| 2 মার্চ 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

ঠাকুর ঘুমোচ্ছেন

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

                     

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comমা মুখে কিছু না বললেও অনুচ্চারিত শব্দগুলো কিরণ বুঝতে পারত। তোর বাবা কত কষ্টে একটু একটু করে বাড়িটা তুলেছিল। তার সাধের ঘরবাড়ি তুই ধরে রাখতে পারলি না। সেই প্রোমোটারের হাতেই তুলে দিলি। কালো ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে মার চোখের ভাষা কিরণ স্পষ্ট টের পেত। মা কি বুঝতে পারে না তার একার রোজগারে এতবড় বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ কিরণের পক্ষে এখন একটা অসম্ভব দায় হয়ে উঠেছে।

কিরণের ওসব সেন্টিমেন্ট নেই। পুরনো এই বাড়ি দেখেশুনে রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এটাই এখন আসল কথা। বাবার কষ্ট সে দেখেছে। উদ্বাস্তু কলোনিতে জমি পাওয়ার পর কোনও মাসে দু’বস্তা সিমেন্ট, কোনও মাসে এক বাঁধ টিন, পাখি যেমন মুখে করে খড়কুটো জোগাড় করে, তেমন করে ঘর তুলেছেন। মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর গদিতে খাতা লিখতেন বাবা। সকাল আটটা নাগাদ বেরিয়ে রাত আটটায় বাড়ি ফিরতেন। সংসার চালিয়ে দুই ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন। মা একটু আলুথালু গোছের, রান্নাঘরে চাল, ডাল, তেল, নুনের খবরও বাবাকে রাখতে হত।

পুরনো এই একতলা বাড়ি ঠিকঠাক রাখা এখন এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা যা হয়েছে, এখনই সব প্লাস্টার ফেলে নতুন করে প্লাস্টার করা দরকার। প্রথম বারের পর আর কলি ফেরানো হয়নি। চারপাশের কার্নিশ তো বোটানিক্যাল গার্ডেন হয়ে রয়েছে। নতুন একটা ঘরও তোলা দরকার। সব মিলে খরচ যা পড়বে, এই মুহূর্তে কিরণের পক্ষে অসম্ভব। তার ওপর সীমার বিয়ের দায় তো সে এড়াতে পারবে না। মার সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই। বাবার পেনশনের সামান্য কিছু খুদকুঁড়ো আর একজোড়া বালা হয়তো তার হাতে তুলে দেবে। কী হবে? সীমার গায়ের রং ময়লা। মোটামুটি কালো রং দেখা যায়, শরীরের সেসব জায়গাগুলো ঢেকে দিতে হলে একজোড়া বালা তো নস্যি। সুতরাং মায়ের মেঘেঢাকা মুখের দিকে তাকিয়ে ডিসিশন পালটে ফেলার মত বোকামি সে করবে না। যেমন তার দেশের বাড়ি সম্পর্কে নেই, তেমনই তিলতিল করে বাবার রক্তঘাম দিয়ে গড়া এই বাড়ি নিয়েও তার কোনও হ্যাং-ওভার নেই। নিজের অস্তিত্ব রক্ষাই সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন। অতি ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ পর্যন্ত যেদিকে খাদ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, শত্রুর উপস্থিতি কম, আবহাওয়া জীবনের অনুকূল, সেদিকে যেতে চায়। কিরণ কেন এই ভাঙাচোরা বাড়ি আগলে বসে থাকবে। যখন পেটে যথেষ্ট ভাত, মাথার ওপর পোক্ত ছাদ, পরনে টেকসই পোশাক থাকে, আবেগ জিনিসটা তখন বেশ এনজয় করা যায়।

কিন্তু এসব তো কিরণের চলনসই গোছের আছে। তবে কেন সে নিজের মনেই যুক্তি সাজায়, তার কোনও আবেগ নেই। তার মনের ভেতরের কোনও দুর্বলতা যদি সে স্বীকার করে ফেলে, তবে প্রোমোটারের হাতুড়ি যখন এই বাড়ি ভাঙবে, যখন হলুদ রং-এর দৈত্যের মত জেসিপি মেশিন এসে বিশাল দাঁত দিয়ে কংক্রিটের চাঙড়গুলো গাড়িতে তুলে দেবে, তখনও কি সে নির্বিকার থাকবে। না কি তখন যাতে নির্বিকার থাকতে পারে, মনে মনে সেই মহড়াই দিতে থাকে।

ভুটু, তুই কি বাড়ি প্রোমোটারের হাতে দিবার কথা ভাবতাছস ?

মুখে ব্রাশ নিয়ে সকালবেলায় উঠোনে পায়চারি করছিল কিরণ। তাদের সোয়া চারকাঠা জমি। সীমানার পশ্চিমে ভাঙা দেওয়ালের নীচে ঘন জঙ্গল হয়ে রয়েছে বহুদিন ধরে। ওদিকে চোখ পড়লেই তার মনে পড়ে একদিন লোক লাগিয়ে জঙ্গলটা পরিষ্কার করতে হবে। সীমা বলছিল সাপের খোলস বাতাসে উড়তে দেখেছে। কিরণ কিছু বলেনি। সেও বেশ ক’বার দেখেছে কালো একটা সাপ তাদের পশ্চিমের দেওয়ালের ভাঙা ফোঁকর দিয়ে একেবেঁকে ওদিকে চলে যাচ্ছে।

হ্যাঁ মা, ঘরদোরের অবস্থা দেখেছ ? প্রত্যেক বর্ষায় মনে হয় এবার বুঝি ভেঙে পড়বে। হাত দিতে আমার সাহস হয় না। কাজ শুরু করলে আর শেষ হবে না। বলো, কোথা থেকে করব। বুড়ির কথাও তো ভাবতে হবে। যেভাবেই হোক, ওর একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে।

হেয়া তো কয় দাদারে ভাবতে না কইরো। আমি বিয়া করুম না। বাচ্চাগো স্কুলটা নাকি হাই হইব। তখন সেলারি অনেক বেশি।

তখন দেখবে ওর চাকরি নেই, বাইরে থেকে টিচার আসবে। সেসব অনেক নিয়মকানুনের ব্যাপার আছে।

এই বাড়ি ভাঙলে আমরা কই যামু?

সে তোমাকে ভাবতে হবে না। সে সব প্রোমোটারের দায়িত্ব। আমাদের কোথাও থাকার ব্যবস্থা সেই করে দেবে।

ভুটু, বাড়িটা কি অরা গুঁড়াগুঁড়া করব?

না মা, গুঁড়োগুঁড়ো করতে সময় অনেক বেশি লাগবে, সেসব সরাতেও ওদের অসুবিধে হবে। ওদের কাছে মেশিন আছে। দেওয়াল, ছাদ, পিলার একদিনেই সব নামিয়ে দেবে। ম্যাক্সিমাম দু’দিন। ওরা বর্ষার আগেই কাজ শুরু করতে চাইছে। ততদিন গোস্বামীপাড়া লেনে একটা ভাড়াবাড়িতে আমাদের থাকতে হবে। অসুবিধে হবে না, আমি দেখে এসেছি। অন্য ভাড়াটে নেই। তুমি এত ব্যস্ত হয়েছ কেন বলতো। আমরা তো থ্রি বেডরুম ফ্ল্যাট নেব। তোমার জন্য ছোট একটা ঠাকুরঘরের কথাও বলেছি। সারা জীবন তো কষ্ট করে কাটালে, এবার একটু হাতপা ছড়িয়ে থাকতে পারবে।

সকলের আরাম, সকলের কষ্ট কী আর সমান হয় রে। তর বাবায় থাকলে কি আর ঘরদুয়ারের এই দশা হইত। রাইতের কালে উঠান দিয়া হাঁটতে ভয় করে। কী জানি, কখন কীসের ঘাড়ে পা পড়ব। উঠানে একটা পাতা পড়লেও তুইলা নিয়া পগারে ফেলত লোকটা। সেই থাকল না, অখন আর ভালো ঠাকুরঘর দিয়া আমি কী করুম। প্রোমোটারের ঘরে কেমনে আর আরাম বেশি হইব।

কিরণ বুঝতে পারল মা-ও তা হলে সাপটা দেখেছে। পাচিলের ভাঙা জায়গাটা দিয়ে এদিকে ঢুকে পড়েছে। বর্ষায় ওরা গর্ত ছেড়ে নিরাপদ, উঁচু জায়গা খোঁজে। প্রথম বর্ষার মুখটাতেই ওদের মেটিং সিজন। এদিক সেদিক খুব দেখা যায়। তারপর কোনও অন্ধকার আনাচকানাচে ডিম পাড়ে। কিরণ যেটা দেখেছে, বেশ লম্বা। কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে একদিন লগি দিয়ে নিমপাতা পাড়ছিল কিরণ। হঠাৎ তার চোখে পড়েছিল পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে জংলি লতার আড়াল দিয়ে কালো একটা লতা সরে যাচ্ছে। শরীরে সামান্য আলো পড়ে মাঝে মাঝে ঝিলমিল করছে। মনে হয় কালো একটা সিল্কের মোড়কে ওর শরীরটা ঢাকা রয়েছে। প্রথমবার দেখে কিরণের সমস্ত শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠেছিল। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কুয়োর পাড়ে। কিন্তু সাপটা যখন ভাঙা ইটের ফাঁক গলে ওপাশে চলে যাচ্ছে, তখন কেন যেন তার মনে হয়েছিল – ইস, আরও একটু বেশিক্ষণ ধরে দেখতে পেলে ভালো হত। হিলহিলে কালো শরীর নিয়ে ধীরেসুস্থে সাপটা যাচ্ছিল। কিরণের অস্তিত্বজুড়ে বিপদের একটা সাইরেন বাজছিল ঠিকই, তবু কালো শরীর থেকে ঝিলমিল আলোর বিচ্ছুরণ তাকে কিছুটা বিবশ করছিল। শুধু ভয় থেকে নয়, আরও কিছু মোহময়ী ঘোর তাকে আবিষ্ট করেছিল।

মার কষ্ট বুঝতে পারছিল কিরণ। তখন তার বয়স আট বছর, সীমা মায়ের কোলে। বেশ কিছুদিন বেলেঘাটায় এক আত্মীয়র বাড়িতে থাকার পর এই উদ্বাস্তু কলোনির খবর দিয়েছিল রাখালতলির প্রাণকুমার জ্যাঠামশাই। জ্ঞাতি সম্পর্কে জ্যাঠা। বেলেঘাটার সেই অদ্ভুত বাড়ির কথা এখনও মনে আছে কিরণের। সবাই বলত রবি উকিলের বাড়ি। পাঁচ ভাইয়ের একান্নবর্তী পরিবার। ও বাড়িতে কিরণ প্রথম গ্রামাফোন দেখেছিল। রবি উকিলকে বড়মামা বলে ডাকতে মা শিখিয়ে দিয়েছিল। বড়মামার একজন দিদি ছিল, নিরুমাসি। কিরণের মনে আছে নিরুমাসি সব সময় আঁচলের মাথাটুকু গোল বলের মত করে গলার কাছে চেপে রেখে কথা বলত। তার গলার স্বর ছিল ভাঙা, ফ্যাসফেসে। মা বলেছিল নিরুমাসির গলায় লিক আছে, বাতাস বেরিয়ে যায়। পরে তাদের কলোনির মাঠে ফুটবল খেলার সময় কোনও দিন বল লিক হলে নিরুমাসির কথা মনে পড়ত। বেলেঘাটার বাড়িতে সকাল হত বেলা সাড়ে এগারোটা বারোটা নাগাদ। সন্ধেবেলা তাদের বাড়িতে কেউ এলে সবাই দেখত বিকেল পাঁচটা নাগাদ দুপুরের খাওয়া সেরে একটু ভাতঘুম দিচ্ছে ও বাড়ির লোকজন।  রাতের হাঁড়ি চড়ত প্রায় বারোটার সময়।

চেম্বারে মোটা মোটা বই-এর ধুলো ঝাড়া, হাতের কাছে বই এগিয়ে দেওয়া,  কখনও বড়মামা যা বলতো, ডাইরিতে সেগুলো ইংরেজিতে লিখে রাখা, প্রায় বছরখানেক তার বাবা এসব করেছে। কিরণের মনে আছে বাবার হাতের লেখা ছিল মুক্তার মত। ক’দিন আগে আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা পুরনো খাতা ফেলতে গিয়েও পৃষ্ঠা উলটে কিরণ দেখেছিল বাবার হাতের লেখা। এ বাড়ি তৈরির নিখুঁত হিসেব লেখা রয়েছে। প্রতিটি পাইপয়সার হিসেব আছে।

প্রাণকুমার জ্যাঠামশাই শুধু জমির খবর-ই নয়, মারোয়াড়ির গদিতে বাবার খাতা লেখার কাজটাও জোগাড় করে দিয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক শনিবারে এ বাড়িতে আসা তার বাঁধাধরা নিয়ম ছিল। পাকা ভিত, কিন্তু মুলিবাঁশের বেড়ার একটা মাত্র ঘর, বারান্দায় মার রান্নাঘর। উঠোনে মোড়া পেতে বসে মার সঙ্গে গল্প করত প্রাণকুমার জ্যাঠা। মার খুব ইচ্ছে ছিল ঘরে ঠাকুরের আসন পাতবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মা লক্ষ্মীর আসন নয়, দেশের বাড়িতে যেমন ছিল তার মদনমোহনের আসন, তেমন একটা বিগ্রহ বসাতে চেয়েছিল। পুজোআচ্চা, ধর্মকর্মের ব্যাপারে বাবার এক ধরণের উদাসীনতা ছিল, সেটা কিরণ বড় হয়েও খেয়াল করেছে। বাড়াবাড়ি দেখলে বিরক্তই হতেন। মা সাহস পায়নি জোর করে বাবাকে দিয়ে এসব করাতে।

শনিবারের জন্য কিরণ অপেক্ষা করে থাকত। প্রাণকুমার জ্যাঠা আসত সবুজ রং-এর সাইকেল চালিয়ে। পেছনে ডায়নামো, সামনে লাইট। প্রাণকুমার জ্যাঠার ফুলপ্যান্টের ডানপায়ের নীচে একটা ক্লিপ। সেটা দিয়ে গোড়ালির কাছে প্যান্ট ভাঁজ করে আটকানো। শনিবার বিকেল হলেই কিরণ সেই সাইকেল নিয়ে চলে যেত এখন যেখানে মনিকা শপিং প্লাজা, সেই ঘোষালদের মাঠে। প্রথমে হাফ-প্যাডেল, এক সপ্তাহের ভেতরেই সিটে উঠে পড়েছিল। শনিবার একটু তাড়াতাড়ি ফিরত বাবা। তখন মা আবার চা দিত দুজনকে। কিরণ যেবার হায়ার সেকেন্ডারি দিল, সেবার পাকা গাঁথনির ঘর উঠেছিল তাদের।

সন্ধেবেলা বারান্দায় একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিল কিরণ। পাশে আরও দুটো চেয়ার এখন খালি পড়ে আছে। এইমাত্র বাবা লোকনাথ কনস্‌ট্রাকশনের জয় আর অরবিন্দ উঠে গেল। কিরণ বুঝতে পেরেছিল ওরা আসলে দালাল। জমিজমা, পুরনো ঘরবাড়ির খোঁজ নিয়ে বেড়ায়। জমির মালিক, বাড়ির অংশীদারদের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা বলে। দু’ভাইয়ের মনের গোপন বাসনা বোঝার চেষ্টা করে। শর্ত বুঝিয়ে দ্যায়। মালিক বা শরিকরা রাজি হলে কোম্পানির লোক আসে। টাকাপয়সার ব্যাপারে কথাবার্তা এগোতে থাকে। জয় এ পাড়ারই ছেলে। প্রায় সব বাড়ির হাঁড়ির খবর জানে। এখন আর এ পাড়াকে কেউ সেবাগ্রাম কলোনি বলে না। কখন যেন উদ্বাস্তুদের নিয়ে গড়েওঠা এই জনপদের নামের শেষ অংশটুকু খসে পড়েছে। ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙ হয়ে গেছে। সেবাগ্রাম আর কলোনি নেই। এখন ঠিকানা লেখার সময় সবাই শুধু সেবাগ্রামই লেখে। এখনকার জেনারেশন হয়তো জানেই না এটা ছিল রিফিউজি কলোনি। যারা জানত, তাদেরও হয়তো মনে হত ‘কলোনি’ শব্দটার ভেতর একরকম অপমানের ম্লান ছায়া জড়িয়ে থাকে। আর্থিক, সামাজিক দিক দিয়ে পরিবর্তন হতেই রিফিউজি তকমা ঝেড়ে ফেলার একটা ইচ্ছে জেগে ওঠে।

কিন্তু পুরনো ঘরবাড়ি সব পালটে যাচ্ছে। যারা পারছে না, প্রোমোটারের দালাল তাদের ঠিক চিনে নিচ্ছে। কত ডোবা ছিল, দুটো বড় পুকুর ছিল, একটা আমবাগান ছিল। এমন কী, এখন বললে হয়তো কেউ বিশ্বাসই করবে না – একটা বাঁশঝাড়ও ছিল সেই কলোনিতে। নতুন করে শেকড় ছড়িয়ে দেবে বলে নতুন ইহুদির মত নতুন মাটির খোঁজে বেরিয়ে এখানে এসে যারা প্রথম খুঁটি পুঁতেছিল, সেই জেনারেশন প্রায় শেষ। কিরণ মাঝে মাঝে ভাবে বাবা যদি এখন সেবাগ্রাম দেখতে পেত, কেমন অবাক হয়ে যেত। কোথায় গেল গোপাল ঘোষের মুদি দোকান। সেখানে এখন সাইবার কাফে। পুকুরদুটো কবে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিরণ লক্ষই করেনি। সেখানে চিত্রালি স্টুডিও। এক মিনিটে পাসপোর্ট সাইজ ফোটো এবং দিবারাত্রি ছবি তোলা হয়। যে মাঠে কিরণ প্রাণকুমার জ্যাঠার সাইকেল নিয়ে আছাড় খেতে খেতে একদিন সিটে উঠে পড়েছিল, সেই ঘোষাল মাঠ এখন মণিকা শপিং প্লাজা। তার পাশেই বিশাল মদনমোহন মন্দির। রাসযাত্রায় এলাহি ব্যাপার। চন্দননগরের কারিগর এসে পুরো সেবাগ্রামই যেন বাহারি আলোয় মুড়ে দেয়। তখন মনে হয় – ইস্‌, বাবাকে যদি দেখানো যেত। মৃত মানুষদের দেশ থেকে বাবা কি দেখতে পাচ্ছে কী প্রবল প্রতাপ নিয়ে সোনায়, রুপোয়, মার্বেলে, মোজাইকে মদনমোহন বসেছেন সেবাগ্রামে। বাবা, তুমি তো পারনি। তোমার হাত থেকে পিছলে গিয়েছিল মদনমোহন।

চায়ের কাপ কিরণের হাতেই ধরা রয়েছে। সে কতদিন আগের কথা। এক সন্ধ্যায় ঘোষাল মাঠ থেকে বল খেলে ফিরছে কিরণ। তার ইচ্ছে ছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে মনসাতলার মাঠে মেলা দেখতে যাবে। বন্ধুদের সঙ্গে সে রকমই কথা ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে আজ আর যাওয়া হবে না। দেরি হয়ে গেছে।

সে রাত ছিল পূর্ণিমার। পুব আকাশে মস্ত বড় সোনার থালার মত চাঁদ উঠেছিল। কিরণদের বাড়ির পুব-সীমানায় সজনে গাছের ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁক দিয়ে বিন্দু বিন্দু চাঁদের নকশা কুয়োর পাড়ে খেলা করছিল। কিরণ উঠোনে পা দিয়েই দেখল আলো-আঁধারিতে কুয়োর পাড়ে কেউ বসে আছে। পাশে কেউ দাঁড়িয়ে।

শুনছ, মেলা থিক্যা একটা জিনিস আনছিলাম। কিরণ বাবার গলার আওয়াজ চিনতে পারল। বুঝল, পাড়ে সিমেন্ট-বাঁধানো জায়গাতে নিশ্চয় মা বসে আছে।

বুজ্জি, আমি জানতাম। আইজকার তারিখ তুমি যে খেয়াল রাখছ, সেইটা কি  আর আমি জানি না। উনিশে মাঘ। খালি হাতে যে তুমি আসবা না, জানতাম।

কিরণ বুঝতে পারছিল না মা বাবার এই কথাবার্তা শোনা তার উচিত হচ্ছে কিনা। যেখানে বসে মা সকালে বাসন মাজে, এখন সেখানে বসে আছে মা। বাবা কুয়োর একদম ধারে। কালো চাদরের জন্য বাবা প্রায় অদৃশ্য, কিন্তু সজনে পাতার ফাঁক দিয়ে পুর্ণিমার চাঁদের টুকরো বাবার চাদরের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে ঘুরে যাচ্ছিল।

কল্যাণী, এতদিন পর তোমার পছন্দের জিনিস পাইছি। ঠাকুর কৃপা করছে। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখি পাথরের থালা, গেলাস বিক্রি করতাছে। সেই দোকানেই পাইলাম। কইলো কাশী থিক্যা আসছে। তোমার মদনমোহনের বিগ্রহ। কালাপাথরের। আমাগো দ্যাশে যেইটি আছিল, তার থিক্যা ছুট।

সইত্য !

তাইলে। এই যে, এই দিকে আস, খাড়াও, এই এই … এ কী করলা কল্যাণী …

কিরণ শুনতে পেল কুয়োর ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ উঠে এল। মায়ের ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা। বাবার সান্ত্বনা। কিরণের বুকের ভেতরেও ছলাৎ করে উঠল।

কাইন্দ না সোনা। সব তার ইচ্ছা। ঠাকুর নিজেই যদি যদি গহীন জলে থাকবার চায়, আমাগো কী আর সাইধ্য আছে তারে আসনে রাখি। কাইন্দ না কল্যাণী, তিনি তো আমাগো ভিটাতেই থাকলেন।

পয়লা বৈশাখে ওরা লে-আউট ফেলল। তার আগে প্রথমে লেবার এসে দেওয়াল, পিলার, ছাদ – এসব ভেঙেছে। পরে হলুদ জেসিবি মেসিন এসে দু’দিনেই সব জঞ্জাল ট্রাকে তুলে জায়গাটা পরিষ্কার করে ফেলেছে। কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার হিতেন ব্যানার্জী কিরণকে বলেছিল কিরণ যদি চায়, লে-আউটের সময় একটু পুজোটুজো দিতে পারে। বাড়ির লোকজন যদি আসতে চায় … থাকলে ভালোই। কালীবাড়িতে গিয়ে নিজের নামে পুজো দিয়েছিল কিরণ। হাতে সন্দেশের প্রসাদী প্যাকেট, মাকে আর সীমাকে নিয়ে গোস্বামীপাড়া লেনের ভাড়াবাড়ি থেকে এসেছিল লে-আউটের সময়। রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। মিনিট দশেক থেকে মা আর সীমাকে পাঠিয়ে দেবে, সে কিছুক্ষণ থাকবে – এ রকম ভেবেছিল।

দাদা, ওরা যখন এসব পরিষ্কার করেছে, জিজ্ঞেস করিস তো কোনও সাপ দেখেছে কিনা। দেখলে নিশ্চয় মেরেই ফেলবে।

কিরণ দেখল তার ছোট বোনের চোখে কেমন যেন মায়া লেগে আছে। অনেক পুরনো রূপকথার মত সাদাকালো ছিটছিট গল্প, ভালোবাসার, উড়ে যাচ্ছে গরম হাওয়ায়, খোলসসহ।

ভুটু, আমি বাড়ি যামু। শরিলটা যেন কেমুন করতাছে। ভুটু, কুয়াটা কুনদিকে ছিল, আমি যে কিছুই বুঝিনা।

জানি মা। আমি জানি তুমি কেন সব ছেড়ে কুয়োটার খোঁজ করছ, আমি তো জানি। তোমাদের বিবাহবার্ষিকীর সন্ধ্যায় পুর্ণিমার চাঁদ ছিল আকাশে। তোমার মদনমোহন জলের গভীরে ডুবে রইলেন। এ জমি এখন আর আমাদের নেই। যদি কোনও দিন প্রলয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়, সব কিছু উথালপাথাল হয়ে যায়, তোমার ঠাকুর হয়তো উঠে আসবেন। ততদিন চল আমরা থ্রী-বেডরুম ফ্ল্যাটে বেঁচে থাকি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত