| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শিশু-কিশোর কলধ্বনি

রুমনকে তুমি যেমন দেখেছো

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 

তোমাদের গলিটা থেকে বের হয়ে একটা বড় রাস্তা আছে। রাস্তাটা ধরে বাম দিকে হাঁটা শুরু করলে তুমি। একটু গেলেই রাস্তার পাশে একটা রেস্টুরেন্টন আছে না? হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক ধরেছো। ওখানে তো তুমি ছোট চাচ্চুর সাথে মাঝে মাঝেই যাও। দুটো ডাল-পুরি, সমুচা, এরপর চা খাও। ঐ রেস্টুরেন্টে তোমার বয়সী এক ছেলে কাজ করে। দেখেছো নিশ্চয়? হ্যাঁ হ্যাঁ… ওর নাম রুমন। ওর ছোট ভাই ওকে বলতো লুমন। আরে অনেক ছোট তো সে, র উচ্চারণ সে সেখেনি এখনো। রাখি খালাকে বলে লাকি খালা। এদিকে রাখির আরেকটা বোন আছে, তার নাম লাকি। কী হলো তাহলে? পিচ্চিটা দুজনকেই বলে লাকি খালা। এই নিয়ে অনেক হাসাহাসি। যাক সে কথা। রুমনের কথায় ফিরে আসি। এই গল্পের নায়ক সেই রুমন।

তুমি চা খেতে খেতে খেয়াল করেছো নিশ্চয়, রুমন খুব চটপটে। এ টেবিল থেকে ও টেবিল, ঘুরে ঘুরে পরিষ্কার করে, পানি দেয়, আবার মাঝে মাঝে খাবারও সার্ভ করে। আবার দেখবে- কোনো মা-ছেলে ওখানে খেতে এলে সে খুব চুপচাপ হয়ে যায়। মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেন থাকে জানো? আসলে ওর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। আচ্ছা, তুমি কি কখনো ভেবেছো? রুমনের বাড়ি কোথায়? ওর মা-বাবা কী করেন? এই বয়সে সে স্কুলে না গিয়ে এখানে কাজ করে কেন? ভাবেনি তো…! আচ্ছা আমিই বলে দিচ্ছি।
রুমনের দিনটা ভালোই কাটছিল। তোমার মতোই সে ক্লাস ফাইভে পড়তো। ওদের গ্রামের বাড়ি ছিল বগুড়া জেলার ধুনটে। যমুনা নদীর পাড়ে। যমুনা নদীর নাম শুনেছো তো তুমি। দেশের প্রধান তিনটি নদীর মধ্যে একটি যমুনা। বর্ষাকালে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এই নদী। দুই কুল ছাপিয়ে বন্যা হয়, নদীর গর্ভে হারিয়ে যায় অনেক গ্রাম। মাস তিনেক আগেও তো এরকম বন্যা হলো। হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক ধরেছো! ওই যে টেলিভিশনে তুমি দেখেছো। সেই বন্যায় ভেসে গেছে রুমনদের গ্রামও। রাতের অন্ধকারে সব ভেসে গেছে। রুমন ছিল তার খালার বাড়িতে। পরদিন সকালে তারা নিজেদের গ্রামের খোঁজ পায়নি আর। যমুনার ভয়াল শ্রোত যেন সব গিলে খাবে। দূর থেকে দেখে অনেক কান্না করেছিল রুমন। তার মা, বাবা, ছোট ভাই- কাউকেই সে আর খুঁজে পায়নি। কোথায় তারা কেউ জানে না।
কষ্ট পেলে বুঝি! কষ্ট পাওয়ারই কথা। রুমন এরপর খালার বাড়িতে আরো কিছুদিন ছিল। ওর খালুটা সুবিধার ছিল না। দুই দিন পর পর কথা শোনাতো। মাঠে নিয়ে গিয়ে কাজ করাতো। কাজের ছেলের মতো। রুমনের মনটা কুকড়ে যেত। অভিমান হতো, কষ্ট পেতো। একদিন কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। প্রথমে পায়ে হেঁটেই ধুনট চয়ে যায়। সেখান থেকে একটা বাসে উঠে সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার ট্রেনে উঠে বসে। তারপর এই ঢাকা।
ঢাকায় এসে কয়েকদিন একটা লেগুনার হেল্পারের কাজ করেছে। কিন্তু লেগুনার যাত্রীরা খুব খারাপ ব্যবহার করে ওর সাথে। মন খারাপ হয়ে ছেড়ে দেয় কাজটা। এরপর ঘুরে ঘুরে এই রেস্টুরেন্টে এসেছে। তুমি হয়তো খেয়াল করে থাকবে, রেস্টুরেন্টের মালিককে সে ডাকে মহাজন চাচা বলে। সেই মহাজন চাচাটা ওর সাথে খুব ভালো ব্যবহার করে। কখনোই ঝাড়ি দিয়ে কথা বলে না। অন্য রেস্টুরেন্টে যেটা দেখা যায়।
এক শনিবার বিকেলে যখন তুমি রেস্টুরেন্টে গেলে, তুমি কি খেয়াল করেছো? তোমার টেবিলটার পাশের টেবিলে তোমার বয়সি আরেকটা ছেলে বসেছিল, তার মা-বাবাকে নিয়ে? ওরা নান রুটি আর গ্রিল চিকেন খাচ্ছিল। ঠিক ধরেছো, তুমি নান রুটির সাথে শিক কাবাব খাচ্ছিলে। আর রুমন বারবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। মনটা তার বিষাদে ভরে গিয়েছিল। এভাবে কতদিন সে মায়ের আদর পায়নি। ওর চোখ ভিজে যাচ্ছিল বারবার। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছছিল।
হঠাৎ তুমি খেয়াল করলে, খেতে বসা ছেলেটা তার বাবাকে বলছে- বাবা ঐ তো, ঐ তো আমার টিশার্ট। রুমনের দিকে ইঙ্গিত করলো ছেলেটা।
বাবাও বলে উঠলো- আরে তাই তো, ঐ যে দামি ব্রান্ডের লোগো। পলওয়েল মার্কেট থেকে এক হাজার টাকায় কিনেছিলাম।
এবার মা তাকালো রুমনের দিকে। বললো- কিন্তু সে ওটা পেল কী করে? ওটা ব্যালকনিতে মেলে দিয়েছিলাম সেদিন। ছেলেটার বাবা বললো- আরে চুরি করেছে বেটা। দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। এই পিচ্চি এদিকে আয়।

রুমন আগে থেকেই ওদের কথা শুনতে পাচ্ছিল। এতো অপমান সে আর কখনোই হয়নি। কষ্টে পেটটা হঠাৎ তার পিঠের সাথে লেগে যাচ্ছিল। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কী করবে বুঝতে পারছিল না। এবার লোকটার ডাকে এগিয়ে এলো। কাছে এসেই চোখ ছলছল করে কেঁদে ফেললো রুমন। বাবা লোকটা মুখ বাঁকিয়ে বললো- এই, টিশার্টটা কই পেয়েছিস? ভালোয় ভালোয় বল, না বললে পুলিশে দিব কিন্তু! তুমি হতবিহ্বল হয়ে দেখলে, রুমন অপমানে, লজ্জায় কিছুই বলতে পারছিল না। ফোঁপানো ঠোঁটে সে কেবল ‘মা, মা’ বলছিল। এটা দেখে লোকটা আরো খেপে গেল। রুমনের কলার ধরে বললো- মা কিনে দিয়েছে না, তুই জানিস এটার দাম কতো? তোর মায়ের এত টাকা আছে?

মায়ের নামে অপমানজনক কথা আর সহ্য হচ্ছিল না রুমনের। কিন্তু এখানে কিছুই করার নেই। মহাজন চাচাটাকেও দেখতে পাচ্ছে না। ক্যাশ কাউন্টার ছেড়ে আশেপাশে কোথাও গিয়েছে। চোখ বন্ধ করে কেবল কাঁদতে লাগলো সে।
ছেলেটার মা অবশেষে বাঁচিয়ে দিল রুমনকে। স্বামীর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো- বাদ দাও তো, এইটুকু একটা ছেলের সাথে এটা করা সাজে না তোমার। লোকটা আবার বসে পড়লো। রুমন এক কোণায় গিয়ে বসে বসে কাঁদতে লাগলো। রুমনের কষ্ট দেখে তোমারও নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল। ওকে কি তোমার চোর মনে হয়? নিশ্চয় না। ছেলেটার চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব আছে, সহজ-সরল কিন্তু বেশ চালু। সে চুরি করতেই পারে না। বিষয়টা পরিষ্কার হতে তোমরা আরো কিছুক্ষণ বসে থাকলে। ওরা বিল দিয়ে চলে গেলে, মহাজন চাচা এসে রুমনকে বললেন- কী হয়েছে তোর? এভাবে মন খারাপ করে বসে আছিস যে?
রুমন মহাজন চাচাকে জড়িয়ে ধরে বললো- এই গেঞ্জি নাকি আমি চুরি করেছি।
-কে বললো তোকে? আমি ফুটপাথ থেকে তোকে কিনে দিয়েছি এটা।
-ঐ যে এখনই বিল দিয়ে গেল যারা, তারা বলেছে, আমাকে চোর বলে গালাগালি করেছে। আপনি ক্যাশে ছিলেন না তখন।
-আচ্ছা, ওদেরকে তো আমি চিনি। এরপর এলে আমি কথা বলবো ওদের সাথে। এভাবে যাকে তাকে তো চোর বানানো ঠিক নয়।
এর কয়েকদিন পরেই রোযা শুরু হলো। সন্ধ্যার ইফতার ও নামাজ সেরে তোমরা ওখানে গিয়েছিলে হালিম খেতে। একটু পরেই খেয়াল করলে সেই ছেলে তার মাকে নিয়ে এসেছে। বাবাটা আজ নেই। ওরা রেস্টুরেন্টে ঢোকার পথেই মহাজন চাচা আটকে দিলেন। সেদিনের ঘটনার পর তুমি এখন অনেক সচেতন। কান খাড়া করে শুনলে, মহাজন চাচা মাহিলাকে সব খুলে বললেন। মহিলাটা খুব অনুতপ্ত হলেন। জিহ্বায় কামড় খেলেন। এরপর মহাজন চাচা রুমনকে ডাকলেন।
মহিলাটা রুমনের মাথায় হাত রেখে আদর করে দিলেন। বললেন- আমাদের ভুল হয়ে গেছে বাবা। আমরা বুঝতে পারিনি। এরপর মহিলাটা রুমনের জীবনের সবকিছু শুনলেন একে একে। সামনে ঈদ, রুমনের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এটা শুনে মহিলাটা বললেন- এবার আমরা কক্সবাজার যাবো ঈদ করতে। তোমাকেও নিয়ে যেতে চাই। আজ থেকে তুমি আমার আরেক ছেলে। যাবে তুমি? রুমন কী বলবে বুঝতে পারে না। চোখ তার আবার ছলছল করে ওঠে। মায়ের কথা মনে হয়। বাবার কথা মনে হয়। মহাজন চাচার দিকে তাকায়। চাচার চোখেও পানি।

চাচা চোখ মুছে বলেন- যারে, তোর দুঃখ বুঝি শেষ হয়ে এলো। তোকে তো ‘ছেলে’ বলেছেন ম্যাডাম। যা, আর কাঁদিস না।
মহিলাটা হাত বাড়িয়ে দেন। রুমন জড়িয়ে ধরে নতুন মাকে। এই পৃথিবীতে সবাই খারাপ না। ভালো মানুষও আছে। আছে বলেই পৃথিবীটা সুন্দর। আরে তোমার চোখেও তো জল দেখছি। মুছে ফেলো। আর প্রার্থনা করো, সব অনাথ শিশু যেন এরকম মায়ের দেখা পায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত