জানা অজানায় অপর্ণা সেন

১.
বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে অপর্ণা সেন এক অনন্য নাম, জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। তাঁর সুখ্যাতির শুরুটা ছিল অভিনয়ে, কিন্তু সময়ের আবর্তে, কালের খেয়া’য় অপর্ণা সেন আজ এমন এক সৃজনশীল শিল্প ব্যক্তিতে পরিণত, যা এখন শুধু অভিনয় না পরিচালনায় তা পরিমাপ করাটা বেশ কঠিন। তাই আজ যেন তাঁর অভিনেত্রী পরিচয়টিও ছাপিয়ে গেছে পরিচালক অপর্ণা সেনের পরিচয়টি। যদিও তিনি পরিচালকের পরিচয়ের প্রতি নিজের বিশেষ আগ্রহের কথা স্বীকার করেছেন। স্বনামধন্য তাঁর এই জীবনে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হলো। দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেলো জীবনের ৭২ হেমন্ত বিকেল। অথচ অপর্ণা সেন যেনো এখনো রূপকথার সজীব এক চরিত্রের নাম। ৩৬ চৌরঙ্গী লেন থেকে শুরু করে গয়না বাক্স, যেনো নিজের নির্দেশনায় বোনা নিজেরই গহীন গোপন সব একাকীত্বের গল্প। তবুও অপর্ণা যেনো একা নয়, বারবার ভাঙছেন- আবার শুরু করছেন নতুন করে পথচলা। আজ চির সবুজ অপর্ণা সেনের জন্মদিন। জীবনের সত্তর বসন্ত পেরিয়ে একাত্তরে পা রাখলেন অভিনেত্রী অপর্ণা সেন। ১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় এই বিখ্যাত অভিনেত্রী তথা চলচ্চিত্র পরিচালকের জন্ম হয়। প্রিয় অভিনেত্রী-পরিচালকের জন্মদিনের তাঁকে জানাই নিরন্তর শুভেচ্ছা। পোষাকী নাম অপর্ণা সেন হলেও স্বজনদের কাছে তাঁর বরাবরের ডাক নাম রীনা। মানবিকতায় প্রখর সচেতন নারীবাদী এই চলচ্চিত্র পরিচালক নারী বিষয়ক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘পরমা’রও সম্পাদক। 

২.
সোজা কথা সোজা ভাবে বলার জন্যও কিন্তু অপর্ণা সেন বিখ্যাত। সেই অপর্ণা সেনের জীবন দর্শনের পরিচয় মেলে এই আত্মকথনে, ‘আমার সব চেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে জীবনে সব কিছুই আমি দারুণ এনজয় করতে করতে করি। কাপড় কাচাটা কেবল সহ্য করতে পারি না। তা ছাড়া টেবিল সাজানো, বাড়ি সাজানো, লেখালেখি, দাবা খেলা, সব কিছুই ভাল লাগে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত এনজয় করি।’ কিছুদিন আগে তারা মিউজিকে রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থাপনায় ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র অনুরাগ নিয়েও অনেক কথা বলেছেন তিনি। সেটি অনেকবার শুনে তাঁর রবীন্দ্রপ্রীতির গভীরতা আমাকে স্পর্শ করে।

৩.
ভারতের সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম তিনি। একাধারে তিনি যেমন অসম্ভব গুণি একজন অভিনেত্রী, তেমনি চলচ্চিত্র নির্মাতাও। এছাড়াও তিনি সফল স্ক্রিপ্ট রাইটারও বটে। একাধিক ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন। বাংলা, হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষার শতাধিক সিনেমার অভিনেত্রী অপর্না সেন আশির দশকের শুরুতেই পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রথম সিনেমা ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর জন্য সেরা পরিচালকসহ দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি ভাষার ১১টি সিনেমার মধ্যে ‘গয়নার বাক্স’ (২০১৩) বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয়। অপর্ণা সেন ১৯৮১ সালে ছবি নির্মাণ শুরু করেন। অত্যন্ত বেছে বেছে কাজ করেছেন এই গুণি অভিনেত্রী ও নির্মাতা। তাঁর প্রতিটি ছবির কাহিনীতেই পাওয়া যায় উন্নত রুচির ছাপ। ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বরাবরই তিনি অত্যন্ত সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘পারমিতার একদিন’, ‘মিস্টার এ্যান্ড মিসেস আয়ার’, ‘ইতি মৃণালিনী’, ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’, ‘যুগান্ত’, ‘সতী’, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’সহ বিখ্যাত সব ছবি।

৪.
তাঁর ‘পরমা’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘গয়নার বাক্স’-এ তিনটি চলচ্চিত্র নারীকেন্দ্রিক। কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে ‘গয়নার বাক্স’ নিয়ে আলোচনকাকালে নারীবাদী চলচ্চিত্র পরিচালনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমি এই ফেমিনিস্ট ছবিগুলোর ভেতর দিয়েই একটা মেসেজ দিয়ে দিতে চাই। আর পুরুষদের নিয়ে বা সমাজের অন্য চরিত্রদের নিয়ে ভাববার তো মানুষ অনেক আছে। আমি না হয় ওদিকটায় একটু কমই ভাবলাম। তবে ছবির গল্প তৈরির সময় কিন্তু এইসব খেয়াল থাকে না। গল্পের প্রতি নিজের ভালো লাগাটাই প্রাধান্য দিতে থাকি। সেটা কী রকম হবে বা কোন ক্যাটাগরিতে চলে যাবে, তা নিয়ে ভাববে সমালোচকেরা। আমি বলব ‘গয়নার বাক্স’টা আমার সেরা ফেমিনিস্ট ক্যাটাগরির ছবি।’

৫.
বাবা ছিলেন প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক ও সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্ত। আর মা সুপ্রিয়া দাশগুপ্ত ছিলেন সুবিখ্যাত বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের পিসতুতো বোন। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্র জগতের আবহে বেড়ে ওঠা তাঁর। তাঁর শৈশব কেটেছে হাজারীবাগ এবং কোলকাতায়। ছোট বয়স থেকে চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে অপর্ণা সেনের। শহরে। অপর্ণা সেন কলকাতার মডার্ন হাইস্কুল ফর গার্লস এ লেখাপড়া করেছেন। তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজির উপর বি.এ পড়েছেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিএ পাস আর করা হয়ে ওঠেনি তার।

৬.
১৯৬১ সালে অপর্ণার পরিচয় হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী প্রয়াত ব্রায়ান ব্রেকের সঙ্গে। ব্রায়ান সেসময় ভারত সফরে এসেছিলেন তার বিখ্যাত মনসুন সিরিজের কাজে। এই কাজে ব্রায়ানের মডেল হয়েছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী কিশোরী অপর্ণা সেন। একজন কিশোরী তার মুখে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করেছে-এই আলোকচিত্রটি অসম্ভব প্রশংসিত হয়েছিল সে সময়। সেটিরই মডেল ছিলেন অপর্ণা সেন।

৭.
১৯৬১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় মাত্র ১৬ বছর বয়সে অপর্ণা সেনের অভিষেক ঘটে রূপালি পর্দায়। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘তিনকন্যা’ ছবির মাধ্যমে প্রথমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন তিনি। সেখানে মৃন্ময়ীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। উল্লেখ্য, সত্যজিৎ রায় ছিলেন অপর্ণার বাবার দীর্ঘদিনের বন্ধু। পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের আরও বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অপর্ণা। তার মধ্যে ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পিকু’ ছবিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবিটিতে অপর্ণার একজন স্বাধীনচেতা স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করে অনেকের মনে দাগ কেটেছেন। পরে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘জন অরণ্য’ ছবিতেও অভিনয় করেন। এরপর পরিচালক মৃণাল সেনের পরিচালনায় ‘আকাশ কুসুম’, ‘একদিন আচানক’, ‘মহাপৃথিবী’ ছবিতে অভিনয় করেন। এছাড়া ‘বসন্ত বিলাপ’-এর মতো সুপার-ডুপার বাণিজ্যিক সফল ছবিতেও তিনি ছিলেন ছবির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ওই সময়ের বিভিন্ন জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে একাধিক হিট ছবির নায়িকা হয়েছিলেন তিনি।

৮.
বাংলা সিনেমার পাশাপাশি হিন্দিতে অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর, দিলীপ কুমার, শত্রুঘ্ন সিনহার মতো অভিনেতাদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন অপর্ণা সেন। অভিনয় করতে করতেই তিনি একসময়ে চলে যান ক্যামেরার পেছনে। চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসেন অপর্ণা সেন। সেখানেও যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় রাখেন তিনি। ১৯৮১ সালে অপর্ণা সেনের পরিচালনায় প্রথম ছবি তৈরি হয় ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী লেন’। ছবিটি পরবর্তীকালে জাতীয় পুরস্কার পায়। শুধু অভিনয় কিংবা ছবি পরিচালনাই নয়, বহুমুখী এই প্রতিভার বিকাশ ঘটে সংবাদজগতেও। কলকাতার বুকে একটি নারী পত্রিকা সম্পাদনা এবং নিউজ চ্যানেলেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। এমনকি রাজনীতিসচেতন অপর্ণা সেন নেমেছেন রাজপথেও। জীবনে নানা সাফল্যের সুবাদে বহুবার বিএফজেএ পুরস্কার পান তিনি। পেয়েছেন পদ্মশ্রী খেতাবও। শুভ জন্মদিন অপর্ণা সেন!

৯.
তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি অপর্ণা সেনকে ১৯৮৬ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রদান করেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তিনি অনেকবার পুরস্কার জিতেছেন। পরবর্তীতে তিনি বহুবার লাইফ টাইম এ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারও পেয়েছেন। পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি জনপ্রিয় পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘সানন্দা’র সম্পাদক ছিলেন। উল্লেখ্য, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রুপ থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘সানন্দা’ পত্রিকাটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সমান জনপ্রিয় ছিলো তাঁর সম্পাদনাকালে। তিনি প্রায় এক বছর তথ্য ও বিনোদন নির্ভর টিভি চ্যানেল ‘কলকাতা টিভি’র ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১০.
জীবন ও কর্মের মতো অপর্ণার ব্যক্তিজীবনও যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। দুই সন্তানের জননী এই অভিনেত্রী বিয়ে করেছেন তিনবার। বেশ অল্প বয়সেই, প্রথম যৌবনে তিনি বিয়ে করেন প্রেমিক সঞ্জন সেনকে। তবে সেই সংসার বেশদিন টেকেনি তার। তারপর সংসারে জড়ান বিজ্ঞান লেখক ও সাংবাদিক মুকুল শর্মার সঙ্গে। যেখানে জন্ম নেয় অপর্ণার দুই কন্যা কমলিনী এবং বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী কঙ্কনা সেন শর্মা। পরবর্তীতে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছিল। তৃতীয়বারের মতো বিয়ে করেন লেখক ও অধ্যাপক কল্যাণ রায়কে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে ইংরেজী সাহিত্যের স্বনামধন্য অধ্যাপক। অত:পর আর কোন ভাঙন নয়, জীবনের এই শেষ সময়টা অপর্ণা পার করছেন ইংরেজির এই অধ্যাপকের সঙ্গে গল্প বুনে।

১১.
‘ইতি মৃণালিনী’ নিয়ে আলোচনাকালে ‘মৃণালিনী কি আপনি’ প্রশ্নের জবাবে নস্টালজিক হয়ে তিনি জানান, ‘হ্যা। মৃণালিনী অবশ্যই আমি। মৃণালিনী চরিত্রটাই দাঁড়াত না, যদি না আমি আমার ভেতরকার রিসোর্সগুলো ট্যাপ করতাম। ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়তো তফাত আছে, কিন্তু আমার মানসিকতা আর মৃণালিনীর মানসিকতা অনেকটাই এক। মৃণালিনী যে পরিবেশে বড় হয়েছে সেটা ছিল আবদ্ধ। যা থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়। আমার বড় হওয়ার পরিবেশ কিন্তু অনেক মুক্ত ছিল। আমার ব্যাকগ্রাউন্ডটা শক্তপোক্ত ছিল। মৃণালিনীও প্রেসিডেন্সি কলেজেই পড়েছে। কফি হাউস একসময় আমাদের ঘরবাড়ি ছিল। কফি হাউসে আমরা শ্যুট করতে পারিনি। কারণ সত্তর দশকের সেই কফি হাউসের সঙ্গে আজকের কফি হাউস একদম মেলে না। তাই কলেজপাড়ারই ফেভারিট কেবিন রেস্তোরাঁয় শ্যুট করেছি। যেটা একদম আগের মতো আছে। সেই সময়ের কথায় ফিরলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে আড্ডা এগুলো আমাদের রোজকার জীবন ছিল। কিন্তু সেই আমি কোনও নকশাল ছেলের প্রেমে পড়লাম না কোনও দিন…।’ আবার ‘আত্মজীবনী না লিখে সিনেমা বানালেন কেন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে অকপটে অপর্ণা সেন বলেছেন, ‘আমার আত্মজীবনী লেখার একটা অফার আছে। আমি মাত্র চার পাতা লিখেছি এ পর্যন্ত। (হাসি)। আই গট সো বোরড। আমি জানি, আমার জীবনটা অনেকের তুলনায় বৈচিত্রময়, কিন্তু কী লিখব বলুন তো নিজের সম্বন্ধে…?

১২.
একটি সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ পাঠ করা জরুরি তাঁকে বুঝতে।
পত্রিকা: আপনার জীবনে একাধিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সব সম্পর্কের সমাপ্তিও যে খুব সুখের হয়েছে তা নয়। আজ এই পর্বে এসে প্রেম বা সম্পর্ক নিয়ে কী মনে হয়?
অপর্ণা: হ্যাঁ, সব সম্পর্কের শেষ যে মধুর হয়েছে তা নয়। তবে কী জানেন, আমার মতে মানুষে মানুষে একটাই স্থায়ী সম্পর্ক হয়। বন্ধুত্ব। সেটাই আমরা প্রেম, বাৎসল্য, সখ্য ইত্যাদি নানা নামে ডাকি। 
পত্রিকা: আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক?
অপর্ণা: দেখুন, স্বামী-স্ত্রীর রোম্যান্টিক প্রেম তো বেশি দিন থাকে না। সেটা থাকবেও না। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যদি বন্ধু হয়, তা হলে সেই প্রেম কিন্তু থেকে যায়। জীবন থেকে এটাই শিখেছি।
পত্রিকা: আচ্ছা অপর্ণা সেনকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, প্রেমে ব্যর্থ হলে কী ভাবে মনে জোর আনা যায়? এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ?
অপর্ণা: আমি কি মনস্তাত্ত্বিক? বলতে পারি, যে মানুষটি আপনার হৃদয় ভেঙেছে তার খারাপ দিকগুলো মনে আনার চেষ্টা করুন। 
পত্রিকা: অপর্ণা সেনের পরে আর কোন নায়িকার নাম করা যায়, যিনি একাধারে সুন্দরী, সেক্সি এবং বুদ্ধিমতী?
অপর্ণা: সেটা আমি কী করে বলব? (হেসে) আসলে অপর্ণা সেনের সব চেয়ে বড় সুবিধে ছিল তার ব্যাকগ্রাউন্ড। (ভেবে) তবে জানেন, মুনমুনের মধ্যেও কিন্তু সেই ব্যাপারটা ছিল। পরমা সুন্দরী। দারুণ বুদ্ধিমত্তা। দুর্দান্ত ফটোগ্রাফার। ভাল কথা বলত। ভাল ছবি আঁকত।… ও ছবি বানাল না কেন কে জানে…. বানালে ভাল ছবিই বানাত। ও বেশি সুন্দরী হওয়াতেই বোধহয় ওর মুশকিল হল।

১৩.
‘আরশি নগর’ অপর্ণা সেনের দীর্ঘ দিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সিনেমা। নিজের পরিচালনা ‘আরশি নগর’ নিয়ে অপর্ণা বলেছেন, ‘এখনকার অপর্ণা সেনের আর নতুন করে কিছু পাওয়ার নেই। আমার প্রায় সব ছবিই বাণিজ্যিকভাবে সফল। কাজেই এখন চাপমুক্ত আমি। ফলে চিন্তা করতে পারছি ছবির ফর্ম নিয়ে। প্রত্যেকটা ছবিতেই বিষয়ান্তরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এই ফর্ম নিয়ে খেলাটা খেলতে বেশ ভাল লাগছে। আর ‘আরশি নগর’ সম্পর্কে বলতে পারি, এই ছবিতে এমন অনেক কিছু আছে যা অপর্ণা সেনের কাছেও নতুন। কিন্তু একটা ভাল ইউনিট সঙ্গে থাকায় সব সমস্যাই কাটিয়ে উঠেছি।’ সিনেমায় যে আরশিনগর তিনি দেখিয়েছেন, সেটা একটা কাল্পনিক জায়গা। এর কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘সিনেমার শুরুতেই সূত্রধর রেশমা বাঈয়ের কথায় আমরা জানতে পারি ‘সকলের মনের ভেতর একটা আরশিনগর। সেই আরশিতে নিজের চেহারা দেখেছেন বাবুলোগ?’ সেই চেহারার ছবিই ফুটে উঠছে। সিনেমাতে এখনকার দুর্নীতি, জমি নিয়ে কাড়াকাড়ি, সাম্প্রদায়িক হিংসা এসেছে। সেই প্রসঙ্গে ‘কালা পয়সাওয়ালা’ গানটাও বেশ বোল্ড আর প্রাসঙ্গিক।” সিনেমাটিতে বিভিন্ন ধারার গান ব্যবহার করা হয়েছে। কাওয়ালি, পপ, রক, হেভি মেটাল, সাধারণ প্রেমের গান, ব্লুজ, বাউল গান আছে। সিনেমায় দেখা যায় কাল্পনিক শহর ‘আরশি নগর’ প্রতাপশালী খান ও মিত্র পরিবারের শত্রুতার স্বাক্ষী। ‘আরশি নগর’ সিনেমাটি মুক্তির পর তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলছেন, “আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই যাবো, যেমন আমি চাই। আমার পরবর্তী চিত্রনাট্য গল্পের খাতিরে যদি নিরীক্ষার দাবি তোলে, আমি অবশ্যই করবো। আমি গৎ বাঁধা সিনেমা তৈরি করতে চাই না।”

(তথ্যসূত্র : দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, পরমা, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, ইন্টারনেট)

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত