| 2 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১) । নিরুপমা বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com‘অভিযাত্রী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি বিজেতা নিরুপমা বরগোহাঞি ১৯৩২ সনে গুয়াহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৫৪ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং ১৯৬৫ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ পাশ করেন। লেখিকার প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘এজন বুড়া মানুষ’, ‘এপারর ঘর সিপারর ঘর’ সহ মোট একুশটি উপন্যাস এবং ‘সতী’, ‘নিরুপমা বরগোহাঞির শ্রেষ্ঠ গল্প’ইত্যাদি দশটি গল্প সংকলন রয়েছে।


প্রথম খণ্ড

(১)

‘We have met the enemy,and he is us’—Walt Kelly

                                                              Subversive Sociological Cartoonist.

        চিরাচরিত নিয়মে গোস্বামী বাড়ি নেই, রমেশ কলিতার বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে,চিরাচরিত নিয়মেই রমেশ কলিতার বাড়িতে গোস্বামী, ধনঞ্জয় দত্ত এবং প্রশান্ত শহরীয়া কর্মহীন পেনশনারের সান্ধ্যবৈঠক বসিয়ে রাজা-উজির মারছে, বা আরও শুদ্ধ করে বলতে গেলে মন্ত্রীসভা ভাঙ্গছে-জোড়া লাগাচ্ছে।কথাটা তিক্ততার সঙ্গে ভাবলেন শ্রীমতী গোস্বামী।আজ কিছুদিন থেকে এই তিক্ততায় স্বামীর এই সান্ধ্যভ্রমণের কথা ভাবছেন তিনি। অথচ কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিক্ততায় ভাবা দূরের কথা, কোনো ধরনের রাগ-অনুরাগেই সন্ধ্য থেকে রাতের ভাত খাওয়া পর্যন্ত গোস্বামীর অনুপস্থিতির কথা তিনি ভাবতে পারতেন না। সকালে সূর্য ওঠে, সন্ধেবেলা অস্ত যায়-এই ধরনের চিরন্তন সত্যই যেন গোস্বামীর সান্ধ্যভ্রমণ তথা সান্ধ্য আড্ডা। অন্তত পেনশন পাওয়ার পরে পেনশন পাওয়ার আগে জু-রোডে নির্মাণ করা এই বাড়িটাতে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য মনস্থ করে দুই বছর আগে তা কার্যত পরিনত করার পর থেকেই গোস্বামীর এই রুটিনই চলে আসছে। সৌভাগ্যক্রমে গোস্বামী থেকে কিছুটা দূরে বাড়ি করেছে রমেশ কলিতা, তার সঙ্গে প্রায় এক সাথেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ আর প্রায় এক সঙ্গেই পেনশন পাওয়া কলিতার খুব বাতের ব্যথা। তাই কলিতা এক প্রকার অথর্ব,এইজন্য তাঁর অনুরোধে গোস্বামী এবং দত্তরা সন্ধ্যেবেলা কলিতার ঘরে মিলিত হয়। ধনঞ্জয় দত্ত এবং প্রশান্ত শহরীয়ার সঙ্গে রমেশ কলিতা এবং রসময় গোস্বামী অর্থাৎ শ্রীমতী গোস্বামীর স্বামী গোস্বামীর নতুন পরিচয় হয়েছে-প্রতিবেশী অন্য দুজন বয়োবৃ্দ্ধ পেনশনধারী ভদ্রলোক হিসেবেই এই পরিচয় আরম্ভ হয়ে বর্তমানে এক ধরনের  ঘনিষ্ঠতায় পরিচয় হয়েছে। অন্তত এই চারজন প্রৌঢ় পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে কথা বার্তা বলে এরকম একটি অকথিত মানসিক বোঝাবুঝিতে এসেছেন যে সন্ধেবেলা চারজন একত্রিত হয়ে দেশ বিদেশের নানা কথা আলোচনা করে সন্ধে থেকে ভাত খাওয়া পর্যন্ত সময়টুকু বিরক্তি ছাড়াই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, দিনের পর দিন এভাবে সন্ধেবেলা কাটিয়ে সেই দিনগুলি ক্রমে মাস, বছরে পর্যবসিত করতে করতে তারা একদিন মহাশূন্যের বুকে বিলীন হয়ে যাবার সেই বিশেষ দিনটার জন্য এগিয়ে যেতে পারে।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-১) । ডঃদীপক কুমার বরকাকতী


        পেনশনধারীর বিরক্তিকর সময়। স্বামীর এই দুর্ভোগটির কথা শ্রীমতী গোস্বামী সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করে দেখতে জানেন,কারণ তাকে তো সংসারের ঘানি টানতে টানতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়নি। সংসার চালানোর এই ঘানি মৃত্যুদিন পর্যন্ত মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মেছে বলে তাকে টেনে যেতে হবে, কিন্তু পুরুষের কর্মজীবনের ছেদ পড়ে স্বাভাবিক, নিয়মিত পরমায়ুযুক্ত একটা জীবনের মাঝ বয়সে না হলেও শেষ অধ্যায়ের অনেক আগেই। তাই সেই সময়টুকু একজন পুরুষের কাছে বড় জঞ্জালময় হয়ে পড়ে,অন্তত পেনশন পাওয়ার প্রথম অবস্থায়। গোস্বামীরও এরকম স্বাভাবিক অথচ শোচনীয় পরিণতির পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখতে পাওয়া শ্রীমতী গোস্বামী সেইজন্যই স্বামীর জীবনের এই নতুন আকর্ষণটির সন্দর্ভে এক ধরনের যেন স্বস্তির ভাবই অনুভব করেছিল, চিন্তার একটা ভার যেন তাঁর মনের কাঁধ থেকে খসে পড়েছিল। পুরুষের জন্য গৃহিণীর জননী, সখী,সচিব আদি যে কয়টি রূপ তার মধ্যে শ্রীমতী গোস্বামীর মাতৃরূপটিই যেন স্বামীর কাছে বিকশিত হয়ে উঠেছিল।আসলে বাৎসল্য রসই যেন তার জীবনের স্নেহ ফল্গুধারাটির সমস্ত ধারায় প্রাধান্য লাভ করে এসেছে-তাই অনিমা, অপু এবং রুণীমা তাঁর সন্তান হওয়ায় ওদের প্রতি তার যে ধরনের উদ্বেগ মিশ্রিত দায়িত্বশীলা মায়ের স্নেহ,প্রায় একই ধরনের উদ্বেগ এবং চিন্তা মিশ্রিত স্নেহ এবং প্রেমের এক সংমিশ্রিত মনোভাব স্বামীর প্রতিও, যে স্বামী তার চেয়ে বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও, শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মনে তাঁর সন্তানের মতোই প্রায় অসহায় এবং স্নেহ-প্রশ্রয়ের যোগ্য।

       তাই  গোস্বামী যখন একটি সান্ধ্য আড্ডায় সারাদিনের জন্য নিমজ্জমান হয়ে পেনশনধারী জীবনের ভার লঘু করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল,তখন শ্রীমতী গোস্বামীও স্বামী চিন্তা থেকে অবকাশ লাভ করে মনের তদ্রূপ এক লঘু ভাবেই সন্ধেবেলা ভাতের হাড়িতে আগুন দিতে পারছিল।

        কিন্তু গত কিছুদিন থেকে পরিস্থিতি থেকে কিছুটা আলাদা হয়েছে।সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত বহন করে যাওয়া সংসারের আগের গতানুগতিক হালকা বোঝাটা এখন শ্রীমতী গোস্বামীর কাছে দুর্বিষহ বোঝায় পরিণত হয়েছে, এখন যেন তিনি আর বোঝাটা একা বইতে পারছেন না, কারণ এখন রাতের রান্নাবাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপু এবং রুণীর তর্ক যুদ্ধটা তার মনে বহন করে আনা বিরাট এক মানসিক অশান্তির বোঝা। আজ কিছুদিন থেকে এই দুই ভাই বোন বুনো মোষের মতো লড়াই করে চলেছে-অবশ্য হাতাহাতি বা চুলোচুলি হয়নি-যে হাতাহাতি চুলোচুলি লেগেছিল তিন বছরের ব্যবধানের পরস্পরের প্রতি একান্ত অনুরক্ত ভাই-বোনের শৈশবে। সে যাই হোক না কেন, এখন অপু আর রুণীর মায়ের মুশকিল হল এই যে ওদের বাবা ঘরে থাকার সময় ওরা যুদ্ধ আরম্ভ করে না, আরম্ভ করে বাবা বেরিয়ে যাবার পরে এবং ওরা বাড়ি প্রবেশ করার পরে। দুজনে কলেজ থেকেই হোক বা অন্য জায়গায় ঘোরাঘুরির পরেই হোক, বাড়ি পৌছানোর পরেই শুরু হয়ে যায় সেই ঝগড়া।   

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত