Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 18

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৬) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী

Reading Time: 11 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 1মিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃদীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা,অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন,প্রব্রজন ,ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi,New Delhi ,2010) এবং The Highlanders(Blue Rose Publishers, New Delhi,2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন,কলকাতা,২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-৬।


 

          পরেরদিন নাটালিয়া যখন অধ্যাপক ক্ৰিয়োসকভের ঘরের সামনে উপস্থিত হল তখনও অধ্যাপক এসে পৌঁছান নি। গত রাতে ঘুম কম হওয়ার জন্য তার চোখ দুটি জ্বালা করছিল। তবু তাকে একটা উত্তেজনা সজাগ করে রেখেছিল। সে এই উত্তেজনার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানায় প্রবেশ করার সময় বন্ধুবান্ধব দুজনের সঙ্গে দেখা হওয়া সত্বেও বিশেষ সময় অতিবাহিত না করে হাত তুলে সম্ভাষণ জানিয়ে বিভাগটার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল। এখন অধ্যাপককে না পেয়ে গবেষকদের জন্য থাকা ঘরটাতে বসে কাগজপত্র থাকা  কাঁধের ব্যাগটা সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখল । তার কিন্তু কিছুই পড়তে ইচ্ছা করল না। গত রাতে পড়া কথাগুলিই সে ভাবতে লাগল।

          কিছুক্ষণ পরে অধ্যাপকের কক্ষের বাইরে কারও পদশব্দ শোনা গেল। নাটালিয়া উঠল এবং কাঁধে  ব্যাগটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। সে দেখল অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ এসেছেন । কোনো এক যুবক তার কক্ষের দরজাটা মেলে ধরেছে ‌এবং অধ্যাপক ভেতরে প্রবেশ করছেন। তার পেছন পেছন প্রবেশ করছে সেই যুবকটি ।

          নাটালিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। এ কে? যুবকটি ভেতরে না গেলে সে অধ্যাপকের কাছে যেতে পারত। এখন তাকে যুবকটি বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ।

          নাটলিয়া ঘরের সামনে এদিকে ওদিকে ধীরে ধীরে পায়চারি করতে লাগল। তার ক্লান্ত লাগছিল, তবু তার গবেষকের কক্ষে গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করল না।

          কিছুক্ষণ পরে অধ্যাপকের কক্ষ থেকে যুবকটি বেরিয়ে এল। যুবকটির পরনে জিনসের প্যান্ট এবং গভীর রঙের শার্টের ওপর একটি মুগা বর্ণের সোয়েটার। তার লাল-সাদা চেহারায় পাতলা মোচটা সম্পূর্ণ কালো নয় মুগা বর্ণের ও নয়। কিছুটা রঙ্গিন।

যুবকটি মুহূর্তের জন্য নাটালিয়ার মুখের দিকে তাকাল যদিও কোনো কিছু না বলে তার পাশ দিয়ে গবেষকের কক্ষের দিকে চলে গেল। সেখানে একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিরে এসে অধ্যাপকের কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাটালিয়াকে দেখে জিজ্ঞেস করল-‘ নাটালিয়া?’

          নাটালিয়া যুবকটির মুখের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল। হ্যাঁ ,যুবকটিকে সে কোথাও দেখেছে।

          সে যুবকটির কথার সম্মতি জানিয়ে বলল-‘ হ্যাঁ,আমিই নাটালিয়া।’

          ‘অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ তোমাকে ভেতরে ডেকেছে।’

          কথাটা বলে যুবকটি দরজাটা তার জন্য খুলে ধরল। সে ভেতরে প্রবেশ করার পরে যুবকটিও ভেতরে ঢুকল।

          ‘এস নাটালিয়া। এই হল ফিয়োডর-ফিয়োডর ইভানভিচ এডলার। আর এ হল নাটালিয়া নিক’লায়েভনা।’

          অধ্যাপক সামনের চেয়ার দুটি  দেখিয়ে দেওয়ায় দুজনেই বসে পড়ল। অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ কোনো ভূমিকা না করে নাটালিয়াকে বললেন -‘ গতকাল তোমাকে যে কেসটির কথা বলেছিলাম এবং কাগজপত্র দিয়েছিলাম সেগুলি আমি এই- ফিয়োডরের সাহায্যে মহাফেজখানা থেকে উদ্ধার করেছিলাম। কেসটা লেনিনগ্ৰাডের  নয়জন নিবাসীর।’

          নাটালিয়া অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে সায় দিয়ে ফিয়োডরের দিকে ঘুরে তাকাল। একপাশ থেকে দেখা ফিয়োডরের মুখটা সে এবার চিনতে পারল – সেই কিয়েভ  থেকে মস্কো আসা রেলের যাত্রাপথে মাঝখানে ওঠা যুবকটিই এই ফিয়োডর।

          অধ্যাপক নাটালিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন-‘ নাটালিয়া, গতকাল যে কাগজগুলি দিয়েছিলাম তা পড়েছ কি?’

          নাটালিয়া সম্মতি জানিয়ে বলল-‘ হ‍্যাঁ স‍্যার, পড়েছিলাম। তার জেরক্স কপি আমি রেখেছি।’

          সে মূল কাগজগুলি অধ্যাপককে ফিরিয়ে দিল।

          ‘ কেসটার কী কী কথা তুমি লক্ষ্য করেছ?’

          অধ্যাপকের প্রশ্নে গত রাত থেকে তার মাথায় ঘুরতে থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথে মাথায় চড়কির  মতো ঘুরতে থাকা কথাগুলি মনে পড়ল। সে সেইসব সাজিয়ে নিয়ে বলল-‘ স্যার কেসটা  যদিও নয়জন লেনিনগ্রাড নিবাসীর,মানুষগুলি মূলত লেনিনগ্রাডের নয়।’

          অধ্যাপক সম্মতি জানালেন।

          নাটালিয়া বলল-‘ তারা বিভিন্ন বয়সের।’

          সে পুনরায় বলল-‘ তারা প্রত্যেকেই ছিল টলস্টয়বাদী।’

          কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে বলল-‘ তারা গান্ধীর দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।’

          নাটালিয়ার আর ও অনেক কথা মনে পড়ল। কিন্তু অধ্যাপক তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখে সে চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মিখাইল ক্রিয়োসকভ বললেন-‘ হ্যাঁ, তোমার কথাগুলি ঠিক।’

          তিনি বললেন-‘ তুমি টলস্টয়ের বিষয়ে পড়াশোনা করছ। টলস্টয়বাদের বিষয়ে তোমার হয়তো একটা ধারণা হয়েছে। তুমি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারবে কি?’

          নাটালিয়া গতরাতে এই বিষয়েই চিন্তা করছিল। সে টলস্টয়ের গল্প উপন্যাস গুলিতে রাজনীতি এবং ইতিহাসের সমাজের ওপরে পড়া প্রভাব এবং সামাজিক বিশ্লেষণের কথা লক্ষ্য করেছে। সে বড় বিপদে পড়ল। তার কেবলমাত্র কিয়েভে অধ্যাপক পুঝিন বলা কিছু কথা মনে পড়ল। তিনি নাটালিয়াকে টলস্টয়ের কক্ষে থাকা দুটি তৈলচিত্রের ব্যাখ্যা করে লেখকটির কথা বলেছিলেন।

          নাটালিয়া বলল-‘ আমি ভালোভাবে বুঝতে পারিনি যদিও দুটি কথা আমি টলস্টয়ের বিষয়ে লক্ষ্য করেছি- একটি হল ম‍্যাডোনার মতো সকলের প্রতি প্রেমের করুণা এবং অন্যটি হল জনসাধারণের প্রতি একাত্মতা।’

          নাটালিয়া কথাগুলি বলে চুপ করে রইল।

          অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ বললেন-‘ তুমি কথাগুলি ঠিকই বলেছ। কিন্তু এটাই টলস্টয়বাদ নয়। তোমার অধ্যয়ন এখনও সম্পূর্ণ  হয়নি।’

          নাটালিয়া ফিয়োডরের সামনে লজ্জা পেল।

          অধ্যাপক তাকে আশ্বস্ত করে তাড়াতাড়ি বলল-‘ তুমি তো কেবল পড়াশোনা আরম্ভ করেছ। এই অবস্থায় এরকম হবেই। আমি কেবল তোমাকে একটা দিক দেখিয়ে দিচ্ছি- টলস্টয়বাদের দিকটি। সেটা মনে রেখে তুমি বই পত্র পড়বে।’

          অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন‌। এবার তিনি ফিয়োডরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-‘ফিয়োডর, তোমার সঙ্গে তো আমি কেসটা সম্পর্কে আলোচনা করছিই। তবু তোমার কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে কি?’

          ফিয়োডর ছোট একটি নোট বইয়ে কথাগুলি টুকে রাখছিল। অধ্যাপক তার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করতেই সে মাথা তুলে তাকিয়ে ছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল – ‘স্যার আমার একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছ। কেসটার সময় ১৯৩২ সন। তার এক বছর দু বছর আগে থেকেই নিশ্চয় গান্ধী টলস্টয়বাদীদেরকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু এম কে গান্ধী নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে ১৯৪৭  সনে স্বাধীন করেছিল। সেই তখনই – মানে ৩২ সনে , যখন তার বয়স হয়তো তিন কুড়ি বছর, গান্ধী কীভাবে নয়জন লেনিনগ্রাড বাসীকে সুদূর ভারত থেকে প্রভাবান্বিত করতে পেরেছিল?’


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৫)


 

          ‘ ভালো প্রশ্ন ফিয়োডর।’ অধ্যাপক বললেন-‘ এর উত্তর খুঁজতে হবে। যদি কোন একজন ৬০  বছর বয়সে তুমি বলা অনুসারে এই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তাহলে তার আগের অন্তত কুড়ি বছর আগে থেকে জগতে কাজের মাধ্যমে তিনি নিজের পরিচয় দিতে পারতে হবে ।এই সমস্ত বাছবিচার আমাদের ধাপে ধাপে করতে হবে ।প্রথম প্রশ্নটি হল-‘ টলস্টয়বাদ কী? তারপর এই টলস্টয়বাদীরা  কী চেয়েছিল ? আর একই সঙ্গে প্রশ্নটি হল – কীভাবে চেয়েছিল ? শেষের কথাটা বিচার করতে গিয়ে হয়তো গান্ধীর কথা এসে পড়বে । এই সমস্ত কিছুর খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। ‘

          কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অধ্যাপক দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ তোমরা দুজনেই আলোচনা কর। ফিয়োডর তো গত কুড়ি দিন থেকেই এই বিষয়ে লেগে  আছে। কারণ তিনি নিজেই লেনিনগ্রাদের।’

          নাটালিয়া ফিয়োডোরের দিকে ঘুরে তাকাল। ফিয়োডর কোনোভাবে উৎসাহিত হল না। তার সেই একই গম্ভীর মুখ।

          অধ্যাপক বললেন-‘ নাটালিয়া তুমি অধ্যাপক পুঝিনের  কাছ থেকে আনা বই এবং ডায়েরি দুদিনের জন্য আমার কাছে রেখে যাও । তাতে গান্ধী এবং টলস্টয়ের সম্পর্কের বিষয়ে অধ্যয়ন করার সুযোগ আছে। এখন তোমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে কাজ করে যাও।’

          অধ্যাপক তার ব্যাগ থেকে একটি ফাইল এবং একটি বই বের করে টেবিলে রাখলেন। নাটালিয়ারা  বুঝতে পারল যে তিনি একটু করে পড়াতে যাওয়া শ্রেণির জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছেন। ওরা  বিদায় নিয়ে বাইরে চলে এল।

          নাটালিয়া ফিয়োডরের  সঙ্গে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।

          ‘তারমানে তুমি লেনিনগ্রাদের ?’-নাটালিয়া জিজ্ঞেস করল ।

          ফিয়োডর সম্মতি জানিয়ে বলল-‘ হ্যাঁ আমি সেন্ট পিটার্সবার্গ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছিলাম।’

          নাটালিয়া ঐশ্বর্যশালী, বিশাল এবং কীর্তিময় মহানগরটির কথা জানে। জারের শাসনে শাসিত রাশিয়ায় প্রায় দুশো  বছর ধরে রাজধানী হয়ে থাকা এই নগরটি সেন্ট পিটার্সবার্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানি আক্রমণ করায় এর জার্মান নাম পরিবর্তিত করে ১৯১৮ সন থেকে পেট্রগ্ৰাড করা হয়। পরে লেনিনের মৃত্যুতে ২৪ সন থেকে মহানগরের নাম লেনিনগ্রাড করা হয়। নেভা নদীর ব-দ্বীপগুলি , তার নর্দমা এবং পাথরে বাঁধানো তীরের প্রণালী গুলি এবং তার ওপরের সেতু গুলি, সঙ্গে বিখ্যাত শীতের রাজমহলের জন্য সৌষ্ঠবপূর্ণ   সম্পদশালী ঐশ্বর্যের কথা নাটালিয়া জানে। তার মহানগরটির জন্য আগ্রহ আছে। দেখেনি। সেই মহানগরটির অলিতে গলিতে ঘুরে তার বায়ু জলে লালিত হওয়া ফিয়োডরের দিকে সে আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে রইল।

          ফিয়োডরের মুখের ভাবের কোনো পরিবর্তন হল না। নাটালিয়ার মুখের দিকে ও সে তাকাল না। আগের মতোই গম্ভীর হয়ে রইল।

          নাটালিয়া জিজ্ঞেস করল-‘ এই লেনিনগ্রাডের নয় জন নিবাসীর কেসটার প্রতি তুমি সেই মহানগরের বলেই আগ্রহী নাকি?’

          ফিয়োডর তার কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে বলল-‘ বলতে পার। কিন্তু অন্য একটি কারণও আছে।’

          নাটালিয়া তার বুকের কাছে কাগজের ব্যাগটি জড়িয়ে ধরে ফিয়োডরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-‘ কারণটা কী?’

ফিয়োডর বলল -‘ ধীরে ধীরে জানতে পারবে। কিন্তু আপাতত কারণটা হল-‘

          কথাটা বলতে গিয়ে ফিয়োডরের অনেক কথা মনে পড়ল। মহানগরটি  বহু শতিকা  ধরে রাজধানী হয়ে থাকা ছাড়াও মৌলিক ধারণা এবং প্রতিবাদের উৎস ছিল। উনিশ  শতকের  তৃতীয় দশকে এর রাজপথে ডিসেম্ব্রিষ্টরা জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। কুড়ি শতকের ১৯০৫ সনেও একটি রবিবার রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল এবং ডুমা গঠন করতে হয়েছিল। ১৯১৭ সনে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে সেই মহানগরেই বলশেভিকরা শীতের প্রাসাদ অর্থাৎ উইন্টার  প্যালেস প্রথম দখল করেছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতি- শিল্পের বহু ধারা এই মহানগরকে উৎস করে প্রবাহিত হয়েছিল।

          ফিয়োডর ভাবা কথাটা মনে রেখে তার অর্ধেক বলা কথাটা সমাপ্ত করল-‘ কারণটা হল আমাদের মহানগরের ইতিহাস আছে।’

          এতক্ষণে ফিউডোর নাটালিয়ার মুখের দিকে তাকাল। সে চট করে  বলল – ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ,এই মহানগরের ও ইতিহাস আছে।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে পুনরায় বলল-‘ তুমি সম্ভবত আমার মতোই তোমার নিজের মহানগরটিকে নিয়ে গর্বিত।’

          নাটালিয়া কিছুই বলল না। তার মুখে একটা অস্ফুট হাসি ছড়িয়ে পড়েছিল।

          ফিয়োডর যেন অনেকটা সহজ হয়ে এল। সে জিজ্ঞেস করল-‘ তুমি সম্ভবত এখানেই পড়াশোনা করেছিলে?’

          নাটালিয়া সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।

          ‘ তুমি কোথায় থাক?’

          নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন তবু গম্ভীর হয়ে তার প্রতি কোনো ভাবাবেগ প্রকাশ না করা যুবকটির প্রশ্ন শুনে নাটালিয়ার খারাপ লাগল না। সে বলল-‘ কালিনিন প্রসপেক্টে।’

          ‘কালিনিন? কালিনিন প্রসপেক্ট?’

          ফিয়োডরের প্রশ্ন শুনে নাটালিয়া  কিছুটা অবাক হল।

          ‘ হ্যাঁ।’- সে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। ফিয়োডর বলল-‘ আমি কিছুদিন আগে কালিনিনগ্রাডে গিয়েছিলাম।’

          ‘ কালিনিনগ্রাড? বাল্টিক সাগরের উপকূলের?’

          ‘ফিয়োডর সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।

          ‘ তুমি কালিনিনগ্রাড  থেকে মস্কো রেলে করে আসছিলে না?’

          নাটালিয়ার  কথায় ফিয়োডর সম্মতি জানাল।

          ‘আমরা হয়তো একই কামরায় আসছিলাম।’

          ফিয়োডর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর বলল-‘ হতে পারে। আমার কিন্তু মনে নেই।’

          নাটালিয়া যে উৎসাহের সঙ্গে কথাটা জিজ্ঞেস করল ফিয়োডরের উত্তরে  সে অনেকটা চুপসে গেল। সে তাকে চিনতে পারছে, কিন্তু ফিয়োডরের মতো যুবক তার মতো একটি সুন্দরী মেয়েকে বিশেষভাবে মনে রাখতে পারেনি।

          নাটালিয়া বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে থাকা কাগজপত্র গুলি নাড়াচাড়া করল। সে গবেষকদের জন্য থাকা কক্ষের দিকে তাকাল।

          ফিয়োডর বলল-‘ তুমি সম্ভবত নিজের কক্ষের দিকে যাবে।’

          নাটালিয়া কোনো কিছু বলল না।

          সে বলল-‘ আমার লাইব্রেরিতে কাজ আছে। দেখা হবে।’

          ফিয়োডর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। নাটালিয়া সে দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল।

          সে গবেষকের রুমে প্রবেশ করে কাঁধের ব্যাগটা  এবং কাগজপত্র গুলি ভালো করে  গুছিয়ে রেখে ওয়াশ রুমে গেল এবং তার বেসিনের উপরে থাকা কাচটাতে নিজের মুখটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল।

          সেদিন রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত নাটালিয়া পড়াশোনা করে টলস্টয়ের জীবনের আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করার চেষ্টা করল। টলস্টয় চব্বিশ বছর বয়সেই ‘শিশুকাল’ নামে একটি বই লিখে প্রকাশ করেছিলেন এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে প্রকাশিত ‘সভ্রেমেনিক’ নামে ম্যাগাজিনের নবম সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলেন। তার তিন-চার বছর পরে’ ছেলেবেলা’ এবং’ যৌবনকাল’ প্রকাশিত হয়েছিল। এরপরই তিনি ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অভিজ্ঞতার উপরে ভিত্তি করে লিখেছিলেন’সেভাস্ট পলের নক্সা’। তার সুইজারল্যান্ড জার্মানি এবং ফ্রান্সের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ প্যারিসে মুক্তভাবে দেখা গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ভয়াবহ দৃশ্য ১৮৫৭ সনে সমাপ্ত করতে বাধ্য করেছিল । তিন বছর পরের অন্য একটি বিদেশ ভ্রমণে তিনি’ মুক্ত রাশিয়ান প্রেস’এর প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার হারজেনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে ‘যুদ্ধ এবং শান্তি’র পরিকল্পনা এবং সঙ্গে প্রথম অধ্যায় ‘ডিসেম্ব্রিস্টদের’ নামকরণে আরম্ভ করেছিলেন। তিনি কসাকদের জীবন নিয়েও উপন্যাস লিখেছিলেন। তারপরে সোফিয়া অন্ড্রেয়েভনার সঙ্গে বিয়ের এক বছর পরে ১৮৬৩ সন থেকে সাত বছরের জন্য তিনি’ যুদ্ধ এবং শান্তি’ লিখে গিয়েছিলেন। এই উপন্যাস লেখার পরে কিছু দিনের জন্য টলস্টয়কে একটা আধ্যাত্মিক ক্লান্তি ঘিরে ধরেছিল।

          নাটালিয়া সেই রাতে যুদ্ধ এবং শান্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে লাগল। উপন্যাসটির শুরু হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গে হওয়া একটি সুন্দর ভোজ সভার মাধ্যমে। সেই ভোজসভায় সমগ্র উপন্যাস পাঁচটি পরিবারের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছিল। উপন্যাসটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের জীবন থেকে নেপোলিয়নের মুখ্য কার্যালয় পর্যন্ত এবং সঙ্গে রাশিয়ার প্রথম এলেক্সজান্ডারের রাজসভার থেকে ঔস্টারলিটজ এবং ব’রডিনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে লিখেছিলেন। এই উপন্যাসের টলস্টয় ডিসেম্ব্রিস্টদের বিদ্রোহের কারণ খুঁজতে শুরু করেছিলেন যদিও তিনি শেষের কয়েকটি অধ্যায়ে আন্ড্রেই বলকনস্কির এক ছেলে ডিসেম্ব্রিস্ট হওয়ার আভাস দিয়েছিলেন। উপন্যাসটিতে ইতিহাসের তত্ত্ব  এবং নেপোলিয়ান এলেক্সজান্ডারের মতো ব্যক্তির ক্ষুদ্রতা এবং গুরুত্বহীনতা বিচার করার প্রয়াস করেছিলেন। এই দর্শনেই হয়তো তাকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলেছিল।

          এর তিন বছর পরে টলস্টয়’ আনা -কেরেনিনা’ আরম্ভ করে চার বছরের মধ্যে সমাপ্ত করেছিলেন। টলস্টয়ের বক্তব্য অনুসারে এই উপন্যাস লেখার সময় তার আত্মা যেন লেখার কাজে একাত্ম হয়ে পড়েছিল। কেননা তিনি লেভিন এবং কিট্টির  মধ্যে সম্ভ্রান্ত ঘরের পরিবারের আনন্দ এবং সন্তুষ্টি অঙ্কন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মানসিক দ্বন্দ্ব সংকটে পরিণত হয়। তার সহজ এবং ধনাঢ‍্য জীবন এবং ধীরে ধীরে বেড়ে চলা ধর্ম এবং নৈতিকতার প্রশ্ন উপন্যাসটির মূল কাহিনি এবং চরিত্রের উপরে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাই হয়তো উপন্যাসটির শেষের পরিণতি করুণাত্মক করে তোলেন ।

          নাটালিয়া সংগ্রহ করে রাখা প্রবন্ধগুলিতে পড়ল- কীভাবে ‘আনা-কেরেনিনা’ প্রকাশের দুই বছর পরে পঞ্চাশ বছর বয়সে টলস্টয়ের বর্হিজগতের  প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুঙ্গে  উঠেছিল এবং যে সম্ভ্রান্ত কাউন্টের পরিবেশে জন্মসূত্রে লালিত- পালিত হয়েছিল সেখান থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছিল। ব্যক্তিগত স্বত্ব, শোষক -শাসক শ্রেণী, এবং প্রচলিত ধর্মের বিরোধ করে লেখাটা তাঁর মূল বিষয় হয়ে পড়েছিল। সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা দেওয়াটা যেন তাঁর দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল । তিনি বেঁচে থাকার বৈধতা এবং ন্যায়িক  ভিত্তির খুঁজে প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ান অর্থোডক্স গির্জাকে আক্রমণের লক্ষ্য করে নিয়েছিলেন । তিনি গির্জার সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রতি সমর্থন জানান নি। তাছাড়া শাসনকারী সরকারকে সমস্ত কাজে সমর্থন জানানোর জন্য তিনি গির্জাকে সমালোচনা করেছিলেন।

          টলস্টয় ‘একটি স্বীকারোক্তি’ নামের পুস্তিকাটিতে   তার ধর্ম এবং নৈতিক সংকটের বিষয়ে বর্ণনা করে খ্রিস্টধর্মের নীতি এবং শুভ সমাচার তিনি নিজের ব্যাখ্যায় তুলে ধরেছিলেন। তার এই বিশ্বাসের বিবরণ তিনি ‘নীতি শিক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় ‘(১৮৮১)’ আমি কীসে বিশ্বাস করি'(১৮৮৪),’ একজন পাগল মানুষের স্মৃতি(১৮৮৪), ‘আমাদের কী করা উচিত ‘(১৮৮৬) এবং ‘ ভগবানের সাম্রাজ্য তোমার মধ্যে আছে'(১৮৯৩) নামে পুস্তক রাজিতে যুক্তির দ্বারা সমর্থন করেছিলেন।

          কথাগুলি পড়তে পড়তে নাটালিয়ার ক্লান্ত লাগল। তার দেহ  ধীরে ধীরে অবশ হয়ে পড়ল। টলস্টয়বাদের আভাস পেয়েও  যেন সে পুরো আভাস পাচ্ছে না ।  ভাবতে ভাবতেই সেই রাতে  সে পড়ার টেবিলে মাথা রেখে  ঘুমিয়ে পড়ল ।

          মধ্যরাতে মা লিডিয়া পাভল’ভনা তাকে জাগিয়ে দিয়ে বিছানায় নিয়ে গেল ।

          পরেরদিন নাটালিয়া একটু দেরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। বাইরে সোনালী রোদ ঝলমল করছিল। তার দেরি হওয়ার জন্য বাইরের বাতাবরণ ইতিমধ্যে বেশ উষ্ণ পড়েছিল।

          নাটালিয়া গবেষকের রুমে গেল। সে পড়া কথাগুলি পুনরায় পড়তে ইচ্ছে করল। অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ নিজের  রুমে আছে বলে জানতে পেরেও তার দেখা করতে ইচ্ছে হল না। সে দেখা করার জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের বক্তব্য অনুসারে তার  হয়তো 🐆ফিয়োডরের সঙ্গে দেখা করা উচিত হবে।

        নাটালিয়া গ্রন্থাগারে গেল।

        সে ইতিহাস আর সমাজ বিজ্ঞানের দিকটায় গেল। সে দূর থেকে ফিয়োডরকে দেখতে পেল। সে একটা টেবিলে মেলে নেওয়া একটা বই বড় মনোযোগের সঙ্গে পড়ছে।পাশেই রয়েছে মাঝে মধ্যে নোট করে থাকা কাগজপত্র গুলি।

        নাটালিয়া তাকে বিরক্ত করল না। পাঁচটার মতো চেয়ারের দূরে সে বসে পড়ল।

        নাটালিয়া বইটা নিয়ে অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। তার গত রাতের ক্লান্তি যেন গ্রন্থাগারের উষ্ণ এবং নির্জন পরিবেশে ধীরে ধীরে চেপে ধরার উপক্রম হল। সে একটা সময়ে অনুভব করল তার কাছে যেন কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।

        সে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল-ফিয়োডর। সে অসহজ ভাবে বলল -‘ তোমাকেও অসুবিধা দিতে আমার খারাপ লাগছে।’

          সে বলল-‘ তুমি হয়তো এক কাপ কফি খেতে পছন্দ করবে। আমি তার মধ্যে স্যারের কথা গুলি নিয়ে একটু কথা বলতে পারব কি?’

        নাটালিয়া কিছুটা অবাক হল যদিও সে কাগজপত্রের ব্যাগটা নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

          কফি হাউসটাতে ভিড় ছিল না। বিশাল কাচ দিয়ে ঘেরা এক পাশের বেড়া দিয়ে কয়েক মহলের নিচে প্রশস্ত চৌহদের কিছুটা দেখা যাচ্ছিল। পাশে একটা টেবিলে মুখোমুখি হয়ে দুজনে বসে পড়ল। বাইরের নিচের সমতলে যুবক যুবতিরা দেখা যাচ্ছে। অধ্যাপকদের দুই একটি গাড়িও দেখা যাচ্ছে।

          ফিয়োডর উঠে গিয়ে ধোঁয়া উঠতে থাকা দুকাপ কফি নিয়ে এল। একটা পেয়ালা নাটালিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে তার সামনে বসে নিয়ে সে নাটালিয়া কে বলল-‘ কাল অধ্যাপক ক্রিয়োসকভ জিজ্ঞেস করা প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেয়েছ কি?

          নাটালিয়া বুঝতে পারল ফিয়োডর টলস্টয়বাদের কথা জিজ্ঞেস করছে।

          সে গরম কফির কপি কাপে এক চুমুক দিয়ে বলল-‘ অনেক পড়েছি, কিন্তু স্পষ্ট ধারণা এখনও পর্যন্ত হয়নি।’

          সে গত রাতের কথাগুলি সংক্ষেপে বলল।

          ফিয়োডর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে বলল-‘ আমিও কথাগুলি চিন্তা করেছি এবং পড়াশোনা করেছি। আমার মনে হয়-‘

ফিয়োডর বলল-‘ টলস্টয়বাদ বোঝার জন্য’ ভগবানের সাম্রাজ্য তোমার মধ্যেই আছে’ বইটি পড়া দরকার। গতরাতে আমি বইটি পড়ার সময় কিছু কথা টুকে নিয়েছিলাম।’- সে এক টুকরো কাগজ বের করে তা দেখে দেখে বলতে লাগল-‘ ভগবানের অস্তিত্বের ওপরে বিশ্বাস রাখাটা টলস্টয়বাদ। সঙ্গে যিশুখ্রিস্টের দেবত্ব স্বীকার না করে তার ধর্মীয় নীতি শিক্ষা গুলি গ্রহণ করাটাও টলস্টয় বাদ।’সারমন্ট অন দি  মাউন্ট’ এর দ্বারা প্রভাবান্বিত সেন্ট ম‍্যাথিউর শুভ সমাচার এবং নীতি শিক্ষার ‘ বাধা দেবে ,দুষ্কার্য করবে না’র ব্যাখ্যা নিষ্ক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে ধরাটাই হয়তো টলস্টয়বাদের মূলমন্ত্র। টলস্টয়বাদ সমস্ত ধরনের সরকারকে তিরস্কার করে, যুদ্ধবিগ্রহের নিন্দা করে। সঙ্গে দেশে সামরিক শক্তি না থাকাটা কামনা করে।’

          নাটালিয়া ফিয়োডরের  মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ফিয়োডর কিন্তু তার দিকে তাকায় নি। টেবিলের ওপরে থাকা কাগজ গুলির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে কফির কাপে চুমুক দিয়ে কিছু একটা বলতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু তার আগেই নাটালিয়া বলল-‘ তাহলে লিও টলস্টয় নৈরাজ্যবাদী ছিলেন কি?’

          ফিয়োডর বলল-‘ তিনি কখন ও নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বলে বলেছেন কিনা জানিনা। কিন্তু তিনি সেরকমই একটি স্থিতি গ্রহণ করেছিলেন- প্রধানত রাজ্য এবং সম্পত্তির স্বত্বের  ক্ষেত্রে। তিনি ‘ভগবানের সাম্রাজ্য তোমার মধ্যেই আছে’ বইটিতে এই বিষয়ে নয় গির্জা এবং দেশের আইনকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন।’

          নাটালিয়া ফিয়োডরের  প্রতি বড় আগ্রহী হয়ে উঠল। সে তাকে টলস্টয়বাদ বোঝাতে সাহায্য করেছে।

          সে ফিয়োডরের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল। আর একটা সময়ে  সে জিজ্ঞাসা করল-‘ তুমি এই বিষয়টির প্রতি এত আগ্রহী হয়ে উঠলে কেন?’

          ফিয়োডর সহজ ভাবে বলল-‘ কেননা আমি লেনিনগ্রাদের নয় জন নিবাসী কেসটার প্রতি আগ্রহী। তারা প্রত্যেকেই টলস্টয় বাদী ছিলেন।’

          ‘ তারা লেনিনগ্রাদের  বলেই কি?’

          ‘না’।-ফিয়োডর বলল-‘ ওটাই একমাত্র কারণ নয়।’

          কিছুক্ষণ থেমে সে বলল-‘ আমি আর্কাইভ থেকে কেসটা উদ্ধার করার পরে তার সম্পর্কে কালিনিনগ্রাডে গিয়েছিলাম।’

          ‘ সত্যিই?’

          নাটালিয়া ফিয়োডরের দিকে তাকিয়ে রইল।

          ‘ কেন?’

          তার প্রশ্নের উত্তর ফিয়োডর দিল না। সে চুমুক দিয়ে কফির অবশিষ্ট অংশটুকু শেষ করল।

          নাটালিয়া আর ও  কিছুক্ষণ কফি হাউসে রইল। ফিয়োডর বলে যাওয়া  টলস্টয়বাদ সম্পর্কে কথাগুলি শুনে গেল। কিন্তু সে তাকে মহাফেজখানা থেকে কেসটার কাগজপত্র উদ্ধার করার পরে কালিনিনগ্রাদে কিসের জন্য গিয়েছিল সেই বিষয়ে বলা থেকে বিরত রইল।

          নাটালিয়া সেদিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>