অলকানন্দা দিন 

Reading Time: 4 minutesIrabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

অলকানন্দাকে আমি নন্দা বলে ডাকি। হলদে রংয়ের ছোট মিষ্টি ফুলটার মতোই অলকানন্দা খুব মিষ্টি আর মোহময়।আমার একঘেয়ে কেরানিজীবনেসেই মোহের ছোপ ছোপ রং লেগেছে ঠিক কবে থেকে, বলতে পারি না। 

একটু আগে নন্দা এসেছিল। কাল আমাদের স্টেকহোল্ডারদের সাথে ওর একটা প্রেজেন্টেশন আছে, সেটা দেখাতে। আমি প্রেজেন্টেশন দেখব কী, নন্দার কথা শুনলাম চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ করে কারণ চোখ খুললেই বিপদ। নন্দার সুতীক্ষ্ন চোখে ধরা পড়ে যাবার ভয়টা এখনও জয় করতে পারিনি। এই আটত্রিশ বছর বয়সে এসে সেই সাহসও আমার আর নেই।

নন্দা প্রেজেন্টেশন শেষ করে মিষ্টি হেসে বললএটা চলবে অমিতাভদা? কোন কোন জায়গায় ঠিক করতে হবে যদি বলতেন

আমি কায়দা করে ঝকঝকে চশমার কাচ অযথাই মুছতে মুছতে বলিতুমি ফাইলটা রেখে যাও নন্দা, আমি দেখে পরে পাঠিয়ে দেবো। 

নন্দা ওর বত্রিশ গিগা বাইটের পুঁচকে পেনড্রাইভটা টেবিলে রেখে বের হয়ে যায়। একলা রুমে বসে আমি মুরাকামির নরওয়েজিয়ান উড খুলে বসি। পড়ায় মন বসবে না জানা ছিল। অতঃপর বই রেখে আবার কফির মগে মন দিই। বুকের ভেতর একটা অচিন পাখি ডানা ঝাপটে ডাকে, নন্দা নন্দা নন্দা। 

কাল একটা মিটিং আছে এইচ আর টিমের সাথে। তার জন্য অনেকগুলো ফাইল ঠিকঠাক করা প্রয়োজন। কিন্তু নন্দার মিস ডিওরের মিহিন গন্ধটা আমাকে এমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে আর কিছুতে মন দেয়া সম্ভব নয় এখন। আমি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করি, তোমার নাম কে অলকানন্দা রেখেছিল, নন্দা? নন্দা, তুমি কেন গায়ে মিস ডিওর মাখো? তুমি এমন করে হাসো কেন, নন্দা? নন্দা, নন্দা, নন্দা, আমাদের চমৎকার সময়গুলো কেন টুক করে শেষ হয়ে গেল? হলো যদি, আমি আবার কেন তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি বলো তো… 

আজকাল কাজকর্মে আমার ভীষণ অমনোযোগ। অফিসে এলেই মনে হয় নন্দা আমার রুমে একগাদা কাজ নিয়ে আসুক, আমরা দুজনে একসঙ্গে বসে মগের পর মগ কফি খাই, বাম গালে মিষ্টি ভাঁজ ফেলে নন্দা প্রাণ ভরে হাসুক, আমি দেখি। আবার আমাদের নিজেদের সময়টুকু ফিরে আসুক, উড়ে আসুক। কিন্তু না, এসবের কিছুই হয় না। নন্দা আসে না, আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফেরে না। নন্দা বড় স্বার্থপর। আমি মনে মনে বলি, তোমাকে আমি খুব কষ্ট দেবো নন্দা, খুব। তোমার মতো আমিও তো স্বার্থপর হতে জানি। 

কফি মগে চুমুক দিতে দিতে আমার এইসব আয়েশি ভাবনা স্থায়ী হয় না। কাচের স্লাইডিং দরজা খুলে রায়হান ঢুকে পড়েছে ভেতরে। আমার উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বসতে বলে– 

অমিত শোন, আজ বিকেলে নর্থ এন্ডে যাব। অনেকদিন আয়েশ করে কোথাও যাওয়া হয় না। 

নর্থ এন্ড আমার প্রিয় জায়গা। নন্দা আর আমি একসাথে গিয়েছিও কয়েকবার। প্রিয় কফিতে চুমুক দিতে দিতে ওর হাসি দেখতাম আমি, তার ভেতর লুকোনো কান্না খুঁজতাম তখন। নর্থ এন্ডের কথায় সেইসব বেখেয়ালি দিন আবার বুকের ভেতর জুড়ে বসে। আমি মনে মনে নন্দাকে ডাকি- নন্দা, আজ এক কাপ কফি খেতে যাবে আমার সঙ্গে? 

আরো কিছু দরকারি অদরকারি কথা বলে রায়হান চলে যায়। আমি নন্দার প্রেজেন্টেশনে মন দেয়ার চেষ্টা করি। মেয়েটা কাজ করে নিখুঁত, তবু প্রত্যেকটা শব্দ ঠিকমতো দেখার চেষ্টা করি। ওর কালকের প্রেজেন্টেশনে যেন সামান্যতম ভুল না থাকে। 

নন্দার সাথে আমার সম্পর্কটা আজকাল কেমন অদ্ভুত। এই মাসকয়েক আগেও আমরা কেবল সহকর্মী ছিলাম। আচ্ছা, এখন কি আমাদের মধ্যে সহকর্মীর থেকে বেশি কোনো সম্পর্ক আছে? না, নেই তো। কিন্তু মাঝখানের কয়েকটা মাস একটা সহজ সরল হিসাবকে অনেক বদলে দিয়েছে।

সৌমিক, নন্দার বর আরেকটা প্রেম করছিল বছর কয়েক ধরে। ঘটনাটা জানার পর নন্দা অফিস করেনি অনেকদিন, মেডিক্যাল লিভ নিয়ে পড়ে ছিল বাসায়। কাউকে কিছু বলেনি অফিসে। ওর টিমের ফোকাল পার্সন হিসেবে আমি খোঁজ নিয়েছিলাম অনেকবার। দেড় মাস পেরিয়ে নন্দা যেদিন অফিসে ফিরেছিল, ওকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। হলদে মিষ্টি ফুলের মতো নন্দা তখন শুকিয়ে ধূসর। আমিই ওকে ডেকে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছি, কাউন্সেলিং করেছি। এই আমার রুমে বসেই ওর বৃষ্টিস্নাত চোখ মেলে এক দুপুরে নন্দা বলেছিল, আমার সাথে আপনি প্রেম করবেন, অমিতাভদা

আমি চমকে উঠেছিলাম। নন্দার প্রতি প্রেম আমার আজকের নয়। এই মেয়েটাকে গত তিন বছরে যত দেখেছি তত বেশি করে প্রেমে পড়েছি। ওকে বলিনি কোনোদিন। আমার সংসার, নন্দার সৌমিক, আমাদের চাকুরিসব মিলিয়ে নন্দাকে আমার বলা হয়নি সেই প্রেমের কথা। কিন্তু সেই দুপুরে আমার কী হয়েছিল, আমি নন্দার হাত ধরে বলে উঠেছিলাম, চলো নন্দা, আমরা অনেক প্রেম করি।

তারপর কিছুদিন আমার সংসার আর নন্দার সৌমিককে পাশ কাটিয়ে অনেক প্রেম করেছিলাম আমরা। রবীন্দ্র সরোবর, নর্থ এন্ড ক্যাফে, স্টার সিনেপ্লেক্স হয়ে সে প্রেম এক বেলার জন্য গিয়ে থেমেছিল ডিয়ার হলিডে রিসোর্টে। সেই দুপুরে অলকানন্দা ফুলের ভেতর আমি বিভোর হয়ে ডুব দিয়েছিলাম। নন্দার মসৃণ ত্বক, ভেজা ঠোঁট আর গহীনতম নদীতে এক জন্মের সাঁতার শেষে যখন তীরে ফিরেছি কেবল, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলেছিলসৌমিক সেই মেয়েটার সাথে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শোয়, আপনি বিশ্বাস করতে পারেন

আমি বিশ্বাস করতে পেরেছিলাম। সেই সাথে এটাও জেনে গিয়েছিলাম সেদিনের দুপুরটা নন্দা কেবল আমাকে ভালোবেসে উপহার দেয়নি।  আমি নন্দার জীবনে এখনো কেউ নই। কথায় কথায় ও আমাকে বনির কথা বলেছিল। বনি মানে বোহেমিয়ান নিলয়, ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। বনি ওকে ভালোবেসেছিল খুব। আমি ছেলেটার ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে এসেছি কয়েকবার। সেদিন নিজেকে আমার বনির মতোই মনে হয়েছিল, সৌমিককে ভালোবেসে নন্দা যাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারেনি। সৌমিকের ওপর রাগ জেদ অভিমান শেষ হলে হয়তো সংসারটা করবে ঠিকঠাক, নাহলে হয়তো করবে না। কিন্তু এই নন্দা আমার প্রেমে পড়েনি এক মুহূর্তের জন্য। সেদিনের পর আমাদের যাবতীয় ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়েছে। আমি এক বুক অপরাধবোধে ডুবে ফিরেছি তিয়াশা আর তূণের কাছে। তবু চোখ বুজলে এখনো ডিয়ার হলিডের আড়াইশো স্কয়ার ফিটের রুমটা দেখতে পাই। চোখ বুজলে নন্দাকে আরো বেশি স্পষ্ট করে দেখি, আরো বেশি করে কাছে পাই। চোখ বুজলে আমাদের অগনিত চুম্বন বারবার ফিরে ফিরে আসে, মসৃণ সিল্কের আঁচল সরিয়ে নন্দা এখনো ব্যাকুল কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, অমিতাভদা, আমি কি খুব খারাপ দেখতে

নন্দাকে আমার ফিসফিসিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, নন্দা, তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। চলো এই বিশ্রী পৃথিবী থেকে আমরা অন্য কোথাও পালিয়ে যাই। এমন কোথাও যাই যেখানে সৌমিক নেই। তূণ, তিয়াশা কেউ নেই। নন্দা প্লিজ, আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি। 

আমার রুমের কাচের দরজা ঠেলে নন্দা ভেতরে আসে। আমি দুচোখ ভরে সেই স্বর্গীয় ফুলকে দেখতে থাকি। আমার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে সে। ওকে কতকিছু বলবো বলে ডেকে উঠি, নন্দা। 

নন্দা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কতক্ষণ, কে জানে। তারপর এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ঠোঁট বলে ওঠেসৌমিকের সাথে আমি হয়তো সংসারটা করব না আর। কিন্তু অমিতাভদা, প্লিজ আপনি এমন করবেন না। জানেন তো, এক জীবনে সব ভালোবাসা পেতে নেই। আপনার তো তূণ আছে, তিয়াশাদি আছে। 

আমি কথার খেই হারিয়ে অর্থহীন প্রশ্ন করিআর আমার নন্দা, সে নেই?

অলকানন্দা আমার দিকে পৃথিবীর নিষ্পাপতম চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। আমি আগাগোড়া এক অর্থহীনতায় ঘুরপাক খেতে খেতে আবিষ্কার করি সে চোখের ভাষা আমার জানা নেই।  

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>