| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

প্রেম অপ্রেমের কথকতা

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comরূহানীর সাথে তাতানের আবার যখন দেখা হলো, ততদিনে পুরানো সম্পর্ক ঝালাইয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। জীবনটা ‘দিল হে তো মানতা নেহি’ সিনেমা না যে, নিজের ঠিক করা পাত্র যখন হেলিকপ্টার থেকে মন্ডপে নামছে, তখন পাত্রী স্বয়ং মন্ডপ ছেড়ে প্রেমিক ঠিক নয় প্রেমের দিকে ছুটে চলেছে! চেখভের ভাষ্য অনুযায়ী সব ভালো গল্পের শেষটা বিয়েতে গিয়ে ঠেকলেও- জীবনে বিয়ে যে কোনো আলটিমেট সমাধান না। এটা তো বিয়ে বিচ্ছেদের হারই বলে দেয়।

সেদিন রূহানীর দিনটা মোটেই ভালো কাটছিল না। অফিসে একটা মিটিং ছিল, তার একটা প্রেজেন্টেশানও। কিছুই ভাল হয় নাই। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তার মাথামোটা বস্ পুরো কনসেপ্টটাই এলোমেলো করে দিয়েছে। অফিস থেকে বিগড়ে যাওয়া মেজাজ নিয়ে অফিস ছুটির দু ঘণ্টা আগেই বাসায় ফিরে এসেছে সে। চাকরিটাও ছেড়ে দেবে কিনা ভাবছে, এমন সময় ডোরবেলটা বেজে উঠল।
প্রায় জনমানবহীন ফ্ল্যাটে ডোরবেলে পাখির কলকাকলির আওয়াজ যেন প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। বিরক্তিতে চোখ কোচকাল রূহানী, কে এলো এ সময়ে? এ সময়ে অন্য দিনতো সে বাড়িতেই থাকে না আর পরিচিত কেউ হলে নিশ্চই ফোন করে জেনে আসবে। তাহলে কি পাশের ফ্ল্যাটের কেউ? সে সাধারণত মানুষ জনের সাথে খুব কম মেশে। দেখা হলে হাই হ্যালো এই পর্যন্তই। তাই তার বাড়িতে পাড়া প্রতিবেশী কেউ কখনো আড্ডা দিতে আসে না। মেয়েদের ঐ মেয়েলী শাড়ি-গহনা, ঘর-সংসার, ছেলে-মেয়ের গল্পে সে কোন ইন্টারেষ্ট খুঁজে পায় না। এসব বিষয়ে কেউ যখন আলোচনা শুরু করে তখন মনের বিরক্তি চেপে রেখে মুখে হাসি ফুটিয়ে বসে থাকার মত লৌকিক ভদ্রতাও সে করে না অনেক সময়। তাই এহেন মানুষের সাথে যেচে কেউ গল্প করতেও আসবে না স্বভাবিক। তাছাড়া তার পরিচিতের গন্ডিও সীমিত। দু একজন বন্ধু, তাও তাদের সাথে কালে-ভদ্রে দেখা হয়। তার এ রকম ঠিক এই স্বভাবটার জন্যই সারাজীবন তাকে একাকীই কাটিয়ে যেতে হবে। এ কথাটা সে জেনে গেছে। আবারো ডোর বেলের শব্দ। কাজের বুয়া দু বার কে-কে করে দরজা খুলে দিল।

মেয়েটার এই এক অদ্ভুত বাজে স্বভাব! এত বলেও সে ওকে বোঝাতে পারল না যে অপরিচিত কাউকে দরজা খুলবা না। স্পাই হোলে দেখে নিবা আর না চিনলে আমাকে বলবা। ওকে আজ আচ্ছা বকুনী দিতে হবে। কাকে দরজা খুলল সে? রূহানী রাগে গর গর করতে করতে আসছিল ড্রইং রুমের দিকে।
এমন সময় কন্ঠস্বরটা ভেসে এলো ভেতরে, রূহানী আছে? ডাইনিং অব্দি এসে থমকে গেল রূহানী, এটা কার গলার আওয়াজ? এই স্বরটার সাথে তার কত নিবিড় যোগাযোগ! তারুণ্যের মধুর স্মৃতি। ঐ ভারী অথচ মিষ্টি স্বরটা যেন তার কান ছুঁয়ে পৌঁছে গেছে রক্তের কণিকায় কণিকায়! ঝটিতে সে ফিরে গেল নিজের ঘরে।

বুয়া এসে দাঁড়াল দরজায়।
কে এসেছে, এই প্রশ্নটা করার প্রয়োজন ছিল না। রূহানী জানত যে কে এসেছে, তারপরও বলল, কে এসেছে বুয়া?
– উনার নাম বলতেছে তাতান।
– ঠিক আছে, তুমি যাও।
রূহানী মুহূর্তে আলমিরার কার্ণিশ থেকে নীচ পর্যন্ত সেট করা বেলজিয়াম আয়নায় নিজেকে দেখে নিল। এতক্ষণ শুয়ে থাকলেও জামা কাপড় ঠিকই আছে। চুলে হয়তো চিরুণী চালালে ভাল হতো কিন্তু ওসব কিছুই করল না সে। রূহানীকে আসতে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তাতান ।

– হ্যালো রূহানী, কেমন আছো?
রূহানী প্রায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলা থেকে কোনোক্রমে ঠেলে বের করল শব্দটা,

-‘ভালো’। তুমি?

রূহানী নিজের ভেতরের এই পরিবর্তনের, এই ভীষণ রকম তোলপাড়ের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিল না। এ যেন সেই কিশোর বয়সে তাতানের প্রেমে পড়ার অনুভূতি এতোকাল পর এসেও একই মাত্রায় রয়ে গেছে। অথচ এতোকালের অদেখায় এটা কখনো সে অনুভবই করে নাই। সে প্রাণপনে তার ভেতরের এই আলোড়ন ঢাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তার মস্তিস্কের ভেতরের এই ইর‌্যাশনাল প্রতিক্রিয়া তাতান যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে সে চেষ্টাই করে যাচ্ছিল সে।
অ-নে-ক দিন পরে, প্রায় আট ’ন বছর তো হবেই তাই না?
– নয় বছর তিন মাস। জবাব দেয় তাতান।
– বাহ্, হোয়াট এ মেমরি! তুমি এতোটা মনে রেখেছ?
– আমি শুধু তোমাকেই মনে রেখেছি, হা হা হা।
হেসে বিষয়টার গভীরতাকে হালকা করার চেষ্টা, এটা ওর স্বভাবগত।
-সে যাক, তুমি কিন্তু আরো সুন্দর হয়েছো।
রূহানী ভেতরে একটু আলোড়িত হলেও খুব স্বভাবিক ভঙ্গীতেই বলল,

-থ্যাঙ্কস! তো হঠাৎ দেশে কবে ফিরলা?
– এই, দশ-বারো দিন।
– আমার ঠিকানা কিভাবে পেলে?
– ইচ্ছে থাকলে সব কিছুই পাওয়া যায়।
– আই ক্যান গেজ।
– ডোন্ট বি।
– আমিই বলে দিচ্ছি, থ্রু কমন ফ্রেইন্ডস।
-সেই আগের মতোই আছো, আমাকে জিততে দিবা না।
– আমি জিততে দেব না তোমাকে! আমি যে সব সময় তোমার মেধা, তোমার ব্যক্তিত্বের কাছে হার মেনেই আছি।
– যাহ! আমার সেই কৈশোরউত্তীর্ণ সময়ে নিশ্চই ব্যক্তিত্বের অত ধার ছিল না।
– ভুল বললা। তোমার মত ব্যক্তিত্ব সম্পন্না নারী আমি জীবনে খুব কম দেখেছি রূহানী। তোমাকে ভালোবাসি এই কথাটাই কখনো বলতে পারি নাই সাহস করে।
– কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক না। তুমি কিন্তু এক সময়ে বলছিলা; ঠিক বলো নাই, একটা চিঠি দিছিলা। সেই চিঠিতে কোন নাম ছিল না, কিন্তু আমি জেনে গেছিলাম কে সে।
– হ্যাঁ। অনেক সাহস করে, প্রায় সারা রাত চিন্তা ভাবনা করে। ভাবছিলাম তুমি যদি না বল! যদি তুমি আর কোনোদিন আমার সাথে কথা না বল! আমি আর বাঁচতে পারব না।
– অথচ দেখ তুমি কিন্তু দিব্বি বেঁচে আছো। আর ও সময়ে আমি কিন্তু হ্যাঁ-ও বলি নাই! হাসতে হাসতে বলল রূহানী ।
– আবার না ও তো বল নাই!
– তাই বেঁচে ছিলা?
– তাই এখনো বেঁচে আছি তবে ঐ যে অপ্রাপ্তিটা! বুকের মধ্যে একটা কাঁটার মত বেঁধে সময় সময়।
পুরুষের এমন হেয়ালীপূর্ণ কথা রূহানীর একদম ভাল লাগে না। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, এনিওয়ে বাদ দাও ওসব, দেশে কেন এসেছ বলো। বেড়াতে নাকি অন্য কিছু?
– এই যে জন্য ম্যক্সিমাম বাঙ্গালী আসে, কাঁধ ঝাঁকাল তাতান।
– কি সেটা, বিয়ে করতে? ও দেশে কাউকে জোটাতে পারলা না!
– নাহ্, যে পারে না সে কোথাও পারে না।
– ওহ, তাই বলো! তাতানের ব্যর্থতার এই সরল স্বীকারোক্তিতে এক ধরণের পুলক বোধ করল রূহানী। আর এ ধরনের স্বীকারোক্তি দিতে পেরে যেন স্বস্তি পেল তাতান, ফলশ্রুতিতে হেসে ফেলল দুজনেই। মানুষের পক্ষেই একটা অভিন্ন কারণে দু রকম আনন্দানুভূতি উপভোগ করা স্বভাব।
– তো পাত্রী ঠিক হয়ে গেছে?
– শুধু পাত্রী না সব কিছুই ঠিক হয়ে গেছে। এই নাও বিয়ের কার্ড। তাতান অফহোয়াইট কার্ডটা এগিয়ে ধরল রূহানীর দিকে।
রূহানী যেন ঠিক এই সময়টারই অপেক্ষায় ছিল মনে মনে। একদিন তাতান এ জন্য তার সামনে আসবে। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক তার বিয়ের খবর জানানোর গৌরব কখনো হাতছাড়া করতে চায় না। এই ব্যাপারটাতে তারা খুব গৌরববোধ করে। তাতানকে এই বোকামিটাও হতছাড়া করতে না দেখে মনে মনে হাসল রূহানী। বেচারা, কত ঘোরাঘুরি করেই না জানি তাকে খুঁজে বের করেছে!অথচ এই তাতানকে রূহানীর এক সময় ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছিল। রূহানী তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে। তাহসান সেকেন্ড ইয়ার। গান গায় বলে কলেজ স্পেশালে বা অন্য কোনে ফাংশনে তার ডাক পড়বেই। তাহসানের থাকতো সব প্রোগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব। তাছাড়া তাতানরা কজন বন্ধু মিলে একটা ব্যান্ড গ্রুপও করেছিল নামটা জানি কি ছিল, ভ্যালকানো বা এ জাতীয় কিছু হবে। কিছুটা পারিবারিক এবং কিছুটা শিল্পের এই সূত্র ধরে দুজন দুজনাকে চিনত তারা।

ব্যান্ড গ্রুপে তাতান ড্রাম বাজাতো। তার সাবলীল ড্রাম বাজানো দেখে রূহানীর মনে হতো পৃথিবীতে যত মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট আছে তার মধ্যে সব চেয়ে সহজ হলো ড্রাম বাজানো। তাতানকে সব সময়েই সে কি একটু আন্ডার ট্রিটমেন্ট দিয়ে গেছে! সে কি কখনো ভাবতে পেরেছিল তাতান বার এ্যাট ল করবে! কেমন মিউজিক নিয়ে পড়ে থাকা একটা ছেলে ছিল সে। রূহানীর গান শেখা বা অকেশনে গান গাওয়া তো মায়ের ইচ্ছাতে। অথচ তাতান তো তা না!
তাতানের সাথে তখন তার স্বল্প পরিচয়। ওর বাবা তখন নতুন এ শহরে বদলি হয়ে এসেছেন। কোন এক সূত্রে দু’ পরিবারের মধ্যে সামান্য যোগাযোগ হয়েছে। এত স্বল্প পরিচয়ে এমন কথা বলা যায় না হয়তো, তারপরও রূহানী তার স্বভাব অনুযায়ী এ কথাটা তাতানকে বলেই ফেলল যে, পৃথিবীতে যত মিউজিক্যাল ইনসট্রুমেন্ট আছে তার মধ্যে সব চেয়ে সহজ হলো ড্রাম বাজানো।

কথাটা শুনেই সে ভীষণ ক্ষেপে গেল। বলল, করে দেখাও তো। তুমিতো কীবোর্ড বাজাতে পারো, তাহলে ড্রামটাও তোমার কথা অনুযায়ী বাজানো কোনো ব্যাপারই না।
– কোনো ব্যাপার না-ই তো। তবে একবারও শিখিয়ে না দিলে আমি পারব কি করে?
– ওহ্ তাই বলো, হার মানলা তাহলে!
– হার মানলাম মানে?
– মানে স্বীকার করলা যে এটাও শিখতে হয়!
– শিখতে হয়, তবে ওটা বাজানো কঠিন কিছু না।
– তোমার এমন মনে হলো কেন? কপালে ভাজ ফেলে জানতে চায় ততান। ভেতরে ভেতরে সে নিশ্চই অপমানিত বোধ করছিল। তাই জেরার এত ঘটা। রূহানী প্রায় বলতে যাচ্ছিল যে, তুমি বাজাও তাই মনে হলো ওটা বাজানো কঠিন কিছু না। বা তোমার সাবলীল ভঙ্গী! কিন্তু কোনোটাই বলল না। বলল, এমনি- দেখে মনে হলো তাই। তারপর রূহানী রিহার্সলে গিয়ে গানের নোটেশানগুলো তোলা বাদ দিয়ে ড্রাম শিখতে লেগে গেল। যতটা সহজ সে ভেবেছিল ততটা সহজ হলো না বটে; তবে সেই সদ্য তারুণ্যে পা রাখা রূহানী, বানের স্রোতের মত তাতানের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। যদিও এটা রূহানী কখনোই তাতানকে বুঝতে দেয় নাই। কোথায় যেন একটা ইগো, বা নিজেকে সুপিরিয়র ভাবা কাজ করত তার ভেতরে। অথচ তাতানের প্রায় রুটিন হয়ে গিয়েছিল রূহানীর মিউজিক  স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। ওদের বাড়ীর সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করা বা কোনো ছুতো ধয়ে ওদের বাড়ী চলে যাওয়া।

কলেজের গন্ডি পেরিয়ে রাজন্যা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছলো তখন সে বেশ স্বাধীন। সে স্বাধীনভাবে তার চিন্তার প্রয়োগ ঘটাতে পারে কেউ বাধা দেবে না। সে ইচ্ছে করলেই অনেকক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারে কোনো বাইন্ডিংস নেই। চাইলে তাতানের সঙ্গেও প্রায় সারাদিন ঘুরে বেড়াতে পারে তেমন বাধা ছিল না কোথাও। কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ালো সে নিজেই।

তাতান হঠাৎ কিছু একটা প্রশ্ন করতে বর্তমানে ফিরল রূহানী।

– তোমার হাজব্যান্ড কোথায় রূহানী? আমার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করলা, আর আমি যে এখনো সিঙ্গল এটা জানো না?
– সিঙ্গল! তাতানের বুকের ভেতরে কেউ যেন এক ড্রাম গরম সিশা ঢেলে দিয়েছে এমন অনুভূতি হতে লাগল। তার মুখটা নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
রূহানী বলল,

– সিঙ্গল, তবে ভেবো না আবার যে কিশোর বয়সের প্রেমের হ্যঙওভার বয়ে বেড়াচ্ছি।
– কিশোর বয়সে তোমার প্রেম হইছিল বুঝি?
– হলেই বা, তাতে কার কি?
তাতান হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো, এবার তাহলে আমি আসি রূহানী। ৩০ তারিখে সন্ধায় রিসিপশন, তুমি এসো কিন্তু। আর তুমি এলে সত্যি ভালো লাগবে। আস্তে করে বলে সে।
– হ্যাঁ নিশ্চই যাবো। রূহানী হাসি মুখে বিদায় জানাচ্ছিল তাতানকে ।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ আবার ঘুরে দাঁড়াল তাতান। বলল, একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে রূহানী? এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরী। বলো দেবে! তুমি আজ অন্তত আমাকে ফিরিয়ে দেবে না! অনুনয় ঝরে পড়ে তাতানের স্বরে।

– কি বল? প্রশ্নটার উত্তর কি আমি জানি?
জানো, একমাত্র তুমিই জানো। তাই তোমার কাছেই জানতে চাইতেছি। আমি জানতাম রূহানী, যদিও তুমি মুখে কখনো বল নাই। কিন্তু সব কথাতো মুখে বলতে হয় না। আই নিউ ইউ লাভড মি। কিন্তু কিছুদিন পর তুমি আমাদের গ্রুপে আসা এমনকি আমার সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিলা কেন?
প্লিজ, প্লিজ রূহানী আমার এই প্রশ্নের জবাবটা দাও প্লিজ! আর কোনোদিন কিছু জানতে চাইব না। রূহানী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। যেন ভেতরে ভেতরে গুছিয়ে নিচ্ছিল সব। এরপর ধীরে যেন কোন এক অজানা গভীর খাঁদ থেকে উঠে আসছে তার কন্ঠস্বর এভাবে বলল,

-আমি আসলে তোমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম তাতান।
– কে-ন?
– যেন আমার অবর্তমানে তোমার উপলদ্ধিটা তীব্র হয় যে আসলে তুমি কি চাও।
– মানে?
– মানে- তোমার মনে আছে তাতান, একদিন তুমি গল্প করতে করতে আমাকে বলছিলা আমার বান্ধবী মুন সম্পর্কে। আর বলছিলা যে মুন খুব ভালো মেয়ে কারণ সে প্রেম করে না। কোনো ছেলের সাথে মেশে না। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম কত কনজারভেটিভ তুমি! আসলে জানো কি তাতান, বয়সের কারণে হোক বা বড়দের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া সংস্কার থেকেই হোক। তোমার ভেতরে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, যে মেয়ে স্বাধীনচেতা, যে মেয়ে পুরুষের বানানো সংস্কারে মোড়ানো না, সে মেয়ে ভালো না। এমনকি যে প্রেমে পড়ে সে-ও না। অথচ তুমি কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই তখন প্রেমে পড়ে গিয়েছ, আর সেটা বুঝতে না পেরে এসব নীতিবাক্য আওড়াচ্ছো।

আমার খারাপ লেগেছিল এটা ভেবে যে, মুন সম্পর্কে তোমার ধারণাটাও ঠিক ছিল না। ও রাখঢাক করতে জানতো, আর আমি তার ধার ধারি নাই কখনো। আসলে তুমি ওরও প্রেমে পড়ছিলা। ওর সৌন্দর্য তোমাকে টানতো। সে যেহেতু তোমাকে পাত্তা দিত না, তাই তুমি আমাকে ওসব কথা শুনাইছো।
– আমি মোটেই সে জন্য ও কথাটা বলি নাই, এসব তোমার ভুল ধারণা। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসতাম রূহানী!
– তুমি আমাকে ভালোবাসো এমন ফিল করতা। ওটা ছিল তোমার ইনফ্যাচুয়েশন।
– ইনফ্যাচুয়েশন তাহলে এতদিন থাকে!
– মানে?
– মানে তুমি এত কিছু জানো আর এটা জানো না, এটা বুঝতে পার নাই যে তোমার ভেতরে একটা ঈর্ষা জাগাবার জন্য ঐসব বলছি!
– প্রতিটা মানুষ তার নিজের মতন তাতান। আমাকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য অন্য কারো সাথে তুলনা চলে না। আর এভাবে অপমান করে জেলাস সৃষ্টি! তোমরা পারোও! তবে কি জানো? মুন দেখতে সুন্দর। তুমি ওর সৌন্দর্য আমার মধ্যে খুঁজতা। মুনের সৌন্দর্য আর রূহানীর পার্সোনালিটি। এ দুয়ের কম্বিনেশন। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজতা। তাই তুমি ভাবটা প্রকাশ না করে পার নাই। ওটাতো আসলে মনের ভাব লুকানোর বয়স না। ঐ বয়সে মানুষ খুব স্ট্রেইট -ফরোয়ার্ড হয়। তুমি যদি প্রেমই চাইবে তাতান তবে কেন তোমার এমন মনে হলো যে, যে মেয়ে প্রেম করে না সে ভাল মেয়ে! তুমি কোনো মেয়ের প্রেমে পড়বা আবার তারই সঙ্গে অন্য মেয়ের প্রশংসা করবা এই বলে যে, সে প্রেম করে না এ জন্যেই ভাল মেয়ে! এ কেমন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা! তবে যে তোমাদের জন্য দেবী আসতে হবে স্বর্গ থেকে!
– আমি খুবই দুঃখিত রূহানী, আমি এ নিয়ে আর তর্ক করব না । তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি অথচ তুমি কারণটা বুঝতে পারবা না এখনো? হ্যাঁ এটা ঠিক, তখন হয়তো ভুল করে তোমার ইগো হার্ট করেছিলাম। তাই এই পরিণতি!
রূহানী জানে সে এই মুহূর্তে তাতানকে হার্ট করছে। তবে জানে না, কেন তার জীবনে এতো চড়াই উৎরাই পার হওয়ার পর এখনো তাতানের জন্য কোথাও ভালোলাগা কাজ করে! কেন কোনো কোনো ভোর রাতের স্বপ্নে তাতান তার ড্রাম নিয়ে এসে হাজির হয়! প্রথম জীবনের প্রেম আসলে কি? অন্য কোনো প্রেম, কোনো ঘর বাঁধা, ঘর ভাঙ্গা কিছুই তার ওপরে ছাপ ফেলতে পারে না! রূহানী বোঝে না এখনো। তবে আজ তার ভেতরে ভাললাগা, ভালোবাসা, আন্দোলন, ভুল সংশোধন যাই থাক। নতুন জীবন শুরু করতে যাওয়া একজন মানুষকে এর বাইরে কিছু বলে আর বিভ্রান্ত করা যায় না। নতুন জীবনে সুখি হোক সে। আর ভালোবাসা! সে না হয় রইল গোপনে।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত