অনিন্দ্য আকাশ-এর পঞ্চ কবিতা

নতুন পথ

মদের তালে তালে মেঘের উচ্ছ্বাস
কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে শরীরে আসে
চোখ অন্ধ নয়, তবে অস্পষ্ট ছবি তুলে
হেঁটে যাওয়া চেনা পথগুলো
কেমন যেন অচেনা লাগে।
পরিচিত বন্ধু প্রেমিকা সকল সূত্র ভুল করে
বারান্দায় ঝুলে থাকায় দোলনায়
স্বমহিমায় দোলে।
খুব বেশি অন্য স্ত্রীর কথা মনে পড়ে
যে এক সময় বনভূমি কাঁপিয়ে
আমার হ্রদে শরীর ভিজিয়েছিল।
কথা দিয়েছিলাম
তাকে আজীবন জোনাকি ভেবেই
তোমার বাড়ির পিছন দিয়ে আলো ছড়াই
হেঁটে আসবো কদমফুল হাতে।
আজ মেঘ কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে মদের বোতলে
রাত ভ’রে এনেছি।
নির্ভেজাল অন্ধ হবো বলে
তুমি আর তুমিতে নেই-
আপনি হয়ে অন্য রংতুলিতে
এঁকে যাচ্ছো নতুন পোস্টার।
ছেলেটা আজ কবি হবে
স্বরবর্ণে বিসর্গ যুক্ত হবে।

 

 

 

 

সাদাত হোসেন মান্টো

সারারাত মান্টো পড়লে ভোর রাতে বৃষ্টি হয়
ঠান্ডা হয়ে যায় সবুজ সবজি ক্ষেত।
হঠাৎ করে দুটো দেশের মানুষ
একই ভাষায় কথা বলে
একই ভাষায় গান গায়।

দেশভাগ কখনো মানেনি পাখিরা
তারা এখনো একই ভাষায় উড়ে যায়
এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে।
তাদের উঠোন ভরা আকাশে
এখানো একই বৃষ্টি নামে।

মান্টোর কোনো দেশ নেই
মান্টো দেশভাগ বোঝে না।

 

 

 

মৃত্যু ও হিজল বন

জিরাফের মাথার উপর দিয়ে জোছনা ঘেঁষা সকাল।
বৃষ্টি হয়নি, তবুও তার রেশ চারদিকে।
এক টুকরো কান্না গড়িয়ে পড়ছে বন-বাদাড়ে।
লেবুগাছটিকে সাক্ষি রেখে বড় হচ্ছে শোক।

মৃত্যুর খুব কাছাকাছি হিজল বন।

অপরাহ্নে নিভৃতে ডাহুক হারিয়েছিল যে পথ
উড়ে উড়ে ফিরে আসেনি আর সেই হলুদ বাসায়।
হাওয়ার বিরহে নাটাই-ঘুড়ি উড়ছে না আর
সাইকেলের প্যাডেলে ভর দিয়ে শৈশব ছিন্ন হয়ে যায়।

মৃত্যুর খুব কাছাকাছি হিজল বন।

নদীতীরে বিকেলের রোদ বকুল পাতার মতো ঝরে যায়
রেল লাইনের পাশের গলিতে বসেও শোনা যায়নি ইঞ্জিনের আওয়াজ।
বিকল যন্ত্রের মতো পড়ে থাকে একগুচ্ছ লবণাক্ত স্মৃতি।
লণ্ঠন ঝরে লটকন ফল বাউলা বাতাসে টক টক করে পড়ে।

মৃত্যুর খুব কাছাকাছি হিজল বন।

 

 

 

গন্তব্য : তোমার উঠান

শীতকালের উঠানে শতসিদ্ধ প্রজাপতিরা আসে
আর আতাফলেরা তোমাদের বাড়ির বাগানে
নোঙর করে রোদ পোহায়।
ঠিক বুধবার দেখা হবে বলে সাদা সাদা
জটিলতা নিয়ে সফেদা গাছের পাশে
দাঁড়িয়ে থাকি রঙিন নাটাই নিয়ে।
উড়ে যায় বক, ধানক্ষেতের সাথে সবুজ যৌনতা নিয়ে
পীত বর্ণের আঙুল থেকে ধোঁয়া উড়ছে যখন-
পিঙ্গল মাছের পিঠ থেকে মশলার গন্ধ।
আমিএগিয়ে যাই শীতকালের উঠানে
বাড়ি যাওয়া হয় না আমার,
ঘুরেফিরে কেবল মুসাফির হই তোমার উঠানে।

 

 

 

সেইসব দিন

যেদিন আমরা প্রথম অন্য রঙের পানির বোতল ধরেছিলাম
সেদিন থেকে আমাদের চুল উসকোখুসকো হতে শুরু করলো
আমাদের হাতে খেলা করলো সোনালি বালা
ঠোঁটে কবে যেন টের পেলাম, ধোঁয়ার অস্তিত্ব
আর- আমরা কেবলই বড় হতে থাকি।
প্রতিবেশীর বারান্দায় আলো জ্বললেই
আমাদের অংক ভুল হতে থাকে-
আমরা দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করতে থাকি
কোলবালিশ আমাদের প্রিয় বন্ধু মনে হতে থাকে
পৃথিবী থেকে সকালবেলা হারিয়ে যেতে থাকে
গভীর রাত পর্যন্ত আলো পাহারা দিই।
অবলীলায় আমাদের শার্টের বোতাম খুলে যেতে থাকে
আমরা লাল চোখ ভালোবাসি।
গভীর রাতে বাড়ি ফিরতে আমাদের ভালো লাগে
আমরা বড় হই, নষ্ট হই, নিঃস্ব হই।
আর-ধীরে ধীরে শৈশবের বন্ধুটিকে হারিয়ে ফেলি।

 

 

প্রচ্ছদ শিল্পী : বিধান সাহা

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত