| 13 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

হঠাৎ

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

সেই স্বপ্নটি সে গতরাতেও দেখলো। স্বপ্নটার রং কী ছিল সে মনে করতে পারছে না।

কিন্তু সে দেখলো, একটি দিঘির ওপর কিছুক্ষণ পরপর বুদ্বুদ ভেসে উঠছে, পরক্ষণে বুদবুদের হাত ধরেই যেন ভেসে উঠছে মরা সাদা মাছ অসংখ্য, আর বৃষ্টি পড়ছে তোড়ে, সেই পড়ন্ত বৃষ্টির ফোঁটার ভারে ভেসে ওঠা মাছগুলো একবার জলের নিচে যাচ্ছে তো আবার জেগে উঠছে। অনেকদিন ধরে সে এই স্বপ্নটা দেখছে, বিশেষত সেই দিনটার পর থেকে। নাসরিন জেগে ওঠে। জেগে উঠেই সে বুঝতে পারলো, কী-একটা যেন তাকে সংকেত করছে।

২.
গত কয়দিন ধরেই বাড়ির ভিতর ফিসফাস শব্দ। সন্ধ্যাবেলায় দুটো টিউশনি শেষ করে নাসরিন ঘরে ফিরে এসেই এই ফিসফিসানি শুনতে পায়।
মা আর ছোট দুটো বোন মিলে যে কী এত ফিসফাস করে সে বুঝতে পারে না। হঠাৎ অ্যাকসিডেন্টে বাবা মারা যাওয়ায় পিঠাপিঠি তিনটি বোনকে নিয়ে মা এক চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। চারপাশে নেমে আসে স্থবিরতা। নাসরিন তার মনের জোরে স্থবিরতা ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। সে এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে ইংরেজি বিষয়ে। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন তাই পেনশনের টাকায় কোনোরকমে চলে যাচ্ছে। পল্লবী এলাকায় এই তিনতলা বাড়িটা তাদের নিজের। তবু এক গভীর নিঃস্বতা তাদের প্রত্যেককে ভেতরে ভেতরে আক্রান্ত করে রাখে। নাসরিন এই নিঃস্বতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবল চেষ্টায় প্রতিনিয়ত নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখে। ভালো একটা চাকরি খুঁজে চলছে ভেতরে ভেতরে । টিউশনিটা না করলেও চলে। তবু ভালো একটি সরকারি চাকরি পাবার আশায় অঙ্ক-বিজ্ঞান আর সাধারণ বিষয়গুলো ঝালাই রাখার জন্য সে কাজটি করছে। তাছাড়া কাজের মাঝে আপাত শান্তি খুঁজে পায় সে। কিন্তু ঘরে ফিরে এই ফিসফিসানি তার মেজাজ খারাপ করে দেয়। অতিরিক্ত রাগে তার কথা বলতেও ইচ্ছা করে না। আজ আবার বাসায় ফিরবার পথে হঠাৎ বৃষ্টির বিশাল কয়েকটি ফোঁটা ঝরঝরিয়ে পড়ে তার গা-টুকুও ভিজিয়ে দিয়েছে। তাই ফেরার পথে রিকশায় বসে রহস্যময় বিকেলবেলাটাও তার দেখা হয়নি। অনেক ভিড় আর রুটিনমাফিক জীবনের ওপর যখন পড়ে থাকে বিকেলের অবাস্তব আলো, তখন যেন চারপাশটা কেমন অলৌকিক মনে হয় তার কাছে। রিকশায় চলতে চলতে এভাবে একাএকা অন্যমনা আর নিমগ্ন হয়ে ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফেরার বিষয়টা নাসরিনের বড় ভালো লাগে।

মাগরিবের আজানের পর আম্মুর নামাজ শেষ হলে ডাইনিং টেবিলে চা দেয়া হবে। ছোটবোন জেবিন কিচেনে গিয়ে ঝালমুড়ি আর চায়ের আয়োজন করছে। জেসমিন বারান্দার কাপড়গুলো তুলে ভাঁজ করছে। নাসরিন তার ভেজা জামাটা বারান্দায় নাড়তে গেলে জেসমিন একটু বিরক্ত হয়ে ওঠে। ‘আপু ,বারান্দার দরজা খুলছো কেন? দেখছো না ! পিলপিল করে মশা ঢুকছে। তোমার জামাটা বরং ফ্যানের নিচে মেলে দাও। এখনি শুকিয়ে যাবে। ’

জামাটা ফ্যানের নিচে শুকাতে দিয়ে নিজের ভেজা চুল শুকাবার জন্য ফ্যানের নিচেই বসে পড়ে নাসরিন। জেসমিন আবার বলে ওঠে, ‘এত ভিজলে কী করে তুমি?’
‘রিকশায় তো পর্দা ছিল না। বৃষ্টি এল হঠাৎ করে। এই বড় বড় ফোঁটা। আর কি করা? এদিকটা তো শুকনো দেখলাম। এখানে বৃষ্টি হয়নি, তাই না?’
‘না, এখানে হয়নি। একটু ছিটেফোঁটা হলেও টের পাইনি। আমি ভাবছিলাম তুমি মামুন ভাইয়ার সাথে হোন্ডায় করে কোথাও ঘুরতে গেছ। তাই ভিজে গেছ। ’
‘ধুর! মামুনের সাথে তো গত দুদিন আমার কথাও হয়নি। সে ট্যুরে গেছে রাঙামাটির দিকে। ফিরে এসে আমাকে রিং করবে। ’
‘মামুন ভাইয়া সত্যিই রাঙামাটি গেছে, তুমি জানো?’
‘হ্যাঁ, জানি তো! ’
‘কোথাও ভুল হয়নি তো?’
‘কার?’

কথাটা আর এগোতে পারে না। ততক্ষণে আম্মু এসে গেছে তাদের মাঝখানে। মেয়েদের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে কান্না ভেজা চোখে সে নাসরিনের দিকে তাকায় একটুক্ষণ। তার দুচোখ ভরে কান্না আসে ঝেঁপে। নাসরিন ভাবে আম্মা অনর্থক পোড়ে। পুড়তে পুড়তে আম্মার এই চোখের জল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

চায়ের পর্ব শেষ হবার পর নাসরিন পত্রিকার পাতায় চোখ বোলায়। পড়তে পড়তে এককোনায় চোখটি আটকে যায়। স্বামীর পরকীয়া প্রেমের বলি তার প্রিয় হোন্ডা। অর্থাৎ স্বামীর পরকীয়ার কাহিনী সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী তার প্রিয় হোন্ডাটিকে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়। কারণ এই হোন্ডায় চড়িয়ে অন্য কাউকে নিয়ে সে ফুর্তি করতে গিয়েছিল। পড়তে পড়তে নাসরিন আর একটু কৌতূহলি হয়ে ঝুঁকে পড়ছিল লেখাটির উপর। তখনই আবার ড্রইংরুম থেকে তিনজনের একটা মিলিত ফিসফিসানি কানে এলো। নাসরিন খবরের কাগজ রেখে চুপচাপ ওদের পাশে গিয়ে বসলো। ‘কী এত সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে এখানে? কয়দিন থেকেই টের পাচ্ছি তোমরা আমাকে লুকিয়ে কী যেন বলে যাচ্ছো। কী বল তো?’ বলতে বলতে লোডশেডিং। জানালার পর্দাটাকে সরিয়ে দিয়ে কাচের ভিতর দিয়ে দূরের আলো দেখতে দেখতে সে আবার আরাম করে গা ছেড়ে বসে সোফার উপর। ‘একটা জরুরি কথা ছিল। না বলে আর পারা যাচ্ছে না। ’ জেসমিন আবার বলতে থাকে।
‘বলো না কী? টাকা-পয়সার সমস্যা?’
‘না। ’
‘তাহলে কি জেবিন এবারও পরীক্ষায় খারাপ করেছে?’
‘না, তা নয়। বিষয়টা তোকে নিয়ে। ’

আম্মু বলতে ভয় পাচ্ছে। ‘আগে বল, তুই মনে কষ্ট পাবি না, তাহলে বলবো। তবে কষ্ট পেলেও এই কথা তোর জানা উচিত। জেসমিনের গলার স্বরে কিছুটা তীব্রতা। মামুন ভাই তোকে মিথ্যে বলেছে। সে রাঙামাটি যায়নি। তাকে আমি আর আম্মু দুদিন আগে মহাখালি থেকে আসার পথে দুপুর বেলা ক্যাপ্টেনস ওয়ার্ল্ডে দেখেছি। ব্লাড টেস্ট করার পর আম্মা খুব টায়ার্ড ছিল। তাকে বাসিয়ে আমি খাবার অর্ডার দিতে গিয়ে দেখি সে, আর তার সাথে একটি স্মার্ট মেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে তার হোন্ডা থেকে নামছে। আমি গ্লাসের মধ্যে দিয়ে ভালো করে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম। সে যখন ঢুকলো, আমি তখন পেছন ফিরে থাকলাম। ওরা আমাদের দেখেনি। তুই বলেছিস তোদের কাবিন হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না আপু! ও তোর সর্বনাশ করবে। সে মুহূর্তে আম্মুকে না বলে আমার উপায় ছিল না। আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। আম্মু শান্ত ছিল। মুখের ওড়নাটা বড় করে টেনে দিয়ে ওই টেবিলের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে দেখে এলো , লোকটি মামুন ভাইয়া কিনা!’

চারপাশটায় ছড়িয়ে থাকা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারটাকে বড় বেশি নোংরা মনে হলো হঠাৎ করে। তারা সবাই যেন আটকে পড়েছে কোনো-এক অন্ধকার গুহার মুখে। নাসরিনের আম্মার দীর্ঘশ্বাসের শব্দটি চারপাশের চুপ করে থাকা সব শব্দ পেরিয়ে তবু শোনা গেল। এই জমাট অন্ধকারে যেন লুকিয়ে আছে কোনো হত্যাকারী। সে কোথায়? ওরা সবাই চুপ করে তাকিয়ে থাকলো জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া একটি আলো-জ্বলা বাড়ির দিকে। তারপর সবাই একে একে কাজের দিকে যেতে লাগলো। জেবিন চার্জার জ্বালিয়ে পড়তে বসলো। জেসমিনও পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে বই-পত্র গোছাতে লাগলো। নাসরিনের আম্মু একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে ডাইনিংরুমে রাখলো। মোমের আলোতে নাসরিন দেখলো তার মায়ের সারা মুখ চোখের জলে ভেজা।

ড্রইংরুমে সোফার কাছের সাইডটেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনটাকে হাতের কাছে পেয়ে নাসরিন ছটফট করতে করতে তখনই মামুনের ফোনে ট্রাই করে। দুবার ট্রাই করে দেখলো ফোন বিজি। একটু পর আবার করে দেখলো, ফোনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। রাগে পুড়ে যেতে থাকে ওর শরীর। অন্ধকারে পুড়ে খাক হয়ে যেতে থাকে শরীরের চামড়া। কালবিষ যেন ফেনিয়ে ওঠে শিরায় শিরায়। তার মনে হলো, সে যেন চোখের আগুন দিয়েই পুড়িয়ে দিতে পারবে মামুনের হোন্ডাটি। মামুনকে না পেয়ে সে মামুনের বড় বোন সুমাইয়া আপুকে ফোন করে।
‘আপু কেমন আছেন?’
‘আরে নাসরিন! কেমন আছো? অনেকদিন পর। এদিকে তো বেড়াতে আসো না! পরীক্ষা শেষ হলো?’
‘না, পরীক্ষা সামনে। দুমাস পর। ’
‘সেদিন তোমাদের বাসার ওদিকটায় গিয়েছিলাম। আমার মেয়ে রিনির বান্ধবীর জন্মদিন ছিল। ভেবেছিলাম খালাম্মাকে একবার দেখে আসবো। যতদিন তোমাদের বাড়িতে ছিলাম নিজেদের কোনোদিন ভাড়াটে মনে হয়নি। কত মজার খাবার খাইয়েছেন খালাম্মা! নিজের আম্মার মতো! ’
‘আপু, মামুন কি ঢাকায়? ওকে ফোন করে পাচ্ছিলাম না। ’
‘হ্যাঁ, ও তো ঢাকাতেই। আমার সাথে অনেকদিন কথা হচ্ছে না। তুমি ওর বনানীর অফিসের ফোন নাম্বারটা রাখো। হয়তো অফিসে ব্যস্ত আছে, তাই ফোন বন্ধ রেখেছে। ’
‘ও তো আপনার বাসার ওপর তলাতেই থাকে। তাহলে আপনার সাথে দেখা হয় না কেন?’
‘সেকি তুমি জানো না? ও তো রামপুরার দিকে আলাদা বাসা নিয়েছে, প্রায় দুমাস হতে চললো। আমাকে বললো এই ছোট বাসায় সমস্যা। তাই তোমাকে নিয়ে নতুন বাসায় উঠবে। হয়তো তোমাকে সারপ্রাইজ দেবে, তাই বলেনি!’
ফোনটি রাখতে রাখতে নাসরিন ভাবলো সারপ্রাইজ বটে! দুমাস হলো বাসা নিয়েছে, সে জানতে পারেনি। রাঙামাটি যাবার কথা বলে ঢাকায় থেকে অন্য মেয়ে নিয়ে রেস্টুরেন্টে টাইমপাস করা । দারুণ সারপ্রাইজ বটে!

৩.
সারাটারাত আধোঘুম আধোজাগরণে কেটেছে নাসরিনের। বেশ কয়েকবার ফোনে মামুনকে ট্রাই করেছে সে। ফোনটি বন্ধ রাখা আছে। সকালে তার কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না। একটু সকাল সকাল সে বাসা থেকে বের হয়ে গেল ক্লাস আছে বলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বারবার আঁতকে উঠছিল অজানা ভয়ে। আম্মু ও বোনদের চেহারায় আঁকা ছিল অনেক অলিখিত প্রশ্ন। আর তার মনে হচ্ছিল এখনই তাদের সামনে থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। খুব ছোটবেলায় তার আর একবার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বাড়িতে একজন চাচা আসলে সে সবার সামনে থেকে পালাতে চাইতো। আব্বু ধমক দিয়ে বলতো, ‘আমার মেয়েটা দিনদিন অসামাজিক হচ্ছে। ’ আসলে সে কাউকে বোঝাতে পারতো না লোকটির ভৌতিক ব্যবহার। সুযোগ পেলেই লোকটি তাকে কোলের উপর বসিয়ে জোরে চেপে রাখতো। আর তার বিশেষ অঙ্গটির উপস্থিতি সে আতঙ্কের সাথে টের পেত। মাঝে মাঝে ঘরে কেউ না থাকলে সেই লোকটি তার মুখ চেপে ধরার সুযোগ খুঁজতো। সে কোনোদিন কাউকে এই কথা বলতে পারেনি। লোকটি ছিল তাদের খুব কাছের আত্মীয়। আজ সকাল থেকে তার নিজেকে ভেসে ওঠা মরামাছের মতো লাগছে। ঝিমোতে ঝিমোতে সেইসব অপমানের মৃত অতীত দুলছে চোখের সামনে। বনানীতে মামুনের অফিসে যেতে যেতে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছটফট করতে করতে সে এইসব ভাবতে থাকে।

বনানী এগারো নম্বর পার হয়ে মামুনের অফিস। মাত্র সাড়ে নয়টা বাজে। মামুন নিশ্চয়ই এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। ওকে দেখে কী বলবে সে? আসলে নিজেকে নিয়ে কী করবে সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না। যতই ভাবছে ততই তার গলা শুকিয়ে আসছে। তবে কি ওই মেয়েটা সর্ম্পকে সে জানবে না? না পুরো সত্যটার মুখোমুখি তাকে হতেই হবে! যদি থাকে আরও কোনো গভীর গোপন সত্য! সত্যিই কি ওদের বিয়ের কাগজপত্র ঠিকঠাক ছিল? সত্যি কি ওর মতো ভালো ফ্যামিলির ছেলে এরকম করতে পারে? কী তাড়াহুড়ো করে হঠাৎ মামুনের পাগলামিতেই বিয়েটা হয়েছিল। সেদিনও ক্লাস শেষ করে সবেমাত্র কলেজ থেকে বের হচ্ছিল সে। তাড়া ছিল বাড়ি ফেরার। আম্মুকে নিয়ে চোখের ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল। তখনই ফোন।
‘কোথায় তুমি নাসরিন? অনেকক্ষণ ট্রাই করছি। ’
‘তুমি কোথায়?’
‘আমি তো মতিঝিল অফিসে এসেছি একটা কাজে। তুমি রমনায় চলে এসো। জরুরি কথা আছে। আমি এখনি রমনার দিকে যাচ্ছি। হোন্ডায় পনেরো মিনিটে পৌঁছে যাবো। ’
অবিশ্রান্ত হুড়োহুড়ির মধ্যেও মামুনের ডাককে সে উপেক্ষা করতে পারে না। অনেক অনেক মেয়েদের ভিড়ে, অনেক গাড়ির শব্দ, পুলিশ, জিপ, ভ্যান, ট্রাক সবকিছু দেখতে দেখতে বা কিছুই না দেখতে দেখতে সে রমনার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। যেন সে সব ছেড়েছুড়ে বনবাসী হবে মামুনের কথায়। প্রথম দেখার ছটফটানো অনুভব নিয়েই সে এগোতে থাকে। অনেক কথা জমেছিল সেদিন বুকের গভীরে আর মামুনকে আচমকা মুখোমুখি পেয়ে জেগে ওঠে গাঢ় হয়ে ওঠা তপ্ত রোদের ভেতর তীব্র চুম্বনপিপাসা। আততায়ী বাতাসে উড়ে আসে উন্মাদনা, ভেসে আসে একজনমে শেষ না হওয়া ঘূর্ণির মতো প্রেম। সেদিন যেন মুহূর্তেই একটুকরো বাতাস হয়ে ভেসে যেতে চেয়েছিল ওরা। জেগে উঠতে চেয়েছিল গান হয়ে। দুপুরবেলায় রমনায় তেমন লোক ছিল না। কয়েকজোড়া জুটি বসেছিল দূরের গাছের ছায়ায়। দূর্বাঘাসে পা ঘষতে ঘষতে মামুনের খুব কাছে এসে বসেছিল সে। অনুভব আর ধ্যানের মধ্যে ছিল মামুনের দুটো হাতের নিবিড় স্পর্শ। নাসরিন হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে গেল। ‘এই আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে! আম্মুকে আজ চোখের ডাক্তার দেখানোর কথা। এখুনি বাসায় ফিরতে হবে। ’

মামুনের চোখে রহস্য খেলা করে। ‘খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে? কিন্তু ম্যাডাম আজই যে বিয়ে করবো আমরা। আমার তিনজন বন্ধুকে বলে রেখেছি। ওরা সবকিছুর আয়োজন করছে। মোহাম্মদপুরে আমার বন্ধুর বাসায় বিয়েটা হবে। ওর বাসার নিচে রেস্তোরাঁ আছে। খাবার দাবারের আয়োজন ওখান থেকে হবে। বিকেল চারটায় কাজী আসবে। তুমি চাইলে তোমার কোনো বান্ধবী বা ছোটবোনকে সাক্ষী হিসেবে আনতে পারো। তবে ঠিক পাঁচটার মধ্যে আসতে হবে কিন্তু। ’

‘কী বলছো? কাউকে না জানিয়ে এভাবে কেন? তাছাড়া তোমার আপু তো বিষয়টা জানে। লুকিয়ে বিয়ে করলে সে কি ভাববে?’

‘আরে ধুর রাখো তো! কবে বড় ভাইয়া বিদেশ থেকে আসবে আর দুভাইয়ের একসাথে শাদি হবে? দুলাভাই একথা বললো আর আপাও সেই কথায় নাচে। আমি আর কতদিন অপেক্ষা করবো? তাছাড়া তোমার আম্মু ভালো ছেলে পেলে তোমারে কোনোদিন বসাইয়া রাখবে না। এখন একটা কাগজপত্রের বিয়ে হয়ে থাক, পরে ওরা যা বলবে তাই হবে। এখন চল, রাফা প্লাজা থেকে একটা শাড়ি কিনি। তুমি শাড়িটা নিয়ে বিউটি পার্লারে যাও আর জেসমিনকে বা তোমার কোন বান্ধবীকে আসতে বলো। ’

পুরো বিষয়টা নাসরিনের কাছে স্বপ্নের মতো লাগতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে মামুনের হোন্ডার পেছনে বসে কখন যেন নিমিষেই রাফা প্লাজায় নেমে পড়ে। সম্মোহিতের মতো রাফা প্লাজার চারতলায় যায়, মেরুন কালার বেনারসি কিনে। মামুন পারসোনায় নিয়ে ওকে ভিতরে পাঠিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে।

কী এক খেয়ালের ঘোরে প্রজাপতির মতো সে সোনালি বর্তমানের পেছনে কাঁপা ডানা নিয়ে উড়তে থাকে। সে আর কারও কথা ভাবতে পারেনি তখন। তার অতীত, ভবিষ্যৎ, একাকী বিয়ে করা! সব কাজ শেষে মামুনের হোন্ডার পেছনে বসে মোহাম্মদপুরের সেই বাসাটিতে যেয়ে বসে অপেক্ষা করে। যথাসময়ে কাজী আসে, কবুল বলা হয়। বিয়ের কাবিননামায় সে দশলাখ টাকার কথা বলে। এ কথাটি তার মনেই ছিল না। মামুনের বন্ধু হাসান তাকে বলে দেয়। নাসরিনের পক্ষে কোনো সাক্ষী থাকে না। বিয়ের পর ভালো কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়া হয় হোটেল থেকে এনে। সন্ধ্যা ছয়টায় মামুনের হোন্ডার পেছনে বসেই সে বাসায় ফেরে। মামুনের সাথে দুবছর আগে পরিচয়, অথচ এই প্রথমদিন সে মামুনের হোন্ডায় চড়ে বাড়ির গেটের সামনে নামার সাহস অর্জন করে। বিয়ের বিষয়টি সে গোপন করেনি। বাড়িতে মামুনের এই হঠাৎ পাগলামির কথা সে জানিয়েছে।

কিন্তু শরীর নিয়ে যে বিষয়টি ঘটে গিয়েছিল তা সে জানায়নি কাউকে। সেদিন আকাশটায় মেঘ ছিল সকাল থেকে। বৃষ্টির আশংকায় ক্লাসে যেতে মন চাইছিল না। দুপুরের দিকে ভাত খেয়ে সবেমাত্র বিছানায় হেলান দিয়েছিল একটুখানি। মামুনের ফোনটা এসেছিল তখনই।
‘এই কী করো?’
‘এইতো মাত্র ভাত খেয়ে উঠলাম। ’
‘কী দিয়ে খেলে?’
‘কাঁচা কাঁঠালের তরকারি। ’
‘ইস্ কী মজা! আমাকে যদি একটু দিতে! আম্মু খুব মজা করে রাঁধতো! আমার কপাল দেখো। তুমি আমার বউ অথচ কাঁঠালের তরকারি তুমি একাই খাচ্ছো! আমি যে কী খাই কী করি কোনো খেয়াল নাই! এইটা একটা জীবন?’

ওর আক্ষেপ দেখে নাসরিন নিমিষে এলোমেলো হয়ে যায়। তখনি বলে ওঠে, ‘তুমি অফিস থেকে বাসায় ফিরো। আমি কাঁঠাল নিয়ে সুমাইয়া আপুর বাসায় যাচ্ছি। অফিস থেকে ফিরে সরাসরি আপুর বাসায় চলে এসো। আম্মু এমনিতেই রাঁধতে বসে বেশ কয়েকবার সুমাইয়া আপুর কথা বলছিল। আজ বিকেলটা তোমাদের বাসায় কাটাবো, ভালোই হবে। ’

দেরি না করে হট ক্যারিয়ারে কাঁঠালের তরকারি গুছিয়ে দুপুরের দিকেই সুমাইয়ার মিরপুর এগারো নম্বরের বাসায় রওয়ানা হয়ে যায় সে। বাসার সামনে এসে দেখে ওদের ছোট্ট দোতলা বাড়িটার গেটে তালা দেয়া। ব্যাগটা খুলে দেখে তাড়াহুড়োতে মোবাইলটা নিয়ে আসেনি সে। এখন কী হবে? এদিকে বৃষ্টি নামছে জোরেসোরে। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগান। পাতাবাহার, দোপাটি আর কয়েকটা সাদা রঙ্গন ঝুলছে। সবকিছুতে চমৎকার একটা কোমল ভাব। গেটের সামনে সে নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এখনি হয়তো আকাশ থেকে জল ঝরবে ফোঁটায় ফোঁটায়। সে বাড়িটার দেওয়ালগুলোর দিকে বিষণ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ হর্নের শব্দে পিছনে তাকিয়ে দেখে মামুন! চোখে-মুখে কয়েকফোঁটা বৃষ্টি। ‘অফিস থেকে তোমাকে ফোন করার পর-পরই বেরোলাম। আপাকে রিং করে দেখলাম, সে বাসায় নেই। তোমাকেও কয়েকবার করলাম। ফোনটা নিশ্চয়ই সাথে নেই। ’
‘ঠিক বলেছো। এখানে এসে হঠাৎ বোকা হয়ে গেলাম। গেটে তালা, বৃষ্টি নামছে। ভাবছিলাম এখনি ব্যাক করবো। ’
‘এই মুহূর্তে আর ব্যাক করতে হবে না। বান্দা হাজির। এখন তোমার অফিস ফেরত স্বামী তার স্ত্রীর হাতের পরম যত্নে রান্না করা কাঁচা কাঁঠালের তরকারি খাবে। এখন সে ভীষণ ক্ষুধার্ত। ’
মামুনের ধারাভাষণ শুনতে শুনতে নাসরিন খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সব সহজ কথার মাঝেও মিশে থেকেছিল পরস্পরের মাঝে খুঁজে পাওয়া হৃদয়।

একটু পরই বৃষ্টি নেমেছিল জোরেসোরে। নিঃশব্দ বাড়িতে দুটি মাত্র মানব-মানবী একমনে শুনছিল সেই বৃষ্টির শব্দ। প্রকৃতি যেন নির্দেশ করেছিল সেই মুহূর্তে ভালোবাসাই তাদের একমাত্র কাজ। বৃষ্টি শেষে সন্ধ্যার আকাশ আবার ফিরে পায় তার নীল। কিন্তু সন্ধ্যায় রিকশায় চেপে একা একা ঘরে ফেরার পথে নাসরিনের মনে হয় সে যেন আজ হারিয়েছে অনেককিছু। সম্মোহিত হয়ে সে হারিয়েছে শরীরের অঙ্গীকার, শরীরের রহস্য। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে তলিয়ে গিয়েছিল নিজেরই অজান্তে। আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিল। ওই উথালপাথাল সময়ের অন্তহীন দুর্দশা থেকে কী করে পার পাবে সে ভেবে পায় না। নীল আকাশটা তার সবটুকু ব্যথা বুকে নিয়ে থমথম করতে থাকে আর দিনের শেষ আলোগুলো লুকাতে থাকে।

৪.
বনানীর অফিসের লিফটে চড়ে উনিশতলায় উঠতে উঠতে সে একপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে থমকে থাকে। লিফট চলতে থাকে আর সে থমকে যায়। একসময় লিফট আপনমনে খুলে গেলে সে তার আকাশি জামা পরা পুতুল শরীর নিয়ে অফিসের বারান্দা ধরে হেঁটে যেতে যেতে একজনের কণ্ঠস্বরে পেছন ফিরে তাকায়। তাকে দেখে সামনে এসে দাঁড়ায় মামুনের বন্ধু হাসান। ‘চিনতে পেরেছেন? আমি হাসান। মোহাম্মদপুরে আপনার বিয়ের সময় আমি সাক্ষী হিসেবে ছিলাম। ’ নাসরিন মাথা নিচু করে হ্যাঁ বলে। তারপর আবার বলে,
‘মামুন কি অফিসে এসেছে? আমি একটু দেখা করতে চাই। ’
‘মামুন আপনাকে বলেনি? সে তো অনেকদিন থেকে মতিঝিল শাখায় অফিস করছে। প্রায় দুমাসের মতো হলো। ’
‘ও আচ্ছা। ’ কানের মধ্যে ঘুরঘুর করছিল, ‘কেন আপনাকে বলেনি?’ শুনতে শুনতে নাসরিন দ্রুত হাঁটতে থাকে আবার লিফটের দিকে। হনহন করে সে হাঁটতে থাকে। পিছন থেকে তাকে আবার ডাকে হাসান।
‘ভাবি একটু কথা আছে দাঁড়ান। ’ চাপা উত্তেজনাগুলোকে ঢোক গিলে লুকাতে চায় নাসরিন। তবু তার ফর্সা মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। হাসান একপলক তাকিয়ে বলে, ‘চলুন আপনাকে এগিয়ে দেই। ’

লিফট থেকে নেমে অফিসের সাথেই একটা আইসক্রিম কর্নারে ওরা মুখোমুখি বসে। নাসরিনের সারা শরীর-মন জুড়ে থাকে এক মরণস্তব্ধতা। হাসান আইসক্রিমের অর্ডার দেয়। তারপর বলতে থাকে― ‘মামুনের মাঝে একটা চেঞ্জ দেখছি ভাবি। ওকে দুদিন অন্য একটি মেয়ের সাথে ঘুরতে দেখেছি। আপনি কী ভাবছেন আমি জানি না। তবে আপনাকে বলা আমার উচিত মনে হল। আমার দেখা ভুল হলে ভালো। আর তা যদি না হয় তবে তা আপনার জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। আপনি এই সর্ম্পকটা থেকে বেরিয়ে আসুন। ’ হাসান আরও অনেক কিছু বলতে থাকে। কিন্তু নাসরিন আর কিছুই শোনে না। সময়, দিক, নিজ সত্তার বোধ সে হারিয়ে ফেলে। তার সামনে একবাটি বরফসাদা আইসক্রিম। তার নিজেকে বরফের টুকরোর মতো ভারী মনে হয়। নিজেকে যেন আর নাড়াবার ক্ষমতা তার নেই। একটা প্রচণ্ড ভারী অতীতের ভারে সে তার হৃদয় হারিয়ে ফেলে। তার মাঝে আর নেই কোনো উষ্ণতা। তার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে পড়তে নিমিষে তা বরফ হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত