আজাদ হিন্দ

স্বাধীনতার আগে শপথ নিয়েছিল সেই সরকার। আজাদ হিন্দ… শপথ নিয়েছিলেন নেতাজি। স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। ভারতে না থেকেও। মুক্ত করতে চেয়েছিলেন দেশকে বিদেশি শাসনের কবল থেকে। পূর্ণ হল সেই আজাদ হিন্দ সরকারের ৭৫ বছর।

।।ডঃ জ য় ন্ত চৌ ধু রী।।
সারারাত জাগা। বহুদিনের স্বপ্ন, পরিশ্রম, আর সংকল্প, স্বাধীনতার সোনালি ভোরকে স্পর্শ করতে। নানা স্তরে প্রস্তুতিপর্ব চূড়ান্ত। স্থান সিঙ্গাপুরের ক্যাথে বিল্ডিং হল। দিনটা ছিল ২১ অক্টোবর ১৯৪৩। পূর্ব প্রাচ্যের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধি ও মালয়ে বসবাসকারী হাজার হাজার নাগরিক। অধিবেশন কক্ষের বাইরে উপচে পড়া সমাবেশ।
আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন থেকে শুরু করে, পূর্ব প্রাচ্যে ভারতীয়দের মধ্যে মানব, অর্থ, রসদ সম্পদ সম্পর্কে সর্বময় সংহতির আহ্বান জানান নেতাজি। মধ্যবিত্ত, দরিদ্র ও ধনী শ্রেণী সবাইকে জাতীয় সেবা ও ত্যাগের আহ্বান তাঁর। আন্তর্জাতিক স্তরে সংগ্রামের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে জানান ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কাহিনী। বাংলায় অনাহারে যখন লাশের সংখ্যা বেড়ে চলেছে… নেতাজি তখন স্বাধীন ভারত গড়ে তোলার চেষ্টায় আহার-নিদ্রা ভুলেছেন। সমস্ত খবর পেতেন তিনি। যতবার খাদ্যশস্য, চাল ইত্যাদি ভারতে পাঠাবার চেষ্টা করেছেন, নিষ্ঠুর ব্রিটিশ প্রশাসন ততবার প্রত্যাখ্যান করেছে সে প্রস্তাব। নেতাজি প্রবাসী ভারতীয়দের আরও জানিয়েছিলেন—‘ভারতের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অস্থিরতা গভীর আকার ধারণ করেছে। বিশেষত বাংলায় দুর্ভিক্ষজনিত অবস্থা। হৃদয়ভেদী এই অবস্থায় একটি মাত্র আশা, অনাহার বিপ্লবের জন্ম দেয়…। আমাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি শুধু ভারতীয় জনগণই পূর্ণ সমর্থন করছেন তাই নয়, ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীর একটি বড় অংশেরও সমর্থন রয়েছে এই কাজে।…’ শেষে তিনি জানান ‘বন্ধুগণ! এখন আপনাদেরকে জানাতে চাই যে, লিগের বিকেলের অধিবেশনে আজাদ-হিন্দ সরকারের গঠন ঘোষণা করব।
বিকেল চারটেয় সভাগৃহ দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিতে পরিপূর্ণ। জাপানকে ধন্যবাদ জানানোর পর সদ্য স্বাধীন হওয়া বর্মা ও ফিলিপিন সরকারকে শুভেচ্ছা জানান নেতাজি। আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন হিন্দুস্তানিতে, তামিল ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন চিদম্বরম।
নেতাজি আইরিশ ও তুরস্কের উদাহরণ টেনে জানান, আজাদ হিন্দ সাময়িক সরকার এবং মন্ত্রিমণ্ডলীতে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধির সঙ্গে অসামরিক বিভাগের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। মন্ত্রিসভায় উপদেষ্টামণ্ডলীতে থাকবেন করিম গনি, দেবনাথ দাস, ডি এম খান, এ ইয়েলাপ্পা, জে থিবি, সর্দার ঈশার সিং এবং এ এন সরকার (আইন বিষয়ক উপদেষ্টা)। প্রধান উপদেষ্টা রাসবিহারী বোস। তিনি আরও জানান, অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে স্থানান্তরিত হলে সেখানে সাধারণ সরকারের মতো সব কিছুই পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। খোলা হবে অনেক নতুন বিভাগও। রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, সমর ও বৈদেশিক নীতির দায়িত্বে সুভাষচন্দ্র বসু। নারী সংগঠনে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন, এস এ আইয়ার (প্রচার বিভাগ), এ সি চ্যাটার্জি (অর্থ)। এছাড়াও লেফটেন্যান্ট কর্নেল—আজিজ আহমেদ, এম এস ভগৎ, জে কে ভোঁসলে, গুলজারা সিং, এম জেড কিয়ানি, এ ডি লোগনাথন, ঈশানকাদির, শাহনওয়াজ খান এবং সচিব সম্পাদক হিসেবে এ এম সহায়।
বিপুল উল্লাসে দীর্ঘ অভিনন্দন জ্ঞাপন করা হয়েছিল। সে দিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, নেতাজি যখন হিন্দুস্তানিতে শপথ গ্রহণ করেন তখন তাঁর চোখে বারংবার জল চলে আসছিল। মর্মস্পর্শী কণ্ঠে তিনি যা বলেছিলেন, তা উপস্থিত দর্শকদের হৃদয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে তিনি সেই ঐতিহাসিক শপথ বাক্য পাঠ করেন—‘আমি সুভাষচন্দ্র বসু ঈশ্বরের নামে গ্রহণ করছি এই পুণ্য শপথ; ভারতবর্ষে ও ভারতবাসীর জন্য জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পবিত্র স্বাধীনতার যুদ্ধ পরিচালনা করব।… চিরকাল আমি থাকব ভারতের সেবক। ভারতের ৩৮ কোটি ভ্রাতা-ভগিনীর কল্যাণ সাধন করাই হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য।… স্বাধীনতা অর্জনের পরেও সেই স্বাধীনতা রক্ষাকল্পে আমি দেহের শেষ রক্তবিন্দু দান করবার জন্য প্রস্তুত থাকব।’ মন্ত্রিবর্গের শপথ গ্রহণের পর অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন ইংরেজিতে। তিনি প্রথমে সিরাজউদ্দৌলা, মোহনলাল, হায়দর আলি, টিপু সুলতান, ভেলুতাপ্পি, আপ্পাসাহেব ভোঁসলে। পেশোয়ারের বাজিরাও, অযোধ্যার বেগমগণ, পাঞ্জাবের সর্দার শ্যাম সিং, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া তোপি, কুঁয়র সিং, রানাসাহেব প্রমুখ ব্রিটিশ বিরোধী পূর্বতন সংগ্রামের নায়কদের স্মরণ করে জানান—‘বেদনাদায়ক ব্রিটিশ শাসনের শেষ চিহ্ন ধ্বংস করতে প্রয়োজন একটি অগ্নিশিখার। ভারতীয় মুক্তিবাহিনীর কাজ হল সেই অগ্নি শিখাকে প্রজ্বলিত করা।… এই সামরিক সরকারের কাজ হবে ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তিকে ভারতের মাটি থেকে বিতাড়িত করা। তারপর এই অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করবে ভারতবাসীর ইচ্ছানুযায়ী তাঁদের আস্থাভাজন একটি স্থায়ী সরকার।… প্রত্যেক নাগরিককে যে কোনও ধর্মপন্থা অনুসরণের স্বাধীনতা, সমানাধিকার, সমান সুযোগ দান এই সরকারের প্রতিশ্রুতি।… সমগ্র জাতির সুখ সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে আজাদ হিন্দ সরকার কৃতসংকল্প। নিজ কার্য সিদ্ধির স্বার্থে বিদেশি সরকার সুচতুরভাবে ভারতীয়দের মধ্যে সৃষ্টি করেছিল যে সমস্ত বিভেদ সেসব নিঃশেষ করে দেবে এই সরকার… ঈশ্বরের নামে, আমাদের যেসব পূর্বপুরুষ ভারতবাসীকে এক জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা করে গিয়েছেন তাঁদের নামে এবং অতীতের যে সব বীরপুরুষেরা শৌর্য ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন আমাদের জন্য, তাঁদের পবিত্র নামে—আমরা আহ্বান জানাচ্ছি প্রত্যেক ভারতবাসীকে, আজাদ হিন্দ সরকারের পতাকাতলে সমবেত হয়ে মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত হতে।…’
এরপর ইতিহাসের চাকা দ্রুত এগতে থাকে।
ছবিঃ সংগৃহীত
জাপানের সক্রিয় সহায়তা পেলেও ক্রমশ প্রবাসী ভারতীয়দের মাতৃভূমির প্রতি প্রবল শ্রদ্ধার কারণে আজাদ হিন্দ সবদিক দিয়ে নিজস্ব শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। ইউরোপের জামার্নিতে নেতাজির হাতে গড়া ইন্ডিয়ান লিজিয়ন পেয়েছিল আধা সামরিক স্বীকৃতি কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সেই নেতাজির প্রবল মেধা ও বৈপ্লবিক ব্যক্তিত্বের সাংগঠনিক মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বৈধ আজাদ হিন্দ সরকার। একে একে স্বাধীন সরকারগুলির তরফে স্বীকৃতির শুভেচ্ছাবার্তা আসতে লাগল জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, জাপান, চীন (নানসিং সরকার), ফিলিপাইন, বর্মা, শ্যামদেশ ও মাচুকুয়ো থেকে। যুদ্ধে নিরপেক্ষ দেশ আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রপ্রধান ইমন, ডি ভ্যালেরা নেতাজিকে পাঠান ব্যক্তিগত অভিনন্দন। আশ্চর্যের বিষয়, সোভিয়েত রাশিয়া মিত্রপলের ব্রিটিশ আমেরিকানদের পক্ষে থাকলেও নীরবে ও গোপনে আজাদ হিন্দ সরকারকে স্বীকৃতি ও সে দেশে দূতাবাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। সাম্প্রতিককালের মুখার্জি কমিশন সূত্রে এমন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
আত্মমর্যাদায় বলীয়ান আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান সামরিক লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে সফর করেন। প্রত্যেক দেশেই হিন্দুস্তানি ভাষায় কবিগুরুর জনগণমনঅধিনায়ক জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় বেজে উঠত। প্রবাসী ভারতীয়দের মনে তীব্র উন্মাদনা ও দেশপ্রেম সঞ্চারিত করেছিলেন নেতাজি। সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা নেতাজি গঠন করেছিলেন নারী বাহিনী ঝাঁসি রেজিমেন্ট। সেখানেও ছিল মাতৃভূমির জন্য রক্তস্বাক্ষরের অঙ্গীকার।
ব্রিটিশ মুক্ত আন্দামান-নিকোবর ভূখণ্ডগুলি জাপান হস্তান্তরিত করল আজাদ হিন্দকে। নেতাজি দ্বীপভূমিতে পদার্পণ করে নামকরণ করলেন শহিদ ও স্বরাজ দ্বীপ। মুক্ত সেলুলার জেল পরিদর্শন করলেন রাষ্ট্রপ্রধান সুভাষচন্দ্র। উত্তোলন করলেন আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকাটি। দু’বারের নির্বাচিত জাতীয় কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি সুভাষচন্দ্রের প্রিয় ও ভারতবাসীর কাছে অতি পরিচিত চরকা শোভিত ত্রিবর্ণ পতাকা ছিল আজাদ হিন্দ সরকারের পতাকা ও সামরিক শক্তি আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা ছিল ব্যাঘ্র শোভিত ত্রিবর্ণ পতাকা। তাই, প্রচার, প্রশিক্ষণ, পুনর্গঠন, বিদেশ, শ্রমসহ ২৪টি বিভাগের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নেতাজির উদ্দীপনামূলক ভাষণ, বিভিন্ন ভাষায় পত্রপত্রিকা প্রকাশ, সিক্রেট সার্ভিস প্রভৃতি কার্যকলাপ বিশ্বের সামরিক বাহিনীর ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান করে দিয়েছে আজাদ হিন্দকে। বিভিন্ন ডিভিশনে, রেজিমেন্টে বিভক্ত আজাদ হিন্দ ফৌজ অদম্য শক্তিতে বার্মা সীমান্ত অতিক্রম করে মূল ভারত ভূখণ্ডে আধিপত্য কায়েম করে। প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটারের মতো এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন শুরু হয়। আনুষ্ঠানিক সরকার ঘোষণার দু’দিনের মধ্যেই ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে আজাদ হিন্দ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে বাংলায় ব্রিটিশের তৈরি দুর্ভিক্ষ নেতাজিকে বিচলিত করেছিল। কোহিমা ইম্ফল ইরাবতী নদী তট রণাঙ্গনে ঘটেছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। ঘটেছিল বিশ্বাসঘাতকতার জেরে অনেক আজাদি সেনার মৃত্যু। তবু হাকা, কালম, কাবা মৃত্যু উপত্যকায় কিংবা টামু, পালেলে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আজাদি সেনাদের গেরিলা যুদ্ধ ইতিহাসে অনন্য। জুলাই মাসের প্রবল পাহাড়ি বর্ষায় জয় ধরে রাখা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এসেছিল প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ। দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলায় তখন চিন্তা চেতনায় অবক্ষয় শুরু হয়েছে। সুভাষচন্দ্রের অনুপস্থিতির সুযোগে রাজনৈতিক শত্রুরা নেতাজি বিরোধী জিগির জনমনে তুলে দিয়েছিল ব্রিটিশের সঙ্গে গলা মিলিয়ে। জাতীয়তাবাদী, বিপ্লবী নেতা কর্মীরা তখন অধিকাংশ জেলে। আজাদ হিন্দ-এর ভারত অভিযানকে, আজাদি সেনাদের আত্মত্যাগকে ভারতবাসীর কাছে জানতে না দিয়ে নেতাজির বিরুদ্ধে অশালীন কার্টুন ও কুৎসা রটনা হতে লাগল। নেতাজির ভারতে পাঠানো সিক্রেট সার্ভিসের লোকজনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলার মাটিতে আজাদি সেনাদের সীমান্তে যুদ্ধজয়ের সঠিক সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হলে জাগ্রত জনতার চাপে সরাসরি দিল্লি জয় কঠিন হতো না। কিন্তু ব্রিটিশের চালে ভুল হওয়ার কারণে পরোক্ষে দিল্লি জয় সম্ভব করে তুলেছিল। নেতাজি বলেছিলেন দিল্লির পথ অনেক। বাস্তব ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম ও শিখ এই তিন সেনানায়কের দিল্লির লালকেল্লায় বিচার পর্ব শুরু হতেই দেশবাসীর কাছে গোপন রাখা আজাদ হিন্দের সংগ্রাম কাহিনী প্রকাশ্যে চলে আসে। দেশ জুড়ে গণবিক্ষোভ, নৌ সেনা, বায়ু সেনায় বিদ্রোহ শুরু হয়। দ্রুত দেশ ভাগের সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ। সহমত পোষণ করেন তৎকালীন জাতীয় নেতৃত্ব। ব্যতিক্রম ছিলেন কেউ কেউ। তাঁদের অন্যতম সীমান্ত গান্ধী বা খান আবদুল গফফর খান। গান্ধীজি তখন সবার কাছেই ব্রাত্য। সঙ্গে চোখের জল আর ‘বেটা’ সুভাষের জন্য আর্তি। দেশি বিদেশি গবেষক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতিকরা স্বীকার করেছেন স্রেফ নেতাজির বৈপ্লবিক ভারত অভিযান ব্রিটিশকে বাধ্য করেছিল ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। রাষ্ট্রীয় স্তরে কিংবা পাঠ্য বইতে স্বীকৃতি না মিললেও আন্তর্জাতিক এক সমীক্ষায় সর্বকালীন স্বীকৃতি মিলেছে আজাদ হিন্দের লড়াই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের কোটি কোটি অর্থ সম্পদ সদ্য ক্ষমতা লাভ করা সরকার লুট করেছিল। আজাদি সেনা কিংবা রানিদের চাকরি মেলেনি, পেনশন হয়নি, এমনকী অনেকের এদেশে ঠাঁইও হয়নি। যশোরের ঝিকরগাছা, বারাসত, বারাকপুরের নীলগঞ্জ, মুলতান, দিল্লির বাহাদুরগড় প্রভৃতি বন্দি শিবিরগুলিতে অকথ্য অত্যাচার, ফাঁসি এবং গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় আজাদিদের। মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়, কোথাও বা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় সেই দেহ। বিশ্বের কাছে এই বর্বরতা সেদিন গোপন করা হয়েছিল। প্রতিবেদক সম্প্রতি যশোরের কপোতাক্ষ নদী ও বারাকপুরের লাবণ্যবতী নদীর (নোয়াই খাল) পাশেই আজাদি শহিদদের রক্তে রাঙানো ভূমিকে প্রণাম করে এসেছে। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের নাম উৎকীর্ণ আছে যেখানে নেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করা কোনও আজাদি সেনার নাম। দিল্লির বুকে এত বছর পরে যদি আই এন এ গেট বা মেমোরিয়াল অব ইউনিটির স্মারক স্তম্ভে ফাইলে প্রকাশিত হাজার হাজার আজাদি সেনাদের নাম উৎকীর্ণ রাখা যেত, তাহলে জাতীয় লজ্জা কিছুটা হলেও মোচন হতো। ১৯৯৩ সালে আজাদ হিন্দের সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্‌যাপন কালে আজাদ হিন্দের নানা সৈনিক ও ঝাঁসি রানিরা আজ প্রায় সবাই প্রয়াত। কলকাতার বুকে রবীন্দ্রসদনে হয়েছিল মূল অনুষ্ঠান। প্ল্যাটিনাম জুবিলিকালে প্রকৃত সত্যের আলোকে আরও বড় প্রত্যাশা রয়ে যায়। চিরকালীন গর্বের উত্তরাধিকার নেতাজি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, যা থেকে একদা প্রেরণা লাভের কথা কলকাতায় এসে স্বীকার করে গিয়েছিলেন মুজিবর রহমান… নেলসন ম্যান্ডেলাও।
[লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতাজি বিষয়ে ডক্টরেট]
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত