উন্নয়ণের গণতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র

Reading Time: 3 minutes বাংলাদেশ রাষ্ট্রটার সূচনা হয়েছিল দ্বি জাতি তত্ত্বের ভিত্তিকে ভাগ হওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রটার অন্যায়, শোষণ ও বঞ্চনার প্রতিবাদে। আশা ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া এই রাষ্ট্রটি মানবিকতা, জাতিসত্ত্বার অধিকার রক্ষা, সম্পদের সুষম বন্টনে বিশ্বের অনান্য দেশের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার ৪৭ বছর  পরেও দুঃভাগ্য জনক হলেও সত্যি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনেকটুকু আমরা পূরণ করতে পারিনি। নানা ঘাত প্রতিঘাত ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে যে যাত্রা সেটাও কয়েক দশক ধরে ‘স্থবির’ হয়ে আছে। সম্ভবত বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ থেকে ‘উন্নয়নের গনতন্ত্র’ তত্ত্ব সামনে আনা হচ্ছে। এবং উদাহরণ হিসেবে মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদকে টেনে আনা হচ্ছে। মাহাথিরের শাসনামলে উন্নয়ন যেমন হয়েছে তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষের উপর ব্যাপক নির্যাতন নিপীড়নের অভিযোগ আছে। বর্তমান সরকারও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে নিজেদের মুঠো বন্দি করে রাখতে পেরেছে। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সরকার নিজেই এখন শক্তিশালী বিরোধী দলের জন্য হাহাকার করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরস্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ‘আমি আশা করেছিলাম এবার শক্তিশালী বিরোধী দল পাবো।’ সংসদে বিরোধীদলের অবস্থান শক্তিশালী করতে মহাজোটের শরীকদের বিরোধীদলে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু এ নিয়ে মহাজোট শরীক জাসদ এবং ওর্য়াকাস পার্টির ঘোর আপত্তি আছে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর আপত্তির কথা গণমাধ্যমে এসেছে। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সরকারি দল যখন ব্যাপকভাবে শক্তিশালী বিরোধীদলের জন্য হাহাকার করছে তখন বাংলা ভাব সম্প্রসারণের একটি কথা এখানে প্রণিধান যোগ্য অমঙ্গল উড়াতে যেও না তাহলে মঙ্গল সহ উড়ে যাবে। তিন মেয়াদে সরকার এমন কঠোরভাবে বিরোধী পক্ষকে মুঠোবন্দি করে রেখেছে যে নিজেরাই এখন শক্তিশালী বিরোধীদলের জন্য মাথা ঢুকে মরছে। ‘’  গণতন্ত্র এর সৌন্দর্য্য হচ্ছে বির্তক বা ডিবেট। প্রাণবন্ত বির্তক বা ডিবেট গৃহপালিত বিরোধীদলকে দিয়ে সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের বিগত শাসনামলে অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চুপ ছিলো জাতীয় পার্টি। প্রাণবন্ত সংসদ ছিল অধরাই। সবচেয়ে অভিনব বিষয় হচ্ছে জাতীয় পার্টির কয়েকজন সাংসদ মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে সরকারের অংশ থেকেও একাধারে বিরোধীদলের ভূমিকাও পালন করেছেন। যেটা আগে কখনো দেখা যায়নি। বর্তমান সরকার তাঁদের আগের দুই মেয়াদে এবং বর্তমান শাসনামলে উন্নয়নের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারের সময় বিগত শাসনামলের বাস্তবায়িত ও চলমান উন্নয়ণ কার্যক্রমকে সামনে এনে প্রচার চালিয়েছে সরকারিদল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় এসে উন্নয়ণের এ গতিধারাকে আরও বেগবান করার। তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্বভার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ও নড়েচড়ে বসেছে। বিভিন্ন স্কুলে আকস্মিক পরির্দশনে যাচ্ছেন দুদক চেয়ারম্যান। দুর্নীতি বিরোধী আরও নানা তৎপরতার খবর আমরা জেনেছি গণমাধ্যমের বরাতে। তবে একটা কথা এখানে ধ্রুব সত্য যে, যেখানে উন্নয়ণ কাজ হয় সেখানে দুর্নীতিও বাড়ে। সঙ্গত কারণেই সেটা বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী হয়তোবা সেজন্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে এত কঠোর মনোভাব পোষণ করছেন। ডেমক্রেটিক রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের ট্রিকেল ডাউন ইকোনমিক্স বা ট্রিকেল ডাউন থিওরী দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। ট্রিকেল ডাউন থিওরীতে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান বোঝাতে চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেই সেটি চুইয়ে পড়ে সমাজের অনান্য স্তরের উন্নয়ণ করবে। পোষ্ট মর্ডান সময়কালে তাঁর এই থিওরীটি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানীরা তখন ধারণা পোষণ করেন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে সমাজের অনান্য স্তরে উন্নয়ণ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ণের জন্য আলাদা আলাদা কর্ম পরিকল্পনা নেয়া জরুরী। বর্তমান সরকার ‘উন্নয়নের’ উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তার সিংহ ভাগই অবকাঠামোগত উন্নয়ন । শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ণ দিয়ে যে সমাজের অনান্য স্তরে ইতিবাচক উন্নয়ন হবে না সেটা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে সরকারকে অবশ্যই শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হবে। বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে লক্ষাধিক কর্মক্ষম বেকার যুবক যুবতীকে ওর্য়াক ফোর্সে নিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উপর মনোযোগ দিতে হবে। দুর্নীতি দুর করে সমাজের সবক্ষেত্রে সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করতে হবে। তাহলেই আমরা টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারবো।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>