শিল্পচিন্তা ও কবিতা

(অস্কার ওয়াইল্ডের শিল্পচিন্তা এবং কবি জিললুর রহমানের কবিতা বিষয়ে)

শরীর মন স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে –ধর্ম ও ঠিক থাকে এ রকম কথাই বলেছেন ঋষিরা । ঋষি বাক্য মান্য করি– কিন্তু মনের মধ্যে আরেকটা ঋষি যে আমি নিজেই তৈরি করে রেখেছি , সে তো গণ্ডগোল বাঁধায় সর্বক্ষণ। আমার ঋষিটা বলে ঋষি পরামর্শ বেশি স্মরণ-বরণ করলে তোমার বাক্যের মূল্য কোথায় । আমি বলি তোমার কথাও সত্য মানি – আমার বাক্য ও মানেসম্মানে খ্যাতি পাক এ কথা ও চাই । আমার ঋষি বলে নিজের পথ নিজে মাপো এবং নিজের পথে চলো। তাই নিজের পথে নিজে নিজে চলি, পারলে নতুন রাস্তা বানাই– একান্তের সড়ক । কিন্তু মন যা মানে শরীর তা মানতে চায় না। শরীর চিৎকার করে বলে ওঠে ‘শরীর আদ্যং ধর্ম খলুসাধনম ‘। শরীর বলছে‘ আমি ভালো যাচ্ছি না’। মন বলছে ‘ আমার অবস্থাও তথৈবচ। বৈষ্ণব সাধকরা যেমন বলেন- শরীর ও মনের সাধনশীল স্থিরতা রাখতে হলে বৃন্দাবনের তিনটি স্বরূপ জানতে হয়। তিনটি স্বরূপ কী? অপ্রাকৃত বৃন্দাবন–প্রাকৃত বৃন্দাবন আর মিশামিশির অন্তরের বৃন্দাবন। আমার তিন স্বরূপ এখন তিন দিকে টানছে আমাকে। তাই হারিয়েছি স্থিরতা ধীরতা। মন চায় একটা শরীর বলে অন্যটা । অর্থাৎ নিজেই নিয়তি অথবা নিয়তির ভেতরে আরেক নিয়তি–সাধন ভজন কিছু নাই। লেখা হয়ে ওঠে না ততটা কষ্টেমষ্টে পড়া যতটা হয়। ফলে আমি হয়ে উঠেছি–এটলাস। আমার কাঁধের উপরে অলিম্পাস জিউস তুলে দিয়েছেন গোটা পৃথিবীটা। আর মাঊণ্ট অলিম্পাস থেকে দেবতারা সুরা সেবন করতে করতে বলছে-কবি হবি? পৃথিবীর ভারে আমার কাঁধ বাঁকা হয়ে পড়ছে। তবু জীবন ও দৈব ছুটি দেবে না। হায় এপোলো হায় মারসায়াস [ কেউ কেউ বলেন–কবি হলেন এপোলোর পুত্র–সত্য হলো কবি এপোলোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মারসায়াসের পুত্র।] মারসায়াসকে পরাজিত করে এপোলো যখন প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ নিয়ে নূড়িপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন কী ভাবছিলেন স্বর্গীয় ক্ষমতার মালিক এপোলো? ভাবছিলেন–পৃথিবীর কোনো বিদ্রোহই সহনীয় নয়। কিন্তু পরিণতি কী? ফলাফল? বিদ্রোহকে যেভাবেই দমন করা হোক না কেন বিজয়ীর মনে একটা অদৃশ্য দুঃস্বপ্ন দুশ্চিন্তা স্থায়ী আসন পেতে বসে। সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম [ কবিতা কী ও কেন ] পোলিশ কবি বিগনিয়েফ হার্বাট এর একটি কবিতায় এপোলোর মনের ভাবনাটি কীভাবে চিত্রিত হয়েছে তা আমাদেরকে জানিয়েছেন। একটি অসাধারণ কবিতা। এপোলোর মনে হচ্ছে মারসায়াসের প্রতিরোধী কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে —- ‘’ কোনো একদিন / জন্ম নেবে কিনা / এক ধরনের শিল্প , যাকে বলতে পারি মূর্ত। / হঠাৎ তার পদপ্রান্তে / ঝরে পড়লো / একটি প্রস্তরিত বুলবুল / তিনি ফিরে দেখলেন / যে বৃক্ষের সাথে মারসায়াসকে বেঁধে রেখেছিলেন / তার সবকটি পাতা / সাদা হয়ে গেছে। [ অনুবাদ-সৈ ম ই ] আমার বিশ্বাস দেবতারা বা ক্ষমতাধররা বিদ্রোহকে অসহ্য মনে করেন বলেই বিদ্রোহের কারণ ও সূচনা তৈরি হয়। আর মানবের অথবা ছোট দেবতাদের বিদ্রোহের চেতনা ও কর্মের ভাষিক অথবা সাঙ্গীতিক চিত্রই তো হয় ওঠে কবিতা। মিল্টনের স্বর্গ হারানোর কাহিনিতে শয়তান যখন বলেন—‘It is better to reign in hell than serve in heaven’—তখনোই তা কবিতা হয়ে ওঠে। Frantz Fanon বলেছিলেন ‘ We revolt simply because , for many reasons, we can no longer breath’। বৃত্তাবদ্ধ শ্বাসরূদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই বিদ্রোহ। ফলে সত্যের জন্য সুন্দরের জনা উৎসর্গিত ও প্রাণিত বিদ্রোহ অবশ্যই শিল্প বা কবিতা। প্রমিথিয়ুস যখন বলেন মানুষের জন্য আগুন চাই–এই চাওয়াটাই হয়ে যায় কবিতা। কেন এমন হয় ? কারণ দ্রোহই কবিতা। কেন দ্রোহ কবিতা হয়ে গেলো? কারণ দ্রোহ নতুন নির্মাতা বা স্রষ্টা। এ কারণেই গ্রিসের দার্শনিকরা ধরে নিয়েছিলেন [মিথে] কবিরা অলিম্পাস ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাহলে কী কবিতা শুধু দ্রোহের ফসল?

কথাটাকে ঠিক এতটা সহজে নেয়া চলে না। কারণ কবিতা সৃজিত হয় বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতা নিয়ে। কবিতা জীবন প্রকৃতি দৃশ্য অদৃশ্য রূপ অরূপ সব কিছুকেই ভাষায় মূর্ত করে তোলে বা তোলার ক্ষমতা রাখে। আর একথাও আমরা সুদীর্ঘকাল থাকে জানি কবিতার জন্য পূর্বনির্বাচিত কোনো বিষয়বস্তু থাকে না—এমন কি শব্দ ভাষা ছন্দ বা কোনো ভাষারীতি ও নয় । আর এ কথাও সত্য কবিতার জন্য কবিতার জগতে অসুন্দর বলে কিছু নেই। দৃশ্যত কোনো সুন্দর কবিতার জন্য সুন্দর হবে এমনটা বলা যায় না। গোলাপ সুন্দর বলে কবিতা হয়ে ওঠে না – গোলাপের সুন্দরকে কবি বা শিল্পী শব্দে –বর্ণে চিত্রিত করে মহিমাময় করে তোলেন বলেই কবিতা হয়ে ওঠে । কোনো বিষয়ের সুন্দর কবিতাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে না বরং কবির রচনা ক্ষমতার গুণেই সুন্দর প্রকৃত ও অবিস্মরণীয় সুন্দর হয়ে ওঠে।সুন্দরকে আবিষ্কার করতে হয় –সুন্দরকে সৃজন করতে হয়। অন্ধকারের রূপগৌরব আঁকতে হলে কবি মননের টর্চ জ্বালিয়ে অন্ধকারের আত্মার গভীর অস্তিত্বের সাথে বা অস্তিত্বের গভীরতার সাথে বসে কথা বলতে হবে। সমস্ত হৃদয় অতুলনীয় আলোক উজ্জ্বল শব্দমালায় খচিত করে অন্ধকারের চোখে চোখ রেখে বলতে হবে—কেমন আছেন, হে অন্ধকার ?
এখানে একটু অস্কার ওয়াইল্ডকে [১৮৫৪-১৯০০] স্মরণ করতে পারি—কারণ তাকে স্মরণ করলে আমাদের মনোবিশ্বের ভেতরের শুদ্ধ শিল্পধারণার কিছু আলোক পেতে পারি। তর্ক বা বিতর্কে আমার আগ্রহ খুব কম ।শিল্পের ক্ষেত্রে আমি পৃথিবীর সকল উজ্জ্বল মতামতগুলিকে শ্রদ্ধা করি।

অস্কার বলছেন — 1. When man acts he is a puppet . When he describes he is a poet .
2. For he to whom the present is the only thing that is present, knows nothing of the age in which he lives.
3. A map of the world that does not include Utopia is not worth even glancing at, for it leaves out the one country at which Humanity is always landing. And Humanity lands there , it looks out, and, seeing a better country, sets sail. PROGRESS IS THE REALIZATION OF UTOPIAS.
4. The note of the perfect personality is not rebellion, but peace.
5. A true artist takes no notice whatever of the public . The public are to him non-existent.
6. Beautiful things began to be made, beautiful colours came from the dyer’s hand, beautiful patterns from the artist’s brain and the use of beautiful things and their value and importance. [Page 45, The Soul of Man under Socialism]
7. Evolution is the law of life, and there is no evolution except towards individualism . Where this tendency is not expressed, it is a case of artificially arrested growth or of disease, or of death.

8.What is true about Art is true about Life. [Page 49]
9. Art is our spirited protest, our gallant attempt to teach Nature her proper place. As for the infinite variety of Nature, that is a pure myth. It is not to be found in nature herself. It resides in the imagination, or fancy, or cultivated blindness of the man who looks at her. [Page 57, The Decay of Lying]
10. Vivian: … Art never express anything but itself. It has an independent life ,just as Thoughts has and develops purely on its own lines. It is not necessarily realistic in an age of realism, nor spiritual in age of faith.
………..
11. The second doctrine is this. All bad art comes from returning to Life and Nature, and elevating them into ideas. Life and Nature may sometimes be used as part of Art’s rough material, but before of they are f any real service to Art they must be translated into artistic conversations. … Life goes faster than Realism, but Romanticism is always in front of Life.
……….
12. The third doctrine is that Life imitates Art far more than Art imitates Life.
এখানে তাঁর সমস্ত কবিতার বা মনোভাবনার প্রতিনিধি হিসাবে একটি স্মরণীয় ব্যালাডের মাত্র ৬টি লাইন উদ্ধৃত করছি –তা ও শেষ ৬টি লাইন। কারণ কবিতা পড়তে পড়তে আমি এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে—একটা কবিতা সৃজনে যতগুলি পংক্তি কবি করণ –কাঠামোয় স্থাপন করেন তাদের সবটাই কবিতা হয়ে ওঠে না । প্রকৃত কবিতা হিসাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে কোনো একটি বিশেষ অংশ বা বিশেষ বিশেষ অংশ অথবা কখনো একটি মাত্র লাইন। কখনো এমন হয় একটি বিশিষ্টতম শব্দবন্ধ চুম্বকীয় আকর্ষণে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় । বলে ঐ শব্দবন্ধই কবিতা – কবিতার মেরুদণ্ড। এ কারণেই কবিতা পাঠের বিষয় নয় শুধু – দুর্দান্ত অভিনিবেশে অধ্যয়নের বিষয়। আমি মনে করেছি এবং আমার কবি বলছে উদ্ধৃত ৬টি লাইন অস্কারের ব্যালাডের অসাধারণ নৈপুণ্যকে ধারণ করে।
‘ And all men killed the thing they love,
By all let this be heard
Some do it with a bitter look,
Some with a flattering word.
The coward does it with a kiss,
The brave man with a sword.’
[ Number 6, The Ballad Of Reading Gaol]

কবি জিললুর রহমান
অস্কারের কবিতা–শিল্প নিয়ে উল্লিখিত চয়ন যখন করছি –তখন আমার মনে হলো আমি কেন আমার সমকালের একজন সজীব প্রাণবন্ত জীবন্ত কবিকে উদ্ধৃত করে আমার ভাবনাটাকে একটা সত্যকার ভিতে দাঁড় করাচ্ছি না । তখনই আমার কানে মন্ত্র এলো–আপনার কাব্য ‘ অন্য মন্ত্র ‘এর কথা [ অন্যমন্ত্র।। জিললুর রহমান । লিরিক- চট্টগ্রাম ।। ১৯৯৫ ] । মনে পড়লো ‘ শাদা অন্ধকার ‘ এর কথা [ শাদা অন্ধকার।। জিললুর রহমান। লিরিক- চট্টগ্রাম ।।২০১০]। মনে পড়লো সেই অসাধারণ কবিকথা ‘আত্মজার প্রতি‘। ‘আত্মজার প্রতি –নিঃসন্দেহে একজন প্রকৃত কবির সাধনাসাধ্য নির্মাণ। যা কালকে আত্মস্থ করবে। কবিতা কখন কীভাবে কবিতা হয়ে ওঠে একথা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ইয়েটস তো এবিষয়ে কথা বলতে বারণ করেছেন। তবু কবিতার বা কবির হয়ে ওঠা নিয়ে অজস্র সহস্র কথকতা তথ্য–তত্ত্ব রচিত হয়েছে পৃথিবী জুড়ে এবং প্রতিদিনই রচিত হচ্ছে। আসলে এ এক সীমাহীন রহস্যময় জাদুর খেলা–বিস্ময় সৃষ্টির শিল্প। আমি আমার কাব্যগ্রন্থ ‘ একা হলে জলতরঙ্গ নীলকণ্ঠ বাউল’ এ মানুষের হওয়া না হওয়ার কথা বলেছি গঙ্গাধর জলদাসের কণ্ঠে। ‘ বাঁশখালীর গঙ্গাধর জলদাস / দেখা হলে বলতো, / তোমার হবে দাদা / তোমার লক্ষ্মণ আছে / তোমার রাজ কপাল / দেখলেই তো চেনা যায় /আর কেউ নয়, আর কারো নয় /তোমাকে দিয়েই হবে হওয়ার কাহিনী ।‘ এবং ‘ গঙ্গাধর হাসতো/ বলতো, হবে, দেখে নিও , হবে / হওয়ার চিহ্ন আছেঃ / যাদের চিহ্ন থাকে/ হয় না হয় না করে ও তাদের / একসময়ে হয়ে যায় / কখন কীভাবে হয় / কার যে কখন হয় /কেন হয়, বলা বড় দায় ।‘ কবি এবং কবিতার ক্ষেত্রে ও আমি গঙ্গাধরের রহস্যময় উক্তিকে বিশিষ্ট মুল্য দেই।

কবি জিললুর রহমান
আপনার ‘অন্য মন্ত্র’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রার্থিত অনিয়ম’ কবিতাটির কথাই ধরুন । উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বময় একটি কবিতা। খুব সহজ হয়ে উঠে আসছে—সহজের ভেতর দিয়েই একটা গভীর ব্যঞ্জনার দিকে যাত্রা করছে। কোনো বিদ্যুৎ চকিত উপমা নেই—একটা আহবান একটা আবেদন শ্রবণ প্রতিমা হয়ে চলতে চলতে একটা অপরূপ দৃশ্যকল্পে গিয়ে পৌঁছায় –এবং স্মৃতিকল্পে নিয়ে আমাদেরকে বলে ‘স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলো পুস্তকের ধুলো কিংবা / অবিবেকী শব্দের সম্ভার।‘
              প্রার্থিত অনিয়ম
ভুল হলে স্মৃতি থেকে দু’একটা শব্দ ফেলে দিও
অপছন্দ ইতিহাস বদলে নিও নিজের নিয়মে
মাটির সারিন্দা হাতে শুভক্ষণে সরস্বতী এসো
বর্ষার আকাশ থেকে কিছু মেঘ উপড়ে থুবড়ে ফেলো।

মোটামুটি অনিয়ম চাই , চাই তীব্র ব্যতিক্রম কিছু
ভোর থেকে সনধে অব্দি নিয়মের এতটা অনুকরণ
                         মানবিক প্রাণের বিরোধী
প্রচার মাধ্যম থেকে সর্বময় বিনোদন
বিপক্ষের দখলে রয়েছে জানি, তারপর ও
অস্থিতে রুক্ষতা আজ ভীষণ কামনা।

জলের ওপর থেকে শ্যাওলার পাতলা আস্তর তুলে নিলে
টলটলে জল পাবে
তোমার চিবুক থেকে সমগ্র মানস
দেখে নিও জলে ।
অপছন্দ হলে বদলে নিও ভীরু গতায়াত
ভুল হলে ভুলে যেও
স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলো পুস্তকের ধুলো কিংবা
অবিবেকী শব্দের সম্ভার ।
কবিতাটিতে একটা কালিক স্মৃতি আছে। চমৎকার উন্মোচন আছে। স্মৃতি ভোলার কথা আছে- আসলে ভোলা নয়, স্মরণ। মাটির সারিন্দা হাতে সরস্বতীকে শুভক্ষণে আসার আহবানের সাথে বর্ষার আকাশ থেকে মেঘসরানোর কথা আছে। মাটির সারিন্দা হাতে সরস্বতী আর বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ একটা ছবি তৈরি করে দিলো। খুব সাধারণ ছবি নয় কিন্তু। এ ছবি থেকে যেখানে এসে দাঁড়াই—সেখানে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে পেয়ে যাই। অস্বস্তিকর অগ্রহণযোগ্য দখলদারী স্বৈরবাস্তবতার বিরুদ্ধে – মানবিক প্রাণবোধের পক্ষে একটা প্রতিবাদ আছে – যা চীৎকার নয় । স্বৈর – নিয়মের বিরুদ্ধে ‘ মোটামুটি অনিয়ম চাই, চাই তীব্র ব্যতিক্রম কিছু’। এখানে কবিতাটি ব্যতিক্রম –কেন না সে যে ব্যতিক্রম চায় তা অনিয়মের ব্যতিক্রম। একটা দ্রোহ আছে –স্বপ্নের জন্য জীবনের জন্য। এর পরেই কবিতাটা একটা মোচড় দিয়ে ওঠে—অন্য এক দৃশ্যপ্রতিমায় নিয়ে যায়—রীতিমতো চমকে দেয় একটা চিত্রকল্পে। তারপর একটি মানসকল্প ,তারপর একটি গভীর স্মৃতিকল্প।মননশীল পাঠকের জন্য একটা অভিজ্ঞান আছে—‘ জলের ওপর থেকে শ্যাওলার পাতলা আস্তর তুলে নিলে / টলটলে জল পাবে’ ।‘ টলটলে জল ‘ আয়নার মত স্নিগ্ধ প্রাশান্ত জল – যে জলে শুধু সমগ্র মুখশ্রী ভেসে উঠবেনা – চিত্রায়িত হবে মানসীর সমস্ত মানস ভূগোল।
তারপর ও কবি খুব সাবধানী—বলে রাখছেন ভুল যদি কিছু ঘটে—ত্রুটি যদি কিছু হয় – ‘ স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলো পুস্তকের ধুলো কিংবা / অবিবেকী শব্দের সম্ভার ‘। এখানেই কবিতাটি্তে কবি একটা ইন্দ্রিয়জ দৃশ্যকল্প
থেকে আরেকটা ইন্দ্রিয়জ দৃশ্যকল্পে পৌঁছে দিয়ে অনেকটা ‘ সিনেস্থেসিয়া ‘ তৈরি করেন যা পাঠককে অভিভুত করে । বার বার উচ্চারণ করতে ইচ্ছা করে – বলতে ইচ্ছা করে ‘’ জলের ওপর থেকে শ্যাওলার পাতলা আস্তর তুলে নিলে / টলটলে জল পাবে ‘’ । শ্রবনেন্দ্রিয়ে বারবার ধ্বনিত হতে থাকে – টলটলে জল পাবে । এখানেই মুগ্ধতা এবং উত্তম কবিতার পংক্তিতে স্থান করে নেয় ‘ প্রার্থিত অনিয়ম’।

প্রিয় জিললুর রহমান
মালার্মে বলেছিলেন—ভাব দিয়ে নয় কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে। আমরা কবিরা ও সমালোচকরা বলে থাকি ‘ যথাশব্দ ‘। কথাটা বলা যতটা সহজ মানাটা ততটা কঠিন। ম্যাথু আর্নল্ড বলেছেন–কবিতায় ভাব–ভাব অনুযায়ী শব্দ এবং ভাষা চয়িত হবে। এলিয়টের ভাবনাও ছিল প্রায় সেরকম । যদিও এলিয়ট বলতেন—কথা বলতে গেলে তো শব্দ দিয়েই সস চালাই। আর্নল্ড বিশ্বাস করতেন গম্ভীর অর্থবহ তাৎপর্যপূর্ণ সিরিয়াস বিষয়ই কবিতার বিষয়বস্তু হবে আর সে অনুযায়ী কাঠামো শব্দ ভাষাভঙ্গি নির্বাচিত হবে। লুই ম্যাকনিস ‘ আজকের কবিতা’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন এবং অনেকটা মজা করেই বলেছিলেন—কবিরা জানেন না যে তার কী করছেন। আর যদি সত্যই জানতেন তা হলে তা করবার দরকার হতো না। এর পরেই যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো যেমন চমৎকার এবং কবিতার জন্য কবিদের জন্য এবং পাঠকের জন্য কাজের কথা। তাঁর যুক্তিটা এ রকম—কবিতা পাঠ করলে পাঠকের মনের কী লাভ হবে তা জানা না থাকলে কবিতা পড়বার কোনো কৌতূহলই পাঠকের বোধে জাগবে না। এবং স্বাভাবিক ও সংগতভাবেই পাঠক ধরে নেবে যা পড়ে কোনো লাভ নেই তা লেখারই বা দরকার কী? কথাটা ফেলবার মতো নয়। বিষয়টি পাঠক বা লেখকের আত্মসচেতনতা ও দায়িত্বসচেতনতার ব্যাপার হয় দাঁড়ায় । ‘ কবিতা কি ও কেনো’ শিরোনামের একটা প্রবন্ধে রসিকতার সাথেই কবি হুমায়ন আজাদ বলেছেন—‘ কবিতা কি ও কেনো’— “ যদি জিজ্ঞেস না করো, তা হলে আমি উত্তর জানি; যদি জিজ্ঞেস করো, তা হলে জানি না ‘’। যেহেতু কবিতা রহস্যময় বলেই তার কোনো ধ্রুব সংজ্ঞা নেই। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কবিতার বিশেষ সংজ্ঞা থাকলে কবিতা বাঁচতো না অথবা কবিতাকে বাঁচানো যেত না । তবে কবিতা আমরা কেন লিখি বা লিখতে হয় এরকম একটি প্রশ্ন তুলে – কবি সৈয়দ শামসুল হক নিজেই তার অভিব্যক্তিতে বলেছেন “ কবিতার ভেতরে যে কবিব্যক্তি,তাঁর ও কবিব্যক্তি যেহেতু সমাজবাসী, সেই সমাজের—এবং যেহেতু কোনো একটি সময়ের,অতএব সেই সময়ের—এই তিন অভিপ্রায় এবং এই তিন অভিপ্রায়ের সম্বন্ধচিত্র আবিষ্কার করবার প্রেরণাই কেবল হতে পারে কবিতা বিষয়ে লেখার একমাত্র যুক্তি।‘’

কবি জিললুর রহমান
এবার আপনার ‘ অন্য মন্ত্র ‘ র ‘মেটামরফসিস’ কবিতাটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। মেটামরফসিস মানেই কাফকা [১৮৮৩-১৯২৪ ]। আর কাফকা মানেই অস্তিত্বের স্বরূপ উন্মোচনের এক জটিল দুরূহ সাহিত্য প্রচেষ্টা। এ এক আশ্চর্য নির্মম রুপান্তরের মহাকাব্য–একটি নভেলার ভেতর দিয়ে –ব্যক্তি পরিবার সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সমগ্র মানব অস্তিত্বের সংশয়গ্রস্ত দলিত মথিত আত্মার অন্তর্গত অর্ধস্ফুট শ্বাস-প্রশ্বাস মাত্র।এ এক মুমূর্ষু নীরব অথচ ভয়াবহ আর্তনাদ নিঃসঙ্গ মানবতার। ফ্রাঞ্জ কাফকা কী অন্টোলজিক্যাল প্রিজন [অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা বা সীমাবদ্ধতার অস্তিত্ব] থেকে মুক্তি চেয়েছেন না অস্তিত্বের গহীন গভীর জটিল সর্পিল অবস্থা ও ব্যবস্থাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ! কাফকা বলেছিলেন – সাহিত্য ছাড়া জীবন আমি ভাবতেই পারি না । গুস্তাভ যানুখের সাথে আলাপচারিতায় কাফকা বলেছিলেন ‘কেউ যদি নিজের ভাবনাগুলি সহজে প্রকাশ করতে পারে তার তুল্য আর কোনো সুখ নেই’। আমরা জানি কাফকা পেশাগত জীবনের চেয়ে শিল্পী জীবনকেই অপরিসীম মূল্য দিয়েছিলেন আমৃত্যু। তিনি তার শিল্পী জীবনের শুরু থেকেই নিপীড়ন অবিচার প্রভুত্ব প্রতিকারহীন নারকীয় ক্ষমতার ভণ্ডামির উৎসবের ভয়ার্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে নীরব একাকীত্বের ত্রাসের ভেতর দিয়ে এগিয়েছেন । ফলে তার সমগ্র সাহিত্য হয়ে উঠেছে সমাজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে অস্তিত্বের একক লড়াই। ফলে তা্র ম ‘ দি ট্রায়াল’ , ‘দি ক্যাসল’ বা ‘মেটামরফসিস ‘সহ সব রচনাই অস্তিত্বের বেদনাদায়ক উন্মোচনের অসাধারণ নির্মম চিত্রের বাণীবাহক । ‘মেটামরফোসিস’ আপনি এভাবেই শুরু করেছেন——

‘ সমস্ত গ্যালাক্সী জুড়ে একমাত্র নিঃসঙ্গ সূর্য
হে কাফকা, প্রাগের বাসিন্দা,
বড়ো বেশী বেদনার্ত তোমার ওই ‘ মেটামরফসিস’।
এলিগরি হতে পারে, হতে পারে আর ও কিছু বেশী
তবুও গ্রেসর সামসা একাকীত্বে অবিরত
                      তোমারই প্রতীক।‘ বেদনাদায়ক অস্তিত্ব স্বরূপের রূপান্তর – মেটামরফসিস। কেউ কেউ কাফকার রচনাকে রোমান্টিক এলিগরি বলেছেন।সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয় রোমান্টিকতা ছাড়া এলিগরির প্রকাশ অসম্ভব। মনে রাখতে হবে এবং আমি বিশ্বাস করি সাহিত্য ও একধরনের বিপাক প্রক্রিয়ার [ মেটাবলিজম] ভেতর দিয়ে কাজ করে –যাকে আমরা বলি মনোসংশ্লেষ বা মনোপ্রক্রিয়া। আমরা জানি প্রথম থেকেই কাফকা এক্সপ্রেশনিশট ছিলেন । বৈনাশিক বাস্তবতাকে সরাসরি প্রকাশ করতে পারছিলেন না বলে আন্তর অভিজ্ঞতার বা আবেগের প্রতীক ধর্মী প্রকাশের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে মেটা মরফসিসে রূপককে সচেতনভাবে পুননির্মাণ করেছেন নিজের শিল্প বিকাশের প্রয়োজনে ।সামসা তো মুলত কাফকারই সংকেতলিপি । গ্রেসর সামসা বা কাফকা কেন একা? তাদের নিঃসঙ্গতার কারণ অস্তিত্বের বৈনাশিক অবস্থা, অস্তিত্বের স্বরূপে ধ্বস, অন্টলজিক্যাল প্রিজনবোধে বসবাস। অর্থাৎ আত্মিক-ব্যক্তিক জগতের মূলোৎপাটন , অস্তিত্বের বিলোপ সাধন, স্বৈরতন্ত্রের সর্বগ্রাসী রূপ ,ব্যক্তিত্বহত্যার সামজিক- রাষ্ট্রিক যন্ত্র যা মানুষকে কীটপতঙ্গে বা সরীসৃপ হিসাবে ভাবতে বাধ্য করে। কাফকার গল্পগুলি কী রূপক না প্রতীক ? আমি মনে করি কাফকার গল্প রূপক কাফকার গল্প প্রতীক কাফকার গল্প মূর্ত কাফকার গল্প বিমূর্তের বাস্তবতা। বিশ্বের তাবৎ সকটের অন্তরালে—বাস্তবতার ভেতরে বাস্তবতার আরেকটা যে ছবি যা বিমূর্ত আকারে শিল্পী মনে আশ্রয় নেয় কাফকা সে দুর্বিষহ অমানবিক রূপকেই আমাদের সামনে তুলে ধরেন । তাই আমরা দেখি’ দ্য ত্রায়াল’ এর জোসেফ কে ‘দ্য ক্যাসল’ এর কে এবং ‘মরফোসিস ‘ এর সামসা মুলত স্বাভাবিক যুক্তিবর্জিত সমাজের বাসিন্দা—যাদের বর্ণ গন্ধ স্পর্শ কাফকা প্রতিমুহূর্তে খুঁজে পেয়েছেন জীবন বা সামাজিক রাষ্ট্রের চার দেয়ালের ভেতরে। যাকে আমরা বলছি একাকীত্ব – যার অপর নাম বিচ্ছিন্নতা , সেই বিচ্ছিন্নতা প্রতিটি মানুষের জীবনের মধ্যেই প্রতীয়মান থাকে- কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে ও সার্বজনীনতায়। কাফকা বলেছিলেন , শিল্প হচ্ছে শিল্পীর কাছে একধরনের যন্ত্রণার স্বাদ নেয়া । যন্ত্রণাকে বরণ ও আস্বাদনের জন্যই শিল্পী নিজেকে প্রকাশ করেন। এবং শিল্পী তো খাঁচায় বন্দি এক পাখি। যানুখ জিজ্ঞাসা করেছিলেন—আপনি ও কি বন্দি পাখি ? কাফকা হাসতে হাসতে বলেছিলেন – আরে আমি তো একটা অসম্ভব পাখি। একটা দাঁড়কাক কাফকা। আবার অন্যত্র এক অসাধারণ বাক্য চয়ন করেছেন – যা মানবের মনোজগতের আর্তনাদকে বিশ্বময় রিক্ততায় ছড়িয়ে দেয়। কাফকা বলেন ‘ আমি হচ্ছি একটা খাঁচা । একটা পাখির সন্ধানে আছি ‘। এখানে পেয়ে যাই তার আত্মার অনুসন্ধানী মনের খবর শিল্পী চৈতন্যের খবর। এরকম কথা যিনি উচ্চারণ করতে পারেন তাকে কী বলা যাবে এবসার্ড মানুষ ?
মাত্র ৬টি লাইনে অঙ্কিত হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ‘মে্টামরফসিস’ । কবিতাটি যেন কাফকাকে আলিঙ্গন করে বলছে ‘বড়ো বেশী বেদনার্ত তোমার ওই মেটামরফসিস ‘। একটি সত্যকার মেধাবী কাব্যবোধন পাওয়া গেলো মেটামরফসিসের শুরুতেই।
আমার কেন জানি মনে হয় বাংলা ভাষার ‘ রূপান্তর’ শব্দটি গ্রিক ‘ মেটামরফসিস’ [ ট্রান্সফরমেশন ] শব্দের বৃহৎ আয়তনকে ধরতে পারে না। গ্রেসর সামসা ও তার জীবনের রূপান্তরটি কীভাবে ঘটে কবিতার সীমাবদ্ধ পংক্তিতে সে বিষয়টি পাঠকের জন্য অনুসন্ধিৎসা তৈরি করে। বুকের ভেতরটা অন্ধকার কারাগার –আলোহীন বিষাদের এক নরক। শুক্লপক্ষের চাঁদের আলো বাইরে অস্থির অস্বস্তিতে বাড়ছে। ঘরের দেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিয়তি রূপান্তরিত পোকামাকড়—যানুখ কাফকাকে দেখে যেভাবে মন্তব্য করেছিলেন – ইনি কী নিজেই সেই ভাগ্যহীন ‘ দ্য মেটামরফসিস ‘ এর সরীসৃপ নন? রূপান্তরের চিত্রটা একটা অসাধরণ ছবিবোধ তৈরি করে – স্মরণ করিয়ে দেয় মহাযুদ্ধের ধংসযজ্ঞের কথা ছারখার জীবন পোড়ো জমি ইউরোপ জুড়ে সীমাহীন ইহুদী বিদ্বেষের কথা। বেদনার ঘূণ পোকা হৃদপিণ্ড কাটে- কাটে , কেটে যেতে থাকে শুধু। যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে নিয়তি নির্ধারিত কাঠামো । এখানে পাই কবির যৌক্তিক নির্মাণ কুশলতা।

‘ অস্বস্তি শুক্লার চাঁদ বাড়ে ধীরে ধীরে
বেড়ে ওঠা খুবই স্বাভাবিক।গ্রেসর সামসা আহা!
কী ভীষণ পোকার নিয়তি !
ঘরের কার্ণিশ বেয়ে ড়ূপায়িত পোকার চারণা;
অস্বস্তির ভারে নত পরিবার সকল স্বজন।
      মহাযুদ্ধ
          ‘পোড়ো জমি’
                সারা ইউরোপ
ইহুদি বিদ্বেষ নিয়ে ফুঁসে ওঠে হালাল জার্মান ,
                    খ্রিস্টের ভক্ত শিশুর দল ।
হৃদপিণ্ডে বেদনার ঘূণ, জনকের অযত্ন ভ্রুকুটি

সমসাময়িককালের একটি বোধপ্রতিমা অস্বস্তির শুক্লার চাঁদের দৃশ্যময় অশুভ আবহ, চিন্তায়িত আবেগ, ইন্টেলেক্ট ও ইমোশন এখানে আমাদের চকিত ও আক্রান্ত করে। কাফকার জীবন ও রচনার সাথে যাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে এ কবিতা তাদের কাছে সর্বগ্রাসী বেদনার চলচ্চিত্র হয়ে দেখা দেবে। ঘরের কার্ণিশ বেয়ে রূপায়িত পোকার ঘৃণ্যচিত্র যা জীবনের বিব্মিষা উদ্রেক করে – তার ছবিটি আমাদেরকে অসহায় এক নিয়তি নির্দেশিত রিক্ততার দিকে নিয়ে যায় । জীবনবোধ ইতিহাসচেতনা বেদনার ঘূণে খাওয়া নিরন্তর ক্ষয় –অবক্ষয় এবং সমস্ত পরিবারের বাস্তব মানসিক ভঙ্গুর অবস্থা মিলে যে প্রতিমাপুঞ্জ তৈরি হয় তা একটি বিশেষ পার্সোনিকেশনের মধ্য দিয়ে একটি ব্যঞ্জনাময় কাব্যস্বস্তি প্রদান করে । বারবার উচ্চারিত হতে থাকে – ‘ অস্বস্তির শুক্লার চাঁদ বাড়ে ধীর ধীরে ‘ অথবা ‘হৃদপিণ্ডে বেদনার ঘূণ, জনকের অযত্ন ভ্রুকুটি ‘। কবিতাটি কী দারূণ সার্থকতায় আমাদেরকে পুঁজিবাদী জীবনে কাফকার নিয়তির মতোই আমাদের নিজেদের নিয়তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ।জিললুরের কবিতার মধ্যে একটা পরিমিতিবোধের প্রাণময়তা আছে বাংময়তা আছে। আর আছে মেলিফ্লুয়াস ব্যক্তিস্বর। এই ব্যক্তিস্বর কীভাবে সচেতন কবির কবিতায় সহজেই প্রগাঢ় রূপ নেয় –তা দেখি মেটামরফসিসের হৃদয় নিংড়ানো শেষ ৩টি লাইনে।
‘ সামসা মরতেই হবে। মরণেই শুভ পরিণতি;
কাফকার আয়ু কমে
বিকেলের আলোর মতোন ‘।

একটা বিস্ময়কর সমাপ্তি । ‘ কাফকার আয়ু কমে / বিকেলের আলোর মতোন ‘। এই শেষ দুটি লাইন আমাদেরকে এক অরুন্তুদ স্বস্তির স্বজ্ঞায় ও প্রজ্ঞায় পৌঁছায় । কারণ কবিতাটিতে কোনো বাড়তি মেদ নেই, পল্লবগ্রাহিতা নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দ ও যেন প্রজুক্ত হয়নি – অথচ কাফকার সামসার সামগ্রিকবোধের আয়তন রূপায়িত হয়েছে। সুন্দর কবিতা এভাবেই সঞ্চারিত হয় চেতনের পরতে পরতে ।
এবার কাফকা সম্পর্কে কিছু সাধারণ কথা, কাফকার নিজের কথা , গুস্তাভ যানুখের সাথে কাফকার কিছু কথা বলে নিতে চাই। চাই কাফকার চিন্তা সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে – যাতে তাঁর শিল্প চিন্তা ও আত্মার কারাগার বিষয়ে একটা বোধ গড়ে তোলা যায়।
কাফকা যানুখের সাথে আলাপচারিতায় বলেছেন ‘ প্রত্যেকটি লিখিত শব্দই তো ব্যক্তিগত দলিল । কিন্তু শিল্প’।
একবার একটি পত্রিকা সাক্ষাতকারে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলো – লেখার ক্ষেত্রে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পন কী? কাফকা নাকি হেসে বলেছিলেন—আগামীকাল একজন মানুষের হৃদস্পন্দন কেমন থাকবে সে কি আজকে বলতে পারবে ? কখনোই তা সম্ভব নয় । কলমই তো হৃদয়ের ক্ষেত্রে ভূ কম্পনিক পেন্সিল। কিন্তু ভূ কম্পনে চিহ্ন ধরে সে পূর্বাভাস দিতে পারে না ।
কাফকা যানুখকে বলেছেন—আধুনিক সময়ের রচনাতে সমকালের একধরনের কম্পিত ছবি অংকিত হয়। এসব ছবি আবার দ্রুত মিলিয়ে যায় । তোমার উচিত ধ্রুপদী গ্রন্থ পাঠ করা –যেমন গ্যায়টে । যার লেখার গভীরতা আছে এবং স্থায়িত্ব আছে। সাম্প্রতিকের রচনা আজ সুন্দর মনে হতে পারে , কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগামঈকাল হাস্যকর ও ফেকাসে হয়ে পড়ে।
যানুখ জিজ্ঞাসা করেন – আর কবিতা – কবিতার ক্ষেত্রে ? কাফকা বলেন, কবিতা জীবনের রূপান্তর ঘটায় । ক্কখনো বা আর ও খারাপ। যানুখ কাফকাকে বলেন – আপনার গল্পে রয়েছে সূর্যালোকের মতো গভীর প্রেম । কিন্তু তা কখনো উচ্চকিত হয়নি। কাফকা গম্ভীর স্বরে বলুলেন—যৌবন সুর্যালোক বলেইতো প্রেমের এবং সুখের। সৌন্দর্য দর্শনের ক্ষমতাতো এসময়েই থাকে। যৌবন ক্ষমতা লোপ পেলে শুরু হয় বার্ধক্য ও অসুখী অবস্থা । যারা সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও দর্শনের ক্ষমতাকে সজীব রাখতে পারে তারা কখনো বৃদ্ধ হন না। কথায় কথায় গুস্তাভ যানুখ বললেন—‘ দি স্টোকার ‘গল্পে আপনি কিন্তু তরুণ ও সুখী। কথাটা শুনেই কাফকার মুখ ঝাপসা হয়ে গেলো এবং বললেন বেদনাময় কণ্ঠে—স্টোকার আসলে স্বপ্নের স্মৃতি—যা হয় তো বাস্তবে ছিলো না। আর কার্ল রোস্মান তো জ্যু ছিলো না ।‘ আমরা জ্যুরা জন্মাই বৃদ্ধ হয়ে’ । আমার মনে হয় এই বাক্যটিই কাফকার দীর্ঘতম দীর্ঘশ্বাস এবং সমগ্র জীবনের বেদনার্ত পরিচয়।
যানুখ যখন বলেন’ দি মেটামরফসিস’ এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন এবং ভয়ংকর কল্পনা । বিষাদ্গ্রস্ত কাফকা বলেন মেটামরফোসিস কোন স্বীকৃতিমুলক রচনা নয় । কোনো এক অর্থে এটা একটা হঠকারিতা। তিনি বলেন নিজের পরিবারের ছারপোকা সম্পর্কে আলোচনা বা গল্প করা বিচক্ষণতা বা রুচিযোগ্য কাজ নয়। কাফকা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন আমি এখন বাড়ি ফিরবো । তবে মনে রেখো –কাফকা বলেন’ স্বপ্ন সত্যকে উদ্ঘাটন এবং আবিষ্কার করে ,সেখনে কল্পনা খুব ছোটোখাটো ব্যাপার। এখানেই জীবনের বিভীষিকা আর সমস্ত শিল্পের ভীতি ‘।
[ কাফকা সম্পর্কিত কথোপকথনমুলক আলোচনায় কমলেশ চক্রবর্তী কর্তৃক ভাষান্তরিত গুস্তাভ যানুখের ‘ আলাপচারীতায় কাফকা ‘ প্রবন্ধটি ব্যবহার করা হয়েছে ]।
আমরা জানি সারাজীবন কাফকা প্রচলিত বৈনাশিক সমজকাঠামো ও জীবনযাপনের বিরুদ্ধে তাঁর জীবন ও সাহিত্যে সংগ্রাম করেছেন। যে ব্যবস্থা তাকে তাঁর ব্যক্তিত্ব চিন্তাবোধ সবকিছুকে জবরদস্তি ও স্বৈরতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করে সেই ব্যবস্থার মধ্যেই জন্ম নেয় উদ্ভ্রান্ত উন্মত্ত উন্মাদ মধ্যবিত্তের প্রতিভু ‘ কে’ । এরা এমন এক অদৃশ্য আইনি ব্যবস্থার জন্ম দেয়—যা এক চূড়ান্ত স্বৈরাচার নঈরাজ্য মুলক স্বেচ্ছাচারিতা। যেখানে ক্ষমতাধরের হাতে সব অবাস্তবই বাস্তব। বিদ্যমান ক্ষমতাই নির্বাচন ও নিড়ড়ধারণ করে নিয়তি। ক্ষমতা প্রতাপ নিপীড়ন নির্যাতন ও বিনাশের রূপকের ছদ্মবেশে যারা মূলহোতা সেইসব ভদ্রলোকদের আমরা চিনে ফেলি নির্জন বধ্যভূমির পরিবেশে –যারা কুকুর আর হায়েনার চেয়ে হিংস্র। ফলে সন্ত্রস্ত অস্তিত্বহীন ছিন্নমূল বিযুক্ত কাফকাদের আশ্রয় নিতে হয় অচেনা অজ্ঞাত দুর্গের মধ্যে—যেখানে নিয়তি নিয়তিকে নির্ধারোণ করে । এ হলো আরেক রূপান্তর। কাফকা কিন্তু জানতেন—কোনো তন্ত্রমন্ত্র বিদ্রোহ- বিপ্লব এ অবস্থা ও ব্যবস্থার স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। পরিবর্তিত ব্যবস্থা আবার বুর্জোয়া আমলাতান্ত্রিকতার কবলে পড়ে নতুন বোতলে পুরাতন মদেরই অস্তিত্ব নেবে। সে কারণেই কাফকার মুখ ও কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিলো সেই অসাধারণ উক্তি – “Every revolution evaporates and leaves behind only the slime of new BEAUROCRACY “.

কাফকা সম্পর্কিত আলচনাটি শেষ করচ্ছি নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ইলিয়াস কানেটির মরফোসিস বিষয়ক একটি মন্তব্য দিয়ে । “ In The Metamorphosis Kafka reached the height of his mastery:
Hr wrote something which he could never surpass,because there is nothing which
The Metamorphosis could be surpassed by—one of the great, perfect poetic works of this century “. [ The Metamorphosis – Franz Kafka . Translated and Edited by Stanley Corngold . ]

প্রিয় জিললুর রহমান
এবার আপনার ‘অন্য মন্ত্র ‘ কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটি ভালো সুন্দর নিটোল কবিতার নির্বাচিত পংক্তি তুলে ধরছি—যা আমার কাছে আপনার কাব্যসিদ্ধির প্রমাণ জানায়। শাঙ্করভাষ্যের মতে কবি ক্রান্তদর্শী—প্রজ্ঞাসাধ্যতার মধ্য দিয়ে জীবনভাষ্য রচনা করতে পারেন। সৎ কবিতার স্পর্শে এলে কবি বা মহৎ কবিতা পাঠক উৎস্যক ধ্যানী পাথকের মধ্যে পরশপাথরের জাগরণ ঘটে।তবে আমি বেশি উদ্ধৃতি চয়ন করবো না, নেবো সেইসব ইঙ্গিতবহ উজ্জ্বল পংক্তি সমূহ কিছু – যেগুলো কবিতারই আলোক স্থাপত্য। ‘সন্তাপী পাথর’ একটি উৎকৃষ্ট কবিতা।যেন কোনো দূর অতীতের সাথে যেন কাছের বর্তমানের সাথে দূর কোনো ভবিষ্যতের সাথে সাঁকো বেঁধে দেয়। শেলী ট মহৎ কবিতায় বর্তমানের ঊপর ভবিষ্যতের ছায়াপাতের কথা গুরুত্ব দিয়ে ্বলেছিলেন ।
           সন্তাপী পাথর
‘ যমুনার ঘোলা জলে থেমে আছে এ কোন পাথর!
চরে বা কিনারে নয়
দ্বীপের অস্তিত্বে মাঝ গাঙ্গে ভাসমান
                              ইব্রাহিমের মোকাম।‘
কে এই ইব্রাহিম বা তার মোকাম নিয়ে প্রশ্ন করা জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে কবির ইমেজ তৈরিতে ভাবাননুষঙ্গের বাগানুষঙ্গের এবং প্রতীকী প্রকাশের জন্য কবির কাছে বিষয়টি কতটুকু প্রয়োজন। প্রথম দৃষ্টিতেই ঝিলিক্মেরে ওঠে লাইঙ্গুলো, পাঠময়তায় টেনে নেয় অর্থময়তার কথা আসে পরে – এখানেই জিললুরের কবি পারংগমতা। জিললুর ভালোভাবেই জানেন কবিতার চেয়ে উপকরণ বড় হয়ে উঠলে কবিতার মৃত্যু ঘটে । বোধ হয় শব্দগুলো ওজন করে মাপা। শিল্পে মনস্তাত্ত্বিক নিয়মের অপরিহার্যতা মান্য করলেই সহজিয়া পথে উঠে আসে কাব্যভাষণের বিশেষ ভঙ্গি।

‘প্রিয়জন অনিকট, হয়তোবা
আর ও দুঃখ জলের আরশিতে কাঁপে
            নদীর পাথর এসে তীরে নয়
               কুমারীর বুকে গিয়ে ঠেকে’।
মোক্ষম কথাটা –মেসেজটা এখানেই। পাথরটা তীরে এসে ঠেকে না। ঠেকে গিয়ে কোনো এক কুমারীর বুকে ।আর কবিতা বাস করে যমুনার তীরের কুমারীর হৃদয়ে। কী করে পাথরটা কুমারীর বুকে ? কি কাজ তার কুমারীর বুকে ? আছে একটা কাজ – কবিতা রচনার। কীভাবে রচিত হচ্ছে কবিতাটি ।

‘ পাথরের বীণা বাজে ভাদ্রের বৃষ্টিতে,
নদীর সম্ভ্রান্ত ঢেউ
হালিমার স্নেহতায়পাথরের যত্ন নেয়,
দুঃখী ও সন্তাপী এ পাথর বুকে ধরে ,
এ পাথরে সুখ নেই এপাথরে শোক আর ও বাড়ে।‘
যে পাথর সন্তাপী হয় , অথচ যে পাথরে সুখ নেই ,যে পাথর শোক আর ও বাড়ায় –সেই বেদনা পাথরই তৈরি
করে অনন্য কবিতা। আকাশ কুসুম, রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া, সবুজ ছাতার কবি, রূপকথা –র কথাস হিসাবে বিশিষ্ট।

প্রিয় জিললুর রহমান
এবার আপনার ‘ শাদা অন্ধকার’ নিয়ে আলাপে যেতে চাই। আপন বোধে উচ্ছ্বাসে হাসিতে প্রকাশে সযম ভালবাসেন। একজন কবির পরিমিতবোধ বা কম্পোজিশন সেন্সই তার কবিব্যক্তিত্ব। ‘শাদা অন্ধকার ‘ এর ভূমিকায় আপনি বলেছেন – “ আমার কবিতা এক সৌম্য সভ্যতার প্রাজ্ঞ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ; আবার কখনো কখনো নারী ‘ স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের তুমি’। আমি কখনো তীব্র আবেগে ভাসতে ভালোবাসি, আবার কখনো ছন্দ শব্দ রূপক ইত্যাদির উচ্ছ্বাসে সংযমে হাসতে ভালোবাসি। কবিতা যে ন সারাটা জীবনই মধুভাষিণী বহুরূপী হয়ে থাকে।আমার কবিতা সারাদিনমান ভালোবাসাটাকে ডাকে। আমার অভিজ্ঞতা আর আমার বহমান স্বপ্ন মুহূর্ত ধরে রাখবার নিরন্তর। সাধনাই আমার কবিতা ।“
এ আত্ম পরিচয় উচ্চারণের আগে আপনি বলেছেন –“ আমার কবিতা আমার ভাবনা চিন্তার সুন্দরতম প্রকাশ । যে প্রশান্ত সুংস্কৃতিতে আমার বেড়ে ওঠা, যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমার সমাজের, যে শুভ্র স্বপ্ন আমার হৃদয়ের –সেই অনন্ত সৌন্দোর্‍্যের রূপায়ণ প্রচেষ্টাই আমার কবিতা। আমার কবিতা আমার প্রেম আমার জীবন আমার স্বপ্ন, সব—
সবকিছু একসাথে একাকার ।“
আমার মনে হয়, কবি জিললুর – শুধু আপনিই নন—আমাদের অধিকাংশের মনই ‘ স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের তুমি ‘র সংস্কৃতিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। আর যেহেতু আমরা কবি, স্বপ্ন যেমন আমাদেরকে অধিকতর আক্রান্ত করে, বেদে বা জিপসিদের মতো ঘোরায় তেমনি আবার স্বপ্নভঙ্গের আর্তনাদে কাঁপায় ও বেশি। আর কবি হিসাবে আপনার ‘ তুমি ‘তো শুধু একক কোনো নারী নয়—আপনার দেশ কাল সত্তা নিয়ে সমূহ মনোজাগতিক ও বাস্তব ভুবন যা আপনার কবি মানব চিন্তনকে ধারণ করে । পৃথিবীর যে কোনো সৎ কবি মনে করে সে ‘ সৌম্য সভ্যতার প্রাজ্ঞ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ‘। মনে করতে সে বাধ্য, যদিও অজস্র সহস্র অসৌম্য অপ্রাজ্ঞ অসভ্যতাকে মানুষের উত্তরাধিকার হিসাবে সে দেখেছে। কিন্তু স্বপ্নই কালকা পালটায় , এমন কি মানবের দূর-ভবিষয়তকে ও । বর্তমান প্রতিমুহূর্তে বিলীয়মান অতীতের আটলান্টিক গহ্বরে । বাকি শুধু ভবিষ্যত—অনন্তের অসীমের। ভবিষ্যতই একমাত্র কাল – যা মহৎ কবির কাছে আগেভাগে এসে ধরা দেয় – একটা প্রাজ্ঞ সৌম্য জগতের , প্রাজ্ঞ মানবিক সংস্কৃতির জগত গড়ে দেয় , যা কবি বর্তমান হিসাবে – ভবিষ্যৎ স্পর্শিত সময়ের বক্তা হিসাবে প্রকাশ করেন। যদি নৃবিজ্ঞানের ভাষায় বলি – ‘ Culture is the man-made part of the environment ‘ –তখন ও কথাটা একইভাবে সত্য।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ শিল্পই হচ্ছে আত্মসংস্কৃতি, সম্যক রূপদানই সংস্কৃতি, তাকেই বলে শিল্প । আত্মাকে সুসংযত করে মানুষ যখন আত্মার সংস্কার করে , অর্থাৎ তাকে দেয় সম্যক ‘ রূপ’, সে ও তো শিল্প। মানুষের শিল্পের উপাদান কেবল তো কাঠপাঠর নয়,মানুষ নিজে। বর্বর অবস্থা থেকে মানুষ নিজেকে সংস্কৃত করেছে এই সংস্কৃতি তার স্বরচিত ছন্দোময় শিল্প। এই শিল্প নানা দেশে , নানা কালে ,নানা আকারে প্রকাশিত , কেননা বিচিত্র তাঁর ছন্দ। [ ছন্দ- রবীন্দ্রনাথ ]।
অথচ, কী আশ্চর্য! দেখুন , ‘ সংস্কৃতি ‘ শব্দটি আমাদের বাংলা ভাষাতেই ছিলো না। আমরা হয় ইংরেজিতে ‘ কালচার’ বলেছি – রবীন্দ্রনাথ কখনো কখনো ‘ কলচর ‘ বলেছেন । জর্মনে শব্দটা ‘ কালটুর ‘ । আমরা সংস্কৃতি বলতে ‘ কৃষ্টি ‘ শব্দকেই ব্যবহার করেছি। সংস্কৃত ‘কৃষ্টি’ মানে কর্ষণ বা চাষ। এই অর্থে সুদীর্ঘকাল আমরা প্রাত্যহিক জীবনযাপনের নিয়মরীতি আর মনোজাগতিক লেনদেনের কথা বলি – সবকিছুতেই আমরা ‘ কৃষ্টি’ কেই ধরে রেখেছিলাম – এমন কি রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘ কৃষ্টি’ বহুল ব্যবহার করেছেন । আমরা ভাবতেই পারিনি’কৃষ্টি’ বোঝানোর জন্য অন্য কোনো শব্দ থাকতে পারে । কিংবা আমরা এ খবর ও রাখার চেষ্টা করিনি যে ‘ কৃষ্টি’ বোঝানোর জন্য ভারতের অন্য কোনো ভাষায় ভিন্ন কোনো শব্দ ব্যবহার হয় কি-না বা চালু আছে কি-না। অথচ এই ইংরেজ ভারতেই – একটি বিশেষ অঞ্চলের ভাষায় ‘ কৃষ্টি’ শব্দটি বোঝাতে দীর্ঘকাল ধরে ‘ সংস্কৃতি’ শব্দটি প্রচলিত ছিলো । জানা না থাকার কারণ আমদের বাঙালি অহমিকা এবং ভারতের বিভিন অঞ্চলের ভাষাসমূহের মধ্যে সাহিত ও সাংস্কৃতিক লেনদেনের অভাব। আমার বিশ্বাস দুটোই সত্য। আমাদের ‘ কৃষ্টি’ সংক্রান্ত চিন্তার উপর আঘাত হানার মতো একটি ‘ চমৎকার ‘ শব্দ আবিষ্কার করে বসলেন আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় – ১৯২২ সালে প্যারিসে গিয়ে । প্যারিসে সুনীতি বাবু তাঁর এক মহারাষ্ট্রীয় বন্ধুর সাথে ‘ কালচার’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দেখলেন – তাঁর মারাঠি বন্ধুটি ‘ কালচার’ অর্থে বারবার ‘ সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহার করছেন । বিষয়টি সুনীতি বাবুর মনে ধরা যায়। মারাঠী বন্ধুর সাথে আলাপে সুনীতি বাবু জানতে পারেন ‘ কালচার ‘ এর প্রতিশব্দ হিসাবে ‘ সংস্কৃতি ‘ শব্দটি মারাঠি ভাষায় দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সূনীতি কুমার দেশে এসে ‘ কৃষ্টি’ শব্দের পরিবর্তে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহার করা যায় কি-না রবীন্দ্রনাথের অভিমত জানতে চান । রবীন্দ্রনাথ সাগ্রহে ‘কৃষ্টি’ শব্দের চেয়ে ‘ সংস্কৃতি’ শব্দটিকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেন । এ ছাড়া ও রবীন্দ্রনাথ ‘ সাহিত্যের পথে ‘ নামক প্রবন্ধে ‘ঐতেরেয় ব্রাহ্মণ’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন – ‘ আত্মসন্সকৃতির্বাব শিল্পানি ‘। অর্থাৎ মানুষ সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সাহিত্যে –নিজেকেই নিজের মতো গড়ে তুলেছে । ‘সংস্কৃতির রূপান্তর ‘ গ্রন্থে শ্রী গোপাল হালদার কথাটিকে এভাবেই বলেছেন –“ মানুষের জীবন সংগ্রামের বা প্রকৃতির উপর অধিকার বিস্তারের মোট প্রচেষ্টাই সংস্কৃতি ।“ ড পবিত্র সরকার বিষয়টাকে আর ও খোলাসা ও বিজ্ঞানসম্মতভাবেই ‘ লোকভাষা লোকসংস্কৃতি’ তে বলছেন – “ মানূষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিল আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়াল – এ দুয়ের তফাতই হল সংস্কৃতির তফাৎ। মানুষের জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্টি যা কিছু সে সবই ‘ সংস্কৃতি ‘ বাকিটা হল ‘প্রকৃতি’।“ আচার্য নীহার রঞ্জন রায় ও প্রায় একই কথা বলেছেন । তবে এটা ঠিক সংস্কৃতির সকল সংজ্ঞাতেই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে যেতে পারে। যদি বলি ‘ সংস্কৃতি’ মানে ‘ মানুষ ‘ সেখানেও আপত্তির অভাব হবে না । আপাত অর্থে আমরা ধরে নেব মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস এবং চেতনার মুলই সংস্কৃতি ।

কবি জিললুর রহমান
যাক , আপনার কবিতা নিয়ে আপনার নিজের ভূমিকা- কথাটিকে গুরুত্ব দিলাম এ কারণে যে – সেখানে মনের ও মতের একটা অবস্থান আছে । সে সাথে সংস্কৃতি সম্পর্কে ও কিছু কথা বলা গেলো –আমাদের নিজেদেরই স্বার্থে। কারণ আপনি নিজেও জানেন ‘সংস্কৃতি ‘ শব্দের অপব্যবহার সাধারনয়ে- অসাধারণ্যে এবং জনারণ্যে কম হচ্ছে না। আপনার কবিমতকে ধন্যবাদ জানাই।

এবার আপনার ‘ শাদা অন্ধকার’ দিকেই—যে নতুন একটি ‘প্রপঞ্চ’ আপনি আমাদের সমাজ –সভ্যতা- অসভ্যতাকে উপলব্ধির জগতে এনে নির্মাণ করেছেন সে দিকেই একটা সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে যাচ্ছি। আপনার এই কাব্যগ্রন্থকেই আমি প্রকাশ লগ্নেই স্বাগত জানিয়েছিলাম । “ শাদা অন্ধকার – এক নতুন প্রপঞ্চ” নামক একটি ছোট্ট অভিমতে বলেছিলাম – “ যে কবি মাঝগাঙে খূঁজে পান ‘ ইব্রাহিমের মোকাম’ নিশ্চয়ই তার বুকে ও কলবে আছে বিশিষ্ট যাদুর জিকির , ‘ অন্য মন্ত্র’ মায়াবী সৃজনের । জিললুর রহমান অন্য মন্ত্রের কবি এবং অনন্য মন্ত্রের ও। মন্ত্রই কবিতা সাধনার সিদ্ধিপথ। মন্ত্রের লক্ষ্য শিল্পের অর্জন, রসের মন্থন আর জীবনের ধনকে বোধের ফিনিকে শব্দ-বাক- শিল্পে রূপায়ণ”। এবং এ কথার পরে বলেছিলাম –“ একদিন বাংলা ভাষার কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর দুচোখে দেখেছিলেন’ অদ্ভুত আঁধার ‘। কবি জিললুর দেখেন ও আবিষ্কার করেন এক নতুন প্রপঞ্চ ‘ শাদা অন্ধকার’। যে শাদা অন্ধকারে চক্ষূষ্মানরাই হঠাৎ দ্বিপ্রহরে এক আশ্চর্য’ ‘ ছোঁয়াছে ঝড়ের ক্ষোভে অন্ধ হয়ে’ যায় । মানুষেরা হয়ে ওঠে ‘সকলেই ধৃত্রাষ্টড়, কী বা গান্ধারী’ এবং সকলের চোখে নেমে আসে এক ‘ শান্তিময় প্রচণ্ড অন্ধতা’ প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, এ কেমন দেশ, এ কেমন মানুষের সংসার”।
জীবন জগৎ সংসার তথা মানসভুবনের বুকের ভেতরে হাত দিয়ে অদৃশ্য রক্তের দৃশ্যাবলিকে তুলে আনতে হলে কবিকে সাহসের চোখ মেলতে হয়—সন্ন্যাসী হতে হয় দৃষ্টির প্রাখর্যে – বলতে হয় আমি দেখছি তা-ই সত্য । সব কিছু সুনসান চলছে, ভোরে সূর্য উঠছে আর বিকেলে ডুবছে। মনে হয় সব ঠিকঠাক আছে, ধোপধাপ ইস্তিরি করা ভদ্রস্থ জীবন – পবিত্র ধবল। কিন্তু বাস্তবের এই রূপ এক প্রচণ্ড অপবাস্তবতার ধাঁধা। মানুষ হাসছে কিন্তু ভেতরে কান্না , কেউ দেখছে না নিরন্তর রক্তক্ষরণ। সকলেই চক্ষূষ্মান—কিন্তু জানে না তারা সকলেই অন্ধ । অর্থাৎ এক আত্মপ্রতারণার নষ্টভ্রষ্ট জীবনবোধই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বের সর্বত্র সুখের তৃপ্তির জীবনবেদ । অথচ ধবল আলোর সমস্ত প্রহরই অন্ধকারে ঢাকা কালোবোরকা পরা। এখানে সব মিথ্যাই সত্য ও সুন্দর । অন্ধকার—আলোকময় ঝলমলে অন্ধকার বাজারজাত করছে কর্পোরেট ভূগোল । আর লোভনীয় পানীয়ের মতো নিয়ত আনন্দে গিলছি অন্ধকারের বিষ অথবা বিষের অন্ধকার। আমরা সকলে উন্মাদ সকলেই মাতাল পান করছি শাদা অন্ধকার । উন্মাদ – কেননা আমাদের বোধের মৃত্যু ঘটেছে । মাতাল – কেননা জীবনের শুভব্রতের তাল হারিয়েছি । আমরা কী জানি না এ সব কী ঘটছে ? অবশ্যই জানি জেনেশুনে আত্মহত্যা করছি – বিষপান করছি।
কিন্তু স্বীকরণে বাধা। কেন বাধা ? কারণ আমরা দ্বিপদী মানুষ –মাত্র , মানবিক মানুষ নই । বোধের মানুষেরা আজ প্রেতলোকে। আমরা ভয়ার্ত কিন্তু বাজিকর। আমরা ক্ষূধার্ত কিন্তু ধুর্ত। আমরা সমজসেবক ও ব্যবসায়ী কিন্তু আপাদমস্তক শয়তানের ভাই। আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি সুখের নারকীয় আত্মকারাগার। কে দেবে মুক্তি ? কে নেবে মুক্তি? কে খোঁজে মুক্তি? কে খোঁজে যুক্তি –শুভ ভবিষ্যৎ ? সকলেই বলে – বলাটাই কৃতিত্বের ফ্যাশন। কিন্তু পথের সন্ধান কেউ খোঁজে না । ল্যুইস ক্যারলের [১৮৩২-১৮৯৮] এলিস ইন ওয়াণ্ডার ল্যান্ডের সেই কথাগুলি – দৃশ্যগুলিই ভেসে ওঠে মানসপটে । ‘ But I don’t to go among mad people, Alice remaeked .
‘Oh you can’t help that, said the Cat: all mad here. I’m mad you’re mad ‘”. আর কেউ যেতে চাইলে ও কন পথে যাবে? তখন ট্র্যাফিক পুলিশের বেশধারী বিড়াল আমাদেরকে বলে দেয় ইচ্ছা হলে কেউ যেতে পারো – কিন্তু – “ In that direction lives a Hatter.and in that direction lives a March Hare. Visit either you like: they’re both mad ‘’. অর্থাৎ যে দিকেই যাও , যে পথেই যাও – দুদিকেই বসে আছে দুজন উন্মাদ ও পাগল। অতএব সব পথ রূদ্ধ। সব পথই অন্ধকার ,তবে সে অন্ধকারের রূপ শাদা। একি কোনো রূপক, কোনো প্রতীক , কোনো কল্পদৃশ্য –ইমেজারি ? না, নিতান্ত বাস্তব > যাদের চোখ আছে তারা দেখুক। যদি ও তারা দেখবে না – তারা চক্ষুষ্মান অন্ধ, শাদা অন্ধকারের আশির্বাদে। এসব কথাই কী বলতে চেয়েছেন কবি জিললুর রহমান তার ‘শাদা অন্ধকার’ কবিতায় বা কাব্যগ্রন্থে ? রুঢ় বাস্তবতাকে ধরবার জন্যে কবিকে আশ্রয় নিতে হয় কাব্যিক গদ্যের কাছে অথবা আব্দন্ময়ী গদ্যের কাব্যিকতার কাছে – যা প্রকৃতই কবিতা আশয়ে বিষয়ে প্রকরণে । হোসে সারামাগোকে উৎসর্গিত ‘শাদআ অন্ধকার কবিতায় [ পৃ -১২ । কাব্য গ্রন্থের নাম কবিতা ] কী আছে ? কিছু বোধগ্রাহ্য ও স্মরণীয় কাব্যশরীর আমরা নির্বাচন করে উদ্ধৃত করতে পারি — যাতে বিষয়ের গভীরতা, চিন্তার বিস্তার, বোধের আততি, জীবন্ত কাব্যিকতা ,কবি ব্যক্তিত্ব এবং পরিচ্ছন্ন নির্মিতি আমরা ধরতে পারি । ‘ শাদা অন্ধকার’ এ রকম—

১। সকলেই দেখতা শিখেছি বেশ কিছুকাল—দেখতে পেয়েছি বলেই পাল্টেছিলো শাসন-কানুন ।
  কারো দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ভীষণ কী কারো ছানি পড়া, কেউবা চশ্মার ফাঁকে ঘোলাটে দেখেছি ।
২। মাঝেমধ্যে বিজয়ের কাছে গিইয়ে হাত নেড়ে দেখেছি তো সফল মুক্তির গান
  তোমার ঘাড়ের ‘অরে কালো তিল—টোলপড়া বাঁকানো ঠোঁটের হাসি—দেখিনি কি ?
৩। শাদা অন্ধকারে কেউ আর দেখি না ভবিষ্যৎ –সকলেই ধৃত্রাষ্ট্র, কেউ বা গান্ধারী- কেউ বা
  জীবনানন্দের সেই ‘ যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দেখে তারা’
৪। আমরা যোদ্ধা নই,আমরা ছা- পোষা যত হাভাতে বাঙ্গাল, দেখি না দুর্নীতি বাবু
  চিনি না শকুনি মামা—কখন কি চালে ফেঁসে যাচ্ছি আদালতে জররী সময়ে
  দেখি না তো রাগত সন্ত্রাস – সবুজ ঊঠোনে কত কাকের বাজার-এই অবসরে
  জ্যোৎস্না- প্লাবিত মেঘনায় কতো জল আর কটো বেদনার ঢেউ- আমাদের নজরে পড়ে না
                                       আমাদের চোখে আজ শাদা পর্দা শান্তিময় প্রচণ্ড অন্ধতা!
৫। আকাশে তখনো যতো, এখনো ফুটেছে তারা –আমাদের চোখ আজ পায় নাতো খুঁজে
  সপ্তর্ষির সরল প্রকাশ – নিরুদ্দিষ্ট বিদুর , কৃষ্ণ ছলনাকারী, আর আমরা কেউ যোদ্ধা নই,অন্ধ!
৬। আমাদের সামনে আজ ফকির আমির হয়—আমরা বলি ‘ ইচ্ছা তাঁর’! আর কোনো
  রাজপুত্র লুটায় ধুলিতে যদি—তবু বলি ‘ ইচ্ছা তাঁর’ – যেই তিনি বললেন হও—
                                                তখুনি হয়ে যে গেলো, সকলেই জানে সে খবর !
৭।মেঘনা- ডাকাতিয়ায় ঢেউয়ের মাতম আর—কীত্তনখোলার বুকে সতেজ বাতাসে কেন
  তোমার চুলেরা দ্রহী ? তোমার প্রশস্ত বুক- সুদৃঢ় চিবুক কন্যা—কবিতা কেমন ?
  তোমার প্রগলভ হাসি ঘুচাবে কি আজব অন্ধতা? স্বপ্ন বুনলেই বুঝি জন্ম নেবে অমর কবিতা ?
৮। আআমাদের সামনে শুধু শাদা অন্ধকার—সূর্যোদয়ে আজ আর আমাদের কিছুই আসে না
  গোধূলি বিদায় নিলে ভেঁপু বাজে ‘এম ভি শীলা’র –তবু শরতে হেমন্তে কেন
                                                                              আমরা জাগি না কেউ !

একটা সচেতন সজাগ জিজ্ঞাসা চিহ্ন নিয়ে বোধাক্রান্ত – নিখুঁত স্টেটমেন্ট – সম্পুর্ণ কাব্যিক মহিমায় । দৃশ্যের পর দৃশ্য – বাস্তবতা- স্বপ্নাক্রান্ততা—গভীর অন্তর্দাহ ; অন্তর্গত ক্রন্দন – জটিল মর্মবেদনা – জাগরণের আকাঙ্ক্ষা – স্বপ্নভঙ্গের হতাশা – ভংগমোহ আর্তনাদ – ব্যর্থতার গ্লানি- ম্লানিমা – করাল্গ্রাস দুর্নীতি – বইষম্যমুলক কুটিলতা – স্বার্থান্ধতা – মহাভারতীয় দৃশ্যময়তায় ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী বিদুর কৃষ্ণ দ্রৌপদী এবং সমস্ত সংসার পৃথিবী যেন মূর্তিময় হয়ে ওঠে শাদা অন্ধকারে। মনে হয় পরাজয়ের বেদনার মানবাত্মার মৃত্যুতে—কবি বলে ওঠেন আমরা আর যোদ্ধা নই। মানে পরাজয়কে মেনে নিয়েছি আমরা । বিদুর নিরুদ্দিষ্ট , আমাদেরকে সৎ পরামর্শ দেয়ার কেউ নেই । আমরা নিজেরা ও নিরুদ্দিষ্ট – জানি না গন্তুব্য কোথায় শেষ পরিণতি কী । শুধু জানি—যে বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছি সে বাস্তব পোড়োজমির চেয়ে ভয়ংকর, নরকের চেয়ে আতঙ্কের । এক প্রকাণ্ড অন্যায় বি্বেকহীনতা অমানবিকতা – কোনো এক দৈত্য কোনো এক লেভিয়াথান চেপে বসেছে আমাদের বুকের উপর। স্বস্তি নেই –স্বস্তি চাইবার মতো সাহস ও নেই ।আমরা কোনো নিয়তির হাতে বন্দি – সব কিছুই ঘটছে নিয়তির ইচ্ছায় । এখানেই কবির দহন—কবিতার জীবনকে রূপায়ণ করা – ছবি অঙ্কনের কবিসক্ষমতা প্রপঞ্চ চেতনাকে ধরবার এবং চিহ্নিত করবার মতো কবি দৃষ্টি । কেউ কেউ পারে – সকলে পারে না , প্রপঞ্চকে কবিতায় সফলতার সাথে ধরতে।

তারপর ও এত গভীর নিবিড় ভয়ঙ্কর শাদা অন্ধকারের মধ্যে কবি কীভাবে তার ভ্রমণদৃশ্যের মধ্য দিয়ে নিয়ে আসেন
মেঘনা-ডাকাতিয়ার ঢেউয়ের তুমুল মাতমের পাশে ‘ কীত্তনখোলার বুকে সতেজ বাতাসে তোমার চুলেরা দ্রোহী ? তোমার প্রশান্ত বুক- সুদৃঢ় চিবুক কন্য – কবিতা কেমন ?’ এ কার চুল – কীত্তনখোলার সতেজ বাতাসে দ্রোহী ? বাংলাদেশ নামক কোনো একটি দেশের আত্মার ? কবি হৃদয়ের স্বপ্ন – জীবন আকাঙ্ক্ষার কোনো বহুদূর নক্ষত্রজয়ী ইউটোপিয়া –যে ইউটোপিয়া সহস্র বছরের বর্তমানে বাস্তবায়িত হয় । সমস্ত হতাশাকে সরিয়ে সরিয়ে এখানেই বোধ হয় জেগে ওঠে জ্বলে ওঠে কবির আশার চেরাগ। প্রশান্ত বুক আর সুদৃঢ় চিবুকের – কবির মানসকন্যা বাংলাদেশকেই কবি জিজ্ঞাসা করেন – কবিতা কেমন ! তারপরই কবির প্রশ্ন ‘ তোমার প্রগলভ হাসি ঘুচাবে কি আজব অন্ধতা ? স্বপ্ন বুনলেই বুঝি জন্ম নেবে অমর কবিতা?’ একটা বিস্ময় বোধের বিস্ময় চেতনার বিস্ময় এবং বিস্ময়ের বিস্ময় আমাদেরকে অমর কবিতার সন্ধানে জাগিয়ে তোলে। ‘ শাদা অন্ধকার ‘ হয়ে ওঠে এক নক্ষত্রসফল কবিতা ।
কবিতাটি এখানেই – আমার মতে – শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু কবির মনে হয়েছে একটা উপসংহার জরুরি। কেননা তার আবিষ্কৃত প্রপঞ্চটি পুনর্বার উচ্চারিত হলে পাঠকের স্নায়ুকে আক্রান্ত ও আপ্লুত করবে ‘ লাইটমোটিফে’ বারবার পাঠকের চোখে মনে কণ্ঠে ভেসে উঠবে “ আমাদের সামনে শুধু শাদা অন্ধকার—সূর্যোদয়ে আজ আর আমাদের কিছু আসে না / গোধূলি বিদায় নিলে ভেঁপু বাজে’ এম ভি শীলা’র—তবু শরতে হেমন্তে কেন / আমর জাগি না কেউ’’?
আমি বিশ্বাস করি এ প্রশ্ন হতাশার নয়— আত্মজিজ্ঞাসা। নিজেদের জাগরণের প্রণোদনা – আমন্ত্রণ আলোকের আশাবাদের। একোটি সুন্দর কবিতা সমস্ত বেদনার রসে সিক্ত হয়ে মনের ভেততর জোছনা ছড়ায় স্নিগ্ধতার এবং আনন্দের। সে আনন্দ অনর্গল কলকল করে উচ্চারণ করতে থাকে – ‘স্বপ্ন বুনলেই বুঝি জন্ম নেবে অমর কবিতা’?
এবং আমি বলি স্বপ্নই সত্য এবং আর ও বলি অবশ্যই স্বপ্নই কবিতা – উজ্জ্বলতম আলোর স্থাপত্য।

এবার ‘শাদা অন্ধকার ‘ থেকে কিছু ভালোলাগা স্বাস্থ্যল কবিতা পংক্তি উদ্ধৃত করছি আমার জন্য এবং আপনার জন্য। আমি মনে করি এবং সমুদ্রবিশ্বাস নিয়ে বলতে চাই কবিতা শুধু পাঠের বিষয় নয় – ধ্যানী অধ্যয়নের বিষয় । কারণ কবিতা ব্যক্তিবিশ্ব মনোবিশ্ব সমাজবিশ্ব বস্তুবিশ্ব এবং প্রকৃতিবিশ্বের স্বরূপকে রূপে-অরূপে প্রকাশ করে।

১। ঝিনুক সইতে পারে
 ‘ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না
  —-
  —-
  ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না
  বুকের ভেতরে মুক্তা বেড়ে ওঠা জটিল ক্যান্সার
  দেবে না দু’দণ্ড শান্তি দারুণ বর্ষায় ! ‘[পৃ-১১]
২। জালে জটাজালে
  ‘বহুবিধ রূপকের আমি এক ঝাপসা একক
   আমাকে ঘিরেছে নীল ক্যামোফ্লেজ, নিজেকে দেখি না নিজে …
   —–
   —–
   আহ! আমাকে বেরুতে দাও কুহকের জটাজাল থেকে … [ পৃ-১৪ ]
৩। এখানে অনেক জল
   ‘চমকে চমকে ঊঠি আজানের ভোরে, দোয়েল তখনো মগ্ন নিস্তরঙ্গ ঘুমে
   শিউলি তলার ফুলে শিশিরে লাগে নি রোদ, শিশু অদিতার হাত খুঁজে ফিরে
                                                                 তোমার নরম বুক
   —–
   —–
   বেলা কতো হলো? ঘাটের মেলে না দেখা, নিস্তরঙ্গ জলরাশি ভাসানে জোয়ারে
   রুমি, মেঘনার বুকে আর কতো ভাসবো বলো তো? আর কতো জল এসে কাঁদাবে
                                                                                 আমাকে?
   —–
   —-
   শেষ হলে টুপ করে নরম বিকেল – মেঘের আড়াল চাই বিপন্ন লজ্জায় … [ পৃ—১৫ ]
কবিতাটিতে জীবন ও প্রকৃতি প্রবাহের ইমেজের সাথে এসে মিশেছে চাকুরি জীবনের কারণে পারিবারিক জীবন বিচ্ছিন্নতার একটি করুণঘন বেদনার ছায়া।
৪। নীলিমা ইথার
   ‘যদি ভাষা পাই, বলে যেতে চাই—‘ তোমাকেই ভালোবাসি ‘
    তুলে নাও ঠোঁটে, চিবুকে বা বুকে স্বপ্নীল চুমু রাশি … [ পৃ –১৬]
৫। নিখোঁজ কবি
  ( কবি সোহেল রাববি স্মরণে)
   সবুজের এক কোণে বুঁদ বসে থাকা ঝাঁকড়া বাবরি নেই
   মেথর পট্টিতে নেই
   নেই তুমি গোঁয়াছি বাগানে
               লিরিকে ও নেই তুমি আজ
   তবে কি পেয়েছো তুমি হৃদয়ের আসল ঠিকানা? কবিতার ? [ পৃ – ১৯ ]
৬। শতবর্ষ অন্ধকার
   শাদা অন্ধকারে মাঝে মধ্যে আমাদের ক্ষোভ জন্ম নেয়, আমরা ঠেলেছি লগি উজানের পথে
   আবার ভাটির টানে ফিরে আসি সেই পুরনো আঁধারে –‘ সম্মুখের আমারে টানিছে পশ্চাতের আমি’
   এলিসের আজব জগতে আমরা দৌড়াই শুধু আগের জায়গার দিকে,যেখানা হাজার বছরের বাস ! [পৃ—৪৬ ]
৭। রুপালি প্লাবন
   রেলের কুঝিক- ঝিক পৌঁছে দিলো মেঘনার ঘাটে চাঁদপুর।
   ইস্টিমারের সিঁটি—‘ এ ডিম ডিম, গর গরম ভাত’ কখনো লঞ্চের ভেপু
   মধ্যরাতে এ কেমন শহর –বন্দর! আধোঘুম চোখ জুড়ে – কখন রকেট আসে?
   কেউ কেউ আগুন ধরিয়ে ঠোঁটে অন্ধকারে দেখেছে আকাশ নীল
   গোল চাঁদ আলো ঢালছে ফ্যাকাসে রুপালি, চা’র কাপে প্রতিবিম্ব নাচে।
   —-
   —-
   হঠাৎ সে রিনিঝিনি বাজিয়ে কাঁকন এলো
   কোনো ভিয়াইপি কেবিনের যাত্রী?
    চাঁদ মেঘে লুকিয়েছে – বেজে ওঠে রকেটের বাঁশি
    ডেকের যাত্রীরা বিছানার চাদর সরিয়ে নিলো—কুসুমিত পদক্ষেপ কুমারীর
    কপোলের টোলে চাঁদ টলোমলো, ছিটকে পড়বে যেন বা এখুনি । [ পৃ – ২১ ]
৮। স্মৃতির স্বল্পতা
   নভোনিলা চন্দ্রাভ রাত্রির স্মৃতি
আমাদের সম্মিলিত
খুব বেশি নেই।
অবিকল আপেলের, চাঁদের , স্তনের
সম্মিলনী সভার মহৎ পৌরহিত্য
আমার সৌভাগ্যে বলো / ক’টি মেলে!
নভোনীলা চন্দ্রাভ রাত্রির স্মৃতি আমাদের খুব বেশি নেই
খুব বেশি রমণীর বেলী ফুল গন্ধ খোঁজা
                   এ নগরে দুঃসাহস, আলুথালু ভুল ! [ পৃ—২৯ ]
৯। ভাসান
  আমাকে ভাসিয়ে নাও সময়ের স্রোত
  অনাগত শিখার হোক সবার প্রতীতি । [ প্রৃ—৪৮ ]
যাদের চোখ আছে তারা দেখুক – শ্রুতি থাকলে শুনুক – বোধ থাকলে ভাবুক এবং যাদের রক্তে আছে অভিজ্ঞান ফিনিক –তারা পাঠ করুক । যে কবিতা- ফ্রস্টের ভাষায় উদবোধন ঘটে আনন্দে আর শেষ হয় প্রজ্ঞায় সে রকম কবিতা ধ্যানী পাঠকের সন্ধানে থাকে অনন্তকাল । যখন কবি থাকে না – তখনো মহৎ কবিতা বসে থাকে অনন্তকাল একজন মহৎ পাঠকের সহৃদয় আলিঙ্গনের অপেক্ষায় ।

প্রিয় জিললুর রহমান মাত্রাবৃত্তের প্রকৌশলে আপনার মহাকাব্যিক প্রকল্প ‘ একটি মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি ‘ আমার আনন্দ ও গভীর সম্মতি পাচ্ছে। এ ভাবনা একটি নতুন মাত্রার উন্মোচন ঘটাবে। যদি ও আমার নিজের কাছে ৭ মাত্রার পর্বের একটি সীমাবদ্ধতা আছে বলে মনে হয়েছিলো—কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি –আপনার আদি পর্ব , উড্ডয়ন পর্ব, প্রথম আসমানে ,দ্বিতীয় আসমানে, তৃতীয় আসমানে, চতুর্থ আসমা্নে , পঞ্চম আসমানে , ষষ্ঠ আসমানে ,সপ্তম আসমানে, স্বর্গলোক, লওহে মহফুজে , নরক গুলজার, প্রত্যাবর্তন পর্ব , প্রত্যগমনের ভোরে এবং শেষের পরে [ মোট ১২৬ টি কবিতা] পাঠ করার পর মাত্রাবৃত্তে ৭ মাত্রায় [ ৩ +৪ ] আপনার স্বচ্ছন্দ গতি আমাকে মোহিত করেছে। বিষয় ও ভাব অনুযায়ী ৭মাত্রায় একটি স্থাপত্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন । চাল কিছুটা হালকা [হতে বাধ্য ] কিন্তু দৃশ্য ও বর্ণনা আমাদেরকে দিব্যালোকে নিয়ে যায় । আপনার ৭ লাইনের স্তবক বা কবিতা নির্বাচন আপনার করণ চেতনাকে সিদ্ধি দিয়েছে । জীবনানন্দ দাশ নাটকে বা কবিতায় মহাকাব্যিক আবহে যে মুক্তির সম্ভাবনা বা দিশার কথা বলেছিলেন তা হয়তো বা এপথেই সম্ভাবনার পথ খুঁজতে পারে ।
আমরা জানি জীবনানন্দ দাশ ‘ কবিতার আলোচনা’ প্রবন্ধে বলেছেন—‘যে কোনো সৎ কবিতাই স্বভাব কবিতা’। তারপর আরেক জায়গায় বলেছেন –‘ সহজ বা স্বভাব কবিতা হলেই হল না, সে কবিতা কি রকম স্বল্প অভিজ্ঞতার স্বচ্ছ অনুভূতিবা অনেক বেশি অভিজ্ঞতার স্পষ্ট বীক্ষা কি রকম মন্ত্রের মতো সিদ্ধ হয়ে রয়ছে সেটা দেখতে হবে ‘।
আবার বলেছেন –‘ সললেই কবি নয় ; কবিস্বভাব বলে একটা জিনিস অবাস্তব নয়, কবিস্বভাব ক্রমেই শিক্ষিত ও শুদ্ধ হয়ে প্রতি পর্যায়ে কবিতার সারাৎসার রেখে যেতে পারে , এ রকম পর্যায় থেকে পর্যায়ে প্রাণনা চলতে পারে কবির মৃত্যু পর্যন্ত ‘।
আমার নিজের কোনো মন্তব্য আমি এখানে করবো না । আপনার কাব্যসাধনা ও মননশীলতায় আমার প্রগাঢ় আস্থা আছে।শুদ্ধতম কবির আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে কথা শেষ করতে চাই । তিনি বলেছেন “ মহৎ কবিতা গম্ভীর নয় শুধু, অথবা প্রাকৃত জীবনের ব্যাপার নিয়ে নিবিড় নয় কেবল মাত্র ; কিন্তু এই দুই জিনিস মিলে এক হয়ে গেছে সেখানেই এমনই আত্মিক নিবিড়তায় ও গাণিতিক শুদ্ধতায় যে সহসা মনে হতে পারে যে মিলনোৎপন্ন কবিতা জ্ঞান নয় আর, জীবন ও নয় যেন, জীবনের সঙ্গে সমান্তরাল জিনিস , কিংবা জিবনকে কোনো আলাদা জগতে নিয়ে নতুন করে তাকে সৃষ্টি ।“
এবার আপনার ‘ একটি মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি’ কাব্য গ্রন্থের ‘শেষের পরে’ পর্বের সর্বশেষ কবিতাটি [ কবিতা – ১২৬ ] উদ্ধৃত করছি —-
                        ‘তখনো মরেছিলো এ্ষায় মরে যায়
                         লক্ষ বছরের মান যাত্রায়

                         নিজের কর্মটা গুছিয়ে শেরে রাখি
                         কখন কে-বা জানে নিয়েই যাবে ডাকি

                         এভাবে মানুষের সৃষ্টির মর্মে
                         জীবন জেগে থাকে পরের প্রজন্মে

                         ব্যক্তি মরে বটে মানূষ মরে নাই …

‘ একটি মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি’ মহাকাব্যিক চেতনের কাব্য নির্মাণের জন্য আপনাকে সাধুবাদ ও প্রশংসা জানাচ্ছি । প্রিয় জিললুর – আপনার মহৎ কীর্তির প্রকাশের অ্পেক্ষায় আছি ।।

প্রিয় জিললুর রহমান
কেন আমি অস্কারের এতগুলি উদ্ধৃতি এবং তাঁর অসাধারণ ‘ দি ব্যালাড অব রিড়িং গেওল ‘ এর ৬ নম্বর ব্যালাডের সর্বশেষ অংশটি তুলে ধরলাম ? আপনি অস্কারের জীবন এবং তাঁর প্রথা বিরোধী জীবনচর্যা—তাঁর শিল্পচেতনা সম্পর্কে ভালোই অবগত আছেন । ১৮৮০ এর দিকে তিনি নিজের মতো করে বিভিন্ন শিল্পাঙ্গিকে নিজেকে প্রকাশ করে গেছেন ।আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও তার বৈচিত্র ভাবনা ছিলো ।আর ১৮৯০ এর দিকে তো তিনি কবি ও নাট্যকার হিসাবে নিজেকে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। তার নন্দনতাত্ত্বিক ধারণা সম্বলিত উপন্যাস দি ডোরিয়ান গ্রে’ প্রকাশ পেয়ে গেছে। এবং সাহিত্য ও শিল্পের জগতে একটা আলোড়ন-বিলোড়ন ও সৃষ্টি হয়েছে । গ্রে যার মুখটি দেখতে ‘face like and rose leaves’—তাঁর অসামান্য চিত্রপট আমাদের সামনে উপস্থিত । এই অসামান্য চিত্রপটই কি কালের গ্রাসে ভঙ্গুর ম্লান ধূসর হয়ে যাবে ? যে কথাটি রবীন্দ্রনাথ বা বিশেষভাবে জীবনানন্দ অথবা গ্যেটে রাসকিনের মতো মনীষীরা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ।আমরা জানি তিনি সে যুগের বিশিষ্ট শিল্পচিন্তক ও সমালোচক রাসকিন ও ওয়াল্টার পেটারের শিষ্য ছিলেন এবং তাদের নন্দনতাত্ত্বিক চিন্তায় আবিষ্ট ও প্রভাবিত ছিলেন। জার্মান ও ফরাসি ভাষায় ছিলেন দক্ষ। তাঁর আইরিশ পিতারাও ছিলেন জ্ঞান জগতে বুদ্ধিজীবী ।তিনি নিজেকে অতুলনীয় ক্ল্যাসিসিস্ট হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। সে কারণেই সাহস এবং দুঃসাহস দুটিকেই তাঁর অক্লান্ত চিন্তন ক্ষমতা ও মেধার জগত দিয়ে ধারণ এবং প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। সে কারণেই অস্কার বলতে পারেন যখন মানুষ সাধারণ জীবনযাপন করে , কাজ করে , অভিনয় করে স্বাক্ষীগোপালের মতো অভিনয় করে—তখন সে তো একটা পুতল মাত্র । কিন্তু সে যখন স্বাধীন ইচ্ছায় নিজেকে বিবৃত করে – বিবরণ দেয় তখনই সে কবি হয়ে ওঠে। কবি—কেননা কবিকে বলতে জানতে হয় একান্ত নিজের মতো করে নিজস্ব নির্বাচিত চেতনায় নিজস্ব স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে। আর যে মানুষ শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবে বর্তমানেই থাকে সে নিজেকে যেমন চেনে না তাঁর কালকে ও চেনে না – তাঁর পক্ষে কবি বা শিল্পী হওয়া অসম্ভব।এবং শিল্প তো মানবিক এবং মানবিকতা তো কল্পনা আশ্রয়ী । শিল্প কিংবা জীবনের ক্ষেত্রে প্রাগ্রসরতা মানেই ইউটোপিয়াকে মননশীলতায় ঊদ্ধারকরণ ও উপলব্ধিকরণ । অস্কার মনে করেন পূর্ণাঙ্গ শিল্প ব্যক্তিত্ব বিদ্রোহ বা ব্যক্তিগত বিরোধিতা নয় প্রশান্ত স্নায়ুর সৃজনশীলতার অনন্য আবিষ্কারক। সুন্দর জিনিস সুন্দর রঙের কাজ অথবা খচিত কারুকার্য আসে রঞ্জক বা কারিগরের হাত থেকে। কিন্তু সুন্দরের আদর্শ ছাঁচ বিশিষ্ট নিপুণ দৃষ্টান্ত বা নমুনা পরিকল্পিত মানস রচনা ছবি বা নকশা আসে শিল্পীর মস্তিষ্ক থেকে। তিনি আস্থার সাথে বিশ্বাস করেন বিবর্তনই মূলকথা জীবনের এবং ব্যক্তিত্ব বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মুল কারিকা শক্তি ।
শিল্প সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করে যেখানে সীমাবদ্ধতার শেষ প্রান্ত । তাহলে বোঝা যাচ্ছে সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রমণই শিল্পের আরাধ্য। কীভাবে সম্ভব এই অতিক্রমণ ? শব্দের স্মৃতি চেতনার ভেতর দিয়ে, ছন্দ , স্বরপ্রবাহের উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে ,শব্দ ও ভাব প্রবাহের আঙ্গিকগত সাংগঠিনকতা দিয়ে এবং সর্বোপরি নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের অসাধারণত্ব দিয়ে। সে কারণেই অস্কার বলেন – প্রকৃত শিল্পী হলেন তিনি—যিনি জানেন তিনি কী সৃষ্টি করছেন এবং কেন করছেন এবং এই সৃষ্টিকে মহত্ত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে কী কল্পনাশক্তি আর কী করণকৌশল ব্যবহার করতে হবে । কবিতার ক্ষেত্রে যেমন – তেমনি সকল শিল্পের জন্যই এটি হচ্ছে খাঁটি কথা। অস্কার আরেকটা রহস্যজনক কথাও বলেছেন – সেটি এ রকম ঃ মানুষ অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাস করতে পারে কিন্তু তারা নবীকরন বা উন্নয়ন বা নতুনভাবে সৃজন করা যায় এমন কথাকে বিশ্বাস করতে চায় না । বোধ হয় এটা এক ধরনের মানবস্বভাব। আমি বলি – শিল্প কবিতা সংগীত স্থাপত্য ভাস্কর্য – নন্দনকলার সব কিছুইতো নির্বাচিত মানবের মানবস্বভাবের সৃষ্টি । অস্কার বিশ্বাস করেন শিল্পের ব্যাপারে করণ -কারণ কল্পনা চিন্তন যততুকু সত্য জীবনের বিষয়ে ও তা সত্য । তবে শিল্পী হিসাবে শিল্প ব্যক্তিত্ব হিসাবে তাঁর অসাধারণ দুঃসাহসী কথন বা বাণী
হচ্ছে – ‘’All that I desire to point out is the general principle that LIFE imitates ART
far more than ART imitates LIFE ‘’.[ The Decay of Lying ].
অস্কার বলছেন এবং গভীর অভিনিবেশের সাথে ঘোষণা করছেন—শিল্প জীবনকে যতটুকু স্মরণ বা অনুসরণ বা অনুকরণ করছে , সত্যকার অর্থে জীবন তার চেয়ে অনুসরণ অনুকরণ করছে শিল্পকে। কেমন করে কীভাবে ? এ প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। কারণ শিল্পী চৈতন্যের ভেতরে এক নতুন চৈতন্যকে সৃষ্টি করেছেন যার নাম কান্তিবিদ্যা বা নন্দনবিদ্যা। এখানে তার স্বরাজ –সে বলছে একজন নতুন শিল্পী –স্রষ্টা হিসাবে জীবন ও প্রকৃতির সৃজনের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি আছে কম্পোজিশনে অসাম্য আছে খুঁত আছে। এ অসঙ্গতি দূর করতে পারে একমাত্র সেই শিল্পী যে বিশ্বাস করে –জীবন সঙ্গতির শিল্পকেই অনুকরণ করবে, নিজের সমাজ প্রকৃতির অসংগতিকে দূর করে সমৃদ্ধ জীবনের একটা সঙ্গত ক্যানভাস তৈরি করবে। অর্থাৎ জীবনের চেয়ে শিল্প বড় এবং নিঃসন্দেহে মহৎ । যদিও আমরা জানি প্রতিটি মহৎ ও বৃহৎ আদর্শই ভয়ানক । ভয়ানক – কেননা সে আলোড়ন- বিলোড়ন তৈরি করে – ঝাঁকি দেয় কম্পন জাগায় মন ও অস্তিত্বের জগতে। যে সমস্ত লোকেরা শুধু নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষা ও কামনা করে নিজের ভেতরেই হাঁটাহুটি করে তারা জানে না তারা কোথায় যাচ্ছে। আমরা যখন বলি – আত্মনাং বিদ্ধি , তখন ও কি আমরা আত্মাকে সম্পূর্ণ বা আংশিক জানি ? আত্মাকে জানা কী জ্ঞানের অগম্য?’ দি ডিকে অব লায়িং ‘ প্রবন্ধে ভিভিয়ান এরকমই বলে যে – শিল্প সম্পর্কে আমরা যত জানি প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা তত নিস্পৃহ হয়ে পড়ি। কারণ প্রকৃতির গঠনের ত্রুটি অসাধারণ বৈচিত্রহীনতা বিচিত্র একঘেয়েমি আমাদেরকে অপূর্ণতার ধারণায় নিয়ে যায়। এই অপূর্ণতার বিরুদ্ধে শিল্পীর প্রতিবাদ জাগে আর তখনই আমরা প্রেমিক হয়ে প্রকৃতি প্রেমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেই তাঁর অবস্থানের কথা। আসলে এ ও একধরনের মিথকথা । আসল কথা হচ্ছে প্রকৃতিকে প্রকৃতির জগতে পাওয়া যাবে না— কারণ তাঁর বাসভূমি আমাদের মানসকল্পনার জগত। আমাদের অহমের অন্তর্জগত ও বহির্জগত যখন ব্যক্তিত্বহীন বা নৈর্ব্যক্তিকতার কারণে বিমূর্ত ও দুর্জ্ঞেয় হয়ে ওঠে তখন প্রকৃতিকে কেমন উদাসীন ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় । আসলে বিষয়টা তা-ই ।
শিল্প মুলত প্রকৃতির গোপন সৃষ্টি। ফলে সে আমাদেরকে বহুমুখী বিচিত্র মানস জগতে ভ্রমণ করায় –কারণ শিল্পে আমাদের প্রবল ঐকান্তিক আগ্রহ আছে। প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি জীবনের ভেতরে বাইরে যে পরিবর্তন ঘটছে তাকে প্রকাশ করা যাবে কোন ভাষা দিয়ে ? একমাত্র সংকেত বা সাংকেতিক পরিভাষা দিয়ে। সে কারণেই বলা হয়েছে স্বীকৃতির স্বরূপে – ‘’ আর্ট ইজ সিম্বল বিকজ ম্যান ইজ এ সিম্বল ‘’।
সংগীতের কথাই ধরা যাক—জীবন ও প্রকৃতির সব কিছুই এর মধ্যে ধৃত হয় প্রকাশ পায় । কিন্ত এটাকে আলাদা করা যায় না –এটা একটা জটিল বিষয় খুব জটিল ক্রিয়ার উদাহরণ। কিন্তু একটা ফুল বা একটা শিশুর উদাহরণের মধ্যে কোনো জটিলতা নাই । কিন্তু দুঃখ ও বেদনা জীবনে যেমন বিদ্যমান শিল্পে ও তেমনি স্বরূপে উপস্থিত। অস্কার ‘ডি প্রোফান্ডিস ‘ প্রবন্ধে একথাই বলতে চেয়েছেন ।অস্কার বলেন [ দি ডিকে অব লায়িং] শিল্প নিজেকে ছাড়া অন্য কিছুকেই প্রকাশ করে না। শিল্পের পৃথক জীবন আছে – যা স্বাধীন ।যেমন চিন্তা তার আপন বিশুদ্ধ পথেই বিকশিত হয় । প্রত্যেক অশিল্প বা খারাপ শিল্প ও জন্ম নেয় একই পদ্ধতিতে উদারভাবাপন্ন স্ফীতিতে জীবন ও প্রকৃতি থেকে চিন্তার অনুৎকৃষ্টতার ভেতর দিয়ে । মন্দ শিল্পের প্রাদুর্ভাব ঘটে মন্দ শিল্পচিন্তা থেকে । জীবন বাস্তব বাদের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে – কিন্তু রোমাণ্টিসিজম সব সময়ে আগেই থাকে।আবার এ কথাও বলা হয়েছে শুদ্ধ প্ররোচনা থেকে খারাপ শিল্প জন্ম নিতে পারে শিল্পীর ক্ষমতার অভাবে।

জীবনের প্রত্যেকটি হাসি ও আনন্দের পেছনে আছে বিশেষ মেজাজ প্রকৃতিগত সংবেদনশীলতা। আছে রুঢ়তা কঠিনতা । কিন্তু দুঃখের পেছনে একমাত্র দুঃখই দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বেদনারা আনন্দ বা সুখবোধের মতো কখনো মুখোশ পরে না । ‘ ডি প্রোফাণ্ডিসে ‘ অস্কার বলছেন – ভালোবাসা হচ্ছে শিল্প। ভালোবাসার দৃষ্টি সুদূর প্রাসারিত। দুর নক্ষত্রের গায়ে কী লেখা আছে ভালোবাসা তা অনায়াসে পড়তে পারে । কিন্তু ঘৃণা এমন এক জিনিস যা পাশের দেয়াল ও টপকাতে পারে না । শিল্প তার চরম ও পরম পরোৎকর্ষতা বা পূর্ণতা পায় নিজের ভেতরেই – বাইরে নয়। বাইরের সাদৃশ্যতার মানদণ্ডের বিচারক দিয়ে শিল্পের করা যায় না। সে আয়নার উজ্জ্বলতার চেয়ে ঘোমটার ছদ্মবেশই বেশি পছন্দ করে। সে এমন ফুল ফোটায় – যা কোনো বন চেনে না।অস্কার বলছেন –‘I said in Dorian Gray that the great sins of the world take place in the brain : but it is in the brain that everything takes place ‘.। এখন আমরা জানি যে আমাদের ব্রেনই হচ্ছে হোতা। আমরা যা কিছু দেখি যা কিছু বুঝি যা কিছু শুনি বা চিনি সব কিছুই ট্রান্সমিশন হচ্ছে ব্রেনের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক কোষই পপিকে লাল করে তোলে , আপেলকে সুগন্ধী আর স্কাইলার্কের ডাককে গান করে তোলে । শিল্প বা কবিতা রচিত হয় মানসলোকে – কোন কারখানায় নয়।
এবার অস্কারের অসামান্য ব্যালাডটির দিকে চোখ ফেরাই – সেখানে দেখতে পাই এক অসাধারন চিত্র । কার ? জীবনের। বিষয় প্রেম । প্রতিট জীবন কী আলাদা আলাদা অবস্থান দেখছে ভালোবাসা নামক মানবিক বিষয়টিকে।শিল্প এখানেই গুরুত্বপুর্ণ জীবনের চেয়ে । জীবন বাস্তবতা আর শিল্প হচ্ছে আদর্শ প্রকল্পনা । সবশেষে পুনর্বার উচ্চারণ করছি অস্কারের শিল্প ভাবনার যাদুকরী বাণী তথা থার্ড ডক্ট্রিন –‘ Life imitates Art far more than Art imitates Life ‘ । অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর নিজের শিল্প ভাবনা সম্পর্কে নিজেই বলেছেন : ‘I was a man who stood in symbolic relations to the art and culture of my age’ .। সবশেষে অস্কারের নিজের কথারই উদ্ধৃতি তুলে ধরছি- শিল্পে তিনি যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন — : ‘’ The Mystical in ART , then Mystical in Life,the Mystical in Nature – this is what I am looking for, It is absolutely necessary for me to find it somewhere ‘’ .

ফাউজুল কবির
২০.০৮.২০২০

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত