Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতাগুচ্ছ

Reading Time: 5 minutes

আজ ২৫ নভেম্বর কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


শেষ ঘোড়া তুই সেই শেষ ঘোড়া যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি। একত্রিশ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এ আমার স্পেকুলেশন। তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার, বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট, এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু, নেক-টু-নেক ফুলমালা— আমার একত্রিশ বছরের সুখদুঃখ একত্রিশ বছরের চাপা ব্যর্থতাকে অধীর ক’রে তুমি ছুটছো। হোয়াইট স্ট্যাণ্ডে বায়নাকুলার ভেঙে লাফিয়ে উঠি। কনুয়ের ধাক্কায় উল্টে যায় জগত্সংসার। তোমার পাঁজরের পিসটনে আমার হাঁফ্ সে ওঠা বুক তোমার ছুটন্ত ধমনীতে আমার টালমাটাল রক্ত, তোমার প্রতিটি গ্যালপে আমার বাদামি উরুর জলোচ্ছাস— তোমার অসহ তারুণ্য খানিকটা খিমচে নিয়েছে আমার বয়স। ভরাডুবির সময় তুমি লাল বয়া, থৈ থৈ জলের ওপর পেট্রলের আগুন-জ্বালা হারেম-সুন্দরী, মরিয়াপানার ল্যাসো দিয়ে .            চম্বলের জঙ্গল থেকে বেঁধে আনা বেওকুফ, বাত্তামিজ ঘোড়া, কদমের চকমকিতে ফুটেছে লাল নীল ফুল, ডাইনে হেলো না বাঁয়ে ঝুঁকো না— ট্রাক সামাল রাখ। পথ ভুল হলেই, ফেন্সের ওপর রাফেল উঁচিয়ে আছে তোমার মরণ, পথ ভুল হলেই আস্তিনে লুকানো বক্র ছুরিতে ওঁৎ পেতে আছে তোমার মরণ, কাঙাল হয়ে দাবি জানাই, সম্রাট হয়ে পদাঘাত করি— উইন চাই, উইন।
তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট, এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু নেক-টু-নেক ফুলমালা, মনে রেখো, তুমি সেই শেষ ঘোড়া যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি।     আমার নাম ভারতবর্ষ  স্টেন গানের বুলেটে বুলেটে আমার ঝাঁঝরা বুকের উপরে ফুটে উঠেছে যে মানচিত্র— তার নাম ভারতবর্ষ। আমার প্রতিটি রক্তের ফোঁটা দিয়ে চা-বাগিচায় কফি খেতে, কয়লা-খাদানে, পাহাড়ে-অরণ্যে লেখা হয়েছে যে ভালোবাসা— তার নাম ভারতবর্ষ। আমার অশ্রুর জলসেচে আর হাড়ের ফসফেট-এ খুনীর চেয়েও রুক্ষ কঠোর মাটিতে বোনা হয়েছে যে-অন্তহীন ধান ও গানের স্বপ্ন— তার নাম ভারতবর্ষ। আমার ঠাণ্ডা মুখের ওপর এখন গাঢ় হয়ে জমে আছে ভাক্ রা নাঙ্গালের পাথুরে বাঁধের গম্ভীর ছায়া। ডিগবয়ের বুক থেকে মায়ের দুধের মত উঠে আসা তোলো ভেসে যাচ্ছে আমার সারা শরীর। কপাল থেকে দাঙ্গার রক্ত মুছে ফেলে আমাকে বুকে ক’রে তুলে নিতে এসেছে আমেদাবাদের সুতোকলের জঙ্গী মজুর। আমার মৃতদেহের পাহারাদার আজ প্রতিটি হাল বহনকারী বলরাম। প্রতিটি ধর্ষিতা আদিবাসী যুবতীর শোক নয় ক্রোধের আগুনে দাউ দাউ জ্বলে যাচ্ছে আমার শেষ শয্যা। ভরাট গর্ভের মত আকাশে আকাশে কেঁপে উঠছে মেঘ। বৃষ্টি আসবে। ঘাতকের স্টেনগান আর আমার মাঝবরাবর ঝরে যাবে বরফ-গলা গঙ্গোত্রী। আর একটু পরেই প্রতিটি মরা খাল-বিল-পুকুর কানায় কানায় ভরে উঠবে আমার মায়ের চোখের মত। প্রতিটি পাথর ঢেকে যাবে উদ্ভিদের সবুদ চুম্বনে। ওড়িশির ছন্দে ভারতনাট্যমের মুদ্রায় সাঁওতালী মাদলে আর ভাঙরার আলোড়নে জেগে উঠবে তুমুল উৎসবের রাত। সেই রাতে সেই তারায় ফেটে পরা মেহফিলের রাতে তোমরা ভুলে যেও না আমাকে যার ছেঁড়া হাত, ফাঁসা জঠর, উপড়ে আনা কল্ জে, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু, রক্ত, ঘাম মাইল-মাইল অভিমান আর ভালোবাসার নাম . স্বদেশ . স্বাধীনতা . ভারতবর্ষ॥        

এই স্পার্টাকাস-রাত

আজ রাতে . যখন চারপাশ সুনসান, মশারির অনের নিচু থেকে . অম্লজান টানার শব্দ, গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে . ঝুপঝাপ অন্ধকার, গাড়িবারান্দার নীচে . ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার, . শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর . ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ বেশ্যার থালার ওপর . মাংসভুক পুলিশের থাবা, শ্মশানে-শ্মশানে চিতার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ, তিন ইঁটের উনুনে টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে ফুটপাথের অন্নপূর্ণা, তাকে ঘিরে . কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া পাতালের দরজায় ঘাতক, হাসপাতালের দরজায় মরণ . . . ঠিক তখনই . আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি, জুলিয়াস সিজার! তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল। তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ . তোমার পায়ের শব্দ, আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি এখন তোমার হাঁ-মুখ, আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায় জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ, চিমনির ধোঁয়ায় গঙ্গার জলে বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে তোমার নিশ্বাসের বিষ, কলকাতার প্রতিটি মানুষের ঘাড়ের ওপর . নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস আমার হাতে তুলে নিয়েছি এই একাঘ্ন এই ক্ষমাহীন কলম যা দিয়ে আজ রাতে আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি, . জুলিয়াস সিজার! তোমার শববাহকেরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম অধীরতায় পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে, কালো কাপড় তোমাকে ঢেকে দেবে বলে অতিকায় ডানা মেলে . ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাজা-মজা মানুষের হাতে হাতে উঠে আসছে . প্রত্নের পাথর, কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি . পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে, তোমার মধ্যরাতের সুরায় মিশে যাচ্ছে নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা . আর্সেনিক, তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট, ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী অপমানিত বিদূষকদের চোখ আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত কল্পান্তের শেষে টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে। এই স্পার্টাকাস-রাত আর এই একাঘ্নী চিঠি তোমার শববাহকদের সঙ্গে শেষবারের মতো কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে, . জুলিয়াস সিজার!       মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . . দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও, চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও, নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ। মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . . পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির, ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে, তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে, খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি— নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক। মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . . চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা, হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে! মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . . এত সরলতা স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন— খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট। কিছুটা সময় আরো রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . . এই বেলা টান টান উঠে এসো, ঘন ঘন দন্তের পীড়নে ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল, এই বেলা ছোখ মুখ খুবলে নাও . ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন কিছুটা সময় আরো মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . . . পাঁচ . . . . চার . . . . তিন . . .     নারীমেধ   এক ‘মেয়েমানুষের মাংস এমনিতেই খেতে খুব স্বাদু, আর যদি দিশি মদে ভিজিয়ে ভিজিয়ে হায় হায় ভাবাই যায় না….. তাছাড়া এখন খুব পড়েছে মরশুম, ছয় মাসে ছ-ডজন নারীকে কিডন্যাপ করে চাকুমচুকুম ঢাউস ঢেঁকুর তুলে ‘ক্যায়সা খুশি কি রাত’…..গেয়ে নেচে চলে গেল ঘোর দেশপ্রেম, দ্যাখো, কি এলেম !!’ দুই ‘তুই কি আমার বোন ? তুমি আমার মা ? মুখে নখের আঁচড় কেন—-উদলা কেন গা ? গিয়েছিলাম বনে, বনে ছিল কালকেউটে কামড়াল নির্জনে। পুতের মত ভায়ের মত পাঁচটি সোনার ছা আশ মিটিয়ে মাস খেয়েছে উদলা করে গা ।’ তিন —- মা কোথায় যাস ? —- পার্কে। — সাথে যাবে তোর আর কে ? — শ্যামের বিধবা বোন। দরজা ভেজিয়ে পথে নামে মেয়ে, ডুকরে ওঠে মা — শোন…….. শিস দিয়ে দিয়ে ছিনাল বাতাস বহে যায় শন শন।।’ চার ‘গাঁ থেকে এসেছে চাষার ঝিয়ারি ফুটপাতে পাল পাল, জানে না কোথায় কার পাশে শুলে হাত ভরে মেলে চাল।’ পাঁচ ‘মেয়েকে বসিয়ে ফাঁকা মাঠে বাপ দূরে দাঁতে ঘাস কাটে। দরের ব্যাপারে টনটনে কোলাকুলি সেয়ানে সেয়ানে। দিন রাত বছরে বছরে তবে না উনুনে হাড়ি চড়ে !’ ছয় ‘তখন ধূ- ধূ রাত। ছিটে বেড়ার ঘরের পাশে সাপের শিসের শব্দ। বোনের ঘরে গিয়েছিলাম। বোনের ঘর ফাঁকা। দিদির ঘরে গিয়েছিলাম। দিদির ঘর ফাঁকা। বাপের ঘরে ঢুকেই দেখি, প্যারালিটিক দুহাতে তাঁর আঁজলা -ভরা টাকা !’ সাত . ‘তুমি তো নও যাজ্ঞসেনী, বাঁধবে, বেণী বাঁধবে। অশ্রু মুছে বাপের ভায়ের পোয়ের অন্ন রাঁধবে। কে খায়, তোমায় কে খায়, রাক্ষসদের মরণ আছে যজ্ঞিডালের মাথায়। রাবণবধের তলোয়ারের দু-কষ বেয়ে মর্চে অনেক প্রায়শ্চিত্তের পর ঝরছে—-একটু ঝরছে !’                

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>