অল্প সল্প গল্প

ঝড়

হযরতকে দেখলে আমাদের তার মায়ের কথা মনে পড়ত। আর তার মায়ের কথা মনে পড়লে ঝড়ের কথা মনে পড়ে যেত কারণ তার মা মারা গিয়েছিল কালবৈশাখীর কবলে পড়ে। হযরতের নানাবাড়ি ছিল আমাদের এলাকায়। সে নানাবাড়ি বেড়াতে আসলে আমাদের সাথে দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলত আর মায়ের গল্গ করত। নাইয়র থেকে ফিরছিল তার মা, একা। এর দুইদিন আগে হযরতের বাবা এসে হযরতকে নিয়ে গিয়েছিল। তার মাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু তার মা বলেছিল, অনেক দিন পর বাপের বাড়ি এসেছে, তাই আরও দুইটা দিন থাকতে চায়। কিন্তু পরের দিনই তার হযরতের জন্য খারাপ লাগতে শুরু করে এবং সে তার স্বামীর বাড়ির দিকে যাত্রা করে দেয়। হযরতের মা তাদের গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিল। তখনই ঝড়ের কবলে পড়ে সে আশ্রয় নেয় একটা বড় আমগাছের নিচে। প্রচন্ড ঝড়ে একটা বড় ডাল ভেঙ্গে পড়ে তার ওপর। আমরা ভাবতাম যদি সেদিন হযরতের মা তার স্বামীর সাথে চলে যেত কিংবা পরিকল্পনামাফিক বাপেরবাড়ি আরও একটা দিন বেশি থাকত তাহলে তাকে মরতে হতো না। হযরতকে দেখলে আমাদের মায়া লাগত, তাই আমরা মনে মনে চাইতাম দুনিয়ায় যেন আর ঝড় না আসে। তবুও ঝড় আসত। ঘরের চালের কোণে দেখা দিত একখন্ড কালো মেঘ, তা আস্তে আস্তে সমস্ত আকাশকে গ্রাস করে ফেলত। ছুটে আসত ঝড়, প্রচন্ড বেগে। আমাদের ঘরের টিনগুলি উড়ে যেতে চাইত। প্রচন্ড বাতাসে গাছগুলি নুয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে যেতে আবার দাঁড়িয়ে পড়ত। যেন রেসলিং-এ যুযুধান দুই পক্ষ। তবু প্রতিবেশি জয়গুনির খড়ে-ছাওয়া চাল উড়ে যেত। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসত আমার বাবার কন্ঠে আযান, অর্থাৎ তিনি খোদাকে ডাকছেন ঝড়ের কবল থেকে আমাদের রক্ষা করতে। আমার মা ঘনঘন আমাদের দিকে তাকাতেন। তখন আবার আমাদের হযরতের মায়ের কথা মনে পড়ে যেত।

ভয়

আমরা একটু আগেই চলে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলল, আপনার ছেলের সেশন আসতে আরও অনেক দেরি। আমরা প্রথমজন নিয়ে কাজ করছি। আপনার ছেলের সিরিয়াল পাঁচ। বুঝেনই তো একেকটা সেশনে অনেক সময় লেগে যায়। আপনারা বরং এক কাজ করুন, ছেলেকে নিয়ে চলে যান পাশের শিশুপার্কে, ঘুরলে ওর ভালো লাগবে। তাই আমরা অর্থাৎ আমি ও আমার স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে পার্কে চলে গেলাম। আমাদের ছেলেটা হাইপার একটিভ। থেরাপি চলছিল। আমরা প্রথম রাইড হিসাবে বেছে নিলাম নাগরদোলা। আমার বউ অবশ্য উঠল না। আমরা দুইজন যখন উপরে উঠে গেছি, তখন কেন যেন আমাদের চেয়ারটা আচমকা বেশ জোরে কেঁপে উঠল। ছেলেটা কেঁদে উঠল। আমি ছেলেকে শক্ত করে ধরলাম আর বলতে থাকলাম, ভয় পেয়ো না, বাবা, ভয় পেয়ো না। কিন্তু সে আরও ভয় পেয়ে গেল, আরও জোরে কাঁদতে লাগল। আমি বলতে থাকলাম, ভয় পেয়ো না, বাবা, ভয় পেয়ো না। তবুও সে কাঁদতে লাগল। তখন বুঝলাম আমিও বেশ ভয় পেয়েছি, আর অভয় বাক্য আমি আমার ছেলেকে নয়, আসলে নিজেকেই শোনাচ্ছি। ফলত, আমার অভয় বাক্য ছেলেকে কোন আশ্রয় দিতে পারছিল না।

বন্ধু

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেভ করছিলাম। থুতনির কাছে কয়েকটা দাড়ি পেকে গেছে। রেজরের ব্লেড সেখানটায় আসতেই হাত থেমে গেল। তখনই শিসটা শুনলাম। দোয়েল পাখির। একবার শিস দিল। তারপর আবার। কিন্তু ঐ দু’বারই। তারপর চরাচরে আর কোথায়ও কোন শব্দ নেই। আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম শহরে পাখির ডাক আমাদেরকে, যারা গ্রাম বা মফস্বল থেকে শহরে এসেছি, স্মৃতিকাতর করে দেয়। তখনই ফেরিওয়ালাদের ডাক শুনলাম, ওই, আ-ম-ড়া! আমড়া নি-বে-ন, আমড়া? মু-র-গি, ওই মু-র-গি। মুরগি লাগবে, মু-র-গি? তারপর আবার সব চুপ। হয়ত ফেরিওয়ালারা ক্রেতা পেয়েছেন। ইত্যবসরে আমার ছেলের ডাক শুনলাম, বাবা, বাবা, দেখে যাও, বারান্দায় পাখি এসেছে। ওর মা বলল, ও, ললি! তোমার বাবা তো এখন আসতে পারবেনা, সেভ করছে। তারপর আবার ওই, আ-ম-ড়া! আমড়া নি-বে-ন, আমড়া? এখন অনেকটা দূর থেকে। ট্রেন ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকলে হুইসেলের শব্দ যেমন লাগে। তবু আমি অপেক্ষা করছি, একটা ডাকের। দোস্ত, বাড়ি আছিস? কিডনি বিকল হয়ে অকালে মরে যাওয়া বন্ধু কি আবার ডাকবে ম্যাটিনি শোতে সিনেমা দেখতে যেতে? যদি ডাকে!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত