Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 18

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৭) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী

Reading Time: 11 minutes

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese literature Dipak Kumar Barkakati 1মিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃদীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা,অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন,প্রব্রজন ,ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi,New Delhi ,2010) এবং The Highlanders(Blue Rose Publishers, New Delhi,2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন,কলকাতা,২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-৭।


পরের কিছুদিন ধরে টলস্টয়বাদের বিষয়টা নিয়ে নাটালিয়া ব্যস্ত হয়ে রইল। তার সঙ্গে থাকা টলস্টয়ের বইগুলিতে চোখ বুলাতে লাগল লাগল। যে সমস্ত বই তার সঙ্গে ছিল না সে গ্রন্থাগারে গিয়ে পড়তে লাগল। সে ফিয়োডরের সঙ্গেও আলোচনা করল। বিষয়টার প্রতি তার আগ্রহ এবং অধ্যায়ন দেখে নাটালিয়া অবাক হল। সে যখনই কথা বলে তার মুখের দিকে তাকায় না। বুঝে উঠা কথা গুলি তাকে অনর্গলভাবে বলে যায়।

          টলস্টয় নাকি এক সময়ে শোপেনহাওয়ারের ‘বঞ্চিত এবং অঙ্কিত পৃথিবী ‘ নামের বইটি পড়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিলেন। তিনি সেখানে উল্লেখিত ঋষি মুনি বৈরাগীর নৈতিকতায় মানুষের জন্য প্রকৃত আধ্যাত্মিক মার্গ বলে মনে প্রানে গ্রহণ করেছিলেন । তিনি ‘এটা স্বীকারোক্তি ‘নামে গ্রন্থটির ষষ্ঠ অধ্যায়ে শোপেনহাওয়ারের বইয়ের উল্লেখ করেছিলেন যে নিজত্ব অস্বীকার করে যে শূন্যতা উপলব্ধি করা যায় তা প্রকৃতপক্ষে আপেক্ষিক শূন্যতা। একে ভয় করার কোনো সকাম নেই। খ্রিস্ট ,বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মের বৈরাগীদের পরিত‍্যাগই পুণ্যাত্মার প্রকৃত মার্গ। ত্রাণকর্তা মেথিউ ১৯:২৪ য়ে চিরন্তন মুক্তির সম্পর্কে বৈরাগীর দরিদ্রতার আবশ্যকতার কথা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন-‘ একজন ধনী মানুষ ভগবানের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে হলে একটা সূঁচের ফুটো দিয়ে পার করার চেয়েও কঠিন।’ তাই যে সমস্ত ধনী লোক চিরন্তন মুক্তির আশা করে তারা নিজেরাই দরিদ্রতাকে বেছে নেয়। সেজন্যই রাজকুমার শাক্য মুনি বুদ্ধ হওয়ার জন্য সমস্ত রকম বিলাসিতার জীবন ত্যাগ করেছিলেন।

‘ সেই জন্যই’- ফিয়ডর বলেছিল-‘ শেষ পর্যন্ত দরিদ্রের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি চাষার মতো সাজ পোশাক পরতেন। মাংস খাওয়া এবং ধূমপান করা ত্যাগ করেছিলেন।’

          কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে বলেছিল-‘ টলস্টয় বিশ্বাস করতেন যে আভিজাত্য হল দরিদ্রতার একটি অসহনীয় বোঝা। তার জন্যই আবশ্যক নৈরাজ্যবাদের।’

          ‘ সেইজন্যই’,-ফিয়োডোর পুনরায় বলেই যাচ্ছিল-‘ টলস্টয় জর্জবাদে বিশ্বাস করতেন। জর্জবাদ হল টলস্টয়ের  চেয়ে এগারো বছরের ছোট উত্তর আমেরিকার হেনরি জর্জ প্রচার করা অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধীয় একটি নীতি। তাঁর মতে ভূমি এক ধরনের পদার্থ। এটা প্রকৃতিপ্রদত্ত আদ্যশক্তি এবং সুবিধা। এটা মানব সৃষ্ট নয়, কিন্তু এর উপরে ধার্য করা মূল্য মানব সৃষ্ট। এই মূল্য অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধীয় ফল। এই মূল্য সমস্ত মানুষের সম্পত্তি হওয়া উচিত। অনেকে জর্জবাদী নাগরিকদের লাভ্যাংশের কথা উত্থাপন করে। এই লাভাংশ হল ভূমি থেকে উৎপাদন করা আয়।

          ‘সে যাই হোক না কেন,-ফিয়োডর বলেছিল-–’ টলস্টয় এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সমস্ত সম্পত্তি কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তা নিয়ে পরিবার সোফিয়ার সঙ্গে তার শেষপর্যন্ত মনোমালিন্য হয়েছিল ।

          ১৮৮৪ সনে টলস্টয় লেখা ‘আমি কীসে বিশ্বাস করি ‘ মামের বইটিতে মুক্তভাবে খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাস করার কথা স্বীকার করেছেন । তিনি বিশেষ করে’ সারমান অন দি  মাউন্ট’ এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন । এটাই প্রশান্তিবাদ এবং অহিংসার মূলনীতি।’

          ফিয়োডর বলেছিল -‘ একজন প্রকৃত খ্রিস্টান গির্জা এবং রাজ্যের নির্দেশাবলী মানার চেয়ে দশটা মহান অজ্ঞাত থাকা আশেপাশের এবং ভগবানের প্রতি প্রকৃত প্রেম উপলদ্ধি এবং প্রদর্শন করার নীতি আহরণ করাটাকেই টলস্টয় শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করেছিল। তা করলে আত্মিক শুদ্ধতার অনাবিল আনন্দ অনুভব করা যায় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে খ্ৰিস্টান হিসেবে তিনি নিজেকে একজন প্রশান্ত, সৌম্য এবং শান্তি প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করে এবং সেই জন্যই তিনি দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারের যুদ্ধবিগ্রহের নিন্দা এবং প্রতিবাদ করেন।’

           সেই স্থিতির জন্যই’,-ফিয়োডর বলেছিল-‘ অনেকেই তাঁকে নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক বলে মনে করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি’ টলস্টয়ের বাইবেল’ নামে  সংশোধিত বাইবেল গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি খ্ৰিস্টের  যে সমস্ত বাণীতে বিশ্বাস করতেন সেইসব সন্নিবিষ্ট করেছিলেন।

          তারপর একদিন ফিয়োডর বলেছিলেন-‘ নাটালিয়া, তুমি জান কেউ একজন টলস্টয়বাদীদের সঙ্ঘবদ্ধ করে একটা দল গঠন করেছিল? তিনি ছিলেন ভ্লাদিমির জি চের্টকভ। তাঁকে টলস্টয় ১৮৮৩ সনে ৫৫ বছর বয়সে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁর দর্শনে বিশ্বাস করা ২৯ বছরের চের্টকভকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পরেই দেড় দু বছরের ভেতরে টলস্টয় ‘আমি কীসে বিশ্বাস করি’ প্রস্তাবটি লিখে প্রকাশ করেছিলেন। সঙ্গে চের্টকভের সাহায্যে ‘পছরেডেনিক’ নামের বই প্রকাশের  একটা প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-৬) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী


          নাটালিয়াকে  ফিয়োডরের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য অনেক পড়াশোনা করতে হল। সে একদিন ঘরের পড়ার টেবিলের কাগজপত্র এবং বইপত্র গুছিয়ে রাখছিল। তার মধ্যে সে হঠাৎ টলস্টয়ের একটি বই পেল ‘ ক্রোয়েটজার সোনাটা’ ভালোভাবে বাঁধানো বইটা পুরোনো। পাতাগুলি মেটে রংয়ের।

          নাটালিয়া বুঝতে পারল বইটি মা লিডিয়া পাভল’ভনার। মাসখানেক আগে সে যখন মাকে নিয়ে ইয়াসনায়া পলিয়ানায় গিয়েছিল তার পরে ফিরে এসে উচ্ছ্বসিত হয়ে দিন দশেক মা টলস্টয়ের পুরোনো  বইপত্র বের করে পড়তে শুরু করেছিল । বইটা অন্য একটি টেবিলে ছিল । একটা সময়ে নাটালিয়ার টেবিলে চলে এসেছে।

          নাটালিয়া বইটা মেলে ধরল। অনেক পুরোনো বই । তার প্রকাশকাল ১৯২১ সনে। তার মধ্যে মেটে বর্ণের সামনের দিকের একটি পৃষ্ঠায় রয়েছে একটি স্পষ্ট স্বাক্ষর- ভলকভ রিয়াজনভ।

নাটালিয়া কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। বহু পুরোনো বই । প্রায় ষাট বছর আগের। মায়ের সাথে ষাট বছর আগের সই সম্বলিত বই।

          নাটালিয়া পুনরায় নামটি দেখল।আর পরে   দু’একটি পাতা উল্টাতে শুরু করল। সে কিছুই পড়ল না-এমনিতেই চোখ বুলিয়ে গেল। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে হল নামটা যেন তার পরিচিত। কোথায় যেন নামটা পেয়েছে। সে পৃষ্ঠাগুলি দ্রুত উল্টাতে লাগল। তারপরে একটা সময়ে সে পুনরায় স্বাক্ষর থাকা পৃষ্ঠাটি মেলে ধরল। স্বাক্ষর টি ভলকভ রিয়াজনভের।

        সে বইটি একপাশে সরিয়ে রেখে তার ব্যাগ থেকে কিছু কাগজপত্র খুঁজে বের করতে লাগল। সে অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের দেওয়া কাগজ গুলির জেরক্স কপি বের করে নিল। ততক্ষণে সে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। সে কাগজের  ওপরের হেডলাইনটা পড়ল-‘ ‘লেলিনগ্ৰাডের নয়জন নিবাসী’ তার নিচে রয়েছে’ লিওনিড এডলার এবং অন্যান্যদের কেস’বলে।

          নাটালিয়া দ্রুত কাগজগুলি উল্টাতে লাগল এবং তার মধ্যে থাকা নামগুলি পড়তে লাগল। হ্যাঁ, হ্যাঁ। এখানই আছে সেই নামটা। ছয় নম্বরে আছে সেই নাম-ভলকভ রিয়াজনভ। বয়স ৩৯ বছর। মস্কো।

          নাটালিয়া উত্তেজিত হয়ে পড়ল।

          সে পুনরায় বইয়ের পাতাটা মেলে ধরল। হ্যাঁ সেই একই নাম।

          সে  এবার স্পষ্ট করে আর ও দুটি কথা লক্ষ‍্য  করল। সইটার নিচে লেখা আছে জায়গার নাম – মস্কো । নিচে দেওয়া আছে একটি তারিখ । তারিখটা ১৮/০৪/১৯২৮।

          এতক্ষণ পর্যন্ত নাটালিয়াকে উত্তেজনা কাঁপিয়ে তুলছিল । সে জানে ‘লেনিনগ্রাডের নয়জন নিবাসী’র কেসটা  হয়েছিল ১৯৩২-৩৩ সনে। এখানে আছে ১৯২৮ সনের সই।

          সে মাকে ডাকতে চাইল। কিন্তু মা কাপড় কলের কাজ থেকে তখন ও ফিরে আসেনি।

          নাটালিয়া বইটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।

          নাটালিয়া দ্রুত রাতের রান্না করে নিল। খাবার টেবিল পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখল, যাতে মা ফিরে এসে এই সমস্ত কাজ করতে না হয়। সে যাতে তে মায়ের সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলার সুযোগ পায়।

          অনেকদিন পরে একজন বন্ধুর সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা কিছু সময় কাটিয়ে লিডিয়া পাভল’ভনা মনের আনন্দে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ি ফিরে নাটালিয়া সন্ধ্যার  সমস্ত কাজ করে রেখেছে দেখে তার মনটা বেশ রঙিন হয়ে উঠল।

          ‘ নাটছেঙ্কা’ – মায়ের আনন্দ বিগলিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।- ‘তোকে বড় কষ্ট করতে হল।

          ‘ না মা, তোমার বয়স হয়েছে। মাঝেমধ্যে আরাম করা প্রয়োজন।’

          ‘ মা নাটালিয়া ‘- মায়ের আনন্দের সুর কমেনি। তিনি বললেন-‘ কাজ করলেই ভালো লাগে। তারমধ্যে আজ আমি শ্রীমতী গ্রিগরয়েভর বাড়িতে ঢুকে কফি খেয়ে কথাবার্তা বলে এসেছি ।’

          নাটালিয়া বুঝতে পারল মা লিডিয়া বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে এসেছে। শ্রীমতী গ্ৰিগরয়েভর কথা কিছুক্ষণ মনের আনন্দে মা বলে গেল।

          কাপড় পরিবর্তন করে মুখ হাত ধুয়ে খেতে বসার আগে লিডিয়া পাভল’ভনা কিছুক্ষণ সোফায় বসলেন।

          ‘ পড়াশোনা করছ কি?’- মা জিজ্ঞেস করলেন।

          নাটালিয়াই অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের সঙ্গে নয় ফিয়োডরের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করা আবশ্যক। সে বলল-‘ করছি আর কি।’

          নাটালিয়ার পড়াশোনায় মন বসতে  দেখে  লিডিয়া পাভল’ভনার মুখে আনন্দ প্রকাশ পেল।

          নাটালিয়া বলল-‘ মা সেই সম্পর্কে একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি।’

মাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাটালিয়া বলল-‘ টলস্টয়ের একটি বই পেলাম-‘ক্রোয়েটজার সোনাটা’। এই বই টা তুমি কোথায় পেলে?’

          নাটালিয়া উঠে গিয়ে টেবিল থেকে উপন্যাসটা  এনে মাকে দিল।

          শ্রীমতী পাভল’ভ বইটা নেড়েচেড়ে   দেখে বললেন-‘ বইটা আমাকে একজন বান্ধবী দিয়েছিল। তার সঙ্গে শৈশবে একসঙ্গে আমি বড় হয়েছিলাম।’

          নাটালিয়া উৎসাহিত হল।-‘ কী নাম তার? বইটিতে যে সই করা আছে- ভলকভ রিয়াজনভ – তিনি তোমার বান্ধবীর কী হন?’

          লিডিয়া  পাভলভ  গম্ভীর ভাবে উত্তর দিল-‘ আমার বান্ধবীর নাম নিনা ভলকভনা।ভলকভ রিয়াজনভ  তাঁর পিতা।’

‘পিতা?’- নাটালিয়ার কণ্ঠস্বরে জোর পড়ল-‘ কোথায় থাকে তোমার বান্ধবী নিনা?’

          ‘ভলগ’গ্ৰাডের আশেপাশে।’

          মেয়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ এবং দেহের ভঙ্গিমা লক্ষ‍্য করে লিডিয়া পাভল’ভনা জিজ্ঞেস করলেন-‘ কেন জানতে চাইছ নিনার কথা?’

          নাটালিয়া যেন দ্রুত টেবিল থেকে ‘ লেনিনগ্রাডের নয়জন নিবাসী’কেসটার জেরক্স কপির কাগজপত্রগুলি মাকে দেখাবে কিন্তু তা না করে সে জিজ্ঞেস করল-‘ আমি তোমার বান্ধবী লিনা এবং বিশেষ করে তার পিতা ভলকভ রিয়াজনভের  কথা জানতে চাই।’

          নাটালিয়া জিজ্ঞেস করল-‘ তাদের তুমি কীভাবে জান?’

          শ্রীমতী পাভলভ বললেন-‘ আমরা এই শহরে পাশাপাশি থাকতাম। নিনার সঙ্গে আমার জন্ম একই বছরে-১৯৩০ সনে।’

‘ তাদের বিষয় আর কি জান? রিয়াজনভ  মহাশয় টলস্টয়বাদী ছিলেন নাকি?’

          মা লিডিয়া পাভল’ভ কন‍্যার টলস্টয়বাদ নিয়ে চিন্তা চর্চা করার কথা জানে। তিনি নাটালিয়ার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর তিনি উঠে গিয়ে সামনের দরজার হুকটা ভালোভাবে লাগিয়ে নিলেন। পুনরায় আগের জায়গায় এসে বসে নিয়ে তিনি বললেন-‘ সেই সময়টা ছিল বড় কঠিন।’

          কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি বললেন-‘ তিনি কী ছিলেন আমি জানিনা। কিন্তু তিনি টলস্টয়ের বই পড়তে ভালোবাসতেন। তার ঘরে একটি ছোটখাট সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছিলেন।’

          শ্রীমতী পাভল’ভনা বললেন-‘ আমরা ছয় সাত বছর বয়স পর্যন্ত পাশাপাশি ছিলাম। আমার পিতা রেড গার্ড ছিলেন। বলশেভিকরা ক্রেমলিন দখল করার দলে তিনিও ছিলেন। পরে লেনিনের মৃত্যুতে স্টালিনের অধীনেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু তার একনায়কত্ব সময়টাকে বড় কঠিন করে তুলেছিল। তিনি কিছুদিন লেনিনগ্রাডে কাজ করেছিলেন। আমার জন্মের দুই বছর পরে তাকে প্রণালি সাজা কয়েদিদের তদন্ত করার জন্য শ্বেত সাগরের উপকূলে বদলি করা হয়েছিল। আমার চার বছর বয়সের পর থেকে মা  বাবার আর খবর পায়নি।’

          লিডিয়া পাভল’ভনা কিছুক্ষণের জন্য নীরবে  রইলেন। তারপর বললেন-‘ বাবা লেনিনগ্রাডে  চাকরি করতে যাওয়ার পর থেকে মা নিনাদের পরিবারের কাছাকাছি আসতে শুরু করে, কেননা পড়াশোনা করতে  থাকা চিন্তাশীল নিনার পিতা প্রায়ই বাড়ি থেকে নাই হয়ে যেতেন । শোনা মতে তিনি নাকি লেনিনগ্রাডের বন্ধু কয়েকজনের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলেন । সেই সময়ে নিনার  মাত্র দুই বছর বয়স । তখন থেকেই নিনার পিতা ভলকভ রিয়াজনভ মহাশয়ের  খবর আর পাওয়া যাচ্ছিল না।তাই —।’

        নাটালিয়ার মা বললেন-তাই স্বামীহীনা দুইজন মাতা আমাকে এবং নিনাকে খেলার জন্য ছেড়ে দিয়ে মাঝেমধ্যে চারদেওয়ালের মধ্যে নিজেদের দুঃখের কথা বলাবলি করত। সেভাবেই নিনার সঙ্গে আমার শৈশব কেটেছিল।তার হয়তো যখন ছয় বছরের মতো বয়সে ভলগ’গ্রাডের আশেপাশে কোনো একটি জায়গায় ওদের পরিবারটি চলে গিয়েছিল।’

        লিডিয়া পাভল’ভনা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।তাঁর মনটা শৈশবের মধুর অথচ করুণ স্মৃতি ঘিরে ধরল।

        নাটালিয়া সোফাটায় মায়ের কাছে এসে হাতটা ধরে বলল-‘মা,তোমার সঙ্গে তার পুনরায় কবে দেখা হল?বইটা তিনি কবে তোমাকে দিলেন?’

        শ্রীমতী পাভল’ভ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন-‘সেটা বছর দশেক আগের কথা।নিনা  ইতিমধ্যে নার্সের সেবায় বেশ স্বীকৃতি লাভ করেছিল। সে দশদিনের জন্য মস্কোতে প্রশিক্ষণ দেবার জন্য এসেছিল। সেবার সে খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করেছিল।তুই তখন স্কুলের হোস্টেলে ছিলি।আমার সঙ্গে দেখা হতেই ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।আমার মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে এবং একই সঙ্গে তার মায়ের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভলগ’গ্রাডে মৃত্যু হওয়ার খবর দিয়ে দুইচোখ অশ্রুসজল করে তুলেছিল। সেবার সে আমাকে এই বইটি দেয়নি।এক বছর পরে পুনরায় একই প্রশিক্ষণ দেবার জন্য আসার সময় সে টলস্টয়ের এই বইটি নিয়ে এসেছিল। বলেছিল-‘এটা বাবার স্বাক্ষর থাকা বই।বড় আদরের। তুইও আদরের-সেই বাবার আমল থেকে।আমি তোকে চিহ্নস্বরূপ এটাই দিলাম।’-সে বইটি দেবার সময় শেষের দিকে দুই একটি কথা লিখে দিল।’

        লিডিয়া পাভল’ভনা বললেন-‘দেখ,মা নাটছেঙ্কা বইটার শেষের দিকে দেখ।’

        নাটালিয়া বইয়ের শেষের পৃষ্ঠাটা মেলে নিল।তাতে লেখা ছিল-‘আদরের লিডিয়াকে-আমাদের পিতাদের অবিহনে আমরা আমাদের আত্মীয়তা সেই শৈশবে গড়ে তুলেছিলাম।এখন পিতার স্বাক্ষর সম্বলিত প্রিয় বইটি ভালোবাসার চিহ্নস্বরূপ তোকে উপহার দিলাম।’

        নিচে নিনা ভলক’ভনার স্বাক্ষর ছিল।তারিখ না থাকলেও লেখা ছিল-মে ১৯৭৯ সন।

        নাটালিয়া কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।তারপর বলল-‘এটা দেখছি দশ বছর আগের কথা।’

        সে জিজ্ঞেস করল-‘মা,নিনা মাসির ঠিকানা তোমার কাছে আছে কি?’

        ‘হ্যাঁ,ও দিয়ে গিয়েছিল। কাগজটা বা কোথায় আছে?দেখতে হবে।’

        নাটালিয়া উৎসাহিতভাবে বলল-‘হ্যাঁ,দেখতো মা।আমাদের কাজে লাগতে পারে।’

        ‘আমাদের?’

        টলস্টয় এবং টলস্টয়বাদ সম্পর্কীয় নাটালিয়ার চিন্তাধারার সঙ্গে ফিয়োডরের কথা অজান্তে জড়িয়ে পড়েছে।তাই তার মুখ দিয়ে আমাদের শব্দটা বেরিয়ে গিয়েছিল।

        ‘আমাদের মানে আমার আর ফিয়োডরের।’-সে বলল-‘আমাদের অধ্যয়নের কাজে লাগতে পারে।’

         লিডিয়া পাভল’ভনা ইতিমধ্যে ফিয়োডরের কথা জানতে পেরেছে।তিনি মেয়ের কথা শুনে চুপ করে রইলেন।

        নাটালিয়া বলল-‘মা,অনেক রাত হয়েছে।এখন রাতের খাবার খেয়ে নেব নাকি?’

        সে রান্না করে রাখা জিনিসগুলি গরম করার জন্য উঠে গেল।

        পরের দিন বেশ উৎসাহের সঙ্গে নাটালিয়া মাকে উপহার দেওয়া টলস্টয়ের বইটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল।সে সারা রাত ফিয়োডরের সঙ্গে দেখা করে  কথাগুলি বলার জন্য উদ্বেল হয়ে উঠল।

        সে বিভাগে গেল। গ্রন্থাগারে গেল।কিন্তু ফিয়োডরকে দেখতে পেল না। সে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে সচরাচর থেকে সে একঘণ্টা আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়েছে।

        নাটালিয়া এক পেয়ালা কফি খাবার জন্য রেস্তোরায় গেল।রেস্তোয়া খোলার বেশিক্ষণ হয়নি।সেখানে দুইজন গ্রাহক বসেছিল।সে এক পেয়ালা কফি নিল।এবং প্রতিদিন বসার মতো সমতল দেখার মতো কাচের বিশাল দেওয়ালের কাছে বসে নিচের দিকে তাকাল।

        বাইরে রোদ ছিল না।গতরাতে কয়েকফোঁটা বৃষ্টি হয়েছিল।তাই আবহাওয়াটা গুমোট ছিল।তবু হালকা জামা কাপড় পরে ছাত্র ছাত্রী ,গবেষক অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল।

        পেয়ালার কফি শেষ করে নাটালিয়া যথেষ্ট সতেজ অনুভব করল।সে বিভাগে ফিরে আসার আগে গ্রন্থাগারে একবার উঁকি দিল এবং সেখানেই ফিয়োডরকে দেখতে পেল। সে পড়াশোনা করার জন্য বই-পত্র বের করে নিয়েছে।                          সে কাছে গিয়ে সংকোচ বিহীনভাবে তাকে ডাকল-‘ফিয়োডর’ 

          ফিয়োডর  মাথা তুলে তাকাল।

          ‘ তোমার সঙ্গে দরকারি কথা আছে। এখুনি এসো তো।’

          ফিয়োডর অবাক হল। সে উঠল।

          ওরা দু’জন পুনরায় রেস্তোরাঁতে গেল। রেস্তোরায় তখন কুড়ি জনের মতো গ্রাহক বসেছিল। কাচের দেওয়াল দিয়ে দেখা গুমোট আকাশ  থেকে তখন ঝিরঝিরে  বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছিল।

          ওরা দুইজন বসল এবং ফিয়োডর কফি আনার আগেই তাকে বইটা দেখিয়ে নাটালিয়া মায়ের সঙ্গে গত রাতে হওয়া কথাগুলি আগ্রহের সঙ্গে বলতে লাগল।

          ফিয়োডর বেশ উৎসাহিত হল। সে বলল-‘ আমি তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে খারাপ পাবে কি?’

          নাটালিয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল-‘ নিশ্চয় না।’

          বিকেলবেলা দুজনেই নাটালিয়াদের কালিনীন প্রসপেক্টের সুউচ্চ অট্টালিকার ছোট অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত হল।

লিডিয়া পাভল’লভনা কাপড় কলের কারখানা থেকে তখনও ফিরে আসেনি। ওদেরকে আধঘন্টা অপেক্ষা করতে হল।

          ‘ এই যে ফিয়োডর -ফিয়োডর ইভানভিছ ।’- মা ফিরে আসায় নাটালিয়া বলল – তোমাকে ওর কথা আগেই বলেছি ।’

          লিডিয়ার গম্ভীর স্বভাবের ফিয়োডরকে দেখে খারাপ লাগল না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-‘ তোমার বাড়ি কোথায়?’

‘ লেলিনগ্রাডে।’

‘ লেনিনগ্রাডে?’- লিডিয়া পাভল’ভনার অনেক কথা মনে পড়ল। তার পিতা পাভলভ টেলপুগ’ভ লেনিনগ্রাডে  ছিলেন। বান্ধবী নিনা ভলক’ভনার পিতা ভলক’ভ রিয়াজনভ ও সেখানে ছিলেন ।

          ‘ হ্যাঁ।’-ফিয়োডর তার কথায় সম্মতি জানাল।-‘ আমি পিটাসবার্গ ইউনিভার্সিটিতে পড়েছিলাম।’

          কথাগুলি বলার সময় ফিয়োডরের এক বছরের জন্য টলস্টয়ের ও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা মনে পড়ল।

          ‘ আপনি লেনিনগ্রাডে  গিয়েছেন নাকি শ্রীমতী পাভলভ?’-ফিয়োডর জিজ্ঞেস করল।

‘ যাই নি। যাবার যে ইচ্ছা নেই তা নয়।’- কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন-‘ তুমিও টলস্টয়ের বিষয়ে গবেষণা করছ নাকি ফিয়োডর?’

          ফিয়োডোর বলল-‘ হ্যাঁ আমিও টলস্টয়বাদের বিষয়ে অধ্যায়ন করছি। একদল টলস্টয়বাদীর বিষয়ে জানতে চাইছি।’

নাটালিয়া বলল-‘ মা লিনা মাসির পিতা ভলকভ রিয়াজনভ ও একজন টলস্টয়বাদী ছিলেন। ‘

          মাকে  তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাটালিয়া বলল-‘ গতরাতে আমি তোমাকে বলছিলাম না, কিন্তু এই ফিয়োডর অধ্যাপক ক্রিয়োসকভের সঙ্গে আর্কাইভ থেকে কিছু তথ্য উদ্ধার করেছে। সেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি ভলক’ভ রিয়াজ নভ ও একজন টলস্টয়বাদী ছিলেন।’

          নাটালিয়া ইতিমধ্যে ফিয়োডরের সঙ্গে আলোচনা করে মাকে ‘লেনিনগ্রাডের নয়জন নিবাসী’র কেসটির কথা বলবে বলে  ঠিক করেছে। তাই সে তাহলে মাঝখান থেকে দুটি কাগজ বের করে মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-‘ এই কাগজে নিনা মাসির বাবার নাম আছে- ছয় নম্বরে।’

          লিডিয়া পাভল’ভনা কাগজে চোখ বোলাল ।‌‌ হ্যাঁ,ছয়  নম্বরে লেখা আছে ভলক’ভ রিয়াজনভের নাম। সঙ্গে আছে মস্কোর নাম। বয়স রয়েছে ৩৯ বছর বলে। 

          লিডিয়া পাভলভনা বুঝতে পারল ওটাই নিনার পিতার নাম। কেননা সেই সময়ে মস্কোতে থাকা তার বয়সটা ততটাই হবে ।

          কাগজটার দিকে তাকিয়ে নিশ্বাসের গতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত মহিলার দিকে তাকিয়ে ফিয়োডর বলল-‘ শ্রীমতী পাভলভ ,আমরা এখন আর ও কথা জানার জন্য আপনার বান্ধবী নিনা ভলক’ভনার  সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

          ‘ হ‍্যাঁ,মা।’-ফিয়োডরের কথায় সম্মতি জানিয়ে নাটালিয়া বলল -‘ আমাদের তার ঠিকানা চাই।’

লিডিয়া পাভল’ভনা বলল -‘ সকালবেলা আমি ঠিকানা লেখা কাগজটা খুঁজেছিলাম। কিন্তু পেলাম না। আমি আবার খুঁজে দেখব।’           ‘খুঁজে দেখ মা।’- নাটালিয়া বলল।

          ফিয়োডর জিজ্ঞেস করল-‘ আপনি কি শ্রীমতী ভলকভ কোন কার্যালয়ে প্রশিক্ষণ দিতে এসেছিল জানেন? যদি জানেন সেখান থেকেও কার্যালয়ের ঠিকানা সংগ্রহ করতে পারব।’

          লিডিয়া পাভল’ভনার   নার্সিং পরিচালকের কার্যালয়টির কথা জানা ছিল । সেই বিষয়ে জানাতেই ফিয়োডর নোট বইয়ে টুকে  নিল।

          কিছুক্ষণ কথা বলার পরে ফিয়োডর যাবার জন্য প্রস্তুত হল। দিনের বেলা বৃষ্টি হওয়ায় বাইরে ঠান্ডা পড়েছিল। তার মধ্যে ট্রামে উঠার জন্য পরনের জ্যাকেটটার জিপটা ভালো করে টেনে দিয়ে মাথার টুপিটা ঠিক করে ফিয়োডর বেরিয়ে গেল।

          নিনা  ভলকভনার  ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার জন্য নাটালিয়ার মায়ের তিন দিন সময় লাগল। সেই তিনদিনের মধ্যে নাটালিয়া ফিয়োডরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে  খুঁজে পেল না। মায়ের কাছ থেকে ঠিকানা পাওয়ার দিন নাটালিয়া তাকে ঠিকানা দেবার জন্য হন্তদন্ত হয়ে খুঁজে বেড়াল। সে বিভাগে নেই, গ্রন্থাগারে নেই। এমনকি বন্ধুদের সঙ্গেও নেই।

          বিকেলবেলা সে দ্রুত এসে গ্রন্থাগারে নাটালিয়ার সঙ্গে দেখা করল। বাইরের ভিজে বাতাসে তার চুল উস্কোখুস্কো হয়ে পড়েছিল তার দুচোখে ক্লান্তি দেখা যাচ্ছিল।

          ‘ পেয়েছি নাটালিয়া। তোমার মাসির ঠিকানা পেলাম।’-ফিয়োডরের ক্লান্ত দুচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

          সে একটা টুকরো  কাগজ বের করে নাটাশিয়ার দিকে এগিয়ে দিল।

          ‘ গত তিন দিন আমি ঠিকানার খোঁজে ঘুরে বেরিয়েছি।’

          নাটালিয়া তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তবু সে ব্যাগ থেকে মা দেওয়া ঠিকানার কাগজটা ফিয়োডরের দিকে এগিয়ে দিল।

          কাগজটা হাতে নিয়ে ফিয়োডরের মুখে একটা অমূল্য হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে বলল-‘ ভেবেছিলাম তোমার মা কাগজটা কোথাও রেখে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু ভালোই হল। মায়ের কাগজটায় আছে বাড়ির ঠিকানা। আর আমারটাতে রয়েছে কার্যালয়ের ঠিকানা। সঙ্গে কার্যালয়ের ফোন নাম্বার।’

          নাটালিয়া জিজ্ঞেস করল-‘ তুমি এই ঠিকানার জন্যই গত তিনদিন হন্তদন্ত হয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ছিলে নাকি?’

          ফিয়োডর সম্মতি জানাল।

          ‘ কিন্তু কেন?’–সে জিজ্ঞেস করল।

          সে বলল-‘ টলস্টয়বাদীদের কেসটার প্রতি যে আমি বিশেষভাবে আকৃষ্ট সে কথা আবার বলতে হবে নাকি?’

          নাটালিয়া এবার তার দিকে তাকিয়ে আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল-‘ও , তোমার আগ্রহের বিশেষ কারণ আছে বলে আগে বলেছিলে। কারণটা কী, বলবে কি?’

          ফিয়োডর কোনো ভূমিকা না করে স্পষ্টভাবে বলল-‘ কারনটা হল আমার নিজের নামটা।’

          নাটালিয়া তার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার সম্পূর্ণ নাম ফিয়োডর ইভানভিচ এডলার।

          ‘কারণ’,-সে পুনরায় বলল-‘ আমি লেলিনগ্রাডের।’ 

          নাটালিয়া কিছুই বুঝতে পারল না।

          তার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিয়োডর বলল-‘ আমি একজন এডলার। কেসটাও অন্য একজন এডলারের -লিঅ’নিউ এডলারের। সঙ্গে আমরা দুজন লেনিনগ্রাডের ।’

          নাটালিয়া ফিয়োডরের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

          কোনো ভাবাবেগ প্রকাশ না করে সে বলল-‘কেসটার সংক্রান্ত আমাদের দ্রুত তোমার মাসির খোঁজে যেতে হবে। 

বাইরে তখন ও ভিজে বাতাস বইছিল। 

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>