আল মাহমুদের কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 4 minutes

আজ ১১ জুলাই কবি আল মাহমুদের জন্মতিথিতে ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধা।


কদম ফুলের ইতিবৃত্ত 

আমি তোমাকে কতবার বলেছি আমি বৃক্ষের মতো অনড় নই
তুমি যতবার ফিরে এসেছ ততবারই ভেবেছ
আমি কদমবৃক্ষ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকব
কিন্তু এখন দেখ আমি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেও
হয়ে গিয়েছি বৃক্ষের অধিক এক কম্পমান সত্তা
বাঁশি বাজিয়ে ফুঁ ধরেছি আর চতুর্দিক থেকে কেঁদে
উঠেছে রাধারা
আমি কি বলেছিলাম ঘর ভেঙে আমার কাছে এসো
আমি কি বলেছিলাম যমুনায় কলস ভাসিয়ে
         সিক্ত অঙ্গে কদমতলায় মিলিত হও ?
আমি তো বলিনি লাজ লজ্জা সংসার সম্পর্ক যমুনার জলে
                                 ভাসিয়ে দাও
আমি তো নদীর স্বভাব জানি স্রোত বুঝি কূল ভাঙা বুঝি
কিন্তু তোমাকে বুঝতে বাঁশিতে দেখ কতগুলো ছিদ্র
সব ছিদ্র থেকেই ফুঁ বেরোয়
আর আমার বুক থেকে রক্ত।



না ঘুমানোর দল

নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল ডাবের মতো চাদঁ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল । ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে এলেম ঘর ঘুমন্ত এই মস্ত শহর করছিলো থরথ । মিনারটাকে দেখছি যেন দাড়িয়ে আছেন কেউ, পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ?

চৌকিদারের হাক শুনে যেই মোড় ফিরেছি বায় — কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল আয় আয় । পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘীটার পাড় এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার । আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল- পকেট থেকে খুলো তোমার পদ্য লেখার ভাজঁ রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ । দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিদের সব কাব্য হবে, কাব্য হবে- জুড়লো কলরব ।

কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই ।

নোলক

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে। নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে ? -হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে। বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছড়িয়ে থাকে।

জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক সবুজ বনের হরিৎ টিয়ে করে রে ঝিকমিক। বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই, আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।

কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ। সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি নাতো ! ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ। এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।

আমি আর আসবো না বলে

আর আসবো না বলে দুধের ওপরে ভাসা সর চামোচে নিংড়ে নিয়ে চেয়ে আছি। বাইরে বৃষ্টির ধোঁয়া যেন সাদা স্বপ্নের চাদর বিছিয়েছে পৃথিবীতে। কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে? যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা সমস্ত কিছুর। প্রতিটি নামের শেষে, আসবো না। পাখি, আমি আসবো না। নদী আমি আসবো না। নারী, আর আসবো না, বোন। আর আসবো না বলে মিছিলের প্রথম পতাকা তুলে নিই হাতে। আর আসবো না বলে সংগঠিত করে তুলি মানুষের ভিতরে মানুষ। কথার ভেতরে কথা গেঁথে দেওয়া, কেন? আসবো না বলেই। বুকের মধ্যে বুক ধরে রাখা, কেন? আর আসবো না বলেই। আজ অতৃপ্তির পাশে বিদায়ের বিষণ্ণ রুমালে কে তুলে অক্ষর কালো, ‘আসবো না’ সুখ, আমি আসবো না। দুঃখ, আমি আসবো না। প্রেম, হে কাম, হে কবিতা আমার তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর?


জেলগেটে দেখা

সেলের তালা খোলা মাত্রই এক টুকরো রোদ এসে পড়লো ঘরের মধ্যে আজ তুমি আসবে। সারা ঘরে আনন্দের শিহরণ খেলছে। যদিও উত্তরের বাতাস হাড়েঁ কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে বইছে, তবু আমি ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পাহারাদার সেন্ট্রিকে ডেকে বললাম, আজ তুমি আসবে। সেন্ট্রি হাসতে হাসতে আমার সিগ্রেটে আগুন ধরিয়ে দিল। বলল , বারান্দায় হেটেঁ ভুক বাড়িয়ে নিন দেখবেন , বাড়ী থেকে মজাদার খাবার আসবে।

দেখো , সবাই প্রথমে খাবারের কথা ভাবে। আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে। ক্ষুধার্ত মানুষ হন্যে হয়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে। সংবাদপত্রগুলোও না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয়। রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি চেপে ধরেছি। হায় স্বাধীনতা, অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম।

আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায়। যাতে আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই। কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি? আমি পাষাণ কারার চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি। শত দুর্দৈবের মধ্যেও আমরা যেমন আমাদের উৎসকে জাগিয়ে রাখতাম।

চড়ুই পাখির চিৎকারে বন্দীদের ঘুম ভাঙছে। আমি বারান্দা ছেড়ে বাগানে নামলাম। এক চিলতে বাগান ভেজা পাতার পানিতে আমার চটি আর পাজামা ভিজিয়ে চন্দ্রমল্লিকার ঝোপ থেকে একগোছা শাদা আর হলুদ ফুল তুললাম। বাতাসে মাথা নাড়িয়ে লাল ডালিয়া গাছ আমাকে ডাকলো। তারপর গেলাম গোলাপের কাছে । জেলখানার গোলাপ , তবু কি সুন্দর গন্ধ ! আমার সহবন্দীরা কেউ ফুল ছিড়েঁ না , ছিঁড়তেও দেয় না কিন্তু আমি তোমার জন্য তোড়া বাঁধলাম।

আজ আর সময় কাটতে চায়না। দাড়ি কাটলাম। বই নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম। ওদিকে দেয়ালের ওপাশে শহর জেগে উঠছে। গাড়ীর ভেঁপু রিক্সার ঘন্টাধ্বনি কানে আসছে। চকের হোটেলগুলোতে নিশ্চয়ই এখন মাংসের কড়াই ফুটছে। আর মজাদার ঝোল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে গরীব খদ্দেরদের পাতে পাতে।

না বাইরে এখন আকাল। মানুষ কি খেতে পায়? দিনমজুরদের পাত কি এখন আর নেহারির ঝোলে ভরে ওঠে? অথচ একটা অতিকায় দেয়াল কত ব্যবধানই না আনতে পারে। আ , পাখিরা কত স্বাধীন। কেমন অবলীলায় দেয়াল পেরিয়ে যাচ্ছে জীবনে এই প্রথম আমি চড়ুই পাখির সৌভাগ্যে কাতর হলাম।

আমাদের শহর নিশ্চয়ই এখন ভিখিরিতে ভরে গেছে। সারাদিন ভিক্ষুকের স্রোত সামাল দিতে হয়। আমি কতবার তোমাকে বলেছি, দেখো মুষ্টি ভিক্ষায় দারিদ্র্য দূর হয় না। এর অন্য ব্যবস্হা দরকার, দরকার সামাজিক ন্যায়ের। দুঃখের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। আ , যদি আমার কথা বুঝতে।

প্রিয়তমা আমার , তোমার পবিত্র নাম নিয়ে আজ সূর্য উদিত হয়েছে। আর উষ্ণ অধীর রশ্মির ফলা গারদের শিকের ওপর পিছলে যাচ্ছে। দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘুমভাঙ্গা মানুষের কোলাহল। যারা অধিক রাতে ঘুমোয় আর জাগে সকলের আগে। যারা ঠেলে । চালায় । হানে । ঘোরায় । ওড়ায় । পেড়ায় । আর হাত মুঠো করে এগিয়ে যায়। সভ্যতার তলদেশে যাদের ঘামের অমোঘ নদী। কোনদিন শুকোয় না । শোনো , তাদের কলরব।

বন্দীরা জেগে উঠছে । পাশের সেলে কাশির শব্দ আমি ঘরে ঘরে তোমার না ঘোষণা করলাম বললাম , আজ বারোটায় আমার ‘দেখা’। খুশীতে সকলেই বিছানায় উঠে বসলো। সকলেরই আশা তুমি কোন না কোন সংবাদ নিয়ে আসবে। যেন তুমি সংবাদপত্র ! যেন তুমি আজ সকালের কাড়জের প্রধান শিরোনামশিরা !

সূর্য যখন অদৃশ্য রশ্মিমালায় আমাকে দোলাতে দোলাতে মাঝ আকাশে টেনে আনলো ঠিক তখুনি তুমি এলে। জেলগেটে পৌছেঁ দেখলাম , তুমি টিফিন কেরিয়ার সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে আছো। হাসলে , ম্লান , সচ্ছল। কোনো কুশল প্রশ্ন হলো না।

সাক্ষাৎকারের চেয়ারে বসা মাত্রই তুমি খাবার দিতে শুরু করলে। মাছের কিমার একটা বল গড়িয়ে দিয়ে জানালে , আবরা ধরপাকড় শুরু হয়েছে। আমি মাথা নাড়লাম।

মাগুর মাছের ঝোল ছড়িয়ে দিতে দিতে কানের কাছে মুখ আনলে, অমুক বিপ্লবী আর নেই আমি মাথা নামালাম। বললে, ভেবোনা, আমরা সইতে পারবো । আল্লাহ, আমাদের শক্তি দিন। তারপর আমরা পরস্পরকে দেখতে লাগলাম।

যতক্ষণ না পাহারাদারদের বুটের শব্দ এসে আমাদের মাঝখানে থামলো।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>