| 21 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১১) । নিরুপমা বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Assamese novel Gosain maa Nirupama Borgohain1অভিযাত্রী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি বিজেতা নিরুপমা বরগোহাঞি ১৯৩২ সনে গুয়াহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৫৪ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং ১৯৬৫ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ পাশ করেন। লেখিকার প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘এজন বুড়া মানুষ’, ‘এপারর ঘর সিপারর ঘর’ সহ মোট একুশটি উপন্যাস এবং ‘সতী’, ‘নিরুপমা বরগোহাঞির শ্রেষ্ঠ গল্প’ইত্যাদি দশটি গল্প সংকলন রয়েছে।


দ্বিতীয় খণ্ড

(২)

এইবার রুণীর পরিবর্তে গোস্বামী বলে উঠলেন, সস্নেহ হাসি হেসে তিনি ছেলেকে বললেন–’ অপু, তোর এই কথাটা ফরাসি রানীর মতোই হল–’ রুটি নেই যদি কেক খায় না কেন।’

অপু আর কিছু না বলে গোমরা মুখে বাথরুমের দিকে চলে গেল। রুণী পুনরায় পেছনের বারান্দায় গিয়ে দেখল যে মা একগাদা জাবরা, ছেঁড়া কাগজের স্তূপ জমিয়ে পুনরায় আগুন ধরিয়েছে এবং উনুনে বসানো কেটলির জল গরম হয়ে উঠছে।

রুণীকে দেখে মা বললঃ এই যে রুণী, বাবা কোথায় গেল? চা ঢেলে দিচ্ছি নিয়ে যা, সকালের চা না পেলে মানুষটার মাথাটা একেবারে খারাপ হয়ে যায়।আর ছেলেটা কোথায় গেল? কাঁচা খড়ি গুলি রোদে বের করে দিক। খড়ি, খড়ের যোগার হোক বা না হোক ভাত তো লাগবেই , পেটের ক্ষুধা তো আর খড়ি- খড়  দেখবে না। আর অপু উঠে  গেলে তোরা বিস্কুট পাউরুটি বের করে চা খেয়ে নিস। 

চায়ের টেবিলে অপুর দিকে মাখন লাগানো পাউরুটির প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে রুণী গম্ভীরভাবে বলল–’ নভেম্বর থেকেই ধরতে গেলে আন্দোলন আরম্ভ হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি, মার্চ শেষ হয়ে এপ্রিলে পৌঁছেছি। শহরের মানুষেরা যেমন গ্ৰামের মানুষের অবস্থা কী হয়েছে ভাবত দাদা, কেরোসিনের অভাবে সেখানে মানুষ নাকি বিকেলের দিকেই ঘুমিয়ে পড়ে, কোনো কোনো জায়গায় মোমবাতির দামই তিন টাকা পর্যন্ত হয়ে গেছে। রিফাইনারি বন্ধ করার মতো কার্যসূচী তোরা কেন নিলি দাদা? সরকারের সঙ্গে যুদ্ধের কিছু পদ্ধতি নিজের নাক কেটে সতিনীর যাত্রা ভঙ্গ করার মতো হয়নি কি? এটা নাকি গণআন্দোলন, তাহলে ছাত্র আন্দোলন‍ করছে কেন? কেন শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের দাম দিতে হল নিজের একটা বছরের একাডেমিক ক্যারিয়ার নষ্ট করে? পুনরায় সামনের বছর বা  কি হয়? ইতিমধ্যে অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেছে‌। কত হাজার হাজার দুঃখী ছেলেমেয়ে আছে যাদের মা বাবা একটা বছর নষ্ট হওয়ার পরে দ্বিতীয় বছর পড়ানোর আর ক্ষমতা নেই। ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি সমস্ত টেকনিক্যাল বিষয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে রেখে কারিগরি শিক্ষায় এমনিতেই পিছনে পড়ে থাকা অসমকে তোরা আরও পিছনে নিয়ে গেলিনা? এই ধরনের আত্মঘাতী পরিকল্পনা তোদের কোন নেতার মগজ থেকে উদ্ভাবিত হয়েছিল?’

অপু কঠোর মুখে বলল–’যে রাজ্য বিদেশির কবলে প্রায় শেষ হয়ে যেতে চলেছে সেই রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষা প্রথম এবং প্রধান কথা তারপরে অন্যান্য কথা হবে । অন্যান্য কথা অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু মৃত্যুর দরজার সামনে দাঁড়ালে অন্যান্য কথা কোথায় চলে যাবে– সেই আসন্ন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কথা হয়ে ওঠে। আজ অসম সেরকমই জীবন মরণের সন্ধিক্ষণ, এখন তোদের মতো দুই চারজন অসম  বিরোধী চক্রের দেশদ্রোহী ছাড়া  অন্য সমস্ত অসমিয়াই সর্বস্ব ত্যাগ করে দেশের জন্য এগিয়ে এসেছে। এই কয়েক মাস অসমিয়ারা যে ধরনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছে যে ধৈর্য নিষ্ঠা এবং ক্লান্তিহীনভাবে আন্দোলন করে চলেছে তার উদাহরণ ভারতে কেন পৃথিবীতেই বিরল।’

‘ অসমিয়া মানুষের দেশপ্রেমের ওপরে আমার কোনো সন্দেহ নেই দাদা– ধৈর্য নিষ্ঠুর একাগ্রতা এইসবের ওপরে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই জনগণ শুদ্ধ পথে চলেছে কি ? নেতার দ্বারা এরা বিভ্রান্ত হয়নি? আমাদের দেশদ্রোহীদের মনে অনেক প্রশ্ন অহরহ জেগে থাকে, যে সবের উত্তর তোরা কখনও দিতে পারিস নি। ছাত্রদের কথা বলছি না কিন্তু আন্দোলনের বহু বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাই এত বছর ঘুমিয়েছিল নাকি যে আজ হঠাৎ জেগে উঠে ত্রিশ  বছরের সমস্যাটির বিষয়ে প্রথম সচেতন হল? এদের অনেক নেতাই তো গত কয়েক বছর বিদেশি ভোটার থাকা তালিকাতে   নির্বাচন খেলে আসছে এবং এখনও গুয়াহাটি পৌরসভার সভ্য পদে অধিষ্ঠিত রয়েছে? অনেক উত্তর না পাওয়া প্রশ্ন, দাদা। তাম্রপত্রগুলি যে ফিরিয়ে দিয়েছে, পেনশন নিতে অস্বীকার করে নাই কেন ? অসমে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর ভয়ঙ্কর বৃদ্ধির কথা বলছে, কিন্তু লোকগণনা যে অসমিয়া ভাষীর ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী গতি দেখাচ্ছে  সেই বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন? এই পরিসংখ্যা এ কথাই প্রমাণ করছে না কি যে অনুপ্রবেশকারীরা অসমিয়া ভাষা সংস্কৃতি নির্বিচারে গ্রহণ করছে ? ধীর ভাবে হলেও অসমে অসমিয়া জাতি গঠনের প্রক্রিয়াটা চলছিল– কিন্তু এখন যেখানে সেখানে বাংলাদেশি বিতরণের নামে স্থানীয় ন- অসমিয়া মুসলমান এবং হিন্দুর ওপর যে অত্যাচার চলল তারপর তারা নিজেদের অসমিয়া বলে পরিচয় দেবে কি ?’

অপু অত্যন্ত ক্রোধের  সঙ্গে উত্তর দিল–’ মিথ্যা কথা, তাদের উপরে কোনো আন্দোলনকারী কোনো অত্যাচার চালায় নি, তাছাড়াও উত্তর কামরূপে যত মানুষের মৃত্যু হল তোরা বামপন্থীরা তাকে অনেক গুণ বেশি করে প্রচার করে বেড়াচ্ছিস। তাছাড়া সমাজবিরোধী দুষ্কৃতিকারীদের করা অপরাধের বোঝাও আমাদের কাঁধ পেতে নিতে হবে নাকি?’

রুণী উচ্চস্বরে হেসে উঠল–’ সমাজবিরোধী দুষ্কৃতিকারী। তোরা ভালো একটা স্কেপগোট সৃষ্টি করে নিজেরা সমস্ত দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছিস দাদা ।’

রুণী আরও কিছু বলার আগে বাবা হাতে খবরের কাগজটা নিয়ে প্রবেশ করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলল – আমিও চা জলখাবার খেয়ে নিই রুণী, আমার এক জায়গায় একটু কাজ আছে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।’


আরো পড়ুন: অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১০) । নিরুপমা বরগোহাঞি


রুণী  বাবার পাউরুটিতে মাখন লাগাতে লাগল এবং অপু গোমড়া মুখে চেয়ার ঠেলে  উঠে পড়ল এবং ভেতরে গিয়ে মাকে চিৎকার করে বলল – ‘মা ,মা খড়ি আনতে হবে যদি আমাকে তাড়াতাড়ি টাকা পয়সা দে।’

‘ শুধুমাত্র খড়ি? বাজারে যখন যাবি আরও দুই একটি জিনিস নিয়ে আসবি।’

অপুকে বাজারে পাঠানোর পরে শ্রীমতী গোস্বামী এসে খাবার ঘরে প্রবেশ করল। তখন গোস্বামীর খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, কেবল রুণী টি পট থেকে ঢেলে দেওয়া দ্বিতীয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি মেয়ের সঙ্গে এটা ওটা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

শ্রীমতী গোস্বামী একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুণী বলল–’ মা তুমি এখন খাবে তো? আমি রুটিতে মাখন লাগিয়ে দিই, কিন্তু চা আর নেই। পুতু  কোথায় গেল? সেও তো চা খায়নি, গরম জল নিয়ে আসুক, আমি তোমাদের চা করে দিচ্ছি…ও পুতু,পুতু?’

শ্রীমতী গোস্বামী বিরস মুখে বললেন–’ হ্যাঁ এই সবই করতে থাকুক, পড়াশোনা তো মাথায় উঠেছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে কী দেশ উদ্ধার করতে চাইছে আমরা বুঝতে পারছি না।’

গোস্বামীর স্ত্রীর কাছে অপ্রস্তুত ভাবটা লেগেছিল, সেই  ভাবটা কাটিয়ে সহজ হওয়ার জন্য যেন তিনি স্ত্রীর দিকে ট্রিবিউনটা এগিয়ে  দিয়ে বললেন– তুমি তো সকাল থেকে কাগজটাতে চোখ বুলানোর সময় পাওনি পুতু জল আনতে আনতে গেছে, ওপরে ওপরে চোখ বুলিয়ে নাও।’

কিন্তু না গোস্বামীর সকাল বেলাটা পরিষ্কার হওয়ার  লক্ষণ দেখা গেল না, কারণ শ্রীমতী গোস্বামী গম্ভীর মুখটা আরও গম্ভীর করে বললেন ––’কোনো দরকার নেই আমার সকাল বেলা কোন ছেলে কোথায় মারা গেল, কার শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হল, কাকে শহীদ করা হল সেইসব পড়ে মরার। গণশ্রাদ্ধ করলেই, কাগজে ফোটো উঠলেই , মা-বাবাকে একগুচ্ছ টাকা উঠিয়ে দিলেই হতভাগ্য পিতা মাতার পুত্রশোক  হালকা হবে। এই ধরনের যুবক ছেলেরা অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে শুরু করেছে, যার বুক খালি হয়ে গেছে সেই বুঝতে পারে পুত্রশোক কী জিনিস! আমাকে সেই মৃত্যুর খবর গুলি দেখাবেন না, আমার সহ্য হয় না। এভাবে জীবন বিসর্জন দিয়ে দিয়ে আমাদের সোনার অসমেরও  প্রয়োজন নেই।’

গোস্বামীর স্ত্রীর কাছে অপ্রস্তুত ভাবটা লেগেছিল, সেই  ভাবটা কাটিয়ে সহজ হওয়ার জন্য যেন তিনি স্ত্রীর দিকে ট্রিবিউনটা এগিয়ে  দিয়ে বললেন– তুমি তো সকাল থেকে কাগজটাতে চোখ বুলানোর সময় পাওনি পুতু জল আনতে আনতে ওপরে ওপরে চোখ বুলিয়ে নাও।’

কিন্তু না গোস্বামীর সকাল বেলাটা পরিষ্কার হওয়ার  লক্ষণ দেখা গেল না, কারণ শ্রীমতী গোস্বামী গম্ভীর মুখটা আরও গম্ভীর করে বললেন ––’কোনো দরকার নেই আমার সকাল বেলা কোন ছেলে কোথায় মারা গেল, কার শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হল, কাকে শহীদ করা হল সেইসব পড়ে মরার। গণশ্রাদ্ধ করলেই, কাগজে ফোটো উঠলেই , মা-বাবাকে একগুচ্ছ টাকা উঠিয়ে দিলেই গেল হতভাগ্য পিতা মাতার পুত্রশোক  হালকা হবে। এই ধরনের যুবক ছেলেরা অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে শুরু করেছে, যার বুক খালি হয়ে গেছে সেই বুঝতে পারে পুত্রশোকে জিনিস কী জিনিস! আমাকে সেই মৃত্যুর খবর গুলি দেখাবেন না, আমার সহ্য হয় না। এভাবে জীবন বিসর্জন দিয়ে দিয়ে আমাদের সোনার অসমের ও  প্রয়োজন নেই।’

গোস্বামী মুখটা লজ্জিত ভাবে সরিয়ে নিতে চাইলেন।বাবার বিব্রত মুখটা দেখে রুণীর  মায়া জন্মাল।পরিবেশটা সহজ করার জন্য সেও চেষ্টা করল:বাবা, খবর জানতে হলে আমাদের খবরের কাগজ গুলি না পড়াই ভালো। সেদিন আমার একজন বন্ধুর দাদা একটা চাকরিতে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সময় তাকে নাকি জিজ্ঞেস করেছিল– আপনি কি খবরের কাগজ পড়েন? তিনি নাকি উত্তর দিয়েছিলেন যে এমনিতে সব সময় ‘দৈনিক  অসম পড়েন, কেবল ভারতের অন্যান্য জায়গা বা পৃথিবীর খবর জানার জন্য কখনও  কখনও স্টেটসমেনটা পড়েন।হাসির কথা নয় বাবা, এটা বর্তমান পরিস্থিতির একটি সত্য দিক। কিছুদিন আগে ‘অসম ত্রিবুন’ এ প্রকাশিত চেনিকুঠির কোনো  এক কে এস সুব্রামানিয়ামের একটি চিঠিরও আমি কাটিং রেখে দিয়েছি – তিনি সেই চিঠিতে সম্পাদককে এই বলে অভিনন্দন জানিয়েছেন যে ভারতের অন্যান্য ন্যাশনাল খবরের কাগজগুলি যখন বিভিন্ন খবরা-খবর পরিবেশন  করছে তখন ত্রিবুন কেবল অসমের সমস্যার উপরে সমস্ত গুরুত্ব আরোপ করে সেই সম্পর্কেই খবরা-খবর দিয়ে বড় প্রশংসার কাজ করছে। চিঠিতে নিশ্চয় ঠাট্টার সুরে লেখা নয়, হলে কি সম্পাদক আর তা প্রকাশ করতেন? চিঠি প্রকাশ করায় এদের অনেক বাছ বিচার – আমিতো কত চিঠি দিলাম তুমি জানো আমি ইংরেজিটা ভালোই লিখি, কথাগুলিও  ভালোই লিখি( লিখি না কি বাবা?) কিন্তু আমার কথা গুলিতে আন্দোলনের অন্ধ সমর্থন ছিল না বলেই নিশ্চয় প্রকাশ করল না- একেই  বোধহয় ‘নিখুঁত অসমিয়া গণতন্ত্র’ বলে আখ্যা দিতে পারা যায়–-‘

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত