বাইলাইন

 

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comবিমলেন্দুদা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, কপিটা লিখে নিজে একবারও পড়ে দেখেছিস? বিমানটি কনিষ্ক থেকে লন্ডন যাচ্ছিল? কনিষ্কটা কোথায় চাঁদ, ম্যাপে একটু দ্যাখাতো।

এলইডি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সবাই আমাকে দেখতে লাগল। আর হাসতে লাগল। তির্যক হাসি। এ ওর কানের কাছে ফিসফিস। সেটা যেন আমাকে শোনানোর জন্যই। কোথা থেকে যে এসব স্যাম্পেলের আমদানি হয়, এরাই কাগজটাকে ডোবাবে, খুঁটি-ফুটি ধরা আছে নাকি রে ভাই গোছের ফিসফিসগুলো রকেটবাজির মতো উড়ে আসতে থাকল আমার দিকে। অথচ সত্যিটা কি জানেন, আমি জানি বললে বিশ্বাস করবে না কেউ, খবরের এজেন্সি, মানে সংবাদসংস্থার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া যে প্রিন্টআউটটা আমার সামনে রাখা ছিল, তাতে স্পষ্ট লেখা দ্য ফ্লাইট ওয়াজ রানিং ফ্রম কনিষ্ক টু লন্ডন। এ বছর সেই দুর্ঘটনার, মানে কনিষ্ক ট্র্যাজেডির তেত্রিশ বছর হল। ১৯৮৫ সালে তিনশ ঊনত্রিশ জন মারা গিয়েছিলেন ওই ঘটনায়। প্লেনের সবাই। সেই নিয়েই কপিটা। দেখুন আজকের দিনে কি কান্ডটাই না হয়েছিল গোছের। এখানে ট্রেনি সাংবাদিক হয়ে ঢুকেছিলাম যখন, প্রথম দিনই বিমলেন্দুদা বলে দিয়েছিলেন, হাতে অ্যাসাইনড কপি না থাকলে যত পারো নিউজ এজেন্সির ফিডগুলো ঘাঁটবে। ফিড মানে হল খবর। কোনও এক তাবড় জার্নালিস্টের একটা লেখাতে যেন পড়েছিলাম, ‘সাংবাদিকতার গোড়ার দিকে টেলিপ্রিন্টারের আওয়াজ আমার কর্ণকুহরে তবলা লহরীর মতো বাজিতে থাকিত। সে আওয়াজে কি মাদকতা।’ এখন তো আর টেলিপ্রিন্টার নেই। সংবাদ সংস্থার একটা ছোট্ট সফটওয়্যার আছে। তাতে পরপর খবর আসতে থাকে। খবরের বাইবেলেই যদি ভুল থাকে আমি কি করব?

‘এজেন্সি থেকেই তো নিলাম, বিমলেন্দুদা’ বলার পর দেখি খুক খুক হাসিগুলো খ্যাকখ্যাক হয়ে গেল দুম করে। নিউজ এডিটরের কানেও হয়ত পৌঁছেছিল কথাটা। তিনি চেয়ার থেকে উঠে এসে বললেন, ‘বাবা সারদেশাই, এখান থেকে পঞ্চাশ পা এগোলে কি বলতো?’আমি চুপ করে থাকি। ‘পঞ্চাশ পা এগোলে একটা দরজা আছে, জানো তো? সেখান থেকে ডান দিকে দেড়শো পা গেলে কি বলতো, মেন দরজা। যখন ইচ্ছে বেরিয়ে যেতে পারো, কেমন? কথাটা মাথায় রেখো। স্টুপিড কোথাকার।’ নিউজ এডিটরের ডান হাত, মোনালিসাদি, নিউজ এডিটরের গায়ে ফের একবার ঢলে পড়লেন। ঘড়ির একটা কাঁটা আরেকটা কাঁটার গায়ে যেমন ঢলে পড়ে, প্রতি ঘণ্টায়। ঠোঁট উল্টে বললেন, ‘শুনেছি নতুন এই বাবুটির আবার নাকি বাইলাইনের শখ। কই হে, শঙ্খ বাজাও, উলুধ্বনি দাও।’ আবার একপ্রস্থ হাসাহাসি, রাজা প্রজা মিলে। তারপরই মোনালিসাদি নিউজ এডিটরের ডান হাত টেনে ধরে বললেন, ‘চলো অনাবিল, কফি খেয়ে আসি।’

বাইলাইন নিয়ে এই ব্যঙ্গ আমার পিঠে চাবুকের মতো লাগে। যাঁরা জানেন না তাঁদের বলে দিই, নিজের নামে খবর বেরোনোটাকে বাইলাইন বলে। কি কুক্ষণে যে এখানে জয়েন করার পরের দিনই অপদার্থের মতো বলে ফেলেছিলাম, ‘অনাবিলস্যার, বাইলাইন পাবো তো?’সেই থেকে আমার এই প্রশ্নটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। মোনালিসাম্যাম শুনে বলেছিলেন, ‘পুঁইশাকের আবার ক্যাশমেমো। কয়েক হাজার টুকরো খবর আগে লেখো তো বাবা।’

আমার বাবা খুব স্বপনকুমার পড়তে ভালোবাসত। আমিও পড়েছি তিন-চারটে। ওখানে যুক্তিযুক্তভাবে কোনও সমীকরণ না মিললেই লেখা হত, কোথা থেকে যে কি হইয়া গেল, অমুককে তখন তমুক স্থানে দ্যাখা গেল। আমার খবরের কাগজে চাকরির ব্যাপারটাও ওই কোথা হইতে কি হইয়া গেলর মতো। নিজের কাছেই কোনও যুক্তি খুঁজে পাই না। পড়লাম কেমিস্ট্রি। মাস্টার্সের পরে ভাবলাম স্কুল সার্ভিস কমিশনটা দিই। চারদিকে এত উন্নয়নের মধ্যে শুধু আমার উন্নয়নটা হল না। পুরো শহর ত্রিফলায় মুড়ে গেল, তিন চারটে নতুন ফ্লাইওভার হল, আঠাশ হাজার পুজো কমিটি দশ হাজার টাকার চেক পেল, লেক টাউনের মোড়ে মেকি বিগ বেনের ঘণ্টা বাজল, শুধু স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষাটা ঠিকঠাক করে হল না। নতুন বার্তার শ্রেণীবন্ধ বিজ্ঞাপনে বক্ষ মালিশ তেল, চিলেকোঠার ঘরে মাশরুম চাষ, বড় ঘরের মহিলাদের সঙ্গে বোল্ড রিলেশানের পাশে একটা সিগারেট প্যাকেটের মতো জায়গায় দেখতে পেলাম, ট্রেনি জার্নালিস্ট চাই। যোগ্যতা স্নাতক। সিভি পাঠালাম। পরীক্ষা হল। রচনা এসেছিল, মি টু। কষে লিখলাম। চাটনি খবর আমি ছাড়ি না কোনওদিনই। প্রচুর ইনফো বমি করলাম খাতায়। লাস্টে লিখেছিলাম, মি টু-র যেন অপব্যবহার হয়ে নতুন করে কোনও শি টু-র জন্ম না দেয়। দেখি আমি সিলেক্টেড। মি টু!

নিউজডেস্কের এক কোণায় বসতাম আর টুকরো খবর লিখতাম। গাজিয়াবাদে নর্দমার পাশে তাজা বোমা উদ্ধার, বেঙ্গালুরুর বানেরঘাটা রোডে পথ দুর্ঘটনায় মৃত দুই, নাসিকে পথ অবরোধে ছাড় পেল না অ্যাম্বুলেন্সও গোছের পঞ্চাশ-ষাট শব্দের খবর। এ ধরনের খবরগুলোকে বলা হত ফিলার। অন্য সব জরুরি খবর পাতায় ধরানোর পর যদি জায়গা ফাঁকা থাকত কখনও কখনও, তখন এসব দিয়ে জায়গা ভরানো হত। প্যাকিং করার সময় দামি শো-পিসের চারধারে পেঁচানো রাবিশ কাগজের মতো। বাহারি মূর্তির মতো আসত দিল্লির কপি কিংবা নবান্ন স্পেশাল। অথবা মেলবোর্ন-শারজা, নিদেনপক্ষে মুম্বই-মোহালি থেকে খেলার খবর। এক্সক্লুসিভ। পাতায় বসত রাজার মতো। জ্বলজ্বল করত রিপোর্টারের নাম। আর সাড়ে ছ’টায় এমন কোনও খবর জমা দিয়ে বা মেল করে যে রিপোর্টাররা বাড়ি চলে যেত, তাদের লেখা চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে ঘষামাজা করে, বলতে গেলে রেডি টু প্রিন্ট করে রঞ্জনদা, সুরম্যদা, উত্তরণদার মতো চিফ সাব এডিটররা রাত এগারোটা-সাড়ে এগারোটায় বলে উঠত, ‘আজকের মতো বাসন মাজা শেষ হল বন্ধুগন।’কোরাসে দীর্ঘশ্বাসগুলো বড় স্পষ্ট হত তখন।

আমাদের কাগজ, মানে নতুন বার্তার বিক্রি দিনে আড়াই লাখ। একটা বাইলাইন মানে কারও নাম দিনে আড়াই লক্ষ বার ছাপা হওয়া। মাসে ছ’বার বাইলাইন নামে পনেরো লক্ষ। ভাবা যায়। আজি যত তারা তব আকাশে, ততবার নিজের নাম। শিয়ালদা স্টেশনে প্রতিদিন যত লোক যায়, ততবার আমি। মুদির দোকানে পাঁচশ মটর ডাল কেনার পরে ঠোঙায় নিজের নাম। ছোটবেলায় নিজের নাম লেখা একটা স্ট্যাম্প বানিয়েছিলাম। খাতার প্রতিটা পাতায় মারতাম। তারপরে হোমওয়ার্ক। আমার স্কুলজীবনে নিজের ইচ্ছে-ভরা বাইলাইন ছিল। স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবে নাগালের মধ্যে প্রথম প্রিন্টার পেলাম যেদিন, ওয়ার্ড ফাইলে কনট্রোল সি কনট্রোল ভি মেরে মেরে একটা পাতায় আড়াইশ বার নিজের নাম ধরিয়ে প্রিন্ট দিয়েছিলাম। স্যার ছিল না তখন। পার্ট টাইম অ্যাটেনডেন্ট পনেরো টাকা চেয়েছিল। আজ বুঝি। এটাকে ঘুষ দেওয়া বলে। দিয়েছিলাম। টিফিনের পয়সা ছিল না আর।

সুরম্যদা নতুন বার্তায় কাজ করে গত বাইশ বছর। কোনওদিন বাইলাইন পায়নি। উত্তরণদা পেয়েছিল। জীবনে একবার। যে ট্রেনে করে হাওড়া থেকে চেন্নাই বেড়াতে যাচ্ছিল, বিশাখাপত্তনমের কাছে সেটা বেলাইন হয়ে যায়। ওরা পিছনের দিকের কামরায় ছিল। সামনের কয়েকটা উল্টেছিল। কপালে ইঞ্চিতিনেক কেটে যাওয়া ছাড়া ওর কিছু হয়নি। ট্রেন থেকে ফোনে ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা কাগজের নিউজডেস্কে ব্রিফ করেছিল উত্তরণদা। সেটা পরের দিন প্রথম পাতায় ওর নাম দিয়ে ছাপা হয়েছিল। জীবনে ওই একটাই বাইলাইন। উত্তরণদা অফিসে জয়েন করেছিল কপালে লালছোপ ব্যান্ডেজ আর একগাল হাসি নিয়ে। সুরম্যদারা সেদিন ফিসফিস করছিল সারাদিন। বলছিল, ‘এর পর থেকে উত্তরণ চাইবে যে ট্রেনেই ও উঠুক সেটা যেন উল্টোয়। কি ফোকটে শালা বাইলাইনটা পেয়ে গেল। তাও আবার ফ্রন্ট পেজ। আর আমরা বছরের পর বছর শুধু ঘষটে যাই।’

উত্তরণদা সেদিনের এডিশনের প্রথম পাতা থেকে ওর লেখা, ওর নাম দেওয়া খবরটা কেটে ল্যামিনেট করে রেখেছিল। আধার কার্ডের মতো। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের মার্কশিটের মতো। যে ব্যাগটা নিয়ে অফিসে আসে ও, আমি জানি ওটার শেষ চেনটা খুললেই বেরিয়ে আসবে প্লাস্টিক ফর্মালিনে সংরক্ষণ করা একটা নিউজপ্রিন্ট। নিউজ এডিটরের কাছে যে দিন খুব অপমানিত হল উত্তরণদা, অনাবিলদা যখন বলল বুড়ো হাবড়ার দলগুলো অন্য রাস্তা দেখে না কেন, সেদিন ছাদের এক কোণায় গিয়ে চুপি চুপি ওটায় হাত বোলাচ্ছিল ও। আমি দেখেছি।

নিজের নাম জিজ্ঞেস করলে কি বলবি লোককে? নিজস্ব প্রতিবেদক, নতুন বার্তা?কিং অফ টুকরো খবর? বাইশ বছর কাজ করার পরেও আমার মতো পরিচয় পেতে চাস? লাখখানেক কপি এডিট করার পরেও শালা যার নাম বেরোয়না কাগজে? শালা এডিটোরিয়াল ডেস্ক। এ সুযোগ ছাড়িস না।

আজ নবমী। মহানবমী। সপ্তমীর দিনই অন্য সব কাগজের মতো আমরাও ছাপিয়ে দিয়েছি, ‘পাঠক ও বিজ্ঞাপণদাতাদের জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা। আগামী চারদিন নতুন বার্তার কোনও সংস্করণ প্রকাশিত হবে না।’ অথচ ঘটনাটা আজকেই ঘটার ছিল। দুপুরবেলা পাড়ায় নবমীভোগের লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ঢাক বাজছে। আমাদের পাড়ার অরুণ-বরুণ-কিরণমালারা এ ওর সঙ্গে সেটিং জমানোর চেষ্টা করছে, এমন সময় ফোন বাজল আমার। অনাবিলস্যার। আমি ফোন তুলে বললাম, ‘স্যার, শুভনবমী।’ উনি বললেন, ‘স্ক্র্যাপ নবমী অ্যান্ড নোট হোয়াট আই অ্যাম সেয়িং। বি প্রোঅ্যাক্টিভ। বিপিন মুখার্জীর একটা অবিটুয়ারি চাই আজ সন্ধের মধ্যে। ওঁর বাড়ি যা। বৌয়ের সাথে কথা বল। ইনপুট নে। কিপ ফলোয়িং আপ। সাড়ে নশো টু হাজার শব্দ। বাই সেভেন পিএম।’জড়ানো কথার পরে ফোনটা কেটে গেল।

আমাদের পাড়ার দুর্গার সিংহের সামনের দুটো দাঁতে এবারে খুব লাল রং দিয়েছে। ওগুলোকে বোধ হয় ক্যানাইন বলে। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম সুরম্যদাকে। আমি জানি, ও এখন সিকিমে। চতুর্থীর দিন রাত্রিবেলাই বেরিয়ে গিয়েছিল। ওকে অনাবিলস্যারের ফোনের ব্যাপারটা ব্রিফ করার পরেই ও আমায় শুরুর দিকের কথাগুলো বলল। মানে ওই নিজস্ব প্রতিবেদকের কথাগুলো। আমি বললাম, ‘আমায় উনি ফোন করলেন কেন সুরম্যদা? আমি তো ট্রেনি। এতগুলো রিপোর্টার!ওরা কি করছে?’ সুরম্যদা বলল, ‘পলিটিকাল রিপোর্টারদের বেশিরভাগই বেড়াচ্ছে। আউট অফ স্টেশন। আর বিপিন মুখার্জী ছোট নেতা। তাও আগের জমানার। তার জন্য ট্রেনিই ঠিক আছে। জলদি ফুটবে বিপিন। ডু ইট। বাইলাইন পাবি।’

বাইলাইন! জিভে জল চলে এল। লেবুর আচার দেখলেই জিভে যেমন জল আসে, তেমন। বাড়িতে এসে টিভি চালালাম। এক চ্যানেলে বনেদিবাড়ির পুজো। অন্য চ্যানেলে ছোট ছোট খোপে একডালিয়া-সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার-দমদম পার্ক লাইভ। নবমী নিশি ফুরায়ো না করে সানাই অন্য জায়গায়। এই তো স্ক্রল যাচ্ছে নিচে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ নিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বিপিন মুখার্জী। ভর্তি বাইপাস লাগোয়া নার্সিং হোমে। অবস্থার ক্রমশ অবনতি।

আমাদের কাগজের নিউজডেস্কে ফোন করলাম। কেউ ধরল না। জানতাম। আগে নাকি পুজোর দিনগুলোতেও কাগজ বেরোত। বছর তিন-চারেক আগে থেকে সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কাগজের সার্কুলেশনের সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তারা নাকি বিদ্রোহ করেছিল পুজোয় কাজ করতে হচ্ছে বলে। সেই থেকে পুজোয় কাগজ বেরোনো বন্ধ। নতুন বার্তায় দেখেছি, সবাই সারা বছর ধরে ওৎ পেতে থাকে এই কটা দিনের জন্য। বেশিরভাগই বেড়াতে যায়। ওই চ্যানেলটাতেই ফের স্ক্রল দেখাচ্ছে আবার। ‘আপনিও রিপোর্টার। খবরের গন্ধ পেলেই ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ করুন এই নাম্বারে।’ ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম,‘বিপিন মুখার্জী কোথায় ভর্তি আছে বলবেন প্লিজ?’লোকটা হাসপাতালের নাম বলে বলল, ‘ভাই কপাল পুড়ল নাকি? লাইনের লোক মনে হচ্ছে!’ যাক গে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস ধরলাম। অ্যাপ ক্যাব সাড়ে পাঁচশ টাকা দেখাচ্ছিল। ক্ষমতা নেই। আমি ট্রেনি তো। কনভেন্স অ্যালাওয়েন্স পাব কনফার্মড হওয়ার পরে। যেতে যেতে গুগল করলাম বিপিন মুখার্জী। তেমন কিছুই পেলাম না। বেশিরভাগই দুহাজার আট নয়ের খবরের লিঙ্ক। ছবি। বড় বড় নেতার সঙ্গে মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বিপিন মুখার্জী। ট্রেড উইনিয়ন নেতাদের দাবিদাওয়া শুনছেন বিপিন মুখার্জী। ধুস। উইকিপিডিয়াতেও ঠিক চার লাইন। কবে জন্ম, পলিটিক্যাল অ্যাফিলিয়েশনে দলের নাম, লাল ব্যাকগ্রাউন্ডে ওনার একটা ছবি আর পাঁচ-সাতটা এক্সটারনাল লিঙ্ক। অত পড়ার টাইম নেই।

হাসপাতালে গিয়ে দেখি রিসেপশনের সামনে ছোট জটলা। ছ-সাত জন লোককে ঘিরে রয়েছে বারো-চোদ্দজন। হাতে নোটবই। হয়তো আমার মতোই ট্রেনি। এক মন্ত্রীকেও দেখলাম। প্রাক্তন মন্ত্রী। ওনার কি দাপট দেখতাম টিভিতে, আগে। হাতে বুম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। চোখেমুখে বিরক্তি। আমি রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিপিন মুখার্জীর স্ত্রী? বাড়ির লোক?’ রিসেপশনিস্ট তখন মোবাইলের মিরর স্ক্রিনের সামনে ঠোঁটদুটো ওভালের মতো করে লিপস্টিক ঘষছিলেন। ঠোঁট ওল্টালেন। তর্জনী। ওই জটলার দিকে। এবারে আমি ওই প্রাক্তন মন্ত্রীকেই জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘স্যার, বিপিনবাবুর স্ত্রী আসেননি?’ উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এসেছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়ি ফিরে গিয়েছেন।’

এই তো সুযোগ। থ্যাঙ্ক ইউ অনাবিলস্যার। এবারে এক্সক্লুসিভ ইনপুট পাব। হলুদ ট্যাক্সি ধরে সোজা টালিগঞ্জ। রিসেপশান থেকে ঠিকানা নিয়ে নিয়েছিলাম। ট্রাম ডিপোতে বিপিন মুখার্জীর নাম বলতেই বাড়ির গলি দেখিয়ে দিল। সব গলির মতো এই গলিরও সামনে বিশাল বড় বড় দুটো কাটআউট। নেত্রী। প্রণাম করছেন। হাসিমুখ। ওনার পায়ের তলায় লেখা, প্রচারে ভ্যাবলা, ন্যাবলা আরও কি সব নাম। কলিং বেল। ভীষণ কর্কশ একটা আওয়াজ। খেয়াল করিনি। দরজাটা হাল্কা করে ভেজানো ছিল। অল্প ঠেলা মারতেই দেওয়ালে বিশাল বড় লেনিন। এবারে কানে এল ক্রন্দনধ্বনি। তাহলে ইনিই বিপিন মুখার্জীর বউ। পাশে তিন চার জন মহিলা। সবারই মুখ থমথমে। টিভি চলছে। হাসপাতালে যেমন চলে। অথবা বারে। ছবি দেখাচ্ছে শুধু। সাউন্ড নেই। খবরের চ্যানেল। নিচের স্ক্রলে দুষ্টু ঝুমকির নবমীর সাজ, মেট্রো আজ বারোটা অবধি, পুজোয় মাতল সাংহাইও, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ক্রমাবণতি, আসছে যাচ্ছে। এদিক ওদিক দেখলাম। আর কোনও সাংবাদিক গোছের লোক চোখে পড়ল না। তার মানে এক্সক্লুসিভ। আমায় কথা বের করতেই হবে। আড়াই লক্ষ বার আমি।

বিপিন মুখার্জীর স্ত্রী বসে রয়েছেন ড্রয়িংরুমের এক কোণে ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে। হাত জোড় করে। কাঁদছেন। এখান থেকে ওনাদের বেডরুমটাও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। অবশ্য সাতশো সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে স্পষ্ট না দেখানোরও তো কোনও কারণ নেই! বেডরুমের মলিন দেওয়ালে আরও একটা লেনিন। লেনিনের পাশেই লাগানো মা কালীর ছবি। দুটো ছবিতেই দুটো শুকনো মালা ঝুলছে দেখলাম। শুনেছিলাম, ওনাদের দলের নেতারা নাকি ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করেন না। এটা এক্সক্লুসিভ পয়েন্ট হতে পারে? ঠিক বুঝতে পারছি না। ওনার স্ত্রীর থেকে আমায় কথা বের করতেই হবে। যতটা পারা যায়। কি খেতে ভালোবাসেন (আসলে ভালোবাসতেন, এ ভাবে তো বলা যায় না এখন), কি করে ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন, ইদানীং সময় কাটান (কাটাতেন, অফ কোর্স) কি ভাবে, আবার ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেন কি না, এগুলোই তো এক্সক্লুসিভ। এই মুহূর্তে বিপিনবাবুর ওয়াইফকে এ গুলো জিজ্ঞেস করা টাফ। হোক, আমাকে করতেই হবে। কিন্তু পেজ ওয়ানে দেবে না মনে হয়। চার দিনের কত জমানো খবর থাকবে। বিপিন মুখার্জী আরও একটু বড় নেতা হলে আমার কোনও চিন্তা থাকত না। পেজ ওয়ানের বাইলাইনটা এক পয়েন্ট বড় হয় সব সময় আমাদের কাগজে। বোল্ডে আমার নাম। উফ্।

টালিগঞ্জের ট্রামডিপোর পাশে যে বড় কালীমন্দিরটা আছে আমি আপাতত সেখানে দাঁড়িয়ে। হাত জোড় করে। প্রণাম অন ডিমান্ড। পঞ্চাশ টাকার ফুল কিনলাম পাশের বাজার থেকে। পঞ্চাশ টাকার মিষ্টিও। প্রণামী বাক্সে একশ টাকা ঢোকাচ্ছিলাম যখন, তখন পাশের লোকগুলো আমায় দেখছিল অবাক হয়ে। ভাবল কত বড় হোতা রে বাবা! ওরা জানে না পুরোটাই স্পনসর্ড। স্পেশাল প্রণাম পাওয়ার্ড বাই বিপিন মুখার্জীর ওয়াইফ। ওনাদের বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি যখন, উনি আমার হাতে দুশ টাকা দিয়ে বললেন, ‘বাবা একটা অনুরোধ রাখবে আমার? তুমি খুব ছোট বলেই বলছি। যাওয়ার সময় ট্রামডিপো লাগোয়া মন্দিরে একটা পুজো দিয়ে দেবে জেঠুর নামে? যেন বাড়ি চলে আসে তাড়াতাড়ি। বেশি করে ফুল কিনবে। মিষ্টির বাক্সে ওনার নাম লিখবে, বড় বড় করে। কেমন?’ আমি বললাম, আপনার একটা ছবি নিতে পারি?

অনেক কথা বললেন উনি। অন্তত আড়াই হাজার শব্দের কনটেন্ট আমার কাছে রেডি হয়ে যাবে আর ঠিক এক ঘণ্টায়। সঙ্গে বিপিনবাবুর বউয়ের ছবি। চোখে জল। এক্সক্লুসিভ। জল ফোটার মতো এখন শব্দ ফুটছে আমার মনে। পেজ ওয়ান হলেও পুরোটা ধরবে না। ‘এর পরে পাঁচের পাতায়’ হবে।

আই হ্যাভ ডান ইট। অবিটুয়ারি রেডি, অনাবিলস্যার। মোনালিসাম্যাম, এ বার?

নাম লেখা মিষ্টির প্যাকেট জমা দিলাম। দায়িত্ব কমপ্লিট। হাত জোড় তো করে আছি। কি বলব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মোবাইলে লাইভ স্ট্রিমিং চলছে নিউজ চ্যানেলের। কানে গোঁজা ইয়ারবাড।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ আর কতক্ষণ?

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত