| 4 মার্চ 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

মা, প্রতিমা ও অন্যান্য

আনুমানিক পঠনকাল: 27 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comএক।

প্রতিমা জানে না ওর সীমাবদ্ধতা ঠিক কোন জায়গায়, এটাকে ওর দোষ বলা যায়। আজীবন ও জেনে এসেছে মানুষ মাত্রই পাখি, স্তন্যপায়ী পাখি। জন্মের পরপরই উড়তে শুরু করবে, আজীবন উড়ে বেড়াবে, উড়তেই থাকবে৷ একদিন মৃত্যু হবে এবং সেদিনই কেবল ডানা ঝাপটানো বন্ধ হবে। মুক্ত-স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু না! জীবনটা ওতো সরলরৈখিক না। সেটা অবশ্য ও বুঝেছে, তবে অনেকটা সময় পর। অনেকটা হিসাবনিকাশের পর। যখন বুঝতে পারলো শালিখ জীবন আর মানুষ জীবন এক নয় তখন তার আশেপাশের মানুষেরাও এগিয়ে এসেছে তার সেই বোধটাকে আরও একটু সমর্থন দেয়ার জন্য। 

প্রতিমা এখন দাঁড়িয়ে আছে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। ক্যাম্পাসের ভেতরের সবচেয়ে মুখরিত প্রাঙ্গনটা আজ নিরব। হয়তো ওর মতোই, সহজ হতে গেলে একটা হিংস্র আর্তনাদের প্রয়োজন। কিন্তু আর্তনাদ করা হচ্ছে না দেখে সহজ হয়ে ওঠাটাও আর হয়ে উঠছে না। প্রতিমা অনেকক্ষণ যাবত এখানটায় দাঁড়িয়ে আছে। সে হলে এসেছিলো মূলত তার কিছু জিনিস নিয়ে যেতে। প্রায় অনেকটা সময় অচলাবস্থা চলার কারণে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস চাইলেও নিয়ে যেতে পারছিলো না। সম্প্রতি হল কর্তৃপক্ষ হলে প্রবেশের অনুমতি দেয়ায় সমস্যাটার সমাধান হয়েছে। আচ্ছা, এই যে ছুটে চলতে থাকা সবার মাঝে একা এভাবে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা-সেটাই কি তবে অন্তঃসারশূন্যতা? নাকি বাস্তবতার বিশাল প্রান্তরে মেকি সামাজিক সভ্যতা বিদ্রোহ করেছে বলে মনের ভাব প্রকাশ করতে শব্দের অভাব? সে জানে না।  

– আপামনি, দশগা টাকা দিবেন? 

প্রতিমার স্তব্ধতা কাটে। জীবনের বিশাল হিসাবনিকাশের লেজার খাতার ভেতর ডুবে গিয়েছিলো সে। এই কন্ঠটা ওকে উদ্ধার করে নিয়ে আসলো যেনো। 

– টাকা দিয়ে কি করবি? 

প্রতিমা ছেলেটার দিকে খুব ভালো করে তাকায়। দশ-এগারো বছর হবে বয়স, চোখেমুখে এই বয়সী আর দশটা বাচ্চাদের মতো ঝিকমিক করা হাসিটা নেই। মুখের মানচিত্রটা কেমন যেনো মলিন, রুক্ষ আর অতিপ্রাকৃত। মাথার চুলগুলো হলদেটে হয়ে গেছে, ঠোঁটের ওপর একটা তিল যেনো সেই রুক্ষ মলিন চেহারাটার মাঝেও নজরফোঁটা হয়ে আছে। 

– কি? কি করবি টাকা দিয়ে? বলবি না? ক্ষুধা পেয়েছে? 

শেষ প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ে ছেলেটা। তার ক্ষুধা লেগেছে। আশ্চর্য ধরণের অমানবিক এই মানবসভ্যতা আর যাই বুঝতে পারুক, নিজ থেকে অসহায়ের কষ্ট বুঝতে আসে না। পারলেও বোঝায় না। ওতে ক্ষতি হয়, ক্ষতির ওপরেও ক্ষতি হয়৷ প্রতিটি মানবসম্পর্কই এক একটি বিনিয়োগ, মানবসভ্যতা একটি লাভজনক সামাজিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সভ্যরা তা স্বীকার করবে না। কেনই বা করবে! সেই ব্যবসার বড় কেনাবেচাগুলো তো তারাই করে, কাজেই অলাভজনক দাবি করাটাতেই বরং সুবিধা। ক্ষতির ওপর ক্ষতির হিসাবটা অন্তত আর করতে হয়না। হাসির প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। এই শহরটা যখন সজাগ ছিলো, যখন তীরে তীরে বন্দরে বন্দরে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলতো তখন ওর জীবনটাও খানিক সুন্দর ছিলো। দিনে দু একবার ভরপেট খাওয়া যেতো। পৃথিবীর অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক স্থানে থাকা মানুষেরা সুখদুঃখের হিসাবনিকাশ করতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও ভাড়া করে বসে। আঁটসাঁট দামি কোটপ্যান্ট পড়া আধিকারিকেরা ঠান্ডাঘরে বসে এ কাগজ ও কাগজ করে ধনকুবেরদের সুখের খতিয়ান বের করে এনে দেয়। তবে ছিন্নমূল বা ভবঘুরেদের এইদিক থেকে সুবিধা, দিনে কয়বার খাওয়া হলো সে হিসাব করলেই সুখ দুঃখের খতিয়ান নেমে আসে।

পুরো পৃথিবী যেদিন থেকে অসুস্থ হলো, হাসিদের জীবনের তলানিতে পড়ে থাকা অবশিষ্ট সুখটুকুও সেদিন থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে শুরু করলো। সবাই বলতে শুরু করলো, ‘ঘরে থাকুন, ঘর থেকে বের হবেন না।’ লাল নীল বাতিওয়ালা গাড়ি আর তাদের সওয়ারিরা কখনো খালি গলায় আবার কখনো যান্ত্রিক কন্ঠে শহর চষে বেড়ালো একই ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে, ‘ঘরে থাকুন…।’ যাদের ঘরই নেই, তারা কোথায় থাকবে বলতে আসলো না কেউই। সমাজের একটা বড় অংশই যে গৃহহীন, একবেলার খাবারের জন্য অর্ধদিবস যুদ্ধ করে যাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাদের চুলোয় কেউ আগুন দিতে আসলো না। ভদ্রবেশী সমাজ পৃথিবীর অসুখেও ব্যবসা করলো। কখনও কাগজ বেঁচে, কখনোবা বিশ্বাস। আজকাল বিভিন্ন জায়গায় শোরগো হয়, ‘কুকুর হইতে সাবধান।’ কিন্তু কেউই বলে না মানুষ থেকে সাবধান হতে৷ কুকুররা কথা বলতে পারলে অবশ্য এই কথাটাই বেশি চলতো, পারে না তাই চলে না। চলেনি, চলছেনা, চলবেও না। মানুষই বোধহয় কৌশলগত দিক থেকে প্রাণিজগতের সবচেয়ে হিংস্র প্রানী, নিজেদের রক্তও নিজেরা হজম করে নিতে পারে। 

হাসির পেটের খিদেটা একটু কমেছে। গতকাল সারাদিন না খেয়ে ছিলো একরকম৷ সন্ধ্যার দিকে একটা গাড়ির ভেতর থেকে রাস্তায় ফেলে দেয়া একটা জুসের ক্যান থেকে খানিকটা খেয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি আর খিদে মেটে? আজ এই সময়ে এই আপার সাথে দেখা না হলে হয়তো ক্ষুধায় মরেই যেতো হাসি। মানুষের সামনে বসে খেতে লজ্জা করে হাসির। এটা অবশ্য ওর অবস্থানের যে কারোর জন্যেই গোদের ওপর বিষফোঁড়া। তাই মানুষ টাকা দেয়ার বদলে খাওয়াতে চাইলে ওর কেমন যেনো অস্বস্তিবোধ হয়। আবার সেই আরেকটা অপরিচিত মানুষের সামনে বসে নিজের ভেতরের ক্ষুধার্ত হায়েনাটাকে উগরে দিতে হবে-ভাবলেই খারাপ লাগে। আজও লাগছিলো। কিন্তু খেতে বসার পর কেন যেন আর লাগেনি। গ্রামে ওর এরকমই একটা বোন আছে। এই বোনটার মতো এতো বড় নয়, ছোটো। ওর নিজের থেকেও ছোটো। কতটুকু উঁচু হয়েছে এই কয়দিনে? হয়তো ওর কাঁধ পর্যন্ত হয়ে গেছে, কতদিন বাড়ি যাওয়া হয় না!

নেত্রকোণার দুর্গাপুরের পাহাড়গুলোর নিচে ওদের বাড়ির আঙিনায় সূর্যের আলো যখন লজ্জাবতীর মতো নুয়ে আসতো তখন ওরা দু ভাইবোন মিলে রান্নাবাটি খেলতো। ততদিন পর্যন্ত অবশ্য সব ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু তার পর থেকে এর মাঝে কত কিছু যে ঘটে গেলো! ছোটো বোনটার জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলো। মার মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মারা গেলো ওদের সদ্যজাত বোনটিও। ওই বয়সে ওতো কিছু বুঝতো না সে, শুধু জানতো মা মারা যাওয়ার পর সেই কবরের ওপর একটা পাঁচিল দাঁড়িয়েছে। ওদের ঘরটা দুভাগ হয়েছে-ওদের বাবা ওদের জন্য একটা নতুন মা নিয়ে এসেছে। মা যেদিন মারা যায় হাসি সেদিন অনেক কেঁদেছিলো। না, মা মারা গেছে সেই যন্ত্রণা বোঝার ক্ষমতা তার হয়নি। সে শোকে কাঁদেওনি৷ সে কেঁদেছিলো তার সদ্যজাত বোনটা কেনো হাত পা নাড়ছে না তার জন্য, ছোট বোনটার জন্য নিজের হাতে বানানো মাটির হাড়ি পাতিল আর পুতুলগুলো একটা একটা করে তার চোখের সামনে নেয়ার পরও হাত পা নাড়ছিলো না ওদের সদ্য জন্ম নেয়া বোন।

ব্যাস! তারপর অনেক কিছু ঘটে গেলো ওদের জীবনে। বাবার সাথে সম্পর্কে পরিবর্তন আসলো। আগেও যে খুব বেশি ভালো ছিলো তেমনটা নয়। হাসিদের বাবা ওদের কাছে ঠিক বাবা হয়ে উঠতে পারেনি কখনো। হাসিদের মা রান্নাঘরেই ওদের খেতে দিতো, হাঁড়ি চুলা থেকে নামানোর আগেই৷ কিন্তু পরে দেখা গেলো নতুন মা আর বাবা হাঁড়ি খাওয়ার পর যা কিছু থাকে তা খুন্তি দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে আধ থালা ভাতও খেতে পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন তাদের নতুন মা তাদের জানালো এক গোপন খবর। খবরটা হলো, শহরের বড় বড় লোকেরা নাকি ভাতের ফেন খেয়েই এত সুন্দর-চাকচিক্যময় আর টসটসে হয়৷ ওদের নতুন মা বুঝিয়ে বললো এ কারণেই ওদেরও ভাতের ফেনই খাওয়া উচিত। শুরু হলো হাসিদের শহুরে জীবন। সকাল, দুপুর, রাত ভাতের ফেন খেয়েই কাটতে থাকলো। এক সময় দেখা গেলো তাতেও ভাগ পড়েছে, শহরের মানুষদের মতো নতুন মায়ের চুলও গোগ্রাসে ভাতের ফেন গিলতে লাগলো। ওতে চুল সুন্দর হয় তাই এই বন্দোবস্ত। একদিন হাট থেকে ফিরে বাবা হাসিকে বললো সবকিছু গুছিয়ে নিতে, ওর জন্য চাকরির বন্দোবস্ত হয়েছে। শহর দুর্গাপুরে নয়, নেত্রকোণাও নয়৷ চাকরি হয়েছে বড় শহর ঢাকায়। অনেক বড় চাকরি। বিশাল বড় জুতার ফ্যাক্টরিতে কাজ, সকাল থেকে দুপুর নাগাদ করলেই চলবে৷ দুপুরে ফ্যাক্টরির ভেতরেই খাবারের ব্যবস্থা, তারপর খাবার খেয়ে লম্বা একটা ভাতঘুম। সেই ঘুমের ব্যাপ্তি সন্ধ্যা পর্যন্ত, সন্ধ্যা মিলালে আবার ঘরঘর করতে থাকা বড় বড় মেশিনে চামড়া কেটে আর জোড়া দিয়ে জুতা বানাতে হবে। পুরো বংশে এইরকম বড় কাজ কেও করতে পারেনি, হাসি করবে-এই নিয়ে ওর বাবা আর নতুন মা খুব গর্বও করেছিলো।

একদিন মায়ের কিনে দেয়া ছোট্ট স্কুলব্যাগটার ভেতর নিজের যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি পুরে নিয়ে হাসি ঢাকা চলে এসেছিলো। ওর বাবা ওকে শ দুয়েক টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলো নিজের মতো করে থাকতে, এখানে আর কোনো সমস্যা নেই। হাসির নতুন জীবন শুরু হলো, একসময় দেখা গেলো এই ফ্যাক্টরিতে শুধু জুতাই না আরো অনেক কিছু তৈরি হয়। যেমন লাল লাল ওষুধ, শুকিয়ে যেতে থাকা জোয়ান ছেলেরা এসব ওষুধ খেয়ে নাকি শরীরে বল আনে-মোটাতাজা হয়। মাঝে মাঝে কিছু মেয়েদেরও দরকার পরে, তারাও খায়। সেইসব ওষুধ আসতো ব্যাগে করে, দাম বেশি, অনেকেই চায় তাই সব প্রক্রিয়াই চলতো অতি গোপনে। হাসির মতো আরও যারা কাজ করতো তাদেরও না করা ছিলো এই খবর বাইরে দিতে। তাতে ওদের দুপুর আর রাতের ভালোমন্দ খাবারে ভাগ পড়তে পারে। একদিন সাভার বাজারে হাসিকে কয়েকজন গাট্টাগোট্টা পুরুষ লোক খাবলে ধরলো, পকেট থেকে সেই ওষুধগুলো বের করে রাস্তায়ই কতক্ষণ মারলো। এমন মার ওকে সে বয়স পর্যন্ত মারেনি কেউই। সেদিন প্রথম বুঝতে পারলো বিচলিত স্নেহের শাসন আর  মারপিট এক ছিলো না। মা থাকতে তার হাতেও কম মার খেতে হয়নি। কিন্তু তাতে স্নেহ ছিলো, মায়া ছিলো। এইবারে কোনো মায়া নেই, কোনো স্নেহ নেই, কোনো শাসন নেই। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর একটা বেঁটে করে মহিলা পুলিশ এসে নানান প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলো। মহিলার মুখের ওপর ঠিক হাসির মায়ের মতোই একটা আঁচিল ছিলো, আর তার নিচে একটা তিল। তার শরীর থেকেও কেমন যেনো একটা মা মা গন্ধ করছিলো, হাসি পাগল হয়ে যাচ্ছিলো সেই গন্ধে। কতদিন মায়ের আঁচলের ভাঁজে লুকানো হয়নি ওর! কিন্তু গন্ধটা ঠিকই মনে পড়ে যাচ্ছে। সব মায়েদের শরীরে বোধহয় এরকম মিষ্টি গন্ধ থাকে! কি কারণে কে জানে, সেদিন কনস্টেবল শুভ্রা দেবীর বাড়ি থেকে আনা পাঠার মাংস আর ভাত তার নিজের মুখে আর রোচেনি। হাসি নামের সেই ছেলেটাকে নিজের হাতেই খাইয়ে দিয়েছিলো সে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলো প্রায় অর্ধদিবস উপোস করে থাকা একটা ক্ষুধার্থ শিশুর গোগ্রাসে গিলতে থাকা।

থানা থেকে ওকে ছাড়া হলো তার পরেরদিন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে। হাসি বুঝতে পারলো যে জুতার ফ্যাক্টরিতে সে কাজ করতো সেখানে সব কিছুর আড়ালে খুব বাজে কিছুর একটা কারবার চলে যেখানে হাসি বা তার মতদের ইচ্ছা করেই ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে, হয় এবং ভবিষ্যতেও হয়তো হবে৷ ফ্যাক্টরির সবচেয়ে ভালো মানুষ যে বুড়ো রহমত দাদা, সেও আসেনি থানায় হাসিকে ছুটিয়ে নিতে। কেউ এসে এই সময়ে বলেনি যে ছেলেটা কিছু জানে না। বলেনি ওকে মেরে লাভ নেই। কেউ আসেনি, কেউ না। থানা থেকে বের হয়ে হাসি ঠিক করেছিলো জীবনটা আর সে এভাবে কাটাবে না। সবকিছু গুছিয়ে আনতে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখলো ওর মতোই আরও একটা ছেলে এসেছে, সাথে তার বাবার মতো দেখতে আরেকটা বাবা। ওদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেনি হাসি। কি বলবে! প্রাণীদের সাথেও কথা বলা যায়, ওরা বোঝে। কিন্তু মানুষের মতো দেখতে প্রাণীদের সাথে তো আর কথা বলা যায়না, বললেও ওরা বোঝেনা। নিজের ঝোলাটা গুছিয়ে নিয়ে এক দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলো সে। তারপর এদিক ওদিক করে অবশেষে এসে থিতু হয়েছিলো এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানকার একটা মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক কি চিন্তা করে যেনো রেখে দিয়েছিলো হাসিকে। শর্ত সারাদিন ফুট ফরমাশ খাটা, টুকটাক কাজ করা, এটা ওটা এনে দেয়া আর যখন যে কাজ আসে। বিনিময়টাও নেহায়েত মন্দ নয়। মালিকের বাড়িতেই থাকবে ও। মালিকের বাড়িতেই তিন বেলা খাবারের বন্দোবস্ত। বেশ সুখেই কাটছিলো হাসির দিন। এর মাঝে একবার বছরও ঘুরে গেলো, বেশ খানিকটা থিতু হয়ে এসেছিলো ওর বানে ভেসে যাওয়া জীবন।

দুই।

আদিত্য কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সারাজীবনেও এতটা কঠিন টানাপোড়েনের মধ্যে পড়তে হয়নি ওকে। পড়েওনি। কিন্তু এখনকার অবস্থার পুরোটাই ওর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। না পারছে সহ্য করতে, না পারছে মানিয়ে নিতে। কারোর সাথে যে বলবে সেটাও করতে পারছে না। অফিসের রিভলভিং চেয়ারটা এদিক ওদিক দোলাতে দোলাতে কখন যে লাঞ্চ টাইমে পৌঁছে গেছে ও নিজেও জানেনা। অফিসের পিয়ন আলমগীর এসে টেবিলে খাবার দিয়ে যেতে যেতে একবার তাকালেন আদিত্যের দিকে। লোকটাকে আজ বেশিই চিন্তিত মনে হচ্ছে।

– আলমগীর ভাই, এসিটা একটু ছাড়বেন তো। খুব গরম আজকে!

আলমগীর সাহেব ভয়ে ভয়ে মাথার উপর দিকে তাকান। ভনভন করে ফ্যান ঘুরে যাচ্ছে, পুরাতন হওয়ার কারণে তার থেকে শব্দও আসছে। আর ঘরে ঢোকার সময়ই খেয়াল করেছেন এসি ছাড়া আছে। ঘরটায় যে একদমই গরম লাগছে না শুধু তাই নয়, একটু পর পর ঠান্ডায় শরীর কেঁপেও উঠছে। আর সেখানা কিনা এই লোক বলে যাচ্ছেন তার গরম লাগছে!

–  স্যার, এসি তো ছাড়াই আছে।

আলমগীর সাহেবের কথায় বিকার কাটে আদিত্যর। একবার তাকায় এসিটার দিকে, তার পরপরই ফ্যানটার দিকে। তারপর টেবিলের সামনে রাখা টিস্যুবক্সটা থেকে এক গাছা টিস্যু নিয়ে নিজের মুখে জমে ওঠা ঘাম মুছতে থাকে।

– স্যার, আপনি কি অসুস্থ? আনোয়ার স্যাররে কি বলবো?

– না না, কাউকে কিছু বলতে হবে না ভাই। আপনি আসেন।

আদিত্য জানে সে কি কারণে স্বাভাবিক হতে পারছে না। কিন্তু এটা জানে না এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি। আজ সারাদিনে প্রতিমা তাকে গোটা চল্লিশেক ফোন করেছে। আদিত্য ফোন তোলেনি। আজ শেষবারের মতো একবার দেখা করতে প্রতিমাকে অনুরোধ করেছিলো আদিত্য। প্রতিমা এসেও ছিলো, তাদের সেই পুরাতন জায়গায়। তাদের সেই পুরাতন প্রেমের মঞ্চে। সপ্তম ছায়ামঞ্চ। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত আর আদিত্য সাহস করতে পারেনি প্রতিমার সামনে দাঁড়ানোর। শুধু যে সাহসই করতে পারেনি তা নয়। আসলে শেষের দিকে ওর ইচ্ছাই হচ্ছিলো না বাড়ি থেকে বের হয়ে অফিস কামাই করে গিয়ে ঐ জায়গাটাতেই আবার বসুক, প্রতিমার খোঁড়া কিছু যুক্তি শুনুক। নিজেকে আজীবন বাস্তবতার হিসাবেই চালিয়েছে মানুষ আদিত্য, তার মনে অতিপ্রাকৃত কোনো গল্পের ঠাঁই নেই। খোঁড়া যুক্তির তো নয়ই। আজীবন এই কয়েকটি জিনিসকে ঘৃণা করে এসেছে সে। কিন্তু ভাগ্যকে কে আটকায়! আজ তারই ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী তাকেই কিছু খোঁড়া যুক্তির বেড়াজালে আটকে রেখেছে বা রাখতে চাইছে।

মাসকয়েক আগে বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়েছিলো আদিত্য। বলা বাহুল্য, প্রতিমাকে না জানিয়েই। আদিত্যর ধারণা কোনো কারণ ছাড়াই আদিত্যর বেশিরভাগ বন্ধুদেরই সহ্য করতে পারে না প্রতিমা। মেয়ে বন্ধুদের তো না-ই। কক্সবাজার পৌঁছানোর পর অনেক চেষ্টা করেও সে প্রতিমার থেকে বিষয়টা লুকোতে পারেনি। ফলস্বরুপ প্রতিমার কক্সবাজার চলে আসা। ভালোই লাগছিলো অবশ্য আদিত্যর, খারাপ লাগেনি। যাক, মেয়েটা আসাতে একটা সার্বক্ষণিক সঙ্গী তো হলো-এটাই ভাবছিলো ও। ওরা সবাই বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পরে প্রতিমা বায়না ধরলো ওকে নিয়ে ঘুরিয়ে আনতে হবে সেন্টমার্টিন। কি করা! প্রেমিকার আবেদন উপেক্ষা করতে শক্তির প্রয়োজন হয়। ততটুকু শক্তি ছিলো না আদিত্যর। সেন্টমার্টিন ঘুরে কক্সবাজার থেকে ঢাকা আসার পথে ওদের গাড়িটা খারাপ করলো। উপায়ান্তর না দেখে একটা হোটেলে উঠেছিলো ওরা। মাঝরাতে নির্জন হাইওয়ে রাস্তায় তো আর শুধু ঝা তকতকে হোটেল খুঁজলেই হবে না। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে মাথা গোঁজার ঠাঁইটাই পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তার পাশেই একটা মোটামুটি মানের হোটেলে একটা ঘর নিয়ে উঠে গিয়েছিলো ওরা।

–  তুমি কি করছো?

প্রতিমার এই নাম্বারটা জানা ছিলো না আদিত্যর। হঠাৎ করে প্রতিমার কণ্ঠে কেমন যেনো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় আদিত্য। কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। খানিকক্ষণ আমতা আমতা করে তারপর চুপ করে থাকে।

– আচ্ছা, বলতে হবে না কি করছো। হয়তো অফিসের কোনো কাজই করছো। কেমন আছো তুমি?

আদিত্য এবারও জবাব দেয়ার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না। যে মেয়েটার সাথে কিনা ফোনকলে কথা বলতে বলতে একের পর এক রাত পার করে দিতো সে, আজ তার সাথেই কথা বলতে গিয়ে শব্দ হাতড়ে বেড়াতে হচ্ছে। পৃথিবী কি বিচিত্র!

– প্রতিমা, কেনো জেদ করছো? এরকম দূর্ঘটনা সবার জীবনেই একটা দুটো হয়। তাই বলে কি মানুষের জীবন থেমে থাকে? পাগলামি করো না সোনা, আমি আজাদকে বলে রেখেছি। ও ওর হাসপাতালে সব ব্যবস্থা করে রাখবে। প্লিজ, আমার কথাটা শোনো। আমরা আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করবো। ট্রাস্ট মি! প্লিজ।

আদিত্য চুপ করে থাকে প্রতিমাকে শুনতে। ওপাশ থেকে কোনো আওয়াজ আসে না।

–  হ্যালো! শুনতে পাচ্ছো আমাকে?

– আমি তো জেদ করছি না আদিত্য! আর দূর্ঘটনাটাও তো আমি মানিয়ে নিয়েছি। তুমি কিসের কথা বলছো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

দাঁতে দাঁত ঘষে নিজেকে কোনোমতে সামলায় আদিত্য। এই মূহুর্তে ওর মাথা গরম করাটা খাটায় না।

– প্রতিমা তুমি সত্যিই বুঝতে পারছো না? আমি বলছি যদি এবোর্শনটা করিয়ে…

–  তুমি জানো আমি কি ভেবে রেখেছি?

আদিত্য চিৎকার করে উঠতে গিয়েও চিৎকার করে না। গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞাসা করে, কি?

– আমি ভেবে রেখেছি ছেলে হলে তোমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখবো আদি, আর যদি মেয়ে হয় তাহলে নাম রাখবো আহ্লাদি। সুন্দর না?

আদিত্য ফোন রেখে দেয়। প্রতিমার কথাগুলো আর কোনোভাবেই ওর হজম হচ্ছিলো না। ও মেয়েটাকে এটাই বুঝিয়ে পারছে না যে গর্ভধারণ মানেই সবসময় মাতৃত্ব নয়। গর্ভধারণটা দূর্ঘটনাও হতে পারে, আর দূর্ঘটনাবশত ঘটা কোনো কিছুই ইতিবাচক কোনো ফলাফল নিয়ে আসে না। গত কয়েক মাস ধরে আদিত্যদের বিয়ের সব প্রস্তুতি জোরেশোরে চলছে। প্রতিমাদের পরিবারটা এতটা প্রতিষ্ঠিত নয়, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় বাবার চাকরিসূত্রে ওদের বাড়ি। আর মূলবাড়ি কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনায়। ওদের পরিবারের এমনও অনেক সদস্য আছে যারা এখন পর্যন্ত একবারের জন্যেও ঢাকা শহরে আসেনি। তার পরেও প্রতিমাকে ও ভালোবেসেছিলো, ভালোবাসার প্রতিজ্ঞাও রাখার চেষ্টা করেছিলো ওর সবটুকু দিয়ে। কিন্তু প্রতিমার ছেলেমানুষির জন্য এখন বোধহয় সেটা ভেস্তেই যাবে। ওর বাবা মা বা পরিবারের কেউ যদি ঘুণাক্ষরেও কোনোদিন এসব বিষয় জানতে পারে তাহলে একটা গণ্ডগোল পাকিয়েই যাবে।

ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম আদিত্য খুব বায়না করেছিলো কেস করবে বলে। প্রতিমা তা করতে দেয়নি। থানায় কেস করলেই বা কি হবে? হারানো সম্ভ্রম ফেরত আসবে? আসবে না। তো কি দরকার সেইসব ঝামেলা করার! আদিত্যও মেনে নিয়েছিলো। হ্যাঁ, এরচেয়ে বরং একটা হাসপাতালে গিয়ে একটা ছোটোখাটো অপারেশন করিয়ে নিলেই ঝামেলা মিটে যাচ্ছে। ঐ ঘটনার পর প্রতিমাকে ওর বাড়িতে দিয়ে আসার পর বেশ কয়েক মাস নিয়মিত যোগাযোগ বন্ধ ছিলো ওদের মাঝে। আদিত্য অনেক চেষ্টা করেছে প্রতিমার সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু কখনো পেরেছে, কখনোবা আবার পারেনি। কোনোবার প্রতিমা ছুটে এসে আদিত্যর বুকে মাথা গুঁজেছে, আবার কোনোবার প্রতিমা আদিত্যর ডাকে সাড়াই দেয়নি। চেনা প্রতিমা হঠাৎ করেই দুর্বোধ্য পৌরণিক দেবীতে রুপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলো। ওর আচরণ বা কথাবার্তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড়া করাতে পারছিলো না আদিত্য। একসময় এসে আদিত্য ঠিক করেই নিয়েছিলো যে মা বাবাকে সবটা বিষয় খুলে বলবে, না করে দেবে যাতে এই সম্বন্ধটাতে তারা যেনো আর না এগোয়। ঠিক সে সময়টাতেই প্রতিমা নিজে থেকে আবার আদিত্যর সাথে এসে যোগাযোগ করলো। প্রথম দিকে আদিত্য অতটা খেয়াল করেনি, কিন্তু কেমন যেনো একটা বদলে গিয়েছিলো প্রতিমা।

বিষয়টা ধরা পড়লো দিন কয়েক আগে। ধানমন্ডি লেকের ধারে আদিত্যের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই ওর হাত নিজের তলপেটের ওপর নিয়ে ধরেছিলো ও। আদিত্য সেখানে স্পষ্ট টের পেয়েছিলো একটি প্রাণের স্পন্দন। ওর যতদূর মনে পড়ছিলো ঐ ঘটনার পর থেকে এর মাঝে আর প্রতিমার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা হয়নি আদিত্যের। সুযোগ আসলেও প্রতিমা দূরে ঠেলে দিয়েছে, আদিত্যও আর জোরাজুরি করেনি। হয়তো ধকলটা কাটিয়ে উঠতে আরও একটু সময় প্রয়োজন!

–  তুমি তো আমাকে কিছু বলোনি!

প্রতিমা আদিত্যের কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেয়নি সেদিন। শুধু মাথা নিচু করে মুচকি হেসেছে। বিষয়টা পরিষ্কার হলো ওর বন্ধু আজাদের কাছে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়ার পর। আজাদ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আদিত্যকে জানালো যে ও খুব শীঘ্রই বাবা হতে যাচ্ছে এবং এবার অন্তত ওদের প্রেমের পাট চুকিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলা উচিত। আদিত্য প্রতিমার মুখে ফুটে ওঠা হাসির বুদ্বুদ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলো, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আজাদের সামনে সবটা বিষয় খুলে বলা সম্ভব নয় তাই টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে এসেছিলো প্রতিমাকে আজাদের ক্লিনিক থেকে, কিন্তু প্রতিমা তখনও হেসেই যাচ্ছিলো খিলখিল করে। প্রেমের প্রথম মাসগুলোতে যেমনটা কমনীয়া লাগতো ঠিক আগের মতোই কমনীয়া লাগছিলো প্রতিমাকে। একটা শুভ্র স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছিলো প্রতিমার মুখ থেকে গলা হয়ে বুকে। আশেপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে সেখান থেকে দ্রুত বের হয়ে এসেছিলো আদিত্য। প্রতিমাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে ওর দিকে তাকিয়ে নিজেরই লজ্জা করছিলো।

– তোমাকে যে পিলগুলো এনে দিয়েছিলাম সেগুলো কি তুমি খাওনি?

প্রতিমা মাথা নেড়ে জবাব দিয়েছিলো, না। আদিত্য বুঝে উঠতে পারছিলো না সেই মূহুর্তে তার ঠিক কি করা উচিৎ ছিলো। তাই সেও বসে ছিলো, চুপ করেই।

তিন।

ডাঃ শায়লা আরেফিন তার চেম্বারে বসে আছেন। গত দশ মিনিটে দুটো সিগারেট আর দু কাপ কফি খেয়েছেন তিনি। সাধারণত তিনি এত ঘন ঘন কফি সিগারেট খান না। আজ খাচ্ছেন৷ কারণটা তিনি নিজেও জানেন না। তার সামনে একটা ঝকঝকে তরুণী বসে আছে। বয়স বলে না দিলে তাকে তরুণী ঠাহর করাটা কষ্টের, কিশোরীটাই বেশি মানানসই৷ এই তরুণীর নাম প্রতিমা। গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত আসা-যাওয়া করছে তার এখানে। মানসিকভাবে অসুস্থ কোনো রোগীই সদিচ্ছায় মনোবিদদের কাছে আসেন না, তাদের ধরে নিয়ে আসা হয়। ধরে নিয়ে আসে তাদের নিকটাত্মীয়রা। সেই আত্মীয়দের চোখে স্নেহ থাকে, প্রিয়জনের জন্য মায়ায় টলমল করা সে চোখে কেমন যেনো একটা উৎকণ্ঠাও থাকে। প্রতিমাও প্রথমবার একা আসেনি, তার সাথে তার ছেলে বন্ধুটা এসেছিলো। মিনিট দশেক দুজনেই তার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলো, তারপর মুখ খুলেছিলো মেয়েটার প্রেমিক। সাধারণত আত্মীয়র মুখ থেকে শোনা ঘটনার বর্ণনায় কিছুটা আতিশয্য থাকে, রোগীর থেকে জানতে গেলে দেখা যায় ঘটনা খুবই সামান্য৷ তবে সে ঘটনার রেশটা হয়তো বড় যে কারণে তাদের শায়লা আরেফিনের মতো মনোবিদদের শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু প্রতিমার ক্ষেত্রে ঘটনাটা পুরোটাই উল্টে ছিলো। প্রতিমার সাথে থাকা তার ছেলে বন্ধুটির চোখে কোনো স্নেহ ছিলো না, সেই চোখে কোনো মায়াও ছিলো না। ছিলো কেমন যেনো একটা ক্রোধ, একটা বিরক্তিভাব। আর প্রতিমার মুখটা ছিলো মলিন, চোখগুলো যেনো শুন্যে হারাচ্ছিলো। যেনো যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কিছু একটা খুঁজছিলো মেয়েটা৷ কিন্তু কি খুঁজছিলো?

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর শায়লা আরেফিনের ধারণা হয়েছিলো হয়তো ছেলেটা ওর বড় ভাই বা অভিভাবকতুল্য কেউ একজন। হয়তো মেয়েটা খুব বাজেভাবে কোনো একটা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে তাই স্নেহটা ঠিক আসছে না, মায়াটাও না৷ একটা চাপা অভিমান কাজ করছে। কিন্তু সবটা ঘটনা শুনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অভিজ্ঞতার বাইরেও একটা বিশাল জগৎ আছে যা সম্পর্কে তিনি অজ্ঞাত ছিলেন-বাস্তবতা। বাস্তবতা অভিজ্ঞতার নিরিখে আপাত হিসাব নিকাশগুলোকেও বদলে দেয়, যাবতীয় চেনাজানা সম্পর্ককে বদলে দেয় এক মূহুর্তে-সামান্য তুড়ির ব্যবধানে৷ সেদিনের পর থেকে প্রতিমা অনেকবার এসেছে শায়লা আরেফিনের কাছে। প্রথম দিকে ওর ছেলেবন্ধু ওকে নিয়ে আসতো, কিন্তু কয়েকদিন পর থেকে আর সেটা আর হয়নি। মেয়েটা একাই আসতে যেতে শুরু করেছিলো। একা একা আসতো, হাতে থাকতো কোনো একটা বই। রোগীদের ওয়েটিং রুমে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছেন শায়লা। প্রত্যেক রোগীকে ডেকে নেয়ার আগে মিনিট পাঁচেক তাকে আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণ করেন যা অবশ্য তার রোগীরা জানে না। দেখা যেতো কোনোদিন মেয়েটার হাতে কাফকা, আবার কোনোদিন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কোনোদিন হুমায়ুন আহমেদ আবার কোনোদিন তসলিমা নাসরিন। একদিন নির্মলেন্দু গুণের একটা প্রেমের কবিতার সংকলনও নিয়ে এসেছিলো সে, একদিন সমরেশ মজুমদার আর আরেকদিন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

সাধারণত তিন চারবারের সেশনের পর শায়লা আরেফিন সব রোগীরই একটা পারসোনা দাঁড়া করিয়ে ফেলতে পারেন। পারসোনা দাঁড়া করিয়ে নেয়ার পর চলে সেইমতে রোগীর চিকিৎসা। এই দীর্ঘ পেশাগত জীবনে কোনোদিনই তার আন্দাজের বাইরে গিয়ে কোনো রোগীর অসুস্থতা ছড়ায়নি। যেমনটা ভেবেছেন ঠিক তেমনটাই হয়েছে। কিন্তু প্রতিমার ক্ষেত্রে কিছুই খাটছে না। ডাঃ শায়লা আরেফিন প্রতিনিয়ত চিন্তার গভীরে ঢুকে যাচ্ছেন। পেশাগত জীবনে তিনি এ ধরণের যতগুলো রোগীকে দেখেছেন তারা সবাই কোনো না কোনো একটা সময়ে গিয়ে সব কিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করে অস্বাভাবিক জীবন যাপনের দিকে চলে গেছে। কেউ আসক্ত হয়েছে চেতনানাশক ওষুধে, কেউ বা ইয়াবা গাঁজায়। কিন্তু প্রতিমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। প্রতিমা শায়লা আরেফিনের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে, প্রতিটি ওষুধও ঠিক মতোই খেয়ে শেষ করেছে। অন্তত ওর অবস্থার ক্রমোন্নতি সেদিকেই ইঙ্গিত করে। তবে হ্যাঁ, একটা জায়গায় তিনি তাকে মানাতে পারেননি। প্রতিমা সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকলেও কোনোভাবেই গর্ভপাতে রাজি ছিলো না। গর্ভপাত করানোর মতো একটা বিষয়ে একজন নারী আরেকজন নারীকে আসলে খুব বেশি একটা জোরও করতে পারেন না। ভেতরের মা’টা বাধা হয়ে ওঠে, ভেতরের মা’টা বাধা দেয়। শায়লা আরেফিনও পারেননি। কাজেই একটা সময়ে এসে তিনি নিজেই বিভ্রান্ত হতে শুরু করলেন, ইতস্ততবোধ করতে শুরু করলেন। এরকম রোগী তিনি আগে কখনো পাননি, প্রচলিত কোনো ধারার ভেতর প্রতিমাকে ফেলতেও পারছেন না শায়লা আরেফিন। 

– আমি ঠিক করেছি কক্সবাজার যাবো। যাবেন আমার সাথে? দুজন পুরুষবিহীন নারী স্বাধীনভাবে সমুদ্রপাড়ে মুক্তভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে, দারুণ না? 

শায়লা আরেফিন জবাবে কিছু বলেন না। প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরান। 

– আমি কি একটা সিগারেট নিতে পারি? 

সিগারেটের প্যাকেট প্রতিমার দিকে বাড়িয়ে দেন শায়লা। প্রতিমা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে মুখে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসে টেবিল থেকে ম্যাচবক্সটা নেয়। কি মনে করে যেনো আবার রেখেও দেয়। সিগারেটটাও রেখে দেয় প্যাকেটের ভেতর। শায়লা আরেফিন সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ইন্টারকমে আর্দালিকে আরও এক কাপ কফি দিয়ে যেতে বলেন। একবার তাকান প্রতিমার দিকে, তার মুখে কেমন যেনো একটা হাসি। হাসিটা খুব মায়াবী, তাতে শিশুর সারল্য আছে। ভয় পাওয়ার মতো কিছু তাতে নেই। কিন্তু তারপরেও শায়লা আরেফিনের কেমন যেনো একটা ভয়ভয় করে৷ একবার প্রতিমার চোখের দিকে তাকান, প্রতিমার চোখের দৃষ্টি হয়ে তাকান দেয়ালে ঝোলানো ছবিটার দিকে। একটা অর্ধনগ্ন মহিলা পুকুর থেকে আজলা করে পানি খাচ্ছেন, আর তার সন্তান তার স্তন মুখে গুঁজে দুধপান করছে। 

– প্রতিমা, তুমি এই অবস্থায় কক্সবাজার কেনো যেতে চাও? 

প্রতিমা একবার শায়লা আরেফিনের দিকে তাকায়৷ হয়তো এই প্রশ্নের কোনো জবাব করার প্রয়োজন মনে করে না ও। আবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে থাকে দেয়ালে ঝোলানো সেই ছবিটার দিকে। কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যান শায়লা, দরজা ঠেলে আর্দালি ঘরে ঢোকে। কফির কাপ আর বাদামের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে আবার দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। হাতঘড়ির দিকে একবার তাকান শায়লা আরেফিন। এই সময়টায় তার এক প্লেট স্যালাড, এক প্লেট বাদাম, এক প্লেট ড্রাই ফ্রুটস আর এক গ্লাস জুস খাওয়ার কথা ছিলো। আর্দালিকে বলতে হয় না, সেই সময় মতো নিয়ে আসে। গত কয়েক বছরে এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু আজ শায়লার মুহুর্মুহু কফি খাওয়াতে আর্দালিও কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছে হয়তো। তাই কি করবে বুঝতে না পেরে হয়তো এই বাদামের প্লেটটাই নিয়ে এসেছে।

– প্রতিমা, আমার মনে হয় কি এই সময়টা তুমি ঢাকাই থাকো৷ সবকিছু সুন্দরমতো সেরে যাক, তারপর একবার মুক্ত হয়ে গেলে তোমার যেখানে ইচ্ছা সেখান থেকে ঘুরে আসতে পারবে। কিন্তু এখন না।  

– আচ্ছা, আপনারা সবাই এই মাতৃত্বটাকে বাঁধা কেনো মনে করেন বলুন তো!

শায়লা আরেফিন প্রতিমার এই প্রশ্নে হঠাৎই থতমত খেয়ে যায়। কি উত্তর করবে ভাবতে ভাবতেই শায়লা আরেফিনকে অবাক করে দিয়ে প্রতিমা হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ায়৷ টেবিলের আরেক কোণা থেকে একটা চেয়ার টেনে এনে দেয়াল থেকে ছবিটা নামায়। 

– এটার দাম কত হবে? আমার খুব পছন্দ হয়েছে৷ 

– এটার দাম দিতে হবে না। নিতান্তই কম দাম। আমার পিয়ন ছবিটা ফ্রেমে বাঁধাই করে এনে এখানটায় টাঙিয়ে রেখেছে, কার ছবি সেটা আমি জানি না৷ 

একটা হাসি দিয়ে প্রতিমা রুম থেকে বের হয়ে যায়। শায়লা আরেফিন আরেক কাপ কফি দিতে বলে প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরান। লম্বা একটা টানে একবুক নিকোটিন নিয়ে নিজেকে সামলাতে পারেন না, কাশতে কাশতে একটা বিশ্রি কান্ড বাঁধিয়ে বসেন। আর্দালি ছুটে এসে এক গ্লাস পানি দিয়ে যায়। পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতে দেখেন আর্দালি ভীতসন্ত্রস্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। 

– বাইরে আর কয়জন রোগী আছে? 

আর্দালি খুব অস্ফুট স্বরে বলে, সতেরো…

– না করে দাও তাদের৷ কাল, পরশু আর তার পরেরদিন কোনো সিরিয়াল নেবে না। আমি ঢাকার বাইরে যাবো। শরীফকে ফোন দিয়ে বলো গাড়ি বের করে গ্যারেজে নিয়ে যেতে। কি কি ঝামেলা আছে তা যেনো সন্ধ্যার আগে সারিয়ে রাখে। 

আর্দালি মাথা নেড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়৷ যাওয়ার আগে ঘরের সব বাতি নিভিয়ে দেয়। সে স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে ম্যাডামের মন এখন খুব বেশি একটা সুবিধার না। এই অবস্থায় যেকোনো সময় ম্যাডামের মাইগ্রেন এটাক হতে পারে। তাই আগে থেকেই ব্যবস্থা। 

চার।

হাসি বসে আছে হাসপাতালের বিশাল বড় করিডরে। চিন্তা করার কোনো কারণ নেই তবুও কেনো যেনো তার খুব চিন্তা হচ্ছে। সহোদর বোনের জন্যেও এই কয়েক বছরে এতটুকু চিন্তা তার হয়নি যতটুকু কিনা তার সদ্য পরিচিত সেই বোনের জন্য হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালের এক আয়া এসে তাকে রুটি-কলা দিয়ে গেছে। সকাল থেকে কিছু খায়নি হাসি। অন্য কোনো সময় হলে এই খাবারের উচ্ছিষ্টটুকুও এতক্ষণে অবশিষ্ট থাকতো না হয়তো, কিন্তু এখনও সে রুটি-কলার থালাটা স্পর্শও করে দেখনি। গতকাল রাতে হঠাৎ করে প্রতিমা আপার অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর সে দৌড়ে গিয়ে হোটেলের নিচতলায় বসে থাকা কয়েকজন কর্মচারীকে জানিয়েছিলো। তাদের দুজন এসে প্রতিমার অবস্থা দেখে কেমন যেনো একটা ভড়কে গিয়েছিলো। যদিও হাসিকে বলা হয়েছিলো যে প্রতিমা ও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিন্তু কিছুক্ষণ পর হাসি দেখতে পারলো জনশূন্য সমুদ্রসৈকতের মাঝে এসে ওদের গাড়িটা থেমে গেছে। ওদেরকে সেখানেই নামিয়ে দিয়ে দ্রুতই সটকে পড়ে সবাই। প্রতিমা তখনও চিৎকার করে কাঁদছিল, ‘আমাকে বাঁচাতে হবে না। আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান।’ কিন্তু ওদের হাতে প্রতিমার কথা শোনার মতো সময় ছিলো না।  

এক ঝিনুকওয়ালার সাহায্য নিয়ে হাসি প্রতিমাকে নিয়ে এসেছিলো এই হাসপাতালটাতে। রক্ত আর স্রাবে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিলো হাসির শরীর। ছোট বোনটার জন্ম দেয়ার সময়ও একইভাবে রক্তক্ষরণ হয়েছিলো হাসির মায়ের। খানিক পর পরই চোখমুখ উলটে যাচ্ছিলো, সারা শরীর বেয়ে ঘোর বর্ষার কোনো এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যার মতো ঘাম ঝরছিলো। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিলো, বুকটা ওঠানামা করছিলো ধনুকের মতো। সে রাতের কথা ভুলে যায়নি হাসি। গতকাল রাতে প্রতিমা আপারও ঠিক একই অবস্থা দেখে সদ্য পরিচিতা এই মানুষটার জন্য তার বুক ফেটে কান্না আসছিলো। হাসপাতালের নার্সরা তাকে ধরে রেখেছিলো শক্ত করে যেনো ছুটে গিয়ে প্রতিমার কাছে না চলে যেতে পারে সে। কিছুক্ষণ পর ভেতরে একটা হুলস্থুল লেগে গেলো। এটা ওটা নিয়ে একটা দৌড়াদৌড়ি পড়ে গেলো। শান্ত এলাকাটা যেনো হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে উঠেছিলো, কিসের যেনো একটা কোলাহল সমস্ত শান্তিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। হাসির কিছু মনে নেই, ওর মনে আছে সে শুধু কেঁদেই যাচ্ছে আর কেঁদেই যাচ্ছে কিন্তু কেউ তাকে প্রতিমার কাছে যেতে দিচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর পরিবেশ মোটামুটি শান্ত হলো। আপাদমস্তক ডাক্তারি পোশাকে ঢাকা একটা চওড়ালম্বা লোক এসে তাকে জানালেন তার একটা বোন হয়েছে। ঠিক একইভাবে, যেভাবে সে রাতে রহিমা দাদী এসে জানিয়েছিলো যে হাসির একটা বোন হয়েছে। তবে খবর দেয়ার মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে। রহিমা দাদী  তাকে বোনের জন্মের সাথে সাথে আরও একটা খবর দিয়েছিলো, তার মায়ের মৃত্যুর খবর। সদ্য মা হারানো হাসিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো গ্রামের বাজারের কোনো এক ঘরে দেশি চোলাই মদের বিষাক্ত নেশায় ডুবে থাকা তার বাবাকে ডেনে আনতে। হাসি ছুটে গিয়েছিলো। পার্থ বাবুর আড়তের পুরোটা ঘুরেও বাবাকে দেখতে না পেয়ে হাসি গিয়েছিলো কবি মামার চায়ের দোকানে। না, সেখানেও পায়নি তাকে। অবশেষে সেলিম কাকার গ্যারেজে হাসি তার বাবাকে আবিষ্কার করেছিলো কোনো এক অপরিচিতা মহিলার সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায়। মায়ের মৃত্যুসংবাদ দেয়ার পরেও নিজের বাবার চোখেমুখে লেগে থাকা নির্লিপ্ত ভাবটার মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখেনি সে। বরং খুব বাজে একটা গালি দিয়ে চৌকির অপর পাশে শুয়ে থাকা মহিলাটাকে আবার জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করেছিলো তার বাবা। নিজের ভেতর জ্বলে ওঠা দাবানলটাকে উগরে দেয়ার মতো পরিপক্কতাও তখনও হাসির মধ্যে আসেনি। তাই হয়তো চোখ মুছতে মুছতে আবার বাড়ির দিকে দৌড়ে এসেছিলো।

হাসি বাড়ি ফিরে উঠানে পা দিতেই শুনতে পেয়েছিলো প্রায় মৃত বাড়ির আঙিনার আবার জেগে ওঠা; আরেকটা কান্নার রোল উঠেছিলো। শশব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢোকার পর দেখেছিলো রহিমা দাদী আয়াদের ধরে কেমন যেনো মাতম করছেন। আয়াদের একজনের কোলে তার সদ্যভূমিষ্ঠা বোন চোখ মেলে শুয়ে আছে। নিজের বোনের জন্য এই দীর্ঘদিনে বানানো মাটির রান্নাবাটির খেলনা বা কাঠের পুতুল, কোনোকিছুর প্রতিই যেনো কোনো আগ্রহ ছিলো না তার। হাসির একের পর এক কথার জবাবে চোখ মেলেও তাকায়নি সে হাসির দিকে। হাসি সেদিন অনেক কেঁদেছিলো, অনেক। বাড়িভর্তি মানুষ স্তব্ধ হয়ে দেখছিলো সদ্য মা-বোন হারানো এক নাবালক শিশুর মাতম। ভোররাতের দিকে তার বাবা বাড়িতে ফিরেছিলো গাঁজা ফুঁকতে ফুঁকতে, বাড়ির ভেতর পা দিয়ে সবার দিকে কেমন যেনো একটা শূণ্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো সে। যেনো কিছুই হয়নি, যেনো কিছুই ঘটেনি। সবই স্বাভাবিক। কিছুক্ষণ বাড়ির ভেতর পায়চারি করে এক সময় ধপ করে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দিয়েছিলো বিছানার ওপর। তার ঘরঘর শব্দ তুলে নাক ডাকার আওয়াজ যেনো হাসির আর্তনাদকেও ছাপিয়ে যাচ্ছিলো।

–  তোমার মা এখন খুব বেশি একটা সুস্থ নয়, তবে তোমার বোন ভালো আছে।

হাসির সম্বিৎ ফেরে। ডাক্তার সাহেবের চেম্বারে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। মাঝখানে কতক্ষণ কেটে গিয়েছে জানে না হাসি। তবে আন্দাজে বলতে পারে বেশ অনেকটা সময়ই কেটে গিয়েছে। একবার ভাবে ডাক্তারকে বলবে যে প্রতিমা তার মা নয়। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্তে বদল আনে সে। গত কয়েক ঘন্টায় ভদ্রবেশী সভ্য সমাজের উঁচু পর্যায়ের মানুষদের বিকৃত মানসিকতা আর অমানবিকতার বেশ কিছু উদাহরণ পেয়ে গিয়েছে সে। শেষ পর্যন্ত না প্রতিমাকে হাসপাতাল থেকেও বের করে দেয়।

– খোকা, তোমার বাবার নাম কি আমাদের বলবে? তোমার বাবা হয়তো জানেন না, কিন্তু তোমার বাবাকে জানানো উচিত। তিনি কি তোমাদের সাথে এখানে এসেছেন? কোথায় আছেন এখন উনি?

হাসি উত্তরে কি বলবে বুঝে পায় না। এই রুমে ডেকে আনার পর থেকেই ভদ্রলোক একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন। হাসি ইচ্ছা করেই খুব বেশি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। নিতান্তই উত্তর দিতে হলে সেটা এক বা দুই শব্দের ভেতরই সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করছে সে।

– খোকা, এক কাজ করো তো। তোমার বাবার ফোন নাম্বারটা বলো। দেখি আমি নিজেই তাকে ফোন করে নিচ্ছি। তোমার মার শরীরের অবস্থাটা একটু খারাপ, এই সময়টাতে তোমার বাবার মায়ের পাশে থাকাটা খুব বেশিই দরকার।

কথা শেষ করে নিজের ফোনটা হাসির দিকে এগিয়ে দেন ডাক্তার পার্থ প্রতিম। কিন্তু হাসি ফোন ঠেলে দেয়। প্যান্টের পকেট থেকে একটা দুমড়ানো মুচড়ানো কার্ড বের করে এগিয়ে দেয় ডাক্তার সাহেবের দিকে। হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় প্রতিমা নিজের ব্যাগ থেকে এই কার্ডটা বের করে হাসির হাতে দিয়ে বলেছিলো যে খুব বেশি প্রয়োজন পড়লে যেনো এই নাম্বারে ফোন করা হয়। গত কয়েক ঘন্টার এই হুলস্থুল পরিবেশের মধ্যে বিষয়টা একবারও তার মাথায় আসেনি। আর মাথায় আসলেও লাভ ছিলো না। হাসির নিজের কোনো ফোন নেই যে তার থেকে সে ফোন করবে। প্রতিমা আপাকেও সে ফোন ব্যবহার করতে দেখেনি, তার মানে তার কাছেও ফোন নেই। রাস্তার মানুষের কাছে খাবার চেয়ে কিছুটা অভ্যাস আছে হাসির, কিন্তু ফোন চাওয়ার অভ্যাস তার নেই।

–  এইযে, এইখানে নাম্বার আছে।

ডাক্তার পার্থ প্রতিম একটু অবাক হয়ে ছেলেটার হাত থেকে কার্ডটা নেন। এই বয়সের একটা ছেলে নিজের বাবার ফোন নাম্বারটা মুখস্ত বলতে পারে না! কি বিচিত্র।  

পাঁচ।

গত কয়েকদিন শায়লা খুব অস্বস্তি এবং অসুস্থতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। এর অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। প্রথম কারণ অবশ্যই প্রতিমার হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়া। গড়পড়তা আর দশটা রোগীর মতো প্রতিমাকে সাধারণ চোখে দেখেন না শায়লা। প্রতিমার সাথে তার একটা আত্মার যোগ আছে। সেটা নিয়ে অবশ্য খুব বেশি একটা ভাবতে রাজি নন তিনি, নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে তাই প্রশ্রয়ও দেননি ততটা। শায়লার কাছে প্রতিমা মোটামুটিভাবে গুরুত্বপূর্ণ একজন রোগী। গুরত্বটা ঠিক কোথায় সেটা অবশ্য জানেন না তিনি। হয়তো অনেকদিনের কথাবার্তায় মেয়েটার ওপর মায়া পড়ে গেছে, তাই! প্রতিমার এভাবে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়াটা শায়লা আরেফিন কেনো যেনো মানিয়ে নিতে পারেননি। সেদিন চেম্বার থেকে বাড়ি ফিরে সবকিছু গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় সন্ধ্যা গড়িয়ে গিয়েছিলো। প্রতিমা বলেছিলো ওর বাস রাতে, কাজেই তাতে কোনো সমস্যার কিছু ছিলো না। সমস্যা গড়ালো যখন সন্ধ্যা থেকে প্রতিমার ফোনটা লাগাতারভাবেই বন্ধ বলে আসছিলো। বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে শায়লা আরেফিনের মাথায় হঠাৎ করেই আরেকটি বিষয় খেলা করতে শুরু করে। প্রতিমার তারিখ এগিয়ে গিয়েছিলো, হয়তো আর দিন দশেকের মধ্যেই নিজের সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছিলো ও। তাহলে এই সময়ে কেনো প্রতিমা এত দূরের যাত্রায় যাবে? তাও আবার বাসে করে। হয়তো প্রতিমার মাথায় বিষয়টা একদমই কাজ করেনি, হয়তো এটা নিয়ে ভাবার মতো মানসিক স্থিরাবস্থানে সে নেইও। তার পর থেকে একের পর এক ফোন করতে থাকেন প্রতিমাকে। বলা বাহুল্য, ফোনটা বন্ধই আসছিলো। একটা যান্ত্রিক মহিলা কন্ঠ বার বার বলে যাচ্ছিলো, ‘আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এই মূহুর্তে বন্ধ আছে। দয়া করে কিছুক্ষণ পর কল করুন…’

শায়লা আরেফিন যেমনটা ভাবছিলেন তেমনটাই হলো। এই কয়েকদিনের প্রচন্ড চাপে তার মাইগ্রেন এটাক হয়ে গেলো। গত দু তিনদিন তিনি না পেরেছেন একবেলা ভালো করে খেতে, না পেরেছেন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এই পুরোটা সময়ে তার মাথা থেকে একবারও প্রতিমার জন্য দুশ্চিন্তাটা সরে যায়নি। সামান্য একটা রোগীর জন্য এত চিন্তা করার কিই বা থাকতে পারে! এর মাঝেও তিনি বারকয়েক চেষ্টা করেছেন প্রতিমার সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু না, পারেননি। ফোনটা বন্ধই বলে যাচ্ছিলো। প্রতিমার ছেলে বন্ধুটির কাছ থেকে ওর বাড়ির ঠিকানা নিয়ে আজকে সকালে গিয়েছিলেনও ওর বাড়িতে। পল্লবীর উত্তরের দিকের রাস্তার পাশের এপার্টমেন্টটায় থাকা ওর দু’তলার ফ্ল্যাটটা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিলো। কাজেই নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছিলেন তিনি। একবার ভেবেছিলেন পল্লবী থানায় গিয়ে অভিযোগ করবেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। থানা পুলিশের ঝামেলায় যেতে ইচ্ছে করেনি তার। গত কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা মাথার ভেতরের ছিঁড়ে ফেটে বের হয়ে যাওয়াটাকে কোনোমতে থামানো গিয়েছিলো। থানার ভেতর গিয়ে আইনি বাতেলা আর আমলাতান্ত্রিক কচকচানিতে সেটা আবার চাগিয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কায় আর অভিযোগ দায়ের করা হয়ে ওঠেনি। অন্য কাওকে থানায় পাঠিয়ে অভিযোগ করাবেন সে ইচ্ছাও হয়নি। মাঝে কিছুক্ষণ ধানমন্ডি লেকে গিয়ে বসে ছিলেন লম্বা বেঞ্চিটাতে যেখানটায় তিনি নিয়মিতই বসেন। সাথে করে নিয়ে যাওয়া রিডার্স ডাইজেস্টটায় অনেক চেষ্টা করেও চোখ বুলাতে পারেননি তিনি। কেমন যেনো একটা উৎকণ্ঠা তাকে তারা করে বেড়াচ্ছিলো। বেঞ্চিটায় বসে খানিক ছটফট করে সন্ধ্যা মিলানোর আগেই বাড়ি চলে এসেছিলেন। বাড়ি ঢুকে দেখলেন প্রতিমার সেই ছেলেবন্ধু আদিত্য তার বাড়িতে এসে বসে আছে। শায়লাকে দেখে সে উঠে দাঁড়ালো না, বরং গাটা সোফায় আরও একটু এগিয়ে দিলো।

– আপনার হুইস্কির কালেকশনটা বেশ বড় দেখছি। আপনি যে এতটা শৌখিন সেটা কিন্তু আপনাকে দেখলে বোঝা যায় না।

শায়লা আরেফিন এই সময়ে আদিত্যর তার বাসায় থাকাটাকে কোনো হিসাবে মিলাতে পারছিলেন না।

–  তুমি আমার বাসায় কি করছো! একজনের ব্যক্তিগত কোনো কিছু ধরতে গেলে প্রথমে তার অনুমতি নিতে হয়, এইটুকু শিক্ষাও কি নেই তোমার মাঝে?

–  আচ্ছা!

ঠা ঠা করে হাসতে থাকে আদিত্য। আদিত্যের ফুলে ওঠা চোখ আর মদের ঘোরে মাতাল হয়ে এদিক ওদিক টলতে থাকা ওর শরীর দেখে শায়লা আরেফিনের হঠাৎ কেমন যেনো ভয় ভয় করতে শুরু করে।

– দেখুন, পার্সোনাল স্পেসে ইন্টারফেয়ার না করাটাকে যদি ম্যানার বলা হয় তাহলে মেনে নিচ্ছি আমি একজন ব্যাড ম্যানারড পার্সন। আপনি নন?

–  কেনো, আমি কি করেছি?

শায়লা আরেফিন ঘামতে শুরু করেন। তবে কি সবকিছু জেনে গেলো আদিত্য?

– আপনি গতকাল আমাকে ফোন করে কি কি বলেছেন কিছুই মনে নেই? হুইস্কির বোতল নিয়ে বসেছিলেন নাকি?

শায়লা আরেফিন একটু ভড়কে যান। আদিত্যকে কাল ফোনে বেশ এক হাত নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমার খোঁজ জানতে চাওয়ার পর বারবার যখন আদিত্য বলছিলো যে প্রতিমার অবস্থান সম্পর্কে ও কিছুই জানে না তখন একটা পর্যায়ে গিয়ে তার মনে হয়েছিলো আদিত্য হয়তোবা প্রতিমার সাথে খুব বাজে কিছু একটা করেছে। হয়তোবা বার বার বলার পরেও গর্ভপাত না করার কারণে মেয়েটাকে মেরেই ফেলেছে ও। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই আদিত্যকে বেশ কয়েকটা কড়া কথা বলেছিলেন শায়লা আরেফিন। যদিও আজ প্রতিমার পাশের ফ্ল্যাটটার গৃহিনীর সাথে কথা বলার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পুরোটা ব্যাপারে আদিত্যর কোনো হাত নেই। কিন্তু এটা বুঝতে পারার পর সে আদিত্যকে ফোন করে বেশ কয়েকবার দুঃখপ্রকাশ করেছে এবং পুরোটা ব্যাপারে যে তিনি কতটা লজ্জিত সেটাও বুঝিয়ে বলেছেন। কিন্তু এর পরেও আদিত্যর এই ধরণের উদ্ধত এবং বেপরোয়া আচরণের মানে কি? 

– আপনি কি অশোক রায়কে চেনেন? উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, আপনার সহপাঠী এবং পরে সহকর্মী ছিলেন।

– না, কোনো অশোক রায়কে আমি চিনি না।

নিজের মধ্যেই বার কয়েক খাবি খেয়ে ফেলেন শায়লা আরেফিন। অশোকের কথা আদিত্য জানতে পারলো কি করে! একবার আদিত্যর দিকে আড়চোখে তাকান শায়লা, ওর চওড়া মুখটা কেমন যেনো আরও বেশি চওড়া হয়ে গিয়েছে। হুইস্কির বোতল থেকে আরও এক পেগ বানিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে তার থেকে একটা সিগারেট ধরায় সে। সিগারেটের প্যাকেটটা শায়লা আরেফিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে আরও এক পেগ বানিয়ে নেয় আদিত্য। শায়লা আরেফিন সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে হঠাৎ বিষম খেয়ে ফেলেন। টেবিলে থাকা গ্লাসভর্তি হুইস্কি এক ঢোকে গিলে নেন। চোখ বড় করে হাঁসফাঁস করতে করতে তাকান আদিত্যর দিকে। ওর মুখে খুব বিশ্রি ধরণের একটা হাসি ফুটে উঠছে।

অশোক রায় বা আশুর সাথে শায়লা আরেফিনের খুব দীর্ঘসময়ের একটা প্রেম ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার প্রতিটি প্রাঙ্গন, প্রতিটি আঙিনা সে প্রেমের স্বাক্ষী হয়ে আছে। ওদের প্রেমে কোনো বাঁধা ছিলো না। অভিজাত মুসলিম পরিবারের একটা মেয়ের সাথে একটা হিন্দু ছেলের প্রেমটাকে সহজভাবে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলো না তখনকার সমাজ বা সভ্যতা। তবুও আশু বাঁধভাঙা প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো শায়লাকে। শায়লাকে আদর করে শালুক ডাকতো আশু। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ওদের জুটিটাকে প্রেমের আদর্শ মনে করা হতো। এমনও দিন গিয়েছে যখন উত্তাল ছাত্র আন্দোলন চলছে, মধুর ক্যান্টিন থেকে একের পর এক মিটিং শেষে বিশাল ছাত্র মিছিল বের হয়ে যাচ্ছে অথচ তারই অব্যবহিত দূরে কোনো এক বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আশু তার শালুকের কোমর অবধি লম্বা চুলে বিনুনি দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্রোহের বারুদের গন্ধে নয়, আশু মাতাল হচ্ছে শালুকের চুল থেকে ছুটে আসা বেলী ফুলের গন্ধে। কিন্তু সে প্রেম টেকেনি। কোনো এক স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার মতোই হঠাৎ গোড়া থেকে ভেঙে চলে আসে। অনেক কিছুর পরে শায়লাকে মেনে নিতে নিমরাজি হয়েছিলো অশোকের পরিবার, কিন্তু শর্ত ছিলো। শর্ত হচ্ছে শায়লাকে সনাতন ধর্ম গ্রহণ করতে হবে এবং তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক আজীবনের জন্য ছিন্ন করতে হবে। কেবল এই শর্তেই রায়বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্যতা পেতে পারতো শায়লা। কিন্তু সবকিছু ভেবে ওর নিজের ভেতরটাই কেমন যেনো গুলিয়ে উঠেছিলো। না, বাড়িতে বৃদ্ধা মা ছাড়া আর তেমন কেউ নেই তার। বাবা গত হয়েছিলেন বেশ কয়েক বছর আগেই। মা ভুগছিলেন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে, মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে জীবনের শেষ মূহুর্তটুকুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আর একদম গোঁড়া মুসলিম বলতে যা বোঝায় সেরকমটা কখনোই ছিলো না শায়লা। ধর্মকর্মের প্রতি এতটা মন ছিলো না। ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ওপর যতটুকুও বিশ্বাস অবশিষ্ট ছিলো অশোকের সাথে মিঠুনদাদের পাঠচক্রটাতে নিয়মিত আসাযাওয়া শুরু করার পর সেটাও ভেস্তে গিয়েছিলো। কাজেই জাতিগত বা পারিবারিক কোনো ক্রোধ বা সীমাবদ্ধতা থেকে অশোকের সাথে সম্পর্কটাকে ভেঙে দেয়নি সে। অশোকের মা যখন এই শর্ত শায়লাকে বলছিলেন তখন নিজের কাছে নিজেকেই খুব বেশি ছোট লাগছিলো শায়লার। অশোকের নির্লিপ্ত ভাবলেশহীন মুখমন্ডল সেই নীচ বোধটাকে আরও বেশি উস্কে দিচ্ছিলো।

অশোকদের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পর আর কোনোদিন অশোকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি সে। অশোক অবশ্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাতে কোনো সাড়া দেননি শায়লা। তার কাছে বারবার মনে হয়েছে একটা মেরুদণ্ডহীন পুরুষের ছায়াতলে বাকি জীবনটা পার করাটা বৃষ্টির দিনে ভাঙা ছাতার নিচে ঘর বানানোর মতোই হয়ে যাবে। এরচেয়ে বরং একাই বাঁচবে সে, বৃষ্টির সন্ধ্যায় তার মাথার ওপরে কারোর ছাতা হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই দৃঢ় সিদ্ধান্তের মাঝে দিয়ে গিয়ে সে একটা সময় নিজেকে গুছিয়ে নেয়। দ্বিতীয় ধাক্কাটা আসে ঠিক সে সময়টাতেই। হঠাৎ করেই তার নিজেকে খুব বেশি দূর্বল মনে হতে থাকে, কেমন একটা বমি বমি ভাব আর মাথা ঘোরানোটা তো আছেই। অশোকের ঔরসজাত সন্তান কবে থেকে সে গর্ভে ধারণ করছে তার কোনো ধারণাই ছিলো না তার।

– আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করবো। সত্যিটা বলবে।

আদিত্য মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শায়লার দিকে তাকায়।

– অশোকের সাথে আমার সম্পর্কের ব্যাপারে তুমি কিভাবে জানো?

আদিত্য শায়লার প্রশ্নটা শুনে একবার হাতের গ্লাসটার দিকে তাকায়, তাতে অবশিষ্ট থাকা বাকি হুইস্কিটা এক চুমুকে শেষ করে।

–  অশোক রায় সম্পর্কে আমার ছোট কাকা। আপনার সাথে তার সম্পর্কটা আমি অবশ্য আমার কাকার কাছ থেকে জানিনি। জানার উপায়ও নেই। বেশ কয়েক বছর হয় তিনি মারা গেছেন।

–  অশোক মারা গেছে! আমি জানতামই না।

শায়লার কথা শুনে আদিত্য খিকখিক করে হেসে ওঠে। বিচিত্র এবং কদর্য সেই হাসার ভঙ্গি।

– আপনি তো এটাও জানতেন না যে প্রতিমা আপনার গর্ভজাত সন্তান যাকে আরও পঁচিশ বছর আগে আপনি সেফহোমে রেখে এসেছিলেন।

আদিত্যর কথা শুনে থতমত খেয়ে যান শায়লা।

– তুমি না বললে অশোক মারা গেছে?

– হ্যাঁ, কাকা মারা গেছে এবং এসব আমি কাকার কাছ থেকে শুনিওনি। আগেও বললাম, এখনও বলছি। আপনি যেদিন প্রতিমার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন সেদিন আমিও গিয়েছিলাম।

– কিন্তু আমি তো সে মহিলাকে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি। আমি নিজেও জানতাম না যে প্রতিমা…

আদিত্য শায়লার মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয়। সোফায় আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে, পারে না। আবার পড়ে যায়।

– প্রতিমা আপনার মেয়ে। গাজীপুরের যে সেফহোমের সামনে আপনার দূরসম্পর্কের এক চাচাতো ভাই জন্মের পরপরই প্রতিমাকে রেখে এসেছিলো সে সেফহোমের পরিচালক ক্ষিতীশ বাবু জীবনের শেষ দিনগুলোতে মেয়ের পিতৃ মাতৃ পরিচয় খুঁজে বের করেছেন। বছর বিশেক বছর আগে আপনি যখন আপনার পিতৃপরিচয়হীন মেয়েকে রাস্তায় ফেলে এসেছিলেন তখন রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে নিজের মেয়ের পরিচয়ে বড় করেছিলেন নিঃসন্তান ক্ষিতীশ সরকার এবং প্রমিলা সরকার দম্পতি। কিন্তু স্ত্রীর মারা যাওয়ার পর নিজের ভেতরকার মৃত্যুভয়টাও যখন জেগে ওঠে তখনই তিনি অনেক খোঁজখবর করে আপনার পরিচয়, ঠিকানা খুঁজে বের করেন। প্রতিমাকে জীবনের শেষ মূহুর্তে এসব সত্যি জানিয়ে যাওয়াটাকে তিনি নিজের কর্তব্য মনে করেছিলেন।

– তার মানে কি…

– হ্যাঁ, প্রতিমা শুরু থেকেই জানতো যে সে আপনারই সন্তান এবং আপনি তার মা। কিন্তু সে নিজেও কিছু বলেনি, আমাকেও কিছু বলতে সুযোগ দেয়নি।

শায়লা আরেফিন আর নিতে পারেন না। সোফার একটা বালিশ নিয়ে তাতে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন।

–  আপনাকে এসব কেনো বলছি জানেন?

একটু থেমে আবার আদিত্য বলতে শুরু করে, ‘আপনাকে এসব বলছি কারণ আমার ধারণা ওর সাথে আপনার যোগাযোগ হচ্ছে এবং আপনি জানেন প্রতিমা এই মূহুর্তে কোথায় আছে। এবং এই যে প্রতিমার জেদ ধরে বসে থাকা বা গোঁ ধরে বসে থাকা সেখানে আপনার একটা নীরব বা সরব প্রভাব আছে, তবে সেটা প্রত্যক্ষ নিশ্চয়ই। এক দুটো দূর্ঘটনা সবার জীবনেই ঘটে, প্রতিমার জীবনেও ঘটেছে। আমি বারবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে এটা নিতান্তই একটা দূর্ঘটনা। কিন্তু সে আমার কথা শোনেনি, বাচ্চাটাও নষ্ট করেনি। আমি একটা ছেলে। দিনশেষে আমারও বাড়ি ফিরতে হয়। আমারও অভিভাবক, পরিবার বা গুরুজন আছেন। তাদেরকে আমি কি বলবো? নিজের সন্তান বলবো নাকি নাম পরিচয়হীন কোনো পুরুষের বীর্য থেকে জন্ম নেয়া বলবো? আর সবকিছু মিলিয়ে কি কোনো পরিবার প্রতিমা বা আমাদের মেনে নেবে? এটা সম্ভব?’

শায়লা আরেফিন কোনো কথা বলতে পারেন না। তিনি কাঁদতেই থাকেন। আদিত্য ধরে আসা কণ্ঠে আরও কি কি যেনো বলতে থাকে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় শায়লার আর্তনাদ। যেনো আহত বাঘিনী বিকট শব্দে চিৎকার করে নিজের মধ্যে অবশিষ্ট শক্তি সম্পর্কে ঘাতককে জানান দিচ্ছে। সেই আর্তনাদের চিৎকারের কাছে সব কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়, সবকিছু ছোটো হয়ে যায়।  

ছয়।

পরশু দিলীপ গুণের চাকরিজীবনের শেষদিন। যৌবনের প্রথম দিকে বাংলাদেশ পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলেন তিনি। আজ প্রায় বছর চল্লিশ হয় তিনি এই পোশাকে আছেন। অস্থিমজ্জার কোণায় কোণায় যখন তারুণ্যের বান বইছিলো ঠিক সেরকম একটা দিনে নিজের বাক্স প্যাটরা সহ সমুদয় স্থাবর অস্থাবর বিষয় সম্পত্তি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সারদা পুলিশ একাডেমিতে। সেখানকার প্রশিক্ষণের পর সেই যে দায়িত্বপালনের শুরু, আজ পর্যন্ত করেই যাচ্ছেন। মাঝখানে চল্লিশ বছর কিভাবে কেটে গেলো জানেন না তিনি। চোর-পুলিশ খেলতে খেলতেই হয়তো বেশিটা সময় কাটিয়েছেন, বাকিটা ‘জ্বি স্যার’ করতে করতে। দিন কয়েক বাদেই দূর্গাপুজা। অন্যান্য বছর এই সময়টা খুব দোনামোনায় কাটতো তার। পুলিশের চাকরি বলে কথা, নয়টা-পাঁচটা ফাইলে গুঁজে থাকার চাকরি তো আর নয়। এমনও দুর্গাপুজা গিয়েছে যেবার কিনা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্তই রাস্তায় রাস্তায় মন্ডপে মন্ডপে কাটিয়ে দিতে হয়েছে, দায়িত্ব পালনে অবশ্যই। চোখের সামনে যখন দেখতেন বাবার কোলে চড়ে মেয়ে আর সাথে তার মা মন্ডপে ঢুকছে তখনই বুকের কোথায় যেনো একটা মোচড় দিয়ে উঠতো। চোখের সামনে ভেসে উঠতো নিজের পাঁচ বয়সী মেয়েটার চেহারা, মনে পড়ে যেতো স্বভাবসুলভ লাজুক স্ত্রী বা অশীতিপরায়ণ মায়ের কথা। মা তো মাই! মাঝে মাঝে মাটিতে গড়া মায়ের প্রতিরূপের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে অভিযোগ করতেন, কখনও বা আবদার। শত কিছু হোক, রক্ত মাংসের মায়েরা তো সন্তানকে নাড়িতে বেঁধে রাখেন। সে মায়ের প্রতি টানটাও একটু বেশিই দৃশ্যমান হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মা শুনতেন কিনা জানেন না দিলীপ গুণ, চটজলদি কোনো ফলাফল আসতো না এই যা। কিসের ডিউটি আর কিসের এলার্ট! মুখ ছাই করে ঘুরে বেড়াতেন এ মন্ডপ থেকে ও মণ্ডপ আর জুনিয়র অফিসারদের গালাগালি করতেন। এ বছর অবশ্য এদিক থেকে একটু সুবিধাতেই আছেন তিনি। মহালয়া আসার আগে আগেই অবসরে চলে যাচ্ছেন তিনি। কাজেই এ বছর দূর্গাপুজাটা পরিবারের সবার সাথে খুব ভালোভাবেই উদযাপন করা যাবে।  

দিলীপ গুণের সামনে একটা দশ-বারো বছর বয়সী কিশোর বসে আছে। সদর হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে এক ভদ্রমহিলার মৃত্যু হয়েছে, প্রতিমা সরকার। মহিলা অবিবাহিত। এই মহিলার সাথে এই ছেলেটাকে দেখা গেছে। হাসপাতালেও, হোটেলেও। প্রথমত ছেলেটাকে প্রতিমা সরকারকে নিজের মা দাবি করেছে, তারপর দাবি করেছে বোন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ করার পর জানা গেলো মেয়েটার বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর আর কিশোর হাসির বাড়ি নেত্রকোণা জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর। কাজেই স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা নিজের পরিচিতি নিয়ে মিথ্যাচার করছে। কিন্তু তাতে তার লাভটাই বা কোথায়! অনেক ভেবেও ঠাহর করতে পারছেন না তিনি।

–  আসমা আক্তার! এদিকে আসো। 

কনস্টেবল আসমা আক্তার ছুটে আসেন।

–  জ্বি স্যার।

– এই ব্যাগটার ভেতর যা আছে সব এখানটায় ফেলো তো। আর ডির কি অবস্থা?

– বডি পোস্টমর্টেমে পাঠানো হইছে স্যার। কাইল নাগাদ রিপোর্ট আইসা যাবে।

‘হুঁ’ বলে হাতের ইশারায় আসমাকে চলে যেতে বলেন দিলীপ গুণ। কিন্তু পরক্ষণেই কি মনে করে যেনো তাকে আবার ডেকে আনেন।

– আসমা, তোমাকে বলছিলাম থানার ভেতরের কোনো কথা যাতে বাইরে না যায়।

–        জ্বি স্যার, বলছিলেন।

আসমা একবার নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। এই থানায় যেদিন থেকে দিলীপ গুণ এসে ওসির চার্জ নিয়েছেন সেদিন থেকেই অন্য সবার মতো তারও দুর্দিন শুরু হয়েছে। প্রায় সব অফিসার কনস্টেবলেরই বাড়তি আয়ের পথ বন্ধ।

– তাহলে তুমি ঐ রিপোর্টার মহিলার সাথে কথা বলতেছিলা কেনো? তোমাদের না আমি না করলাম যে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ প্রেসের সাথে কথা বলবা না? বলি কি বলি নাই?

আসমা মাথা নিচু করে থাকে। এই মূহুর্তে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোনো সুযোগ নাই। যেহেতু স্যার এভাবে বলেছেন তার মানে পুরোটা বিষয় অবশ্যই তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। একে তো এমনিতেই আসমা কথা অমান্য করেছে, এর পর যদি কথার পিঠে কথা আসে তবে আসমা খবর পাচার করে কত টাকা পেয়েছে সে খবরও স্যার পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তাই আর রা শব্দ করে না সে।

– আমার রিটায়ারমেন্টের আগে পর্যন্ত যেনো আমি তোমাকে থানায় না দেখি। যাও, এখন দূর হও চোখের সামনে থেকে।

আসমা মাথা নিচু করে ওসির কেবিন থেকে বের হয়ে আসে, কিন্তু দূর হয়ে যায় না। এই ধরণের হুমকি স্যার নতুন দিচ্ছেন না। এর আগেও কয়েকবার সে এই হুমকি শুনেছে। তবে এবার অবশ্য বলার ধরণ বদলেছে। আগে স্যার বলতেন পরবর্তী সাত দিনের কথা, এখন বলছেন রিটায়ারমেন্টের কথা।

‘এই আদিত্য শোনো, তোমাকে আমি ইচ্ছা করেই পুরোটা বিষয় খুলে বলিনি বা বলছি না। যেদিন ঘটনাটা ঘটে সেদিনের আগে থেকেই আমি মেডিসিন নিচ্ছিলাম, তোমাকে জানাইনি। কাজেই পুরোটা বিষয় সেই ঘটনার কোনো ফলাফল নয়, কোনো সম্ভাবনাই নেই। তোমার বন্ধু আজাদ ভাইয়ের সামনে আমি স্বাভাবিক হতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো আমি পারিনি। গতকালই আমি আরেকজন ডাক্তারকে দেখিয়ে এলাম। ডাক্তার বলছেন আমি দু মাসে পা দিয়েছি। তার মানে এটা এই ঘটনার কোনো ফলাফল না। আমি কিছু একটা আন্দাজ করতে পারছিলাম, কিন্তু বলিনি।

পুনশ্চঃ ০১

তোমাকে চাইলেই আমি পুরোটা বিষয় আজই খুলে বলতে পারতাম কিন্তু বলিনি। কেনো? সেটা যেদিন তোমাকে এই চিঠিটা পড়তে দেবো সেদিনই বলবো। আমার ভয় হয়।

পুনশ্চঃ ০২

বাচ্চাটা ছেলে হলে নাম রাখবো ‘আদি’, মেয়ে হলে ‘আহ্লাদি’। তুমি কিন্তু না করতে পারবে না।

তোমার প্রতিমা

২১.১২.২০১৯   

ধাঁধাঁ: বলো তো আমাদের পরের বাচ্চাটা মেয়ে হবে না ছেলে? বলতে পারলে ভালোবাসি, না পারলেও ভালোবাসি।’

দিলীপ গুণ ছোট চিরকুটটা বারবার করে পড়ছেন। না, নতুন কিছু মাথায় আসছে না। শুরুতে যা আন্দাজ করেছিলেন সেটাই সত্যি মনে হচ্ছে। টেবিলে মূর্ছা গিয়ে পড়ে থাকা ছেলেটাই তাহলে সেই আদিত্য। মেয়েটার সন্তানের সম্ভাব্য পিতা। চিরকুটটা থেকে চোখ তুলে একবার সামনে তাকান, এবার গলা ছেড়ে হাঁক দেন।

– ইসমত আলী!

– জ্বি স্যার, জ্বি স্যার…

দরজা দিয়ে তড়িঘড়ি করে ঢুকতে গিয়ে কোথায় যেনো একটা বাঁধা পড়ায় হোঁচট খায় ইসমত আলী। কোনোমতে নিজেকে সামলায়, মাথার টুপিটা ঠিক করে সটান হয়ে দাঁড়ায়।

– তোমাকে না বলছিলাম এনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে করছো?

–  জ্বি স্যার, এম্বুলেন্স আসতেছে।

– আচ্ছা, আপাতত এর দাঁতকপাটি খোলার ব্যবস্থা করো নয়তো জিভ কেটে যাবে। আর শিশু কর্মকর্তাকে খবর দেয়া হয়েছে?

– জ্বি স্যার, কামরুল স্যার গেছেন ওনাদের নিয়ে আসতে।

দিলীপ গুণ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। পাশের রুমে গিয়ে কনস্টেবল আসমাকে দেখে তার মাথায় রক্ত উঠে যায়। কিন্তু আসমার কোলে হাত পা নেড়ে চিৎকার করতে থাকা বাচ্চাটাকে দূর থেকে দেখে মনটা আবার কেমন যেনো শান্তও হয়ে যায় তার। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে নিজেও কেমন যেনো শিশুর মতো হয়ে যান। থানার সবাই প্রবল পরাক্রমশালী রাগী কর্মকর্তাকে এভাবে শিশুর মতো আচরণ করতে দেখে হকচকিয়ে যান। বাচ্চাটাকে আবার আসমার কোলে তুলে দেয়ার সময় তার চোখ আটকে যায় বাচ্চাটার চেহারা, নাক মুখের গড়ন আর চেহারায় ফুটে থাকা হলদেটে লালচে রঙটায়। চাকরিজীবনের কয়েক বছরের মাথায় এরকমই একটা বিকালে এভাবেই হাত পা নাড়তে থাকা একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যস্ত সড়কের মাঝে। সেই বাচ্চাটার চেহারার সাথে কেমন যেনো একটা অদ্ভুত ধরণের মিল আছে এই বাচ্চাটার। দিলীপ গুণ নিজের মনেই নিজেকে ভর্ৎসনা করেন, এক সময়কার প্রখর স্মৃতিশক্তির দিলীপ গুণ আজ এই সামান্য বিষয়গুলোও গুলিয়ে ফেলছেন!    

 

 

 

 

 

 

One thought on “মা, প্রতিমা ও অন্যান্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত