একটি ব্যক্তিগত যন্ত্রণা বা স্মৃতিচারণ

কোনো কোনো মানুষের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে বেশ প্রভাব বিস্তার করে।হয়তো তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘকালীণ নয়, তবু মনে হয় কোথাও যেন একটা টান তৈরি হয়ে যায়, আর তাই তাঁর চলে যাবার পর বুকের মধ্যে একটা শূণ্যতা কাজ করে।

আজকের দিনটা আমার কাছে তেমনি একটা দিন। মানুষ জন্মালে তার মৃত্য ঘটবে এর থেকে স্বাভাবিক ঘটনা, বাস্তব সত্য কিছু হয় না।তবু মন মানতে চায় না সেই সত্যকে মেনে নিতে। অথচ মানতে হয়।

হ্যাঁ, আজ সকাল থেকে মন ভালো নেই। তার কারন আজ ভোরে বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়িতে অসুস্থ অবস্থায় ৮১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন আমার, শুধু আমার কেন, পৃ্থিবীর বহু মানুষের প্রাণের কাছাকাছি, প্রিয় অভিনেতা গিরিশ কারনাড।

আর তখন থেকেই আমি স্মৃতির ভারে কাতর হয়ে বসে আছি।

এই তো সেদিন, এক বছর আগের মে মাসের ৭ তারিখ মেল করেছিলাম তাঁকে। সময়টা সকাল। অনুবাদ পত্রিকার নাট্য সংখ্যা করব।তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। আমার অত্যন্ত কাছের মানুষ, বোন অধ্যাপিকা স্রোতস্বিনী দে তাঁর ‘এ হিপ অফ ব্রোকেন ইমেজেস’ নাটক অনুবাদ করেছেন।(বাংলায় ভাঙা ভাঙা চাঁদ, প্রকাশনা-প্যাপিরাস) তার থেকেই মেল আইডি নিয়ে মেল করার সাহস দেখালাম।

মেল করার ঠিক এক ঘন্টা বাদে আমার দেওয়া মোবাইল নাম্বারে একটি ফোন আসে।বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না পাঠক- কন্ঠ স্বর শুনে আমার হাত পা অবশ হয়ে আসে, উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ি চেয়ার ছেড়ে।

ওপাশ থেকে সেই স্বর বলে ওঠে, ডিয়ার বিতস্তা, গিরিশ কারনাড হেয়ার। তুমি অনুবাদ পত্রিকার কথা বলেছ। আমি যতদূর মনে করতে পারছি এর এডিটর ছিলেন ঘোষাল। ইয়েস, বৈশম্পায়ন ঘোষাল। তাঁর সঙ্গে আমার বেশ হৃদতা ছিল। কলকাতায় এবং বেঙ্গালুরুতে কয়েকবার তাঁর সঙ্গে আড্ডা হয়েছে। আপনি কী তাঁর কেউ?

আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। কারন, বাবা কখনো বলেনি ওনার সঙ্গে পরিচয়ের কথা। তাছাড়া বাবা নিজেকে যেহেতু পুরোই আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন করে গুটিয়ে নিয়েছিলেন বাইরের জগত থেকে, তাই ফেলে আসা দিনের কথা কখনোই বলতেন না। অথচ গিরিশ কারনাডের মতো বিখ্যাত ব্যক্তি অনুবাদ পত্রিকা থেকে মেইল পাঠানো মাত্র তাঁর খবর নিতে সরাসরি ফোন  করেছেন! সত্যি আমি যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত হই। আমি তাঁকে বলি, হ্যাঁ, তিনি আবার বাবা।

গ্রেট। আমিও এমন কিছু অনুমান করেছিলাম। কেমন আছেন তিনি? দীর্ঘকাল যোগাযোগ নেই। ফোন নাম্বার কী পাওয়া যেতে পারে?

আমি বলি, বাবা এখন মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেছেন। আর কোনো নাম্বারই সেখানে পৌঁছাবে না স্যার।

কয়েক সেকেন্ড মৌনতার পর তিনি বললেন, আমি ধার্মিক ব্যক্তি নই। এমনকি ধর্ম বিষয়েও আমার বিরক্তি আছে। কিন্তু তিনি সব ধর্মের উপরে একজন স্পিরিচু্য়্যাল ব্যক্তিত্ব, যা আমি আজ অবধি কোথাও দেখিনি।

তারপর তিনি বললেন, তুমি যে সাক্ষাৎকার নেবে বলেছ, কোনো প্রশ্ন তৈরি করেছ? তাহলে মেল করে দাও।

তখনো একটা ঘোরের মধ্যে আমি। তাড়াতাড়ি বললাম, হ্যাঁ, পাঠিয়ে দিচ্ছি।

আসলে আমি কোনো প্রশ্ন তৈরি করিনি। একটা পুরোনো জার্নাল থেকে তাঁর কিছু প্রশ্নের অংশ আর উত্তর নিয়ে রেখেছিলাম। তিনি অনুমতি দিলে ছাপব বলে।সেটাই পাঠিয়ে দিলাম। এবং ভেবেছিলাম, ওনার মতো ব্যক্তিত্ব কি আর নতুন করে কিছু বলবেন আমাকে? এবং আমি ভুল প্রমাণিত হলাম। উনি মেইল দেখে লিখলেন, এই সাক্ষাৎকার অনেক আগের। এরমধ্যে আমার ভাবনার অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। তুমি হায়দারবাদ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর কমপারেটিভ লিটেরেচারের অধ্যাপক তুতুন মুখার্জীর সঙ্গে যোগাযোগ করো। উনি আমার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্প্রতি, এবং আমাকে নিয়ে অনেক কাজও করেছেন। ওই ইন্টারভিউটা নিলে তোমার পাঠক ভালো ভাবে আমাকে চিনবেন।

হে ঈশ্বর, আপনাকে চিনবে? আপনি সারা বিশ্বের পরিচিত নাম। কী নন আপনি? নাট্য ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালক, সাহিত্যিক, নাট্য রচয়িতা। আপনাকে আমি নতুন করে চেনাব? নিজের মনেই বলি।

উনি কিন্তু তুতুন ম্যাডামের নাম্বার পাঠিয়ে দিয়ে জানালেন, ম্যাডামকে সব বলে দিয়েছেন।আমি যেন যোগাযোগ করে নিই। এরপর পাঠক জানেন, তাঁর অসামান্য সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় আমাদের পত্রিকায়।

তারপর একাধিকবার তাঁর সঙ্গে মেইলে আমার কথা হয়। টুকরো টুকরো সেই কথায় আমি আদ্যন্ত ভালো আপোষহীণ এক মানুষকে আবিষ্কার করি, ছুঁয়ে যেতে চেষ্টা করি তার দর্শন, জীবনবোধ, জীবন দর্শন, ভারতীয় পুরান, মিথ, মহাকাব্য, লোককথা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ও ভাবনাকে।

অথচ নাটকের জগতে তিনি এক অতি পরিচিত নাম।তিনি কেবল নাট্যকার নন, ভারতীয় থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের পরিধিতে নির্দশক ও অভিনেতা হিসেবেও তিনি তুলনাহীন। সাহিত্যিক হিসেবেও কন্নড় সাহিত্যের তিনি এক গুরুত্বপূর্ন নাম। যযাতী, মা নিষাদ, তুঘলক, হয়বদনে,উৎসব, নাগমন্ডল, প্রভৃতি নাটকের জন্য কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এই প্রবীণ নাট্যকার অভিনেতা পরিচালক আমার মতো এক সাধারন মানুষকে সময় দিচ্ছেন দেখে অভিভূত  হই। এইতো তাঁকে জন্মদিনে প্রনাম জানিয়ে মেল করলে জানান, ভালো থেকো, আরো জানান শরীর ঠিক নেই।

 জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৯মে।মহারাষ্ট্রে।চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন তিনি। প্রাথমিক পড়াশোনা কর্নাটকে। অঙ্ক এবং সংখ্যাতত্ত্বে স্নাতক হওয়ার পর রাজনীতি এবং অর্থনীতি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা।

১৯৭০-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সংস্কার’ তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি। একে একে ‘নিশান্ত’ (১৯৭৫), ‘মন্থন’ (১৯৭৬), ‘স্বামী’ (১৯৭৭), ‘পুকার’ (২০০০) ‘ইকবাল’-(২০০৫), এক থা টাইগার, টাইগার জিন্দা হ্যায়,- এ তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করে দর্শককে। অন্য দিকে টেলিভিশনেও ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। ১৯৮৬-’৮৭তে জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘মালগুডি ডেজ’-এ অভিনয় করেছিলেন।

গিরিশ সাহেবের ঝুলিতে রয়েছে পদ্মশ্রী , পদ্মভূষণ, জ্ঞান পীঠ, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি , সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ।

চলে গেলেন আজ সকালে। রেখে গেলেন এক বছরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানান স্মৃতি।  

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত