| 18 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

বি(দ্বে)ষ

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

(১)

সকাল সকাল স্নান সেরে নিয়ে গায়ত্রীমন্ত্র জপ করতে করতে ঠাকুরঘরে ঢুকে দেওয়ালে টাঙানো প্রত্যেকটা ঠাকুরের ফটোতে একবার করে হাত ঠেকিয়ে সেই হাত নিজের কপালের মাঝখানে একবার করে ছুঁইয়ে নিলেন অনিমেষবাবু। মফঃস্বলে থাকা অনিমেষবাবুর কর্মস্থল ছিল শহর কোলকাতার প্রাণকেন্দ্রে, যাতায়াত করতেই কেটে যেতো অনেকটা সময়। তাই দু’মুটো ডাল-ভাত কোনোক্রমে নাকেমুখে গুঁজে, জুতো-মোজা পরে অফিসে বের হওয়ার আগে বসার ঘরের দরজার মাথায় স্বসন্মানে বিরাজিত, প্লাস্টিকের তৈরি রক্তজবার মালায় শোভিত মা কালীর ফটোতে একবার ভক্তিভরে প্রণাম করেই স্বীয় ধর্মাচরনে ইতি টানতেন অনিমেষবাবু। কিন্তু চাকরি থেকে অবসরগ্রহনের পর এখন অনিমেষবাবুর হাতে অঢেল সময়, তাই রোজ সকাল-সন্ধ্যেয় যখন নমিতাদেবী রান্নাবান্না করতে বা টিভি সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত থাকেন তখন অনিমেষবাবু সময় কাটাবার জন্য পুজোপাঠ, জপতপ করেন। আর এইসব করতে করতেই অনিমেষবাবুর মনের ভেতর আস্তিকতার সুপ্ত আগুনটা ধীরে ধীরে স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে থাকে। গত নভেম্বরের ন’তারিখে একটা দমকা হাওয়া পেয়ে দপ করে জ্বলে ওঠে সেই ছাইচাপা আগুন। তারপর সিএএ, এন আর সি, শাহিনবাগে অবস্থান বিক্ষোভ; অনিমেষবাবুর মনের ভেতর আস্তিকতার সাথে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষজনের ওপর বিদ্বেষ সমানুপাতে বাড়তে থেকে। তবে এই আস্তিকতা ও বিদ্বেষের যৌথ আগুন দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠার আগেই তাতে জল ঢেলে দেয় করোনা ভাইরাস।

অনিমেষবাবুর একটিই ছেলে, অরুনাভ। ছেলেও ওঁরই মতো সুদর্শন, সুপুরুষ। তাই উনি সহজেই অনুমান করতে পারেন ছেলেরও বেশ কিছু গায়ে পড়া বান্ধবী আছে। সে জন্য একটু দুশ্চিন্তাও হোতো ওঁর, মনে হোতো এই বোধহয় ছেলে নিজের পছন্দের কোনো মেয়েকে ঘরের বউ করে আনার দাবি তোলে। কিন্তু না, অরুনাভ সে পথ একেবারেই মাড়ায়নি। গত ফাল্গুনে নমিতাদেবী যখন বিয়ের কথা পেড়ে সম্বন্ধ দেখার কথা বলেন তখন কোনো বরোধিতা করে না অরুনাভ। অনিমেষবাবুও নিশ্চিন্তমনে একটি নামী দৈনিকের রবিবারের ক্রোড়পত্রে ও একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে পুত্রের জন্য উপযুক্ত পাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেন। কিন্তু বিধি বাম, শর্ট লিস্টেড পাত্রীপরিবারের সাথে বিয়ের কথা শুরু করার আগেই শুরু হয়ে যায় লকডাউন। এই বিষাক্ত বছরে নতুন করে কোনো সম্বন্ধ আসার আর কোনো সম্ভাবনাই দেখছিলেন না অনিমেষবাবু। তবে শেষ অবধি একটি সম্বন্ধ এল, অনিমেষবাবুর এক দূরসম্পর্কের বৌদির ভাইয়ের মেয়ে; মেয়ের পড়াশোনা এখনও শেষ হয়নি তাই বিয়ে দেওয়ার তেমন তাড়া নেই, ভালো ছেলের খোঁজ পেয়েছেন তাই ভালো করে দেখেশুনে নিয়ে পাত্রটিকে হাতে রাখতে চান। তাই অদ্য বৈকালে কন্যাদায়গ্রস্থ দম্পতি আসবেন ‘দামাদ’ দর্শনে।

সব দেবতার উদ্দেশ্যে আর একবার হাত জড়ো করে প্রণাম জানিয়ে, বিকেলের পরিকল্পনা করতে করতে ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অনিমেষবাবু।

(২)

“আপনার বইয়ের কালেকশন তো বেশ ভালো। আমারও বই পড়ার নেশা আছে, বিয়ের আগে লাইব্রেরীর কার্ডও ছিল।”, কাচের আলমারির ভেতর থরে থরে সাজানো বইগুলো দেখে উৎসাহিত হয়ে বললেন ইন্দ্রানী। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বললেন,”দেশে-বিদেশে আমারও পড়া তবে এই কাইট রানার বইটা পড়বো পড়বো করেও পড়া হয়ে ওঠেনি। আপনার কেমন লেগেছে গল্পটা ?”

সুন্দরী মহিলাটি যদি ভবিষ্যতে বেয়ান হন, সেই আশায় লেখা এবং লেখক দুইয়ের বিশেষত্বই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বলতে লাগলেন অনিমেষবাবু।

হোয়াটসঅ্যাপে মেয়ের দুটি ফটো পাঠিয়েছিল বৌদি, একটা ফুলবাগানের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আর একটা কোনো অনুষ্ঠান বাড়িতে সপরিবারে বসে। মা-মেয়ে দুজনের মুখের গড়ন একই; টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট, অনেকটা, হিন্দি সিনেমার সেই পুরোনো দিনের নায়িকা সায়রাবানুর মতো। 

সুন্দরী মহিলাদের সামনে একটু সুন্দর করে সেজুগুজে না উপস্থিত না হলে পুরুষমানুষের মান থাকে না। অনিমেষবাবুর ঘুমটা আবার কুম্ভকর্নের মতো, পাছে দুপুরে বেশি ঘুমোলে চোখমুখ ফুলে যায় তাই উনি সারা দুপুর সিনেমা দেখে কাটিয়েছেন; ‘মুঘল-এ-আজম’, বহু বার দেখা সিনেমা, জানা গল্প, তবুও আরও একবার দিলীপকুমারের দমদার অভিনয় শীশমহলে ‘যব প্যার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ গানের সাথে মধুবালার নাচ দেখতে মন্দ লাগে না।

মোগলাই পরোটার একটা টুকরো মুখে তুলে চিবোতে চিবোতে নমিতাদেবীর দিকে তাকিয়ে নবারুন বললেন,”এই সব আপনি বাড়িতে বানিয়েছেন ?”

অনিমেষবাবুর দিকে একবার দেখে নিয়ে নমিতাদেবী সলজ্জ ভাবে উত্তর দিলেন,”উনি বিরিয়ানি খেতে খুব ভালোবাসেন তাই একটু-আধটু মোগলাই রান্না শিখে নিয়েছি।”

কথা আর বেশি এগোবার আগেই পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলো অরুনাভ। নবারুন আর ইন্দ্রানীর মুখ দেখে অনিমেষবাবু বেশ ভালোই বুঝতে পারলেন যে লখনৌ চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবি আর আলিগড়ি পাজামায় সজ্জিত সৌম্যদর্শন অরুনাভকে ওদের দুজনেরই মনে ধরেছে।

ক্যাটারারকে মেনুটা ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন অনিমেষবাবু। খরচ একটু বেশি পড়ে পড়ুক খাবার-দাবার যেন এ-ওয়ান হয়। ভালো জাতের খাসির মাংস দিয়ে বিরিয়ানি আর রেজালা বানাবার নির্দেশ দিলেন উনি।

অ্যাডভান্সের টাকাটা দিয়ে ক্যাটারারকে বিদায় করতে না করতেই ডেকরেটারের ফোন। বাজারচলতি ডি,জে নেওয়ার জন্য আর একবার পীড়াপীড়ি। কিন্তু অনিমেষবাবু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোয়ালিটিতে উনি কোনো কমপ্রোমাইজ করবেন না। বিয়েবাড়ি মানেই সানাই, আর সানাই মানেই বিসমিল্লাহ খান। সিডির জন্য ডেকরেটারকে চিন্তা করতে হবে না, ওটা অনিমেষবাবু নিজেই দেবেন, নিজস্ব কালেকশন থেকে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত