আন্দালীবের কবিতা

আজ ০১ অক্টোবর কবি আন্দালীবের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


মধ্যযাম থেকে কয়েক ছত্র

১২ঃ০০
রাত বারোটায় ঘড়ির কাঁটাগুলো স্তিমিত হয়ে আসে।
সঙ্গমের চে’ বারান্দায় দাঁড়াবার ইচ্ছেরা তীব্র হয়।

১২ঃ৪২
আমার কেবলি মনে পড়ে একশৃঙ্গী হরিণের কথা।
বিরহী বনাঞ্চল, দূতাবাসের রাস্তা — যেখানে এসে আর
পথ খুঁজে পায় না বোকা পর্যটক। হায় মৃগ-নাভি!
কস্তুরী ঘ্রাণে থৈ-থৈ উপচে ওঠে রাত থেকে রাতের শহর।

০১ঃ৩৫
ঘুড়িশিকারে গেল যারা তাদের কোন উচ্চতাভীতি নেই।
দূরবর্র্তী শহরের খাঁজে তারা গচ্ছিত রেখে আসে বায়ুপ্রবাহ,
সূর্যাস্তের স্মৃতি — এ’সব মনে আসে আমার সন্তর্পণে,
আঁধারবেলায়। রাত দেড়টায়।

০২ঃ০৮
মধ্যযাম! তোমাকে লক্ষ করে শহরের অনিদ্রারোগীরা সব
ঘড়ি থেকে খুলে নিয়েছেন ঘুমের কাঁটা। বুকপকেটের খাঁজে
রেখে দিয়েছেন সেবনপ্রতীক্ষ্য ঘুমের বড়ি। অফুরান টক্সিক মদ
রেখেছেন তারা রাতের গহিনে, ম্রিয়মাণ কিছু জোনাকির সহায়তায়।

০২ঃ১৫
এ’পর্যায়ে ফশ্ করে এক কাঠি সিগারেট ধরানো যায়; সহজেই,
নিথর আমার ঘুমের বারান্দায়।

০২ঃ৩৭
অসফল সঙ্গমের শোক বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়েছে যারা
অনিদ্রারোগীর আকুলতা এর চে’ বেশি কিছু আর নয়।
ফ্রিজিয়াম! ওহ্ ফ্রিজিয়াম!
মরফিয়াসের চোখের গভীরে দেখি নিস্তরঙ্গ আমার শহরখানি ডুবে যায়।

মিরর মিরর

ফিরেছি পারদের দেশে,
খুনোখুনি আর ক্লিন্ন পৃথিবীর
যুদ্ধোত্তর সব ট্রেঞ্চ ভালবেসে।
মানুষের চামড়ায় মোড়ানো
শোক বই পড়ে জেনেছি –
জগতে তুমিই সুন্দর,
বাকী সব উৎকট, মিথ্যে।

ওই কীটদুষ্ট গাছের ছায়ায়
পড়ে আছে যত ইচ্ছেচালিত যান
অশ্বশক্তির অপচয় রোধ করে –
তারা জানেনি খর গ্র্যাভিটির টানে
কী উলম্ব চলেছে জগত
আজ রসাতলের দিকে!

ওই সুতীব্র ভোর্টেক্স বেয়ে
নেমে যেতে-যেতে ভাবি
জগতে তুমিই সুন্দর, বিম্বিত
ধ্বংসের পরাবৃত্তে।

ভিয়োলা

কতটা রোদের দেশ থেকে মিহিন
জেগে ওঠে কুয়াশা! তোমার ম্লান ত্বক, বিমর্ষ ভূ-গোল,
আমার এই বিহন-বিহন বেলা।
এইসব নিথর অরণ্যানী মূলত নীল দেয়াল এক,
হায় প্রমিত সুন্দর! যার পাশে বসে তৈরি হয়
বেদনার সাঁকো, দীর্ঘশ্বাস, প্রসূন ছায়ার খেলা।

কুয়াশায় ডুবে গেলে তাবৎ বনানী,
পৃথিবীর সমস্ত জানালায় জেগে থাকে ভুল দৃশ্য,
শীতঋতু, আর একটা মেপল কাঠের বেহালা।

ট্রিগার হ্যাপি

এত কেন ঘোড়া দাবড়াচ্ছো হে তর্কবাগীশ?

তোমার দিকেই চেয়ে আছে যখন আগ্নেয়াস্ত্র সুন্দর!

ওই টোটাবন্দুক হাতে যারা শিকার করছে খরগোশ,

ঘন-ঘন নিশানা পাল্টাচ্ছে; তারা ছড়াচ্ছে কপট ত্রাস। স্যাংচুয়ারিতে নির্মম শুরু হচ্ছে মৃগয়াপর্ব।

কিছু দেখলেই লোকে বলছে – ফায়ার!

হাওয়ালেখ

১.
নিরর্থের দিকে যাও। চিনে নাও, তোমার সমাধিতে কারা এসে
ঠুকে যায় হাওয়ার ফলক।

২.
ঘোর লাগে প্রপেলারে। কার গায়ে জেগে থাকে ওই মেরুন
রাত্রিবাস? দ্যাখো মানুষপুতুল, লৌহকারখানা থেকে উঠে আসে
কেমন সুগ্রীব বিমানের ঝাঁক! আমাদের আশ্চর্য অ্যারোড্রোমগুলো
ডানা ভাঙার আর্তনাদে ভরে ওঠে। মানুষ জেনে গেছে পতনের
শব্দ মূলত জাগতিক সংকেত এক পুনরায় জেগে ওঠার। ফলে
বাতাসের গান বাজে, তরঙ্গ লিখে রাখে আয়নোস্ফিয়ার।

৩.
ফুটেছে হাওয়ার ফুল। নীল আমব্রেলা। অসুখের দিকে রাত্রি
সরে গেছে। গ্রন্থ-মলাটের নিচে বয়ে গেছে রক্তাল্পতা। আমরা তো
দেখিনি আজও প্রসূন-সভ্যতা, আইসিস, দেখিনি নতমুখী ফুল।
গ্রন্থ’সরণির পাশে কী করে শুয়ে থাকে নশ্বরতা! হায় মুদ্রারাক্ষসের দল,
তোমাদের কাছে জমা রাখি আয়ুর ভ্রমর, সুখ্যাতি, আত্মখুনের বারতা।

৪.
এ’ বৈধব্যে পুড়ে যাক মেঘ। হাওয়ার বারতা। তুমি প্রাচীন পুস্তক
নিয়ে কথা বল, যার ভাষা অস্পষ্ট। প্যাপিরাস হে, দিকে-দিকে
কার এত গোপন সংকেত আসে! বিদূষিকার লণ্ঠনে লেগে থাকে
নির্জ্ঞান, প্রবুদ্ধ শহরের আলো। মহাচৈতন্যের মাঝখানে নিশ্চেতন
যেই দেবদারু গাছ আছে, অনুবাদে তারাও সক্ষম। তারা জানে
পৃথিবীর প্রাচীন পুস্তক সব মেলে ধরা আছে বিদূষিকার দিকে।
যার তৃতীয় নয়নে বিদ্ধ তীর। যার করপুটে অতীতের লিখনরীতি হাসে।

৫.
শেষমেষ গ্যাসোলিনই সত্য, গতিনির্ভর এই পৃথিবীতে আর
রাষ্ট্রনায়কেরা পিস্তলেরো। ফলে বুদ্ধি ব্যতীত আর হারাবার
কিছু নেই। আজ পৃথিবীর ম্যাপ নিয়ে মেতে আছে কারা?
উজবুক না কোন রাজর্ষী? কার নাম লেখা আছে গ্যালিলির
সমুদ্রতটে? সে সত্য সযতনে লুকিয়ে রাখে আজ লৌহ,
আকরিকের পাখি।

৬.
নেমে যাই ধীরে, এই অষ্পষ্ট গানের মাঝে। দেখি ফুটে আছে
ধূম্রস্বর, লহরী। গাগরি ছলকে ওঠে, গমকে গমকে। ভাঙে ক্রম,
শ্রুতিবিশ্ব। পদপ্রান্তে নেমে আসে সমুদ্র সোপান। অবরোহ গান
বাজে ইথারে-ইথারে, আজ গীতনির্যাস। পুষ্পরথ চেপে কারা
চলে যায় দূরে? তারা জানে প্রস্থান আসলে হাওয়ার কারসাজি,
হাহাকার মূলত বনমর্মর।

৭.
উড়ে যাও ধ্বস্ত কাগজের প্লেন, এই বিজন ফরেস্ট, এই ব্যাকুল
সাব-আরবান দৃশ্য পেরিয়ে। যত দূর দেখ আজ চিৎপ্রকর্ষ, শঙ্কার
বিপরীতে জেগে থাকা রোদ। ছায়ার কাঠামো, বিটপ আর ছিন্ন
পত্রালী। কর্পূরের মত উবে যাওয়া উড্ডয়নপথ, তারও তো
বিয়োগচিহ্ন থাকে, যার দিকে চেয়ে ন্যুব্জ হয় কাগজের প্লেন,
তার ব্যথাতুর ডানা গুটিয়ে আসে।

৮.
কে থাকে আগুনপাহাড়ে – সে’ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি আজও।
শুধু দূর দিকে চেয়ে মনোলিথখানি মৃদু হেসেছে। বাতাসে উড়েছে
ভলক্যানোর ছাই; ভস্মাধার পরিপূর্ণ হয়েছে। জেগে উঠেছে ওই
আকরিকের পাখি, যার আগুনে-ডানায় চেপে উভচরেরা মৃত্যুর
সীমানা পেরিয়েছে। অনতিদূরেই ধসে পরেছে পাথরের সেতু।
ফলে চিরপ্রশ্ন হয়ে দূরে আগুনপাহাড় শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছে।

৯.
ওঠো আজ, অনাবিষ্কারে চলো। স্তূপাকার পড়ে আছে যেখানে
জংধরা জাহাজের শব। উদ্গার শেষে ফিরে আসা যুদ্ধাস্ত্রের গায়ে
লেগে আছে আজও বহু যুদ্ধের তাপ, বহু স্খলনের চিহ্ন। আর যত
ওই ধাতব আকাশ, যতটা আলকালির সমুদ্র – তুমি লিখে রাখো
খাতায়, চিরকূটে; সেই সব মুছে যাবে। স্ফুলিঙ্গ রবে শুধু, অগ্নিকু-
রবে। যত কামারশালার গান, হাপরের শব্দ চিরকাল রয়ে যাবে
হৃদয়ে আমার।

১০.
কিংখাবে রাখো প্রেম। বিরহ তোমার। আজ রণক্ষেত্রের দিকে
উড়ে যায় চূর্ণ চকিত গান যত; তারা জানে ধাতু নিগ্রহ,
জানে হাপরের ছল কতোটা ধরে রাখে যুযুৎসা আমার।
যদি হননের রাত আসে, যদি ক্রূর হাসে আকরিকের ফলা;
তবে স্থানু হও, আর নতজানু হও। বৃশ্চিকসূর্যের নিচে
আজো কারা গান গায় এমন পেগান?

স্নেহ

তোমাকে রেখেছি স্নেহে, সঙ্গোপনে। বাদামি

ত্বকের নিচে, মেদ ও মাংসে। যত দূর দেখি

এনজিওশাসিত গ্রাম। তোমার আঁকাবাঁকানো

হেরিং-বন্ডের রাস্তা ঘুরে শেষ হয়ে গেছে টেকসই

উন্নয়নের কাছে এসে। তোমার মৌনতা-পীড়িত

ফিশারিতে আজ চাষ করেছে কারা এমন

গভীর জলের মাছ! তোমার কলহাস্যমূখর

পোল্ট্রি ফার্মগুলো যেন দপ করে নিভে গেছে।

তোমার ভোগ্যপণ্যের গ্রাফ, বড় স্খলন প্রবণ।

স্নেহের মত নিম্নগামী, পরান্মুখ এমন! তোমার

স্বনির্ভরতার ইতিহাসে ক্ষুদ্রঋন বলে যেন

আর কিছু নেই। তোমার কাচ-ভাঙা হাসি

বন্ধক রেখে কিনে নেব লাল হন্ডা আজকেই।

অপুষ্পক – ৪

ফিরিয়ে নাও ফুল

এই মত্ত ঢালাইমেশিন যে’ রকম

উগরায় ক্লিংকার

শ্রমঘন দুপুরের পাশে

এসে বসে মৃদু

বিকেলবেলার হাওয়া

চূর্ণ হীরক আর

ঘাসের জঙ্গল থেকে

অনাবৃষ্টির ছাট আসে

উদ্ধত বাবেলের চূড়া

থেকে দেখা যায়

অধঃপতনের দিকে সামান্য

এগিয়ে এসেছে ফুল

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত