বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে। বাংলাদেশে তখন আরো দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ছিল চট্টগ্রাম। অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি কোথায় হবে তা নিয়ে যথেষ্ট মতদ্বৈততা ছিল: চট্টগ্রামে না কুমিল্লায়।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম শহরের জনগণ এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বড় ধরনের আন্দোলন শুরু করে। তারই ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। মনে রাখা উচিত, সময়টা আইয়ুব খানের শাসনামল, একনায়কতন্ত্রের কাল। চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে আন্দোলন চলছিল সেখানে চট্টগ্রামের বহু বুদ্ধিজীবীর সংশ্লিষ্টতা ছিল।

দাবি ছিল, এখন যেখানে সিআরবি বা চিটাগাং রেলওয়ে বিল্ডিং সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করার, কারণ সিআরবিকে ঘিরে রেলওয়ের বিশাল এক ভৌত কাঠামো, অসংখ্য অট্টালিকা ও দালানকোঠা ছিল। এর নান্দনিক শোভাও ছিল মনোমুগ্ধকর। দাবির পেছনে এ যুক্তিও ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের প্রায় সব মুখ্য কাজই তখন সংঘটিত হতো ঢাকায় অবস্থিত প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয়ে। সিআরবি সেহেতু রেলওয়ের কাজের কেন্দ্র হিসেবে তার গুরুত্ব হারিয়েছিল।

চট্টগ্রামের অধিবাসীদের এই চাওয়াটির কোনো গুরুত্বই ছিল না আইয়ুব খানের কাছে। এই সামরিক শাসক পূর্ব পাকিস্তানে আরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় দিতে রাজি হয়েছিলেন শুধুমাত্র এই কারণে যে, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলো, কিন্তু এমন এক জায়গায় যা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে, তখনকার সময়ে প্রায় একটি অগম্য স্থানে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যাঁর পরামর্শে ও বুদ্ধিতে এখানে স্থাপিত হয়েছিল তিনি হলেন প্রয়াত ফজলুল কাদের চৌধুরী, আইয়ুব খানের পার্লামেন্টের স্পিকার।

ফজলুল কাদের আইয়ুব খানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হলে ছাত্রদের আন্দোলন শহরকে স্পর্শ করবে না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দালন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, ৬২, ৬৩’র শরীফ শিক্ষা কমিশন বিল বাতিল আন্দোলন, মার্শাল ল’ বিরোধী আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন- সব আন্দোলনেরই প্রাণকেন্দ্র ছিল ছাত্ররা। মুখ্যত ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

৬০-এর দশকের প্রথম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যতগুলো বাঙালির অধিকারের আন্দোলন হয়েছে- গণতন্ত্রকে পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন- সব আন্দোলনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। গুরুত্বে যত অকিঞ্চিৎকরই হোক না কেন এসব আন্দোলনে আমারও একটা ক্ষুদ্র ভূমিকা ছিল; প্রথমে ছাত্র হিসেবে, পরে শিক্ষক হিসেবে। পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির সযত্ন প্রয়াস ছিল চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন ড. এ আর মল্লিক। তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের একান্ত আপনজন মনে করা হতো (পরবর্তীকালে অবশ্য এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল)। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে যে বিভাগগুলো খোলা হয় সেগুলো ছিল : বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও পরে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও ম্যাথমেটিক্স। আরো পর যথাক্রমে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্ব বিভাগ খোলা হয় ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আমি যোগ দিই ১৯৬৯-এ।

১৯৬৯-এ অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ড. আনিসুজ্জামান (বাংলা), ড. শামসুল হক, ড. এখলাস উদ্দিন প্রমুখ। এরও আগে যোগ দিয়েছিলেন প্রফেসর আলী আহসান, ড. আব্দুল করিম, ড. আর আই চৌধুরী, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী, প্রফেসর আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীন, ড. আনিসুজ্জামান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) প্রমুখ বলিষ্ঠ শিক্ষকরা।

অন্য বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে আমরা যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই প্রত্যেকেই একটি পদোন্নতি পেয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ছিলাম প্রভাষক বা লেকচারার। এখানে পদোন্নতি পেয়ে হই সিনিয়র লেকচারার, এখন যাকে বলা হয় এসিস্টেন্ট প্রফেসর। বলিষ্ঠ শিক্ষক যাঁদের নাম আগে উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা সিনিয়র লেকচারার থেকে পদোন্নতি পেয়ে রিডার হন, যে পদটি বর্তমান এসোসিয়েট প্রফেসর বা সহযোগী অধ্যাপক। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র প্রফেসর ছিলেন সৈয়দ আলী আহসান।

তিনি এর আগে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াননি, তবুও তাঁকে প্রফেসর বা অধ্যাপক পদ দেওয়া হয়েছিল। এর মুখ্য কারণ সম্ভবত তিনি ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের খুব কাছের লোক। তিনি আইয়ুব খানের লেখা ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস্ (Friends, not Masters) বইটির অনুবাদক বাংলায়।

১৯৬৬ সাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন উন্মুখ। ৬৬-তে বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানেই তাঁর ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ৬ দফার মধ্যে দু’টি রাষ্ট্রের অবয়বকে পরিষ্ফুট করা হয়েছিল। এই ৬ দফা ছিল মুখ্যত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দলিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ নিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করার মেনিফেস্টো। ৬ দফা দাবি গ্রহণ করা পাকিস্তানি শাসকচক্রের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তাই আইয়ুব খান ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব যদি যুক্তির ভাষা না বোঝে তাহলে তাকে অস্ত্রের ভাষা দিয়ে বোঝানো হবে।’ ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ৬ দফার পক্ষে বাংলাদেশের বহু জায়গায় জনসভা করেছিলেন; অবশ্য, প্রথম জনসভাটি তিনি করেন চট্টগ্রামে, ঢাকায় নয়। চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর সহায়তায়। আতাউর রহমান খান প্রমুখ আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতারা ৬ দফার দাবিগুলোর পক্ষে মাঠে নামতে ভয় পেয়েছিলেন।

প্রতিটি জনসভার শেষে বঙ্গবন্ধুকে এরেস্ট করা হয়। তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আবার জনসভা করেন। তাঁকে স্তব্ধ করার জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। তাঁর সঙ্গে এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আরো কয়েকজন বাঙালি সামরিক অফিসার, বাঙালি সিএসপি অফিসার ও রাজনীতিবিদকে আসামি করা হয়। ষড়যন্ত্র মামলায় আসামিদের নির্যাতনের যে বিবরণ আকার ইঙ্গিতে পত্র-পত্রিকায় তখন প্রকাশিত হচ্ছিল তা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে এক ভীতিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়।

আমার মনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাউঞ্জে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একত্রিত হতাম, চা খেতে বা অন্য কোনো কারণে, তখন আমাদের অনেকের মুখেই একটা শঙ্কার ছাপ দেখতে পেতাম। চারদিকে একটা সন্দেহাকীর্ণ আবহ তৈরি করা হয়েছিল। ৬৮-তে আইয়ুব খান Decade of Reform বা ‘এক দশকের উন্নয়ন’-এর এক দাম্ভিক ঘোষণা দেন। এক দশকজুড়ে তিনি পাকিস্তানে যে সব উন্নয়ন করেছেন তার কীর্তিগাথা চারদিকে প্রবলভাবে প্রচার শুরু হয়।

একদিকে কঠোর-কঠিন নিষ্পেষণ, অন্যদিকে উন্নয়নের জয়ধ্বনি- এরই মধ্যে শুরু হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাঁধভাঙা আইয়ুববিরোধী, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী প্রচণ্ড আন্দোলন। এ আন্দোলনে আইয়ুব খানের সব শৃঙ্খল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুকে জেলের তালা ভেঙে বের করে নিয়ে আসা হলো। শেখ মুজিব জনচিত্তে অভিষিক্ত হলেন অজেয় নেতা হিসেবে, বাঙালির মুক্তিদাতা হিসেবে, জনঅধিকারের প্রতীক হিসেবে।

১৯৬৯-এর মার্চে আইয়ুব খানের বদলে আরেকজন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এলেন, ঘোষণা করলেন আরেক দফা মার্শাল ল’। প্রতিশ্রুতি দিলেন গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার। এই রাজনৈতিক আবহাওয়ার মধ্যেই আমরা প্রায় শ’খানেক শিক্ষক, হাজার দু’য়েক শিক্ষার্থী নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার একটি বৃহৎ পাদপিঠে পরিণত করার প্রয়াসে যুক্ত হলাম। পুরো ’৭০ সালটাই ছিল একই সঙ্গে আশা ও উদ্বেগের।’

৭০-এ এক ভয়াবহ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। এই প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোনে বঙ্গোপসাগরের বহু দ্বীপ নিশ্চিহ্ন হলো। উপকূল অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞের যে করালগ্রাস নেমে এসেছিল তার ফলে প্রায় ১০ লাখ লোক প্রাণ হারালো। এই মহামারণযজ্ঞে বাংলাদেশের বিধ্বস্ত মানুষদের পাশে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের কোনো সাহায্য পাওয়া গেল না। ইয়াহিয়া খান হেলিকপ্টারে চড়ে বিধ্বস্ত অঞ্চল আকাশ থেকে অবলোকন করে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গেলেন।

দেশের এই বিক্ষুব্ধ অবস্থায় ’৭০-এর নির্বাচন হলো। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করল। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনও পেল। পাকিস্তানের শাসকচক্র ভেবেছিল, যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল ক্রিয়াশীল ছিল তাই কোনো দলের পক্ষেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল এবং ঘোষণা করলো তারা ৬ দফা বাস্তবায়ন করবে তখন পাকিস্তানের শাসকচক্র ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো।

১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন হওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল। অনেক আগে থেকেই পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) ভুট্টো ষড়যন্ত্র করছিল আওয়ামী লীগকে বা বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হবে না। ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো এবং পাকিস্তানি শাসকচক্র কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন করতে রাজি ছিল না এই কারণে যে তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে নির্মম অর্থনৈতিক শোষণ অব্যাহত ছিল তা বন্ধ হয়ে যাবে এ আশঙ্কায়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ৬ দফায় পাকিস্তানের জন্য দু’টি কারেন্সি, দু’টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অর্জিত বিদেশি মুদ্রা প্রদেশে রেখে দেয়া ইত্যাদি যে সব দাবি উত্থাপিত হয়েছিল তার মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাচার করার পথ রুদ্ধ করা।

এ বিষয়ে এবং ভুট্টোও যাতে ক্ষমতার অংশীদার হতে পারে সে বিষয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে বদ্ধপরিকর ছিল। এ ধরনের কোনো সমঝোতা ছাড়া আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় বসাতে তারা খুবই শঙ্কাবোধ করছিল। এ কারণে ভুট্টো, ইয়াহিয়া খানকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে গণপরিষদের ১৯৭১-এর ৩রা মার্চে নির্ধারিত অধিবেশনটি স্থগিত রাখা প্রয়োজন যতক্ষণ না কোনো সমঝোতা হয়।

মনে রাখা প্রয়োজন, এই পার্লামেন্টের অন্যতম প্রধান করণীয় ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ যদি এই শাসনতন্ত্র প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা নেয় তাহলে তারা যে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের স্বার্থকেই রক্ষা করবে তা পাকিস্তানের শাসকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, আগেই এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ১লা মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তান রেডিও থেকে ঘোষণা করা হলো যে, ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

পার্লামেন্ট স্থগিত হওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়লো, হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমে এলো। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সারা বাংলাদেশজুড়ে হরতাল। এই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চওঅ (পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সৈন্য আনা হচ্ছিল বাংলাদেশের সম্ভাব্য আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য, স্তব্ধ করার জন্য।

ঢাকার এয়ারপোর্টে পিআইএ’র ও অন্যান্য বেসামরিক বাঙালি কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এ ব্যাপারে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলেন, এয়ারপোর্টের সার্বিক কর্তৃত্ব সামরিক শাসকরা নিয়ে নেয়। এই নিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হলে গুলি চালানো হয়, এতে দু’জন নিহত হন এবং অনেকেই আহত হন। বঙ্গবন্ধুর কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি ২রা মার্চ থেকেই অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন।

৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালির মুক্তি কামনার যে অসাধারণ ভাষণটি দিয়েছিলেন সেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, চান বাঙালির মুক্তি; বাঙালির স্বাধীনতা। এই চাওয়ার বিরুদ্ধে যদি কোনো আঘাত আসে তাহলে তিনি বাঙালির ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে তা প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তাঁর এ নির্দেশ সবাই মেনে নিয়েছিল, আমরাও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি তাঁর এই নির্দেশ অনুসরণ করে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম, কিন্তু কোনো ক্লাস হতো না। রেলওয়ে, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, হাইকোর্ট প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান তাঁরই নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনে সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করেছিল। গ্রামগঞ্জও এর আওতাবহির্ভূত ছিল না। কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়তো না একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া।

প্রতিবাদের বহ্নিশিখা সবার মনে ধিকিধিকি জ্বলছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই প্রত্যয়কে সাধারণ জনগণের কাছ পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াসে, ব্যাখ্যা করার প্রয়াসে ১৭ই মার্চ থেকে লালদিঘীর ময়দানে সপ্তাহব্যাপী এক কর্মসূচি পালন করে।

প্রায় প্রতিদিন সভা আরম্ভ হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহরের মুখ্য সড়কগুলোতে ট্রাক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হতো যেখানে অসহযোগের বাণী, স্বাধীনতার বাণী সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শিত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হতো। লালদিঘীর সভাতে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। যদিও লালদিঘীর এই সভাটি ছিল মুখ্যত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পরিচালিত; এই কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রামের তৎকালীন বিশিষ্টজনরা ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছিলেন।

এঁদের মধ্যে যাঁদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী ডা. কামাল এ খান, চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক, বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন, একই কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ। ডা. কামাল এ খান প্রগতি মোটরস্-এর ব্যবস্থাপক জনাব হাবিবুল্লাহ খান থেকে প্রায় ১০টি ট্রাক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন আমাদের প্রতিদিনের ট্রাক র‌্যালির জন্য। অধ্যাপক মমতাজউদ্দীন বেশিরভাগ সময় উপস্থাপনায় থাকতেন।

এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শামসুল হক যিনি স্বাধীনতা-উত্তরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। আমি এই সময়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। ড. শামসুল হক প্রতিদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে আসতে না পারলেও আমরা যারা মাঠের পরিচালনায় ছিলাম তাদের অকুণ্ঠভাবে সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। ড. আনিসুজ্জামানের সহযোগিতাও বিশেষভাবে উল্লেখ্য।

আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে যাঁরা উন্মুক্ত ময়দানে বক্তৃতা দিতে সক্ষম ছিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলা বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক জনাব আবু জাফর নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গেছেন স্বাধীনতার বেদিমূলে নিবেদিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এই উদ্যোগটিকে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত করতে। তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন অনিচ্ছুক অধ্যাপক আলী আহসানকে এই সভায় নিয়ে আসতে।

এ সভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন অধ্যাপক আলী আহসান এবং এ কারণেই পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী যখন বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর প্রতিহিংসার নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে তখন তিনিও আমাদের সঙ্গে এপ্রিলের মধ্যভাগে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে আমার মনে হয়। অবশ্য তাঁর জামাতা বাংলার অধ্যাপক ড. কোরেশী আমাদের সঙ্গে শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন।

২৪শে মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পরিচালিত এই সভাটি প্যারেড ময়দানে অর্থাৎ চট্টগ্রাম কলেজের মাঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। সে দিন প্রধান বক্তা ছিলেন ড. এ আর মল্লিক। তাঁকেও আমরা উদ্বুদ্ধ করেছিলাম আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে। তিনি এরপর থেকে নিরলসভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে গেছেন। যদিও তিনি ছিলেন মোনায়েম খান কর্তৃক নির্বাচিত উপাচার্য (স্বাধীনতা-উত্তরকালে অধ্যাপক আলী আহসানের মধ্যে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আচরণ দেখেছি, ড. মল্লিকের মধ্যে কখনো তা পরিলক্ষিত হয়নি)।

২৪শে মার্চ রাত প্রায় ৮.৩০ এর দিকে প্যারেড ময়দানে যখন একটি নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল যার বিষয়বস্তু ছিল স্বাধীনতা আন্দোলন (এবারের সংগ্রাম), ঠিক এমন সময় খবর এলো চট্টগ্রাম বন্দরে সদ্য আগত পাকিস্তানি সোয়াত জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র নামানো হচ্ছে।

এ কথা উপস্থিত জনতা-দর্শকদের মধ্যে প্রচারিত হওয়া মাত্রই সেখান থেকে বিরাট একটি দল মিটিং ভেঙে বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। বন্দরের শ্রমিকরা আগে থেকেই অস্ত্র নামানো প্রতিহত করছিল। তাদের ওপর সে দিন ভোররাতে গুলি চালানো হয়, শুনেছি অনেক শ্রমিক নিহত হয়েছিল। সঠিক সংখ্যাটি এখনো কেউ জানে না। বহু মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। ২৪-২৫শে মার্চ রাতেই মেজর জিয়াউর রহমানকে সোয়াত থেকে অস্ত্র নামাতে পাঠানো হয়েছিল।

২৫শে মার্চ সারাদিন চট্টগ্রাম শহর বিক্ষোভে উত্তাল ছিল, রাস্তায় আমাদের এবং অন্যদের নেতৃত্বে আগ্রাবাদ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুরে আমরা কয়েকজন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যাই। সেখানে আমাদের চা দিয়ে আপ্যায়ন করেন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের তৎকালীন প্রোগ্রাম প্রডিউসার এবং যুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ।

আমরা সে সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির জন্য একটি বিরাট প্রাপ্তির আশায় উদ্বেল ছিলাম কিন্তু এর জন্য কী মূল্য দিতে হয় সেজন্যেও আমাদের উদ্বেগ কম ছিল না। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ও বাঙালি বিহারির সংঘর্ষে অনেক লোকের মৃত্যু ঘটেছিল।

২৬শে মার্চ সকাল ৭টা-৭.৩০ এর দিকে আমার মা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন, ‘আমাদের রেডিওটা বোধহয় খারাপ হয়েছে, কারণ বাংলাদেশের কোনো বেতার কেন্দ্র শোনা যাচ্ছে না’। এর কিছুক্ষণ পর আমাদের ড্রাইভার আমার স্ত্রীর সঙ্গে যে আলোচনা করছিল তা আমি শুয়ে শুয়ে শুনছিলাম। সে বলছিল, ‘দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে’। তার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময় বাংলার অধ্যাপক বন্ধুবর আবু জাফর এসে পৌঁছলেন।

আমি শোয়া থেকে উঠে এলে তিনি আমাকে জানালেন, আন্দরকিল্লার মোড়ে সিটি করপোরেশন অফিসের সামনে ট্রাকে দাঁড়িয়ে সাদা পোশাকে কয়েকজন ইপিআরের সৈন্য জনগণের কাছে সব ধরনের সাহায্য চাইছে এবং বলছে তারা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে।

ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অবাঙালি সৈন্যরা পাঁচ শতাধিক বাঙালি অফিসার ও সৈন্য হত্যা করেছে। তাদের অনেকে ষোলশহর রেল স্টেশনের কাছে সমবেত হয়েছে। জাফর সাহেব বললেন, চলুন তাড়াতাড়ি যাই, দেখা যাক কী হয়েছে। গাড়ি নেওয়া যাবে না, কারণ পথে পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা হেঁটেই রওনা দিলাম আন্দরকিল্লার দিকে। পথে নেমে দেখলাম অনেক লোকই পথে; বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করছে এবং খবর জানার চেষ্টা করছে, কী হয়েছে। আমরা হেঁটেই আন্দরকিল্লায় পৌঁছলাম। তখনো ইপিআরের লোকজন জনগণের কাছে সাহায্য চেয়ে চলেছে। আমি ও জাফর সাহেব আন্দরকিল্লার মোড়ের কাছেই একটা গলি দিয়ে একটু হেঁটে মেটারনিটি হসপিটালের পাশে আজাদী পত্রিকা অফিসে গেলাম খবর জানার জন্য।

আজাদী অফিসে তখন তেমন লোক ছিল না। দোতলায় একটি লম্বা টেবিলের ওপর সাইক্লোস্টাইল-এ ছাপানো বঙ্গবন্ধুর পাঠানো অনেকগুলো স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে রয়েছে। সেই ঘোষণায় ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ও অন্যান্য জায়গা আক্রান্ত হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্য নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে প্রত্যেককে সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান করছেন।

উপরের এই বক্তব্যটি বঙ্গবন্ধুর পাঠানো বক্তব্যের আক্ষরিক মূল নয়। আমার এখনো মনে থাকা বক্তব্যের সারাংশ। বাইরে বেরিয়ে এলাম। শুনলাম, বেলা ৮.৩০-৯টার দিকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছে। আন্দরকিল্লা মোড়ে এক রেস্টুরেন্টে নিজের কানেই শুনতে পেলাম উর্দু মেশানো বাংলায় একজন লোক ঘোষণা দিচ্ছে, কোন কোন অপরাধ করলে তখন চালু থাকা ‘মার্শাল ল’-তে মৃত্যুদণ্ড হবে- অতি সব সাধারণ অপরাধেই মৃত্যুদণ্ড।

বুঝলাম জনমনে ভীতি ছড়ানোর জন্যই এই ঘোষণা। বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা এলো, বিকেল ৪টায় লালদিঘীতে সমাবেশ হবে। সবাইকে সেখানে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিছু সময় পর অবশ্য এ সমাবেশ বাতিল করা হয় পাকিস্তান বিমান বাহিনী কর্তৃক সমাবেশের ওপর বোমা বর্ষণের আশঙ্কায়।

সে দিন রাত থেকেই চট্টগ্রাম শহরে অলিখিত ও অনির্দেশিত কারফিউ জারি হলো। তখন ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি এলাকা বাঙালি ইপিআর সৈন্যদের কর্তৃত্বে চলে এসেছে। সে দিন রাতেই সোয়াত জাহাজ থেকে ঘনান্ধকার আচ্ছাদিত নগরের আকাশ আলোয় বিদীর্ণ করে কামানের গোলা ছোড়া হলো ক্যান্টনমেন্টের দিকে।

চট্টগ্রাম শহর ৩০শে মার্চ পর্যন্ত স্বাধীন ছিল, জনগণের অধিকারে ছিল। ২৯ তারিখ থেকেই পাকিস্তানি সৈন্যরা শহরের বিভিন্ন জায়গা অধিকারে নেয়ার চেষ্টা করছিল। তাদের কাছে কামান-মেশিনগান ইত্যাদি অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল যা বাঙালিদের কাছে ছিল না। ইপিআরের সঙ্গে সাধারণ বাঙালিরা, ছাত্ররা, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বিভিন্ন দলের কর্মীরা এক হয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। শহরের নানা জায়গায় খ-যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে ৩০ ও ৩১শে মার্চ। ৩১শে মার্চ শহরের পতন হলেও কালুরঘাট ব্রিজের অপর পাড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।

আমরা অর্থাৎ আমার মা, আমার স্ত্রী ও দু’বছর বয়সী মেয়ে এবং আমার বন্ধু জাফর সাহেব ও তাঁর দুই ভাই ৩০শে মার্চ নৌকা করে কর্ণফুলী পেরিয়ে নদীর অপর পাড়ে আমার শ্বশুরের গ্রাম কানুনগোপাড়ায় আশ্রয় নিই। আমরা সেখানে ছিলাম এপ্রিলের ৯-১০ তারিখ পর্যন্ত। কালুরঘাট ব্রিজকে ঘিরে যুদ্ধ ঘনীভূত হচ্ছিল।

বুঝতে পারলাম যে, প্রায় নিরস্ত্র সামান্য অস্ত্র-সজ্জিত বাঙালিদের পক্ষে অত্যন্ত ভারী সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরোধ করা বেশিদিন সম্ভব হবে না। অবশ্য এর মধ্যে ৩-৪ তারিখের দিকে আমার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক রবের দেখা হয়েছিল। সে গ্রাম থেকে শহরের দিকে যাচ্ছিল। সে আমাকে বললো ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, শিগগিরই তারা ভারী অস্ত্র পাবে, যা দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হবে, দেশকে স্বাধীন করা হবে।

পরে শুনেছি রব কাপ্তাই যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নিহত হয়। রবের স্মৃতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে। ওর কথা এখনো আমার মনে হয়, খুবই প্রাণোচ্ছল ছিল রব; মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভেই আত্মদানকারী বীর। তারিখগুলো এখন যথাযথ মনে পড়ে না; প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের ঘটনা তো! ৭-৮ তারিখের দিকে জাফর সাহেব আমাকে বলতে শুরু করেন, ‘এখনই আমাদের ভারতে চলে যাওয়া দরকার। পাকিস্তান সৈন্যবাহিনী আমাকে, আপনাকে ও আমার ভাইদের দেখামাত্র হত্যা করবে। কারণ, নিশ্চয় তারা জানবে লালদিঘী ময়দানে সপ্তাহব্যাপী স্বাধীনতার সপক্ষে যে সভা করা হয়েছে আপনি ও আমি তার উদ্যোক্তা।’

আমি যখন এই খবরটি অর্থাৎ আমাদের ভারতে চলে যাওয়া দরকার, আমার শ্বশুর মশাইকে জানালাম সেখানে তখন কংগ্রেসের শ্রী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ও কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণেন্দু দস্তিদার ছিলেন। শ্রী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ও পূর্ণেন্দু দস্তিদার বললেন, আমরা কেন যাবো? ওরা আমাদের কেন মারবে? আমরা কি আওয়ামী লীগ করি? আমি বললাম এবং জাফর সাহেব আমাকে সমর্থন দিলেন, নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধে উভয়পক্ষ নির্বিচারে একে অন্যকে হত্যা করেছে, সেখানে উপজাতি পরিচয়টিই প্রধান ছিল, অন্য কিছু নয় এবং যেহেতু আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সেজন্যই ওরা আমাদের হত্যা করবে।

৯-১০ তারিখের দিকে আমার শ্বশুর মশাই তাঁর এক অতি পুরোনো পরিচালককে আমাদের সঙ্গে দিলেন। কর্ণফুলী নদী দিয়ে উত্তরে অর্থাৎ উজানে গিয়ে এক জায়গায় নেমে সেখান থেকে মদুনাঘাট হয়ে হালদা নদী দিয়ে আমার শাশুড়ির বাবার বাড়ি রোসাংগিরিতে রাত্রী যাপন করে পরের দিন ভোরে উঠে আবার নদী পথে করেরহাট বা নারায়ণহাট হয়ে রামগড়ে পৌঁছতে পারলে তার অপর পাড়ে ভারতে পৌঁছানো যাবে। তাঁর এই নির্দেশিত পথেই আমি, আমার মা, স্ত্রী ও মেয়ে এবং জাফর সাহেবরা তিন ভাই রামগড়ে পৌঁছি।

বলতে ভুলে গেছি, জাফর সাহেবদের বাড়ি সাতক্ষীরা ছিল বলেই তিনি আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। তাছাড়া যেহেতু তিনি শহরে থাকতেন তাঁর পক্ষে ২৬শে মার্চের পরে ক্যান্টনমেন্টের সামনে হাটহাজারী রাস্তা দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যাওয়া সম্ভব ছিল না। রামগড় পৌঁছে আমরা সেখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আশ্রয় নেয়া একদল শিক্ষককে পাই যাঁরা লালদিঘীর ময়দানের সভায় অংশ নিয়েছিলেন।

এঁদের মধ্যে ছিলেন উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক, ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আলী আহসান, ড. কোরেশী, ড. রশিদুল হক, ড. শামসুল হক প্রমুখ প্রায় ১৫-১৬ জন, প্রায় সবাই সপরিবারে। ১৪-১৫ তারিখের দিকে আমরা ছোট্ট একটি নদী পেরিয়ে রামগড়ের অপর পাড়ে ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত সাব্রুমে ঢুকি। একই দিনে আমরা পৌঁছি সাব্রুম থেকে আগরতলা শহরে। আগরতলায় আমরা বিভিন্নজন বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় পাই। আগরতলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপালের বাসা খালি করে দেয়া হয়েছিল ড. এ আর মল্লিক সাহেবকে আশ্রয় দেয়ার জন্য।

আগরতলায় ৫-৬ দিন থাকার পর আমরা অনেকেই কোলকাতায় চলে যাই। জাফর সাহেবও তাঁর ভাইদের নিয়ে কোলকাতায় পৌঁছে যান দিন দশেক পরে। কোলকাতায় পৌঁছে আমি বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক বন্ধুকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সহপাঠীকে সেখানে পাই। এঁদের মধ্যে ছিলেন আমার স্কুল জীবনের সঙ্গী ও সহপাঠী সিএসপি ওয়ালী-উল-ইসলাম। সে তখন চুয়াডাঙ্গার এসডিও (সাব ডিভিশনাল অফিসার)। আরো দেখা মেলে ড. সামাদ (রাঙ্গামাটির তৎকালীন এডিসি), বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আমার অকৃত্রিম বন্ধু কানুতোষ মজুমদার, অর্থনীতিবিদ মতিলাল পাল এবং অগ্রজতুল্য স্বদেশ বসু প্রমুখ অনেকের।

পুরো এপ্রিল-মে মাস জুড়ে আমাদের মিলনের কেন্দ্রস্থল ছিল তৎকালীন কোলকাতাস্থ পাকিস্তান হাই কমিশনের (যা তখন বাংলাদেশ দূতাবাসে পরিণত হয়েছে) তৃতীয় সচিব আনোয়ারুল করিম জয়ের কক্ষ। এছাড়া, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ বিরাটভাবে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। মে মাসের শেষদিকে আমাকে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটি প্রজেক্টের ডিরেক্টর করা হয়।

এই প্রজেক্টের অধীনে প্রায় ৩০ জন ব্যক্তিকে গবেষক ও কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়, যাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন শিক্ষক বা গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রভাষক ও পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী, চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিক।

আমার ঐ প্রজেক্টে বা গবেষণা সমীক্ষায় গবেষক হিসেবে কাজ করেছিলেন আরো অনেকেই যাঁদের নাম উল্লেখ করতে গেলে প্রবন্ধের কলেবর অনেক বেড়ে যাবে। জাফর সাহেব অবশ্য নিজেই একটি কাজ বেছে নিয়েছিলেন। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য সংগ্রহ করা। তাঁকে সম্ভবত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করতো। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জাফর সাহেব সংগৃহীত তথ্যসামগ্রী ও অন্যান্য আরো তথ্য সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ নামে একটি কর্নার স্থাপন করা হয়। এই কর্নারের সহকারী কিউরেটর হয়েছিলেন জনাব শামসুল ইসলাম বাহাদুর।

মুক্তিযুদ্ধের এই নয় মাস সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়েছেন, আমরা মুখ্যত যুক্ত ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা ও যথার্থতা ভারতীয় জনগণ এবং বিশ্ব সমাজের সামনে তুলে ধরতে, ব্যাখ্যা করতে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমি বেশ কিছু কথিকা পড়েছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাখ্যা করে যে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় সে বইটির নাম ছিল ‘রক্তাক্ত বাংলা’। প্রকাশ করেছিলেন প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত তাঁর প্রকাশনা সংস্থা ‘মুক্তধারা’ থেকে সম্ভবত ১৯৭১-এর আগস্ট মাসে। এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছিল। লেখকদের মধ্যে ছিলেন ড. এ আর মল্লিক, আনিসুজ্জামান, অনুপম সেন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, মতিলাল পাল, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ।

প্রায় একই সময়ে বোম্বের প্রসিদ্ধ জার্নাল Quest-এর একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার জন্য। Quest-এর এই সংখ্যায় লিখেছিলেন জয় প্রকাশ নারায়ণ। বাংলাদেশ থেকে লিখেছিলাম আমরা তিনজন; আমি, মতিলাল পাল ও প্রয়াত মাহবুবুল হক। আমার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘Social background of Bangladesh Independence movement’. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের তিন বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর শিক্ষকরা যুক্ত ছিলেন; কিন্তু সবচেয়ে বেশি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী।

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে একটি ‘বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধ পরিষদ’ গঠন করেছিলেন জহির রায়হান। এই পরিষদের মহাসচিব ছিলেন তিনি নিজে, আমাকে করা হয়েছিল সমাজ বিষয়ক সচিব, ড. এ আর মল্লিক ছিলেন সভাপতি, ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন সহসভাপতি। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রচিত (১৬ খ-) গ্রন্থে এই পরিষদের উল্লেখ রয়েছে। এই পরিষদ ও চট্টগ্রামের শিক্ষকরা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবদান বিশাল ও অসীম গর্বের যা ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত