ব্যক্তিত্বের আনন্দময়তা বিষাদ হতে রক্ষা করে

ছবিঃ সংগৃহীত

 

বিষণ্ণতা আমাদের গতিময় জীবনের সবচেয়ে পরিচিত মানসিক দুরবস্থা, একটি সমীক্ষায় দেখা যায় ২০৩০ সাল নাগাদ বিষণ্ণতা হবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। আমাদের দৈনন্দিক জীবন দিনকে দিন ব্যস্ত হতে ব্যস্ততর হচ্ছে, এবং চাহিদার সাথে ক্রমাগত বাড়ছে অতৃপ্তির ঘটনা। এই মর্মে আমাদেরকে বিষাদ বা নৈরাশ্যকে জানা এবং বাস্তবিক মোকাবেলার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল আয়ত্ব রাখাটা আত্মরক্ষার একটি ধাপ বলতে হবে। এক্ষেত্রে সমস্যাকে চিহ্নিত করা জরুরি।

বিষণ্ণতা কি এবং কেমন এর বৈশিষ্ট্য?

বিষণ্ণতা বা বিষাদজনিত সমস্যাকে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার বলা হয়। যে ক্রমাগত অনুভূতি দুঃখবোধ, অর্থহীনতাবোধ ও যে কোনো আনন্দ কার্যক্রমে অনীহা তৈরি করে তাকে  ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার বলে।

সাধারণত-

  • নির্লিপ্ত ভাব
  • আগ্রহহীনতা
  • আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
  • নিরাশা
  • অসহায়ত্ব
  • দুর্বলতা বোধ
  • আত্মহত্যার প্রবণতা
  • অমনোযোগ
  • অপরাধবোধ

এবং

  • ক্ষুধাধামন্দা/অতিক্ষুধা
  • ওজন হ্রাস/বৃদ্ধি
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • যৌন অনিচ্ছা
  • অনিয়মিত ঋতুস্রাব
  • ঘুমের সমস্যা- ঘুম আসতে বিলম্ব/হঠাৎ ঘুম চটকে যাওয়া/অতিনিদ্রা
  • আবেগহীনতা

এই সকল উপসর্গ বিষাদ নির্দেশ করে থাকে এবং ব্যক্তিকে সমাজ থেকে ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, মেজাজের স্বাভাবিকতা ও চিন্তার নির্দিষ্টতা নষ্ট করে এটি আরো ভয়াবহ মানসিক ব্যাধির দিকে ঠেলে দেয় যা চিন্তাশক্তিকে বাস্তবতাবিবর্জিত করে ফেলতে সক্ষম। তবে এই পর্যায়ে ব্যক্তি তার সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারে এবং চিকিৎসায় স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

অতএব আমাদের চারপাশে বিপুল সমস্যা নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত হই, বিষাদও সমস্যা হিসেবে ততোধিক মনোযোগ পাবার দাবী রাখে নিঃসন্দেহে। জীবনের নিয়মিত সমস্যা যেনো মানসিক চাপের দরুণ এই পর্যায়ে না চলে আসে তার জন্য প্রয়োজন কাছের ও প্রয়োজনীয় মানুষগুলির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা। এজন্য দেখা যায় চটপটে ব্যক্তিত্বের মানুষ বিষাদে ভোগে না আর যে কোনো চাপকে সামলে নেবার অভিব্যক্তি তাদেরকে সকলের চেয়ে আলাদা প্রমাণ করে।

 

বিষাদ একটি সুপরিচিত মানসিক দুরবস্থা, এবং বিষাদ মানেই আপনি ধ্বংস হয়ে গেলেন তা কিন্তু নয়। পৃথিবীতে বহু বিখ্যাত মানুষ বিষাদকে জয় করে সৃজনদক্ষতায় পৃথিবীকে আলোকিত করে গেছেন। হ্যারি পটার এর স্রষ্টা জে কে রাওলিং লাখ লাখ শিশুকে এক কল্পনার রাজ্য উপহার দিয়েছিলেন নিজের লেখনীর মাধ্যমে। অথচ এই লেখিকা বহুদিন ধরেই বিষণ্নতায় ভুগছেন। আর এটি প্রভাব ফেলেছে তাঁর লেখাতেও। ২০১০ সালে অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাওলিং বলেছিলেন, ‘যে এতে ভোগেনি, তাঁকে বিষণ্নতা কী, তা বোঝানো দুঃসাধ্য। এটি কিন্তু শুধু দুঃখবোধ নয়। অনেকটা অনুভূতিশূন্য মানসিক অবস্থা। হ্যারি পটার-এর বিভিন্ন উপন্যাসের খল চরিত্রগুলোর মধ্যে আমার বিষণ্নতা ফুটে উঠেছে।‘*

 

বিষণ্নতা থেকে রেহাই পাননি নভোচারীরাও। ১৯৬৯ সালে চন্দ্রজয়ী বাজ অলড্রিন যখন খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন, তখনই বিবাহবিচ্ছেদ হয় তাঁর। পারিবারিক অশান্তি একপর্যায়ে বিষণ্ন করে দেয় এ নভোচারীকে। ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাজ অলড্রিন স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, তাঁর মা ও নানাও একই রোগে ভুগেছিলেন এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যাও করেন। তবে নিয়মিত চিকিৎসায় সেরে উঠেছিলেন বাজ।*

 

এবং পরিশেষে বলা যায় ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবনের সুন্দরকে উদযাপন করতে পারা, যে কোনো মানসিক চাপ যদি আপনাকে এই বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাহলে অবশ্যই সতর্ক হোন এবং প্রিয়জনকে শেয়ার করুন, উপসর্গ বিশ্লেষণ করুন। চিকিৎসা আপনাকে সঠিক জীবনভঙি উপহার দিতে সক্ষম।

 

লেখকঃ ডাঃ রমজান সরকার সাজ্জাদ

এমবিবিএস, এমপিএইচ(কোর্স), সিসিডি(ডায়াবেটলজী)

ডিওসি(চর্ম-যৌন রোগ)

সহকারী রেজিস্ট্রার, মানসিক ও মাদকাসক্তি রোগ বিভাগ

টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ, বগুড়া, বাংলাদেশ।

কবি, প্রাবন্ধিক ও স্বাস্থ্যকলাম লেখক।

 

* তথ্যসূত্র- দৈনিক প্রথম আলো, অনলাইন ডেস্ক, ১০ই মে ২০১৭

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত