আমার কনে বিদায় (পর্ব-১)

আমার বিয়ে হয়েছিল ফাল্গুন এ।যাকে বলে কি না বসন্ত।সেই কোন এক বসন্তসন্ধ্যায় আমি পতিগৃহে যাত্রা করলাম।তা যেই লোকটির ঘাড়ে লটকে পরলাম,সে কি না পুরোটাই অপরিচিত।বিয়ের আগে মাত্র দু বার দেখেছি ভদ্রলোককে।দুরভাষে কথা হয়েছে বেশ কবার।তার মাঝে আবার অনেক নাটক।সেই গল্প অন্য কোনদিন বলব। আজ বরং আমার শ্বশুরবাড়ি যাবার গল্প বলা যাক।

তা আমাদের উত্তরবঙ্গে বিয়ের পরদিন বাসি বিয়ে হয়।তারপর সন্ধ্যেবেলায় কনে বিদায়।সমস্যাটা হল সেই আঠেরো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছি।হস্টেল মেসে কাটানো হয়ে গেছে বিয়ের আগে আট আটটি বছর।তাই ঠিক বাপের বাড়ি ছেড়ে যাবার ফিলটা আসছে না।কী জ্বালাতন।আসবেটা কি করে?জানি তো আমার শ্বশুরবাড়ি বাসের সময়কাল মাত্র দিন দশেক।তারপর মধুচন্দ্রিমা সেরে চল পানশী বেলঘড়িয়া।মানে তিনি যাবেন কর্মস্থলে, সুদূর নেদারল্যান্ডসে। আর আমি পুনর্মূষিক, সেই কলকাতার মেসবাড়ি।

তা সে যেটা বলছিলাম।ব্যাপারটা হল সেই ফীলটা আসছে না।সব বন্ধু বান্ধব,বোনেরা,হইচই মজা,বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ব্যাপার।তখন সেই এগার বছর আগে কুচবিহারের মত আধা মফস্বল জায়গা প্রফেশনাল মেকাপ আরটিস্টের কথা কেউ ভাবতেও পারত না।বিয়ের দিন পার্লার থেকে এসে সাজিয়ে যেত।আর অন্য সময় পাড়ার দিদি বউদিরাই ভরসা।তো পাড়ারই এক দিদি সাজাচ্ছে আমায়।এই নড়বি না, এদিকে তাকা,এই চোখ বন্ধ,ওই চোখ খোলা এসব চলছে।সাথে হাসি আড্ডা,এমন সময় দেখি আমার মা ঠাকরুন দেখি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে নাক টানছেন।ছলছল চোখ।যাত্তারা।এদিকে ছোটকাকু আমায় পাশের ঘরে ডেকে বললেন একদম কাঁদবিনা কিন্তু।বউদির শরীর ভাল না।উত্তেজনা ঠিক না।কান্না পেলে চেপে রাখবি।কি মুশকিল।কাকে বোঝাই যে আমার কান্নাটান্না মোটেই পাচ্ছে না।কিন্তু না,ওটি হচ্ছে না।হতে দাওয়া যায়?কি অনাচার?বাঙালি মেয়ে তুমি শ্বশুরঘরে যাওয়ার আগে কাঁদবে না কো মোটে?ছ্যাঁ ছ্যাঁ।বলি লজ্জার মাথাটি খেয়ে বসে আছ নাকি হে?বুড়ো বয়সে বিয়ে হলে অমনিই হয়।

তা এত কথা যাতে না ওঠে,তারও ব্যবস্থা আছে।দারুন ব্যবস্থা। গালভরা নাম কনকাঞ্জলি।মা এর হাতে মুঠি করে চাল দিয়ে বলতে হবে মা তোমার ঋণ শোধ করে গেলাম।এবার না কেঁদে থাক দেখি মুরোদ কত।হুম বাবা।কাঁদবে না?ওটি হচ্ছে না।আরে বাবা,সারা জীবন বাবা মার ঘাড়ে বসে খেয়ে এত বড়টি হলাম।কে হিসেব রাখতে গেছে কত খেয়েছি।আমি তো রাখিই নি।আর ঋণ শোধ করে গেলাম মানে?কোথায় গেলাম?আগে আমি ছুটিছাটাতে একা এসে গিলতাম।এবার থেকে দুজনে আসব।দ্বিগুন খরচ।তিন চারগুন হলেই বা আটকাচ্ছে কে?জামাইকে পেলে আবার আমার বাবার মন আর হাত দুটোই একটু বেশিই দরাজ হয়ে পড়বে সেটা আমার চেয়ে বেশি কে জানে।গত এগারো বছর ধরে বাড়ি গেলেই ফাঁসির আসামির মত খাওয়ায় বাবা মা,যাতে সন্দেহ জাগে এ খাওয়াই শেষ খাওয়া নয় তো?

যাক গে যা বলছিলাম।কনকাঞ্জলি।এবার একটু কান্না কান্না পাচ্ছে যেন।এই রে?কেঁদেই ফেলব না কি? হুম।ঠিক ধরেছি।চোখটা যেন ভেজা ভেজা লাগছে।একঝাঁক কাকিমা জ্যেঠিমা মাসিমারা ঘিরে দাঁড়িয়ে চোখ মুচ্ছেন আর তাদের দেখে আমার মাতৃদেবীর কান্নার বেগ আরো বেড়ে যাচ্ছে।আমার ছোটকাকিমনি(যিনি কিছুদিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন)আমায় জড়িয়ে ধরে বললেন, একদম চিন্তা করবি না মা বাবার জন্য।আমরা সবাই আছি।আরে আমি তো জানি তোমরা আছ।আমি তো সেই কবে থেকেই বাড়িছাড়া।তোমরা আছ বলেই তো আমি নিশ্চিন্ত।আজ যখন লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে কথাটা,মনে হচ্ছে জিজ্ঞাসা করি,কই কাকিমনি?তুমি যে বলেছিলে,তুমি আছ?তাহলে কেন থাকলে না?কেন চলে গেলে এমনি ভাবে?এত তাড়াতাড়ি?

গাড়িতে উঠলাম।সঙ্গের ওই গাঁটছড়া বাঁধা ভদ্রলোক মা বাবার হাতে ধরে কি সব বলল কে জানে,আমার সুপারম্যান বাবাটিও এবারে কাঁদতে শুরু করলেন।বোঝো।এবার আমিই বা নিজেকে আঁটকাই কি করে?গাড়ি চলতে শুরু করল।আমি ফ্যাঁচফ্যাঁচ করেই চলেছি।এই আমার এক সমস্যা।একবার শুরু হলে থামতে পারিনা।গাড়ির ড্রাইভার দাদা আবার একটু বেশি আবেগতাড়িত হয়ে “মেরা কুছ সামান” গান চালিয়েছেন।আমারও কান্নার বেগ উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে।আমার নতুন বরটা বেশ ধমকের সুরে বলল,গানতা চেঞ্জ করুন তো।আটাশ বছরের জীবনে সেও প্রথম একটি আস্ত বউ পেয়েছে।তার সামনে একটু অভিভাবকত্ব না দেখালে চলবে কেন?আমিও ফ্যাঁচফ্যাঁচ করতে করতেই বললাম,আমি এই গানটাই শুনব।হু হু বাবা।আমায় চেন নি এখনও।

পথে মদন মোহন মন্দিরে গাড়ি থামিয়ে প্রণাম করা হল।গাড়ি আবার এগিয়ে চলল।ও হো,বলা হয় নি।আমার শ্বশুরবাড়ি সিতাই, কুচবিহার জেলার একটি ছোট গ্রাম।গ্রামের ঢুকতে হলে পেরোতে হয় মানসাই নদী।অন্ধকার ঘুটঘুটে চারিদিকে।গাড়িশুদ্দু উঠিয়ে দিল বাঁশের সাঁকোর উপর।সে কি শব্দ,আর ঝাঁকুনি।মনে হচ্ছিল এখুনি সাঁকোশুদ্ধ ভেঙে পড়ে সলিল সমাধি হল বলে।আর দেরি নেই।মা গো।নবপরিণীত বরের হাতটা প্রাণপণ শক্তিতে খামচে ধরে আছি।চলো বস।ডুবতে হলে একসাথেই ডুববো।গাড়িতে আমরা ছাড়াও ছিল আমার দুই মামাতো আর মাস্তুতো বোন,মিতুন আর পিউ।ওদের দশাও তথৈবচ।

যা হোক,সাঁকো পেরোলাম এক সময়।পরবর্তীতে গাড়িশুদ্ধ নৌকায় করেও নদী পেরিয়েছি।গ্রামে ঢোকার মুখে ব্যান্ডপার্টি নিয়ে হাজির শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে অনেক লোকজন।সারা গ্রাম নাকি ঘোরানো হবে।আমার তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি দশা।গাড়ি এগোচ্ছে কি এগোচ্ছেনা বোঝা মুশকিল।হঠাৎ করে দেখি গাড়ির জানলা দিয়ে অনেক আলো এসে পড়ছে গাড়ির ভেতর।ব্যাপারটা কি আমার বর বোঝালো।গ্রামের লোকজন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গাড়ির ভেতর টর্চ মেরে নতুন বউ দেখছে।

এরপর কত পথ ঘুরে কতক্ষনে শ্বশুরবাড়ি পৌছেছিলাম সে যাত্রায়, সে আর এতদিন পর মনে নেই।শুধু এটুকু মনে আছে আর পাঁচ মিনিট বেশি দেরি হলে আমি গাড়ি ঘোরাতে বলতাম।বিয়ে ক্যান্সেল।তারপর থেকে এগারো বছর ধরে ঐ ভদ্রলোকের সাথে সংসার করছি।অনেকবার বিয়ে ক্যান্সেল করার ধমকি দিয়েছি।কিন্তু ওই পর্যন্তই।সেও বুঝে গেছে এতদিনে,মোল্লার দৌড় ঐ মসজিদ অব্দি।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত