| 20 এপ্রিল 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

স্বরাজনৈতিক

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comস্থানীয় এমপির পেটোয়া বাহিনীর নেতা নিহত হওয়ার পর একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল পাশের বস্তিতে। এখানেই থাকতো ওই নেতা। হুলুস্থুল করছিল সবাই কিন্তু সবচেয়ে বেশী চিৎকার শোনা যাচ্ছিল নিহত নেতার বউয়ের গলা থেকে। সহজভাবে জীবনযাপন করা লোকজন এই চিৎকারকে স্বাভাবিক মনে করবেন একশবারের মধ্যে একশবার। কিন্তু সবাইতো আর সহজ না, ফলে বউয়ের চিৎকার কেন এত উঁচু, সেটা জানতে গিয়ে জটিল মানসিকতার লোকগুলি অন্য এক খবর জেনে ফিরে এলো উৎসুক জনতার কাছে। তারা জেনেছিল, স্বামীর মৃত্যুর শোকের চেয়েও বউকে নাকি বেশি আতঙ্কিত করেছিল ক্ষমতা হারানোর ভয়। এতদিন স্বামীর দাপটে নিজেই সারা বস্তিতে দাপট দেখিয়ে বেড়াতো বউটা। সুখের সেই দিনগুলি বুঝি আর রইলো না। 

 
কিন্তু অনন্ত শোকের মধ্যেও কিভাবে আবার সেই দাপটের দিনগুলি ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা নিয়ে ভাবনার বিরতি ছিল না বউটার মাথায়। আর লেগে থাকলে যে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, সেই আপ্তবাক্য আবার প্রমাণিত হলো হঠাৎ মাথার মধ্যে জন্ম নেয়া এক নতুন সম্ভাবনার আলোকছটায়। ক্ষমতাবানের সঙ্গে বিবাহই ক্ষমতার মূল ভিত্তিএটাই ছিল সেই আলোকছটার পিছনের নক্ষত্রের বর্ণালী। আর সেই বর্ণালীর বিশ্লেষণে জানা গেল, এবার বাগাতে হবে পেটোয়া বাহিনীর নতুন নেতাকে।


নতুন চিন্তা মাথার ভিতরে জন্ম নিলেও যে মাথার ভিতরেই আটকে থাকবেএই কথাতো কেউ কোনদিন বলেনি। ফলে এখানেও ঘটলো সেই প্রাচীন ঘটনানতুন চিন্তা ছড়িয়ে পড়লো। বস্তির সব মহিলা, যারা এতদিন বউটার দাপটে ঈর্ষায় ভুগতে ভুগতে ভাবতো তাদের স্বামীও যদি পেটোয়া বাহিনীর নেতা হতোশুরু করলো পেটোয়া বাহিনীর নতুন নেতাকে স্বামী হিসাবে দখল করার চিন্তা। ফলে বিবাহের একটা মহামারী যেন ছড়িয়ে পড়লো বস্তির ঘরে ঘরে। স্বামীপুত্রভাই যাকে হাতের কাছে পেলো, তাকেই পেটোয়া বাহিনীর নতুন নেতার খোঁজে লাগিয়ে দিল মহিলারা।


বস্তি থেকে কিছুটা দূরে বাস করতো একটা মধ্যবিত্ত এলাকা। আর সেখানে ছিল একটা কাজির অফিস। বস্তিতে ছড়িয়ে পড়া বিবাহের মহামারীর জীবানু বাতাসে ভাসতে ভাসতে একদিন পৌঁছে গেল সেই কাজী অফিসের অন্দরেও। আর বসে বসে ঝিমাতে থাকা কাজী দেখলো এই মহামারী তার বরাত খুলে দিতে পারে একটু উদ্যোগ নিলেই। সেটা আর কিছু্ই নাএই অফিসটাকে ছেড়ে দিয়ে বস্তিতে ঘরভাড়া নিয়ে সেখানেই অফিস খুলে বসতে হবে। কাস্টমার কেয়ার বলে একটা কথা আছে তো। দুই পয়সা কামানোর জন্য এই কাজটুকু তো করতেই হবে। 


সেইদিনই কাজী তার এক ঘনিষ্ট লোককে লাগিয়ে দিল বস্তিতে ঘরভাড়া করার কাজে এবং করিৎকর্মা লোকটাও একটা ঘর ভাড়া করে ফেলে দেখিয়ে দিল দক্ষতার নমুনা। এখন ঘরটার কপালে টিকলির মতো ঝলমল করছে কাজি অফিসের নতুন সাইনবোর্ড।


কিন্তু বিবাহ মানেতো শুধু কাজী অফিস না, আছে অর্থনীতির ব্যাপকতাও। সেই সত্য অনুসরণ করেই বিবাহের মহামারীর জীবানু একদিন পৌঁছে গেল এক ব্যাংক ম্যানেজারের কামরায়। আর সেই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ম্যানেজার নির্দেশ দিলেন বস্তিতে একটা এটিএম বুথ বসানোর। বিবাহে তো টাকা-পয়সা দরকারই, নব-দম্পতির বিভিন্ন সাধ আহ্লাদ পূরণেও আমরা পিছিয়ে যাবো নাআত্মতৃপ্তির সঙ্গে ভাবলেন ব্যাংক ম্যানেজার। সামাজিক দায়িত্বশীলতাতেও ব্যাংকটা যে পিছিয়ে নেইস্বীকার করতে বাধ্য হলেন সেসময় ম্যানেজারের রুমে উপস্থিত এক পুরানো গ্রাহক।


সোনার বাংলা ডেকোরেটরই বা দুইপয়সা কামানো এবং সামাজিকতায় অংশ নেবার সুযোগ হারাতে চাইবে কেন? চাইলো না। ফলে ওই ডেকোরেটরও শুরু করলো তার বস্তি অভিযান।


ডেকোরেটরের বস্তি অভিযান ঘরভাড়া দিয়ে শুরু হলেও তারা একটু এগিয়ে গিয়ে ভাবতে চাইলো বিষয়টাকে। অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানে বিবাহ মানেই উৎসব, তাই ঘরভাড়া নেয়ার দিনের সন্ধ্যা থেকেই বস্তিটাকে আলোকসজ্জায় ভাসিয়ে দিল তারা এবং এরজন্য কোন পয়সাও দাবি করলো না। ইনভেস্টমেন্ট বলে একটা কথা আছে তো! আর বস্তিবাসীও তাদের এতদিনকার অন্ধকারে ডুবে থাকা বস্তিটাকে আলোর গয়না পড়া রূপসীর মতো দেখতে পেয়ে আপন করে নিল ডেকরেটরের লোকজনকে। এই কাণ্ড দেখে ডেকরেটরের মালিক মনে মনে বললো, মার দিয়া কেল্লা আর খবর দিলো তার বেতনভুক পাচকদের। ভোজ ছাড়া কি বিবাহ হয়?


এই সমস্ত ঘটনা প্রভাবিত করলো বস্তির পাশের কমিউনিটি সেন্টারটাকেও। সেন্টারের মালিক ঘোষণা করলেন বিবাহের সমস্ত অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেবেন তিনি এবং সেটাও বিনামূল্যে।

 

পরিস্থিতি এখন একটা বিবাহের সম্পূর্ণ অনুকূলে। কিন্তু পেটোয়া বাহিনীর নতুন নেতাটা কে?

 


সেদিন সন্ধ্যায় আলো ঝলমল উজ্জ্বল বস্তিটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল স্থানীয় এমপি। এরকম একটা হঠাৎ উজ্জ্বল কিছুর পাশ দিয়ে যাবার সময় কারো চোখ পড়বে নাএটা যেমন হয় না সচরাচর, স্থানীয় এমপিরও হলো না। তার মনযোগ কেন্দ্রীভূত হলো এবং কৌতুহলী হয়ে সফরসঙ্গীদের দিকে সে তাকালো প্রশ্নমাখা চোখে। সঙ্গীরা সাথে সাথেই হড়বড় করে বলতে শুরু করলো ঘটনাটার বিবরণ। কিন্তু সবাই একসঙ্গে বলার চেষ্টা করাতে বিষয়টা বোধগম্যতার কাছেতো এলোই না বরং ততক্ষণে পিছনে পড়ে যাওয়া বস্তিটার মতোই দূরে চলে যেতে থাকলো। বিরক্ত স্থানীয় এমপি বাধ্য হলো ধমক দিয়ে সবাইকে থামাতে। তারপর টক শোর পস্থাপকের মতো টেনে ধরলো আলোচনার লাগাম। জগত শক্তের ভক্তএই আপ্তবাক্য এরপর শুরু করলো ভোরের আকাশে নিজের আলো ফুটিয়ে তুলতে এবং চারপাশ ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠলো।


মানুষ যখন দেখতে শুরু করে তখন বুঝতেও শুরু করে সবকিছু। স্থানীয় এমপিও স্পষ্ট টের পেলেন তার পেটোয়া বাহিনীর নেতার মৃত্যু বস্তিটাকে জাগিয়ে তুলেছে এবং সবাই অপেক্ষা করছে নতুন নেতার আগমনের। স্থানীয় এমপি সবচেয়ে বেশি ঈর্ষাকাতর হলেন মেয়েদের উদ্বেলতায়। রাজনীতির খোলসে ডুবে থাকা তার রোমান্টিক হৃদয় বারবার পিছন ফিরে দেখতে চাইলো দ্বেলিত মেয়েতে ভরা ওই বস্তিটাকে। খুঁজতে চাইলো মেয়েদের ভীড়ের গন্ধ আর কোমলতাকে।


সেইরাতে স্থানীয় এমপির ঘুমের মধ্যে বারবার হানা দিল ওই আলোভরা বস্তিটা। আর যতবারই সে এলো, সাথে নিয়ে এলো মেয়েদের দলটাকেও।

 


স্থানীয় এমপির মাথা এখন একটা হারেম হয়ে গেছে। সারাক্ষণ তাতে অজস্র মেয়ের শব্দ, গন্ধ আর ভীড়। আর যৌনতাতো আস্তাবল খুলে বের করে দিয়েছে তার সবগুলি ঘোড়াহঠাৎ স্বাধীনতা পেয়ে সেই ঘোড়াগুলি হয়ে উঠেছে বন্য, খুড়ের আঘাতে তচনচ করে দিচ্ছে মগজের সমুদয় মাটি।


মাথার এহেন আচরণ খুব একটা খারাপ লাগছিল না স্থানীয় এমপিরপতিতালয়ের মালিকের মতো সে পভোগও করছিল তার সাম্রাজ্যের সুখ। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল এর ভার্চুয়ালিটিতে। ডিজিটাল আনন্দের স্বাদ নিতে অনভ্যস্ত স্থানীয় এমপি কিছুদিন পরেই বিরক্ত হয়ে পড়লো রক্তমাংসের অভাবে। তার ক্ষুধার্ত শরীর এখন খালি চিড়িয়াখানার বাঘের মতো আর্তনাদ করে হরিণের ঘাড় মটকাতে না পারার বেদনায়।


কিন্তু সমস্যার সমাধানতো কোথাও না কোথাও আছেই। মগজহারেমের ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় এমপি কেবল ভাবে সমাধানটা কোথায়। কিন্তু কোন হদিশই মেলে না তার। অন্যরাও কে যদি কোন পরামর্শ দেয়সেটাও মনে ধরে না। মনমরা স্থানীয় এমপির জীবন এখন যেন বোধিবৃক্ষের তলায় দুঃখের মুক্তি খুঁজতে বসা বুদ্ধের দিনগুলির মতো।


কিন্তু বুদ্ধওতো একদিন খুঁজে পেয়েছিলেন দুঃখ থেকে মুক্তির পথ। সাধনায় কি না সম্ভব? স্থানীয় এমপিও তাই লাগাতার ভাবনার ফলে পেয়ে গেল চিড়িয়াখানার শিক ভেঙ্গে বনে পালিয়ে যাবার রাস্তা। হরিণের ঘাড় মটকানো এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

 


বস্তিতে আজ একটা অন্যরকম ত্তেজনা। সরু গলিগুলির মোড়ে মোড়ে আলোচনা চলছে খবরটা নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই খবরটা এনেছে পেটোয়া বাহিনীর এক চ্যালা।


খবরটার মূলকথাপেটোয়া বাহিনীর নিহত নেতার স্ত্রীকে বিয়ে করে স্থানীয় এমপি নিজেই হয়ে গেছে নতুন নেতা। আর নিহত নেতার আগের স্ত্রী ফিরে পেয়েছে বস্তির ওপর তার হারানো দাপট।

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত