আকাশে ওড়ার দিনগুলো (পর্ব-৪)

গত পর্বের পরে…
২০-৩-২০১৮ তারিখে আমাদের অসম্ভব ব্যস্ততায় দিন কেটেছে। ব্যস্ততা বলতে তেমন কোনো কাজের চাপ ছিল না সেদিন। বলা যায়, ঘুরে বেড়ানোর চাপ ছিল।
সেদিন আমরা ক্যানবেরাতে প্লেজার ট্রিপে গিয়েছিলাম। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি থেকে বাসে প্রায় তিন ঘন্টা ভ্রমণ করে ক্যানবেরা পেীঁছানো যায়। প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ৪০ জন সদস্য এবং কোর্স কো-অর্ডিনেটরসহ সকাল সাতটার দিকে আমরা ক্যানবেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। বেশ বড় একটা বাস এসে এপিএক্স হোটেল এপার্টমেন্টস থেকে আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। নাহিদ ভাই প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাসের ভেতর পানি ছাড়া কিছু খাওয়া যাবে না। এর কারণ আর কিছুই না, পরিচ্ছন্নতা।
আমরাও অল্প সময়ের মধ্যে বুঝে গেছি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম এবং প্রধান কনসার্ন হলো পরিচ্ছন্নতা। সেটা হাইওয়ে হোক বা ঘরে অথবা রেস্টুরেন্টে, এমনকি ট্রান্সপোর্টেও। সত্যি অসম্ভব সুন্দর ঝকঝকে রাস্তাঘাট আর অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিস্টেমের দেশ অস্ট্রেলিয়া। এই শহর নোংরা করতে কারো মনই সায় দিবে না।
ক্যানবেরা যাবার পথে সকাল ৯:১৫ মিনিটে আমরা Road Heaven Cafe র সামনে ব্রেকফাস্ট করেছি। ব্রেকফাস্ট আমাদের সাথেই আনা হয়েছিল; আপেল, নাটস বার, জুস আর কেক। ক্যাফের কাঁচের বাক্সে নানান ধরণের লোভনীয় স্ন্যাক্স সাজানো থাকলেও পর্ক থাকার সম্ভাবনা থাকায় আমাদের কেউই কোনো কিছু খেতে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। সেই সাথে মোটামুটি সবার ভেতরে মূল্য আতংকও কাজ করছিল।
এত সুন্দর দেশে একটা বিষয় ভীষণ অস্বস্তিকর, শহরের যেখানেই যাওয়া হোক না কেন শুচিকর্ম সম্পাদনের জন্য টয়লেটে কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। আমাদের মতোন বাঙালি যাদের কথায় কথায় পানি খরচ করার অভ্যাস তাদের জন্য বিব্রতকর অবস্থা। যাত্রাপথে সঙ্গে বোতলে পানি রাখা ভাল তা দেশ থেকেই জেনে এসেছিলাম। ক্যাফের ওয়াশরুমগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন, sanitary waste unit এর জন্য আলাদা বক্স আর ওয়েস্টবিন তো ছিলই, কিন্তু সেই একই বিষয়-পানির ব্যবস্থা নেই। একজন সিনিয়র ম্যাডামকে দেখলাম বিব্রত হয়ে টয়লেটেই যাচ্ছেন না। যাহোক খাবার খেয়ে আমরা নিজেরা নিজেদের রাবিশ নিয়ে ওয়েস্ট বিন বক্সে ফেললাম। যে স্যার বাংলাদেশে থাকাকালে নিজেরা তেমনভাবে এ ধরনের কাজ করেন না তারা কিন্তু বেশ খুশিমনেই নিজের হাতে ময়লা বা প্যাকেটগুলো নিয়ে নির্ধারিত জায়গায় ফেলেছেন।
আমরা সকাল ১১ টার দিকে Bangladesh High Commission পৌঁছালাম। খোলা চোখে নিরাপত্তা বেষ্টনীহীন মনে হলেও এই দূতাবাস অদৃশ্য এক নিরাপত্তা চাদরে ঘেরা ছিল। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার বাংলাদেশী দূতাবাসে এসে বুঝলাম, এটা যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। উত্তাল বাতাসে ভিনদেশের মাটিতে দেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়তে দেখে বুকের ভেতরটা অহংকারে ভরে উঠলো। ১১ থেকে ১ টা অবধি আমরা His Excellency High Commissioner, Bangladesh High Commission, Canberra এর সাথে Interaction অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি। দারুণ স্বতঃস্ফূর্ত আর প্রাণবন্ত ছিল পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার এই আয়োজন। His Excellency High Commissioner তার মূল্যবান বক্তব্য আর প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ইস্যু, অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ এর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বানিজ্য সুবিধা ইত্যাদি নিয়ে মূল্যবান আলোচনা করেছেন। এখানে সামান্য রিফ্রেশমেন্ট এর ব্যবস্থা ছিল।
খানিকক্ষণ ফটোসেশন করে আমরা আবার বাসে উঠে বসি এবং আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট, ক্যানবেরাতে পৌঁছাই।
হাইকোর্ট ভবনটির চমৎকার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, সুউচ্চ ছাদ। আমরা ৩ টি কোর্ট রুম বা এজলাস পরিদর্শন করি। কোর্ট চলাকালীন মোবাইল ফোন নির্ধারিত স্থানে জমা দিয়ে কোর্ট রুমে প্রবেশ করেছি। একজন সম্মানিত বিচারক এবং একজন রেজিস্ট্রারার আমাদের আদালতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেন। কোর্ট নং-১ এ সাতজন বিচারপতির জন্য আসন রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৭ জন বিচারক রয়েছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতোন নারী প্রধান বিচারপতি সুজান কেইফেল কর্মরত আছেন। সম্মানিত সুজান কেইফেলসহ আরও চারজন বিচারকের সমন্বয়ে কোর্ট অফ আপিলে একটি মামলার শুনানীকালে আমরা উপস্থিত ছিলাম।
এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। পিনপতন নিস্তব্ধতায় কোর্টে কার্যক্রম চলছিল। আইনজীবী, বিচারক প্রত্যেকেই মৃদুস্বরে কথা বলছিলেন। সেদিন বাংলাদেশে আমাদের কোর্ট রুমে নানান প্রতিকূলতা আর অবকাঠামোর অপ্রতুলতার মধ্যেও বিচারকাজ পরিচালনার কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক আত্মতৃপ্তি কাজ করছিল আমার।
হাইকোর্ট থেকে ফিরতিপথে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্রেকে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে নেমেছিলাম। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের উদ্বোধন করা অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এই পার্লামেন্ট ভবনটির সৌন্দর্য সত্যি মুগ্ধ করেছে। পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির মাঝখানে প্রশস্ত মাঠ আর সামনে স্বচ্ছ পানির লেকঘেরা অপূর্ব সুন্দর স্থাপনা এই পার্লামেন্ট ভবন। প্রশিক্ষণার্থীরা সময়টুকু ধরে রাখতে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
এরপর আমরা ‘ব্লাক মাউনটেন পেনিনসুলা’ তে যাই। ‘ব্লাক মাউনটেন পেনিনসুলা’ দারুণ সবুজ একটা পার্ক। জলাধারে সাঁতরে বেড়ানো হাঁস, পাখির ঝাঁক দেখতে দেখতে ছিমছাম সাজানো পার্কটির বেঞ্চে বসে আমরা আমাদের লাঞ্চ করেছি। আইন মন্ত্রণালয় থেকে আগত ওসমান হায়দার স্যার, জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের আজাদ, প্রিয় সহকর্মী ঝুমার সঙ্গে মজার আড্ডা দিতে দিতে মসলাদার তেল চুপচুপে ইন্ডিয়ান কারি আর ভাত দিয়ে আমরা আমাদের খাওয়া পর্ব শেষ করে খানিকক্ষণ পার্কের মনোরম পরিবেশে ঘুরে বেড়িয়েছি। এখানে অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য সব দর্শনীয় স্থানের মতো বিশাল বিশাল গার্বেজ বক্স, পর্যাপ্ত খাবার পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল।
সেদিনের একটি মুহূর্ত মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি। আমি আর ঝুমা পার্কের টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম। আমরা তখন ফ্রেশ হবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম হঠাৎ বিশ্রামকেন্দ্রের মেঝেতে তাকিয়ে দেখি অসংখ্য রোয়া রোয়া শরীরের বিছা ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদের সতর্ক করে আমরা তড়িঘড়ি বাসের দিকে ছুটেছিলাম। কী ভয়ানক। ঝুমা হাসতে হাসতে বলছিল, আপা, পোকামাকড়ের দেশ-বিদেশ নাই।
সেদিন দিনের শেষ ভ্রমণ স্থান ছিল ‘ক্যানবেরা ন্যাচারাল পার্ক।’ সিডনিতে পা দেয়া মাত্রই আমরা সবাই উদগ্রীব হয়েছিলাম, কখন অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্যাঙ্গারু দেখতে পাবো। অবশেষে ‘ক্যানবেরা ন্যাচারাল পার্কে’র বিশাল তৃণভূমিতে দর্শন মিলেছিল এক ঝাঁক চঞ্চল ক্যাঙ্গারুর যা আমাদের ভিন্ন এক আনন্দ অনুভূতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
এই প্রাণিটি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পশু। সামনে দুটি ছোট আর পেছনে দুটি লম্বা পায়ের অধিকারী ক্যাঙ্গারু পেছনের দুই পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। ভীষণ সাবধানী এই প্রাণিটি নিজের শরীরের থলেতে বহন করতে পারে ক্যাঙ্গারু শাবক। শাবকটি মায়ের থলেতে এমনভাবে ঢুকে পড়তে পারে যে তাকে বাইরে থেকে দেখা যায় না। কবে যেন একটা উপকথা পড়েছিলাম, বনদেবীকে শিকারীর হাত থেকে বাঁচানোর কারণে মা ক্যাঙ্গারু তার তলপেটের এই থলেটি বর হিসেবে পেয়েছিল। ক্যাঙ্গারুকে আমার সেই গল্পের ক্যাঙ্গারুর মতো নিরীহ আর উদার প্রাণি বলেই মনে হচ্ছিল। আমি মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম মা ক্যাঙ্গারুর চোখের মায়াময় দৃষ্টি! আমরা যতো কাছে এগোচ্ছিলাম চঞ্চল পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
ক্যাঙ্গারুর পেছনে ছুটতে ছুটতে বেলা পড়ে এসেছিল। ফেরার উদ্দেশ্যে আমরা সবাই আবার একে একে বাসে উঠেছিলাম। তারপর বাস ছুটতে শুরু করেছিল আমাদের জন্য নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে।
সারাদিনের ছুটোছুটি আমাদের একেবারে ক্লান্ত করে ফেলেছিল। আমি আর ঝুমা ভেবেছিলাম রুমে ফিরে দুটো খেয়ে নিয়ে সোজা ঘুমিয়ে যাবো। কিন্তু পরিশ্রান্ত শরীরে নরম বিছানায় ডুবতে ডুবতে দেশে রেখে আসা প্রিয়জনদের মুখ মনে পড়ে আমাদের দুজনের সারাদিনের সব আনন্দ ফিকে হয়ে আসছিল। এ অদ্ভুত এক দোটানা। বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না।
(চলবে)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত