| 19 মে 2024
Categories
চলচ্চিত্র বিনোদন সাক্ষাৎকার

আমার সময়: মৃণাল সেন

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ভাষান্তরঃ

[ বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার মৃণাল সেন বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরের একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পড়াশোনার জন্য কলকাতায় আসেন এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও তিনি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চল্লিশের দশকে তিনি আইপিটিএর (ইন্ডিয়ান পিপ্‌লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হন এবং এর মাধ্যমে তিনি সমমনোভাবাপন্ন মানুষদের কাছাকাছি আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি সাংবাদিক, ওষুধ বিপণনকারী এবং চলচ্চিত্রে শব্দ কলাকুশলী হিসাবে কাজ করেন।

১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘রাতভোর’ মুক্তি পায়। এই ছবিটি বেশি সাফল্য পায়নি। তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’ তাঁকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকে তিনি আর্ন্তজাতিক পরিচিতি পান। ১৯৬৯ সালে তাঁর পরিচালিত ছবি ‘ভুবন সোম’ মুক্তি পায়। এই ছবিতে বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিটি অনেকের মতে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তাঁর কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ইন্টারভিউ (১৯৭১), ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭২) এবং পদাতিক (১৯৭৩) ছবি তিনটির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন তাঁর খুবই প্রশংসিত দু’টি ছবি এক দিন প্রতিদিন (১৯৭৯) এবং খারিজ (১৯৮২)-এর মাধ্যমে। খারিজ ১৯৮৩ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালের চলচ্চিত্র ‘আকালের সন্ধানে’। এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল একটি চলচ্চিত্র কলাকুশলীদলের একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষের উপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির কাহিনি। কী ভাবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সেটাই ছিল এই চলচ্চিত্রের সারমর্ম। আকালের সন্ধানে ১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার হিসাবে রুপোর ভালুক জয় করে। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাপৃথিবী (১৯৯২) এবং অন্তরীন (১৯৯৪)। এখনও অবধি তাঁর শেষ ছবি আমার ভুবন মুক্তি পায় ২০০২ সালে।

মৃণাল সেন বাংলা ভাষা ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলুগু ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৬৬ সালে ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন মাটির মনীষ, যা কালীন্দিচরণ পাণিগ্রাহীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়। ১৯৬৯-এ বনফুলের কাহিনী অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় নির্মাণ করেন ভুবন সোম এবং ১৯৭৬-এ তৈরি করেন মৃগয়া। ১৯৭৭ সালে প্রেম চন্দের গল্প অবলম্বনে তেলুগু ভাষায় নির্মাণ করেন ওকা উরি কথা। ১৯৮৩ সালে ফের তৈরি করেন হিন্দি চলচ্চিত্র, খণ্ডহর। ১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন জেনেসিস, যা হিন্দি, ফরাসি ও ইংরেজি তিনটি ভাষায় তৈরি হয়।

এই সাক্ষাৎকারটি মার্কিন চলচ্চিত্র ও রাজনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন Cineaste এর পক্ষ থেকে নিয়েছেন গ্যারি ক্রাউডাস। গ্যারি ক্রাউডাস cineaste ওয়েবম্যাগের একজন প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি চল্লিশ বছর যাবত চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ চলচ্চিত্র গ্রুপ ট্রাইকন্টিনেন্টাল ফিল্ম সেন্টার, দ্যা সিনেমা গিল্ড (১৯৮০-২০০৪) এবং ইকারাস ফিল্মস (২০০৪-০৮) এর সঙ্গে কাজ করেছেন। ]

গ্যারিঃ চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখিও করেছেন?

মৃণাল সেনঃ আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র আন্দোলনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সেই সময়ে চলমান ছাত্র আন্দোলনগুলোর মধ্য দিয়েই আমার নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। ১৯৩০-এর দিকে বৃটিশ সরকার শাসিত একটি রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়েই বড় হয়েছি। তবে আমার নিয়মমাফিক চলচ্চিত্র দেখা হতো না।  তখনো চলচ্চিত্রে আমার তেমন কোনো আগ্রহ তৈরি হয়নি।

১৯৪২-এর দিকে যখন কলেজের পড়াশোনা শেষ হয় তখন সাউন্ড রেকর্ডিং-এ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। একবার এক স্টুডিওতে যারা রেকর্ডিং এর কাজ করে তাদের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছি। কিন্তু আমি শুধুমাত্র ক্যাপাসিটর এবং কন্ডেন্সর ঝালাই এর কাজ করেছি। সেই কাজটিও তেমন পছন্দ ছিলো না ফলে ছেড়ে দিয়েছি। আমার মনে হয়েছিলো এই কাজটি আমাকে সাউন্ড রেকর্ডিং এর টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বুঝতে সহযোগীতা করবে তাই এ সম্পর্কে পড়াশোনাও শুরু করে দিয়েছিলাম।

১৯৪৩-এর দিকে কলকাতা ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে (বর্তমানে কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগার) সাউন্ড রেকর্ডিং নিয়ে বিভিন্ন বই পড়া শুরু করি। একদিন ভুলবশত একটি বই আমার হাতে এসে পড়ে Film as Art by Rudolf Arnheim। এই বইটি পড়ে আমি প্রথম চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে জানতে পারি। বইটি আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। আমি কখনো উপলব্ধিই করিনি একটি ছবির নিজস্ব দর্শন থাকতে পারে। দ্বিতীয় বইটি আমি পড়ি Graphic Art by Vladimir Nilsen। যদিও বইটি পড়ে আমি পুরো বুঝতে পারিনি তবে বইটি খুব চিত্তাকর্ষক ছিল। এভাবেই চলচ্চিত্রের নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে আমার বোঝাপড়া তৈরি হয়।

আমি শীঘ্রই আমার সোভিয়েত বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। প্রথমবিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যারা ম্যাক্সিম গোর্কির টিলজি The childhood of Maxim Gorky (1938), My Apprenticeship (1939), and My Universities (1940) চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করছিলো। সোভিয়েত বন্ধুদের সংগঠনের জার্নালেই চলচ্চিত্র নিয়ে আমার প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘ফিল্ম অ্যান্ড পিপল’ শিরোনামে। যদিও এই শিরোনামটি আমি ধার করেছিলাম রলফ ফক্স এর বই ‘দ্যা নোভেল অ্যান্ড পিপল’-অ্যা মার্ক্সিস্ট অ্যানালাইসিস অব লিটেরেচার থেকে।

সেই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই চলচ্চিত্র বিষয়ক একজন ভাল লেখক হিসেবে আমার নাম-ডাক শুরু হয়।  বলা চলে এরপর থেকে আমি চলচ্চিত্র বিষয়ক বইয়ের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হয়ে গেলাম বিশেষ করে আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্রের গঠন এবং মনস্তত্ত্ব আমাকে পেয়ে বসেছিলো। পাশাপাশি আমি ভারতীয় সাহিত্য এবং জীবনধারাকে আইজেনস্টাইনের দৃষ্টিকোন থেকে দেখার চেষ্টা শুরু করলাম। চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখিতে বামধারার বুদ্ধিজীবীরা বেশ কৌতহূলী ছিলো কেননা তারা তখনও এটা বুঝে উঠতে পারেনি চলচ্চিত্রেও সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার অনেক কিছুই তুলে ধরা যায়। আমি তখন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির জার্নালে নিয়মিত লেখালেখি করছি। বিশেষ করে ‘দ্যা ডায়লেটিকস অব সিনেমা’ নিয়ে টানা দু-তিন বছর আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু ভারতীয় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে টিকে থাকা খুবই কষ্টকর। সেই সময়ে প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকাগুলো লেখকদের কোনো পারিশ্রমিক দিত না। ফলে লেখালেখির পাশাপাশি অর্থ উপার্জনে আমাকে নানা কিছু করতে হয়েছে।

তখন বেশিরভাগ সময়ে আমার অলস দিন কাটতো। আমি একটি ছাপাখানায় কাজ করেছি, মেডিসিন রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে কাজ করেছি, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও কাজ করেছি। এই সময়ে আমি ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতি একধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম কেননা আমার চলচ্চিত্র আগ্রহ ছিলো একাডেমিক। ১৯৪৭-৪৮ এর দিকে কলকাতা চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয়। চলচ্চিত্র সমিতির সদস্য হওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থও আমার ছিল না। কিন্তু আমার বন্ধুরা আমাকে প্রায় সেখানে নিয়ে যেত। ঘটনাচক্রে তখন কলকাতা চলচ্চিত্র সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সচিব ছিলেন সত্যজিৎ রায়।

আমার মতো রায়েরও শুরু থেকে চলচ্চিত্রে ভীষণ আগ্রহ ছিলো। তিনি প্রতিদিন একটি করে স্ক্রিপ্ট লিখে অনুশীলন করতেন। যেমন একটি ছবি দেখলেন এবং বাড়ি গিয়ে সেই ছবিটির একটি স্ক্রিপ্ট পুনরায় লিখতেন। সেই সময়ে (১৯৪৮-৪৯) কলকাতার রাজনৈতিক অবস্থাও উত্তপ্ত ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সামরিক আন্দোলন চলছিলো। আমরা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম গোপনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো। আমাদের হাতে বেশ কিছু বিদেশি চলচ্চিত্র বিষয়ক জার্নালও এসে পড়লো। ইতালির নিওরিয়েলিস্ট আন্দোলন সম্পর্কেও আমাদের ধারণা তৈরি হলো।

আমার প্রথম স্ক্রিপটি ছিলো ২০-২৫ মিনিটের একটি ফিল্ম নাম দিয়েছিলাম ‘স্বদেশের সংগ্রাম’। আমি ভেবেছিলাম গ্রামে শুটিং করবো কিন্তু তখন আবার কৃষক আন্দোলন চলছে। আমাদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা ছাড়াই চেষ্টা শুরু করেছি তাই সে প্রচেষ্টাও বিফল হলো। আমাকে স্ক্রিপ্ট ছিড়ে ফেলতে হয়েছে কেননা সেই সময়ে আমাদের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়েছিলো।

এই সব প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে আমি পুনরায় লেখায় মনযোগ দেই। ১৯৫৩-এর দিকে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় চার্লি চ্যাপলিন। আমার অনুবাদেও আগ্রহ ছিলো। ক্যারেল কেপেক এর মরনোত্তর একটি উপন্যাসও অনুবাদ করেছি। শেষমেষ ১৯৫৬-এর দিকে আমি একজন প্রযোজক পাই যিনি নিজেই বলেছেন-এই লোকটি কিছু একটা করতে পারবে যেমনটি আমাদের সত্যজিত রায় করে দেখিয়েছেন। ফলে সে বছর আমার প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ‘রাতভোরে’। কিন্তু এটা একদম সফল হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি- আমার দ্বারা চলচ্চিত্র সম্ভব নয়। আবারো অর্থের প্রয়োজনে নানাবিধ কাজ করতে শুরু করলাম। এরপর আবারো আরেকটি চলচ্চিত্র করার সুযোগ হয় নীল আকাশের নীচে (১৯৫৯)। এটিই হলো সেই চলচ্চিত্র যা আমাকে একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আমার তৃতীয় চলচ্চিত্র বাইশে শ্রাবণ (১৯৬০) যেটির প্রতি এখনো আমার ভালবাসা রয়েছে। এই চলচ্চিত্র বিদেশেও প্রদর্শিত হয়েছে। সেই থেকে আমি চলচ্চিত্র তৈরি করছি বিশেষ করে নেরেটিভ ফিল্মস কিন্তু আমি সবসময় আমার বর্তমান সমাজচিত্রকে আমার ফিল্মে ধরতে চেয়েছি।

কিন্তু শীঘ্রই দেখতে পেলাম আমার চলচ্চিত্র একটি নির্দিষ্ট দর্শকের গন্ডিতেই আটকে আছে। ফলে আমার পক্ষে নতুন প্রযোজক পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়লো। সেই সময়ের সমাজ বাস্তবতা নিয়ে একটু ভিন্নরকম  চলচ্চিত্র তৈরি  করার ফলে বাজারি চলচ্চিত্রের চেয়ে আমার দর্শক সীমিতি হয়ে পড়ায় আমাকে একটা সময় খারাপ একটি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৬৮ এর দিকে আমি সরকারি অর্থে (গভার্নমেন্ট ফিলম ফিন্যান্স কর্পোরেশন) ‘ভুবন সোম’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করি। সেই সময়ে (FFC) এর অর্থ পাওয়া এতটা সহজ কাজ ছিল না। তারা কেবল প্রচুর বিত্তবানদেরকেই অর্থ দিতেন যারা অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে পারতো। সত্যজিত রায় FFC র অর্থায়নে কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেবলমাত্র সেই চলচ্চিত্রগুলোর পরিচালনা করেছেন।

‘ভুবন সোম’ মূলত নির্মাণ করেছি হিন্দি ভাষায় যেনো সমগ্র ভারবর্ষে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপরই FFC র নীতিতে বেশ পরিবর্তন আসে। তারা এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অর্থ প্রদান করতেন যাদের পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সহযোগীতা নেই অথচ যারা মূলত অফ-বিট ছবি নির্মাণেই বেশ আগ্রহী। ভুবন সোমের পর থেকেই FFC ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

গ্যারিঃ আপনার চলচ্চিত্র কি অন্যান্য পরিচালকদের রাজনৈতিক ছবি তৈরিতে সহযোগীতা করেছে?

সেনঃ যদি সত্যি কথা বলি তাহলে বলব না। আমি ১৯৭১-সাল থেকেই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করি। ভুবন সোম তির্যকভাবে একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিলো। কিন্তু আমার দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে এবং যা আমি আমার পূর্বের চলচ্চিত্রগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে। তারপর ১৯৬৫-তে মুক্তি পায় আকাশকুসুম। এই ছবিটি একজন তরুন যুবককে নিয়ে-যে কিনা সমাজের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় কিন্তু একচেটিয়া পুজির বাজারে লড়তে গিয়ে এটা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনা। ছবির শেষের দিকে তাকে অনেক বুদ্ধিমান দেখায়। এই ছবির আগাগোড়াই ছিলো একজন মধ্যবিত্তের সামাজিক পরিবেশ নিয়ে কিন্তু টেকনিক্যালি এবং স্ট্যাটিস্টিকেলি সেটির পরিসমাপ্তি ঘটেছে ‘ইন্টারভিউ’ তে গিয়ে।

ভুবন সোমের চলচ্চিত্র নির্মাণের পর ভারতবর্ষজুড়ে আমার নিজস্ব একটি দর্শক-শ্রোতাশ্রেনী তৈর হয়েছে। আমি যে ভাষায় যাই নির্মাণ করিনা কেন তারা আগ্রহ নিয়ে সেটি দেখে। ফলে আমার শত্রুর সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়তে শুরু করলো।

বেশিরভাগ ভারতীয় চলচ্চিত্রই মানসম্পন্ন না। তারা দর্শকদের বিভাজন করে ফেলে। কিন্তু ‘ইন্টারভিউ’ এবং এর পর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো অনেক দর্শকই মন্তব্য করেছে- আমি সমাজ বিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। আমি দর্শকদের এমন মন্তব্যগুলো ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। কেননা আমার মনে হয়েছে যাক শেষমেষ আমার নিজের দৃষ্টিকোন তো প্রকাশ পেয়েছে। এরপর আমি তরুনদের দেখেছি এ বিষয়গুলো নিয়ে তারা আরো সোচ্চার হয়েছে। কলকাতার রাজনৈতিক পরিবেশ এখন পর্যন্ত উত্তপ্ত হলেও এমন একজন তরুন চলচ্চিত্র নির্মাতা দেখিনি যে কিনা একটি সফল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছে।

গ্যারিঃ ভারতীয় রাজৈনিতক দলগুলোর মধ্যে বিশেষ করে যারা মার্ক্সীয় দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে একনিষ্ঠ কর্মী হয়েছে তারা কি সেইসময়ে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলো?

সেনঃ সেটা আংশিক। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলো খুব শক্তিশালী ছিলো। আমাদেরও একটি বড় সংগঠন ছিলো ‘দ্য ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন’ পুরো ভারতবর্ষজুড়ে এমন একটি সংগঠন যেখানে চমৎকার মঞ্চনাটকগুলো হয়েছে। সমগ্র ভারতবর্ষে মঞ্চ নাটকের এক অভাবনীয় পরিবর্তন হয়েছিলো সেই সময়ে। ১৯৪৭ আগে আমরা সবাই সেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ৪৭ পরবর্তী সংগঠনটিকে চালানো অনেক জটিল হয়ে পড়ে। IPTA’র বেশিরভাগ সভ্যরাই ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেনীর। ফলে চিন্তা-চেতনা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আমরা চেয়েছিলাম IPTA’এর এই পরিবেশটাকেই চলচ্চিত্র শিল্পে কাজে লাগাতে কিন্তু তা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

তবে বর্তমানে চমৎকার সব চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে মোম্বাই এবং দক্ষিণ ভারতে। দুজন পরিচালক যারা ডকুমেন্ট্রি নির্মাণ করতেন তারা চমৎকার দুটো ফিচার ফিল্ম তৈরি করেছেন। ফিল্ম দুটির একটি ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্মিত ইংরেজী চলচ্চিত্র Hot Air। ভারতীয় চলচ্চিত্রে ১৯৪৭ এর ঘটনা চমৎকার ভাবে দেখানো হয়েছে। আরেকটি হলো শ্যাম বেনেগালের অংকুর। যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সবকিছুর উন্নতি হচ্ছে। এটা একটা ভাল লক্ষণ। ভবিষ্যতে কী হবে তা বলতে পারছি না। তবে এটা বলা যায় ভারতীয় চলচ্চিত্র আর আগের জায়গায় থেমে নেই।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত