একটি ফাগের গল্প

Reading Time: 3 minutes

শেষ বিকেলের  কমলা আভার আলো আমীর দূর্গের শার্সি মহলের সামনে পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে চতুর্দিকে। সাদা মিনারের গায়ে এখন কমলা রঙের নকশী কাটার উঁকিঝুঁকি। আমীরের রাজকুমারী  যোধাবাই বিষন্ন মুখে বসে আছেন শীশ মহলের অলিন্দে। সামনের ধৌসা পাহাড় ঘিরে রেখেছে আমীর প্রাসাদকে,  জয়পুর জনপদ থেকে নিচে তাকালেই ক্ষীণস্রোতা ভীমকায়ানি বয়ে চলেছে। তার ওপারে রয়েছে আজমেরী শরীফ দরগা। খাজা মৈনুদ্দিন চিস্তির আবাস আর ওখানেই আছেন তিনি, মুঘল বিজেতা চাঘতাই বীর জালালুদ্দিন মহম্মদ আকবর। শাহেনশার সাথে যোধার বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন চার মাস কিন্তু সখ্যতা গড়ে উঠতে পারেনি। রাজকুমারী দিল্লীতে একমাস থেকেই ফিরেছেন বাবা রাণা ভারমলের দূর্গ আমীরে।ফেরার পথে দিল্লী নিয়ে যাবেন মালিকা উস জাহান যোধাবাইকে। কাল বাদে পরশু হোলি সারা আমীর ফাগের উৎসবে মাতোয়ারা বিকানের থেকে দাদী আম্মা বালাবাই এর মাইকার  সবাই এসে পড়েছে, তার মা পদমাবতীর  মাইকা রণথম্ভোরের রাণারাও এসেছেন ফাগের উৎসবে সামিল হতে।  রঙ্গোলিতে হরেক কিসিমের গুলাল মিশানো হচ্ছে। ভাঙ মিঠাই ঠান্ডাই সিদ্ধাই চৌপর খাবার  তৈরি হচ্ছে প্রাসাদের চৌকা ঘরে। ফাগুয়া বলে কথা, রাজপুতান ছৌড়ারা মিঠি সুর তুলছে  বাঁশিতে, রাজপুতানীরা বিন্দি আঁকছে কপালে পায়ে পড়ছে  ভারী পায় জোড়। আমীরের নাচের তালের নাম আছে সারা রাজপুতানায়। গুলালের মধ্যে ভেষজ রঙের ব্যবহার শিখিয়েছেন যোধাবাই নিজেই। তাঁর মত শিল্পী কেউ ছিল না রঙের ব্যবহারে। সব কিছুর মধ্যে মন পুড়ছে শুধু রাজ দুলারি যোধার। মুঘলদের সাথে তার বিবাহ শুধুই রাজনৈতিক সমঝোতা মাত্র। এছাড়া উপায় ছিল না। তার দুই ছোটভাই মনো সিং আর জগন্নাথ সিং কে আটকে রেখেছিল মেওয়াটের শাসক  শরফউদ্দিন হুসেন। রাণা ভারমলের তখন ভেতরেও চাপ চলছে। তাই ভানঝা পূরনমলের সাথে যুদ্ধে না গিয়ে সেনাপতি চাঘতাই খানের শরণাপন্ন হলে,  আকবরের সাথে আগ্রার কাছে সাঙানীরে বলে একটি জায়গায় দেখা হয় ভারমলের এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন কন্যাদান করে। উদ্ধার হয় পুত্র জগন্নাথ সিং ও মনোসিং। দুই ভাই যোধার কলিজা ছিল তাই এই বিবাহে সে একবার ও মানা করেনি পিতাকে । রাজপুত নারীদের ত্যাগ ই ধর্ম এটাই নিয়ম। কিন্তু মন মানে না। যোধা নিজেও তরোয়াল লাঠি খেলা ঘোড় সওয়ারি সব শিখেছেন। নিন্দুকেরা বলে যোধা ভারমলের পর্তুগীজ রক্ষিতার গর্ভজাত। তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে রানী পদমাবতী তাকে  কোলে তুলে নেন। যোধার মেধা, যোগ্যতা গুণাবলী রাজপুত ঘরানার সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল। তবুও কুসুম কলি রাজকুমারী ছোটথেকে কৃষ্ণ ভগবানের পূজা করেছেন, গান শিখেছেন সন্ত রামাদাসের ভজন। চাঘতাই বীরেদের যোশ, খানা পিনা জেহাদ, জাঁবাজী তার বড় রুক্ষ লাগে। রাজপ্রাসাদে বাদশার মা মরিয়ম উস জমানী হামিদা বাই না থাকলে তাঁর দমবন্ধ হয়ে যেতো। এত্তেলাদার আগেই এসে জানিয়ে গেছে বাদশা প্রায় পৌছে গেছেন। পাহাড়ি রাস্তা কাল রাত থাকতেই পৌছে যাবেন আমীর দূর্গে। তিনি শাহেনশাহ মালিক ই হিন্দুস্থান, অপেক্ষা কেন করবেন এই আমীর দূর্গে! হয়ত তাকে কাল ই রওয়ানা দিতে হবে দিল্লীর পথে। ফাগের উৎসব আর ফিরবে না তার জীবনে। যোধা পায়ে পায়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন।

ঢুকতেই রনথম্ভোরের মামাজি রতনদাস সিংজির বেটী বৃন্দাসিং মানোয়ারি ঝাঁপিয়ে পড়ল জিজির উপর। সন্ধ্যার রাগে সাজালো তার বড়িজিজিকে– সিঁদুর রঙের ঘাঘরাচোলি আর স্বর্নাভ চুনরিতে। মাথায় দিলে মালা, অলংকারে মুক্তো আর সোনার চমক! রত্নহারে বিরাট একটি কমল হীরে। হীরে টি ধরে বৃন্দা বলল “এই তোমার জাঁবাজ সিপাহী জালাল”— প্রত্ত্যুত্তরে বৃন্দা দূতী একটি কিল খেলো বড় করে। সাজ শেষ করে দুজনে চলল কৃষ্ণ মহলে আরতী দেখবে বলে। আজ ই ঝুলায় বসে যাবেন গিরিধারী আর রাধিকা জি– মহলে পা দিয়েই যোধা  শুনলো  টংকারাতে গান ধরেছেন ভগবান দাস চাচা, হিন্দোলে,– মধুবন মে রাধিকা নাচে রে-; যোধা গিয়ে বসলেন মার পাশে,ঝুলার দড়িতে হাত দিতেই, গুঞ্জন উঠলো- খান ই খানান, দিল্লীশ্বর, শাহি ই হিন্দুস্থান জালাল উদ্দিন আকবর মহম্মদ শাহ  পৌছেছেন এসে আমীরে–

– এতটা পথ উজিয়ে আগেই এসে পড়লেন তিনি! তবে কি রাতেই!!  যোধার পদ্মপলাশ চক্ষু দুটি জলে ভরে উঠলো। কৃষ্ণ লালা!! পরের দিন অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল  যোধার। রাতের বেলা মেহমানওয়াজীর সময় খাবার পরিবেশনকরতে করতে একমুহূর্তের জন্যে চোখ তুলতেই দেখেছিল দুটি চোখ তার দিকেই ছিল কারুর– তিনি কোনমতে দিয়েই উঠে এসেছিলেন কক্ষে। যোধা স্নান করে হরজাই রঙের ঘাগরা চোলি, নীবিবন্ধ পরে খোলা চুলে এসে দাঁড়ালেন তার প্রিয় শার্সিমহলের খোলা অলিন্দে। কপালে জ্বল জ্বল করছে লাল কুমকুম। নীচে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে  স্বচ্ছতোয়া ভারতোয়ানিকে। পাশেই দীর্ঘকায় কি একটি ছায়ামত রোদ্দুর আড়াল করতে ফিরে দেখতেই চমক লাগলো–

–আপকি লিয়ে এক ছোটিসি ভেট হ্যায়, মালিকা ই হিন্দুস্থান, আগর হুকুম হ্যায় তো, পেশ করু? নরম স্বরে জানতে চাইলেন খোদাই হুকুমত দিল্লীশ্বর আকবর– বাদশা কি করে জানলেন তিনি সকালে স্নানের পর এখানেই আসেন আগে! যোধা নীরব দুটি স্থির চক্ষু তুলে তাকালেন, আকবর দেখলেন এক পবিত্র ভোর, ফজরের নমাজের আহবান– — সাদা আঙরাখার খোপ থেকে বার করলেন একটি হাতির দাঁতের বাক্স। সেই বাক্স খুলতেই বেরোলো একটি সোনার বাঁশি তাতে নবরত্নের কাজ। যোধার চোখে বিস্ময়!  সেই বিস্ময় কাটতে না কাটতেই,অন্য খোপ থেকে মুঠো ভরে নিয়ে মেলে ধরলেন যোধার সামনে– এক মুঠ লাল গুলাল আপ কি লিয়ে মালিকা— যোধা স্তব্ধ হলেন এবার , কিছুক্ষন ইতস্তত করে হাতের পাতাটি এগোলেন  দেওয়ার জন্যে, জালাল পরম যত্নে কুসুম কোমল পাতাটির নিচে নিজের পাতাটি মেলে ধরলেন — চারটি চোখ এক হলো কি নিবিড়ে!

লালাজির মন্দিরে ভগবান দাস জী গাইছেন, পরজ বসন্তে মেরে তো গিরিধারা গোপালা দুসরা না কোয়ি—-

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>