| 1 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ গল্প: দুর্গার ডায়েরি । প্রণতি গোস্বামী

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

মূল অসমিয়া থেকে বাংলায় অনুবাদ-বাসুদেব দাস

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,assamese storyলেখকপরিচিতি-১৯৫৩ সনে অসমের উত্তর লক্ষ্ণী্মপুরের জামগুরিতে প্রণতি গোস্বামীর জন্ম হয়।কলেজ জীবন শেষ করে ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।ছোটগল্প ছাড়াও বেশ কিছু উপন্যাসের রচয়িতা।প্রকাশিত গল্প সংকলনগুলি যথাক্রমে‘সুমনরমা’,’গান্ধারীরদরে’,’নির্বাচিত গল্প’ ইত্যাদি। এছাড়া দুটি শিশুসাহিত্যের গ্রন্থও রয়েছে।


অবিনাশ কার্পেটের ওপরে পদ্মাসনে প্রাণায়াম করতে বসেছিল। ভোরবেলা । তার সামনে রাস্তার ওপারে লাইটপোস্ট। লাইটটা আজকাল আর জ্বলে না। কতদিন ধরে জ্বলছে না সে খেয়ালকরেনি। সন্ধ‍্যেবেলা থেকে প্রতিটি মানুষের বাড়ির সামনে থেকে বের হওয়া এবং ভেতরে প্রবেশ করা গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলের হেড লাইটের আলো রাস্তাটাকে অন্ধকার হতে দেয় না। অবশ্য রাত সাড়ে এগারোটা বারোটা বাজার পর থেকে গাড়ি বের হওয়া বা ভেতরে ঢোকার পরিমাণ কমে যায়। পৌরনিগমের খারাপ হয়ে যাওয়া বাল্ব অথবা ইলেকশনে পরাজিত প্রার্থীররেজাল্টের পরে পর্যন্ত ঝুলে থাকা হোর্ডিং একই কথা ।কিন্তু সেই লাইটপোস্ট সংলগ্ন কয়েকটি তার কয়েকটি কাককে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার সুবিধা করে দিয়েছে। এটাই উপকার ।ঠিক বিশ্রাম নয়, রাতটা বিশ্রাম নেবার পরে নিজেকে ওয়ার্ম আপ করে। সেই সময়হয়তো তারা কর্ম নির্ধারণ অথবা দিক নির্ধারণ করে নেয়। প্রথম যখন একটি কাক আসে তখন অন্ধকার মিশ্রিত আলো এবং কুয়াশাকাকটিকে প্রায় ঢেকে রাখে । অনেক কষ্টে কাকটাকে চিনতে পারা যায়। তারপরে এক এক করে ছয়টা কাক এসে জড়োহয় । শেষের কাকটা আসার সময় কতটা আলো হবে অথবা কটা বাজবে অবিনাশ বলে দিতে পারে।

             অবিনাশের অবজারভেশন একেবারে শুদ্ধ। প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড গুলি সত্যি সময়মতোচলে।ছয় নম্বর কাকটি যখন আসে ,পাশের কোনো একটি বাড়ির রেডিওতে কেন্দ্র খোলার মিউজিক বাজতেথাকে।বাড়িটাতে আকাশবাণী গুয়াহাটিতে কাজ করা একজন কর্মচারী থাকেন ।না হলে কে সকালবেলায় বন্দনা শোনাবে! 

কাকগুলি কিন্তু একই দিকে মুখ করে বসে না। কিছুক্ষণ পরে ডিউটি যেন ভাগ করে দেওয়াহয়েছে এভাবে দিকে দিকে কাকগুলি উড়েযায় ।

এখন তারে তিনটি কাক বসে আছে ।কাকগুলিকে দেখা যাচ্ছে ।কেবল কাকই নয়, দূরের অস্পষ্ট পাহাড়টা, পাহাড়ের ওপরে ছড়িয়ে থাকা ঘরগুলি স্পষ্ট হয়ে আসছে ।

অবিনাশ দীর্ঘশ্বাসটা নিতে গিয়েহঠাৎ ছেড়ে দেয় ।একঝাঁক বাতাস বয়ে এসেছিল। কিন্তু বাতাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ । টক টক,পচা গলা ।গলিটা যেখানে মিলিত হয়েছে সেই রাস্তার পাশে থাকা ডাস্টবিনটা তার ঘরের বেলকনি থেকে দেখা যায়।ডাস্টবিনের বাইরের এক বিস্তীর্ণ এলাকা নানারকম আবর্জনা ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা উচ্ছিষ্ট ,লাল নীল পলিথিন,খালি বোতল , ডিবের রূপ রঙ,রস গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে একটি জীর্ণশীর্ণ কুকুর প্রাতঃভোজের অনুসন্ধান করছে ।একটা কাক লাফিয়েলাফিয়ে সেই বিস্তীর্ণ এলাকার কেন্দ্রবিন্দু ডাস্টবিনটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।আশ্চর্যের কথা, খালি প্লাস্টিকের বোতলের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো দুটি ছেলেও উপস্থিত হয়েছে । মলিনশাড়ি পরা, পাগলিরমতোমহিলাটিকে অবিনাশের পরে  চোখে পড়েছে । কারণ তার দুই হাত এবং ঝাঁকড়া চুলের মাথাটা ডাস্টবিনের ওপরে উবুড় হয়ে পড়েছিল ।ছোট ছেলে দুটি বাইরে পড়ে থাকা দুটি মাত্র বোতল পেয়ে বস্তায় ভরে নিয়েছে ।কাকটাএকটুকরো রুটি পা এবং ঠোঁটের সাহায্যে ছেঁড়ার চেষ্টা করছে।কালো রঙের কুকুরটা পছন্দের ব্রেকফাস্টপায় নি বোধহয় । অন্য একটি কালো কুকুর পলিথিনেরব্যাগটায় মাথাটা ঢুকানোর চেষ্টা করছে। সে যতই চেষ্টা করে পলিথিনেরপ্যাকেটের ভেতরে থাকা পদার্থগুলি চাটবার,ততই ব্যাগটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।গন্ধটা মনোরম। কালো কুকুরটা ব্যর্থ হয়ে সেই চেষ্টা বাদ দিল আর নাকের আশেপাশে লেগে থাকা খাদ্য কণিকা জিহ্বাদিয়েচেটেনেবার চেষ্টা করল। নাগাল না পাওয়া কিছু হলদে পদার্থ কিছুটা নাকে লেগে রইল । ঠোঁট চেটে সে পা দিয়ে চেপে ধরে ঠোঁট দিয়েছিড়েছিড়ে মহা আরামে রুটি ভক্ষণ করতে থাকা কাকটার দিকে পির পির করে তাকাতে লাগল। কিন্তু কাকটাকে আক্রমণ করার মতোকুকুরটার শক্তি বা উদ্যোগ বা সাহস কোনোটাই নেই । সে জানে সে তাড়িয়ে দিলে কাকটা হয়তোউড়ে চলে যাবে । কিন্তু ঠোঁটে করে রুটিটা নিয়ে যাবে । ইতিমধ্যে অন্য একটি কাক উড়ে এসেছে এবং রুটি খেতে থাকা কাকটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।

পেয়েছে। ডাস্টবিনেমানুষটা কিছু একটা পেয়েছে। নীল রঙের পলিথিন না কাপড়েরপুঁটলিটানিয়ে এসে সেখান থেকে দ্রুত সরে এল। বোতল কুড়োনো একটি ছেলে ‘এই দিদি কী পেলি কী পেলি’বলে তার চেয়ে দীর্ঘ একটি বস্তা পিঠে ফেলে পেছনপেছন কয়েক পা এগিয়ে গেল।কিন্তু সঙ্গের ছেলেটা তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করল–এই এই চলে আয় বিলাল।ও কী পেয়েছে তা দেখে লাভ নেই । ওতে বোমা ও থাকে।বুঝবে ঠেলা।

দুজনেই পুনরায় বোতল খুঁজে দেখতে লাগল। দিদি বলে সম্বোধন করা পাগলীর মতো দেখতে মেয়েটি নীল রঙের পুঁটলিটা বুকের মাঝে চেপে ধরে শুকনো খড়ির মতো দুটো পা নিয়েদৌড়াতে শুরু করল। হয়তোবাসিলোফ, পুরোনো কেক হতে পারে। এই কয়েকদিন ধরে যা লোডশেডিং ফ্রিজে থাকা খাবার জিনিস ও খারাপ হয়ে যায় । ডাস্টবিনেছুঁড়ে ফেলতে হয় । কখনও ধনীরবাড়িতে কোনো পার্টিতে প্রয়োজনের চেয়েবেশি জিনিস আনা হয় । কী বিচিত্র এই পৃথিবী– কেউ না খেয়ে মরে আবার কেউ খেতে না পেরে ফেলে দেয়।

ইতিমধ্যে রাজপথে দুই একটি ছোটখাটোগাড়ি চলতে শুরু করেছে। বাজারে শাকসব্জি,মুরগি বহন করা গাড়ি, দুধের গাড়ি ইত্যাদি আসছে। সেই গাড়িগুলিমাঝেমধ্যে পাগলীর মতো মনে হওয়া মানুষটিকে অবিনাশের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দেয়। পুনরায় উঁকি দেয়। কাজের খোঁজে রাস্তায়বেরোনো কিছু শ্রমিক তার দিকে আড়চোখেতাকায়।

একসময় বড় বড়বাড়িগুলিমানুষটাকে অবিনাশের কাছ থেকে একেবারে আড়াল করে দেয়। কোনো চৌরাস্তা বা তেরাস্তাদিয়ে সে পথ পরিবর্তন করেছে । অবিনাশ প্রাতঃকার্যের জন্য তৈরি হল। সেই আধা পাগলী অথবা ডাস্টবিন থেকে নেওয়াপুঁটিলিটা তার মন থেকে সরে গেল। 

(২)

বেশ কিছুদূরদৌড়ানোর পরে তার গতি স্বাভাবিক হল। না স্বাভাবিক থেকে একটু দ্রুত। সে পুঁটলিটা থেকে বেরিয়ে থাকা মাথাটা একবার দেখল এবং অধিক জোরে বুকে জড়িয়ে ধরল। একটা দুটো দোকান খুলেছে। খোলা দোকান অথবা খোলা গৃহস্থ ঘরের দিকে চোখ রেখে সে এগিয়ে গেল। সেখানে পথের দু’পাশে দোকান বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বেশি আর আছে বিভিন্ন প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড থাকা ঘর ওপরে নিচের মহলে হয়তো ফার্মেসি। গৃহস্থ ঘর আছে যদিও সেইসব দুই তিন মহলের ওপরে। নিচের তলাগুলি এভাবে রয়েছে যে সহজে চোখে পড়ে না। সে আকুল হয়ে এদিকে ওদিকে মানুষের খোঁজ করল। এত সকালে কোনো মানুষ তাকে দেখতে পাবে একান্ত প্রয়োজনে এদিকে ওদিকে যাওয়া ছাড়া বা টিউশুনিতে যাওয়া ছেলে মেয়েছাড়া?

তার কোল থেকে বিড়ালের ডাকের মতো একটা ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে তার বুকটা কেঁপে উঠছে। সে ক্ষুধায়ডাস্টবিনে হাত ঢুকিয়ে ছিল এবং তার হাতে উঠে এল একটি ক্ষুধার্ত প্রাণী। একটি সদ্যোজাত শিশু। শিশুটি ছেলে না মেয়ে সে এখনও দেখে নি। ইস সে এখন ও দেখেনি। যেতে যেতে সে শিশুটিরগায়ের ওপর থেকে কাপড়ের আবরণটা সরিয়ে দেখল– মেয়ে।

একজন দোকানি স্নান করে দোকানের সমস্ত জিনিসের দিকে ধূপধুনোজ্বালিয়ে দরজার দিকে থাকা গনেশ দেবতার কাছে স্থাপিত করেছে এবং দোকানের একজন কর্মচারী বারান্দা থেকে রাস্তা পর্যন্ত একটা ঘটি থেকে জল ছিটিয়ে চলেছে। জলের ছিটে রাস্তা দিয়ে যেতে থাকা একটি মানুষের শরীরেও পড়েছে। এটাই ভালো সময়– শিশুদের জন্য নিশ্চয় কিছু একটা দেবে। শিশুটিকাঁদছে। পৃথিবীতে আসার পরে তার ঠোটেএকফোঁটা অমৃত পড়েনি। ধূপজ্বালিয়ে একটা দীর্ঘ প্রণাম করার পরে দোকানি তাকে দেখতে পেল। বড় ভালো সময়। সে ভাবল, নিশ্চয়শিশুটিকে কিছু একটা দিয়েপুণ‍্য অর্জন করবে। সে হাত পাতল। দোকান মাত্র খুলেছে, বিক্রি আরম্ভ করে নি। মানুষটাকে কিছু দেওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবল দোকানি। কে জানে হয়তোগনেশ বাবার ইচ্ছা, তাকে পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছে। দুটাকার একটা মুদ্রা ছুড়ে দিল। হাত পেতে নিয়েমেয়েটি বলল– দুধ চাই, বাচ্চাটা খেতে পায়নি।

হার্ডওয়ারের দোকানে কোথায় দুধ পাবি? যা ভাগ।

সে এগিয়ে গেল । একজন মাড়োয়ারিব্যবসায়ী স্টিলের গ্লাসে চা খাচ্ছিল। তলানির চা টুকু ছুঁড়ে দেওয়ায় গরম চা তার পায়ে পড়ল। এই চা টুকু যদি তার বেগের বাটিটাতে দিত বাচ্চাটার ঠোঁট দুটি ভেজাতে পারত। কোথাও রেডিওতে লোকগীতি বাজছে–

কিনো তই অভাগীয়া জনম লভিলা

জনমিয়ামাতৃস্তনখাইবাক না পাইলা

যেন গীতর তালে তালে সে হেঁটে চলেছে।

(৩)

মেয়েটির জ্বর।কী জ্বর প্রতিবেশীরা জানে না। জানেনা মানে মেয়েটি ঘরেই থাকে না কোথাও হোস্টেলে থাকে প্রতিবেশীরা তাও জানে না। কে কার খবর রাখে! আজকাল প্রতিবেশীদের থেকে ফেসবুকের প্রতিবেশীরাই বেশি আপন। ফেসবুকে বন্ধু হয়, মিলন হয়, বিচ্ছেদ হয়, সর্বহারাওহয়। তাদের আদরের একমাত্র মেয়েটির জ্বর। কালরাতেনার্সিংহোম থেকে এনেছে। নিজের ঘরে শুয়েরয়েছে। তার কাছে কাউকে যেতে দেওয়াহয়নি। সকালবেলা ঘর ঝাড়ু দিতে আসা মহিলাটিকেও সে রুমঝাড়ু দিতে বা পরিষ্কার করতে দেয়নি। নিজে ঝাড়ু দিয়ে দিয়েছে। সকালবেলা মেয়েটিকে এক কাপ চা দিতে এসে মা রাস্তার দিকের জানালাটা খুলে ভারী পর্দাটা গুটিয়ে দিল। জালিকাটা পর্দার ওপর দিয়ে কিছু দূরে রাস্তার দিকে তাকাতে পাগলী বলে মনে হওয়া মানুষটার চোখে চোখ পড়ল। জানানা খোলার শব্দে মানুষটিআশা নিয়ে জানালার দিকে তাকাল– ও মা কিছু একটা দিবি। বাচ্চাটা কিছুই খেতে পায়নি।

— না,না এখান থেকে ভাগ। কোথা থেকে বাচ্চা পেলি, কেই বা তার বাপ কে জানে!

বাটিটা এগিয়েদিয়ে পুনরায় বলল– একটু দুধ। নাহলে বাচ্চাটা মরে যাবে।

দুধ নেই যা ভাগ। বাচ্চা এনেছিস। মা হয়ে একটু দুধ খাওয়াতে পারছিস না। তোর নয় নাকি?

হঠাৎ অসুস্থ মেয়েটির মায়ের রাস্তার মহিলাটির কোলের দিকে চোখ গেল। সেই টাওয়েলটা তিনি চিনতে পেরেছেন। সেই নতুন টাওয়েলটা এই আধা পাগলীর পক্ষে যোগাড় করা কোনো মতেই সম্ভব নয়।

এই, তুই এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যা। না হলে কুকুর লেলিয়ে দেব। গেলি এখন থেকে। আজ থেকে এদিকে আর কখনও আসবি না।

কুকুরের নাম শুনে মহিলাটি সেখান থেকে চলে গেল।

ইস মা, খুব ব্যথা করছে। বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে, খেলে একটু আরাম পেতাম না কি মা? কোথাকার শিশু ওটাকেইএকটু নিয়েআয়তো।

মায়ের শরীরে কম্পন উঠেছে। চার দিকে তাকিয়ে বলল– নাই চলে গেছে।

শিশুটির আসল মায়ের দুধের ভরে জমাট বেঁধেছে, ব্যথায় জ্বর উঠেছে এদিকে শিশুটি এক ফোঁটা দুধের অভাবে কান্নার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে।

মানুষটা একই পথে ফিরে এল–’ কাঁদিস না বাছা, ভগবান যখন আমার হাত দিয়েছে, তোকে আমার বাঁচাতেই হবে।

রেডিওতে শোনা গানটা শেষ হয়নি–’ কিনু তই অভাগীয়া জনম লভিলা…

(৪)

বেটা তোমার দুধ খাওয়া হয়েছে কি? রান্নাঘর থেকে মা চিৎকার করে বলল।

খাচ্ছি মা। বিস্কুটটা টুকরো করে মাঝখানের ক্রিমটা চাটতে চাটতে নিহাল বলল।

জলদি খেয়ে নাও, দেরি হয়ে যাবে। আমি তোমাকে স্কুল বাসে উঠিয়েদিয়ে অফিস পৌঁছাতে হবে।

হয়ে গেছে ।তুমি চিন্তা কর না। তুমি বাথরুমে যাও। তুমি বের হওয়ার পরে আমি স্নান করে রেডি হয়ে যাব। দুধের বাটিটা নাড়াতে নাড়াতে চোখে দুষ্টুমি নিয়ে নিহাল বলল।

মা বাথরুমে ঢুকেছে। সে এই সময়টুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে হাতে দুধের কাপটা নিয়েছাদে উঠে গেল। সে সব সময় মা বাথরুমে যাবার সুযোগে উপরে উঠে গিয়ে দুধটা ধীরে ধীরে ঢেলে দেয় এবং নিচের বারান্দায়শুয়ে থাকা বিড়ালটা পাকা থেকে চেটেচেটেখায়। নিহাল এবং বিড়ালটির মধ্যে যেন একটা বোঝাপড়া আছে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দুধ ঢালতে যেতেই বিড়ালটারচেয়েও আগে নিচের মানুষটার চোখে পড়ল। সে বুঝতে পারল ছেলেটি এখনই কিছু একটা নিচে ঢালবে । নিশ্চয়ই খাওয়ার জিনিস হবে । হাতে থাকা নোংরা বাটিটা পেতে ধরল যাতে সে ঢালতে চাওয়া জিনিসগুলির কিছুটা অন্তত বাটিতে পড়ে ।

এটা একটা সুন্দর খেলা হবে। সে ওপর থেকে ঢেলে দেবে আর নিচের ভিখারীটা ক্যাচ ধরবে । পারবে কিনা দেখা যাক । সে ঢালতে যেতেই শিশুটার চোখ পড়ল। তার ছোট্ট মনটি কিছু একটা বুঝতে পারল। নিচে নেমে গিয়ে সে দরজার মুখে দাঁড়াল। মহিলাটি দ্রুত সেদিকেএগিয়ে এল। সে বাটিতে দুধটুকু ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষণ শিশুটির দিকে তাকিয়েরইল। মহিলাটি দ্রুত সরে গিয়ে নিরাপদ জায়গায় পথের পাশে মাটিতে লেপ্টে বসে নিল এবং মলিনশাড়িরএকপ্রান্ত দুধে ভিজিয়েশিশুটির মুখে দিল । শিশুটি প্রথমে ঠোট দুটি ফাঁক করল না । তারপরেআড়মোড়া ভাঙ্গার মতো করল। ঠোটের ভেতর থেকে দুধটুকুবেরিয়ে এল।

তার একটু দূরেই সিটি বাসের স্টপেজ। সকালের দিকেই এতটাভিড় নেই। অবিনাশ এবং আরও দুই-একজন অপেক্ষা করছিল। তার চোখ টিভির দোকানে চলতে থাকা টিভির পর্দায় মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকালবেলা সে টিভির নিউজ দেখার সময়পায়না। একটা রক্তাক্ত মোটাসোটা শিশু। টিভির পর্দা থেকে সরে গেছে শিশুটি। গাজা স্ট্রিপের না বি টি এডির সে বুঝতে পারল না। বাস দাঁড়াতেই সে উঠে পড়ল । আপন-মনে শিশুটিকে দুধ খাওয়াতে থাকা মহিলাটির পাশ দিয়েই সে বাসে উঠে পড়ল ।  

তখনই শিশুটিকেশাড়ির আঁচল ভিজিয়ে ভিজিয়ে দুধ খাওয়ানোরসময় নিজের চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়েপড়ল– হয়তো মাতৃস্নেহ বিগলিত চোখের জল অথবা শিশুটির দুর্ভাগ্যে দুঃখি হয়ে। মহিলাটিরহয়তো মনে জাগছে কীভাগ্য, কী ভাগ্য নিয়েএসেছিস তুই? তোর জন্য মার বুকের একটুকু দুধ নেই।কে তোর মা? কেন ফেলে দিয়েছে ঘরের সন্তান। হয়তো এসব কিছুই ভাববার মতো মগজ সুস্থ নয় । শিশু তার হাতে অল্প দুধ খেয়েছে এটাই তার আনন্দ। সভ্য পৃথিবীতে যোগ্য মানুষ হতে না পারা মহিলাটির একটি অসহায় শিশুকে জীবন দেওয়ার কার্য হয়তো তাকে সামান্য হলেও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে– তারই চোখের জল এটা।

মহিলাটিকে পাশ কাটিয়ে রাস্তার লোকজন আসা-যাওয়া করছে । পায়ে চলা পথে মানুষের ব্যস্ততা, পথে-ঘাটে যানবাহনেরভিড় এবং কোলাহল বেড়ে গেল। কোনো একজন পার হয়ে যাবার সময় তার দিকে তাকায়। অপেক্ষা করার মতো কারো সময় নেই।

রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা চুড়িদার পরা একজন মহিলা তারদিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছিল। মহিলাটির চোখ এবার রাস্তায় একবার শিশুটিকেখাওয়াতে থাকা মহিলাটির ওপরে।

একটা খালি রিক্সা আসে, মহিলাটি এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে– এই রিক্সা।

ভাড়া আছে। উৎসাহেপেডেল মেরে রিক্সাওলাএগিয়েযায়।

এইবার রিক্সার জন্য পথ চেয়ে থাকা মহিলাটি শিশুটিকে দুধ খাওয়াতে থাকা ভিখারি জাতীয় মহিলাটির কাছাকাছি গিয়ে বলল–’ কার শিশু? তোমার বলে তো মনে হচ্ছে না!

আধা পাগলী হলেও মহিলাটি বুঝতে পারল একমাথা কালো চুল থাকা আদর করতে ইচ্ছা করা শিশুটি যে তার নয় তা মহিলাটিবুঝতে পেরেছে।

 আমার নয় দিদি, আমার বোনের বাচ্চা। জন্মদিয়েবোন মারা গেছে। ওকে নিয়ে কী করব? কে দেখাশোনা করবে?

মহিলাটির এবার হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে দিল্লিতে পড়তে যাওয়া প্রিয়ার কথা মনে পড়ল। মহিলাটির বোনেরও রিয়াকে জন্ম দিয়েই মৃত্যু হয়েছিল। ডাক্তার তাকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিল তার পক্ষে মাতৃ হওয়াটা কতটা বিপজ্জনক। সে মানল না। মা হওয়ার তার এতই ইচ্ছা। রিয়াকেওমহিলাটি বড় যত্ন করে লালন পালন করেছিল।

চুড়িদার পরা মোটাসোটা মহিলাটি ব্যাগ থেকে খুঁজে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করলেন এবং তার কোলের দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন–বাচ্চাটিকে কিছু একটা কিনে দিস।

মহিলাটি দ্রুত একটা খালি অটো পেয়ে চলে গেলেন। শিশুকে খাওয়াতে থাকা মহিলাটি স্থির হয়ে তাকিয়েরইল।

মহিলাটি শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখা দুই টাকার একটি মুদ্রা বের করল এবং তার জায়গায় পঞ্চাশ টাকাটা ভাঁজ করে গিঁট দিয়ে রাখল। তাকে তো কিছু একটা খেতে হবে।সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। শিশুটি ঘুমিয়ে পড়েছে।


আরো পড়ুন: অসমিয়া অনুবাদ গল্প: স্বর্গযাত্ৰা । অজন্তা


(৫)

একটা দোকান। বড় বড় কাঁচের বোতলে বিভিন্ন আকৃতির বিস্কুট।সারি সারি সাজিয়ে রাখা আছে। পাউরুটি, কেক, ঝুলে আছে বিভিন্ন রংয়েরপ্যাকেটে। তার মধ্যে নানা রকমের চিপস রয়েছে। উঁচু টুলটিতে বসে থাকা টুপি এবং লুঙ্গি পরা দোকানি হাজি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছে। হাজী সাহেব পুরোনো গ্রাহক। কিছুদিন ছিল না। বিবির সঙ্গে মক্কা গিয়েছিল। দোকানির কাছে তারই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছে। জিনিসপত্র ওজন করতে করতেছেলেটি কথাও শুনছে, মালপত্রও ওজন করছে।

কথা শুনছে যদিও দোকানির চোখ একবার জিনিসপত্র ওজন করা ছেলেটির দিকে আরেকবার কাচের বোতল গুলির ওপারে থাকা মহিলাটির দিকে। বেঁটেখাটো মহিলাটির ঝাঁকড়া মাথাটাই কেবল দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ভিখারি। এখন ও পর্যন্ত কিছু চেয়ে হাত পাতেনি যদিও মতলব বোঝা যাচ্ছে না। কখনও সুযোগ বুঝে এই ধরনের মহিলারা একটা পাউরুটি বা আলু পেঁয়াজনিয়ে চলে যায়।

কী চাই?

মহিলাটি বোতলগুলির আলমারির ওপার থেকে এসে দরজার মুখে পা রাখল। হাজী সাহেবের আতরের গন্ধে সমস্ত জায়গাটা ম ম করছিল। এখন দরজার সামনে একটা দুর্গন্ধ দেখা দিল। ডাস্টবিনে নোংরা খুঁজতে থাকা মানুষের, স্নান করার, কাপড়ধোয়ার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা মানুষের শরীর থেকে কি আর সুগন্ধ বের হবে?

দোকানি তাকে দ্রুত বিদায় করার জন্য সিন্দুক থেকে একটা খুচরা পয়সা বের করে আনতেই মহিলাটিমলিন হাতে দু টাকার মুদ্রাটা এগিয়ে দিল। মানুষগুলি অবাক হল- মহিলাটি বা হাতে একটা ছোট বাচ্চা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।

এবার খুচরো পয়সাটা জায়গায় রেখে দিয়ে বোতল থেকে একটা বড় আকারের বিস্কুট বের করে দিল। দোকানি বুঝতে পারল মহিলাটির ক্ষুধা পেয়েছে।

দোকানির দিকে এগিয়েদেওয়া পয়সাটা লাগবে না বলে হাত দিয়ে ইশারা করে দোকানি হাজী সাহেবের সঙ্গে কথায় মশগুল হল। মহিলাটির পদক্ষেপ গুলি এমনিতেও লম্বা। পাদুটি শুকনো খড়ির মতো। বিস্কুট চিবোতেচিবোতে সে যেতে থাকল। একমুঠো খাদ্য যোগাড় করাই যদিও দিনটির মধ্যে তার লক্ষ‍্য এখন সে নিজের বাসস্থানে যেতে চাইল। ওভার ব্রিজটা যেখানে শেষ হয়েছেগাড়ি মোটর, মানুষজন প্রবেশ না করার সেই কোণটিতে তার থাকার জায়গা। চালার দরকার নেই, একপাশে পলিথিনদিয়ে ঢাকা আছে।

কিন্তু পথেই একজনের সঙ্গে দেখা হল। শিশুটিকেনিয়ে যাওয়া মানুষটারকাপড়চোপড়, ইচ্ছা হলে কথা বলা, ইচ্ছা না হলে কথা না বলা স্বভাবটির জন্য লোকেরা যেমন তাকে পাগলী বলে,সে মুখোমুখি হওয়া এই বুড়ি বলার মতো মহিলাটিকে পাগলী বলে না। তার পরনের মেখেলা- চাদর পুরোনো হলেও পরিষ্কার। তার জীবিকা আলাদা আলাদা। ভিক্ষা করে, রোগজীর্ণশিশুদের,মেয়েলি অসুখে বিভিন্ন ওষুধ পত্র, সময়েসময়ে পুরুষ মানুষকে বশীকরণের উপায়ও বলে দেয়। চুরিও করে। কখনও কখনও বাইরে মেলে রাখা কাপড়, দরজার মুখে খুলে রাখা স্যান্ডেল নাই হয়ে যায়।

‘ এই তুই কোথায় পেলি এটাকে? দীর্ঘ কালো বুড়িমানুষটাশিশুটিকেনিয়ে যাওয়া মহিলাটিকেজিজ্ঞেস করল।

আধা পাগলী কোনো উত্তর না দিয়ে পার হয়ে গেল। মানুষটা পুনরায় জিজ্ঞেস করল–’ এই কিছু একটা জিজ্ঞেস করছি, উত্তর দিচ্ছিস না কেন?

বুড়ি শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া মানুষটার পেছন পেছন এসে পথরোধ করে দাঁড়াল– আমি জানি এটা তোর নিজের বাচ্চা নয়। তোকে আমি সেদিনও দেখেছি, বাচ্চার জন্ম দেওয়া চেহারা তোর নয় । তুই কোথাও নিশ্চয় এটাকে পেয়েছিস। পুলিশ কেস হতে পারে এটা জানিস তো?

পথরোধ করে দাঁড়ানোবুড়িটিকেএকপাশ দিয়ে অতিক্রম করে সে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল। বুড়িচিৎকার করতে থাকল– সে কোথাও থেকে শিশুটিকেকুড়িয়ে এনেছে! এখন শিশুটিকেদেখিয়েদেখিয়ে ভিক্ষা করবে। শিশুটিকে দেখলে ভিক্ষা দিতে না চাওয়া মানুষেও দেবে।

বুড়ি যেন ঈর্ষায়জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগল। কিছুক্ষণ একা একা বসে থেকে আবার এগিয়ে যেতে লাগল।

ব্যস্ত রাস্তায় এটা কোনো দেখার মতো দৃশ্য নয়। দুপুরের গরম।

(৬)

দুপুরবেলাটা সে ওভারব্রিজের কোণে নিজের ঘরেই রইল। অন্যদিনেরমতো হোটেল থেকে একথালাপুরোনো ভাত এনে খেল। কিন্তু শিশুটি পুনরায় কাঁদতে শুরু করায় সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। কারো কাছ থেকে ধার করে এনে একটু দুধ খাওয়াবে। ততক্ষণে বেলা পড়ে এসেছে। টুপি এবং পাজামা পরে মানুষগুলি মসজিদের দিকে যেতে শুরু করেছে।

হাতে হাতে জিনিসপত্র নিয়ে এসে কিছু লোক একটা গাছের আশেপাশে দাঁড়িয়েছে। এরা সব কোথাও থেকে পুলিশ উচ্ছেদ করা মানুষ। হয়তো তারা রেললাইনের পাশে ছিল। ওদের মধ্যে বুড়ি এবং ছোট ছোট ছেলে মেয়েও আছে। ছেলে মেয়েদের কয়েকজন ওদের মাথায় কত বড় বিপদ এসে পড়েছে বুঝতে পারছে না। এটাকে হয়তো একটা অ্যাডভেঞ্চার বলেই ভাবছে। তাই তারা সিনেমা থিয়েটারের হোর্ডিং এবং রাস্তার মানুষ দেখে নীরব হয়ে পড়েছে। দুয়েকজন তো কোথাও বাজতে থাকা গানের তালে তালে নাচতে শুরু করেছে।

       পাগলী বলে মনে হওয়ামানুষটি দেখল একজন মানুষ মাটিতে বসে নিয়েশিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। খাওয়ার আনন্দে চঞ্চল পাদুটিদিয়েশিশুটি মাকে লাথি মারছে। পাগলী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়েরইল । মানুষটার শিশু না খাওয়ার দিক দিয়ে দুধ বেরিয়ে আসছে ।

– কি দেখছ? শিশুটি ছেলে না মেয়ে? 

– মেয়ে।

– কী নাম রেখেছ?

পাগলী নামের কথাটা চিন্তাই করেনি। কারও বাড়িতে কালী পুজো আছে। একজন ঠেলায় করে কালী মূর্তি নিয়ে যাচ্ছে। পাগলী ভাবল নামটা কালী রাখলে কেমন হয়। না, শিশুটি কালো নয়, ফর্সা। তাহলে দুর্গা।

এর নাম দুর্গা। পাগলী বলল। অর্থাৎ নামকরণ হয়ে গেল।

– দুধ খেতে পাচ্ছে কি?

মেয়েটি আমার নয়, আবর্জনার মধ্যে পেয়েছি। মানুষটাকে বিশ্বাস করা যেতে পারে ভেবে পাগলি বলল।

শিশুটি আবার কাঁদতে লাগল। কোনো কথা বিনিময় না করেই মানুষটাশিশুটির দিকে হাত এগিয়ে দিল। পাগলী ও কুঁজো হয়ে বসে থাকা মানুষটার হাতে শিশুটিকে তুলে দিল। নিজের শিশুটিকে পাশেই চুলকাতে থাকে দিদির কাছে দিয়ে নতুন শিশুটিকে দুধ খাওয়াতে লাগল। দৃশ্যটা পাগলি দেখে মুগ্ধ হল।

– তুই এটাকে বাঁচাতে পারবি কি?

– সীতা মাইয়াকে তো ভগবান বাঁচিয়ে ছিল।

শিশুটি দুধ খেয়েঘুমিয়েপড়ল। ঘুমেরমধ্যেও খেতে থাকল।

কী করবি! ভগবান আমাদের থাকার জন্য একটা জায়গাও দেয় না। পুলিশ আমাদের বস্তির ঘর দুয়ার সব ভেঙ্গেদিয়েছে। মানুষটা দুঃখের কথা বলল। তারপর সুর পরিবর্তন করে বলল–’ একটা কাজ করে দিতে পারবি। এক বোতল জল এনে দে। কথাটা বলে একটা মলিন বোতল এগিয়ে দিল।

পারবে ।কেন পারবে না। দুর্গাকে মানুষটা দুধ দিয়েছে। মানুষটা কেবল এক বোতল জল চেয়েছে।

পাগলী বলে মনে হওয়া মানুষটা বোতলটা হাতে নিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করল কোথায় একটা জলের ট্যাপ দেখেছে। এগিয়ে সে দেখতে পেল একটা দেয়ালের গা থেকে জলের টেপ লাগানো রয়েছে। তার কতটা তৃষ্ণা পেয়েছে জল দেখেই বুঝতে পারল। বোতলে জল ভরিয়ে নিজের মুখে ঢালল। তারপর মুখ ধুলো। শেষে বোতলে জল ভরার জন্য বোতলটার টেপের নিচে রেখে দিল। অর্ধেকটা ভরতে না ভরতেই জলের গতি কমে এল, টিপ টিপ করে জল পড়ল। সেই ফোঁটা ফোঁটা জলেই বোতল ভর্তি করার জন্য অপেক্ষা করল । বোতলটার গলা পর্যন্ত আসতেই জল বন্ধ হয়ে গেল । ভর্তি না করেই সে বোতলের মুখ লাগিয়েনিল ।

ফিরে এসে সে অবাক হয়ে গেল । না কি তারই কোনো ভুল হয়েছে? এখানে তো কেউ নেই। কিন্তু এখানেই তো ছিল মানুষগুলি–ঐ গাছটার নিচেই। এখন খালি।

খালি নয়। বাকি সব আছে, সেই মানুষগুলিই নেই । এদিকে ওদিকে কিছু লাঠি হাতে পুলিশছড়িয়ে রয়েছে ।

সে চিৎকার করে করে যেতে থাকল– দুর্গা, দুর্গা, এই দুর্গা!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত