আশাপূর্ণা দেবীর গল্প ‘কাজে লাগানো’

আমার আপনার সবার প্রিয় আশাপূর্ণা দেবীর ১৯০৯ সনের ৮ জানুয়ারী জন্ম । ১৯৯৫ এর ১৩ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান। অথচ অদ্ভুত কথা হল তিনি কোনোদিন স্কুলে পড়েননি। হ্যাঁ এটাই সত্যি। কারণ বাড়ির বারণ ছিল। তাঁর মা সরলাসুন্দরী দেবী কিন্তু স্কুলে পড়া বিদুষী ছিলেন। মা খুব চেষ্টা করেছিলেন তাঁর মেয়েরা স্কুলে পড়ুক। কিন্তু তাঁর শাশুড়ির অনমনীয় জেদের কাছে হার মেনে যান। আশাপূর্ণা দেবীর  ঠাকুমা শেষমেশ মত দেননি। তিনি আজীবন আফসোস করেছেন স্কুলের মুখ দেখেননি বলে। এই গল্প শুনে মনে পড়ে যায় আশাপূর্ণার বিখ্যাত ট্রিলজি প্রথম প্রতিশ্রুতির কথা। যেখানে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘরে বাইরে মেয়েদের কঠিন লড়াইয়ের ইতিহাস বলেন অত্যন্ত সহজ অন্তরঙ্গ ভাষাশৈলীতে।

মা সরলাসুন্দরীর ছিল শিক্ষা – দীক্ষা রুচি উদারতা। যা কিনা তিনি মেয়েকে দিয়ে গিয়েছিলেন । পিতা হরেন্দ্রনাথ গুপ্তর ছিল সংগীত ও চারুশিল্পে প্রতিভা। স্বামী কালিদাস গুপ্তের আজীবন সহৃদয়তা তাকে সাহিত্যের পথে সঙ্গ দিয়েছে।

আশাপূর্ণা দেবীর সাথে তাঁর বৌমা নূপুর গুপ্তর অদ্ভুত সুন্দর সম্পর্ক ছিল। প্রতিটি বইয়ের ভূমিকা লেখেন তাঁর বৌমা।  তিনি ঘরোয়া আশাপূর্ণাকে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।  নূপুরদেবী বলেছেন  – “আমি এত মানুষ দেখেছি, কিন্তু আমার শাশুড়ির  মত সমস্ত সংকীর্ণতা ছাপিয়ে উঠতে আর একজনকেও দেখলাম না। মা টানা লিখতে পারতেন না , কেউ না কেউ দেখা করতে আসতো। যেমন একদিন পুরোনো ঝি এসেছে, মা কুড়ি টাকা দিলেন, খানিক গল্পসল্প করে বিদায় দিয়ে আবার লিখতে বসলেন এরকম। “প্রথাগত শিক্ষা ছিল না কোনো, তাহলে  এত এত উপন্যাস, গল্পে এত মনোগ্রাহী সব চরিত্র তিনি আঁকলেন কি করে? কি করে লিখলেন, বিকেলে ভোরের ফুলের মতো সামাজিক সম্পর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রবীণ দুই মানুষ মানুষীর কাছে আসার গল্প বা শুক্তি সাগরের কাহিনী, যেখানে নায়িকা সম্পর্কের নাম রাখে ‘ও কিছু নয়’।

নিজের সময়ের থেকে অনেক দূর এগিয়ে ছিলেন আশাপূর্ণা। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন “আমি মনের জানলা খোলা রেখেছিলাম যে’ ….. তাঁর প্রতিটি নারী চরিত্রই স্বতন্ত্র। স্বকীয়তায় উজ্জ্বল।

আগেই বলেছি মায়ের উৎসাহে পড়াশোনা। মায়ের উৎসাহেই ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় প্রথম কবিতা পাঠানো। আশাপূর্ণা দেবীর মতে সম্পাদকদের উৎসাহমূলক চিঠিগুলো ‘আরো পাঠাও, আরো লেখোই তাঁর আসল অনুপ্রেরণা। তাঁর তো তখন মাত্র তেরো বছর বয়স। তাই সম্পাদকদের তুমি করে সম্বোধন। শেষজীবনে ডিগ্রির আর পুরস্কারের অভাব হয়নি। সম্মানসূচক ডক্টরেট পেয়েছিলেন, জব্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৩), রবীন্দ্র – ভারতী (১৯৮৭), বর্ধমান (১৯৮৮), বিশ্বভারতী (দেশিকোত্তম ১৯৮৯) এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পেলেন ১৯৯৩ সালে। বিখ্যাত উপন্যাস ট্রিলজি  — প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা ও বকুলকথা। এর মধ্যে প্রথমটির জন্য তাঁর হাতে জ্ঞানপীঠ উঠে আসে। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও আরো নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা বই, পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা।


কাজে লাগানো
…………………

অ্যাঁ! চুরি!

এত বড় ওজনের একখানা চুরি! খোদ রাজবাড়ি! স্বয়ং মহারাজের জন্মদিনে, একেবারে রাজ-অন্দরের খাসমহল ‘মচ্ছমহল’ থেকে! খবরটা শুনেই মহারাজা খাপ থেকে তলোয়ার টেনে বার করতে গেলেন, কিন্তু অনেক দিনের মরচেয় খাপের সঙ্গে জম্পেস হয়ে আটকে থাকার দরুন তলোয়ার আর খাপ্ থেকে বেরোতে রাজী হল না।

রাজা রেগে গলদঘর্ম হয়ে হাঁক পাড়লেন, “কে আছিস, বড় মন্ত্রীকে ডেকে আন!”

বড়মন্ত্রী পাকা দাড়িতে চিরুনি চালাতে-চালাতে এসে বললেন, “কী ব্যাপার?”

রাজা আমড়া-খাওয়া হেন গোমড়া মুখে বললেন, “ব্যাপার গুরুতর! রাজবাড়িতে চুরি!”

বড়মন্ত্রী চিরুনির মোটা দিকটা ঘুরিয়ে সরু দিকটা দিয়ে আঁচড়ে নিয়ে নিশ্চিন্দি গলায় বললেন, “এই কথা! এই নিয়ে হৈচৈ? মহারাজ কি ভোরে সূয্যি উঠলে আশ্চয্যি হন? না সন্ধেয় অন্ধকার নামলে? চুরির মতো এমন স্বাভাবিক ঘটনা জগতে আর কী আছে? রাজ্যে রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা অহরহ কত চুরি হচ্ছে। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, খালে-বিলে, নদী-নালায়, সর্বত্রই চুরির চাষ! পুকুরকে পুকুর, পাহাড়কে পাহাড়, কী না চুরি হচ্ছে! চুরি নিয়ে আপনার দামী মাথাটা ঘামিয়ে জখম করবেন না।”

রাজা বললেন, “দেখো মন্ত্রী, তুমি আমায় বোকা পেয়ে ছেলে ভুলোতে এসো না। রাজ্যের সর্বত্র চুরি হচ্ছে বলে খোদ রাজ-অন্দরে চুরি হবে? দেশে একটা সভ্যতা-সম্ভ্রম নেই? সাত মহলের শেষ মহল হচ্ছে অন্দর মহল, আবার তার মধ্যে পাঁচ মহলের শেষ মহল হল গিয়ে ‘মচ্ছমহল’।

মন্ত্রী ঘাড় নেড়ে বললেন, “তা বটে! রাজবাড়িতে মামার বাড়ির আবদার চলতে পারে না। কিন্তু মহারাজ ওই পাঁচ মহলের বাকী মহলগুলো কী?”

রাজা তপ্ত হয়ে বললেন, “মন্ত্রী বুড়ো হয়ে সব বিস্মরণ হলে না কি? রান্নাবাড়ির নাম খোদ অন্দরমহল না? তার পাঁচ মহলের নাম ‘অন্নমহল’, ‘ব্যঞ্জনমহল’, ‘মিষ্টিমহল’, ‘মাংসমহল’ আর ‘মচ্ছমহল’ না? শেষেরটাই সব থেকে শক্ত পাহারা না?”

ব্যাপারটা তাই। খাঁটি বাঙালী রাজা মহারাজা বিশাল নারায়ণ বর্মন! তাঁর ওই শেষ মহলটিতেই যত্ন বেশী।

মন্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে! তা চুরিটা কী গেল?”

বিশালনারায়ণ হাঁড়ির মতো মুখ করে বললেন, “কী চুরি গেল, সেটা তো কথা নয় মন্ত্রী! কেন চুরি গেল সেটাই কথা।”

মন্ত্রী বললেন, “তা বটে!”

“তবে তলব করো যত সেপাই, শান্ত্রী, পাহারাদার, দ্বাররক্ষী আর দেউড়ির দারোয়ানদের।”

মন্ত্রী বললেন, “বেশ!”

কিন্তু আসলে কী চুরি গেছে না জেনে কি আর তদন্ত করা চলে? মন্ত্রী-মশাই রান্নাবাড়ির খাশ চাকরের খাশ খিদমদগারের খাশ চাকরানীর কাছে তল্লাস করে খবর জানলেন! জেনে মাথায় হাত দিলেন।

সর্বনেশে কাণ্ড!

এ চুরির ফয়সলা না হলে মন্ত্রীত্বপদ থাকবে?

রাজার জন্মদিনে সোনাইদিঘিতে জাল ফেলিয়ে রাজার জন্যে যে দেড়মনী পাকা রুইটি তোলা হয়েছিল, আর তিনজন জেলেয় মিলে কুড়ুল দিয়ে যার বিরাট মুড়োটা ধড় থেকে আলাদা করে ফেলে রাজরান্নাঘরের দাওয়ায় নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবং স্বয়ং মহারানী যে মুড়োটিকে স্পেশাল উনুন জ্বেলে রাজার মনের মতো করে তেল-তেল করে মাখা-মাখা সর্ষের ঝাল রেঁধে রেখেছিলেন রাজামশাইয়ের জন্মদিন বাবদ, সেই মুড়োটি চুরি গেছে! রান্না হয়ে গেলে মচ্ছমহলে -প্রকাণ্ড এক রুপোর গামলায় চাপিয়ে কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে-ছড়িয়ে রেখে মহারানী আগুনতাত থেকে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে টানা পাখার তলায় হাওয়া খেতে বসেছিলেন, রাজার ভাত বাড়বার সময় দেখেন মুড়ো হাওয়া।
এর পরেও রাজামশাই খাপ থেকে তলোয়ার বার করতে যাবেন না? বেরোল না তাই, নইলে একধার থেকে সক্কলের গর্দান যেত না?

যাক, এখন আর মহারাজা তাঁর দামী মাথাটা ঘামাচ্ছেন না, বড়মন্ত্রী যখন তদন্তের ভার নিয়েছেন।

আঁচড়ানো দাড়ি বাতাসে খোড়ো বাড়ির চালের মতো উড়তে থাকে, মন্ত্রী নাগরা জুতো লটপটাতে-লটপটাতে দরবার-হলের সেজো-সিংহাসনে গিয়ে বসে সিংদরজার দারোয়ান ব্রজগোবিন্দ সরখেলকে ডাক পাড়ান।

আগের আমলের দারোয়ান ছিল সব ভোজপুরী। এখন একধার থেকে সব বাঙালী পাহারাদার বসানো হয়েছে।

তবে তারা পাগড়ি পরে, কুর্নিশ করে।

ব্রজগোবিন্দ কুর্নিশ করে বলল, “কী বলুন?”

বড়মন্ত্রী রেগে বললেন, “কী রকম পাহারাদার? রাজ অন্দরে চুরি! তুমি না সিংদরজার হেড্ রক্ষী? চোখ তাকিয়ে থাকো না ঘুমোও?”

ব্রজগোবিন্দ ফের কুর্নিশ করে বলল, “সিংদরজা দিয়ে চোর সেধোয় শুনেছেন কখনো?”



বড়মন্ত্রী দাড়ি নেড়ে বললেন, “তা বটে, তা বটে।”

তবে দ্বিতীয় মহলের দ্বারী দ্বারকেশ্বর দলুইকে তলব করো। …দ্বারকেশ্বর দলুই-তার নামে যে অভিযোগ হয়েছে তা শুনে বলল, “মন্ত্রীমশাই, আমার দরজা দিয়ে একটি ছুঁচও গলে যেতে পারে না।”

মন্ত্রী বললেন, “বলি ছুঁচ না গলুক হাতি গলে না?”

দ্বারকেশ্বর একগাল হেসে বলল, “আজ্ঞে সেটা খিড়কি-দোরে।”

মন্ত্রী মাথা হেলিয়ে বলেন, “তাও তো বটে।… ডাক তবে খিড়কির দারোয়ানকে।”

রাজার চাকর তপাই বলল, “উঁহু, তা হবে না, একে একে সাত দেউড়ি তদন্ত হোক।”

তবে হোক।

তিনমহলের দেউড়ির পাহারাদার হাই তুলতে-তুলতে এসে বলল, “রাত জাগা আমার সয় না, ঘুম না হলে পেটের মধ্যে হুট-পাট করে, কিন্তু চোরের নাক গলাবার জো রেখেছি ভেবেছেন? দেউড়ি থেকে চলন-ঘর পর্যন্ত গালচের মতো পুরু করে চোরকাঁটা বিছিয়ে রেখে ঘুমোতে যাই।”

চারমহলের শান্ত্রী আরও চালাক, সে দেউড়ির দরজায় ঘণ্টা ফিট করে রেখেছে, দরজায় হাত দিয়েছে কি ঘণ্টারা বেজে উঠবে ঢংঢং, টুংটাং, ঠুন্ঠুন্।

একে-একে সব মহলের দ্বারীদের জেরা করলেন বড়মন্ত্রী, দাড়ি নেড়ে-নেড়ে দেখলেন, মানে শুনলেন, চোর আসবার পথ কেউ কোনওখানে রাখেনি। রাখে না।

তবে?

তবে তেল-তেল করে সর্ষের ঝাল রাঁধা সেই দেড়মনী মাছের মাথাটা গেল কোথায়? তাও রাতে নয়, দিনে দুপুরে।

দিনে দুপুরে!!

শুনে পাহারাদার মহলে হৈচৈ পড়ে গেল!

দিন দুপুরে চুরির জন্যে রাত পাহারাদের জেরা! এ কি মামদোবাজি না কি? চিত্‌কার করে উঠল সবাই, “প্রতিবাদ, প্রতিবাদ!” হেড দারোয়ান ব্রজগোবিন্দ এসে বলল, “মন্ত্রীমশাই দিনের পাহারাদাররা গেল কোথায়?”

বড়মন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, “তাই তো গেল কোথায়?”

প্রধানা পরিচারিকা মহিষমর্দিনী বলল, “তারা সবাই মিলে খিড়কি পাহারা দিচ্ছে।”

খিড়কিতে সবাই। ব্যাপার কী! নিশ্চয়ই সব রহস্য ওইখানে।

বড়মন্ত্রী সদলবলে- মানে সাত দেউড়ির সব পাহারাদার আর বড়মন্ত্রী ঝেঁটিয়ে যত দাসদাসী এগিয়ে গিয়ে দেখে, খিড়কি দরজার পাশে অনেক লোকের গুলতানি।

এখানে কী? এখানে কী?

গুলতানরা চুপ মেরে বলে উঠল, “কিছু না মন্ত্রীমশাই, কিছু না, এমনি দাঁড়িয়ে আছি সবাই।”

বড়মন্ত্রী অবাক! “কাজকর্ম ফেলে সবাই এমনি দাঁড়িয়ে আছ? দেখতে হবে-”

বলে লোকজনকে ঠেলেঠুলে যেতে যাবেন, হাঁ হাঁ করে ওঠে সবাই, “পড়ে যাবেন। পড়ে যাবেন।”

মন্ত্রী রেগে বললেন, “বটে, তোমরা কেউ পড়ছ না, আর আমিই অমনি পড়ে যাব? বুড়ো হয়েছি বলে আমায় এত অবজ্ঞা?”

বলেই না সামনের লোকদুটোকে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলেন তড়বড়িয়ে। বাস! মন্ত্রীমশাইয়ের চিহ্ন নেই আর!

দেড়ফুট লম্বা সাদা দাড়ি আর জরির কোমরবন্ধ আঁটা সাদা রেশমী পোশাক সমেত বড়মন্ত্রীমশাইয়ের আড়াইমনী দেহটি রাজার দেড়মনী মাছের মুড়োটার মতই মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে গুলতানবাজরাও এদিক-ওদিক ছিটকে হাওয়া, পাহারাদাররা হাঁ।… এ কী তাজ্জব।

সামনে ইয়া বড়-মুখ-এক সুড়ঙ্গ, মন্ত্রীমশাই তার মধ্যে দিয়ে তলিয়ে গেছেন।

গেছেন তো গেছেন, গড়গড়িয়ে গড়াতে-গড়াতে একেবারে কোন্ পাতালে। মাথা ঝাঁকিয়ে কোমর বাঁকিয়ে উঠে দেখেন দিব্যি গোটা-গোটা সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন মন্ত্রীমশাই কোমরে হাত দিয়ে-দিয়ে। মাথায় পাগড়ি তাই মাথাটা বেঁচেছে।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে বড়মন্ত্রী মশাই ‘থ’।

এ যে একেবারে রাজ-রাস্তায় উঠে এলেন। চেনা জায়গা। সিঁড়ির মুখে রাজবাড়ির হেডরাঁধুনীর বাড়ির পাশ-দরজা। হেডরাঁধুনীর ছেলের বিয়েতে এসেছিলেন, বাপের শ্রাদ্ধতেও এসেছিলেন। রাজবাড়ির হেডরাঁধুনীর মান তো কম নয়।

বড়মন্ত্রী মশাই কোমর ডলতে-ডলতে হাঁক দিলেন, “বাড়িতে কে আছ?”

মানুষের গলা শুনতে পেলেন না, শুধু ভারী গলার একটা ‘গরর্ গরর্’ শব্দ পেলেন। সর্বনাশ।

হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল মন্ত্রীমশাইয়ের। হেড-রাঁধুনী টঙ্কবল্লভ গুণাকর বুড়ো বয়েসে বাঘ পুষছে! মন্ত্রী কি আবার ওই সুড়ঙ্গ পথে নেমে যাবেন? ‘গরর…গরগরর…গর’ আওয়াজ যে বাড়ছে। কিন্তু কী করে যাবেন? এদিকে নয়, সিঁড়ি আছে ওদিকে? ওদিকে তো গর্তে পা ফেলে গড়গড়িয়ে গড়িয়ে এসেছেন।… আস্তে-আস্তে পা টিপে-টিপে এগিয়ে গেলেন দালান পার হয়ে পড়লেন, আর পড়েই সামনের জানলা দিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পেলেন।

গন্ধমাদনের চূড়োর মত, বিরাট এক মাছের মুড়োর ওপর বসে আছে একটি বেঁটে খাটো গোলগাল গিন্নীবান্নি কেঁদো বাঘ।… আর ওই মুড়োটাকে ঘিরে একরাশ হৃষ্টপুষ্ট বেড়াল মহোল্লাসে শাঁস খুবলোচ্ছে।

যেন তুলোছেঁড়া বালিশের চারধারে নেংটি ইঁদুরের মহোল্লাস। দৃশ্যটা দেখে মন্ত্রীমশাইয়ের এমন কম্প শুরু হল যে, ‘বু বু বু বু’ শব্দ করতে-করতে গড়িয়ে পড়লেন।

বেড়ালগুলো একসঙ্গে মিউমিউ করে উঠল, বাঘটা ‘গরগর’। ওদের শব্দে কোথা থেকে যেন বেরিয়ে এল টঙ্কবল্লভ গুণাকর। এসেই আর্তনাদ করে উঠল, “এ কী মন্ত্রীমশাই, আপনি এখানে? এ কী অবস্থা! কই রে, কে আছিস? জল আন্, পাখা আন্।”

মন্ত্রীমশাই ‘বুবু’ করে বললেন, “জল থাক, আগে তোমার ওই বাঘ সরাও বাবা।”

“বাঘ!”

টঙ্কবল্লভ মাথায় হাত দেয়, “বাঘ কোথায়? ও তো আমার পোষা বেড়াল আহ্লাদী!”

“ও তোমার বেড়াল? আমায় কি খোকা পেয়েছ টঙ্ক?”

টঙ্ক বলে, “এই আপনার পা ছুঁয়ে বলছি মন্ত্রীমশাই, সেরেফ বেড়াল। ইয়ে মানে রাজরান্নাঘরের দুটো ভালমন্দ খেয়ে খেয়ে গতরটি একটু হয়েছে ভাল। ওর ছানাপোনাদেরও মন্দ নয়। ওই দেখুন না মায়ের সঙ্গে খেলছে।”

মন্ত্রী বললেন, “বুঝেছি। রহস্য ফাঁস হল। কিন্তু মুড়ো কি রোজই চুরি যায়?”

টঙ্ক মাথা চুলকে ঘাড় হেঁট করে মুচকি হেসে বলে, “আজ্ঞে না, তা নয়, মহারাজের ভোগের পর পাতের মুড়োটা পেসাদ পায় বেটি, আজই কেমন ভুলক্রমে কাজটা আগে-ভাগে করে ফেলেছে। যতই হোক জানোয়ারের বুদ্ধি তো? সময় ঠিক করতে পারেনি। ঘড়ি না দেখেই সুড়ঙ্গ পথে নেমে গেছে। না বুঝে সুড়ঙ্গ দিয়ে পাচার করে এনে-”

মন্ত্রী আগুন হয়ে বললেন, “না বুঝে? আস্ত কি ভাঙা বোঝে না ও?”

টঙ্কবল্লভ বলে, “সে কি মন্ত্রীমশাই, ভাঙা কেন হতে যাবে? পেসাদ তো রোজ আস্তই থাকে। রাজামশাইয়ের তো শুধু দৃষ্টিভোগ! খেয়ে থাকেন শুধু জলসাবু।”

“জলসাবু? শুধু জলসাবু খেয়ে থাকেন মহারাজা!”

টঙ্ক জিভ কেটে বলল, “এই মরেছে, বলে ফেললাম। একথা যেন ফাঁস হয় না মন্ত্রীমশাই, তাহলে টঙ্কর ফাঁসি।”

মন্ত্রী দেখেন, আহ্লাদী তখন সপরিবারে মুড়োটাকে কায়দা করে ফেলেছে।… গা করকর করে ওঠে বড়মন্ত্রীর। কড়া গলায় বলেন, “তা রোজই বা বেড়ালের ভোজে লাগে কেন? মহারানী খেতে পারেন না?”

“হুঁঃ। তাঁর ভাগের ল্যাজটাই কে খায় তার ঠিক নেই। দাসীদের খেয়ে-খেয়ে অরুচি।”

“বলি তোমরাও তো খেতে পারো।”

“আজ্ঞে আমার কথা বাদ দিন। মচ্ছমহল মিষ্টিমহল মাংসমহল অন্নমহল সকল মহলের দাসদাসীরই খাওয়ায় অ্যালার্জি। খেয়ে খেয়ে-”

মন্ত্রী বললেন, “তা অন্য দিকে দু’একদিন ছুঁড়ে মারা যায় না?”

টঙ্কবল্লভ জিভ কাটে, “সর্বনাশ! তাহলে তো রাজামশাইয়ের জলসাবুর ব্যাপার ফাঁস হয়ে যাবে।”

মন্ত্রীমশাই দাড়ি নেড়ে নেড়ে বলেন, “তা বটে! কিন্তু এত বড় সুড়ঙ্গটি কাটল কে?”

টঙ্কবাহাদুর একমুখ হেসে বলে, “আজ্ঞে সে-কষ্ট আমাদের করতে হয়নি, পূর্বপুরুষরা করে গেছলেন। মানে রাজবাড়িতে হঠাৎ শত্রু-আক্রমণ হলে মহারানীরা সুড়ঙ্গ-পথে পালাবেন বলে করা। তা জিনিসটা যখন রয়েছে কাজে লাগানো ভাল। শত্রু আক্রমণ তো আর নেই একালে।”

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত