আস্তে লেডিস…

শ্রমণা রায়

‘আস্তে লেডিস’… বেরিয়ে যেতে যেতেও ক্যাঁচচচ করে ব্রেক কষল বাসটা। যাক… ব্যাগ ওড়না সব সামলে কোনওরকম ভিড়ে ঠাসা মিনিবাসটায় গুঁতিয়ে গেল সুপর্ণা। না, ঠিক গুঁতিয়ে না, তার ক্ষেত্রে বাসে ওঠার ধরনটা বরং সেঁধিয়ে যাওয়া বললেই ঠিক হয়। বাসের হাতল ধরে গরমে সেদ্ধ হতে হতে নিজে ভেবেই মনে মনে হেসে উঠল সে। ছেলেগুলোকে দ্যাখে কেমন ব্যাগ-ফাইল-কনুই সব দিয়ে আশেপাশের লোককে নিস্পৃহ মুখে ধাক্কা মারতে মারতে বাসে উঠে পড়ে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে ভিড় বাসে ওঠাটা ঠিক এমন হয় না। বাসে উঠে তো সেই একই ভাড়া দেবে, তবু কন্ডাক্টরের অনুগ্রহের আশায় কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে থাকে সে।

‘আস্তে লেডিস’… বাসের গায়ে চাপড় মেরে কন্ডাক্টর হেঁকে উঠে খানিকটা ঠেলেই তুলে দেয় তাকে। আর সুপর্ণাও দিব্বি বুকের কাছে ব্যাগটা জড়োসড়ো করে ধরে টুক করে বাসে সেঁধিয়ে যায়। এই অবসরে বাস কন্ডাক্টর যে অনেক সময়ই অকারণে পিঠে হাত দেয়, বেশ বুঝতে পারে সে। কখনও অবশ্য না বোঝার ভান করে, ভাবে, তাকে বাসে তুলতে বাধ্য হয়েই পিঠে হাত দিতে হচ্ছে। কখনও ভাবে, যাকগে – মরুকগে। পিঠে একটু হাত দিলে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। এ নিয়ে চেঁচামেচি করলে হাজার হাঙ্গামা। রোজকার বাসের ভিড় ঠেলে এসব এখন অভ্যেস হয়ে গিয়েছে তার। হাতের ব্যাগটা দিয়ে কোনওরকমে সামনেটা আড়াল করে সে। অফিসের ব্যাগটা তার কাছে এখানে আত্মরক্ষার মাধ্যম। কিন্তু উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার কাছে আক্রমণের, সবাইকে ঠেলে সরানোর মাধ্যম।

যাক গে যাক… বাসটা তো আজ মিস হয়নি। ৯-৫০ এর মিনিবাসটা ধরে ফেললে নিজেকে সুনীতা উইলিয়ামস মনে হয় সুপর্ণার, আকাশ ছাড়িয়ে মহাকাশে ওড়ে। আজ তো লেট হবে না। শাশুড়ির অসুখ, মেয়ের পেট ব্যাথা… আজকের অজুহাতটা অন্তত পরের দিনের জন্য তুলে রাখা যাবে। কালকে যেমন, একটুর জন্য বাসটা মিস হল। স্ট্যান্ডের কাছাকাছি এসে দ্যাখে মিনিবাসটা বেরিয়ে যাচ্ছে। একছুটে ধরতে গিয়েও আটকে গেল সুপর্ণা। দৌড়তে সে ভালোই পারে। অফিস আর বাড়ি – সারাদিন তো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুট লাগিয়েই কাটে। কিন্তু বড় রাস্তায় এত লোকের সামনে এভাবে এক বিবাহিতা মহিলার দৌড়নো কিছুটা দৃষ্টিকটূ বইকি। তাই অনেকগুলো আটকে পড়া দৃষ্টি থেকে বাঁচতে নিজেকে সামলে নেয়। হাত নেড়ে কন্ডাক্টরের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাটা গতকাল আর কাজে আসেনি। নাক-মুখ কুঁচকে চেয়ে দেখল তার পেছন থেকে এসে ফাইল হাতে ছেলেটা দিব্যি দৌড়ে বাসের হাতলটা ধরে ফেলল। একটা তেতো নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল সুপর্ণা, ‘আস্তে লেডিস’…।

অফিস পৌঁছে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। বিয়ের পর থেকে বাড়ির হাজার দায়িত্ব ঘাড়ে এসে চাপায় ছেলেগুলোর মতো অফিসে অতটা সময় দিতে না পারলেও কাজটা সে ভালোই পারে। করেও মন দিয়ে। আগামী মাসে একটা ইনক্রিমেন্টের চান্স আছে। আনঅফিসিয়ালি ঘোষণাও হয়ে গিয়েছে। সেটা নিয়ে তার পাশের কিউবিকলের অরিত্র যে খানিকটা চটে আছে, বেশ বুঝতে পারে সুপর্ণা। এদিনও সুপর্ণা ঢুকতেই ঘড়ি দেখল অরিত্র। যেন ওর অফিসে ঢোকা-বেরনোর তদারকি ওকেই করতে দেওয়া হয়েছে। আরে বাবা তোরা হাজার বার চা-সিগারেট খেতে বাইরে যাবি… সেটা কিছু না। আর সুপর্ণা পাঁচ মিনিট দেরি করলেই মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকোয় সুপর্ণা। “আগের দিনের ফাইলে তিনটে মিসটেক ছিল সুপর্ণা। বস ফোন করেছিল। একটু রেগেই আছে তোমার উপর।” প্রয়োজনের থেকে অকারণে গলাটা চড়িয়ে বলল অরিত্র। আচ্ছা, এর আগের বার যে পলাশদা স্পেশাল অ্যাচিভমেন্টের অ্যাওয়ার্ডটা পেল, কই এত জ্বালা ধরেনি তো অরিত্রর।

শুধু অরিত্র কেন? সেদিন তার স্বামী সঞ্জয়ও তো গজগজ করছিল এই বলে তাদের অফিসে নাকি যত সুযোগসুবিধে সব মহিলা কর্মীদের জন্যই। বসকে তারা নাকি নানা ভাবে খুশি রাখে। মনে মনে হাসে সুপর্ণা। অরিত্রও নিশ্চই এরকমই কিছু ভাবছে।

‘আস্তে লেডিস’, ‘আস্তে লেডিস’… মনে মনে দুবার আউড়ে নিল সুপর্ণা। একটু পরে ছুটি হবে। ফিরতি জনতার ভিড় ঠেলে ঘরে ফিরবে সে। তারপর পিছু ছাড়াবে ‘আস্তে লেডিস’?… একটু হেসে মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল সে।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত