অন্তর্লীনা

(এই গল্পের স্থান,কাল,পাত্র সবই কাল্পনিক। গল্পের প্রয়োজনে ভগবান তথাগতের চরিত্রের অবতারনা হলেও ঘটনাক্রম সম্পূর্ণ কাল্পনিক)

পর্ব – ১

সুশ্রোতা নদীর উত্তর তট ঘেষে সুবিশাল বিক্রমবিহার রাজ্যের সীমানা শুরু। মহারাজ অনঙ্গবর্ধন সুশাসক,প্রজাদরদী,বিচক্ষণ রাজা।রাজ্যাভিষেকের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই রাজা হিসেবে নিজের ক্ষমতা তিনি প্রমান করেছেন।প্রজারা মহারাজকে মান্য করে,ভালবাসে।মহারাজ নিজে সুপুরুষ, বলবান,শক্তিশালী, কিন্তু কোমলহৃদয় ব্যক্তি।

রাজ্যাভিষেকের আগেই পিতৃবন্ধু মালব্য রাজার কন্যা শুচিপ্রিয়াকে বিবাহ করেন অনঙ্গবর্ধন পিতার ইচ্ছানুসারে। শুচিপ্রিয়া সুন্দরী, গুনবতী।বংশপরিচয় ও রূপের নিরীখে বিচার করলে রাজমহিষী হবার সম্পূর্ণ উপযুক্ত। কিন্তু বড্ড ছেলেমানুষ। যৌবনে পদার্পন বকরলেও শৈশব যেন তাকে ছেড়ে যায় নি এখনও।মালব্যরাজের অধিক বয়সের সন্তান রাজকন্যা শুচিপ্রিয়া জ্যেষ্ঠ পাঁচ ভাইয়ের আদরের একমাত্র বোন।তার ফলে সবার মাত্রাতিরিক্ত স্নেহের তলায় চাপা পরে তার ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হবার সুযোগ পায়নি যেন।কিছুটা আবেগবর্জিত তিনি।

অনঙ্গবর্ধন প্রেমিক স্বামী।স্ত্রীকে তিনি স্নেহ করেন।স্ত্রীর ইচ্ছা অনিচ্ছার মর্যাদা দেন।শুচিপ্রিয়ার কাছে সংসার,রাজত্ব সবই যেন পুতুল খেলা।তিনি তার চারপাশে নিজের মত করে একটি জগৎ রচনা করে নিয়েছেন।সেই জগতে তিনি সম্রাজ্ঞী। তাঁর সঙ্গিনী,পরিচারিকাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন তিনি সদাসর্বদা।স্বামীর প্রতি তাঁর মনোভাব বোঝা দুষ্কর। হয়তো ভালোবাসেন,নির্ভর করেন।কিন্তু তার প্রেমিকাসত্ত্বার পরিস্ফুটন হয়তো এখনো সেভাবে হয়নি,অন্তত অনঙ্গবর্ধন তেমনটাই অনুভব করেন।রাজপরিবারের নিয়মানুসারে মহারাজ একাধিক দারপরিগ্রহ করতে পারেন।কিন্তু অনঙ্গবর্ধন অন্য ধাতুতে গড়া।পিতার একধিক বিবাহের ফলে তাঁর মাতা মহারানী কনকমল্লিকার প্রতি পিতার অবহেলা শৈশব থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি।একাধিক নারীসঙ্গকে অধর্ম মনে করেন।

মহারানী শুচিপ্রিয়ার সমস্ত আবদার কিন্তু স্বামীর কাছেই।মহারানীর কাছে জাগতিক বস্তুমুল্য অধিক।হৃদয়ের অতলে তলিয়ে দেখার প্রয়োজনিয়তা তিনি অনুভব করেননা।দোষ তাঁকেও দেওয়া যায় না।জন্ম থেকেই তিনি শুধু হাত পেতে নিতেই শিখেছেন।অযাচিত ভালোবাসা পেয়েছেন অকুন্ঠ্য।পরিবর্তে কেউ কিছু দাবী করেনি তাঁর থেকে।তিনিও কিছু ফিরিয়ে দেবার তাগিদ অনুভব করেননি।মহারানী জেনেছেন শুধু পাওয়াতেই তার অধিকার।

প্রকৃতির নিয়মে মাতৃত্ব এসেছে তাঁর।শিশু পুত্র সৌরিন্দ্রবর্ধন ধাত্রীমাতা ও পরিচারিকাদের কাছেই পালিত হয়।শিশুহৃদয় কিন্তু মাকে ঠিকই চেনে।ছুটে ছুটে আসে মাএর কাছে একটু স্নেহের প্রত্যাশায়।কিন্তু মহারানী শুচিপ্রিয়ার মাতৃহৃদয়ও বড় কৃপন।তার অবাধ জীবনে সন্তান সাক্ষাত ছন্দপতন।অনঙ্গবর্ধন আশা করেছিলেন,সন্তানজন্মের পর হয়তো শুচিপ্রিয়ার পরিবর্তন হবে।কিন্তু তা হয়নি।মহারাজ নিজে রাজকার্যে ব্যস্ত থাকেন।কিন্তু শিশু সৌরিন্দ্র তাঁর হৃদয় জুড়ে থাকে।সন্তানের প্রতি স্নেহের ব্যকুলতা অনুভব করেন তিনি।আহা,এতবড় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার, মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের একমাত্র পুত্র সে,জন্মাবধি মাতৃস্নেহবঞ্চিত।মা থেকেও নেই তার।মহারাজের কোমল হৃদয়ে বড় বেদনা বাজে।

এভাবেই দিন বয়ে যায়।কিন্তু একজন রাজার তো রাজধানীতে বসে থাকলে চলেনা।একদিন দূত মারফত খবর পান প্রতিবেশি রাজ্য অমরাবতী নিঃশব্দে সীমান্ত সম্প্রসারণ করছে।অমরাবতী তার পিতার আমলে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল।সেই সম্পর্কই বজায় ছিল এ যাবত।কিন্তু অনঙ্গবর্ধনের বিবাহকে কেন্দ্র করে অশান্তির সূত্রপাত হয়।অমরাবতী রাজ্যের রাজকন্যা সুচিত্রার সাথে সম্বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে দূত এসেছিলো তাঁর দরবারে।উদ্দেশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ককে পারিবারিক সম্পর্কে পরিবর্তন। কিন্তু অনঙ্গবর্ধনের পিতা মহারাজ অনন্তবর্ধন সেই সম্পর্ককে নাকচ করে দেন তৎক্ষনাৎ। কারণ,প্রতিবেশী রাজ্য তুলনায় ক্ষুদ্র।সম্পর্ক হয় সমানে সমানে।মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের নিজস্ব কোন মতামত ছিল না।পিত্রাদেশ শিরোধার্য করে তিনি রাজকন্যা শুচিপ্রিয়াকে পত্নীত্বে বরণ করেন।

সীমান্তে গোলযোগের সংবাদ পেয়ে মহারাজ অমরাবতীতে দূত পাঠালেন।পত্রপাঠমাত্র এই অন্যায় ভুমিসম্প্রসারন বন্ধ করে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা দাবী করলেন।নচেত যুদ্ধ অবধারিত। যুদ্ধ মানে অর্থক্ষয়,লোকক্ষয়।কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিকল্প কোন পন্থা নেই।দূত এসে জানালো এক ছটাক ভুমিও প্রত্যাবর্তন করবেন না তাঁরা
জানিয়েছেন। পারলে মহারাজ অনঙ্গবর্ধন যুদ্ধ করে ফিরিয়ে নিন ভূখন্ড।

মহারাজ বুঝলেন এই যুদ্ধ আর এড়ানো সম্ভবপর নয়।ক্ষত্রিয় পুরুষ তিনি।রাজরক্ত উত্তপ্ত হতে সময় লাগে না।শুধু একটাই দ্বিধা।তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজপুত্রের কি হবে?যত্নের ত্রুটি তার হবে না তা তিনি জানেন।কিন্তু মাতৃস্নেহবঞ্চিত শিশুটি পিতাঅন্তপ্রাণ।সৌরিন্দ্রর বড় কষ্ট হবে।কিন্তু পুত্রস্নেহের দুর্বলতাকে মনে স্থান দিয়ে রাজকর্তব্যে অবহেলা করার মানুষ তিনি নন।যেতে তাঁকে হবেই।প্রজারাও তাঁর সন্তানসম।একজন রাজার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য প্রজাপালন। মহারাজ সিদ্ধান্ত নিলেন।

মহারানী শুচিপ্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না।কোন দুঃখ,দুশ্চিন্তা বা বিরহের চিহ্ন দেখা গেল না তার অভিব্যক্তিতে।না হল কোন ভাবান্তর।স্বামী মানুষটির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি যেন তার জীবনে মূল্যহীন।মাঝেমধ্যে অনঙ্গবর্ধনের আজকাল সন্দেহ জাগে মহারানীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে।কি করে কোন মানুষ এতটা অনুভুতিহীন হতে পারে।কিন্তু এসব নিয়ে ভাবনার সময় এখন নয়।রাজপুত্রের যথাযোগ্য ব্যবস্থা করে মহারাজ যুদ্ধযাত্রা করলেন।

পর্ব -২

মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের যুদ্ধযাত্রার পর পক্ষকাল গত হয়েছে।সীমান্তে শত্রুদমন করতে মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের মত বীর ও তাঁর শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বেশি সময় লাগেনি।অমরাবতী পরাজয় স্বীকার করে সন্ধিপ্রস্তাব পাঠিয়েছে। মহারাজকে অনুরোধ করেছে আতিথ্যগ্রহণের।অনঙ্গবর্ধন বন্ধুবৎসল মানুষ।তিনিও পুরোন শত্রুতা জিয়িয়ে রাখতে চাননা।তিনি অমরাবতীরাজের আতিথ্যস্বীকার করেছেন।

সপ্তাহকাল অমরাবতীতে অতিবাহিত করে অনঙ্গবর্ধন মুগ্ধ তাদের সৌজন্য ও আতিথেয়তায়।ছোট হলেও সুন্দর সুসজ্জিত রাজধানী, পরিচ্ছন্ন নগর, পথপার্শ্বে চিরহরিৎ বৃক্ষের সারি।অনঙ্গবর্ধন মুগ্ধ।অমরাবতীরাজ প্রৌঢ় হয়েছেন।জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র কিঞ্চিৎ জড়বুদ্ধিসম্পন্ন,তাই সিংহাসনের অনুপযুক্ত। কনিষ্ঠ রাজপুত্র এখনও নাবালক,বয়োপ্রাপ্ত হলে সেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে।রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ নিজে রাজ্যশাসন করেন।তাঁকে রাজকার্যে সাহায্য করেন রাজকন্যা সুচিত্রা।এই সেই রাজকন্যা সুচিত্রা, যার সাথে অনঙ্গবর্ধনের বিবাহপ্রস্তাব তাঁর পিতা অপমানপূর্বক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

রাজকন্যা সুচিত্রা এখনো অনূঢ়া।কারন রাজ জ্যোতিষীর বিধান অনুযায়ী বিগত পঞ্চবর্ষ বিবাহে বৈধব্যযোগ ছিল রাজকন্যার।এই ক’দিনে সুচিত্রাকে দেখে মহারাজ অনঙ্গবর্ধন বিমোহিত হয়েছেন।না রাজকন্যার রূপে নয়,ব্যক্তিত্বে।শৈশব থেকে মহারাজের ঘনিষ্ঠ নারীসঙ্গ বলতে মা এবং স্ত্রী। রাজমাতা কনকমল্লিকা সারাজীবন ভাগ্যকে ধিক্কার না দিয়ে জলস্পর্শ করতেন না,সদা সর্বদা অসন্তুষ্ট। আর স্ত্রী শুচিপ্রিয়া তো নিজের জগতেই আছেন।কিন্তু এই রাজকন্যা সুচিত্রা? কত সহজ ও সাবলীল।সুচিত্রা পর্দানশীন নন।বিদুষী ও বুদ্ধিমতি।কি অপার দক্ষতায় পিতাকে রাজকার্য পরিচালনায় সহায়তা করেন রাজসভায় বসে।লোকলজ্জা,নারীসুলভ ব্রীড়া নেই।খাপখোলা তরোয়ালের মতন তেজস্বিনী তিনি,আবার শান্ত,নম্র,মৃদুভাষিণী।

মহারাজ অনঙ্গবর্ধন নিজে পঠনপাঠনের অনুরাগী।এই প্রাসাদের সুবিশাল গ্রন্থাগার দেখে তিনি বিমোহিত। জেনে অবাক হ’ন এই গ্রন্থাগারের অধিকাংশ বইই রাজকন্যার সংগ্রহ। বিবিধ বিষয়ে রাজকন্যা সুচিত্রার সুগভীর জ্ঞান।অনঙ্গবর্ধন নিজ হৃদয়ের অগোচরেই তুলনা করেন।শুচিপ্রিয়ার রূপ যদি সূর্য হয়,সুচিত্রা চাঁদের শান্ত মাধুর্য্য।শুচিপ্রিয়া অগ্নির তাপ হলে,সুচিত্রা ধারাবারীর কোমল শীতলতা।কখনো মনে হয়,পিতা যদি এই বিবাহপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করতেন,রাজকন্যা সুচিত্রা আজ বিক্রমবিহারের রাজমহিষী হতেন।তারপরেই নিজের হৃদয়কে শাসন করেন তিনি।ছিঃ।কি ভাবছেন এসব?

হায় রে জটিল মানবহৃদয়। যার থেকে দূরে যেতে চায়,মন আরও বেশি করে তার পানেই ধায়।মহারাজ অনঙ্গবর্ধন অবাকবিস্ময়ে দেখেন রাজকন্যা সুচিত্রা কত সহজে জ্যেষ্ঠভ্রাতার মাতৃহারা শিশু পুত্রকে অপার স্নেহসিঞ্চন করেন।কেউ দেখে অনুভব করতে পারবে না এই শিশু তার নিজের সন্তান নয়।অনঙ্গবর্ধনের হৃদয়ের পটে ভেসে ওঠে শিশু সৌরিন্দ্রের কোমল মুখ।আহা,না জানি পিতার অনুপস্থিতিতে কত কষ্টেই দিন কাটছে তার।করুণা হয় শুচিপ্রিয়ার উপর।হায় রে মূঢ় নারী,নিজেও জানেনা কি হারাচ্ছে।মহারাজ কল্পনা করেন,সুচিত্রা যদি সৌরিন্দ্রের মা হতেন।পরক্ষনেই নিজেকে সংযত করেন।যা হয়না,তাই নিয়ে ভেবে অনর্থক মনকে কষ্ট দেওয়া বই তো নয়।রাজকন্যা সুচিত্রার ব্যবহারে কোন লজ্জা বা জড়তা নেই।দেখে মনে হয় তিনি জানেনই না,যে তাঁর সাথে মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের বিবাহপ্রস্তাব হয়েছিল।সহজ ও স্বাভাবিক তার ব্যবহার।

দুই রাজ্যের সন্ধি উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন হয়েছে রাজ্য জুড়ে। উৎসব শেষে মহারাজ অনঙ্গবর্ধন নিজ রাজ্যে ফিরে যাবেন।উৎসবের প্রাকদিবসে সন্ধ্যেবেলায় দূত সংবাদ দিলো,রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ মহারাজের দর্শনাভিলাষি।মহারাজ অনঙ্গবর্ধন আনন্দের সাথে সম্মতি দিলেন।তিনিও চাইছিলেন আনুষ্ঠানিক সন্ধির আগে রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপের সাথে একান্তে বাক্যালাপ করতে,বিশেষতঃ পিতার আচরনের ক্ষমা প্রার্থনা করা পুত্রের ধর্ম।সেইমত তাদের একান্ত সাক্ষাতকারের আয়োজন হল।কিন্তু রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপের মুখে তিনি যা শুনলেন, সেইজন্য তিনি প্রস্তত ছিলেন না।

কুশল ও সৌজন্য বিনিময়াদির পর রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ কিছুটা দ্বিধাভরে জানালেন,“মহারাজ,মার্জনা করবেন।কাল সন্ধি উৎসব।তাই আজই আপনাকে কিছু কথা না জানালেই নয়।যদিও রাজকন্যা সুচিত্রা আপনাকে এসব কথা জানানোর ঘোরতর বিরোধী, কিন্তু আমার মনে হয়েছে,আপনার সব কথা জানা উচিত।”
মহারাজ অনঙ্গবর্ধন বিস্মিত হলেন।কাল সন্ধি উৎসব।আজ এমন কি কথা থাকতে পারে যা এত জরুরি যে আজই না জানালেই নয়।তিনি বললেন,
” আপনি নির্দ্বিধায় বলুন।”
রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ অতঃপর বলতে শুরু করলেন,“মহারাজ আপনি হয়তো জানেন না, আপনার পিতামহী স্বর্গীয়া রাজমাতা স্বর্নমঞ্জরী দেবী ও আমার স্বর্গীয়া মাতা দুজনে প্রিয়সখী ছিলেন।রাজকন্যা সুচিত্রার জন্মের পর আপনার পিতামহী তাকে পৌত্রবধূ হিসেবে প্রার্থনা করেন আমার মাতার কাছে।আমিও তাদের সম্পর্ককে সম্মান জানিয়ে এই প্রস্তাবে সম্মত হই।আপনার পিতামহী তাঁর নিজের হীরকাঙ্গুরীয় দিয়ে আমার কন্যাকে আশীর্বাদ করেন,আর তাকে রাজকূলবধু হিসেবে পাটিপত্র করেন বিক্রমবিহারের রাজার পাঞ্জা আঁকা দলিলে।আমিও এই বৈবাহিক সম্পর্কস্থাপনের উপহারস্বরূপ দুই রাজ্যের সীমান্তবরাবর ভূমি প্রদান করি আপনার পিতা মহারাজ অনন্তবর্ধনকে।এই সবকিছুই মহারাজ অনন্তবর্ধনের সম্মতিক্রমেই হয়েছিল।রাজকন্যা শৈশব থেকে জেনেই বড় হয়েছেন,যে তিনি আপনার বাগদত্তা।কিন্তু হঠাৎই জানতে পারি আপনি মালব্যরাজকন্যার পানিগ্রহন করছেন।শুনে রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলাম।তার পরিনাম আপনার গোচর।আমার মাতা সেই শোকে ইহলোক ত্যাগ করেন।এতগুলো বছর ধরে নিদারুণ যন্ত্রনায় দগ্ধ হয়েছি।ভেবেছি,আপনার কাছে দূত প্রেরণ করবো,বরপণ বাবদ দাওয়া ভূখন্ড ফেরত চাইবো।কিন্তু মাতা সুচিত্রা বাধা দিয়েছেন।তাঁর বক্তব্য ছিল,’নিজের সম্পত্তি ভিক্ষা করবো কেন?আমরা ক্ষত্রিয়।পারলে যুদ্ধ করে জয় করবো।’সেই কারনেই এই যুদ্ধ।মাতা সুচিত্রা মূর্খ নন।তিনি জানতেন বিক্রমবিহারের সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হবার মত সৈন্যবল অমরাবতীর নেই।কিন্তু মায়ের আমার আত্মমর্যাদাবোধ অতি তীব্র।যাই হোক,এই সেই বিক্রমবিহারের মোহর দাওয়া পাটিপত্র দলিল,আর এই আপনার পিতামহীর অঙ্গুরীয়।এগুলো আপনার সম্পত্তি।আপনি গ্রহণ করুন।”

মহারাজ অনঙ্গবর্ধন অনেকক্ষন স্থানুবৎ বসে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে সামনে রাখা দলিল খুললেন।রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ যা যা বলেছেন,সেসবই স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে।নীচে জ্বলজ্বল করছে বিক্রমবিহারের শীলমোহর।এতে ভুল হবার জায়গা নেই।আর এই অঙ্গুরীয় খুব পরিচিত মহারাজের।রাজপ্রাসাদে পিতামহীর তৈলচিত্রে তাঁর হাতে এই অঙ্গুরীয় সকলেই দেখেছে।তাহলে,সবটাই ভুল?পিতা এতবড় অন্যায় করেছেন?ছি ছি।এখন মহারাজ কিভাবে পিতার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করবেন?কি করলে এই অপরাধেএ গুরুভার লাঘব হবে?

সারারাত কেটে যায়।মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের চোখে ঘুম আসে না।তীব্র অপরাধবোধে তিনি দগ্ধ হতে থাকেন।অনুশোচনায় তার হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে।

পর্ব -৩

মহারাজ অনঙ্গবর্ধন নিজরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেছেন।অমরাবতীর বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় মহারাজের শক্তি ও খ্যাতি অনেকগুনে বর্ধিত করেছে।সারা বিক্রমবিহার রাজ্যে উৎসবের পরিবেশ।সবাই খুশী।আকাশে বাতাসে আনন্দের রেশ।শুধু রাজা অনঙ্গবর্ধনের হৃদয়ে সুখ নেই, শান্তি নেই।মহারাজ যুদ্ধ জয় করে ফিরেছেন।রাজ্যবাসীর গর্বের সীমা নেই।কিন্তু মহারাজ কি হারিয়ে ফিরেছেন কেউ জানেনা।মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের সব অহংকার আজ ভূলুন্ঠিত।এই বিশাল রাজত্ব,সম্পদ সব বিষবৎ প্রতীত হচ্ছে।পিতার একটি ভুল পদক্ষেপ আজ তাঁর জীবনকে অসহনীয় নরক করে তুলেছে।সবাই জানে মহারাজ বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন।শুধু অনঙ্গবর্ধন জানেন এই জয় মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়।কি অপমান।ছিঃ ছিঃ।এই জয়ের ভার অনঙ্গবর্ধন আর বইতে পারছেন না।জয়ী হয়েও পরাজয়ের গ্লানিতে জর্জরিত তিনি।আর রাজকন্যা সুচিত্রা? পরাজিতা হয়ে তিনি স্বমহিমায় ভাস্বর।এই পরাজয় নিজের সম্মানরক্ষার্থে তিনি স্বেচ্ছায় বরন করেছেন।মহারাজ অনঙ্গবর্ধনকে জিতিয়ে দেবার জন্যই এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।অনঙ্গবর্ধন আর রাজকন্যা সুচিত্রার সম্পর্কের শেষ সুতোটুকু ছিড়ে ফেলার জন্যই এত আয়োজন।

মহারাজ চেয়েছিলেন অর্জিত ভূখন্ড ফিরিয়ে দিতে।কিন্তু রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ তা গ্রহণ করতে অসম্মত হন।বলেন, ” ক্ষমা করবেন মহারাজ।ওই ভূখন্ড আপনি অমরাবতীকে যুদ্ধে পরাজিত করে অর্জন করেছেন।এর উপর আর অমরাবতীর কোন অধিকার নেই।আপনি অমরাবতীর অতিথি।এই অনুরোধ করে আমায় লজ্জিত করবেন না।”

আর রাজকন্যা সুচিত্রা?সবকিছুর পরেও এত সহজ,স্বাভাবিক কি করে?মহারাজ অনঙ্গবর্ধন তো তার সবটকু দিতে চেয়েছিলেন। রাজকন্যাকে পত্নিত্বে বরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজকন্যা সুচিত্রা কত অবলীলায় বলে দিলেন,” মহারাজ,এই অনুরোধ করে,আমায় আর আমার পিতাকে অপমান করবেন না।এই প্রস্তাব আমাদের তথা অমরাবতীর পক্ষে অসম্মানজনক।অমরাবতী বিজিত রাজ্য।আপনি চাইলে আমায় বন্দী করে নিয়ে যেতে পারেন।কিন্তু যা ঘটেছে,তার পর এই বিবাহপ্রস্তাব আমার কাছে সম্মানের নয়।আপনার দয়া গ্রহণ করতে আমি অসমর্থ।ক্ষমা করবেন আমায়।”

দয়া?অনঙ্গবর্ধন কি সত্যিই দয়া করতে চেয়েছিলেন রাজকন্যা সুচিত্রাকে?সেই সুচিত্রা,যাককে জানা অবধি মহারাজ অনঙ্গবর্ধন শুধু তাঁর কথাই ভেবেছেন দিনরাত।যত দেখেছেন,তত মুগ্ধ হয়েছেন।নারীর এই নতুন রূপের পরিচয় মহারাজকে মুহুর্মুহু বিস্মিত করেছে।তিনি কি রাজকন্যাকে ভালোবেসেছেন?অনঙ্গবর্ধন জানেন না, ভালবাসা কাকে বলে।মহারানী শুচিপ্রিয়া তাঁর স্ত্রী। শুচিপ্রিয়া যেমনই হন,অনঙ্গবর্ধন তাকে তাঁর মত করেই গ্রহন করেছেন।তাকে সম্মান করেছেন,স্নেহ করেছেন।তিনি এক নারীতে আসক্ত।এটা মহারাজের অহংকারের জায়গা।তিনি তার পিতার মত বহুপত্নিক নন।তিনি মনে করেন, একসাথে একাধিক নারীর সাথে সম্পর্কস্থাপন চরিত্রদৌর্বল্যের পরিচায়ক।কিন্তু তাহলে রাজকন্যা সুচিত্রার প্রতি তাঁর যে অনুভূতি, একে কি নাম দেবেন অনঙ্গবর্ধন? এ তাঁর কেমন দুর্বলতা?

দুর্বলতা? শুধুই দুর্বলতা?হ্যাঁ, দুর্বলতাই তো।নইলে একটি ছোট্ট রাজ্যের রাজকন্যা,তার এতদূর স্পর্ধা?মহারাজ অনঙ্গবর্ধনকে দয়া দেখায় সে?তাঁকে অপমান করার সাহস করে?এত অহংকার?কিসের এত গর্ব?রূপের?মহারানী শুচিপ্রিয়ার নখের যোগ্য নয় সুচিত্রার রূপ।কি আছে তার মধ্যে,যার জন্য সে মহারাজ অনঙ্গবর্ধনকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস করে?ও আচ্ছা,মহারাজ অনঙ্গবর্ধনকে বিবাহ করলে সুচিত্রা প্রধানা মহিষী হতে পারবেন না,দ্বিতীয়া পত্নী হয়ে থাকতে হবে,সেই কারণ? মহারাজ নিজের মনেই যুক্তি সাজান,রাজকন্যা সুচিত্রাকে ঘৃণা করতে চেষ্টা করেন।কিন্তু হৃদয়ের গভীরে যথেষ্ট জোর খুঁজে পাননা,নিজের যুক্তিতে বিশ্বাস করার।যত ঘৃণা করতে চান,তত রাজকন্যা সুচিত্রার শান্ত,দৃপ্ত,তেজস্বিনী রূপ মানসপটে ভেসে ওঠে।মহারাজের যাবতীয় যুক্তি বুদ্ধি দুর্বল হয়ে পরে।অনঙ্গবর্ধন রাজকার্যে মন দিতে পারেন না।শিশু সৌরিন্দ্র পিতার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বার বার ফিরে যায়।মহারাজ নির্ঘুম রাত কাটান।একটু আশ্রয়ের খোঁজে মহারাণী শুচিপ্রিয়ার কক্ষে যান।কিন্তু মহারাজের যন্ত্রনা বোঝার মত মানসিক গভীরতা শুচিপ্রিয়ার কোথায়?

এভাবে চলতে পারেনা।এই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসা আশু প্রয়োজন, মহারাজের নিজের স্বার্থে,এই বিক্রমবিহার রাজ্যের স্বার্থে।সারা রাজ্যে বিজয় উৎসবের আয়োজন চলছে।এর মাঝে খবর এসেছে ভগবান তথাগত বুদ্ধ কিছু শ্রমন সহ বিক্রমবিহারের আতিথ্য গ্রহন করেছেন।নগরীর প্রান্তে এক কাননে তিনি অবস্থান করছেন।মহারাজা অনঙ্গবর্ধন তথা বিক্রমবিহারের অশেষ সৌভাগ্য এই রাজ্যে ভগবান তথাগত পদধূলি দিয়েছেন।মহারাজ ভগবান তথা অন্যান্য শ্রমনদের আতিথেয়তার যেন কোন ত্রুটি না হয় দেখতে আদেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রীকে।স্থির করলেন,পরদিন প্রাতঃকালে তিনি নিজে যাবেন তথাগত দর্শনে।কে বলতে পারে,হয়তো সেখানেই তিনি আলোর দিশা পাবেন।ভগবান বুদ্ধের শরণে খুঁজে পাবেন শান্তির পথ।নিশ্চয়ই সেখানে তিনি মানসিক আশ্রয় খুঁজে পাবেন,পথ পাবেন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দোলাচল থেকে মুক্তির।

পর্ব -৪

কি শান্তি,কি সুখ।এ কি অনুভূতি? সামনে এ কাকে দেখছেন মহারাজ অনঙ্গবর্ধন? তিনি ডুবে যাচ্ছেন এ কোন প্রশান্তির সাগরে?চারিদিকে এত আলো কোথা থেকে এলো?কই চোখ ঝলসে যাচ্ছে না তো?এইই কি স্বর্গ? সামনে কি স্বয়ং ইশ্বর?

মহারাজ স্থানুবৎ বসে আছেন ভগবান তথাগতর পদপ্রান্তে।দু’চোখে অশ্রু আজ আর কোন বাঁধা মানছে না।মহারাজের হৃদয় আজ ভারহীন।সব হৃদয় যন্ত্রনা ইশ্বরের চরণে সমর্পণ করেছেন তিনি।

ভগবান চোখ মেলে চাইলেন।কি অপার করুণা তাঁর দু’চোখের দৃষ্টিতে। কি সুশীতল শান্তি।মহারাজ যেন শান্তির সাগরে অবগাহন করে উঠলেন।যে পথের সন্ধানে এসেছিলেন তিনি,সেই পথ তিনি পেয়েছেন।মহারাজ সাষ্টাঙ্গ প্রনিপাত করলেন ভগবান তথাগতকে।ভগবান স্মিত মধুর হাস্যে আশীর্বাদ করলেন।মহারাজ করজোরে নিবেদন করলেন,
” ভগবন্,আপনার হৃদয়ের অগোচর তো কিছুই নেই।আমি আপনার দাসানুদাস। আমায় পথ দেখান দয়া করে”।

তথাগত তেমনই মধুর হাস্যে উত্তর করলেন,“মহারাজ,হৃদয়ের চেয়ে সৎ পথপ্রদর্শক কেউ নেই।নিজ হৃদয়কে প্রশ্ন করুন,যাঞ্চা করুন সঠিক পথ।ঠিক সেই পথের দিশা পাবেন।মনুষ্যহৃদয়ের কোন কোনে সত্য পথের দিশা লুকানো থাকে অবশ্যই।শুধু তাকে খুঁজে বার করতে হয় নিজেকে।মস্তিষ্ক দিয়ে নয়,হৃদয় দিয়ে।”

সঠিক পথের দিশা।মহারাজ অনঙ্গবর্ধন আজ জানেন সেই পথ,তাঁর সকল প্রশ্নের উত্তর তাকেই খুঁজে বার করতে হবে।তিনি রাজা। প্রজাপালন তাঁর প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। মহারাজ ফিরে এলেন রাজপ্রাসাদে।আজ অনেকদিন পরে তাঁর হৃদয় স্থির,শান্ত।মহারাজ দরবারে গেলেন।রাজকার্য পরিচালনা করলেন।শিশুপুত্রকে ক্রোড়ে নিয়ে আদরে আহ্লাদে ভরিয়ে দিলেন।আহা অবোধ শিশু।মাতার উপেক্ষা জন্মাবধি সয়ে আসছে।তার পরম আশ্রয় পিতা।সেই পিতাও ক’দিন তার দিকে ফিরেও তাকান নি।ছিঃ।এ কি মানসিক বৈকল্য?একজন রাজাকে এরকম দৌর্বল্য শোভা দেয় না।সত্যিকারের রাজা সেই,যে যেকোন অবস্থায় নিজ কর্তব্যে অবিচল থাকতে পারেন।

কর্তব্য।অত্যন্ত গুরুভার শব্দ।রাজার কর্তব্য প্রজাদের প্রতি।পিতার কর্তব্য সন্তানের প্রতি।স্বামীর কর্তব্য স্ত্রীর প্রতি।এসকল কর্তব্যই মহারাজ এযাবতকাল অবধি যথাযথভাবে পালন করে এসেছেন।কিন্তু মানুষের কি নিজের প্রতি কোন কর্তব্য থাকেনা?নিজের হৃদয়ের প্রতি?সারাজীবন সংসারে সবার প্রতি কর্তব্য করতে গিয়ে মানুষ নিজেকে উপেক্ষা করে।অন্য সব কর্তব্যের গুরুদায়িত্ব বহন করতে করতে নিজের প্রতিও যে কিছু কর্তব্য থাকে,সেটা ভুলে যায়।

আজ মহারাজ অনঙ্গবর্ধনের সামনে তার নিজের হৃদয় স্বচ্ছ আয়নার মত প্রতীয়মান।না,রাজকন্যা সুচিত্রার প্রতি তাঁর আর কর্তব্য নেই কিছু।ছিলো হয়তো।কিন্তু রাজকন্যা নিজেই তাকে সেই দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন।সব বন্ধন খুলে মুক্ত করে দিয়েছেন মহারাজ অনঙ্গবর্ধনকে।কিন্তু মহারাজ নিজের হৃদয়ের প্রতি কর্তব্যকে অস্বীকার করেন কি করে?তিনি আজ অনুভব করেছেন রাজকন্যা সুচিত্রার প্রতি তার সুগভীর প্রেম। না কোন বাগদান,প্রতিশ্রুতি বা কর্তব্যের সম্পর্ক নয়।এ সম্পর্ক হৃদয়ের।আর কোন দ্বিধা নেই।মহারাজ নিজের মন বুঝেছেন।অমরাবতীর রাজকন্যা সুচিত্রা রাজরানী হয়ে আসবেন এই বিক্রমবিহারে।আসতে হবেই তাকে।কতদিন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন রাজকন্যা? অনঙ্গবর্ধনের হৃদয় তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন।তিনি বুদ্ধিমতি।তিনি বুঝবেন মহারাজের প্রেমানুভূতি।আর রাজকন্যাও কি আন্তরিক ভাবে চান না অনঙ্গবর্ধনকে।সুচিত্রা শৈশব থেকে নিজেকে মহারাজের বাগদত্তা বলে জেনেছেন।মহারাজকে স্বামী হিসেবে জেনেই বড় হয়েছেন।আজকের এই প্রত্যাখ্যান সুগভীর অভিমান থেকে,অনঙ্গবর্ধন তা বোঝেন।না আর কোন অভিমানের সুযোগ দেবেন না তিনি রাজকন্যা সুচিত্রাকে।রাজ্যে বিজয়োৎসব সমাপ্ত হলেই তিনি নিজে গিয়ে রাজকন্যার পাণীপ্রার্থনা করবেন।যে ভাবে হোক রাজকন্যার মত করাবেন।কোমল নারীহৃদয় কতক্ষণ আর কঠোর হয়ে থাকবে?

মহারাজ অনঙ্গবর্ধন সিদ্ধান্ত নিলেন,তিনি নিজেই পত্র প্রেরণ করবেন রাজকন্যা সুজাতাকে।তাকে বোঝাবেন,জানাবেন তাঁর হৃদয়ের কথা।রাজকন্যা নিশ্চয়ই বুঝবেন।বিজয়োৎসব শেষে দূত যাবে অমরাবতী, মহারাজের হৃদয়বার্তা বহন করে।

পর্ব – ৫

শ্রীল শ্রীযুক্ত মহারাজা অনঙ্গবর্ধন সমীপেষু,

আপনার পত্র প্রাপ্ত হইয়াছি।রাজকন্যা সুচিত্রা দেবীর উদ্দেশ্যে আপনার লেখা পত্রও যথাসময়ে তিনি পাইয়াছেন।বিশেষ কারণবশতঃ সেই পত্রের উত্তর তিনি নিজে দিতে পারিলেন না।তাই আমিই এই পত্র লিখিতেছি।

মহারাজ, আপনি অবগত হইয়াছেন, যে রাজকন্যা সুচিত্রা দেব্যার সহিত আপনার বিবাহ সম্বন্ধ শৈশবেই স্থির হইয়াছিলো আমার মাতা ও আপনার পিতামহীর ইচ্ছায়।তিনি জন্মাবধি আপনার বাগদত্তা। সেই পুতুল খেলার বয়স হইতেই তিনি আপনাকে স্বামী বলিয়া জানিয়াছিলেন।তাঁর পিতামহী ও আপনার পিতামহীর সখিত্বের সুবাদে আপনার সব সংবাদই তাঁহার কাছে পৌঁছাইতো।তিনি তাঁহার মানসপটে আপনার চিত্র রচনা করিয়াছিলেন।আপনার যোগ্য পত্নী ও বিক্রমবিহারের ভবিষ্যৎ রাজমহিষীরূপে নিজেকে তৈয়ার করিয়াছিলেন সযত্নে।আমরা সকলেই তাহাকে লইয়া গর্বিত ছিলাম।নিজের কন্যা বলিয়া বলিতেছি না,কিন্তু সত্যই মাতা সুচিত্রার মত কন্যা প্রাপ্ত হইলে যে কোন পিতা গর্ববোধ করিতেন,ইহা আমি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি।তিনি আমার শ্রেষ্ঠ সন্তান। বিদ্যায়,বুদ্ধিতে,বাহুবলে,রাজনীতি ও কূটনীতির অগাধ জ্ঞানে তার মত আমি কাউকেই দেখিনাই।অথচ এত গুনের অধিকারিনী হইয়াও তিনি সম্পূর্ণ নিরহংকার।

মহারাজ, আমি আপনার নিকট মিথ্যাভাষনের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। রাজকন্যার বিবাহ সম্পর্কে রাজজ্যোতিষীর বিধান সর্বৈব মিথ্যা ছিলো। রাজকন্যার বিবাহের জন্য বিভিন্ন রাজা,রাজবংশ হইতে প্রস্তাব আসিতেছিল। মহারাজ,আমায় বলিতে পারেন এরূপ অবস্থায় একজন হতভাগ্য পিতা কি করিতে পারে?তাঁহার মন পরিবর্তনের অনেক প্রয়াস সত্ত্বেও তিনি নিজ সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন।তাই রাজ জ্যোতিষীর বিধানের মিথ্যা নাট্য রচনা করিতে হইয়াছিলো।ইহার অধিক আর কিই বা করিতে পারিতাম আমি।আমি ক্ষত্রিয়, রাজপুরুষ। চোখের জল ফেলা লজ্জার।কিন্তু আমি যে একজন পিতাও।কন্যার কষ্টে হৃদয় বিদির্ণ হইতো।আমার মাতা অনেক যন্ত্রনা বক্ষে লইয়া স্বর্গারোহণ করেন।ভাগ্য ভাল,আপনার পিতামহীকে এইসব প্রত্যক্ষ করিতে হয় নাই।তিনি জীবিত থাকিলে হয়ত এই ঘটনা ঘটিতও না।যাহাই হোউক,যাহা ঘটিয়াছে, তাহা আমার কন্যার ভাগ্য।ভাবিয়াছিলাম,যে যাহা বলে বলুক,মাতা সুচিত্রা স্নেহচ্ছায়ায় বার্ধক্যের শেষ দিন গুলি অতিবাহিত করিয়া দিবো।নাই বা গেলেন তিনি শ্বশুরালয়, রাজকন্যা অমরাবতী আলো করিয়া বিরাজ করুন।

মানুষ ভাবে এক,হয় আরেক।আগেই বলিয়াছি,আপনার সকল সংবাদই রাজকন্যা প্রাপ্ত হইতেন তাঁহার পিতামহী মারফত।যেই বয়সে শিশুরা রাক্ষস,খোক্ষস,দত্যিদানোর কাহিনী শুনিয়া নিদ্রা যায়,রাজকন্যা আপনার কাহিনী শুনিতেন পিতামহীর কাছে।তিনি অবগত ছিলেন,আপনি আপনার পিতার একাধিক বিবাহকে সমর্থন করেন না।আপনি একপত্নিক পুরুষ।রাজকন্যা আপনার এই মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করিতেন।একাধিক নারীসঙ্গকে তিনি চরিত্রদৌর্বল্য জ্ঞান করেন।আপনি তাহার হৃদয়দেবতা।আপনার মানসিক দৌর্বল্যের কারণ হইতে তিনি চান নাই।

মহারাজ, আপনি কেন ফিরিয়া আসিলেন আমার কন্যার জীবনে?তিনি তো নিজ দুর্ভাগ্যকে স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন।নিজের জীবনকে নূতন করিয়া গুছাইয়া তুলিতেছিলেন।আমারই ভুল।তাঁহার কথা মানিয়া যুদ্ধের অবতারণা না করিলে আজ এই বার্ধক্যে এই যন্ত্রণা আমায় সহিতে হইতো না।আমারই পাপে আজ এই শাস্তি।

মহারাজ,রাজকন্যা সুচিত্রা আমাদের ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন।না,তিনি জীবিত আছেন।কিন্তু আমি আমার প্রিয়তম সন্তানকে হারাইয়াছি।মাতা সুচিত্রা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিয়াছেন।ভগবান তথাগতর চরণে নিজেকে সমর্পণ করিয়াছেন।তিনি অমরাবতী ত্যাগ করিয়াছেন।জানিনা কোথায় আছেন।আর কখনো ইহজনমে তাহাকে দেখিতে পাইবো কি না।তিনি যেখানেই থাকুন,হতভাগ্য পিতার হৃদয়ে তিনি তাঁহার শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসাবেই থাকিবেন সারাজীবন। হয়তো আপনিও তাহাকে মুছিয়া ফেলিতে পারিবেন না অন্তর হইতে।

যাইবার আগে আপনাকে তাহার প্রণাম জানাইতে বলিয়াছেন।সম্ভব হইলে ক্ষমা করিবেন হতভাগিনীকে।আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিবেন,এইবারে যেন একটু শান্তি পান তিনি।ভগবান তথাগতর চরনে সকল দুঃখ সমর্পন করিয়া যেন প্রকৃত সুখের সন্ধান পান।

আপনার দীর্ঘায়ু এবং যশ প্রার্থনা করি।

নিবেদনান্তে ইতি,
রাজা হেমেন্দ্রপ্রতাপ

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত