| 26 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

পরিব্রাজকের মনোলগ

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট
(প্রারম্ভিক আবহের সঙ্গে  ভয়েস ওভার আসে। সঙ্গে প্রোজেক্টারে  দেখা যায় পাহাড় নদী সমুদ্রের সব আকর্ষণীয় ছবি। এখানে একটি ছেলে একা কথা বলে যায়। নির্দেশক দরকার এবং কল্পনা মিশিয়ে ব্যবহার করবেন অভিনেতাকে। লিখতে লিখতে প্রাথমিক কল্পনা এবং কিছু সংগীতের ধরতাই দেবার চেষ্টা করলাম।)
সামনের দুমাস অনন্ত প্রখর গ্রীষ্মকাল। পাহাড়, সমুদ্র, নদী হয়ে আমরা উড়ে যাবো দূরে বহু দূরে… এসব অলীক ভাবনা  ভাবতে ভাবতে আমার ছোটো গল্পের কথা মনে হয়েছিলো। মায়ের মুখে শোনা গল্প। পার্বতী একদিন কার্তিক ও গণেশকে বলেছিলো যে আগে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে তাকে গলার হার উপহার দেবেন। শুনেই তো কার্তিক বেড়িয়ে পড়লেন তার ময়ূর নিয়ে ,বিশ্বজয়ের কাহিনী ও চিহ্ন নিয়ে ফিরে এসে তিনি দেখেন দাদা গণেশ পার্বতীকে প্রদক্ষিণ করেই পেয়ে গ্যাছেন সেই অমূল্য হার। মাকে ভ্রমণ মানেই বিশ্বভ্রমণ।আমার এই লেখার ভাবনাও খানিকটা তাই। থিয়েটার করার কারণে সব শিল্পের সঙ্গেই নিবিড় ঘর। সেইসব ঘরনিদের একবার সাদা পাতায় ছেড়ে দিয়ে দেখলাম…কোভিড-১৯এর এই  বিশ্বজোড়া  ত্রাসের  অভিঘাতে  আজ  আমাদের সব ভ্রমণ ঐ মানষ ভ্রমণ। 
(একটা জানলা ঘেরা স্পেসে আলো এসে পড়ে। কিছু আলো ঘোরাফেরা করে। ফিসফিসিয়ে কিছু কন্ঠস্বর বলে ওঠে।)
‘বিহঙ্গের নীড় আছে-শেয়ালের গর্ত আছে অরণ্যের অন্তরালে
আমাদের যাত্রা-যাত্রা ছাড়া কিছুই নাই’
একা লন্ঠন  এর  আলো  নিয়ে  এদিক ওদিকে  ঘুরতে ঘুরতে  একটি ছেলে বলে।
নিকানো মন আর শুদ্ধ মুহূর্ত বলে আজকাল আর কিছু পাবেনা তুমি কারণ অভিমান মুছিয়ে দেবার মতো কোনো প্রপাত নেই আর। অভিমান তো আর বাষ্প হয়ে উড়ে যায় না। সে শুধু জমে। জমতে জমতে হেরিকেনের কাঁচে কালসিটে পরে যায়।
(হেরিকেনের আলো কমাতে বাড়াতে থাকে অস্থিরভাবে।)
তন্বী তিস্তা, সবুজ তিস্তা পাহাড়ের আর কত কান্না সইবে? কতবার অনর্থক সবুজ হয়ে উঠবে আবার? পাহাড়ের পলেস্তারা খসে পড়ে। কেউ খবর নেয় না, শুধু খসে পড়া দুর্দশা আর প্রতিটা মন কেমনের বিকেল এখনো একইসঙ্গে দূর থেকে আসা পর্যটককে অভিবাদন জানায়।
(ছেলেটি অভিবাদনের ভঙ্গিতে স্থির হয়। পিছনে সূর্যের  অস্তরাগের রং ছিটিয়ে যায়)
(ফিসফিসিয়ে বলে) একটু থিতু হও। এখান থেকে এক পেলব কমলা রঙের সূর্যাস্ত দ্যাখা যায়… এই হেলে যাওয়া অতিথি বিকেলের মিশে যাওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই, যেমন মানুষের বিশ্বাস না করা ছাড়া উপায় থাকে না, ঠিক তেমনই। পথিক বা পাগল সকলেই সূর্যোদয় দেখতে চায় কিন্তু হয়ে ওঠেনা সবসময়।। অস্ত বরং অনেক মেদুর রোম্যান্টিক। হলদে বিষাদের ছেড়ে ছেড়ে যাওয়া চা বাগানের মাঝে এলে মানুষ আজকাল একটু বিশ্বস্ত হয়, অন্বর্থ হয়…ডুয়ার্স সবসময় নদী, জঙ্গল, থুড়ি ঝিমধরা সবুজ মেখে মেখে থাকে।
(ছেলেটি  হেরিকেনকে  একটি ভিডিও ক্যামেরার মতো করে ধরে। প্রোজেক্টারে  জল জঙ্গল পাহাড়ের ছবি ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। সঙ্গে মানানসই আবহ।)
(জানলার একেবারে গরাদে মুখ রেখে ছেলেটি বলে। সারা স্পেসে ছড়িয়ে আছে এখন বহু বিচিত্র বর্ণের ঘুড়ি।)
‘এবার কোনদিকে, বলো
কোন ভাষা? কোন বিষয়বস্তু? প্রকাশভঙ্গিমা?’
ঘুড়ি তুলে নেয় এক এক করে। উড়াতে উড়াতে বলে যেনো। ঘুঘুর একটানা শব্দ শোনা যায়।
আজও বিবিধ বেঠিক প্রবৃত্তিকে না বলতে পারিনা আমি। ঠেকাতেও পারিনা। যেভাবে ঘুড়ি উড়তে উড়তে আটকাতে পারেনা জড়িয়ে ধরা থেকে বা সমুদ্র আটকাতে পারে না ঢেউ কিংবা আকাশ ঠেকাতে পারেনা উল্কাপাতের বিস্ফোরণ তেমনি আমিও নিজেকে নিঙড়ে নিঃস্ব করে দেবার আগে আরেকটু চাতকের মতো তিতিক্ষা দ্যাখাতে পারিনা এখনো। এ আমার নিজের ক্ষয় অথবা বিছিয়ে যাওয়া বিদীর্ণতা। একে করুণাও করা যায় বা পিঁড়ি পেতে বসে ভাত খাওয়ানও যায়। অস্বীকার করাও যায়, নিস্তল ঘুমের মধ্যে আসা স্বপ্নবৃন্দ অথবা দুঃস্বপ্নের স্তবক হিসাবে ঝিনুক কুড়িয়ে নেওয়া যায় অপ্রসিদ্ধ সমুদ্র সৈকত থেকে। যেভাবে বৈশাখ ভু্লিয়ে দ্যায় পলাশের মাস অথবা হেমন্ত সাঁট করে একাকী কোনো রানারের সঙ্গে অথবা শীতকাল হাতে নিয়ে সুপর্ণার জন্য অপেক্ষা করেন ভাস্কর চক্রবর্তী ঠিক তেমনই দুপুর চায় কোনো ঘুমন্ত দোতলা বাস। যেভাবে পাহাড়ে উঠতে উঠতে কোনো স্বাধীন পর্বতচারী খুঁজে নেয় নিজস্ব টেন্ট ,এ খানিকটা তেমনই কিন্তু এই অনামা টেন্ট বারবারই হারিয়ে যায়। খোলস থেকে দংশন ধুয়ে দ্যায়ে যেভাবে ভোরের বাতাস ভ্রমণও হয়তো দংশন বা চুমুর দাগ ধুয়ে ফেলে এক আবহমান ঝর্নাতলায় বসে।
(ছেলেটি বসে। বৃষ্টি ধুয়ে দেয় ওকে এসে।)
এখনো অনেক ভ্রমণই বাসা চায়। সেসব একপেশে বাসায় ফেরার তাগিদের মধ্যে রিক্ত হয়ে আসা এক নাছোড় একঘেয়েমি আছে, অহেতুক বিড়ম্বনার আভাসও আছে। 
ভালোবাসার কাছে নাগাড়ে পরাজয় মেনে নেওয়া আছে, নদীর মতো বয়ে যাওয়াও আছে।গাছের মতো আকাশ ছুঁতে চাইবার ধক আছে। স্রোতের বিপজ্জনক ইশারা এক পর্বত থেকে অন্য পর্বতে আছড়ে মারে এই যাত্রাকে। সেই নির্লিপ্ত অথচ প্রত্যয়ী বোল্ডারের যেমন ভবিতব্য, তেমন হেমন্তের শুকনো পাতা গুলোরও, আমারও। এই যাযাবর জীবনও এখনো কষ্টের রং চিনতে পারে…ফলত আজ এই মায়া থেকে কাল অন্য সোনালি বালির মরুভূমিতে আজ ভরন্ত শস্যক্ষেত্র থেকে কাল কোনো এক নিঃসঙ্গ কাকতারুয়ার মুখোমুখি বসে বুঝতে পারি দেবতার মতো অবজ্ঞা, ইনফ্লুয়েঞ্জার জিভের মতো অনীহা, শ্মশানের পুরোহিতের সেই অন্তিম মন্ত্রোচ্চারণে মতো গভীর একোক্তি, আত্মরতির আনন্দ এবং ট্রামলাইনের তারের উপরে ঝলসে যাওয়া মৃত কাক ছাড়া এজীবন আর কিছু বাঁচিয়ে রাখেনি…সেই বাঁচিয়ে রাখা অনর্থক একইরকম স্বার্থপর নিবিড় জাবড় কাটা সহ্য করাও একটা ভ্রমণ… কেউ নটে গাছের শেষ অব্দি দ্যাখে…কেউ কয়েকটা এস এম এস …ব্যাস…এই তো প্রদক্ষিণ।
(প্রোজেক্টারে বহু- রং এর ঘুড়ি উড়ে যায় ছেলেটি তার  মধ্যে তলিয়ে যেতে  যেতে বলে-)
‘হাজার ভিড়ের মধ্যে চেয়ে দেখি আমার শহর’
স্পেসের আলো এখন বড় ছেড়া ছেড়া,  তার সঙ্গে  শহরের কোলহলের  শব্দ  মিলেমিশে  যায়।
আমাকে এক বন্ধু একবার বলেছিলো সন্ধের সাগর দেখতে এবং তা দিঘা বা পুরীতে সিজন টাইমে। বরাবরের নির্জনতা প্রিয় আমি ওকে হেসে বলি ‘কেন রে! ওই অসম্ভবের ভিড়?’ ও বলেছিলো ওই ভিড় ঠেলে, আলো শুষে নিয়ে যদি কোনো শব্দ ছেনে ছুঁয়ে নেড়ে ঘেঁটে বাড়ি পর্যন্ত এনে খাতায় বা কম্পিউটার এ লিখে ফেলতে পারিস,হুবহু পারিস, না বানিয়ে পারিস… তবে সেইদিন তুই বুঝবি আমন ধান ওঠার মজা, রয়ানী গানের উচ্ছাস বা কৃষকের জমি চলে যাবার খেদ। আমি হেসেছিলাম। খাদের কিনারে দাঁড়ালে অমন হাসি পায় আমার। নিঃসঙ্গতাকে ও হিংস্রতাকে হজম করে এমন হাসি অভ্যেস হয়ে গ্যাছে আমার। ও আমায় বলে শোন চাষীর শ্রম যেমন দ্যাখা যায়, মজুরের মাথার ঘাম পায়ে পড়বার শব্দ তুই চাইলে যেমন শুনতে পাস তেমনই সমুদ্রেরও একরকম অবিশ্রাম শ্রম আছে। চাঁদ বেনের পারি জমানোই ধর বা সুনামী থেকে আজকে আম্ফানের গতিই ধর…সেসবই শ্রমের চিহ্ন বহন করে। সমুদ্রের ভ্রমণ অমোঘ, নিরন্তর এবং স্বাধীন। আমি এসব ভাবতে থাকি আর ওদিকে সন্ধে নামতে থাকে…চোখেও সমুদ্র ঢেউ ছুঁয়ে যায়…(সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসে)
দেখি কত ছেলেমেয়ে আলোজ্বলা বল সমুদ্রের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর একসমুদ্র আলো সব নিয়ে ফিরে আসছে…রাতের বংশনামহীন কোনো নক্ষত্রের মতো, আবার চলে যাচ্ছে দূরে যেখানে অবর্ণনীয় দিগন্ত রেখা মিশে গেছে মরা বাঁচার মাঝের কোনো ধূসর চৌখুপ্পিতে।একটু পরেই ভাস্কর তার ‘শয়নযান’ নিয়ে আসবেন আর বিভূতিভূষণ আসবেন হয়তো ‘দেবাযান’ এ চড়ে…প্রকৃতি আর মানুষের এই আশ্চর্য অথচ নিবিড় অভিজ্ঞান বিনিময় আমাকে বিমূঢ় করে তোলে…আমি চোখ থেকে সমুদ্র মুছে আয়নার সামনে দাঁড়াই… দেখি পৃথিবীটা ঈষদুষ্ণ আবছা আলোয় ভরে যায়…আয়না ঝাপসা হয়ে  যায়।
(একটি আয়না  নিয়ে গোটা  স্পেসে  আলোর  প্রতিফলন  ঘটায় ছেলেটি।  সঙ্গে বেজে চলে, মৌসুমি  ভৌমিক। ‘আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে,আমাকেও সাথে নিয়ো নিয়োগো আমায়’)
মধ্যবিত্ত মধ্যবয়েস একমাত্র যুঝতে পারে তার নৈমিত্তিক অবসাদ এর সঙ্গে। পতঙ্গের আধপোড়া শরীরের দিকে ঘোলাটে হয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে দেখে বহু ঢেউ ভেঙ্গে চোখ পেরিয়ে শরীর ছুঁয়ে নেমে যাচ্ছে…সমুদ্রস্নান এর আকুতি নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়। নামতে নামতে দেখি সমুদ্র ফিরে গেছে একেবারে দিগন্তরেখা বরাবর। যেখানে ঘিরে থাকা চোরাবালির মাঝে বসে জীবন আর মৃত্যু অনর্গল দাবা খেলে চলেছে সূর্যকে ব্যাক সেন্টার করে।…সন্তর্পনে বোল্ডার ভেঙ্গে ভেঙ্গে, ঢেউ পেরিয়ে পেরিয়ে অনর্থক অক্ষর থুড়ি কটাক্ষ সাজিয়ে যাই। হয়তো এসব আসলে এক ভার্চুয়াল প্রশংসা পাবার ছল। হয়তো সবাই আসলে লাইক কমেন্ট পাবার জন্য শ্রম। তবুও শ্রমই তো! প্রেমের এই শ্রমের মধ্যে দিয়ে, ছিটকে আসা জোনাকির আলোর মধ্যে দিয়ে যদি কোনো একদিন একটা আকস্মিক লেখা, একটা বিস্ময়কর অভিনয় অথবা একেবারেই কুয়াশাঢাকা কোনো ছায়াছন্ন মৃত্যু খুঁজে পাই যেটা আসলে মৃত্যু ঠিক নয় বরং একটা উন্মাদের বিশ্রামময় বা দীঘল কালো জ্যান্ত দীর্ঘশ্বাস অথবা অসাড় প্রতিশোধ। যেসব বলতে চাই চোখে চোখে, গায়ে গতরে, কলমে কলমে, মঞ্চে মঞ্চে কিন্তু হয়ে ওঠেনা সবসময় সেসব অস্ফুটকে প্রতিইঞ্চিতে, লালচে ধূসরে বুঝে নেয়াই আসলে এক প্রবল সমুদ্রস্নান।যা আমাদের প্রকৃত অর্থে বিহ্বল করে, সাঁতার কাটাবার কৌশল ভুলিয়ে দেয়।এসব দেখে হাসেন মৌসুমী ভৌমিক। সমুদ্র ঘরে ফিরিয়ে দেবে ঠিকই কিন্তু লাইক কমেন্ট বা ইমোজি ঘর ভেঙ্গে দেয়…মনও।
(প্রোজেক্টারে অনেকগুলো ভাঙ্গা  আয়নার মধ্যে দিয়ে ছেলেটি হেঁটে যায়। মঞ্চে এখন অদ্ভুত সবুজ রং এর আলো।)
‘পরিখার ওপারে থাকে দৃপ্ত চিতাবাঘ
লাফ দিল তার উমম, শব্দ হল, দাঁতে লেগে
থাকা হাড়েদের কুচি, রক্তের দাগ
পরিখার ওপারেতে লাফ দেয় তীব্র চিতাবাঘ’
সেই চৌকো খুপরিতে পুরোনো টেবিল ঘড়িটা শেষ এলার্ম বাজিয়ে বসেছিলো। বসেছিলো আমার মতোই  নিস্তেজ হয়ে। এতোই নিথর এবং আতঙ্কিত লাগছিলো তার উপস্থিতি যেনো মনে হচ্ছিল যে কোনো এক ক্ষুধার্ত চিতা তার ঘাড়ের কাছে গরম নিঃশ্বাস ফেলছে।থাবাটাই যেনো ছায়া দিচ্ছে ঘড়িকে।একটা থাবা একইসঙ্গে ছায়া ও ভয় যুগপৎ জুগিয়ে যাচ্ছে দেখে ঘড়িটা তার যাবতীয় প্রদক্ষিনের সম্ভাবনাকে জড়ো করে আরেকবার অন্তত ঘুরতে চাইলো।
 ছেলেটি  ঘুরতে ঘুরতে এই কথাগুলি বিলাপের মতো করে বিড়বিড় করে বলে। সঙ্গে কিছু ঘড়ির টিকটিক চলে  নিজস্ব অবাধ্য গতিতেই।  
রোজকার শ্রমজীবী পৃথিবীর মতো আমার এই  ঘূর্ণন। শ্রম যার অভ্যেস অথবা গতায়াত সে আর কতোক্ষনই বা নিথর হয়ে থাকবে? বিষাদ তাকে চিনে ফেললেও সে খুঁজে খুঁজে কিছু নদী ডেকে আনে, জড়ো করে পাহাড়ের খোদলে বা নিজের স্মৃতির আদিম খোলসে। ঘুরতে ঘুরতে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধে নদী খোঁজে সে শুধু একটু জিরিয়ে নেবে বলে, খানিক পা ডুবিয়ে বসে থাকবে একা একা…এসব ভেবে সে খুঁজে চলে। ক্লান্তি ঝেড়ে নিতে হেলান দেয় সবজে পাহাড়ের কোলে। আহ্নিকগতিতে ছেদ পড়ে যায় যেনো। হঠাৎ বুঝতে পারে সেই ক্ষুধার্ত চিতাও পিছু নিয়েছে তার। ঘড়ি ঘাড় ঘুরায়, ফিরে তাকায়…দেখে সেই তীব্র চিতাবাঘ এর চোখে এক কালো পট্টি বাঁধা… ফলত এক সময় আরেক সময়কে দেখে যতোটা চমকে উঠবে ভেবেছিল ততোটা আর হয়না…বরং ঘড়ি চলতে শুরু করে, সেই শব্দে পিছন পিছন চিতাও…কোনো এক গহীন অরণ্য বা প্রাচীন মহাকাশে ওরা হয়তো মিলিয়ে যাবে…যাবেই।এসব বেবেই এক বড় ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড় আমি। লোকে এর পোশাকি নাম রেখেছে লকডাউন। 
(লকডাউনের খবরের বিবিধ মন্তাজ প্রোজেক্টারকে ঘিরে ধরে, সেই চিতার থাবার মতোই।)
‘আমার ক্যানভাস থেকে বয়ে যাচ্ছ আকাশে আবার
জগতে কোথাও কেউ জেগে বসে নেই
আমি ছাড়া আর কেউ নেই
আছে এই উন্মাদ আগার
আমি আর উন্মাদ
আগার
তুমি উন্মাদের বন্ধু নও অন্ধকার?’
(পাগলাগারদের ঘন্টা বেজে চলে। একটানা। একটা আলো উপর থেকে নেমে আসে ছেলেটির উপরে।)
এখনো কোনো কোনো পূর্বাভাষ মেলেনি বলে, হেল্পলাইনগুলোয় অন্ধকার বেশিবার বেজে ওঠেনি বলেই অনলাইন ছিলে তুমি অনেকরাত অব্দি। আসলে অনলাইনও একরকম সচিত্র এবং বিচিত্র ভ্রমণের দুনিয়া। যেখানে মূলত যে যা করে বাইরে সে তা বলেনা। ছেঁড়া মুখগুলো আরো ছিঁড়ে ছিঁড়ে চারপাশে কারা যে ছড়ায়।কারা? উত্তর মেলে না। তবুও এখনো কেউ কেউ পূর্বাভাষ মিলিয়ে নেবার অনিবার্য এবং ভূতগ্রস্ত আকাঙ্খায় বেখেয়ালি উপকূল বরাবর অর্থশুন্য হেঁটে চলে যদিও সে জানে কতশত বিস্মরণ অহৈতুকি ধ্যান বুকের উপর দিয়ে বয়ে যায় রেললাইনের মতো, যেখানে নিরাকার শয়তান সবসময় লাল সিগন্যাল জ্বেলে বসে থাকে…অনেকদিন পর কোনো এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় আমাদেরকে ডেকে বলে যেকোনো সাইক্লোন বা টর্নেডো, ঝঞ্ঝা বা টানা বৃষ্টি সে যতই শক্তিশালি হোকনা কেন সে আসলে অসম্ভব একা…শক্তি ছাড়া তার কোনো প্রলেপ নেই, পতন  ছাড়া তার কোনো সম্বল নেই। বজ্রপাতের তীব্র কন্ঠ আসলে তার রোদন…ফলত পূর্বাভাষ এলেই প্রশাসন থেকে চিলতে জমি মালিক সকলেই সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে, লাল সতর্কতা জারি করে। আর এরপর যদি মিলে যায় সমাচার? ভেঙ্গে যাওয়া পার, জীবন কিনারের পান্ডুর আভা মেখে বসে অনেক মানুষ একে অপরকে শুশ্রূষা দেয়…বেঁচে ওঠে বিচিত্র সব তাজ্জব জীবন, উন্মাদ স্টেশন। আলোহীন মানুষ ত্রাণ  শিবিরে ধর্ণা দেয়। ওৎ পেতে বসে থাকে ভাষণ   বা রেশনের জন্য। জনতার বুকের রেললাইন খুঁজে খুঁজে ঠিক সেট হয়ে যায় নতুন কোনো স্টেশনে, নতুন কোনো নেতার কোঠায়। …যেখানে সবুজ হয়ে ওঠে সিগন্যাল। ঢেউ,উড়ে আসা ঘরের চাল, পাখির  বাসা,মৃত দোকান, উপরে পড়া টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎ খুঁটি ফিরে যায় ট্রেনের কামরাতে গাদাগাদি করে যে যার নিজের স্টেশনে…আবার কোনো এক অজ্ঞাত দ্রাঘিমাতে ঘনিয়ে ওঠে পূর্বাভাষ…
(তীব্র ঝড়ের প্রাবল্য ও  শব্দে গোটা অংশটি বলে চলে এই ছেলেটি। মাঝেমাঝেই সিগ্ন্যালের মতো আলো দপদপ করে। সাইরেন বেজে যায়। ছেলেটি বিড়বিড় করে বলে…)
‘আজও পাশের বাড়ি থেকে গান আসছে
সন্ধেবেলার গান’
আমি কড়া নাড়লেই এক পাড়া দোকান বন্ধ হয়ে যায় তোমার। এই পাড়া যে আর্লস না আগ্রা সেসব ম্যাপ দেখে ঠাওর করা যায়না কখনো। কিন্তু এই গ্লোবাল স্পেসে শুরু হয় অনর্গল ফিসফাস, নীরবে কল্পনা মাখে এ জানলা ও জানলা। খানিকটা মায়াকাজল  ও। চোখাচোখি করে পান মুখে দেয় বৌদিরা। কাকিমারা কাপড় তুলতে তখনই ছাদে যায়, আমার কড়া নাড়া এবং ভিতরে ঢোকা দেখতে, দেখে না চাখে! যেভাবে আচার চাখে নতুন জিভ।বা ক্লিভেজ দেখে পাড়ার কালভার্ট সেভাবেই ওয়াল থেকে স্ট্যাটাস চেখে নেয় এই ভ্ৰমন পিয়াসী যাদুচোখগুলো। এই টুকরো ঘটনা সইতে সইতে হেলে পড়া বিকেলে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন ঝিমিয়ে পড়ে ঘুঘু। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নাছোড় চোখও ক্লান্ত হয় নীল মাছরাঙ্গার। হাঁকাহাঁকি বন্ধ করে ফেরিওয়ালারা চলে যাচ্ছে নিজেদের আস্তানার দিকে। যেনো অমলের সঙ্গে দেখা করবার সব প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে ওদের। বিক্রি হোক না হোক আমি পাড়ায় ঢুকলে যে যার মতো জায়গা ছেড়ে দেয়। অথচ সকলেই দেখে। এক স্বচক্ষে অথচ আড়চোখ দেখা সে সব। আমি বুঝতে পারি ঠিক এই সময় তানসেন গানে গানে আগুন ধরান। দীপক রাগ খেলা করে তোমার গোটা শরীর জুড়ে। আমিও প্রস্তুতি নি সবে। কিন্তু না বৃষ্টি নেমে যায়…রাগে রাগে বৃষ্টি নামিয়েছেন তখন তানসেন-কন্যারা। এতোক্ষন যারা জ্বলে পুড়ে মরছিলো তারাও শীতল হয়, সব জ্বালা মেটে তাদের। অর্ধদগ্ধ তানসেনের শরীর বেয়েও বর্ষা নামে। ভেজা চোখ খুলে তিনি দেখেন পুনরায় রোদ্দুর চেয়ে একহাতে ভিক্ষাপাত্র অন্যহাতে ক্যানভাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ভিনসেন্ট। তিনি পাড়ার সকলকে একটা করে সূর্যমুখী দেন আর তানসেনকে দেন স্টারি নাইট…এসব দেখে আমি পালাতে শুরু করি, পালাতে…পিছনে ছুড়ি নিয়ে ছুটে আসছেন ভ্যানঘগ…সামনে সিগন্যাল এ দেখি আমার মুখ কেমন যেন পল গগ্যাঁ  মতো হয়ে এসেছে… আর আশপাশের সব বাড়ির রং হলুদ, সব দরজার রং সবুজ…সব দরজা খোলা…প্রতি দরজায় বিষণ্ন অমল ডেকে চলেছে তার নিজের দইআলাকে।
ভ্যানঘগের  নানা ছবির কোলাজ এই দৃশ্যে ঘুরে ফিরে আসে। ছেলেটি হারিয়ে যাবে তার মধ্যে আবার বেরিয়ে আসবে। বসে থাকবে জানলার দিকে তাকিয়ে। দৃষ্টি  অসম্ভব শুকনো। পাতা ঝড়ে পড়বে এই একলা অমলের গায়ে। 
‘যেন কোনো যাদুঘরে ঘুমায়েছে মনে হয়
পেটের ভিতরে খড় পুরে
চিতাবাঘিনীর মতো সুন্দর উজ্জ্বল
ভীষণ, উজ্জ্বল, সুন্দর
ঘুম দরজা খোলে এবার। চোখ কচলে দেখে নেয় চারদিক। রুকস্যাকের চেনে মোম ঘষে প্ল্যাস দিয়ে ভালো করে চেপে নেয়, টিফিন কৌটার বাটিটি একবার যত্ন করে আটকে, জলের বোতল থেকে সামান্য জল গলায় ঢেলে এবার সে পথে নামে। এখন রাস্তা তার একার। এবারে সে বিলিয়ে দেবে, বিছিয়ে দেবে, এলিয়ে দেবে, ভরিয়ে দেবে, ভাসিয়ে দেবে ঘুম দিয়ে। কখনো পরিশ্রম অনুযায়ী, কখনো অবস্থান অনুযায়ী, প্রেক্ষিত বুঝে নেবে কখনো। এরপর গুছিয়ে গুছিয়ে খামে ভরা ঘুম, ক্যাপসুলে ভরা ঝিমুনি, সাদা চাদরে মোড়া আদরের ভারী নিদ্রা কিম্বা বরফ উপচে পড়া রঙ্গিন গ্লাসের টেনশানের ঘুম বা আই সি ইউ এর মত ঠান্ডার মতো নিঃসাড় কোমার মতো ঘুম বা ঘুমের অসুখ ভরে দেয় এই কমলালেবুর মতো পৃথিবীর সকল আদম ঈভের চোখে চোখে। পাতা ভারী হয়ে আসে চোখের। বিছানা বা আস্তানা খোঁজে সকলেই কেউ বা খুঁজে নিয়েছে এক ফালি ফুটপাত বা অন্ধকার রক। শুক্লপক্ষের চাঁদ জেগে থাকে শুধু। সে নানান কলায় উঁকি দিয়ে দিয়ে ঘুম দেখে যায়। 
ঘুম এবারে মেঘের পিঠে চড়ে নেয়। এবারে সেই চড়কা কাটার বুড়ির সঙ্গে গল্প জমাবে সে। প্রিয় চাঁদমামা আর ঘুম… তখন তার রুকস্যাক হয়ে ওঠে প্রায় প্যারাশুট। হাওয়া ভরে নেয় প্রাণপণে, আকড়ে ধরে মেঘের পালক…এক ছায়াপথ থেকে অন্য আকাশ গঙ্গায় তখন সে মহাকাশচারী। চাঁদ সরে সরে যায়… আর ঘুম না পৌঁছানোর জন্য চাঁদের বুড়িরও আর ঘুম আসে না। অনিদ্রা পেয়ে বসে তাকে। চরকা চালিয়ে যায় সে।স্পেস জুড়ে প্রচুর  সাদা সুতো ঢুকে এসে ছেলেটিকে ঢেকে দেয় যেনো। সঙ্গে চরকা  কাটার শব্দ বাড়তে থাকে। স্পেস জুড়ে আলো এখন তীব্র ঘন নীল। আকাশে যেনো চাঁদ খেলে যাচ্ছে একা একা। 
…সুতোর পরে সুতো জমে যায়…এবারে পৃথিবীর সমস্ত মা মধ্য যামের তাদের বাচ্চাদের ঘুম ডাকের গান গায় …আয় আয় চাঁদ মামা টি দিয়ে যা চাঁদের কপালে চাঁদ টি দিয়ে যা। জোৎস্না কুমারীরা খুঁজে আনে সুন্দরী প্রায় বিলুপ্ত মৎস কন্যাদের। তারা সেই রাশি রাশি সুতোর উপরে রঙ্গিন ঘুড়ি লাগায় …ঘুমের লাটাই তখন হাতবদল হয়ে যায়। জোৎস্না আলোয় বহু রঙের ঘুড়ি উড়ে বেড়ায়… ঘুমের স্বর্গে সকলেই ঘুড়ি দ্যাখে। ঘুমে ঘুমে প্যাঁচ কাটে জীবনের। ঠিক এর নীচেই,  পৃথিবীর এক প্রাচীন মেঘভর্তি মহাকাশের নীচে, যেখানে তারারা লুকোচুরি খেলছে অনবরত সেখানে সেই প্রায় বিলীন হয়ে আসা বিস্তীর্ণ তটে তখন পার্টি করে মৎস্যকন্যা ,জোৎস্নাকুমারী ও চাঁদমামা।…মাঝে মাঝে ধূমকেতু এসে বসে ওদের মুখোমুখি কখনো বা উল্কা অথবা কক্ষচ্যুত কোনো নীল রং এর উপগ্রহ। সকলে মিলে ষড় করে কোনো এক আগাম আকাশ ঘুমের…
(ঘন নীল আলোর মধ্যে বেজে চলে একটানা বেহালা। ছেলেটি  জানলাগুলো খুলতে চেষ্টা করে। পারেনা। আলো তাকে ফলো করে। )

7 thoughts on “পরিব্রাজকের মনোলগ

  1. খুব ভাল, খুব ভাল….. অনেকের অব‍্যক্ত সংলাপ উচ্চারিত হয়েছে এই পরিব্রজ‍্যায়। অপেক্ষা রইল

  2. অপূর্ব লেখন! রিয়্যালিটি থেকে সুররিয়্যালিটিতে এই অবাধ গতায়াত অভি’র লেখনীর বৈশিষ্ট্য। আর সেটাই আমার মতো অভি-মুগ্ধ পাঠকদের অভি-প্রব্রজ্যা গ্রহণে প্রলুব্ধ করে। বারবার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত