নক্ষত্রপুঞ্জের নিশান

পথের হদিস পথই জানে

৪ঠা জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস।আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীতের জন্মভূমি দেখার সাধ আমার বহুদিনের ছিল বটে, কিন্তু চঞ্চল পথিকের প্রেম বহুগামী। তাই এত বছর ধরে এত জায়গা ঘুরেছি, মোটামুটি কাছে থেকেও বাল্টিমোর যাওয়া হয়ে ওঠেনি আজ অব্দি। অবশেষে এক শুক্কুরবার বেরিয়ে পড়তেই হল “Star-Spangled banner”-এর সেই আশ্চর্য মোহময়তার উৎস স্থলের দিকে। নক্ষত্র তেজদীপ্ত সেইসব যুদ্ধজাহাজের নিনাদ মাখা বন্দরনগরী আর আমার আলো-আঁধারীর রাজা এডগার অ্যালন পোর বাড়ি খুঁজতে আমেরিকার মেরিল্যান্ডের বৃহত্তম শহর বাল্টিমোরের জন্য। দুদিনের ছোট্ট সফর। উত্তেজনা ছিল ঠিকই, কিন্তু উদোম সড়ক ধরে যখন ছুটে চলছিল নিউ জার্সির নেওয়ার্ক থেকে বাল্টিমোরের উদ্দেশ্যে গ্রে হাউন্ড বাস খানা।

আমার মনে প্রথম নায়াগ্রা কিম্বা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যাওয়ার মত ভাললাগা চেপে বসেনি। সাধারণ বাঙালি মন আমার। ভেবেছিলাম এও আর একটি পারিবারিক টুর হিসেবেই পড়ে থাকবে মনের কোনায়। কিছু ভুল ভেঙ্গে যাওয়া যে এত প্রিয় হতে পারে সেটা বুঝেছিলাম পরেরদিন। তার আগে অবশ্য মায়াময় সন্ধ্যে কাটালাম। আমার এক  পিসতুতো দাদা সময়ের আগেই গাড়ি নিয়ে হাজির বাসস্ট্যান্ডে। বাড়ি যেতেই ছোট্ট ভাইজি পায়ে পায়ে ঘুরছে, গায়ে লেপ্টে আছে সোয়েটারের মত। বউদিটি খাঁটি ২৪ ক্যারেট।

জন-তরঙ্গে আমরা ক্ষিপ্ত ঢেউ ফেনিল

ঠিক এমনটাই হচ্ছে ফোর্ট ম্যাক হেনরি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবাদ যাদের চেয়েছে শোষণের কৃষ্ণগহ্বরে বিলীন করে দিতে, তারা অন্তরের আলোকলতায় ভাস্বর হয়ে তৈরি করেছে মুক্তির ইতিহাস। এই আমেরিকার একমাত্র দ্রষ্টব্য যেটি ন্যাশনাল পার্ক আর ন্যাশনাল মনুমেন্ট দ্বৈত সম্মানে উজ্জ্বল। সার্জেন-সোলজার জেমস ম্যাকহেনরির নামানুসারে নাম হয়েছে দুর্গটির।  

জেমসের সাক্ষর আছে আমেরিকান কনস্টিটিউশানে। ভিজিটর সেন্টারে যুদ্ধজয়ের একটি নাতিদীর্ঘ ডকুমেন্টারি দেখে আমরা এগোলাম দুর্গের পথে। বিবস্ত্র সভ্যতার সীলমোহরে গাঁথা আছে যুদ্ধের কিছু ক্ষয়দাগ আর জয়-পরাজয়ের গল্পগাথা। ঢুকেই পরিখার প্রহরা দুর্গের চারিপাশে। মন দিয়ে পড়ছিলাম ফলকে লেখা কাহিনি।

“আর ইউ ইন্ডিয়ান? আই মিন বর্ন দেয়ার?” অচেনা কন্ঠে চমকে তাকিয়েছি ।

এক মাঝারি বয়েসের ভদ্রলোক। একেতে জায়গাটি তেমন টুরিস্ট বহুল নয়। তারপর ঝুরঝুরে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকার জয়গাথা পড়ছে একটি ভোম্বলমার্কা ভারতীয় মেয়ে। হয়ত সেটাই অবাক করেছে তাকে। মিনিট দশেক গল্প হল। উনি চলে গেলেন তারপর।

যাইহোক, এরপর সিংহদুয়ার পেরিয়ে পঞ্চভুজাকার দুর্গের ভেতরে প্যারেড গ্রাউন্ডে। তাকে ঘিরে নানান কিছু। দরোজাটা দেখে রাজস্থানী হাভেলির দরজাগুলো মনে পড়ছে। শক্তপোক্ত বাধা। ঢুকেই ডানদিকে কমান্ডিং অফিসারদের কোয়ার্টার আর গার্ডহাউস। ভোজের এলাহী বিস্তার টেবিলে, আসল কিছুই নেই যদিও। তবু সেই রথের মেলার মাটির খাবারের মত মাংসের রোস্ট, চিজ, সুরা আর সবজিতে লাঞ্চ অথবা ডিনার স্প্রেড সাজানো। পাশে বিছানা, ফায়ারপ্লেস, বেসিন, চেয়ার, পড়ার টেবল। একচিলতে অন্দরে সবকিছুই পরিপাটি। একটি আয়নাও রাখা আছে। হঠাৎ মনে হল, যে অফিসারটি মুখ দেখতেন তার কি গর্ব হত নিজের জন্য? নাকি মুখটুকু না দেখে যেই শত্রুর বুকে এঁকে রেখেছেন ট্রিগারের গুলি সদ্য? তার জন্য একটা চাপা হাহাকার বোধ হত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে? এর পাশেই বারুদখানা। গুলি কামান বোঝাই। জুনিয়র অফিসারদের ঘর, ব্যারাকের সারি পরপর । বাঁদিকে আছে সিভিল ওয়ার গার্ডহাউস। একটি রেডিও রাখা আছে ব্যারাকে। বিশ্বযুদ্ধের লাইভ কমেন্ট্রি চলছে বোতাম ঘোরালেই। আছে নানান সময়ে ব্যবহৃত সব অস্ত্রশস্ত্র। যে ক্রসের গায়ে লাগানো থাকত মার্কিনি পতাকা, তাও রাখা আছে সযত্নে। একমুহুর্তে পিছিয়ে যাচ্ছে সময়। এখুনি যেন সারি বেঁধে সৈনিকরা চলে আসবে। গায়ে শিহরণ লাগে। এইবার দুর্গের বাইরে চলে যাব। তার আগে একটু বলে নি কেন এত গুরুত্ব এই দুর্গের।

১৭৯৩ থেকে ১৮১৫ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের যুদ্ধের সময় দু’পক্ষই চেয়েছিল আমেরিকার পণ্য আর মালবাহী জাহাজ নিজের দখলে রাখতে যাতে বিপক্ষের প্রয়োজনীয় সরবরাহ বন্ধ হয়। কিন্তু আমেরিকা চিরদিন স্বাধীনতার জয়গানে বিশ্বাসী। “ফ্রি ট্রেড এন্ড সেলার রাইটস” এই স্লোগানে তারা ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ এদের মোকাবিলায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওয়াশিংটন আক্রমণ করে। তারপরেই আক্রমণ আসে বাল্টিমোরের দিকে। রণতরী আর ডুবজাহাজের সাহায্যে প্রায় ২৫ ঘন্টা লড়াই চলে গুলিবারুদের। তারপর ভোরের আলোর মত ফুটে ওঠে আমেরিকার নক্ষত্রখচিত ফিফটিন ষ্টার -ফিফটিন স্ট্রাইপ ফ্ল্যাগটি।

জয় হয় স্বাধীনতার, সাম্রাজ্যবাদের অবসানে। যেমনটা দেখেছে ইতিহাস যুগ যুগ ধরে। নিছক যুদ্ধ দেখেছিলেন আইনজীবী ফ্রান্সিস স্কটস কি। কিন্তু সেই লড়াইয়ের পবিত্র আগুন এত প্রাণিত করেছিল তাকে, নীতিবাগীশও প্রাণের অক্ষরে নথিবদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই অনুভব। যা একদিন হয়ে ওঠে আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত, “দ্য ষ্টার স্পেন্গল্ড ব্যানার”। অবশ্য পরবর্তী কালে ভাগ্যের ফেরে আমেরিকার অসামরিক যুদ্ধের সময় স্কটের নাতি ছিলেন এই দুর্গেই বিনা বিচারে আটক সকল রাজনৈতিক বন্দীদের একজন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এটিকে কেন্দ্র করে ৩০০০ শয্যার সামরিক হাসপাতাল গড়ে ওঠে। নিরন্তর সেবারত একজন নার্সের কথা লেখা আছে দেয়ালে বাঁধাই হয়ে, “যুদ্ধের ধংসস্তুপ থেকে আমাদেরই পুনর্নির্মাণ করতে হয় পরিছন্ন মানুষ…” সত্যি! এই ধ্রুবসত্য বন্দুকের নল কোনদিন জানবেনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবশ্য এই দুর্গের ভূমিকা ছিল কেবল উপকূলরক্ষী ঘাঁটি হিসেবেই।

দুর্গের বাইরে উপকূল ঘিরে কামান সাজানো থরে থরে। নিথর বসে রইলাম কিছু মুহূর্ত আমরা। এই জলে কত স্রোত বয়ে গেছে, ধুয়ে গেছে রক্তের দাগ। বৃষ্টি তখন ধরে এসেছে কিছুটা। কিন্তু আমার তখন অন্তরে মেঘ করছে প্রবল।

ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি

জেগে উঠলাম গাড়ি যখন থামল। আসলে খুব ইচ্ছে ছিল ওয়াটার ট্যাক্সি চড়ার। ছোটবেলার লঞ্চের মত একটা আনন্দ ছিল মনে। সেই বাদামভাজা খেতে খেতে মামাবাড়ি যেতাম বাবুঘাট থেকে লঞ্চ চড়ে। তখন মনে হত এটার জন্যেই মামাবাড়ি যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ফোর্ট ম্যাকহেনরি দেখার পর আজ মনটা বড় দ্রব। তাই এডগার অ্যালন পোর বাড়ির দিকেই গেলাম। আমার সেই ছোট থেকে পড়া বিখ্যাত ভুতুড়ে লেখক। তখন ভয় মানে পো। কেবল লিখে রোজগার করা প্রথম মার্কিনি লেখক। আমি তো এক জালি। কেরিয়ারের ঘাটে নোঙ্গর বেঁধে মাঝেমধ্যে কালচার্ড হওয়ার আনন্দে কলম ধরি। অপার বিস্ময় আমার যারা শুধু লেখেন তাদের নিয়ে। এত দেরি করে ফেলেছিলাম গাড়ি ছুটিয়েও সময়ে পৌঁছোন গেলনা। অ্যালন পো মিউজিয়াম ততক্ষণে বন্ধ। কিন্তু তার নামের রাস্তাটা আর বাড়িটা দেখলাম। এইখানে লেগে আছে তার পায়ের ছাপ। লেখনীর আঘ্রাণ। কেমন ছিলেন কে জানে? বরফে পিছলে গেছেন কোনদিন? কিম্বা ঠিক পাশের বাড়ির উদ্দাম মিউজিকে ভেঙ্গে গেছে মনোযোগ লিখতে বসে? আমার কেবল মনে হয় লেখকরা অন্য গ্রহের জীব। আমাদের এপার্টমেন্টের মতই তাঁদের বাড়িটাও একই রকম হলে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে।

যাই হোক, আগডুম বাগডুম দেখছিলাম আরো কিছু কিছু এরপর । ডাউনটাউন থেকে দেখা  যুদ্ধ জাহাজ। যারা নোঙ্গর বেঁধে আছে ইনার হারবারে। একোয়ারিয়াম, মিউজিয়াম, সায়েন্স সেন্টার, ক্রুজ, সারিবাধা দোকান। আলো, ভিড়। ব্যস্ত রাস্তাগুল সব। কিন্তু সেসব আজকের লেখায় জুড়তে নেই। খেলো লাগে।

পরদিন ফেরার পালা। পা ছড়িয়ে ঘরোয়া আড্ডা, ব্যালকনিতে বৃষ্টি আর জমাটি লাঞ্চে ভেটকি সর্ষে, ইলিশ ভাজা আর সেই তেলে মাখা বেশি করে নুন দিয়ে ভাত। রোববারের দুপুরে পাঁঠার মাংসও ছিল। বাইরের খাবার তেমন খাইনি। তবে এখানে এলে ক্র্যাবকেক খায় অনেকে, বেশ নাকি নাম আছে।

ফিরে এসে আমি ভিখিরির মত অক্ষর সন্ধান করছি, ভ্রমণ কাহিনি লিখব বলে। এই মনটাকে রঙের মত যে ছিটিয়ে দেব স্মৃতির ক্যানভাসে, পারিনা। কেবল “আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী…।”

কৃতজ্ঞতা স্বীকার (কবিতার লাইন): 

শক্তি চট্টোধ্যায়, জয় গোস্বামী, সুকান্ত ভট্টাচার্য

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত