ওবায়েদ আকাশের কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 4 minutes

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা দৈনিক সংবাদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। কবি,সম্পাদক ওবায়েদ আকাশের জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবার জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


এ গল্প জানে না কোনো শিশু প্রজাপতি শৌখিন শিশুটির কাছে একগুচ্ছ ফুলের মালা পড়ে আছে ফুল নিয়ে আমাদের ধারণা অনেক একঝুড়ি কাগুজে ফুলে কত কী সম্বন্ধ হয়ে যায় আনমনে ভাবি, আকালের সম্পর্কগুলো এই ভাবে, রূপ-অন্ধ মানুষের ভেতর সুখ্যাত বেশ ফুলেদের পরস্পর সম্বন্ধগুলো রটে আছে পুরাকাল হতে এ গল্প জানে না কোনো শিশু প্রজাপতি আমাদের মহত্ত্বগুলো আলোয় বিবর্ণ হয়ে ঝরে গেছে কাগুজে ফুলে কেবল শিশুটির পাশে বিস্তর পড়ে থাকে প্রকৃত গোলাপ, মালতি       জঙ্গলজুড়ে মহাপরিকল্পনা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসবার আগে, জঙ্গলের কিছু যাপনচিত্র যেমন বাঘ কিংবা সিংহের সঙ্গে মহাপার্বণে দুধভাত খাওয়ার দৃশ্য হাতির শুঁড়ে ভর করে হলুদ পাকা আম ছেঁড়ার দৃশ্য আমাদের প্রচার মাধ্যমে বারবার প্রদর্শিত হওয়া জরুরি তাতে শাহবাগ থেকে কার্জন হল– ছেলেমেয়েআবালবৃদ্ধবনিতা প্রত্যেকের হাতে তোমার জন্য শোভা পাবে নানাগন্ধ পুষ্পের তোড়া তোমাকে গ্রহণ করবে রাজার বাহিনী, মেঘের অতিথি যখন জঙ্গল থেকে ডাক আসে– এসব কথা আগে থেকেই ভাবতে ভাবতে আমাদের ব্যক্তিগত গৃহপালিত বাঘ-সিংহ-হাতির চারপাশ ঘিরে পায়চারি করি বাড়ির অন্দর ঘিরে সুরক্ষিত রাজার বাহিনী এবং বর্ষার পুকুরের জলে শিশুদের লাফিয়ে পড়ে স্নানের দৃশ্য কল্পনা করি আর এসব কিছুই নিজস্ব ক্যামেরায় ধারণ করে বড় হচ্ছে বাড়ির শিশুরা একদিন আমি সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে সত্যি সত্যি জঙ্গলের দিকে পা বাড়িয়ে দেই এবং এবং বিস্মিত হয়ে দেখি, জঙ্গল মানেই হলঘর যেখানে রাজকার্য পরিচালিত হচ্ছে, শাসন-ত্রাশন শলা-পরামর্শ, রাষ্ট্রের সাফল্য-ব্যর্থতা তুলে ধরা হচ্ছে কারাগার থেকে কারো মুক্তি কারো গ্রেফতার পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাকে দেখেই কেউ একজন গ্রেফতার করে একগুচ্ছ ঘুমের পিল খাইয়ে দিয়ে বলল: এরপর তোমার মুক্তি আমার দেখা হলো না জঙ্গলজুড়ে আলিশান বাড়ি, নৈশক্লাব বিমানবন্দর, শপিংমল, বিউটিপার্লার, বার, রেস্তরাঁ আরো কত কী…     একদিন আমি  চাইলেই আমার সুখ-দুঃখের অংশীদার তুমিও হতে পারতে চরম নিদানকালে অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে আমার দুঃখের গলায় ছুরি আর সুখের পেটে বর্শা ঢুকিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত শরীরের পাশে চিৎকার জুড়ে দিতে সে কথা ভুলেও জানতে না আজকাল তোমার আমার মধ্যবর্তী ব্যাপকতা ভেঙে আমাদের সুখ-দুঃখের অনর্থই দেখা হয়ে যায় পরস্পর কোমর জড়িয়ে ধরে- খায়দায়, নাচে শুধু জলের ওপর থেকে কচুরিপানা সরিয়ে ঝুপ করে ডুব দিতে গেলে-কে কখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আমি ভেজা ভোরবেলা রৌদ্রের কাছে তোমাকে হারানোর বেদনার কথা বলি- রৌদ্র তখন শিশিরে শিশিরে ঝরে এইসব জাজ্বল্য শিশির ফ্রেমবন্দি করে সদর রাস্তায় তুলে ধরে দেখি কেউ আমাকে করুণা করে কণ্ঠহার খুলে দেয় কিনা একদিন আমি সূর্যাস্তের ভেতর তোমাকে খুঁজতে বেরুবো সে কখনো তোমার কাছে পৌঁছে দেবে বলে আমাকে সঙ্গে না নিয়ে যেতেই পারে না লাল রঙের ঘুড়ি  লাল রঙের ঘুড়ি, তুমি আকাশ থেকে কতদূর ওপরে উঠলে তোমাকে আর খুঁজেই পাবো না? কতদিন তোমার নাটাই ধরে বসে আছি তোমার ভালবাসার দেখভাল করছি আর সূর্যের তাপে পুড়ে-যাওয়া রঙ প্রকৃতি থেকে ভিক্ষে করে সময় অসময় তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি আজকাল কিছু জ্বরের ঘোরে এটাওটা বলি অফিসে রাস্তায় যে যার গালে চড় বসিয়ে দেই তখন তোমার নাটাইয়ের কথা একদমই মনে পড়ে না তখন তোমাকে সে কী কসরত করে নিচে নেমে আমাকে সারিয়ে তুলতে হয়, আবার ওড়ার প্রস্তুতি নিতে দিনের পর দিন ক্ষয় হয়ে যায় অথচ জানো আমিই তোমাকে অনন্ত আকাশে অদৃশ্যলোকে একদিন মিলিয়ে দেব বলে প্রতিশ্রুত আছি আবার যখন ফিরে আসবে- দেখবে, এই আমি রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে তোমার জন্য কতটা প্রতীক্ষা করতে পারি মধ্যরাতে আথালে-গোয়ালে গবাদিপশুদের অসম চিৎকার তোমার আমার দূরত্বের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয় ভাবছি, এবার জ্বরাক্রান্ত হলে ভরা বর্ষার নদীতে ডুবে তোমাকে জানিয়ে দেব অনন্ত মুক্তির কথা   সাধ আহ্লাদ  সাধ আহ্লাদ থেকে একটুআধটু মাদুরের ওপর ছড়িয়ে নিয়ে বলি: তাণ্ডব চালিয়ে যাও রণাঙ্গনে ক্লান্ত ঘর্মাক্ত দেহে ঊর্ধ্বমুখে জল খেতে চাইলে কেউ একজন পাঠিয়ে দেবেন বৃষ্টির ধারা আমাদের চেনা আকাশ থেকে শকুনেরা পালিয়ে গেছে কবে চামচিকের ঠোঁটে খণ্ড খণ্ড মেঘ ঘরময় পায়চারি করে বর্ষণের নিরাপত্তা নিয়ে কারো কোনো উৎকণ্ঠাই নেই এ মুহূর্তে দীর্ঘদিনের জমানো সাধ আহ্লাদে ফাটল কিংবা বিভাজন কারো কাম্য হতে পারে না বিভাজিত ক্ষতে সবাই আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে মাঝামাঝি বসে কালার বাঁশি সুর তুলতে পারে হুক্কাহুয়া শেয়ালের ডাক মধ্যরাতের সাধ আহ্লাদে শুধু আতঙ্কই ছড়িয়ে দিতে পারে বিভাজন ক্রিয়াটা আমি বুঝে না বুঝেই চাপিয়ে দিয়েছি- অখণ্ড সাধ আহ্লাদ থেকে কোনোই সদুত্তর মিলছে না নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারে মাতাল হয়ে যারা চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছে দেখি তারা কী বলে অন্যথা আগত আষাঢ়ে একা একাই তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে দেখানো যাবে স্রোতের অভিলাষ  সে এখন পাতালনিবাসী, তাকে কূলের খবর বোঝাতে যাওয়া আকাশ থেকে একটি-দুটি তারকা খুলে আথালের খামে বেঁধে রাখবার মতো অবাস্তব কিছু অথচ যখন আত্মাভিমানে ঘর ছেড়ে গেল, অনাহারে কত কত কাল পাখি আর নদীদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেল গাঁয়ের বধূরা পরম পরিহাসে কলসী ছেড়ে জল ছুড়ে দিত দেহে ছোট্ট শিশুরা পরিধেয় খুলে নগ্ন করে দিত এ-খবর রটে গেলে কলার ভেলায় করে ছুটে এল শত শত শিশু-পর্যটক। কেউ তার নগ্ন পশ্চাৎদেশের কেউ আবার ছবি তুলল মাথা মুড়িয়ে নিয়ে তখন শুধু ধমকে দিয়ে বললাম: স্রোতে চড়া মানেই যত্রতত্র ভেসে বেড়ানো নয় কূলে কূলে পৌঁছে দেয়া ফসলের আগাম বারতা পর্যটক মানেই… তবু সূর্যাস্ত থমকে দাঁড়াল এ দৃশ্য অবলোকনে এবার পাতাল থেকে বারতা এলো, এখানে শুধুই অবাধ সংসর্গ আছে; নিস্তব্ধ উদযাপন আছে, এসো স্রোতের অভিলাষ শুধু নদীতীরে জনপদে কাটাছেঁড়া এবড়োখেবড়ো রিফুকর্ম… উন্মাতাল ত্রাস আর চাইবো না  ভোরবেলা আর তোমার কাছে কিছু চাইবো না সারারাত্রি চেয়ে চেয়ে জ্যোৎস্না দিয়ে সূর্য ঢেকেছি কম্বল দিয়ে গ্রীষ্ম ঢেকেছি আর তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হিমালয়ের মৃত্যু দেখেছি তোমাকে জানানো হয়নি, আমার চাইবার দিন সহস্র বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে যখন তোমার নাভিতে বসে খেলে যেত ইদুর ছানারা তোমার আমার নখ কেটে দিত-দেয়ালের টিকটিকিগুলো এতটা নির্জন ঘরে টিক টিক করে ঘোষণা করত ‘সত্যি’ # ভাবছি, আজ ভোরবেলা গাছের গুড়ি ফেলে পৃথিবীর বন্দর-নগর-রাজপথ-গলি স্তব্ধ করে দেবো # তুমি চাইলেই কেবল মুক্ত করে দেবো অকাতরে খরস্রোতা নদী       পাহারা দাও প্রেম

দুয়ারে বসে পাহারা দাও চিল ইথারে ওড়ে কাহারো ছোড়া ঢিল

ওপাশে ডাকে মানিক জোড়া ঘুঘু পাহারা করো একটুখানি লঘু

গ্রীবার চুমু গ্রীবায় শোভা পাক পাহারা তবু শালিক ধান খাক

দুয়ারে বসে পাহারা দাও প্রেম প্রেমের নৌকা ঘাটেই ভেড়ালেম

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>