অমিতাভ দাসের গল্প

আজ ১০ ডিসেম্বর কবি, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক অমিতাভ দাসের শুভ জন্মতিথি।ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

বিশ্বাস

বেলা করেই ঘুম ভাঙে । তারপর কাকার দোকানে গিয়ে বসি । পরোটা-ঘুগনি-চা । সিগারেট জুটছে না, ফলত বিড়িতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ।

বাণীপুর । জলরঙে আঁকা । এই যে আমি সেই পথে আসি, যাই । গাছের নিবিড়ে গিয়ে বসি । এত চুপচাপ, এত শান্ত সমাহিত যে, আমিও চুপ হয়ে যাই । চুপ হয়ে থাকতে ভালো লাগে । খুব নিবিড়ভাবে চুপ করে থাকলে গাছের কথা শোনা যায় । তার ভাষা বোঝার চেষ্ট করি রোজ । অথচ যে ধ্যান দরকার, তা নেই আমার ।

আজ সকালটা অন্যরকম ছিল । শূন্যতার উপলব্ধিগুলি যখন আচ্ছন্ন করেছিল আমায় । সব মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম । জানতাম সেই প্রিয় মানুষীর সাথে কথা হবে না আর এ জীবনে । অথচ কেন এমন হয় বলো ! কেন এমন হবে ! হঠাত্ ফোন বেজে উঠলো । দীর্ঘ একমাস পর । পরিচিত সেই ছবি, যা আমার খুব প্রিয় । হাত কাঁপতে থাকে বিস্ময়ে । ভাবতে পারছি না সন্দেশ ফোন করেছিল । বুঝতে পারছিলাম না, কী করবো ! কী করা উচিত । আহা, যার সঙ্গে আমার প্রাণের খেলা । যে আমার পরম প্রিয় । সেই মনের মানুষ । যাকে পেয়েছিলাম শহরের শীতের ধুলোয় । সন্ধ্যার নির্জনে । বইমেলার দুপুর রোদে । যার ঘামে ভেজা আঙুল, আদুরে আবদার । সব মনে পড়ে যাচ্ছে আমার ।

দেরী হয়ে গেল । যেই ফোনটা ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, হ্যালো… কেটে গেল । জানি ও আর ফোন রিসিভ করবে না আজ । খুব জেদ তার । খুব রাগ ।

পাশে বসা বন্ধুকে বললাম, আমি জিতে গেছি । সন্দেশ কথা দিয়েছিল যে, ও আর কখনও ফোন করবে না আমায় । কিন্তু জানতাম, করবে । করেছে সে ফোন । এই যে পাওয়া, তা অনেক, আমার বিশ্বাসটাকেই খুঁজে পাওয়া । আমি না, জিতে গ্যাছে আমার বিশ্বাস ।

 

একটা রথের গল্প

এক
সুদেব, বাপিন, রাজা, বিজয়া তখন ক্লাস ফাইভ-সিক্স । ছোট্ট রথ সাজাতো । পুজো করতো । টুনির আলোয় আর ফুলের মালায় জগন্নাথ দেবকে সাজাতো । পাড়াময় রথ নিয়ে বেড়াতে যেত– রথের দড়ি টানতো সবাই । তারপর সন্ধ্যা হলে মেলায় যেত — পাঁপড় ভাজা…

দুই
কলেজ জীবন । ডাক্তার বান্ধবী সুমনা এসেছিল শেষবার । বাপিনকে দেখতে । জ্বর হয়েছিল বাপিনের । জিলিপি আর পেয়ারা এনেছিল সাথে । বলেছিল, আমি তোকে জাস্ট সহ্য করতে পারি না । তোকে বিয়ে করবো না । আমাকে ছাড় ।

তিন
বাপিনের তখন ত্রিশ । ডিগ্রি কোর্সের এক ছাত্রীর সাথে প্রেম করতো । রথের বিকেলে প্রেমিকা শ্বেতা এসেছিল । দরজা বন্ধ ছিল । ডেকেছিল পাড়ার বাচ্চাগুলো । বাপিন ওদের অনেক পয়সা দিয়েছিল । রথের দড়ি টানেনি । ইচ্ছে করেনি । তবে প্রেমিকার ব্রা-এর হুক খুলেছিল ।

চার
চল্লিশে এসে বাপিন রথের বিকেলে কেবল মদ খেয়েছিল । একা–বেশ বড়ো বড়ো পেগ । নেশা হয়নি ।
বাড়ি ফেরার পথে সে রথের শোভাযাত্রা দেখলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে । কী ভীড়– কী ভীড়–বাতাসা কুড়োচ্ছে কেউ কেউ–সাদা বাতাসা বাপিনের খুব প্রিয়…
সাদা বাতাসা ছোটবেলায় রথের মেলায় গেলেই সে পেত । ঠাকুরমার সাথে সে মেলায় যেত–কত কাদা, কত বৃষ্টি–কত ঝড় –জল …
এখন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে বাড়ি ফিরছে । গত চল্লিশ বছরের জমানো দুঃখগুলো চোখ দিয়ে টপ টপ করে ঝরে যাচ্ছে… বৃষ্টির জল আর চোখের জল মিশে যাচ্ছে, চিনতে পারছেনা সে, কোনটা চোখের জল আর কোনটা বৃষ্টির…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত