সফুরা খাতুন, এলিজাবেথ মুর্মু ও রাক্ষসী সূপর্ণখা

  

১. 

  অসংখ্য পাতার স্তুপ বা বলা চলে এক বিস্তীর্ণ পত্রশয্যার ভেতর থেকেই লক্ষণ যখন কালো, রাক্ষসী মেয়েটির শরীরের উপর থেকে উঠে দাঁড়ালেন, তখন বহু দিনের উপোসী শরীরের সাময়িক ক্ষুধা ও উত্তেজনা নিবৃত্ত করার পর নিজেই নিজের প্রতি ঘৃণা ও ক্রোধে, বিবমিষা ও আত্মগ্লানিতে মরে যাচ্ছিলেন। রাক্ষসী মেয়েটি শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিল। ওর জংলী ভাষায়, অরণ্যের যে ভাষা ভ্রাতৃসত্য পালনে বহু দূরের আর্যাবর্তের অযোধ্যা নগরী ছেড়ে এসে বনেই থাকতে থাকতে টুকটাক শিখে যাচ্ছেন লক্ষণ, সেই ভাষায় মেয়েটি বলছিল যে সে কুমারী বা সধবা না হলেও বিধবা এবং সে সহজলভ্যা, গণিকা নয়। সে আরো বলছিল যে কালো বা রাক্ষস হলেও সে নিজেও এক বড় ঘরের, এক রাজবংশের মেয়ে। তার স্বামী দুষ্টবুদ্ধিকে বড় ভাই রাবণ আগে অনেক স্নেহ করতেন। তবে দুষ্টবুদ্ধি কিনা একটা সময় রাবণকেও ক্ষমতার খেলায় হারাতে চাইল আর তাই রাবণ তাকে শাস্তি হিসেবে খুনই করে ফেললো। বৈধব্যের শোক কাটাতে মীনাক্ষী প্রায়ই লঙ্কা ছেড়ে এই দক্ষিণ ভারতের অরণ্যগুলোয় তাদেরই মত অরণ্যচারী অসুর আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে আসে বটে…সাথে তাকে পাহারা দিতে বড় তিন ভাই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ না এলেও ছোট তিন ভাই খর, মারীচ এবং দূষণও আসে। তবে আর্যদের মেয়েদের মত রাক্ষস বা অসুর মেয়েরা কিনা পুরুষের অনুগামীনী হয়ে সবসময় চলা-ফেরা করে না…এ দেশটা ত’ একসময় অসুরদেরই ছিল…আর্যরা সংখ্যায় কম বলে না নিজেদের পান্ডুরত্বক মেয়েদের সবটা সময় পাহারা দিয়ে চলে…তাই বনে অনেক সময় খর, মারীচ আর দূষণ নিজেদের মত ঘুরতে-ফিরতে থাকে আর মীনাক্ষী তখন একা হয়ে যায়…তাই বলে সে ত’ শিথিল বসনা নয়!

     ‘ছেড়ে দাও আমাকে! দোহাই- জোর করো না-’

মাছের মতই গভীর দুই চোখ তুলে রাক্ষস মেয়েটি বলছিল। তার কলসের মত দুই স্তন, কলসের মতই ভারি নিতম্ব আর কলা গাছের মত বিপুল দুই উরু এবং কোমরের অনেকটা নিচ পর্যন্ত দীর্ঘ, বিপুল কেশ…অসুরদের মেয়েগুলো এমনিতে কালো আর নিশ্চিত ওদের গায়ে কটু গন্ধ; তবু বিধাতা কি সব মাংস ওদের শরীরেই ঢেলে দিয়েছেন নাকি?

‘আমি লঙ্কার রাজকন্যা মীনাক্ষী- ছেড়ে দাও- আমি বিধবা-ছেড়ে দাও!’

অথচ লক্ষণের শরীরে বহু দিনের ক্ষুধা। রামের সাথেই বের হয়েছিলেন দুপুরের পর হাঁটতে। ভ্রাতৃবধূ সীতা মাসের যে ক’টা দিন রজ:স্বলা থাকেন, নিরন্তর ব্যথায় তার তীব্র আর্তি আর একটি মাত্র কুঁড়েঘরের মাটিতে পাতা কুশে টানা সাত দিন শুয়ে থেকে অবিরল রক্তাক্ত হতে থাকার সময়টা…প্রাসাদের বিস্তার এখানে কোথায় যে দেবরের সামনে লজ্জা ও সতকর্তার আড়ালটুকু রক্ষা করে যাবে- ভ্রাতা রাম সঙ্গত কারণেই এই একটি সপ্তাহ স্ত্রী সঙ্গ বঞ্চিত থাকেন বলেই লক্ষণের সাথে অরণ্যে হাঁটা-চলার সময়টা বেড়ে যায় তার…দু’জন মিলে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে-চলে আবার সন্ধ্যা নাগাদ কুঁড়েতে ফেরেন…রামই তখন বলছিলেন, ‘আমাদের ভেতর সবচেয়ে বেশি ত্যাগ করছো তুমিই, লক্ষণ!’

‘কিভাবে? একথা কেন বলছেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা?’

‘বিলক্ষণ! ভরত যদিও আমার খড়ম রাজ সিংহাসনে রেখেই রাজ্য পরিচালনা করছে, তবু ত’ সে রাজধানীতে এবং রাজপ্রাসাদেই আছে। স্ত্রী মন্ডবী আছে তার সাথে। শত্রুঘ্নর পাশেও আছে তার বধূ রাজকন্যা শ্রুতকীর্ত্তি। আমার এই কুঁড়েঘরে সীতা কত দূর থেকে চলে এসেছে! একা তুমিই নারী সঙ্গ বঞ্চিত…লজ্জার কিছু নেই হে! মাথা নীচু করছো কেন?’

ঠিক তখনি কুচকুচে কালো তবে দীর্ঘদেহী, আয়ত টানা চোখ ও এলোকেশী এক রাক্ষসী যুবতী তাদের সামনে এসে পড়ে। লক্ষণের নাসারন্ধ্র বিষ্ফারিত হয়। এই পঞ্চবটী অরণ্যে বহু দূরে দূরে কিছু মুনীর কুঁড়ে আছে বটে, তবে আর্যকন্যাদের যত্র তত্র স্পর্শ করা যায় না। এই অসুর নারীরা নাকি শিথিল গমনা। এছাড়া এই কালো রাক্ষসীদের খানিকটা সময় ব্যবহার করে ছেড়ে দিলেই কি এসে যায়?

রাম মুচকি হাসলেন, ‘মাত্র সাত দিন তোমার ভ্রাতৃবধূকে স্পর্শ করতে পারছি না। তাতেই কেমন যেন লাগছে! আর তুমি কিনা! জানকী আর দু/একদিনের ভেতর শুচি ও সুস্থ হয়ে উঠবেন। অগ্রসর হও। পুরুষ ও রাজপুত্রের অধিকার গ্রহণ করো।’

এটুকু বলে, দুষ্টু হাসির সাথে সামান্য ভ্রু বাঁকিয়ে রাম হারিয়ে গেলেন অরণ্যের পাকদন্ডীতে। শিকারী চিতা বাঘের মতই লক্ষণ ঝাঁপিয়ে পড়লেন সামনের কালো যুবতীটির উপর।

কালো, অসুর যুবতীটি প্রাণপনে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে থাকলো। দীর্ঘ নখে সে আঁচড়ে দিতে চাইলো লক্ষণকে। কিন্তÍ, রাজপুরুষের দীর্ঘ অস্ত্র শিক্ষা ও শারিরীক ব্যায়ামে লক্ষণের দেহ সুগঠিত। সে শুনেছে এই কালো জংলী রাক্ষসদের নারীরাও অসীম দৈহিক শক্তির অধিকারী। তবু এতদিনের অস্ত্রশিক্ষা বা মল্লযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সে কি এক সামান্য নারী দেহকে পরাজিত, বশীভূত করতে পারবে না?

‘উফ্- তুমি ত’ সূপর্ণখা একদম- রাক্ষসী!’ রাক্ষসী মেয়েটি সত্যি সত্যিই দীর্ঘ নখে আঁচড়ে দিয়েছে লক্ষণের পিঠ। 

‘সূপর্ণখা কোথাকার!’

ব্যথা ও যন্ত্রণায়, তীব্র ঘৃণায় বলে উঠলেন লক্ষণ। তাঁর পুরুষের উত্তেজনা শেষ ও পূর্ণ হয়েছে। কিন্তÍ মেয়েটির দেহের উপর থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই এতক্ষণের কামনার বিপরীতে একদম ভিন্ন এক অনুভূতি খেলে যেতে থাকে তাঁর দেহে। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাম আজো একগামী- যদিও পাশে তাঁর স্ত্রী রয়েছে প্রতি মূহুর্তের সঙ্গীনী। অন্য ভাইরাও যার যার ধর্মপত্নীর সাথেই রয়েছে। কিন্ত এ কি করা হলো? মিথিলার রাজকন্যা উর্মিলা…সরলা উর্মিলা…এই রাক্ষসী যুবতীর মত কলসের মত স্তন বা নিতম্ব নয় তার…আর দশটি শ্বেতকায়া নারীর মতই ছিপছিপে, পান্ডুরত্বক উর্মিলা, নীল নয়না উর্মিলা …কিন্ত সে যে আর্যকন্যা! বিবাহিতা স্ত্রী। লক্ষণ এ কি করলো?

‘রাক্ষসী- আমাকে প্রলুব্ধ করেছিস তুই!’

ভূ-লুন্ঠিতা, সদ্য ধর্ষিতা নারীটি তখন মাত্রই ঠোঁটের কাছে লক্ষণের কামড়ে রক্তাক্ত ক্ষত মুছে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। তার শাড়ির আঁচল জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। চোখ বেয়ে নামছে অপমানের অশ্রু।

‘আমি প্রলুব্ধ করেছি তোমাকে?’

হতবিহ্বল কালো নারীটি কোনমতে বলে।

‘নয়তো কি- তোর মত কালো নারীকে আমার মত একটি ফর্সা যুবক ছোঁবে? তোর মত একটি নোংরা, গায়ে গন্ধ,  রাক্ষসীকে? তুই ত’ কুচ্ছিত। প্রথমে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে প্রলুব্ধ করতে চাইলি- সেটা না পেরে আমাকে!’

‘আমি কখন তোমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে প্রলুব্ধ করলাম?’

হতবিহ্বল নারীটি কোনমতে এ কথা বলতে না বলতেই লক্ষণ তার কোমরে বাঁধা পেটিকার ছুরি খুলে মীনাক্ষীর সামনে এগোলেন।

‘রাক্ষসী- সূপর্ণখা! কোন্ সাহসে তুই এক আর্য রাজপুত্রের পিঠে আঁচড় দিস? খুব বাড় হয়েছে, না? দ্যাখ আমি তোর কি করি!’

পরক্ষণেই এক নিষাদ নারীর প্রবল আর্তনাদে শিহরিত হয়ে উঠল গোধূলি শেষের সদ্য সন্ধ্যা নামা পঞ্চবটী অরণ্য। ধর্ষিতা মীনাক্ষীর নাক বরাবর বসে গেল এক শ্বেতকায় রাজপুত্রের ছুরি। ছুরি বসিয়েই আর পেছন ফিরে তাকালেন না সেই রাজপুত্র। সোজা ছুটতে থাকলেন পঞ্চবটীতে নিজেদের কুঁড়ে বরাবর। খানিকদূর সামনে দৌড়াতেই দেখলেন পাকদন্ডীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা স্বয়ং। বিচলিত হলেন লক্ষণ। সামান্য লজ্জাও পেলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কি খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে তবে সবই শুনছিলেন? মৈথুন ক্রিড়ার সব শব্দ…মৈথুন…না…মৈথুন বলা যায় কি? মৈথুন ত’ নর-নারীর সম্মতির ভিত্তিতে হয়। লক্ষণ যা করেছেন…তিনি নিজেই ভাবতে থাকেন যে তিনি কি করেছেন এবং ভাবতে ভাবতে বিহ্বল হয়ে যেতে থাকেন।

‘লক্ষণ- পৌষ ও মাঘ শেষ হয়ে ফাল্গুন গিয়ে চৈত্র চলে এসেছে। গোদাবরীর জল এখন আর শীতে জমে তুষার হয়ে যাচ্ছে না। তুমি একবার মাত্র অবগাহন করে নাও। কুঁড়েতে গিয়ে আমরা আগুন জ্বালাবো। রাক্ষস নারীর সঙ্গ করে যে অপবিত্র ভাব জাগছে তোমার দেহে ও মনে, একটিবার অবগাহণ করলেই সব শুদ্ধ হয়ে যাবে।’

‘জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা- দেবী জানকি কি মনে করবেন? এছাড়া এতটা সন্ধ্যা পর্যন্ত উনি একা। এই রাক্ষসী নারী বলছিল যে সে রাক্ষসপুরী লঙ্কার বিধবা রাজকন্যা মীনাক্ষী। আমি তাকে বলপ্রয়োগ করেছি একথা প্রচারিত হলে আমাদের রঘু বংশের যে বড় কলঙ্ক হবে।’

‘তা’ কখনোই হবে না। তুমি অনর্থক দুশ্চিন্তা করেছো। স্বয়ং কবিশ্রেষ্ঠ বাল্মিকী আমাদের গৌরবগাঁথা লিখবেন। এক শ্বেতকায় রাজপুত্র কোন কালো রাক্ষসীকে ছোঁবে বলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা আকর্ষনীয় নয়। এ কথাই রামায়ণ গানে যুগ যুগান্ত ধরে প্রচারিত হবে।’

‘জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা!’

‘অনর্থক বালকের মত দুশ্চিন্তা করছো, লক্ষণ! এছাড়া জানকী একা কুটিরে অবস্থান করছেন। তাড়াতাড়ি গোদাবরীতে অবগাহন সম্পন্ন করো।’

‘তাঁকেই বা কি বলব আমরা?’

‘উফ্- তাঁকে কিছু বলতেই বা হবে কেন? বড় জোর তাঁকে বলব এক রাক্ষসী আমাদের দুই ভাইয়ের পিছু নিয়েছিল, তাঁর সতীন হতে চাইছিল। উপযুক্ত শিক্ষা দিতে তুমি তার নাক কেটে নিয়েছো…ব্যস! জানকী যা সরল সে সব কথা বিশ্বাসও করবে।’

বলে জোরে হেসে ওঠেন রাম। গোদাবরীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন লক্ষণ। সিক্ত বসনে উঠতে উঠতেই তাঁর মনে হয় পৃথিবীটা আশ্চর্য রকম লঘু। শাসক শ্রেণির জন্য কোন অপরাধই অপরাধ নয়। এবং তার কোন দন্ডও হয় না কখনো। এই ত’ পঞ্চবটীর দীর্ঘ সব শাল ও তাল বৃক্ষ তেমনি রয়েছে । সোনালী খেজুর পাকছে গাছের ডালে। অশোক-কিংশুক-চন্দন বৃক্ষে হিল্লোলিত চৈত্র সন্ধ্যার পঞ্চবটী। ভীরু বনহরিনীরা ছুটছে আশ্চর্য ছন্দে। শীতে পুষ্যা নক্ষত্রের রাজত্ব চলে আকাশে। আর এখন চিত্রা নক্ষত্রের সময়।

‘তেমন কিছু ত’ হবে না জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা?’

‘একদম কিছু হবে না সেটা নয়। এই রাক্ষস নারীটি যদি সত্যিই লঙ্কার রাক্ষসপুরীর রাজকন্যা হয়ে থাকে এবং তার তিন ভাই যদি মাঝে মাঝেই এই অরণ্যে হাওয়া খেতে আসে, তবে তারাও হয়তো আমাদের উপর প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে। সীতাকে আরো বেশি সতর্কতার সাথে দেখে রাখতে হবে আমাদের। যাক- নিষাদ আর রাক্ষসদের এত ভয় পেলে চলবে না!  আর এ নিয়ে অনুশোচনারও কিছু নেই লক্ষণ। অরণ্য আর নিষাদ বা রাক্ষসদের হারাতে হলে মাঝে মাঝেই ওদের নারীদেরও পরাজিত করতে হয়। এটাই রাজধর্ম। ’

সন্ধ্যার অন্ধকারে সার সার চক্রবাক ও সারস ডানা ঝটপটায়।

‘মীনাক্ষী- মীনাক্ষী? কোথায় ছিলি তুই?’

‘এই তোমাদের আসার সময় হলো?’

খর, দূষণ ও মারীচের দিকে তীব্র ক্ষোভে তাকায় মীনাক্ষী। 

‘তুই গাছের ডালে ডালে ফুল দেখতে দেখতে পিছিয়ে পড়েছিলি। আমরা তিন জোয়ান পুরুষ কিছু দূর সামনে একটা হরিণ শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তোর ঠোঁটের কাছে কেটে গেছে- শাড়িটাও ছেঁড়া- কি হয়েছে? লঙ্কার রাজকুমারী মীনাক্ষীর এত বড় ক্ষতি কে করতে পারে?’

‘আমি মীনাক্ষী না- আমি সূপর্নখা- রাক্ষসী সূপর্নখা- আর্যরা আমায় নতুন নাম দিয়েছে, জানো না?’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে লঙ্কার বিধবা রাজকুমারী মীনাক্ষী।

 

২. 

আফ্রিকায় একটি মিশনারী দলের সাথে পাঁচ বছর ডাক্তারি কাজ করার সময় ছোট-খাট একটি তুলা খামারের মালিকও হয়েছিলেন স্টিভ রবসন। একটি বান্টু উপজাতি মেয়ে তাঁর নিয়মিত শয্যাসঙ্গীও হয়েছিল তখন। বছর চোদ্দর মেয়েটিকে প্রথম যেদিন বন্দুকের নলে তুলে বৃটিশ সৈন্যদের একটি ট্রুপ তার কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়, মেয়েটিকে একটি গোলগাল কালো বানরী ছাড়া কিছুই মনে হয়নি তার। কেমন বিচিত্র কোঁকড়া চুল! এ বয়সেই উদ্ধত হয়ে ওঠা বুক, অহঙ্কারী নিতম্ব আর পেলব উরু ছাড়া ওর আছেটা কি? মেয়েটির গায়ে দূর্গন্ধ থাকতে পেরে ভেবে সন্ধ্যা থেকেই মদের বোতল খুলে বসেছিলেন। যেন ওর গায়ের গন্ধ তাঁকে তাঁর পুরুষের চাহিদা মেটাতে বাধা না দেয়। দেশে তাঁর স্ত্রী রেবেকা এতটাই পতিব্রতা ও নরম মনের মেয়ে যে বলার নয়। তবে তিন/তিনটি মহা দুষ্টু শিশু সন্তানকে নিয়ে এই প্রবল গরমের দেশে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রা করে রেবেকার আসা ঠিক হবে কিনা তিনি বুঝতে পারেন না। রেবেকা বরং লন্ডনে থেকেই শিশু মানুষ করুক। তিনি আরো কিছুদিন তুলা খামারের আয়ের টাকা জমিয়ে আর ডাক্তারি করে ফিরে যাবেন। বান্টু মেয়েটি অবশ্য বছর খানেকের মাথায় গর্ভবতী হলো। না কালো না সাদা তবে খানিকটা হলদে রঙের এক জোড়া বাচ্চার জন্ম দিল সে। স্টিভ রবসন শিশু দু’টোর দু’টো এ্যাংলো নাম রেখে লন্ডনগামী জাহাজে উঠে বসেছিলেন। জাহাজ ঘাটে রেবেকা এসেছিল স্বামীকে গ্রহণ করতে। তেমনি হাসি-খুশি, গোলাপী ফ্রিল দেয়া গাউন পরা রেবেকা। হাসি-খুশির ভেতরেই মুখে-চোখে হাল্কা উদ্বেগের কুঞ্চনও সে এড়াতে পারে না। ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলে, ‘কোন নিগ্রির পাল্লায় পড়েছিলে নাকি- যিশুর দিব্যি- সত্যি কথা বলো!’

‘কি যে বলো- অমন কালো আর কুচ্ছিত মেয়েদের ছোঁয়া যায়? পাশে যেতে পারবে না তুমি, রেবেকা!’

এবার এনগেজমেন্ট হবার আগের অষ্টাদশী মেয়েটির উচ্ছলতায় হেসে ওঠে ত্রিশের রেবেকা। কিন্তÍ লন্ডনে ক’দিন থাকতেই আবার টাকা করার নেশা পেয়ে বসে তাঁর। রেবেকাকে রেখেই আবার ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’র একটি বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করলেন। প্রথমে কিছুদিন ইন্ডিয়ায় বেঙ্গল প্রভিন্সের সাঁওতাল পরগণায় কাজের পর ইস্ট বেঙ্গলের দিনাজপুরে। গরমে খুব মড়কে মানুষ মরছিল তখন। কলেরা। এরা বলে ওলাওঠা বা মা শীতলার দয়া। পুষ্পরাণী মুর্মু নামে যে সাঁওতাল মেয়েটি তার ঘর ঝাড়– দিতে আসত, তার বড় বড় দুই কালো চোখে আর অসম্ভব পুষ্ট স্তন-নিতম্ব-উরুতে কোথাও সেই বান্টু মিসট্রেসের ছায়া! বছর পাঁচেক পুষ্পরাণী বা এলিজাবেথ মুর্মু তাঁর কাছেই থাকলো। পঁয়ত্রিশের রেবেকার চিঠি আসে মাঝে মাঝে। ছেলে-মেয়েরা বড় হচ্ছে। এখন বাবা পাশে না থাকলে ওরা যদি বখে যায়? অনেক টাকা করা হয়েছে। একা রেবেকা আর পারে না। কথা মিথ্যে নয়। টাকা-পয়সা একদম খারাপ হয়নি। পুষ্পরাণী বা এখন এলিজাবেথ মুর্মুর ঘরে তিনটি বাচ্চা ভিক্টর, সেবাস্টিয়ান আর এ্যাগনেসকে রেখে রেলগাড়িতে উঠে বসার সময় এলিজাবেথ মুর্মুর বড় ভাই পিছন থেকে তির ছুঁড়ে মারায় পিঠে সেবার যে ক্ষত হলো আর হাসপাতালে দু’মাস বাড়তি থাকতে হলো, সেটা স্বদেশে ফিরে রেবেকার ডাকা ‘ওয়েলকাম হোম’ পার্টিতে ইউনিয়ন জ্যাক ও রানীর মর্যাদা রক্ষায় এক কল্পিত বীরগাঁথার গল্পে অতিথি অভ্যাগতদের চমকিত করতে পারলেন বটে স্টিভ রবসন।

 

৩. 

খালিদ নিতান্ত অবসাদগ্রস্থের মত তাকায়। দেখতে দেখতে এই ক্যাম্পে সবাই কেমন স্বাভাবিক হয়ে এলো। শুধু সেই স্বাভাবিক হতে পারে না! একটি নয়, দু’টি নয়- তিন/তিনটি বোন তার। তিনটি বোনের দু’জনকেই বর্মাইয়া সৈন্যরা অত্যাচার করে আগুনে পুড়িয়ে মারলো। ছোট বোনটা বেঁচে গেল। অদ্ভুত সেই বেঁচে যাওয়া। তম্ব্রুর সেই পাড়ায় ভাদ্র মাসের শেষের দিকে এক রাতে যেদিন মিলিটারি আসলো, তাদের মুসলমান পাড়ার প্রতিটা বাড়িতে হামলা দিয়ে বোরখা, হিজাব কি ওড়না সরিয়ে মেয়েদের বাছতে শুরু করে। ভাগ্যে খালিদের বউ তার নবম সন্তানের জন্ম আসন্ন বলে নিতান্ত মন্দ হয়ে গেছিল দেখতে। তিনটি আবিয়াতো বোন বাসাতেই ছিল। ওরা কেউই রক্ষা পায় না। পাড়া ঘেরাও করে গুলি করছে বর্মী সৈন্য। `কালা’দের পাড়ায় প্রায়ই যেমন তারা আসে। মসজিদের ভেতর ঢুকে, বুদ্ধের বিগ্রহ রেখে প্রার্থনা করে। জোয়ান ছেলেদের আর্মি জিপে তুলে নিয়ে কোথায় যে চলে যায় আর ফিরে আসে না!

‘নটান ডাসেন (২০১০)- নটান ডাসেন (২০১০)- আঁরা ব্যাকগুণ মিলিয়া সুচির ফার্টিত ভোট দিলাম। ভোট পাবার সাথত ও উলট-ফুলট করতে লাগল যে!’

কুতুপালংয়ে ঢোকার মুখেই পাকা রাস্তায় বড় চায়ের দোকানগুলোর একটিতে বসে সোহরাব চেঁচিয়ে ওঠে। ইসমাইল চাচা রাসিডং থেকে এসে ব্যবসা জমিয়ে বসেছে বেশ। একটা টিভিও কিনেছে।

‘ইবা বর্মাইয়ারা কয় আঁরার মাইয়ারা কালা? আল্লা- মিছা হতা!’

জমিলা আর সাদেকা সেই রাতেই মারা গেছিল। সফুরার বেঁচে থাকার কথা ছিল না তবু বেঁচে গেল প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে। খালিদের সামনে থেকে তিনটা বোনকেই টেনে নিয়ে গেল বর্মাইয়ারা। সামনের স্কুল-ঘরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পাড়ার সতেরোটি মেয়েকে। যার ভেতরে তিনটি মেয়েই খালিদের বোন। পাড়ায় তাদের রূপের খ্যাতি ছিল। এপাশে অবরুদ্ধ বেঁচে থাকা পুরুষ, বৃদ্ধা বা বারবার গর্ভবতী হতে হতে খুব কুচ্ছিত হয়ে যাওয়া নারীরা। মাঝরাতে কোন পুরুষ কুকুরের সগর্জন সন্ত্রাসে ত্রস্ত নারী কুকুরের ভীত ও প্রতিবাদী কান্নার মত সৈন্যদের বিকট গলার সন্ত্রাস ও ঠা ঠা হাসি, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ আর থেকে থেকে মেয়েগুলোর তীক্ষ কান্নাও একসময় স্তিমিত হয়ে আসে।

‘আল্লাহ- রহম গরো!’

খালিদের বৃদ্ধা মা জায়নামাজে বসে। স্ত্রী মালিকা কিছুই বলতে পারছিল না। খুব অল্প বয়সে বউ হয়ে এসে অবধি ননদিনীদের সেব বড় বোনের মতই হয়ে উঠেছিল। দেখতে দেখতে ভোর রাতের নক্ষত্রের আলো মিইয়ে সূর্য ওঠার প্রস্তÍতি নিতে নিতে সতেরোটি মেয়ের গায়েই সৈন্যরা দেশলাই ও কেরোসিন ঢেলে দিলে প্রকট আর্তি শুরু হয়। চিরদিনের গেছো মেয়ে সফুরা গায়ে অর্দ্ধেকটা আগুন সহ স্কুলঘরের দেয়াল থেকে মরীয়া লাফ দিতে দিতেই ভোরের আলোর আভাস মিইয়ে গিয়ে অল্প অল্প বৃষ্টি শুরু হয়। গায়ে আধা আগুনে কাপড় খুলে যাওয়া সফুরা তীব্র জীবন পিপাসায় জীবন্মৃতের চৈতন্যে ঠিক বাসার সামনে এসে টলে পড়ে যায়। কোনভাবে বর্মী সৈন্যদের চোখ সে ফাঁকি দিতে পেরেছিল। শাহজাদা সেলিমের প্রেমিকা আনারকলি সফুরার মত দেখতে ছিল কিনা ভাবত যাকে দেখে পাড়ার যুবকেরা, সেই সফুরার গায়ে সারাদিন মাছি ভনভন করে। বার্ণ সেপটিক কবে যে ভাল হবে! অর্ধ-নগ্ন সফুরাকে কাঁধে বয়ে খালিদ এক ‘মুরাত’ (পাহাড়) থেকে আর এক ‘মুরাত’-এর ঢালে লুকিয়ে, এতগুলো বাচ্চা, বুড়ি মা আর আট মাসের গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে তম্ব্রু থেকে টেকনাফের সাবরং পৌঁছেছিল মোট পঁচিশ দিনে। এত এত এনজিও আর জাতিসঙ্ঘের মানুষেরা এসে এত সেফ স্পেস বানায়, উমেন ফ্রেন্ডলী স্পেস বানায়, তম্ব্রুতে যার হতেরো হানী (সতেরো কানী) জমি ছিল আর মুসলমানের ছেলে হিসেবে আট ক্লাসের বেশি পড়তে না পারা খালিদ হোসেন ভাবে ছোট বোন সফুরার সারা শরীর আর মুখের আগুনপোড়া দগদগে ঘা গুলো হয়ত কোনদিনই আর ভাল হবে না। কথাও বলবে না আর কোনদিন? এত কথা বলত যে মেয়েটা! মা ধমক দিয়েই কথা থামিয়ে রাখত। সতেরো কানী জমির মায়া না হয় খালিদ ছেড়ে দিল, এদেশে এসে এদেশের মানুষের মত ডাল-ভাত খেতে গেলে তার পেটে সমস্যা হয়। তম্ব্রুর নদীর মিঠা পানি, ভাল মাছ কি তম্ব্রুর বাতাস দুনিয়ার আর কোথায় মেলে? সেগুলোও না হয় ছেড়ে দিল। সফুরার কি হবে? আট আনি সোনা দিলে এই দগদগে ঘা বোনটিকেই বিয়ে করবে বলে কেউ কেউ বলে। এসব মিঠা কথার একটিও খালিদ বিশ্বাস করে না। তার আনারকলির মত ফুটফুটে বোনটিকে সে কিভাবে বাঁচায়?

‘বদ্দা- ইবা বর্মাইয়ারা কি কয়?’

‘ইবা বর্মাইয়ারা কয় যে কুন ধর্ষণ ন অইয়ে- অর কয় আঁরার বেডিরা কালা।’

চায়ের দোকানে নানা মানুষের কথার তলানিতে খালিদ হোসেনের গলা চাপা পড়ে যেতে থাকে।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত