Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 10

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৫) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী

Reading Time: 7 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 1মিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃদীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা,অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন,প্রব্রজন ,ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi,New Delhi ,2010) এবং The Highlanders(Blue Rose Publishers, New Delhi,2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন,কলকাতা,২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-৫।


 

    নাটালিয়ার মন আনন্দে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে মস্কো গিয়ে মা এবং অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের সামনে কখন কথাগুলি বলতে পারবে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সেই জন্য সে আসার পথে জলপথে না এসে বেশিরভাগ রেলপথে এল। সেই যাত্রা পথে সে অধ্যাপক পুঝিন দেওয়া বই দুটি এবং পুরোনো নোট বইটা মন দিয়ে পড়ছিল। যতই পড়ল ততই সে উত্তেজনায় মস্কো পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ল।

    যাত্রাপথে নাটালিয়া অন্য যাত্রীর সঙ্গে দুজন যুবকের সঙ্গে পরিচিত হল। ফুর্তিবাজ বলে মনে হওয়া যুবকটি উত্তরাঞ্চলে ভ্রমণ করতে বেরিয়েছে। সেই যুবকটি বারবার তার মনোযোগ আকর্ষণ করে কথা বলার চেষ্টা করছিল। মাঝপথে উঠে আসা অন্য যুবককে গভীর চিন্তান্বিত  বলে মনে হল। সে হাতে নিয়ে থাকা বইটা মনোযোগের সঙ্গে পড়তে চেষ্টা করল।

    নাটালিয়া নোটবইটা আর মাঝে মধ্যে বইটা বের করে পড়ছিল। পাতলা লাল মোচ থাকা এই দ্বিতীয় যুবকটি তবু তার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাল না। সেই জন্য প্রথম অবস্থায় নাটালিয়া যুবকটির প্রতি কিছুটা উৎসুক হয়ে পড়ল কিন্তু পরে সে অধ্যাপক পুঝিন দেওয়া বইটিতে এতটাই মনোযোগী হয়ে পড়ল যে যুবকটি মস্কো পাওয়ার আগেই কোনো একটি স্টেশনে নেমে গেল তা সে বুঝতেই পারল না।

    অধ্যাপক পুঝিন দিয়ে পাঠানো বই দুটির একটি ছিল জোসেফ যে জকের মহাত্মা গান্ধীর বিষয়ে লেখা বইটি। অন্নটি ছিল গান্ধীর আত্মজীবনী-‘ দ্য স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’।এই বই দুটি থেকে আর বিশেষভাবে অধ্যাপক পুঝিনের নোট বই  থেকে গান্ধী এবং টলস্টয় সম্পর্কে নাটালিয়ার একটি ধারণা হতে শুরু করেছিল।

    মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামের অপরিচিত ভারতীয় উকিলটি লন্ডন থেকে পাঠানো প্রথম চিঠিটা টলস্টয় যখন পেয়েছিলেন তখন তিনি অবাক হয়েছিলেন। চিঠিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রেঞ্চভিলে তেরোহাজার ভারতীয় লোককে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকের চালানো অত্যাচার কীভাবে সইতে হয় তার কথা গান্ধিজি বিস্তারিতভাবে বলেছিলেন। ইংরেজ শাসক ইতিমধ্যে বেশ কিছু  বাধা-নিষেধ আরোপ করে একটি বিশেষ আইন গ্রহণ করার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। এই আইনটি ভারতীয়দের জন্য কারাগারের কালো আইন সদৃশ বলে বর্ণনা করে গান্ধিজি লিখেছিলেন যে তার জন্য ভারতীয়দের ঘৃণা করাই নয়, ন্যায্য প্রাপ্য থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে অন্যায় ভাবে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। এই আইনের বিরোধিতা করেই তারা কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে একটা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তার কথা গান্ধিজি সেই চিঠির মাধ্যমে টলস্টয়কে জানিয়েছিলেন।

    গান্ধীর এই চিঠিটি টলস্টয়কে যথেষ্ট আকৃষ্ট করেছিল। কেননা তিনি সেই ১৯০৯ সনের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ডায়েরিতে লিখেছিলেন-‘ট্রেঞ্চভিলের একজন হিন্দুর কাছ থেকে একটি অতি সুন্দর চিঠি পেলাম এর দুদিন পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা ভারতীয় জনগণের চলতে থাকা আন্দোলনের সাফল্য কামনা করে টলস্টয় গান্ধিজিকে লিখেছিলেন-‘আমি তোমার কাছ থেকে পাওয়া আকর্ষণীয় চিঠিটা আমাকে বড় আনন্দিত করেছে। ট্রেঞ্চভিলে থাকা আমার আদরের ভাইদের এবং তাদের সহযোগীদের ভগবান যেন সহায় করে।’

    গান্ধিজির কাছ থেকে পাওয়া এই চিঠিটা পড়ে টলস্টয় ভারত থেকে কিছু দুঃখজনক খবর পেয়েছিল। এই সমস্ত কথা বর্ণনা করে তিনি’ হিন্দুর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি’ বলে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন এবং তাতে ভারতে চলা ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যায় অত্যাচার গুলির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

    এই প্রথম চিঠিটা যোগাযোগের পরেই নভেম্বর মাসের ১০ তারিখ লন্ডন থেকে লিখে পাঠানো গান্ধিজির দ্বিতীয় চিঠি অধ্যাপক পুঝিন ইংরেজি ম্যাগাজিনের মধ্যে উদ্ধার করেছিলেন। এই চিঠির উত্তর যে টলস্টয় দিতে পারেননি সেকথা গান্ধীর জোহান্সবার্গ থেকে১৯১০ সনের ৪ এপ্রিল লেখা তৃতীয় চিঠির উত্তর দেবার সময় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। গান্ধী তৃতীয় চিঠির সঙ্গে তার নিজের গুজরাটি ভাষায় রচিত গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়ান হোম রুল’ এর নিজে করা ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থটিও পাঠিয়েছিলেন। এই চিঠিটি পাওয়ার পরে অসুস্থ অবস্থাতেও টলস্টয় এই গ্রন্থের সঙ্গে দ্বিতীয় চিঠির সঙ্গে পাঠানো গান্ধীর বিষয়ে জোসেফ লেখা গ্রন্থটি পড়েছিলেন এবং একদিন ডায়েরিতে লিখেছিলেন- এই সন্ধ্যেবেলায় আমি গান্ধীর বইটি পড়লাম, বড় ভালো লাগল। গান্ধীর বিষয়ে লেখা বইটিও পড়লাম। বড় প্রয়োজনীয় বই । আমাকে তাকে লিখতে হবে।

    অসুস্থ দেহে আট মে টলস্টয় গ্রন্থদুটি আগ্রহের সঙ্গে পড়ার কথা জানিয়ে গান্ধীর তৃতীয় চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন এবং লিখেছিলেন যে গান্ধী উল্লেখ করা নিষ্ক্রিয় অহিংস প্রতিরোধ কেবল ভারতের জন্যই নয় সমগ্র বিশ্বের জন্য আবশ্যক। সঙ্গে লিখেছিলেন যে সুস্থ হয়ে উঠলেই গান্ধীর কাজ এবং বইয়ের বিষয় যা বলার আছে লিখবেন। তোমার বন্ধু এবং দাদা বলে শেষে টলস্টয় নিজের স্বাক্ষর করেছিলেন।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৪)


গান্ধী তৃ্তীয় চিঠিটি দেওয়ার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনৈতিক বাতাবরণ শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। সরকারের সঙ্গে অসহযোগ করার জন্য শত শত ভারতীয় মূলের পরিবারকে গৃহহীনকরা হয়েছিল। আকালও দেখা দিতে শুরু করেছিল। গান্ধী তার আর্কিটেক্ট বন্ধু হেরমন কলেনবাসের সঙ্গে গৃহহীন ভারতীয় লোকদের থাকার জন্য এক হাজার একশো একরের  একটি বৃহৎ কৃষি উদ্যোগ গড়ে তুলেছিলেন । ‘টলস্টয় ফার্ম’ নামে এই ফার্মটিতে বিনামূল্যে থাকার সুবিধা দিয়ে মানুষগুলোকে কৃষিকার্যে মনোনিবেশ করার সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। এই পামের কথা সবিশেষ জানিয়ে কলেনবাস  এবং  গান্ধী দুজনেই ১৫ আগস্ট টলস্টয়কে পত্র প্রেরণ করেছিলেন। এটাই ছিল গান্ধী টলস্টয়কে লেখা শেষ চিঠি। টলস্টয়  মৃত্যুর দুই মাস আগে ১০ সেপ্টেম্বর গান্ধীর চিঠির দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন। যুদ্ধের পরিবর্তে প্রেমের পথ এবং স্নেহ ভালোবাসা- দিয়ে শিক্ষার আদর্শ শ্রেষ্ঠ বলে লেখাটাই চিঠিটার মূল কথা ছিল।

    এই কথাগুলি লিখে কিছুটা জায়গা ছেড়ে অধ্যাপক পুঝিন তার ডায়রিতে লিখলেন-১৯১০ সনের  ১০ নভেম্বর তারিখ সকালে অষ্টাপভ স্টেশনে টলস্টয়ের মৃত্যু হল।

    নাটালিয়া ডায়েরিটা বন্ধ করে রাখল। তার কাছে অন্য দুটি বইও ছিল। একটাও তুলে নিল না।

    নাটালিয়া তখনই লক্ষ্য করল যে মাঝেমধ্যে একটি বই বের করে পড়তে থাকা পাতলা রঙ্গিন মোচের চিন্তান্বিত যুবকটি ইতিমধ্যে কোনো এক  স্টেশনে নেমে পড়েছে।

    মস্কো স্টেশনে রেল থেকে যখন নাটালিয়া নামল তার মুখে বেশ ভালোভাবেই শীতের স্পর্শ অনুভব হল। বাইরে মেঘলা আবহাওয়া। হয়তো কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি পড়ছিল।

    বাড়িতে গিয়ে নাটালিয়া দেখল মা তখনও কাপড়ের কারখানা থেকে ফিরে আসেনি। সে পোশাক  বদলে নিল। কিয়েভ থেকে মায়ের জন্য আনা উপহারটা একটা ভালো জায়গায় রাখল। রাখার সময় মনে হল টেবিলে একটি পুরোনো বই রয়েছে। বইটি লিও টলস্টয়ের। ইয়াস্নায়া পলিয়ানা থেকে ঘুরে আসার পরে মায়ের টলস্টয়ের প্রতি আগ্ৰহ পুনরায়  জেগে উঠাটা  সে অনুভব করতে পারছিল। তার অনুপস্থিতিতে মা হয়তো বইটা পড়তে শুরু করেছিল। 

    নাটালিয়ার মনটা ভালো হয়ে গেল। উৎসাহের সঙ্গে সন্ধ্যার আহার  রাঁধতে লাগল। মুখে একটা গীতের কলি গুণ গুণ  করতে লাগল।

মা লিডিয়া পাভলভ’না যখন এল যুবতি মেয়ের আনন্দ দেখে তার ভালো লাগল। তথাপি মনে মনে ভয় পেলেন। খেতে বসে কিয়েভে হওয়া তার অভিজ্ঞতার কথা শোনার জন্য তিনি ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করলেন। অধ্যাপকের সঙ্গে হওয়া কথাবার্তা শোনার পরে মা আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল-‘ যাত্রা পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো ? সহযাত্রীরা কীরকম ছিল?

    ‘কোনো অসুবিধা হয়নি মা’ কথাটা বলে নাটালিয়া মায়ের মন বুঝতে পেরে আনন্দের সঙ্গে বলল- ‘জান মা, এই যাত্রায় আমার সঙ্গে দুজন ছেলের পরিচয় হয়েছে।

‘ দুজনের সঙ্গে?’ মা আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন।

‘ হ্যাঁ দুজনের সঙ্গে। দুজনেই অধ্যাপক পুঝিনের নাতি ।একজনের বয়স ১২ অন্যজনের বয়স ৮। নাটালিয়া হেসে উঠে বলল-‘ জান মা ,অধ্যাপকের পত্নী আমাকে কী বলেছিল-‘ এরা তোমার সমবয়সী হলে আমি এদের তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য উপদেশ দিতাম। নাটালিয়া রেল যাত্রীর সঙ্গে  দেখা হওয়া যুবক দুজনের কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করল না ,কেননা সে ওদের সঙ্গে কথাই বলেনি।

    মায়ের মুখে সরল হাসি ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন-‘ অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ তোর খবর নিচ্ছিল। তোকে নাকি  কিছু কথা বলার জন্য দেখা করতে চায়।’

    পরেরদিন অধ্যাপক আসার আগেই নাটালিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কক্ষে গিয়ে অপেক্ষা করে রইল। অধ্যাপক ডাকার জন্যই নয় তার কিয়েভের অভিজ্ঞতার কথা বলার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইল।

    অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ আসার সঙ্গে সঙ্গে সে তার সঙ্গে দেখা করল। তার পরীক্ষার অভিজ্ঞতা অধ্যাপকের সামনে গড় গড় করে বলে যেতে লাগল। অধ্যাপক পুঝিনের উদারতার কথা বলে তার দেওয়া বই এবং ডায়েরিটা দেখাল।

    সমস্ত কিছু শুনে এবং বই দুটি দেখে গম্ভীর অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের মুখে দুর্লভ মুচকি হাসিটা বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল । তারপরে তিনি বললেন – তোমার যাত্রার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। কেননা ইতিমধ্যে আমিও অন্য একটি তথ্য উদ্ধার করেছি। দুটির মধ্যে বেশ সামঞ্জস্য আছে বলে মনে হচ্ছে।’

    অধ্যাপক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ তুমি একটু অপেক্ষা কর। আমার ক্লাসটা করে এসে এই বিষয়ে আলোচনা করব।’

    নাটালিয়া অধ্যাপকের ফিরে আসার ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে রইল। তিনি এসে নাটালিয়াকে বললেন-‘পেরেষ্ট্রইকা এবং গ্লাসনস্ত আমাদের গবেষণায় বড় সাহায্য করেছে। আমরা আর্কাইভ গুলিতে উকি মেরে দেখার সুযোগ পেয়েছি,তারমধ্যে অনুসন্ধান চালাতে পারছি। সেই সুবিধা নিয়ে আমরা কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করতে পেরেছি। এর মহাফেজখানার কাজে আমাকে সাহায্য করেছে ফিয়ডর ইভান’ভিচ। কাগজ গুলি হল একটি কেস সম্পর্কে। কেসটা হল -।’

    অধ্যাপক টেবিলের ড্রয়ার থেকে কয়েকটি কাগজ বের করলেন। কাগজগুলিতে  চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন-‘ কেসটা হল লেনিনগ্রাদের। তার নম্বর হল ৫৩২১২। লেনিনগ্রাদের নয় জন নিবাসীর।’

    নাটালিয়া  অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের দিকে কৌতুহলভরে তাকিয়ে রইল। সে গবেষণা করবে টলস্টয়ের রচনার বিষয়ে, আর তার গুরু অধ্যাপক তাকে বলছে লেনিনগ্রাদের একটা কেসের বিষয়ে তার সামঞ্জস্যই বা কোথায়?

    অধ্যাপক নাটালিয়ার কৌতূহল নিবারণ করার জন্য বললেন-‘ আমি তোমাকে কিছু কাগজপত্র দেব। সেইসব ফোটোকপি করে আমাকে ফিরিয়ে দেবে। সেই সমস্ত পড়ে আমার সঙ্গে আগামী কাল দেখা করবে।’

    নাটালিয়া বিদায় নেবার সময় কাগজপত্র গুলি তারদিকে এগিয়ে দিয়ে তিনি বললেন-‘ফিয়ডর কয়েকদিন আসেনি। সে কেসটার প্রতি খুবই আগ্রহী। তার সম্পর্কে সে এখানে সেখানে ঘুরে বেরিয়েছে । সে এলে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। আলোচনা করতে পারবে।’

    এর সঙ্গে তিনি বললেন-‘ অধ্যাপক পুঝিনের কাছ থেকে আনা বই ডায়েরি আজ আমার কাছে রাখলাম।’

    সেই রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত নাটালিয়া ক্রিয়োসকভের কাছ থেকে আনা কাগজপত্রগুলি বারবার পড়তে লাগল। কেসটা ‘ লেনিনগ্রাদের নয়  জন নিবাসী’র যদিও কেসটা ‘লিঅ’নিড এডলার এবং অন্যান্যদের’ কেস বলে  লিপিবদ্ধ করা আছে। লেনিনগ্রাদের বিচারালয়ে  তার নম্বর দেওয়া হয়েছে ৫৩২১২। নাটালিয়া কেসটার বিষয়ে যতই পড়ল  ততই সবিশেষ জানার জন্য উদগ্ৰীব হয়ে পড়ল। এই কেসের প্রত্যেকেই ছিল টলস্টয়বাদী। এই টলস্টয়বাদীরা সংগঠিত হয়ে কিছু একটা কাজ করতে চাইছিল সে কথা স্পষ্ট ছিল ।কিন্তু কী এই টলস্টয় বাদ? কি করতে চেয়েছিল এরা?

    নাটালিয়া উদগ্রীব হয়ে পড়ল। সে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন হল। সে লিও টলস্টয়ের যতগুলি গল্প-উপন্যাস পড়েছে তাতে কোনো ধরনের টলস্টয়বাদ খুঁজে পায়নি। ইতিহাসের সমাজের ওপরে পড়া  প্রভাব এবং সঙ্গে সামাজিক বিশ্লেষণের কথাই সে রচনাগুলিতে লক্ষ্য করেছে। 

    তাছাড়া সে অবাক হল অন্য একটি কারণে। এই কেসটার সঙ্গে ভারতের এমকে গান্ধীর নাম ও জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন?

নাটালিয়া কেসটাতে জড়িত মানুষগুলির নামগুলি দেখতে লাগল।

প্রথম নামঃলিঅ’নিড  এডলার ,৩১বছর, লেনিনগ্রাদ

তারপরের গুলি-

পিটার যেলেনক’ভ,৫৪ বছর, লেনিনগ্রাড

ভিক্টর একছুস্কি ৪১ বছর, লেনিনগ্রাদ

মিখাইল ভেসিলিয়েভ,৩০ বছর, লেনিনগ্রাদ

ভ্লাদিমির  ভেলিক্স,৪৫ বছর,মস্কো

ভলকভ রিয়াজনভ,৩৯ বছর ,মস্কো

য়ুরি ফমিসেভ ,৪৮ বছর, কাজান

শ্বিগান’ক ঝুছুপভ,৪৯ বছর ,কাজাখ

নিকলাই চের্নভ ,৪৭ বছর, জর্জিয়া

    মানুষগুলি যদিও মূলত বিভিন্ন শহর বা অঞ্চলের, কেসটাতে জড়িত হয়ে পড়ার সময়ে তারা প্রত্যেকেই লেনিনগ্রাদ বাস করত।

    নাটালিয়া নামগুলি বার বার পড়ল। কেসটার কথাগুলি পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে তার একটা কথা ভেবে ভালো লাগল যে কেসটাতে লেখা মতো মানুষগুলি টলস্টয়বাদী ছিল । অর্থাৎ তারা নিশ্চয় টলস্টয় অধ্যায়ন করত, তার মতো তাকে এবং তার লেখাগুলি ভালোবাসত। তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা টলস্টয়ের  অনুগামী হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কীভাবে তারা এই কেসটাতে জড়িত হয়ে পড়ল? সে জানে না‌।

    সে কাগজপত্রগুলি সামনে নিয়ে  অনেকক্ষণ কথাগুলি বসে ভাবতে লাগল। সে ঠিক করল – অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের সঙ্গে তার দেখা করতেই হবে । প্রয়োজন হলে মহাফেজ খানা থেকে কেসটার কাগজপত্র উদ্ধার করা ফিয়ডর ইভানভিছের সঙ্গেও দেখা করবে। 

আচ্ছা যুবকটি এসেছে কি? সেই বা কী ধরনের?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>