বাঙালীর দুর্গা পূজা—মাতৃশক্তি ও অর্থনীতি

।।সু দ ক্ষি ণা গু প্ত।।

 

দুর্গে দুর্গতিনাশিনী। যিনি দুর্গতিনাশ করেন, তিনিই দুর্গা। দুর্গার আবির্ভাব ঘটে দেবতাদের দুর্গতিনাশ করার জন্য। দেবতারা যখন অসুরদের ভয়ে তটস্থ,স্বর্গের রাজ্যপাট হারাতে বসেছে, সেসময়ে দুর্গার সৃষ্টি। হ্যাঁ,সৃষ্টি—জন্ম নয়। শিব স্বয়ম্ভু, নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু দুর্গা সে অর্থে স্বয়ম্ভু নন। তিনি মাতাপিতার থেকে জন্ম নেননি ঠিকই, তাঁকে গর্ভধারণ করেননি কোনো মহিলা, কোনো পুরুষের বীর্যসঞ্চারে সৃষ্টি হয়নি তাঁর প্রাণ কিন্তু মোহিনী সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যার সৃষ্টি যে বিষ্ণুর দ্বারা— যিনি একজন পুরুষ।
মহিষাসুরকে নিধন করবার জন্য দরকার হয়েছিল একজন নারীর। সেই মহিষাসুর, যে কিনা দেবতাদের উৎখাত করেছিল স্বর্গ থেকে। দুর্গার দশটি হাতের সৃষ্টি হয় দশটি অস্ত্রধারণের জন্য। এই দশটি অস্ত্র দিয়ে তাঁকে সাজিয়ে দেন দেবতারা। এইখানে একটু খটকা লাগে আমাদের।এই দেবতাদের মধ্যে কিন্তু কোনো নারী ছিলেন না। ইন্দ্র,বরুণ আদি দেবেরা সকলেই পুরুষের অবয়বধারী। অর্থাৎ,ভারতীয় সভ্যতার আদি যুগে, মানুষের কল্পনায় প্রকৃতিকে শান্ত রাখার জন্য যে দেবতাদের সৃষ্টি ও আরাধনা—যেমন ইন্দ্র,বরুণ, পর্জ্জন্য—এঁরা সবাই পুরুষ—অথচ প্রকৃতি নারী, নন কি?

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা হলেন পুরুষ।ধরিত্রীকেও ধারণ করে আছেন যিনি,অর্থাৎ স্থিতির দেবতা বিষ্ণুও পুরুষ। আবার লয়ের দেবতা শিবও পুরুষ।অথচ শুধু পুরুষে আর পৃথিবী চলছিল না,তাই কি?তাই কি সৃষ্টি পৃথিবীর আদিশক্তি মহামায়ার? যাঁর অনন্ত রূপের প্রতিভূ হলেন কালী, চন্ডী, দুর্গা—অর্থাৎ যাঁদের আমরা শককটির সঙ্গে একাত্ম করি? কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে?

আদিশক্তি মহামায়াকে বাদ দিলে,অপরাপর নারী দেবতারা সৃষ্ট হয়েছেন মানুষের প্রয়োজনে। সরস্বতীর আবির্ভাব ঘটেছে বিদ্যাদাত্রী হিসাবে-—যখন আর্যসভ্যতা স্থিতিপ্রাপ্ত হল সরস্বতী নদীতীরে।বেদ, উপনিষদ,মানুষের জীবনযাত্রা নির্ণয় করতে শুরু করলো,সামগানে মুখর হলো তপোবনগুলি। অর্থাৎ সঙ্গীত, শাস্ত্র ইত্যাদি মননশীলতার চর্চার সঙ্গে দেবী সরস্বতীর আরাধনার শুরু। লক্ষ্মী সমুদ্রমন্থন থেকে উঠে এলেন- যখন কিনা পুরুষ দেবতারাই অসুরদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন কেবল। লক্ষ্মী এলেন যখন কৃষিসভ্যতা জন্ম নিচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে-তাই তাঁর হাতে ধানের শিষ। কিন্তু এঁদেরও পরিচয় কারও স্ত্রী,কারও কন্যা। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহাদেবের এই পরিচয়ের দরকার হয়নি কিন্তু।

যা হোক,নারীশক্তির প্রয়োজন হল কেন? এইখানে দ্বিতীয় খটকা। প্রয়োজন কি ছিল নারীর,বা নারীশক্তির? শক্তি মানেই নারী নন কি? নারী ও পুরুষের পৃথক লিঙ্গ ঠিকই, কিন্তু শক্তির কি লিঙ্গভেদ হয়? নারীশক্তি—পুরুষশক্তির মধ্যে কোনো প্রভেদ আছে কি?

মহিষাসুর শিবের কাছে বরপ্রাপ্ত। ভারতীয় পুরাণে এই এক সমস্যা। যে যত দুষ্টু লোকই হোক না কেন—কোনো দেবতাকে তপস্যা করে তুষ্ট করতে পারলেই হল—ধন, যশ, মান, গৌরব—সমস্ত রকম enjoyment এমনকি অমরত্ব পর্যন্ত লাভ হয়ে যায়। তা সেরকমই হয়েছিল মহিষাসুরেরও। মহাদেবের বরে তিনি অবধ্য। অর্থাৎ কিনা স্বয়ম্ভু শিবের সম্ভবতঃ মনেই হয়নি যে পুরুষ ছাড়াও কোনো প্রজাতি থাকতে পারে, যার হাতে মহিষাসুরের নিধনপ্রাপ্তি ঘটার সম্ভাবনা।

সে যা হোক, যখন স্বর্গে দেবতাদের অস্তিত্ব বিপন্ন মহিষাসুরের দাপটে—তখন তাঁরা শরণাপন্ন হলেন বিষ্ণুর এবং সৃষ্টি হল দশভুজা দশপ্রহরণধারিনী দুর্গার।
দুর্গার দশটি হাতে দশটি অস্ত্র গুঁজে দিলেন দশজন পুরুষ দেবতা। এইখানে আরেকটি খটকা। মহিষাসুরকে বধ করতে একজন নারীর প্রয়োজন হল, কারণ শিবের বরটা না হলে ঝামেলা করছিল। কিন্তু দুর্গার দশটি হাতের দরকার পড়ল কেন? মহিষাসুরের মাত্র দুটি হাত। তবে নারীর একক শক্তিতে কি বিশ্বাস ছিল না পুরাণকারদের? কিংবা তখনকার সমাজের? দশটি হাত-দশটি অস্ত্রের দরকার পড়ল এক অসুরকে মারতে- যতই কেন না তার প্রতিটি রক্তবিন্দু জন্ম দিক আরও আরও অসুরের।

অনেকের মতে দুর্গার দশটি হাত প্রতীকী। অর্থাৎ একজন নারী যে পাঁচজন সমান কাজ করতে পারেন,সেটিই বোঝানো হয় এই দশভুজা নারীর কল্পনায়। হতেও পারে। প্রবলপরাক্রমশালিনী দুর্গার দশটি হাত কি তবে নারীর শক্তির প্রতীক? নারীর শক্তি,নারীশক্তি নয়।

দেবী দুর্গা বীরাঙ্গনা,আবার দেবী দুর্গা মাতৃজ্ঞানে পূজিতা। শিবের বরে অবধ্য মহিষাসুরকে বধ করার জন্য এক নারীর আবির্ভাব বোধহয় সমাজে নারীকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের, নারীকে মনুষ্য হিসাবে মর্যাদা দানেরই একটি চেষ্টা।

তবে খটকা আরেকটি এখানেও আছে। বীরাঙ্গনা দুর্গা অশুভ শক্তি বিনাশ করতেই আবির্ভুত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে যে শুধু সর্বাঙ্গসুন্দরী হতে হল ,তা নয়—হতে হল অসুরের কামনার বস্তুও। অর্থাৎ,গল্পটা ঘুরে ফিরে সেই একই। দশটি অস্ত্র দিয়ে প্রবল পরাক্রমে villain নিধন করবেন যিনি-সে পুরুষ হোক বা নারী—সেই দেবীকেও কিন্তু কাম্য হতে হল পুরুষের। যে ভ্রান্ত ধারণাবলে যে অসুরবধের জন্য পুরুষশক্তির প্রয়োজন হল, অর্থাৎ পুরুষ দেবতা দ্বারা সৃষ্টি হিল নারীশক্তির।আরো বিশদ করে বলতে গেলে- পুরুষ ও নারীশক্তির তফাৎ করা হয় যে ধারণা থেকে—সেই ধারণা থেকেই জন্ম নিল নাকি এই ধারণাটিও যে গুণবতী নারীকেও হতে হবে রূপবতী এবং পুরুষভোগ্যা? আবার এই দুর্গাই যুগে যুগে পূজিত হচ্ছেন মাতৃরূপে—কারণ তিনি অশুভশক্তির বিনাসকারী এবং পৃথিবীর রক্ষয়িত্রী, পালয়িত্রী—ঠিক মায়ের মত।

মজার কথা হলো দেবী দুর্গা জগতের মা হলেও নিজে কোনো সন্তানের জন্ম দেননি,গর্ভধারণ করেননি। যে দেশে নারীজন্মের সার্থকতা একমাত্র সন্তানের জন্মদানে, সেখানে স্বয়ং আরাধ্যা মাতৃদেবতা কোনো সন্তানের জন্ম দেননি, দুর্গার কোনো রূপই গর্ভধারণ করেননি, তবু জগৎ সংসারের তিনিই মাতা।
জানা যায়, fertility cult, অর্থাৎ মাতৃকা শক্তি এবং লিঙ্গম এর পূজা আর্যসভ্যতায় প্রবেশ করে প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, এবং স্থিতিপ্রাপ্ত হয়। তার আগে মাতৃকা শক্তি বিভিন্ন রূপে, যেমন কালী, তারা,চন্ডী এমনকি মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপেও,এবং অবশ্যই শিবের স্ত্রী হিসেবেও পূজিতা হতেন আর্যরা যাঁদের ‘ম্লেদ্থ’ বলতেন,তাদের সমাজে। এই ‘ম্লেদ্থ’রা ছিলেন তাঁরাই ,যারা সংস্কৃত ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতেন। জেমকন সিন্ধু সভ্যতা বা দ্রাবিড়ীও সভ্যতার মানুষরা,শবর ইত্যাদি জনজাতির মানুষরাই প্রথমে মাতৃশক্তি পূজারী ছিলেন।

এই দুর্গাই আবার মর্ত্যে আসেন বঙ্গদেশে পূজা পেতে—শারদীয়া তিথিতে। এ তাঁর অকালবোধন, সুদূর লঙ্কায় শ্রীরামচন্দ্রের আহ্বানে তাঁর জেগে ওঠা রামায়ণের যুগে—রাম কিন্তু আর্য ছিলেন। এই শরৎ কৃষি প্রধান বাংলাদেশে আসে বর্ষার পর— “আশ্বিনে‌র মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি”অর্থাৎ বাংলার মূল পেশা কৃষি এবং মূল শস্য ধানের সঙ্গে এই পূজার নাড়ীর যোগ।এই উৎসব তাই বাংলার অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত- কারণ এই তো হবে “রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হল সারা”।

হচ্ছিল মাতৃশক্তি আরাধনার কথা।দুর্গা মর্ত্যে আসেন চারটি সন্তান সর্মভিব্যাহারে, যাঁরা আগেই বলেছি,তাঁর গর্ভজাত সন্তান নন,নানারকম অদ্ভুতভাবে তাঁদের সৃষ্টি হয়েছে। তবে লক্ষ্য করার বিষয়—সন্তানদের মধ্যে দুটি পুত্র, দুটি কন্যা।সমান সমান—পুরানকারেরা এখানে কোনো gender brian দেখাননি।

এইখানে সবকিছুই বড্ড গুলিয়ে যাচ্ছে।দুর্গার সৃষ্টি হল কিছু পুরুষ দেবতার দ্বারা,এক পুরুষ দ্বারা অবধ্য পুরুষ অসুরকে নিধন করতে।যিনি নিজে কোনো নারীর গর্ভজাত নন,গর্ভে ধারণ করেননি কোনো সন্তানকে—তিনিই পৃথিবীর আদিশক্তি মহামায়ার একটি রূপকল্পনা,যে মহামায়া সৃষ্টিকত্রী, পালয়িত্রী, রক্ষাকত্রী,”আদিজগৎ-জনপূজ্যা”মাতৃশক্তি।

দুর্গাপূজা বঙ্গদেশে দশপ্রহরণধারিনী,মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা।কিন্তু ইনি আসেন স্বামীর গৃহ থেকে পিত্রালয়ে।না,শ্বশুরবাড়ি থেকে নয়,কারণ তাঁর শ্বশুর শাশুড়ি নেই,তাঁর স্বামী শিব স্বয়ম্ভূ ।

এই দুর্গা পিত্রালয়ে আসেন পিতা স্বয়ং হিমালয় এবং মাতা মেনকার কাছে।এই মেনকা দেবতা,না মানুষী,না অপ্সরা—জানা নেই। জানা আছে যে তিনি পার্বতী উমার জন্মদাত্রী যে উমা হলেন দুর্গার একটি রূপ,যে উমা মানুষের অনেক কাছাকাছি, যাঁর দশটি হাত নেই,যাঁর একটি বাপের বাড়ি আছে—স্বামীর সঙ্গে প্রচুর চাপানউতোর এর পর যিনি সেখানে আসতেও পারেন বছরে মাত্র চারদিনের জন্য। স্বামী কিন্তু ঠিক পিছনে এসে চোখ রাখেন তাঁর উপর। তাঁর আগমন হয় কৈলাস থেকে হিমালয়ে—বাঙালী জাতির কল্পনায় তিনি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসেন—মেয়ে আসেন তাঁর বাপের বাড়ি। সেই চিরন্তন স্বামীগৃহ-পিতৃগৃহের মাঝে মেয়েদের দোলাচলের গল্প।

পূজা হল দশপ্রহরণধারিণী মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির। বিমূর্তের উপাসক বিশ্বকবি লেখেন—”আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে……”। এই পূজা আদতে রূপ নেয় একটি উৎসবের। যে উৎসবকে কেন্দ্র করে অবিশ্ব বাঙালি সমাজ মেতে ওঠে আনন্দে। যে আগমন সৃষ্টি করেছে বিশেষ ধারার একটি সঙ্গীত—বাংলার একান্ত নিজস্ব “আগমনী”। সবচেয়ে বড় কথা – এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলার অর্থনীতি জেগে ওঠে, প্রাণ ফিরে পায়। এই উৎসব বাঙালীর বছরকে স্পষ্ট দুটি ভাগে ভাগ করে দেয়—”পুজোর আগে”আর”পুজোর পরে”।

এই পূজা কিন্তু মাতৃশক্তির আরাধনা,নারীশক্তির নয়। যদিও এই নারী অশুভবিনাশকারী দশভুজা। খটকা লাগে এখানেও। সাধারণ নারীর মতো ইনি নন,জগতের পালয়িত্রী”মাতৃরূপেণ সংস্থিতা”। ঘরের মেয়ে বাপের বাড়ি আসেন, পূজিতা হন মাতৃরূপে, তিনিই মা, তিনিই যোদ্ধা। অনন্তকাল ধরে নারীকে সমাজ,অর্থাৎ পুরুষ সমাজ যে দুটি রূপে দেখে এসেছেন—তা হল মা আর ভোগ্যা। নারী মানুষরূপে বিবেচিত হলেন কোথায়?

সে যা হোক, কথা হল এই যে বঙ্গদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে দুর্গোৎসবের ওপর নির্ভরশীল। দুর্গাপূজা এবং দুর্গোৎসব event একটি। কিন্তু পূজা এখানে মূল্যহীন হয়ে যায় উৎসবের কাছে। আর ভাগ্যিস তা উৎসব হয়ে ওঠে,তাই তো অর্থনীতির এমন রমরমা দেখা যায় ঐ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তবে খটকা আছে। এই দুর্গাপূজা। আর এই মূর্তি তৈরীর অধিকার আবহমান কাল ধরে পুরুষের অধিকার। কেউ কখনো ভাবেননি যে এতে নারীশক্তির কোনো অবদান বা skill থাকতে পারে। কেউ কখনো ভাবেননি যে দুর্গাপূজায় ঢাক বাজানোর অধিকার মহিলাদের উপর ছেড়ে দেওয়া যায়। এখন যে মাতৃপূজা, তা কোনো মহিলা পুরোহিতের হাতে সম্পন্ন হতে পারে—এ কি কেউ ভাবতে পারেন? অথচ গণিকাপল্লীর মৃত্তিকা ছাড়া দুর্গাপূজা সম্পন্নই হয় না।

এতদিনে শোনা যাচ্ছে ২/১জন মহিলা মৃৎশিল্পীর কথা। তাঁদের নিয়ে ছোট্ট documentary তৈরী করে ঘোরানো হয়েছে social media তে। নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ প্রয়াস। অন্তত: সাধারণ মানুষ অবগত হচ্ছেন মহিলা মৃৎশিল্পীদের সম্বন্ধে। সচেতনতা বৃদ্ধি হচ্ছে মহিলাদের, তরুণীদের, কিশোরীদের। কিন্তু এই যে কয়জন মহিলা মৃৎশিল্পী আছেন ,এঁরা সকলেই তাঁদের পিতা বা স্বামীর মৃত্যু বা অসুস্থতার বা অপারগতার কারণে তাঁদের স্টুডিওটা বাঁচাতে এই শিল্পের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আমরা উন্মুখ অপেক্ষায় থাকবো সেদিনের,যেদিন মেয়েরা নিজেদের কেরিয়ার গড়ার স্বার্থে প্রতিমা গড়তে এগিয়ে আসবেন। হয়তো তাঁদের মধ্যে আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা কিছু ছাত্রীও থাকবেন।

এখন দেখতে পাই কিছু মহিলা ঢাকী শিল্পী আসেন কোনো কোনো পুজো প্যান্ডেলে। কিন্তু সংখ্যায় তাঁরা নগণ্য এবং তাঁরাও আসেন সেই সব পরিবার থেকেই,সে সব পরিবারের পুরুষ ঢাকী শিল্পীরা নিয়মিত পূজার সময়ে ঢাক বাজিয়ে থাকেন। এবার আমরা কি আশা করব,অন্য অন্য মেয়েরাও ধীরে ধীরে এই বাদ্যযন্ত্রটি আপন করে নেবেন, যেমন নিয়েছেন গীটার, সেতার, প্রভৃতিকে? এমন কোনো কোনো,যদিও হাতে গোনা জায়গাও তবলাকেও?তবে যাঁরা ঢাক শিল্পে এসেছেন,তাঁরা তো এই কথাই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে মেয়েরাও পারে।

আর পুরোহিত?কবে পাব আমরা দুর্গা পুজোয় মহিলা পুরোহিত? পুজোয় যেখানে অবাহ্মণ পুরুষদেরই পুরোহিত হবার অধিকার নেই,সেখানে মহিলা পুরোহিত,সে যে জাতেরই হোক না কেন,কবে আসবেন,সেটা ভাবতে পারাই যায় না।

মহিলারা অনেক জায়গায় দুর্গাপূজোয় সংগঠনে থাকেন। দুর্গা পুজোর আয়োজন করেন তাঁরা,কিন্তু নিজেদের হাতে পুজোর ভার তুলে নেওয়া—সে বোধহয় শুরু হতে দেরী আছে। কিন্তু আমরা আশায় থাকি যে একদিন এই ঘটনা ঘটবেই, যেখানে বারোয়ারী পূজামণ্ডপে আমরা মহিলা পুরোহিত,মহিলা তন্ত্রধারক—এঁদের দেখতে পাব।

আবার ফিরি অর্থনীতির কথায়। অর্থনীতির তত্ত্ব বলে যত বেশি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ হবে দেশে-—ততই দেশীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। একজনের ব্যয় অপরজনের আয়ে পরিণত হয়,মুনাফা সৃষ্টি হলে তা বিনিয়োগ হয়,তার থেকে আবার আয়-ব্যয়-কর্মসংস্থান ইত্যাদি।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে শিল্পটি সবচেয়ে বেশি জাগ্রত হয়ে ওঠে,সেটি অবশ্যই মৃৎশিল্প। মৃন্ময়ী দুর্গা সপরিবার সবাহনে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে শোভা পায়,পারি জমান বিদেশে। সবমিলিয়ে রমরমা অবস্থা হয় এসময়ে। কিন্তু শিল্পীরা তো সারাবছর থাকেন যে তিমিরে সে তিমিরেই—এই সময়টাই তাঁদের কাজ ও রোজগারের সময়। একই কথা প্রযোজ্য যাঁরা প্যান্ডেল, লাইটিং ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত,তাঁদের উপরও।

আর যে শিল্পটি এই দুর্গাপূজা উপলক্ষে তাদের ব্যবসাটা জমিয়ে তোলে— সেটা হলো বস্ত্রশিল্প। শাড়ি-জামা-পোশাক-আশাক-জুতো-ফ্যাশনদ্রব্য,সঙ্গে আনুষঙ্গিক সাজগোজের জিনিস,শরীরচর্চার ব্যবস্থা মাত্র একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে এত বড় ব্যবসা পৃথিবীতে আর কোথাও হয় কি না সন্দেহ—এমনকি christmas এও। সঙ্গে পানভোজনের ব্যবসা থেকে বড় বড় হোটেল— সবই এই সময়েই যা হোক দুপয়সা কামিয়ে নেয়। এমনকি বাঙালি সারাবছর পয়সা জমিয়ে আরও যে কত জিনিস কেনে—আসবাব থেকে শুরু করে গৃহস্থালির কত না কিছু। হ্যাঁ,সবই যে শুধু নিজের ব্যবহারের জন্য, তা নয়-—উপহারেরও তো এই সময়ই সবচেয়ে সুসময়।

আর এসময়ে বা এ উপলক্ষ্যে ব্যবসা জমিয়ে ফেলে কত ট্রাভেল এজেন্সী, ট্রেন,প্লেন, বাস,হোটেল সবাই। অর্থাৎ ভ্রমণশিল্পটিও খুব জমে ওঠে এসময়ে। যেমন -বাঙালী বেড়াতে যায়,তেমন গৃহে ফেরে অনেক প্রবাসী। আর গাড়ি চড়ে পুজো দেখার বাঙালিও কম থাকে নাকি এসময়ে?

একে শুধু গ্রহস্থের ব্যয় হিসাবে দেখলে তো চলে না,এ শুধু বিক্রেতার আয়ও নয়। এ কোন সম্পদের অপচয়ও নয়। এই যায় থেকে সারাবছর বাঁচার রসদ পাব অনেকে,অনেকে আবার এর থেকে সঞ্চয় করেন—যা বিনিয়োগ হয় অন্য কারও ব্যাংকের মাধ্যমে, অথবা সোজাসুজি বিনিয়োগও হয় কোথাও। ফলে আরও আয় বৃদ্ধি,কর্মসংস্থানবৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধি-—ঘুরে অর্থনীতির চক্র।

এই মাতৃপূজাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যে পরিমান প্রাণ সঞ্চয় হয়,তার কতটুকু মহিলাদের দান ,তার হিসেব অন্য। মহিলাদের প্রাপ্তিই বা কতটুকু,সেও অন্যতম গবেষণার বিষয়।

প্রবন্ধটি শুরু হয়েছিল পুরুষ দেবতা দ্বারা সৃষ্ট এক নারীরূপী দেবতার অসুর নিধনের কথা দিয়ে। অশুভনাশিনী এই বিশ্বপালয়িত্রী যুগে যুগে মাতৃরূপে পুজিতা অথচ তিনি কোনো রমণীর গর্ভজাত নন। কোন সন্তানের গর্ভধারিনীও নন তিনি। এই মাতৃরূপী যোদ্ধৃরুপী অসুরদমনী কিন্তু দুর্গাপূজায় বাঙালির ঘরে আসেন নেহাৎই ঘরের মেয়ে হয়ে চারটি সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি আসার মধ্যে দিয়ে। তখন তাঁর পিতামাতার পরিচয় মেলে আগমনী গানে। বাংলার অর্থনীতি রমরম করে উঠে দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পূজার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না নারীদের অংশগ্রহণ।

ভারতীয় সভ্যতার মতই এই দুর্গা কাহিনীও অতি জটিল, অনেক তার অভিমুখ,অনেক প্রতিপাদ্য। ভাবতে গেলে কুলকিনারা মেলে না। পুরুষ-নারী-শক্তি-প্রকৃতি-এতদিন ঘুরে ফিরে আসে সেই চিরন্তন মা ও সন্তানের গল্প। মায়ের সুরক্ষা, মায়ের আশীর্বাদ পাব বলে এই মাতৃশক্তিকে আমি স্তব করি,পুষ্পাঞ্জলি দিই এই মূর্তির পায়ে। কিন্তু আমাদের রক্তমাংসের গর্ভধারিণীকে আমরা কজন পূজা করি,কজন দেবীর সন্মান দিই? মা কখনো ক্লান্ত হয়ে সন্তানের কাছে আশ্রয় চাইতে আসেনা,সন্তান কিন্তু শেষ আশ্রয় চায় মায়ের কোলেই—”সন্ধ্যা হল গো মা.. ওমা,তুলে ধরো”। এমনকি মহিষাসুরও দুর্গার হাতে মৃত্যুর সময় তাঁকেই স্তব করতে ভোলে না!

 

লেখিকা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপিকা

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত