বিশ্ব সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু

মানুষের স্বপ্ন তার নিজের ছায়ার চেয়েও বড়। পৃথিবীর ইতিহাসে এক অমর মহাকাব্যের নাম বঙ্গবন্ধু। সাত মার্চের অনবদ্য ভাষণে নিউইয়র্কের নিউজ উইক ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনিই হয়ে উঠেন পৃথিবীর প্রথম ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’। লেলিন ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ নেই যার নাম বঙ্গবন্ধুর সমান উচ্চতায় স্বনিত হতে পারে। বাইগার আর মধুমতীর জলে সিক্ত হয়ে যে খোকা একদিন কেঁদে উঠেছিলো টুঙ্গীপাড়ায় সেই খোকাই সময়ের নদীর স্রোতে বেড়ে উঠে হয়ে যায় সকলের বঙ্গবন্ধু। ঊনিশশো ঊনসত্তর সালের উত্তাল দিনগুলোতে, চারদিকে যখন আগুনের ফুলকিতে তিলে তিলে মাতৃগর্ভে তৈরি হচ্ছিল মুক্তি, তখনই ছাত্রনেতা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাকের দেওয়া উপাধিতে ইতিহাসের খ্যাতিমান খোকা নিমিষেই হয়ে উঠে সকলের ‘বঙ্গবন্ধু’। তোফায়েল আহমদের করিৎ কর্মে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ হতে তেঁতুলিয়া ছাপিয়ে হিমালয়-আন্দিজ। বাইগার-মধুমতীর স্রোত মিশে যায় সুদূর হাডসন আর টেমসের স্রোতে। একজন শেখ মুজিব অবিরল স্রোতে বঙ্গবন্ধু হয়ে বঙ্গোপসাগর পার হয়ে পৌঁছে যান আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের কূলে। পৃথিবীর আরেক কীর্তিমান ক্যাস্ট্রোর কাছে বঙ্গবন্ধুই হয়ে উঠেন হিমালয়ের প্রতীক।  তাই মুজিব কেবল একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস নয়, মুজিব মানেই পৃথিবীর বহমান প্রেরণা, মুজিব মানেই পৃথিবীর অদ্বিতীয় সাহিত্য।

রবীন্দ্রনাথের পরে কাউকে নিয়ে যদি সবচেয়ে বেশি সাহিত্য সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে তিনি শেখ মুজিব। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাকে নিয়ে এত সাহিত্য কর্ম দেশ ও বিশ্ব সাহিত্যে। প্রতিদিন আজও মুজিবকে নিয়ে নতুন কিছু না কিছু কেউ না কেউ সৃষ্টি করে চলেছেন। তবু একটা মোটামুটি হিসাবে দেখা যায় হত্যার আগে ও পরে মুজিবকে নিয়ে আমরা পেয়েছি প্রায় পঞ্চাশের অধিক মুজিবাশ্রয়ী গল্প, পেয়েছি অজস্র কবিতা, উপন্যাস ও গান। পেয়েছি নাটক, চলচ্চিত্র ও কাব্যনাট্য। ছড়া ও শিশুতোষ সাহিত্যে মুজিবের জীবন এসেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। গানে-প্রবন্ধে মুজিব ছড়িয়ে পড়েছেন মননশীল জগৎ হতে বিনোদন ও দেশাত্মবোধের অপ্রতিম সাম্রাজ্যে। দেশ ছাড়িয়ে মুজিবের এই আবেদন এই ঢেউ ভাসিয়েছে বিশ্বসাহিত্যকেও  সমান ভালবাসায়।

দেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর আবেদন প্রায় সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। সারা বিশ্বের কবিগণও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশপ্রেম, অবিস্মরণীয় অবদান নিয়ে সাড়াজাগানো কবিতা লিখেছেন।  ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য। ‘ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কবি শঙ্খ ঘোষের এই লেখার কথা মনে হতেই ৭৫ ভেসে ওঠলে চুপটি করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসে আবৃত্তি করতে থাকে ‘রাসেল, অবোধ শিশু তোর জন্যে আমিও কেঁদেছি/খোকা তোর মরহুম পিতার নামে /যারা একদিন তুলেছিলো আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি/তারাই দুদিন বাদে থুথু দেয়, আগুন ছড়ায়/আমি ক্ষমা চাই আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই। ‘ কবিতার প্রতিটি পরতে পরতে রাসেল ও বঙ্গবন্ধুর মুখ ফুটে উঠে।

যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেই পাকিস্তানের কবিরাও লেখেছেন তাকে নিয়ে। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম পাঞ্জাবি ভাষায় লাহোর ডিস্ট্রিক্ট জেলে বসে ‘সিরাজউদ্দৌল্লাহ ধোলা’ কবিতাটি লিখে উৎসর্গ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর নামে। কবিতাটিতে তিনি সিরাজ উদ দৌলা ও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে ব্যক্ত করেন।

ভারতের উর্দু কবি কাইফি আজমীর ‘বাংলাদেশ’ কবিতায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতি উত্তরে নয়াদিলি্লর সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত মনিপুরের অন্যতম শীর্ষ কবি এলাংবম নীলকান্ত তাঁর ‘তীর্থযাত্রা’ গ্রন্থে ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন।

বিদেশিদের সেইসব কাব্যমালায় বঙ্গবন্ধু মূর্ত হয়ে উঠেছেন। মার্কিন লেখক রবার্ট পেইনের ‘দি চর্টার্ড এন্ড দ্য ডেমড’, সালমান রুশদীর ‘মিড নাইট বিলড্রেম’ এবং ‘শেইম’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’, জাপানি কবি মাৎসুও শুকাইয়া, গবেষক ড. কাজুও আজুমা, প্রফেসর নারা, মার্কিন কবি লোরি এ্যান ওয়ালশ, জামান কবি গিয়ার্ড লুইপকে, বসনিয়া কবি ইভিকা পিচেস্কি ও ব্রিটিশ কবি টেড হিউজসহ বিভিন্ন বিদেশি লেখকদের কবিতায় বঙ্গবন্ধু উপস্থাপিত হয়েছেন নানাভাবে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যিক আবিদ খানের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘সিজনাল এডজাস্টমেন্ট’ উপন্যাসে প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর কথা এসেছে।

কবি আবু জাফর শামসুদ্দিনও তার ‘আরেক ভুবন : সোভিয়েত ইউনিয়ন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে ওই দেশের মানুষ কিভাবে বাংলাদেশ বলতে বঙ্গবন্ধুকেই চিনে তার আখ্যান। একটি মানুষ কতটা দাগ কাটলে স্মৃতিচারনে ও উঠে আসেন এই ভাবে মার্কিন সাংবাদিক এবং ঔপন্যাসিক অ্যানি লোপার লেখায়, ‘শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল ঘরোয়া পরিবেশে। একবারও মনে হয়নি এতো বড় একজন নেতার সামনে বসে আছি। বন্ধুসুলভ মুজিব নিজে চায়ের কাপ তুলে দিলেন আমার হাতে। এমন অসাধারণ মনের পরিচয় পাওয়া কঠিন। আমার সাংবাদিক জীবনে পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছি, বহু নেতা-নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, কিন্তু বাংলাদেশের শেখ মুজিবের মতো এমন সহজ-সরল মানুষ আর পাইনি। ‘

অমিয় চক্রবর্তী, কিংবা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘শোনো একটি মুজিবুরের থেকে’ কবিতাটি, যা গান হিসেবে এখনো সমান জনপ্রিয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে/লক্ষ্য মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি/আকাশে বাতাসে উঠে রণি।/বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’ বাঙ্গালীদের হৃদয়ে অফুরন্ত আশার সঞ্চার করা ইতিহাস। আর অন্নদাশংকর রায়ের লেখা আজ মিথ এত বছর পরে সে যেন আখ্যান বলে ওঠে নতুনের সামনে কিংবা আরো অনেক ক্যালেন্ডার উড়িয়ে গিয়ে বলে ওঠে- ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা/গৌরি যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/রক্তগঙ্গা বহমান/নাই নাই ভয় হবে হবে জয়/জয় মুজিবুর রহমান।’

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত