Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Amiya Chakravarty Indian literary critic

অমিয় চক্রবর্তী ভিন্নধারার কবি | আবু আফজাল সালেহ

Reading Time: 3 minutes

 

অমিয় চক্রবর্তী (জন্ম: ১০ এপ্রিল, ১৯০১ – মৃত্যু: ১২ জুন, ১৯৮৬) বাংলা সাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক কবি। তিরিশের দশক এবং বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ,  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দে’র সঙ্গে কবি অমিয় চক্রবর্তীর নামও আবশ্যিকভাবে চলে আসবে। অমিয় চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘কবিতাবলী’(১৯২৪)। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে: উপহার(১৯২৭), খসড়া(১৯৩৮), এক মুঠো(১৯৩৯), মাটির দেয়াল(১৯৪২), অভিজ্ঞান বসন্ত(১৯৪৩), পারাপার(১৯৫৩), পালাবদল(১৯৫৫), ঘরে ফেরার দিন(১৯৬১), হারানো অর্কিড(১৯৬৬), পুষ্পিত ইমেজ(১৯৬৭), অমরাবতী(১৯৭২), অনিঃশেষ(১৯৭৬), চলো যাই(১৯৬২), উল্লেখযোগ্য।

ত্রিশের দশকে যে পাঁচজন কবি রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে গিয়ে আধুনিক-সাহিত্যের জন্ম দিয়েছেন তাদের মধ্যে অমিয় চক্রবর্তী একজন। প্রথমদিকে তার কবিতায় রবীন্দ্র প্রভাব ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে, খুব দ্রুতই,  কবিতায় নিজস্ব এক ধারার জন্ম দিয়েছেন তিনি। পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে দ্বন্দ্বমুখর। কিন্তু কবিতায় টানাপোড়েন বদলে দিয়েছেন। প্রেমের কবিতাতেও ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায়। বৃষ্টির সুরে প্রেমের সুবাস। চকিত অনুভূতিতেই রোমান্টিকতা। ধরি, ‘ধক করে লাগে বুকে-/-তুমি-/খুঁজি চারিদিকে।/আমি/রোদ্দুরে দরজা-খোলা ঘরে।/উঠোন, আকাশ,/একেবারে/ধুয়ে মোছা শেষ।’ বস্তুচেতনা ও গতিচেতনা ধরা দিয়েছে অমিয়র কবিতায়। সাধারণ শব্দে অসাধারণ প্রকাশ করতে যথেষ্টই পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন তিনি। ‘নীল কল।/লক্ষ লক্ষ চাজা। মর্চে পড়া শব্দের ভিড়ে/পুরোনো ফ্যাক্টরি ঘোরে।/নিযুত মজুরি খাটে পৃথিবীকে/বালি বানায়, গ্রাস করে মাটি, ছেড়ে দেয়, দ্বীপ রাখে,/দ্বীপ ভাঙে; পাহাড়, প্রবালপুঞ্জ, নুনযন্ত্রে ঘর্ঘর ঘোরায়(সমুদ্র)।

অমিয় চক্রবর্তী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ডি.ফিল. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হাওয়ার্ড, বস্টন প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক প্রাচ্য ধর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। বিশ্বের নানান দেশে নানাবিধ তিনি ভ্রমণ করেন। ফলে, একারণে কবি ইয়েটস, জর্জ বার্নাড’শ, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্টফ্রস্ট, আলবার্ট সোয়ইটজর,বোরিস পান্তেরনাক, পাবলো কাসালস প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য লেখকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিক্ষকতা ও কর্মসূত্রে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন কবি অমিয় চক্রবর্তী।  এর প্রভাব তাঁর অনেক কবিতায় দেখা যায়। পর্যটনস্থান-কেন্দ্রিক অনেক কবিতা রয়েছে। তাঁর কবিতায় আন্তর্জাতিক বিশ্বপরিবেশের অনেক ভৌগোলিক স্থানের নাম, বর্ণনা ও চিত্র লক্ষ করার মতো। এই কারণে কবির ভ্রামণিক কবিতার বেশিরভাগই  অনন্য হয়েছে। এমন একটি কবিতাংশ তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা। তাঁর ‘‘ওক্লাহোমা’’ কবিতা থেকে- ‘সাক্ষাত সন্ধান পেয়েছ কি ৩-টে ২৫শে?/বিকেলের উইলো বনে রেড এরো ট্রেনের হুইসিল/শব্দ শেষ ছুঁয়ে গাঁথে দূর শূন্যে দ্রুত ধোঁয়া নীল;/মার্কিন ডাঙার বুকে ঝোড়ো অবসান গেলো মিশে।।/অবসান গেল মিশে।।/মাথা নাড়ে ‘জানি’ ‘জানি’ ক্যাথলিক গির্জাচুড়া স্থির,/পুরোনো রোদ্দুরে ওড়া কাকের কাকলি পাখা ভিড়;/অন্যমনস্ক মস্ত শহরে হঠাৎ কুয়াশায়/ইস্পাতি রেলের ধারে হুহু শীত-হাওয়া ট’লে যায়…।’

কবি-সাহিত্যিকরা জীবন-জীবিকাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। জীবন ও সংসারের জটিল হিসাব-নিকাশ কবিতার ছত্রে ছত্রে উঠে আসে কবির কবিতায়। অমিয় চক্রবর্তীও ব্যতিক্রম নয়। প্রেম-ভালোবাসার সঙ্গে ছোটদের জন্য শুভকামনাও রয়েছে। ‘‘পিঁপড়ে’’ কবিতায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়- ‘আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ঘুরুক দেখুক থাকুক/কেমন যেন চেনা লাগে ব্যস্ত মধুর চলা-/স্তব্ধ শুধু চলায় কথা বলা-/আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে তার ঐ ভুবন ভ’রে রাখুক,/আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ধুলোর রেণু মাখুক…’। ‘চাঁপার কলিতে, কবি, ধরো অণুবীক্ষণ যন্ত্র।/খুলে যাবে কোমল দিগন্তে-দিগন্তে/জ্যামিতিক গড়নের অঙ্গন(পুষ্পদৃষ্টি)’, ‘চোখের সৃষ্টিকে দেখি ট্রেনের জানালা দিয়ে/মধ্যাহ্নে আদিম অচেতন/মাটির বিস্তৃতি(চলন্ত)’, ‘মাছ চলে নীল ঢেউ-এ ডাক দিয়ে/কাঁকড়া ছায়ার হাঁটা/রেখার মাঠের সুর,  স্বচ্ছতাল।/সময় ঘুমোয় রোদে(কালান্তর)’, ‘চারপয়সার নাগরদোলায় কে দুলিবি আয়(নাগরদোলা)’, ‘ছোটো জলের আয়না,/টুকরো আকাশ লুকিয়ে রাখো/বুকে ঢাকো(পুকুর)’, ‘আশ্চার্য এই পৃথিবী, স্বীকার করি।/-কিছুই চেনা নেই, গেল না জানা/বলতে বলতে ট্রামে উঠে পড়ি(আশ্চর্য)’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে কাঙ্খিত অর্থ প্রকাশে অমিয় চক্রবর্তী যথেষ্ঠ পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। সাধারণ শব্দ ব্যবহারে যে এমন সব ভালো ভালো কবিতা লেখা যায় তা অমিয় দেখাতে পেরেছেন। উল্লিখিত কবিতাংশ, অলংকার, শব্দবুনন কবির প্রতিনিধি হিসাবে উলে্লখ করলাম। তাঁর বেশিরভাগ কবিতায় এমন। তাঁর কবিতা পড়লে পাথক ঠকবেন না, কবিরা সমৃদ্ধ হতে পারবেন।

অমিয় চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের সান্নধ্যি বেশি পেলেও তাঁর কবিতা ছিল সর্ম্পূণ রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহিত্য-সচিব হিসেবে যে-কাজ তাকে করতে হয়েছে অমিয় চক্রবর্তী স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, ’কবিতা এবং অন্যান্য সব রচনার পাণ্ডুলিপি রক্ষাভার ছিল আমার ওপরে।’ তিনি স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, ‘শান্তিনিকেতনের জীবন’ প্রসঙ্গে। তিনি লিখেছিলেন, ‘…শালবীথির তপ্ত ছায়াবৃত মর্মর, ছাতিমতলার শুভ্র স্তব্ধ পাথর এবং উৎকীর্ণ মন, রবীন্দ্রনাথের গভীর বাক্যালাপ এবং অজস্র আতিথ্য, প্রমথবাবুর হাস্যকৌতুকময় প্রখর মননশীল আলোচনা ও বন্ধুত্বের অযাচিত দান একটি অপরিণত, অজ্ঞাত বাঙালি ছেলের সাহস আশা-কল্পনাকে ছাপিয়ে অপরূপ হয়ে দেখা দিয়েছিল। আজও বুকে জেগে আছে আকাশ মাঠ খোয়াইয়ের পাণ্ডুর উজ্জ্বল বলয়-চক্র, দারুণ গ্রীষ্মে উৎফুল্ল আমলকী-সারি এবং বহু দূরে পাড়-বসানো সবুজ তালতড়ি। আশ্রমেরই অভিন্ন অন্তর্গত রূপে সেই দৃষ্টি আমার কৈশোর জীবনে প্রসারিত।’  কবিতার জন্য তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ‘ইউনেস্কো পুরস্কার(১৯৬০)’, ভারতীয় ‘ন্যাশনাল একাডেমী পুরস্কার’, দেশিকোত্তম(১৯৬৩) এবং পদ্মভূষণ(১৯৭০)  ইত্যাদি উপাধি/পুরস্কার পেয়েছেন।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>