Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 10

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৪) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী

Reading Time: 9 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 1মিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃদীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা,অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন,প্রব্রজন ,ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi,New Delhi ,2010) এবং The Highlanders(Blue Rose Publishers, New Delhi,2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন,কলকাতা,২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-৪।


 

নাটালিয়া জলপথ দিয়ে কিয়েভে যাবে বলে স্থির করল।

ভল্গার উজান পর্যন্ত যেতে পারা মস্কো-ভল্গা প্রণালী দিয়ে, সঙ্গে দক্ষিণের ডন নদী পর্যন্ত যেতে পারা ভল্গা-ডন  প্রণালী দিয়ে মস্কোভা নদীর পাশের মস্কো বন্দর সংযোজিত। এই প্রণালী দুটোর জন্যই শ্বেত সাগর, কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর, কাস্পিয়ান সাগর এবং আজব সাগর থেকে মস্কো পর্যন্ত জাহাজ আসা যাওয়ার পথ সুচল। তাই স্থলভূমির মধ্যভাগে যদিও মস্কো মহানগরকে পাঁচটি সাগরের বন্দর বলে বলা হয়ে থাকে।

নাটালিয়া মস্কো- ভল্গা এবং ভল্গা-ডন প্রণালী দিয়ে ডন নদী পর্যন্ত যাওয়াটা স্থির করল। ডন নদী কৃষ্ণা সাগরে পড়েছে এবং সেই সাগরের উত্তরে রয়েছে ইউক্রেইন। তারই রাজধানী শহর হল কিয়েভ।

৮৫০ সনের আগে রাশিয়ায় অত্যন্ত কম সংখ্যক মানুষ বাস করতেন। কিন্তু সেই শতকে সুইডেন থেকে ভাইকিং আক্রমণকারীরা দক্ষিনে এসে কিয়েভ শহর প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। ছোট ছোট জাতি উপজাতি কৃষক এবং শিকারিরা রুশদেশের এখানে-ওখানে বসবাস করত যদিও এই পমুয়া  ভাইকিং ব্যবসায়ীদের রুশ বলে বলা হত। ওদের ব্যবসার অঞ্চল ছিল বাল্টিক সাগর থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত থাকা পথটা। ব্যবসায়ীদের এই অঞ্চলটা  নিয়ে রাশিয়া রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। দশম শতকের শেষের দিকে বাইজেন্টাইন ধর্মী খ্রিস্টান মিশনারিরা কিয়েভ শহরে আসে এবং মানুষগুলিকে গ্ৰিক অর্থোডক্স গির্জার অন্তর্ভুক্ত ধর্মে দীক্ষা দান করে। তারাই চাইরিলিক লিপিও ভাষা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। নাটালিয়া জানে এই লিপি এবং ধর্ম দুটিই এখনও রাশিয়ায় প্রচলিত রয়েছে।

নাটালিয়া মস্কো-ভল্গা প্রণালিতে চলা মার্কিন নামের একটা ফেরিতে উঠল। ফেরিটার  নাম গৃহযুদ্ধের সময়ের বাল্টিক সাগরের বিখ্যাত নাবিক নিকোলাই মার্কিনের নামে রাখা হয়েছিল। ভল্গা অঞ্চলে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। পরে তাকে প‍্যানিবরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

সুদৃশ্য ফেরিটার চারপাশের বিশাল বিশাল কাচের জানালা দিয়ে নাটালিয়া হালকা এবং নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করে যেতে লাগল। নদীতে সুন্দর সুন্দর যাত্রীবাহী ফেরি ছাড়াও বড় বড় মালবাহী জাহাজ চলছিল। যতই সে ভাটির দিকে যাচ্ছিল ততোই গ্রীষ্মের ছুটি উপভোগ করার জন্য উজানের দিকে যাওয়া আনন্দ-ফূর্তি করতে থাকা মানুষগুলিকে ফেরিতে পার হয়ে যেতে দেখতে পেয়েছিল। মানুষগুলি উষ্ণ সূর্য ছাড়াও নানা বর্ণের উজ্জ্বল ফুলের প্রশস্ত বাগিচা, সমান তৃণভূমি এবং সবুজ অরণ্যের মাঝে মধ্যে ঘুরে বেরিয়ে গরমের বন্ধ উপভোগ করবে। বাতাসে উড়তে থাকা রঙ্গিন সাজ-পোশাক ফুর্তিবাজ মানুষগুলির মধ্যে কিছু মানুষ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গান গেয়ে চলছিল। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে পার হয়ে যাওয়া মানুষগুলি নাটালিয়া থেকে শুরু করে ভাটির দিকে যাওয়া যাত্রীদের আনন্দ বিলিয়ে গেল।

নাটালিয়ার ডন নদী দিয়ে কৃষ্ণসাগর পাওয়ার আবশ্যক হল না। পথে নেমে পড়ল। পরে উত্তর ইউক্রেইনের নিপর নদীর পাশে থাকা কিয়েভের উদ্দেশ্যে সে বাসে যাত্রা করল।

সে একটা হোটেলে রইল।

পরেরদিন অধ্যাপক পুঝিনের বাড়ি খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না। পুঝিনের এক ছেলে কয়েক মাইল দূরে ইস্পাত  উদ্যোগে কাজ করে, যদিও কিয়েভ থেকে আসা যাওয়া করে। মস্কো বা লেনিনগ্রাদের শীতের তুলনায় কিয়েভের জলবায়ু বেশ উষ্ণ বলেই সত্তরের উর্দ্ধের অধ্যাপক অবসরের পরে কিয়েভে থাকাটা ঠিক করেছে। কখনও কখনও ছেলে তাকে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানোর জন্য কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়। উত্তর এবং পশ্চিমের পার্বত্য এলাকা সুদূর উত্তরের শীতল জলবায়ু রোধ করে উপকূল অঞ্চল উষ্ণ করে রাখে বলেই উপকূলে ভ্রমণকারীর বড় ভিড় হতে দেখা যায়। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলের বালিতে ক্ষুদ্র বস্ত্র পরিধান করে মানুষগুলি রোদের উষ্ণতা নিয়ে শুয়ে থাকে। সাগরে স্নান করে এবং নানাবিধ খাদ্য উপভোগ করে আনন্দ ফুর্তি করে।

অধ্যাপক পুঝিন পরিবারের সঙ্গে সাগরের পারে পারে মৃদু বাতাসে ঘুরে বেড়ান। রোদের তাপ নেন। ক্যাভিয়ার, সার্ডিন মাছ এবং সাগরীয় শামুক দিয়ে প্রস্তুত করা খাদ্য খায়। কয়েকদিন সেখান থেকে সজীব হয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপক পরিবারের সঙ্গে কিয়েভে ফিরে আসেন।

দিনটা ছিল পরিষ্কার । উষ্ণতায় ভরা। নাটালিয়া যাবার সময় অধ্যাপক পুঝিন বাড়িতে ছিলেন। সকালের আহার খেয়ে তিনি একটা পাতলা হাউসকোট পরে পরিবারের সঙ্গে বারান্দার রোদে বসে সকালের খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

নাটালিয়া নিজের পরিচয় দিয়ে অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ দিয়ে পাঠানো পরিচয় পত্রটা অধ্যাপকের দিকে এগিয়ে দেয়। তিনি চোখের চশমা ঠিক করে কাগজটা পড়ার জন্য কিছুক্ষণ সময় নিলেন। তারপরে মুখে চেপে ধরে থাকা পাইপটা এক হাতে সরিয়ে নিয়ে নাটালিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন ,-‘ও তাহলে তুমিই নাটালিয়া নিকলায়েভ না? গবেষক ।

    ‘হ্যাঁ’, নাটালিয়া সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।

    ‘বস।’

অধ্যাপকের কথা শুনে পাশে বসে মোটা শলা দিয়ে ধীরে ধীরে উল বুনতে থাকা পরিবার বলল-‘ তোমরা একবারে পড়ার ঘরেই বসবে নাকি? য়েই

‘হ‍্যাঁ,সেটাই ভালো হবে।’

অধ্যাপক উঠে দাঁড়ালেন এবং নাটালিয়াকে ‘এসো’ বলে তিনি তার পড়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। টেবিলের ওপাশে তাকে বসতে দিয়ে নিজেও বসে নিয়ে অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন-‘ বল তুমি কি বিষয়ে গবেষণা করছ?’

বৃদ্ধ অধ্যাপকের প্রশ্ন এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকানো দেখে নাটালিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হল। মুহুর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল- ‘স্যার, আমি টলস্টয়ের বিষয়ে গবেষণা করতে চাই। আমাদের সমাজের উপরে তার চিন্তাধারার প্রভাব সম্পর্কে গবেষণা করতে চাই।’   অধ্যাপক দুয়েকবার পাইপটা টেনে নিল। তারপর বললেন-‘ তোমার বিষয়টা একটি মহাসাগর এবং নতুনত্বহীন।’

নাটালিয়ার মনটা মুহুর্তের মধ্যে বিষন্ন হয়ে গেল।

অধ্যাপক বলে গেলেন-‘ নতুনত্বহীন বলছি এই কারণে যে এই বিষয়ে ইতিমধ্যে অন্যে গবেষণা করার সম্ভাবনা যে নেই তা নয়।’

তিনি পুনরায় বললেন-‘ হলেও, তুমি যদি নতুনত্ব দিতে পার, তাহলে একই বিষয়ে হয়েও তোমার গবেষণার গুরুত্ব থাকবে।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন-‘ তুমি তার কী, কতটুকু পড়েছ?’

নাটালিয়ার বিষন্ন মন তখন ও সজীব হয়ে উঠেনি। সে তার পঠিত বইগুলি এবং অন্য রচনাগুলির সম্পর্কে বলতে কিছুটা সময় নিল। সে কথাগুলি থেমে  থেমে বলল-‘ আনা কারেনিনায় তার পরিবারের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছিল। অন্যদিকে’ যুদ্ধ এবং শান্তি’তে প্রকাশ পেয়েছিল দেশের প্রতি ভালোবাসা।’

অধ্যাপক হেসে বললেন -‘এটা তার নিজের বলা কথা। তারপর বললেন- ‘তার ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ পুনরায় পড়বে । ‘ক্রোয়েটজার সনাটা’ পুনরায় পড়বে । মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সামাজিক মূল্যবোধের বিশ্লেষণ বিচার করে দেখবে। রুশ জনগণের আনন্দ,বেদনা, স্বপ্ন, নেপোলিয়নের কবলে বহুভাষী ইউরোপের সঙ্গে আমাদের মানুষের দ্বন্দ্ব ,ন‍্যায়ের সংগ্রাম ,ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তে এর বিন্যাস এবং শান্তি পিয়াসী মানুষের জীবনের রূপান্তরের কাহিনি ‘যুদ্ধ এবং শান্তি’তে খুঁজে দেখবে।’নাটালিয়া নোটবুক’ বের করে নিয়েছিল। সে দ্রুত কথাগুলি লিখে নিতে লাগল।

অধ্যাপক বলে গেলেন -‘ ‘কসাক’ এবং ‘নবজন্ম ‘ভালোভাবে পড়বে।

অধ্যাপক পুঝিন বললেন – টলস্টয়ের বই সবাই পড়তে পারে, কিন্তু সেই ব্যক্তি মানুষটাকে জানতে পারলে তবেই গবেষণা করা যেতে পারে। তাকে খুঁজে দেখ- লেখায়, সঙ্গে জীবনীতে।’

নাটালিয়া নোট বই থেকে মাথা তুলে বৃদ্ধ অধ্যাপকের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজে জানা কথাগুলি বলতে শুরু করল । তিনি ভূমি দাসদের জন্য কী করেছিলেন শিক্ষা-দীক্ষার জন্য কী করেছিলেন কীভাবে ‘ইয়াস্নায়া পলিয়ানা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন, রিয়াজন প্রদেশে ছাউনি পেতে কীভাবে দুঃস্থদের খাদ্য দান করেছিলেন, সঙ্গে হত্যাকারীকে বাঁচানোর জন্য তিনি কী করেছিলেন। তাছাড়া সে দুই একটি গল্পের কথাও উল্লেখ করল- ‘মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে’, ‘যেখানে প্রেম সেখানেই ভগবান’, ‘একজন মানুষের কতটুকু জমির প্রয়োজন’, ‘ভগবান দেরিতে হলেও সত্যটাকে দেখেন’ ইত্যাদি এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই টলস্টয়ের মন প্রতিফলিত হওয়ার কথা সে অবিরতভাবে বলে গেল।

নাটালিয়ার উৎসাহ ধীরে ধীরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ হতে লাগল । সে অবশেষে বলল -‘ঋষি টলস্টয়ের  অনুভূতির প্রকাশের কথা আমরা দেখতে পাই অন্য একটি ঘটনা থেকে। তিনি মস্কো কনজারভেটরির একটি সঙ্গীত সন্ধ্যায় সঙ্গীতজ্ঞ  পিয়টর সাইকোভস্কির  আনডান্টের  প্রথম কোয়ার্টেটটা শুনছিলেন। শুনতে-শুনতে তার চোখের জল পড়তে লাগল। এতই সূক্ষ্ম ছিল টলস্টয়ের অনুভূতি।’

নাটালিয়ার মুখের দিকে বৃদ্ধ অধ্যাপক পুঝিন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তার কথা শেষ হওয়ার পরেও তিনি হাতের পাইপটা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন । তারপরে তার কোমল কন্ঠে বললেন -‘নাটালিয়া, তোমার সুন্দর মনের আভাস আমি পেয়েছি । তুমি আসলে দেখতে যতটুকু সুন্দর  তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর ।’

নাটালিয়ার গালে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। 

অধ্যাপক বললেন -‘পারবে ,তুমি টলস্টয়ের বিষয়ে গবেষণা করতে পারবে । মানুষটার উপলব্ধি তোমার সত্তায় ছড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত, তার সমস্ত লেখালিখির জ্ঞান তোমার প্রজ্ঞানের পরিধিতে  বেঁধে না নেওয়া পর্যন্ত কেউ গবেষণা করতে পারেনা। এই কথা অনেক গবেষক উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু তুমি পারবে।’

তিনি পুনরায় বললেন -‘তোমার বিষয়টা বড় বিশাল। কিন্তু প্রজ্ঞানের  পরিধিতে  বাঁধার জন্য এর অত্যন্ত আবশ্যক রয়েছে । সেই অবস্থা হলেই  তুমি তার মধ্যে গবেষণার অন্য একটি সূক্ষ্ম পথ খুঁজে পাবে। যেখান থেকে একটি নতুন দিক নিয়ে গবেষণা করতে পারবে।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বৃদ্ধ অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন -‘আচ্ছা নাটালিয়া, তুমি আমার কাছে কেন এলে? অধ্যাপক ক্ৰিয়োসকভই বা  আমার কাছে তোমাকে কেন পাঠালেন?’

নাটালিয়ার আড়ষ্টতা ইতিমধ্যে অনেকখানি দূর হয়েছিল । সে বলল -‘আপনি নাকি একসময় টলস্টয় যাদুঘরে গবেষণা করেছিলেন অধ্যাপক লাসে ল‍্যাংকের সঙ্গে । আপনাদের চেয়ে অন্য কেউ-‘

কথাটা শেষ না করে নাটালিয়া বলল-‘ তাই স্যার ক্ৰিয়োসকভ আলোচনার জন্য আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’

বৃদ্ধ অধ্যাপক অল্প হাসলেন। তারপর নিভে যাওয়া পাইপটা টেবিলের এক পাশে রেখে দিয়ে বললেন -‘অনেক বছর হল। ইতিমধ্যে অধ্যাপক লাসেল‍্যাংক স্বৰ্গগামী হলেন। সেটা হয়তো ১৯৫৬  সনের কথা। স্টালিনের সময়কাল কত কঠিন ছিল তুমি নিশ্চয় জান‌। ১৯৫৩ সনে তার মৃত্যুর পরে ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হল। ১৯৫৬ সনে ক্রুশ্চেভ মুক্তভাবে স্টালিনের সময়ের মুক্ত এবং গুপ্ত- দুই ধরনের হত্যার সমালোচনা করতে লাগলেন ।আমরা গবেষকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সেই সময় আমি ইয়াস্নায়া পলিয়ানার হাভেলিতে গ্রন্থাগারে বসে গবেষণা করার সুযোগ পেলাম ।তখনই অধ‍্যয়ন করেছিলাম।’

‘অনেক বছর হল।’- অধ্যাপক বললেন-‘ কথাগুলি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি জিজ্ঞেস করলে কথাগুলো হয়তো মনে পড়তে পারে।’

তখনই অধ্যাপক পুঝিনের পত্নী দুকাপ কফি দিয়ে গেলেন।

তিনি বেরিয়ে যাবার পরেও নাটালিয়া বৃদ্ধ অধ্যাপকের সঙ্গে কিছু সময় চুপ করে বসে রইল। পুত্রবধূ হুকোঁর পাইপটা তামাকে পরিপূর্ণ করে জ্বালিয়ে দেওয়ার পরে দুটান মেরে অধ্যাপক নাটালিয়াকে  জিজ্ঞেস করলেন-‘ তোমার নামটা কি বলেছিলে? নাটালিয়া নয় কি?’

এবারও নাটালিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ‘আচ্ছা ,তুমি এর আগে ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় গিয়েছিলে কি?’

নাটালিয়া বলল-‘ গিয়েছি স্যার, দুবার।’

‘সেখানকার কোন কথাগুলি তোমাকে আকর্ষণ করে?’

নাটালিয়া কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল-‘ সেখানকার শান্ত সমাহিত একটি তপোবনের রূপ আমাকে আকর্ষণ করে।’

‘বেশ।’ অধ্যাপক প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন-‘ সেখানকার দুটি ঘরে দুটি তৈল চিত্র রয়েছে। সেগুলি লক্ষ্য করেছ কি?’

নাটালিয়ার মনে পড়ল টলস্টয়ের শোবার করে ম্যাডোনার তৈলচিত্রটির কথা। আরও একটি ছবি ছিল তাঁর বসার ঘরের দেওয়ালে।  সেটা একটি দাড়িওলা মানুষের একজোড়া ঘোড়া নিয়ে হাল বাওয়ার চিত্র ছিল।

নাটালিয়া বলার পরে বৃদ্ধ অধ্যাপক বললেন-‘ দুটো চিত্রই অর্থবহ। একটিতে ম্যাডোনার মাতৃমূর্তিতে প্রেমের করুনার প্রকাশ। অন্যটিতে দাড়ি থাকা মানুষটার জনগণের সঙ্গে একাত্মতার প্রকাশ। সেই দাড়িওয়ালা মানুষটিকে চিনতে পেরেছিলে  কি?’

নাটালিয়া চিনতে না পারার কথা বলায় অধ্যাপক বললেন-‘ ওটাই হলেন টলস্টয়।  ইলিয়া রেপিন অঙ্কিত সেই সাধারণ ছবিটিতে একজন কাউন্ট হাল বাওয়াটা হল অতি অসাধারন কথা।’

কিছুক্ষণ থেমে অধ্যাপক বললেন-‘ মস্কোতে না থেকে ইয়াস্নায়া পলিয়ানায় থেকে পুঁথি  রচনা করাটাতেই টলস্টয়ের মহত্ত্ব ছিলনা, তিনি শ্রমজীবী কৃষকের মতো বেঁচে থাকতে চেষ্টা করেছিলেন।’

 নাটালিয়া অধ্যাপকের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পরে অধ্যাপক পুঝিন বললেন-‘ নাটালিয়া, আমি আজকাল অনেক কথা ভুলে গিয়েছি, কিন্তু টলস্টয়ের হাবেলির যাদুঘরে আমার আবিষ্কার করা একটি চিঠির কথা আমি ভুলতে পারিনি- পারবও না। সেটা ছিল একটি ইংরেজি ম্যাগাজিনের  ভেতরে।’

অধ্যাপক বলে গেলেন-‘ তখন আমি মধ্যবয়সী ছিলাম।আবেগ-অনুভূতি তখনও প্রবল ছিল। সেই ভাবনা থেকেই টলস্টয়ের  হাতের স্পর্শ লাভ করা গ্রন্থগারের অনেক বইপত্র তন্নতন্ন করে সন্ধান করে দেখেছিলাম। আর তখনই আমি আবিষ্কার করেছিলাম সেই চিঠিটা। চিঠিটা টলস্টয়ের কাছে এসেছিল। আর এসেছিল অন্য কার ও কাছ থেকে নয়, এমকে গান্ধীর কাছ থেকে।’

অধ্যাপককে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছে দেখে নাটালিয়া বলল-‘ স্যার, সেই এম কে গান্ধী? ভারতের মহাত্মা গান্ধী?’

নাটালিয়ার চোখে একটা সরল ঔজ্জ্বল‍্যেব ভাব ছড়িয়ে পড়ল।

‘ঠিক বলেছ।’- বৃদ্ধ অধ্যাপক বললেন-‘ চিঠিটা পড়ার পরে টলস্টয় ইংরেজি ম্যাগাজিনটার ভেতরের রেখেছিলেন। তার পরে কেউ ম্যাগাজিনটা সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে। টলস্টয়ের আর চিঠির উত্তর দেওয়া হল না। কিন্তু সেই চিঠিতে উল্লেখ করা এবং তার সঙ্গে পাঠানো একটি বই যাদুঘরে পাওয়া গেল। চিঠির উত্তর দেওয়ার মানসে টলস্টয় বইটি খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়েছিলেন বলে মনে হয়, কেন না ভালোলাগা প্রতিটি পৃষ্ঠায় সই করে রেখেছিলেন।’

অধ্যাপক কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কিছু একটা ভাবতে লাগলেন। তা দেখে নাটালিয়া জিজ্ঞেস করল -‘ স্যার সেই বইটার নাম কি ছিল?

 ‘তাইতো, সেটা তো মনে পড়ছে না।’- অধ্যাপক কথাটা পুনরায় ভাবতে লাগলেন।

 কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন-‘ আচ্ছা তুমি দুই একদিন এখানে থাকবে নাকি? আমি আমার কাগজপত্র গুলি একটু ভালো করে খুঁজে দেখি’।

 ‘নিশ্চয় স্যার । প্রয়োজন হলে আমি এক সপ্তাহ থেকে যেতে পারব।

 নাটালিয়া সেদিনের মতো বিদায় নিল।

কিয়েভে  আসার সময় নাটালিয়া ভেবে এসেছিল যে খ্রিস্টান ধর্মের একটি মূল কেন্দ্র এই ঐতিহাসিক জায়গাটা সে ভালো করে দেখবে । সেন্ট সোফিয়া কেথেড্রেল এবং কিয়েভ-পেছের্স্কায়া মনাস্ট্রি দেখবে। তার সঙ্গে এখানকার অপেরাও দেখবে। কিন্তু অধ্যাপক পুঝিনের সঙ্গে দেখা হয় এতটাই উৎসাহিত হল যে সে অন্য সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে সন্ধ্যেবেলাটা অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে এসে কথাগুলি বিশ্লেষণ করে নোট নিতে শুরু করল। 

পরেরদিন অধ্যাপক পুঝিন নাটালিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল।

নাটালিয়া ঘরে প্রবেশ করার সময় অধ্যাপকের বৃদ্ধা স্ত্রী মুচকি হেসে বললেন-‘ কে জানে তুমি কী যাদু করেছ- তুমি যাবার পরে অনেকদিন পরে তিনি ফাইল কাগজপত্র এবং বইপত্র গুলি খুঁজতে শুরু করেন।

নাটালিয়া ঘরে প্রবেশ করার সময় অধ্যাপক আগ্রহের সঙ্গে বললেন-‘ এসো এসো নাটালিয়া। বইটার নামটা জানতে  পেরেছি-‘ এমকে গান্ধী- ‘ইন্ডিয়ান পেট্রিয়ট ইন সাউথ আফ্রিকা’ লেখক জোসেফ জে ডক। তিনি একজন ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি। ইংরেজ।’

অধ্যাপক পুঝিনের টেবিলে দুই একটি বই ছিল। একটি পুরোনো ডায়েরিও  ছিল। তিনি ডায়েরিটাতে একটা কাগজের টুকরো দিয়ে চিহ্ন রাখা পৃষ্ঠাটা বের করে চশমাজোড়া ঠিক করে পড়তে লাগলেন।-‘ গান্ধী চিঠিটা লিখেছিলেন ১৯০৯ সনের ১০ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গ থেকে। চিঠিতে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী ভারতীয় শ্রমিকদের উপরে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসক চালানো অত্যাচারের বিরুদ্ধে করা  আন্দোলনের বিষয়ে লিখেছিলেন। তিনি এই আন্দোলনের সম্পর্কে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য লন্ডনে যাবার কথা আগেই জানিয়েছিলেন। এই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে আলোচনা বিফল হওয়ায় তিনি জোহান্সবার্গ থেকে ফিরে এসেছেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের রোষে পড়ে তাকে কারাবাস খাটতে হয়েছে। তিনি সঙ্গে পাঠানো জোসেফ ডকের বইটির বিষয়ে টলস্টয়কে জানিয়ে লখেন যে গান্ধীর জীবনের উপরে লেখা বইটিতে  দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় জনসাধারণ করা আন্দোলনের বিস্তৃত আলোচনা তিনি পাবেন। 


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৩)


কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অধ্যাপক বললেন-‘ সেই জন্যই হয়তো টলস্টয় বইটির প্রতি বেশি আকর্ষিত হলেন। অসুস্থ দেহে বইটি পড়ে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠায় হস্তাক্ষর করে যেতে লাগলেন ।কিন্তু চিঠিটা ইংরেজি ম্যাগাজিনের মধ্যেই থেকে গেল। গান্ধীকে আর উত্তর দেওয়া হল না।’

নাটালিয়া কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিল না। সে  কেবল অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে রইল।

অধ্যাপক পুনরায় বললেন -‘ আমি ইংরেজি ম্যাগাজিনের মধ্যে পাওয়া চিঠিটা টলস্টয়কে  লেখা গান্ধীজীর দ্বিতীয় চিঠি  ছিল ।তার আগেই টলস্টয়ের ডায়েরি মতে  ১৯০৯ সনের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম  চিঠিটা পেয়েছিলেন। এর  পরে ১০ মে মাসের শুরুতে তৃতীয় চিঠি এবং সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমদিকে চতুর্থ এবং শেষ চিঠি পেয়েছিলেন। শেষের চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন কিনা জানি না, কারণ তার সম্পূর্ণ দুমাস পরে ১০ নভেম্বর টলস্টয়ের মৃত্যু হয়েছিল।

অধ্যাপক কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পুনরায় বললেন-‘ এটাই আমি উদ্ধার করা  চিঠিটার পরে করা গবেষণার ফল।’

অধ্যাপক চুপ করলেন এবং হাতের ডায়েরিটা নামিয়ে রাখলেন । এতক্ষণ কিসের চাপে যেন তিনি গম্ভীর হয়ে অহরহ কথা বলে যাচ্ছিলেন। সেই চাপ ধীরে ধীরে বিলীন হল। মুখটা কোমল হয়ে হাসির রঙ্গিন একটা ভাব সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি টেবিলের উপরে থাকা তামাকের পাইপটা তুলে নিয়ে জ্বালিয়ে টানতে লাগলেন।

তিনি বললেন – আমার শরীর খুব একটা ভালো নয়। এই বই দুটি এবং ডায়েরিটা আর আমার কাজে আসবে না। আমি মস্কো থেকেও বহুদূরে। চার বছর পরে তোমার মতো উৎসাহী কেউ এই প্রথম আলোচনা করতে এল তাই -।’

তিনি কিছুক্ষণ থেমে পুনরায় বললেন-‘ এগুলি তুমি নিয়ে যাও। এরমধ্যে আমার কথার বিশদ টীকা পাবে। ১৯৮৫ সন থেকে সরকার শিথিল হয়েছে। গ্লাসন্স্ট হয়েছে-খোলা হয়েছে। পেরেষ্ট্রইকা হয়েছে- পুরোনো নীতি বিচার করে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে। তুমি হয়তো এই সময়ের এই পরিবেশ ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারবে।’।

অধ্যাপক নাটালিয়ার সম্পূর্ণ নামটা জিজ্ঞেস করল এবং প্রত্যেকটির মধ্যে  নামটা লিখে নিজে সই করে তার হাতে তুলে দিল।

তারপরে কফি খেয়ে এক ঘন্টার আলোচনা নাটালিয়ার কাছে বড় গৌণ হয়ে পড়ল। কেননা সে অধ্যাপকের উদারতায় ভেতরে ভেতরে আনন্দে অধীর হয়ে পড়ছিল।

পরেরদিন উৎসাহের সঙ্গে সে মস্কো ফিরে এল।এই যাত্রায় ফিওডোর ইভানভিচের কথা তার মনে পড়ল না।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>