বিরল প্রতিভাধর অন্নপূর্ণা দেবী ও রবিশঙ্কর

আজ ২৩ এপ্রিল। বিরল প্রতিভাধর অন্নপূর্ণা দেবীর জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তাঁকে।

[রবিশঙ্করের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে। তবে এ বিষয়ে অন্নপূর্ণা দেবী একবারই মুখ খুলেছিলেন, সেটা ২০০০ সালের আগস্টে। মেন’জ ওয়ার্ল্ডের জন্য একটি লিখিত সাক্ষাৎকারে তিনি রবিশঙ্করের সঙ্গে তার টানাপড়েন নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারগ্রহীতার নাম উদ্ধার করা যায়নি। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশের অনুবাদ করেছেন এসএম রশিদ।]

 

আগস্ট, ২০০০। রবিশঙ্করের প্রথম স্ত্রী, একাকী, সুরবাহার বিশারদ অন্নপূর্ণা দেবী ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। এ সাক্ষাৎকারে তিনি অসুখী বিবাহিত জীবন এবং তাদের ছেলে শুভর ট্র্যাজিক জীবন সম্পর্কে অনেক অজানা কথা বলেছেন। এটি আধুনিক যুগের এক বিরলপ্রজ আধ্যাত্মিক সংগীতজ্ঞের অনন্য, অবিস্মরণীয় গল্প।

হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিকাল সংগীতের দুনিয়ায় অন্নপূর্ণা দেবীর প্রতিভা এবং খোদ ব্যক্তি হিসেবে তিনি এক রকম কিংবদন্তি। তিনি মহান ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কন্যা, ওস্তাদ আলী আকবর খানের বোন এবং তার এককালের স্বামী পণ্ডিত রবিশঙ্কর। কিন্তু এতসব বিখ্যাত মানুষের নিকটাত্মীয় হয়েও সুরবাহার ও সেতারের দক্ষতায় তিনি জীবন্ত এক সূচক।

ট্র্যাজেডি হচ্ছে, তার সংগীত সবই দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

চার দশক আগে রবিশঙ্করের সঙ্গে এক ঝামেলার পরিপ্রেক্ষিতে অন্নপূর্ণা দেবী শপথ নিয়েছিলেন যে তিন আর কখনো সেতার বা সুরবাহার বাজাবেন না। তার পর থেকে তিনি দৃশ্যত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করছেন, মুম্বাইয়ের বাসা থেকে বের হন না বললেই হয়। তার বয়স এখন ৭৪ বছর, কিন্তু সারা জীবনে তিনি কোনো রেকর্ডিং করেননি। প্রায় ৫০ বছর হলো বাইরের কোনো মানুষ তার চেহারা দেখেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম জর্জ হ্যারিসন। ১৯৭০-এর দশকে তিনি একবার অন্নপূর্ণার দেখা পেয়েছিলেন এবং তার রেওয়াজ শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে সেটা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুরোধে। অন্নপূর্ণা দেবীর দক্ষতা হয়তো তার ছাত্রদের সাফল্যে টিকে আছে। এ ছাত্রদের মধ্যে আছেন ভারতের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের অনেকে, যাদের মধ্যে আছেন নিখিল ব্যানার্জি, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, নিত্যানন্দ হলদিপুর, বসন্ত কাবরা, অমিত ভট্টাচার্য ও অমিত রায়।

সমাজ থেকে অন্নপূর্ণা দেবীর বিচ্ছিন্নতা এমন মাত্রায় ছিল যে তিনি এমনকি কারো সঙ্গে ফোনেও কথা বলতেন না। একবার তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং সেটা তার ছাত্রদের মাধ্যমে। এ সাক্ষাৎকারের জন্য তিনি বর্তমান লেখককে তার বাসায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন কিন্তু সামনাসামনি বসে কোনো কথা বলেননি। তিনি লিখিতভাবে তাকে দেয়া প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন। অনেক বিষয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে কথা বলেছেন রবি শঙ্করের লেখা আত্মজীবনী রাগমালায় তিনি যেভাবে তাদের বিয়ে ও একমাত্র পুত্র শুভর মৃত্যুকে বর্ণনা করেছেন সে বিষয়ে।

তিনি একপর্যায়ে বলে ওঠেন, ‘আমি আমার বৈবাহিক জীবনে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কিত মিথ্যা ও রঙ চড়ানো গল্পগুলো সম্পর্কে অবগত। …আমার মনে হয় পণ্ডিতজি তার পরিমিতিবোধ বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন অথবা তিনি একজন প্যাথলজিকাল মিথ্যাবাদীতে পরিণত হয়েছেন।’

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের আকাশগঙ্গা অ্যাপার্টমেন্টের ছয়তলায় অন্নপূর্ণা দেবীর ফ্ল্যাট। দরজায় তার নামফলক দেখা যাচ্ছিল, আরেকটি নোটিস লাগানো ছিল, যেখানে লেখা রয়েছে— ‘অনুগ্রহ করে তিন বার বেল বাজাবেন। কেউ সাড়া না দিলে দয়া করে আপনার কার্ড বা বার্তাটি রেখে যান। সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ।’ আমি প্রথমবার বেল বাজাতেই হাসিমুখে দরজা খুলে দিলেন রুশিকুমার পান্ডেয়া (তিনি সবসময়ই হাসিমুখে থাকেন, লিফটম্যান আগেই আমাকে জানিয়েছিল)। পান্ডেয়া মন্ট্রিল কলেজের মনস্তত্ত্বের শিক্ষক, ১৯৮০-এর দশকে মুম্বাই এসেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে সংগীতের তালিম নিতে এবং আর কখনো ফিরে যাননি। তিনি ১৯৮৪ সালে তাকে বিয়ে করেন। বেশির ভাগ দর্শনার্থী তার কক্ষের পর আর বাড়ির ভেতরে যেতে পারেন না। আর তার ঘরটি সদর দরজার ঠিক পাশেই। তবে সে রাতে অন্নপূর্ণা দেবীর এক ছাত্র, অতুল মার্চেন্ট আমাকে বাড়ির ‘নিষিদ্ধ এলাকা’য় নিয়ে গেল। আমরা রান্নাঘরের পাশ কাটিয়ে গেলাম, তিনি সেখানে নিজেই রান্না করেন এবং ধোয়ামোছা করেন। তিনি বাসায় কোনো চাকর রাখেন না। অতুল জানাল, রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকলেও তার কান সর্বদা সতর্ক থাকে, ড্রইংরুমে ছাত্ররা কী বাজাচ্ছে, সেটা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কোনো কিছুই তার কান এড়িয়ে যেত না। একদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে অতুল বলতে লাগলেন, “একদিন সরোদবাদক বসন্ত কাবরা রাগ ভৈরব অনুশীলন করছিলেন। আমরা বসন্তের পাশে বসে থেকেও কোনো ভুল ধরতে পারিনি। তারপর হঠাৎ মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘নিশাদ কি তরফ বেসুরা হ্যায়, সুনাই নেহি দেতা কেয়া’?”

সোজা এগিয়ে গেলে একটা দরজা, যেটা বন্ধ। ‘মা ধ্যান করছে’— অতুল জানাল। সে আমাকে ড্রইংরুম কাম তালিম রুমে নিয়ে গেল। এপাশের দেয়ালঘেঁষে নানা আকারের সেতারের সারি। ড্রইংরুমের স্লাইডিং ডোর খুললে আরব সাগর দেখা যায়। কক্ষের মাঝে ছেঁড়াখোরা একটা চাটাই। ‘এখানেই দক্ষিণামোহন ঠাকুর, নিখিল ব্যানার্জি, আশীষ খান, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, নিত্যানন্দ হলদিপুর, বসন্ত কাবরাসহ মায়ের সব ছাত্র বসে তার কাছে শিক্ষা নিয়েছে। আর এ শেখানোর সময় মা এই বেতের চেয়ারে বসেন।’ এ বাড়িতে প্রবেশের পর যে কেউ তত্ক্ষণাৎ বুঝতে পারবে যে এখানে অস্বাভাবিক নীরবতা বাজছে। ঘরের চারদিকে আলাউদ্দিন খাঁর ছবি এবং ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি। এক কোণে রাখা একটা ছোট ফ্রেমে বাঁধাই করা স্কেচের দিকে আমার দৃষ্টি আটকে গেল। ‘ওটা অল্প বয়সে শুভ এঁকেছিল’— অকুল জানাল। স্কেচটা সম্মোহনী। কালো রঙের অনেকগুলো দরজা আপনাকে তাদের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে। এটা ভুতুড়ে। শুভ ছিলেন অন্নপূর্ণা ও রবি শঙ্করের ছেলে, যিনি ১৯৯২ সালে অকালে মারা যান।

বিয়ের পরপর রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার ঘরে শুভেন্দ্র শঙ্করের জন্ম, ১৯৪২ সালের ৩০ মার্চ। জন্মের আট সপ্তাহের পর তার একটি শারীরিক সমস্যা ধরা পড়ে। অবশ্য এক মাসের মধ্যেই শুভ সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর শুভ রাতে জেগে থাকত এবং যথারীতি কান্নাকাটিও করত। ফলে শুভর এ রাতজাগার অভ্যাসের কারণে তার মা-বাবার রাতে ঘুমাতে অসুবিধা হতো। রবিশঙ্কর তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “…সেই সমস্যার কারণে শুভর রাতে না ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি হলো। এটা পরের এক বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। ধীরে ধীরে আমি অন্নপূর্ণার ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসতে দেখি। আমাদের দুজনেরই প্রচণ্ড পরিশ্রম যাচ্ছিল এবং মেজাজও চড়ে যাচ্ছিল। সে সময় আমার পক্ষে বোকামি বা ফালতু বিষয় সহ্য করাটা সম্ভব ছিল না এবং প্রায়ই আমরা একে অন্যের ওপর রেগে উঠতাম। আমি বিষয়টা আগে কখনো বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝলাম, সে তার বাবার চড়া মেজাজ পেয়েছে। সে একদিন আমাকে বলে ফেলল— ‘তুমি আমাকে কেবল সংগীতের জন্য বিয়ে করেছ! তুমি আমাকে ভালোবাসো না!’ আমি অন্য কোনো নারীর সঙ্গে কথা বললেই সে ভয়ানক ঈর্ষায় ভুগত। যখনই আমি অন্য কোনো শহর থেকে কোনো প্রোগ্রাম করে ফিরতাম তখন সে বলত ওই শহরের কোনো মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেম চলছে। এটা ছিল পাগলামির মতো।”

শুভ এর মধ্যে পেইন্টিংয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছিল এবং তার জন্য একজন গৃহশিক্ষক রাখা হলো। আর বাবার কাছে শুভ সেতার শিখত। এরপর পুরো পরিবার মুম্বাই চলে যায়। শুভর বাবা তখন বিরাট তারকা এবং সবসময় ব্যস্ত। হয় কনসার্ট নয়তো সিনেমার জন্য রেকর্ডিং, তাই এবার তার সংগীতশিক্ষার ভার পড়ল তার মা অন্নপূর্ণা দেবীর ওপর। মুম্বাইয়ে গিয়ে রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার সম্পর্ক বিচ্ছিরি চেহারা ধারণ করল, যখন অন্নপূর্ণা আবিষ্কার করলেন রবিশঙ্করের সঙ্গে নৃত্যশিল্পী কমলা শাস্ত্রীর (পরবর্তীতে চক্রবর্তী) সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিপর্যস্ত অন্নপূর্ণা শুভকে নিয়ে মাইহারে বাবার বাড়িতে চলে যান। পরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে কমলার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরই অন্নপূর্ণা রবির সংসারে ফিরে যান। কিন্তু এরপর রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণার সম্পর্ক আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। ১৯৫৬ সালে অন্নপূর্ণা দুই বছরের জন্য রবির ঘর ছেড়ে যান এবং ১৯৬৭ সালে তারা আলাদা হয়ে যান।

এ সবকিছুর মধ্যেও মায়ের কাছে শুভর রেওয়াজ নিয়মিতই ছিল। অন্নপূর্ণার কঠোর শিক্ষা এটা নিশ্চিত করেছিল যে শুভ দীর্ঘ আলাপ বাজাতে দক্ষতা অর্জন করবে। শুভ সপ্ততানও আয়ত্ত করেছিল। উল্লেখ্য, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এটা রবিশঙ্কর ভালো বাজাতে পারতেন না।

পণ্ডিতজি (রবিশঙ্কর) কীভাবে পুত্রের এ প্রতিভার কথা জেনেছিলেন। একদিন রবিশঙ্কর মুম্বাইয়ের একটি রেকর্ডিং স্টুডিওতে অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি হঠাৎ সেতারের বাজনা শুনতে পান। রবিশঙ্কর অবাক হয়েছিলেন, কারণ যে সুর ভেসে আসছিল, সেটা তার শ্বশুর আলাউদ্দিন খানের তৈরি করা এবং নিখিল ও রবি ছাড়া সেটা তেমন কেউ বাজাতে পারত না। রবিশঙ্কর জানতে চাইলেন, কে বাজাচ্ছে? তখন পাশের লোকজন হেসে বলল, ‘পণ্ডিতজি নিশ্চয়ই আপনি মজা করছেন! আপনার নিজের ছেলে বাজাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছেন না। রবিশঙ্কর তখন ছেলেকে এক হোটেলে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এক মঞ্চে বাজানোর প্রস্তাব দিলেন।

বাবার ক্যারিশমা ও পশ্চিমের হাতছানি শুভর চোখ ধাঁধিয়ে দিল। মায়ের কঠোর জীবনযাপন রীতি ও শিল্পশিক্ষায় শুভ হাঁফিয়ে উঠেছিল। তাই শুভ বাবার সঙ্গে আমেরিকা যেতে চাইল। অন্নপূর্ণা স্টেজে পারফর্ম করার আগে শুভকে তালিম শেষ করতে বললেন। কিন্তু রাজি হলো না। চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে অন্নপূর্ণা ছেলেকে ছয় মাসের পরিশ্রমসাধ্য তালিমের কথা বললেন এবং এটাও জানালেন যে এ ছয় মাস পর শুভ যেখানে খুশি যেতে পারে। কিন্তু শুভ একগুঁয়ে, সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইল। এ সময়ই অন্নপূর্ণার কুখ্যাত ‘ঘুমের ওষুধ খাওয়া’র ঘটনাটি ঘটেছিল। রাগমালায় পণ্ডিত রবিশঙ্কর লিখেছেন, “১৯৭০-এর শুরুর দিকে আমি মুম্বাইয়ে থাকতাম। একদিন আমার হোটেলকক্ষে শুভর কাছ থেকে জরুরি কল পেলাম। ক্ষীণ কণ্ঠে সে আমাকে তাদের বাসায় যেতে বলে এবং তাকে আমার সঙ্গে নিয়ে আসার কথা বলে। কী হয়েছে আমি কিছুই জানতাম না, তবে ওর কণ্ঠের স্বরে আমি ভীত হয়ে পড়েছিলাম। তত্ক্ষণাৎ মালাবার হিলে ওদের ফ্ল্যাটে ছুটে গেলাম। শেষ সাড়ে তিন বছরে আমি সেখানে যাইনি। গিয়ে দেখলাম শুভ শুয়ে আছে এবং তাকে অসুস্থ দেখাচ্ছে। ছোট্ট শিশুর মতো সে আমাকে নিজের সঙ্গে তাকে আমেরিকা নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। কারণ সে তার মায়ের গরম মেজাজ ও কঠোরতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। ২৮ বছরের ছেলের মুখে এমন ধরনের কথা শুনে আমার খুব মন খারাপ এবং একই সঙ্গে মেজাজ গরম হয়। অন্নপূর্ণা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘ওকে (শুভ) নিয়ে যাও। আমি আর ওকে রাখতে চাই না।’ আমি কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইনি, তাই মেজাজ খারাপ হলেও কিছু বলিনি। আমরা দুজন সেখান থেকে চলে আসার পর জানতে পারি যে আত্মহত্যা করতে শুভ ৮/১০টা ঘুমের ঔষধ খেয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে সময়মতো ডাক্তার এসে শুভর পেট খালি করে।” বহু বছর ধরে এটাই ছিল ঘটনার আনুষ্ঠানিক বিবরণ।

কিন্তু এবারই প্রথম অন্নপূর্ণা নিজে ঘটনাটি নিয়ে কথা বললেন। মেন’জ ওয়ার্ল্ডকে দেয়া এ সাক্ষাৎকারে তিনি রবিশঙ্করের প্রতি নির্দয় ছিলেন। ‘আমি আমার বৈবাহিক জীবনে কী ঘটেছে সে সম্পর্কিত মিথ্যা ও রঙ চড়ানো গল্পগুলো সম্পর্কে অবগত।’ অন্নপূর্ণা বললেন,

“আমি বিষয়গুলো নিয়ে নীরব ছিলাম, কারণ বাবা এতদিন জীবিত ছিলেন। আমি তাকে কষ্ট দিতে চাইনি। তাই অন্যায় আর দুর্দশা সহ্য করেও চুপ ছিলাম। কিন্তু এখন আমার মনে হয় দুনিয়ার মানুষের আমার কথাগুলো শোনা প্রয়োজন, অন্তত শুভ সম্পর্কিত অংশটি। …আমার মনে হয় পণ্ডিতজি তার পরিমিতিবোধ বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন অথবা তিনি একজন প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি একটি ইংরেজি প্রবাদ সত্য প্রমাণ করেছেন: ‘বুড়ো বলদের মতো বড় বলদ আর কেউ নয়।’ ভালো হতো যদি তিনি এসব ভণ্ডামি না করে নিজের শিষ্যদের শিক্ষা দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এতে শিষ্যরাও তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এবং ভারতে নতুন নতুন সংগীত প্রতিভার দেখা পাওয়া যাবে।

যে বছর পণ্ডিতজি মুম্বাই এলেন, তিনি তখনই জানতেন যে শুভ খুব ভালো বাজাচ্ছে। তিনি একদিন শুভকে ডেকে নিয়ে তার বাজানো শুনলেন। এবং শুভর শৈল্পিক দক্ষতাকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে তার সঙ্গে মঞ্চে পারফর্ম করার প্রস্তাব দিলেন। পণ্ডিতজির চ্যালা-চামুণ্ডারা বলল, শুভ একেবারে তৈয়ার (প্রস্তুত)” এবং সে যেকোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারবে। তাই তার উচিত বাবার সঙ্গে ট্যুরে যাওয়া। শুভর বয়ান অনুযায়ী পণ্ডিতজি বলেছিলেন, ‘তোমার মা এবং আমি একই গুরুর কাছে তালিম নিয়েছি, তাই আমিই তোমাকে শিক্ষা দিতে পারব।’ আমার জবাব ছিল, ‘তার কথা ঠিক কিন্তু ছেলেকে তালিম দেয়ার সময় তার হাতে নেই। তুমি দয়া করে এখানেই থাকো। আর দেড় বছর তালিম নিলেই তোমার শিক্ষা সমাপ্ত হয়ে যাবে। এরপর তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো। আমি তোমাকে আটকাব না কারণ, তখন তুমি নিজেই দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে পারবে।’

অন্নপূর্ণা দেবী বলে চললেন, ‘‘ঠিক এমন সময়ই পণ্ডিতজি এবং শুভ একসঙ্গে মিলে শুভর ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পরিকল্পনাটি তৈরি করে। এটা ছিল আমাকে দুর্নাম করা এবং শুভকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা পরিকল্পিত নাটক। শুভ সে সময় যথেষ্ট পরিণত মানুষ ছিল না, তাই সে অনিচ্ছাতেই তার বাবার পরিকল্পনার অংশ হয়ে যায়। আমার ধারণা পরবর্তীকালে শুভ এটা বুঝতে পেরেছিল এবং তার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। শুভর মৃত্যু ছিল অকাল এবং সম্ভবত প্রতিরোধযোগ্য। সে সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা এবার খুলে বলতে চাই। আমাকে যখন জানানো হলো যে শুভ ঘুমের ওষুধ খেয়েছে, আমি তত্ক্ষণাৎ একজন ডাক্তার ডাকলাম। ডাক্তার শুভকে পরীক্ষা করে নিশ্চিত জানালেন কোনো সমস্যা নেই। আমরা ঘরে কোনো খালি ওষুধের বোতল খুঁজে দেখলাম কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। এবং তখন পরিকল্পনামতো শুভ তার বাবাকে ফোন করে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন পণ্ডিতজির কাছে আমার একটিই অনুরোধ ছিল ‘আপনি আমার জীবন ধ্বংস করেছেন আর এখন নিজের ছেলের জীবন শেষ করছেন। কেন?’’ তার একমাত্র জবাব ছিল, ‘শুধু তোমার জন্য।’

‘আজ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারিনি কেন তিনি শুভর তালিম শেষ করতে দিলেন না। সে সময় কথা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, শুভ ভবিষ্যতে পণ্ডিতজির থেকে ভালো বাজাবে এবং এটা হবে পণ্ডিতজির ওপর আমার প্রতিশোধ। হয়তো এ কারণেই পণ্ডিতজি এমনটা করেছিলেন। আমি জানি না মানুষ কীভাবে এমন চিন্তা করতে পারে। শুভ বা অন্য যে কেউ যদি ভালো সংগীতজ্ঞ হয়ে ওঠে, তাহলে তার সব কৃতিত্ব বাবার। আমাদের সংগীত তার দেয়া উপহার।’

‘আমি জানি পণ্ডিতজি নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে খুব সচেতন। তার হয়তো মনে হয়েছে আমার ওপর সম্প্রতি প্রকাশিত বইটি তার ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন করেছে। তাই তার লেখাটা তার ভাবমূর্তি উদ্ধারের এবং তার ছেলের প্রতি তিনি যে অবিচার করেছেন, সেই অপরাধকে প্রশমিত করার একটা চেষ্টা। শুভ এটা তার জীবনের শেষ মাসগুলোয় এসে বুঝতে পেরেছিল এবং তার বাবার মুখ দেখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। শুভ একজন বড় মাপের শিল্পী হতে পারত। সে তার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তার তালিম শেষ করতে পারলে শুভ অসাধারণ বাজাতে পারত। কিন্তু নানা ধরনের ঘটনা সেটা হতে দিল না।’

‘বিস্ময়কর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শুভ আমেরিকায় তার কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা ছুঁতে পারেনি। আমেরিকা পৌঁছার এক সপ্তাহের মধ্যে তার বাবা তাকে একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্ট এবং একটা ফোর্ড মাস্টাংয়ের মধ্যে বেঁধে ফেলে। এবং দুই বছরের মধ্যে সে নিউইয়র্কের মর্যাদাপূর্ণ কারনেগি হলে বাজায়। কিন্তু ধীরে ধীরে সে সেতারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শুভর মধ্যে দৃঢ় সংকল্প ছিল না। কিছুদিনের মধ্যে সে জাংক ফুড এবং কোকা-কোলায় আসক্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের প্রয়োজন মেটাতে তার মর্যাদার সঙ্গে বেমানান ছোট কাজ করা শুরু করে। এমনকি টাকার জন্য একবার সে একটা মদের দোকানেও কাজ করে। সে আট বছর সেতার বাজানো বন্ধ রেখেছিল। সে লিন্ডাকে বিয়ে করে এবং তাদের দুটি সন্তান হয়— সোম ও কন্যা কাবেরী।’

আট বছর পর শুভ আবার সেতার বাজাতে শুরু করেন এবং একটি কনসার্টে অংশ নিতে ভারতে ফিরে আসেন। এটাই ছিল তার শেষ ভারত সফর। তিনি তার মায়ের সঙ্গেও দেখা করেন। সুরেশ ব্যাস নামে অন্নপূর্ণা দেবীর এক ছাত্র মা-পুত্রের সেই সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘‘শুভ এলেন এবং মাকে প্রণাম করলেন। তার মা বললেন, ‘শুভ, এসো, এসো। তোমার সন্তানরা কেমন আছে? তোমার স্ত্রী?’  এভাবে ২ মিনিট কাটার পর শুভ বলে উঠলেন, ‘মা, আমি শিখু (আমি শিখতে চাই)।’ তিনি জবাবে বললেন, ‘ভালো। তোমার সেতারটা এখনো এখানেই আছে। নিয়ে বসে পড়ো।’ মা আবার সন্তানকে শেখাতে শুরু করলেন, যেন কিছুই হয়নি। অথচ সেদিন মা আর পুত্রের দেখা হয়েছে ২০ বছর পর।’’

সমালোচক মদনলাল ব্যাস স্মৃতিচারণ করেন, ‘১৯৯০ সালে পুনেতে বাবা ও ছেলে আবার একত্রে বাজালেন। কিন্তু জানা গেল সেদিন শুভ বেসুরে বাজিয়েছিল। কিন্তু আমি পরে অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং শুনেছি এবং তাতে খবরটা একেবারে মিথ্যা মনে হলো। কিন্তু খবরটা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। আমার মনে হয় শুভকে বিপর্যস্ত করে দিতেই এটা করা হয়েছিল। তার মাইক্রোফোনে ত্রুটি করা হয়েছিল বলেও শোনা যেতে লাগল। কাছাকাছি সময়ে আমি তাকে একটা প্রাইভেট কনসার্টে রাগ দেস বাজাতে শুনেছিলাম। এত সুন্দর আমি কাউকে বাজাতে শুনিনি। সেদিন সে জানিয়েছিল সেই সকালেই সে এটা তার মায়ের কাছে শিখেছিল!’

সেই বেসুরো বাজানোর গুজব শুভকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। অনেকেই তাকে ভারতে থেকে মায়ের কাছে তালিম পূর্ণ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু শুভ বলেন, দেরি হয়ে গেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে শুভ সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ১৯৯২ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর ব্রঙ্কিয়াল নিউমোনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে শুভর মৃত্যু হয়।

অন্নপূর্ণা দেবী ও রবিশঙ্করের ডুয়েটঃ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত