আমাদের খনজনপুর

অনেক দিন আগের কথা।  সালটা বোধ হয় ২০০৪। হঠাৎ কিছু নতুন বই এক সাথে পেয়েছি।  কী রেখে কী পড়ি এমন উত্তেজিত অবস্থায়, নাম দেখে ‘আমাদের খনজনপুর’কেই বেছে নেই।মনে হলো, নামের মাঝে মিষ্টি এক দ্যোতনা আছে। অল্প শুরু করেই দেখলাম, কৈশোর-তারুণ্যের প্রেম নিয়ে,লেখক লিখছেন সহজ সাধারণ নস্টালজিক ভাবে। অনুমান করে নিলাম, হালকা কোনো প্রেমের উপন্যাস হতে পারে।  কোন সমস্যা নেই, ভাবনাটা তখন এমন ছিল যে কিছু একটা হলেই হলো!  প্রথম তিন চার পাতা আলস্যের আরাম কেদারায় নিজেকে ফেলে, বেশ হেলাফেলার ভাব নিয়ে পড়লাম। বিশেষ জমজমাট বা আনকোরা কোনো কাহিনী নয়, তবু কী যে হলো!  কিছুক্ষণের মাঝেই তীব্র ভাবে ভীড়ে গেলাম আমাদের খনজনপুরে।  উপায়ন্তর না দেখে, একটানেই শেষ করতে হলো; আর পাঠশেষে আবিষ্কার করলাম‘হতচকিত এক নতুন আমি’কে।যদিও উপন্যাসের প্রবেশ মুখ ছাড়াতেই বুঝেছিলাম, নাহ এটি ঠিক সাধারণ প্রেমের উপন্যাস নয়। কিন্তু উপন্যাসটি কিসের? আসলে একের পর এক, এমন অদ্ভুত সব অনুভূতিকে লেখক সামনে এনে দিচ্ছিলেন যে, কী-কেন-কিসের উপন্যাস কিছুই তখন মাথায় ঢোকেনি।  এখনো মনে আছে অনুভূতিগুলো শুধু আশ্চর্যজনক ভাবেই নিজস্ব মনে হয়েছিল।  অতি প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা, সহজ-সরল সে খনজনপুরকে খুঁজতে এক সাধারণ পাঠক হিসেবে আমিও তাই বারবার সঙ্গী হয়ে পড়ছিলাম লেখকের।  ফলস্বরূপ টানা চারবার শেষ করেছিলাম সেই একমাসে।  ‘কেমন লেগেছিল’ সে ভাবনা হয়তো মনের কোণে কোথাও রেখে দেয়া ছিল।  এই সেদিন আবার পড়তে গিয়ে অদ্ভুত অনুভূতির পুরনো সে স্মৃতি’র ঝাঁপি এই এত দিন বাদেও ফিরে এলো। আর তাই, “আমাদের খনজনপুর” এর জনক, লেখক মঈনুল আহসান সাবেরকে এবং তাঁর লেখনীকে নতুন করে চিরে চিরে দেখতে ইচ্ছেটা হয়েই গেল।

আধুনিক গদ্যশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের এর গল্প,উপন্যাস আগেও পড়েছি। এখনও পড়ি।  সাধারণ এক পাঠক হয়েও বেশ বুঝতে পারি, উনার একটা নিজস্ব ধরণ আছে।  নির্দিষ্ট সে ধরণে রেখেও, তিনি তাঁর পাঠককে‘অন্যরকম এক ভিন্নতা’র স্বাদ পাইয়ে দেন।  ‘আমাদের খনজনপুর’-এর সেই স্বাদটি বোধহয় একটু বেশিই ভিন্নতার।  খুব চেনা, যেন পুরো ঘটনাই আমার।  আমার এই কথাগুলো অন্য কোন লেখকও হয়তো কখনো না কখনো, কিছু না কিছু লিখেছেন।  কিন্তু এটা পাঠকের মনে পক্ষপাতমূলক রেখাপাত করার কারণ সম্ভবত এটাই যে তিনি হুবহু লিখেছেন।  ‘আমাদের খনজনপুর’ এর শুরুতেই দেখা যায়, প্রধান চরিত্র নোমান উত্তম পুরুষে বলতে থাকে তার আর রেবেকার কথা। উপন্যাসের সূচনাপর্বে, বেশ ব্যাকুল এক ব্যর্থ প্রেমিকের মতো নোমান তার কষ্টের কথা বলতে শুরু করে।  অবশ্য এ বলায় ‘না পাওয়া’র ব্যর্থতার চাইতে, অধরা সে কৈশোর-প্রেমের আকুলতাই বেশি।  বলতে বলতে নোমান চলতে থাকে বর্তমানে;কিন্তু ঘুরতে থাকে অতীত-রোমন্থনে। এক পর্যায়ে হঠাৎ আর বোঝা যায় না- সে খুঁজছে‘কৈশোর’, ‘কৈশোরের প্রেম’ নাকি ‘ফেলে আসা খনজনপুরকে’?  উপন্যাসের বিস্তার হচ্ছিলো এভাবে। ধীরে ধীরে অস্থির এক খণ্ডিত সময়, অচেনা মুল্যবোধ সহ আরও কত কিছু যে সামনে আসতে থাকে!তবে তা আসে খুব ধীরে।  নোমান আর রেবেকার ভেতরে থাকা তীক্ষ্ণ কিন্তু পুরনো সে বহু বর্ণিল কূপ খুঁড়তে গিয়ে।

উপন্যাসের রেবেকা একজন ধনী এবং সফল পুরুষ জুলফিকারের স্ত্রী। নোমানেরও পুত্র, কন্যা এবং স্ত্রী আলোকে নিয়ে গোছানো সংসার।  তারপরও নোমান এবং রেবেকা এখনো সেই ছেলেবেলার মতোই বন্ধু পরস্পরের।  খনজনপুরে পাশাপাশি বাসায় বড় হওয়া দুই কিশোর-কিশোরীর তখনও অনেক গল্প থাকত।  গল্প তাদের এখনও থাকে, অনেক দূরের দুই শহরে বাস করেও।  তারা অবশ্য নিজেদের অপ্রকাশিত সে ভালবাসার গল্প সরাসরি করে না।  গল্প করে খনজনপুরের।  তারা যে এলাকায় পাশাপাশি বাসায় থাকত, সে পাড়ার নাম ছিল রোদভাঙা।  এখন মাঝে মাঝে ফোনে, আর দু একমাস পরপর নোমান চিটাগং থেকে ঢাকায় রেবেকা’র বাসায় বেড়াতে এলে তাদের পুরনো সেই রোদভাঙার স্মৃতি-ঝাঁপি খোলে।  রোদভাঙার গল্পে তারা মশগুল হয়ে যায়।  অফুরান কথা তাদের ছেলেবেলার সব বন্ধুকে নিয়ে।  আত্মীয়, প্রতিবেশীকে নিয়ে।  অজস্র গল্প তাদের খনজনপুরের অদ্ভুত এক কালো নদীকে ঘিরেও। রেবেকাদের বাসার পিছনে বড় একটা পুকুর ছিল।  পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে প্রায়ই বিকেলে তারা আড্ডা দিত। রেবেকা’র বর্তমান শহুরে জীবনে কোথাও কোন পুকুর নেই, তবু সে পুকুর চলে আসে, হঠাৎ আনমনে।  স্কুলে বাচ্চাদের ক্লাস নেওয়ার সময় ‘পন্ড’ লিখতে গেলে!  ঝাপসা হয়ে আসা মন একছুটে তখন খনজনপুরে চলে যায়।  সে তুচ্ছ কথাও সে বলে, নোমানকে।একি অতীতের খনজনপুর তথা রোদভাঙা তাদের বর্তমান জীবনকে ছাপিয়ে উঠতে পারে না বলে?  রেবেকার স্বামী জুলফিকার ভাবে তেমনটাই।  কিন্তু রেবেকা বা নোমান এর ভাবনা অন্যরকম। খনজনপুর ছিল তাদের এক স্বপ্নের জায়গা। খুব ছিমছাম, ছোটখাটো সুখ-দুঃখের সে মফস্বল তাদের মতে পৃথিবীর এক নম্বর সেরা জায়গা। নিজেদের সুপ্ত প্রেমের অসফলতার কারণেই কিনা বোঝা যায় না, তাদের যৌথ সে আড্ডায় প্রায়ই হঠাৎ চলে আসে বিজন কাকুর কথা।  বিজন কাকু যাকে ভালবেসেছিল সে মেয়েটির পরিবার হুট করেই একদিন ইন্ডিয়ায় চলে গিয়েছিল।  বিজন কাকু খনজনপুরের মায়া ছাড়তে পারেননি, আবার নিজের ভালবাসাকেও ভুলতে পারেননি। আত্মীয় স্বজনহীন অবস্থায় নিজের বিশাল পোড়োবাড়িতে একাই থাকতেন।  সেখানে প্রায় সন্ধায় নোমান, রেবেকাদের বাবারা জমাট আড্ডায় মশগুল হতেন।  এলাকার ছোটদের জন্যও ছিল বিজন কাকু’র সীমাহীন মায়া।  তিনি ছিলেন সবার আপন এবং অভিভাবকের মতো।  নোমান-রেবেকা’র গল্পেই জানা যায়- বিজন কাকুর আয়োজনে পাড়ায় রচনা প্রতিযোগিতা হতো।  নিজ নিজ শৈশবের এমন হাজারো অসাম্প্রদায়িক গল্প চকিতে চোখে ভাসে পাঠকের!  অজান্তেই পাঠক এমন বারবার ফেলতে থাকে দীর্ঘশ্বাস!  নোমান-রেবেকা’র মতো টক, ঝাল, মিষ্টি খনজনপুর যে তারও ছিল; অনুভূতির স্মৃতিগুলো হুবহু এক ।পুরনো সে রঙিন দিন খুঁজতেই, তারা দুজন হঠাৎ একদিন রাতের ট্রেনে খনজনপুরে যাত্রা করে।  গিয়ে পনেরো বছর আগের সে খনজনপুরকে আগাপাশতলায় খুঁজতে থাকে তারা।  এই এখানে এসেই পাঠক পলকহীন দেখতে থাকে খুব দ্রুত বদলে যাওয়া নতুন এক সময়কে।  হুড়মুড় করে নেমে আসা অচেনা এ সময়কে, দুর্বোধ্য এক সমাজকে পাঠকের চিনে নিতে কোন কষ্ট হয় না।  লেখক সাবের এমন নিখুঁত ছবি এঁকেছেন এক মফস্বলের ‘দুই সময়’ এর, যে নিশ্চিত হয়ে জেনে নিতে ইচ্ছে করে- লেখক কী মফস্বলের ছিলেন?  তা নাহলে, এমন মমতায় এবং ক্ষয়িষ্ণু এ সময়ের নির্মমতায় তিনি ছোট্ট সে শহরকে নিখুঁত ধারণ করলেন কী করে?

লেখক মঈনুল আহসান সাবের সফল একজন শক্তিশালী গল্পকার।  একজন ভালো গল্পলেখক যখন একটি উপন্যাস লেখেন, তখন কখনো কখনো সে উপন্যাসে গল্পের আবহ থেকে যায়।  কিন্তু ‘আমাদের খনজনপুর’ সে সংশয়ে পড়েনি এতোটুকুও।  তেমন কোনো অতি জাঁকজমক ঘটনা এখানে নেই, আবার টুকরো টুকরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আছেও।  চরিত্রগুলো এখানে ধীরে ধীরে পাঠকের চোখে স্পষ্ট হয়েছে।  পাঠক এখানে একটি মজার ব্যাপার আবিষ্কার করতে পারে।  চরিত্রগুলোর চেহারার কোনো বর্ণনাই লেখক দেননি, কিন্তু প্রত্যেকের চেহারাই এখানে স্পষ্ট।  যেমন ধরা যাক রেবেকার কথাই।  তার রূপ-সৌন্দর্যের বিবরণ এখানে দেখা যায়নি।  কিন্তু কী যে এক আলোময় অপার্থিব রূপসী হিসেবে সে পাঠকের কাছে সরব হয়ে ওঠে!  উপন্যাসে বিচরণ করতে করতেমনে হয়, রেবেকা যেন খনজনপুরের সেই আলোকবর্তিকা, যার ছোঁয়ায় আসতে চায় সবাই।  যে আলো’র পরশ কেউ পায়, কেউ বা পেয়েও পায় না। এখানে চরিত্রগুলোর অনুভূতির পুংখানুপুংখ বিশ্লেষণেই সম্ভবত লেখক চরিত্রগুলোকে এঁকেছেন।  নিঃসন্দেহে এক কঠিন কাজ।  উপন্যাসে বর্ণনা বা বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রচুর কথোপকথন আছে।  কথোপকথন আকর্ষণীয় হলে, গতিময়তাও এসে যায় অবধারিত ভাবে।  এখানেও এসেছে।  তবে লেখক মঈনুল আহসান সাবের এর যারা পাঠক, তারা তাঁর লেখায় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতার সাথে পরিচিত।  যা এখানেও আছে পাতায় পাতায় ছড়ানো।  অবশ্য ‘আমাদের খনজনপুর’ এর এ বিষণ্ণতা কোথাও যেন একটু অন্যরকম।  এ বিষণ্ণতা ঠিক বিষময় নয়।  এখানে তা সুখ-সুখ দুঃখময়।  ‘আমাদের খনজনপুর’ নামটি বইয়ের জন্য শতভাগ ঠিক মনে হলেও, প্রচ্ছদটি আরো আকর্ষণীয় হতে পারতো।  উপন্যাসটি হাতে নেওয়ার সময়ে তেমন ভাবনা না এলেও, পড়ার পর অনেক পাঠকেরই তা মনে হবে।  আসলে  উপন্যাসের চমৎকারিত্বেই, চমকিত পাঠক এসব চারপাশ ভাবতে বসে। 

‘আমাদের খনজনপুর’ শুরু হয়েছিল, একটি সহজ সুন্দর নস্টালজিক প্রেমের উপন্যাসের আদলে।  শেষও হয়েছে তেমনই, প্রেমের ব্যর্থতা আর আকুলতার কথায়।কিন্তু লেখক এসবেরমাঝেও‘দিয়ে’ গেলেন অনেক।  আর এখানেই তিনি মঈনুল আহসান সাবের, অন্য ধাঁচের এক সাহিত্যিক।  সহজ ভাষায় তিনি জানিয়ে যান জীবনের কঠিন সব বোধ।  ভাষা’র কারুকাজ নিয়ে লেখককে ভাবিত মনে হয়নি।  খুব সহজ, সাবলীল কিন্তু বড়নির্মোহ এক ভাষায় তিনি লিখে গেছেন পুরোটাই।  যেকোনো ধরণের পাঠকই আকর্ষণীয় লেখনীর এ উপন্যাসটি পড়তে পারবে, পাঠে আনন্দও শুষে নেবে। সহজ ভাষায় লেখা জীবনের সকল জটিলতাই সকলকে বুঝতে হবে এমন কোনো দিব্যি লেখক দেন না।  সুতরাং একটা উপন্যাসের সব কিছুই সবাইকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, এমন না!  পাঠক চাইলে ‘আমাদের খনজনপুর’কে নিছক প্রেমের উপন্যাস ভাবতে পারে।  আবার ভাবতে পারে, সময়কে খোদাই করে ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য তুলে রাখা, কোন জটিল সামাজিক উপন্যাস।  নিজেকে দেখার, নিজেকে চেনার এক অভূতপূর্ব মানবিক বিশ্লেষণের উপন্যাসও ভাবতেই পারে পাঠক।  সকল ভাবনার সকল স্বাধীনতাই এখানেদিয়ে রেখেছেন লেখক।  যেকোনো ভাবনাই যে কেউ ধারণ করতে পারে, আর উপন্যাসটি সার্থক মনে হয়েছে সেখানেই, কারণ পাঠশেষে সবাইকেই এটি ভাবাবে।  বহুদিন ভাবাবে।  বিবর্ণ কোন একাকী দুপুরে খনজনপুরকে মনে পড়বে।  কেনো নয়?  শুরুর সে ফেলে আসা বিন্দুতে ফিরতে কার না ইচ্ছা করে!  কিন্তু ফেরা হয় না।  ফেরার সেই চেষ্টা কেউ করতে পারি, কেউ বা তাও পারি না। তখন বিকল্প আরেকটি জীবনের কথা ব্যাকুল হয়ে ভাবতে থাকি।  এটাকে ‘খসড়া জীবন’ ভেবে নিয়ে আর একটি সফল জীবন চাই।  যদিও সে জীবনেও থাকতে পারে বহু আক্ষেপ, তবু, তবুও ভাবি; নিদেনপক্ষে কল্পনাতেও যদি পাই! …  হ্যাঁ, আর এ কারণেই নোমান-রেবেকা’র খনজনপুর শেষপর্যন্ত শুধু তাদের থাকেনি।  আমাদের সবার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘ভিন্ন ভিন্ন খনজনপুর’কে লেখক সাবের দক্ষ শিল্পীর হাতে টেনে বাইরে এনেছেন।  পাঠক একাকার হয়েছে খনজনপুরে।  আবার বাস্তবতায় ফিরে আলাদা হয়েছে, উপন্যাসের শেষ প্রান্তে।  …  বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক মঈনুল আহসান সাবের এর যাদুকরী লেখাকে জানতে, ঘুরে আসতেই হবে একবার ‘আমাদের খনজনপুর’ –এ।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত