| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
এই দিনে গল্প সাহিত্য

ত্রুটি

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

আজ ১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপিকা, বৈদিক পুরোহিত  ও লেখক ড. রোহিনী ধর্মপালের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

ঋত্বিকের মা অলকানন্দা প্রখ্যাত পরিচালক। স্বনামধন্য। তাঁর ভাবনা চিন্তার ধরণটাই অন্যরকম। অলকানন্দার প্রথম সিনেমাটাই সাড়া ফেলে দিয়েছিল কলকাতায় আর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে। গল্পটা অবশ্য একেবারেই নগরকেন্দ্রিক বলে কলকাতার বাইরে খুব একটা চলে নি। এক সমকামী মানুষের বারবার ভালোবাসা ভেঙে যাওয়ার গল্প নিয়ে সিনেমাটা করা। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটি প্রদর্শিত হওয়ার পর দর্শকেরা দশ মিনিট ধরে standing ovation দিয়েছিল। স্বভাবতই শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কারটাও অলকানন্দাই পেয়েছিলেন। ঋত্বিক অবশ্য অনেকটাই ছোট তখন। ওর নামটাও ঋত্বিক ঘটকের থেকেই নেওয়া । মায়ের মতে, সারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক ছিলেন ঋত্বিক ঘটক, তাই একমাত্র সন্তানের নাম তাঁর নামেই রেখেছিলেন তিনি।

ঋত্বিকের ছোটবেলাটা বড্ড ডিসটার্বর্ড । মায়ের সঙ্গে প্রায় রোজ বাবার ঝগড়া দেখতে দেখতে বড় হয়েছে ও। আর ঝগড়া অতি সামান্য কারণে । মায়ের পক্ষে, অমন একজন মায়ের পক্ষে সংসারের ছোট ছোট কাজ মনে রেখে করা অসম্ভব ছিল। অথচ বাবা সব সময় তাই নিয়ে চেঁচামেচি করতেন । এদিকে দিয়া, ঠাকুমাকে দিয়া বলেই ডাকত ঋত্বিক, কোনো দিন কোনো অভিযোগ করেন নি মাকে নিয়ে । বরং বৌমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন তিনি। মায়ের ছবি বা কোনো খবর কাগজে বেরোলেই যত্ন করে কেটে কেটে খাতায় সাঁটাতেন আর ফোন করে করে সবাইকে বলতেন, “আজকে বুনুর ছবি বেরিয়েছে ‘এই সময়’ এ, ‘আনন্দবাজারে’, ‘আনন্দলোকে'”! মাও তেমনি ভালোবাসতেন শাশুড়ীকে। আর বলতেন, “তুমি আমার সত্যি মা”!

শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্ক অটুট ছিল আর এই সম্পর্কই বোধহয় মা বাবাকেও এক জায়গায় ধরে রেখেছিল; ঋত্বিক নয়, শাশুড়ির জন্যই অলকানন্দা প্রবীরের দুর্ব্যবহার মেনে নিচ্ছিলেন দিনের পর দিন । একজন দুঁদে সিনেমার পরিচালক, শুটিং এর সময় যার উপস্থিতিই সবাইকে চুপ করিয়ে রাখে, যার তৈরি সিনেমা একটার পর একটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়ে আসে; তার সংসারের অবস্থা যদি বাইরের লোক জানতে পারত, তাহলে হয়ে যেত আর কী! তাও শেষের দিকে অশান্তি অনেকটাই বেড়ে গেছিল, কাগজে লেখালেখিও আরম্ভ হয়ে গেছিল এই নিয়ে !

অলকানন্দা যখন ঋত্বিককে নিয়ে আলাদা হয়ে যান, তখন ঋত্বিক মাত্র তেরো। বাবার জন্য ঋত্বিকের খুব বেশি মন খারাপ হয় না । বাবাকে ও ভীষণ ভয়ই পেতো। মা ফিরলেই বাবা বলতে থাকত ওর নামে।
“তোমার গুণধর পুত্র আজ কি করেছে জানো? স্কুলে মারপিট করেছে”!
“কী আশ্চর্য! এই বয়সে তো ছেলেপুলেরা এমন করেই। স্কুল বুঝবে। টিচাররা দরকার হলে শাস্তি দেবেন”!
“এই, এই তোমার জন্যই বিগড়ে যাচ্ছে হারামজাদা ছেলেটা! এর পর বড় হয়ে পাক্কা ক্রিমিনাল তৈরি হবে”!
“মুখ সংযত করে কথা বল প্রবীর! ওইটুকু ছেলে, তাকে কিভাবে বলছ! তুমি না ওর বাবা”!
এরপরে এমন নোংরা কথা বলতে শুরু করত বাবা, যে ঋত্বিক মাকে জড়িয়ে কাঁপতে থাকত।
“এই বাচ্চার বাপ যে আমি, তার গ্যারান্টি কি? তুই ছেনাল মাগি, কোথায় কোথায় লাগিয়ে বেড়াস তার খবর রাখি না ভাবছিস”!
মা ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে আসত পাশের ঘরে, দরজা বন্ধ করে বসে কাঁপত দুজন, কারণ বাবা ততক্ষণে ঘরের দরজার সামনে এসে চিৎকার শুরু করে দিয়েছে! শাশুড়ির ঘুম হত না বলে বেচারা ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে যেতেন। যেদিন ওঁর ঘুম এইসব চিৎকার চেঁচামেচিতে ভেঙে যেত, উনি উঠে আসতেন। আর একমাত্র দিয়াকে দেখলেই বাবা কেমন চুপ করে ঘরে ঢুকে যেত। আর এমন যে কখনো সখনো ঘটত, এমন নয়! বরং এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছিল! মা সারা দিন পরিশ্রম আর উত্তেজনার পর হাক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে, আর বাবা বসে থাকবে কিছু না কিছু নালিশ করার জন্য । একবার তো চুপিচুপি বাবার কম্পিউটারটা চালু করতে গিয়ে কড়াং করে একটা আওয়াজ হয়ে পর্দাটা কালো হয়ে গেল! ভয়ে প্রাণ উড়ে গেছিল ওর! ও জানতো, সেদিন মার খুব ইম্পর্টেন্ট একটা শুটিং, তবু ভয়ে মাকে ফোন করে ফেলেছিল। মা সুভাষদাকে ফোন করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। ওর সামনেই সুভাষদা হাসতে হাসতে ফোন করেছিল, “বৌদি, তারটা আলগা হয়ে গেছিল বলে আপনি এমন তাড়া লাগিয়ে আসতে বললেন”! আসলে সুভাষদা জানবে কি করে, বাবা ফিরে দেখলেই তো বুঝে যেত যে ঋত্বিক হাত দিয়েছে যন্ত্রটায়। আর দুটো দিন আর রাত অশান্তিতে ভরে যেত ওদের!

ক্বচিৎ কখনো কোথাও একসঙ্গে গেলেও শুরু হয়ে যেত ঝগড়া । বিষয় কি? না প্রবীর যা বলবেন, ঋত্বিক আর অলকানন্দাকে সেই পোষাকই পরতে হবে, বিশেষ করে ঋত্বিককে। যদি তা না করা হয়, তাহলে তার জেরও চলবে অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়েও। তবে বাইরের কেউ সামনে এসে কথা বললে কিন্তু বাবার মুখে একগাল হাসি। আর যদি কেউ বলে, “ঋত্বিককে কী সুন্দর দেখতে হয়েছে প্রবীরদা! ঠিক অলকানন্দাদির মতো”! তখন ওই গোমড়ামুখো বাবা অদ্ভুত হাসি হেসে সবার সামনে ওকে আদর করবে! গাল টিপে দেবে! ঋত্বিকের তখন আরো খারাপ লাগতো আর ও গুটিয়ে যেতো!

দিয়া চলে গেলো নভেম্বরে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ওরা বেড়াতে গেল শান্তিনিকেতন । সঙ্গে রূপা পিসী আর অরবিন্দ পিসা, আর ওদের মহা বিচ্চু বাচ্চাটা, রনি। কথায় কথায় ও ঋত্বিককে চিমটি কেটে ভালো মানুষের মত মুখ করে বসে থাকত। ও যখন সহ্য করতে না পেরে একবারও কিছু করত, চিল চিৎকার করে উঠত পাজিটা! আর রূপা পিসী মিষ্টি হেসে মাকে বলত, “তুই তো সারা দিন বাইরে থাকিস, তোর ছেলেটা একটু হাতে পায়ে দুষ্টু হয়ে গেছে কিন্তু, এবার একটু ছেলেটার দিকে নজর দে!” আর শুরু হয়ে যেত বাবার ঋত্বিক- নিধন-পালা! সেইবার, সোনাঝুরিতে মা রা ঝুঁকে পড়ে গয়না দেখছে; এক জায়গায় মাটির গাড়ি, বাজনা দেখতে ওও অমন ঝুঁকে পড়েছে, আর রনি দিলো পেছন থেকে এক ঠ্যালা। ও হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাটির একটা পালকির ওপর। সেটার অবশ্য কিছু হলো না, কিন্তু ওর কপালটা লাল হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে রনিকে ওও দিলো এক ঠ্যালা । ওরই বা তখন কতটুকু বয়স। বারো টারো হবে! আর রনি আট নয়! ওর ঠ্যালা খেয়ে রনি একটু শুধু টলমলিয়ে গেল, আর তারপরেই গগনভেদী আওয়াজ! মা পিসী পিসা, সব ছুটে এলো! আর সবার সামনে, ওই হাট ভর্তি লোকের সামনে, ওর কথায় এতটুকু পাত্তা না দিয়ে বাবা, “জানোয়ারের বাচ্চা” বলে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে দিলো, শেষে ওখানকার দোকানদাররা এসে বাবাকে আটকালো। বলল, “ছিঃ! কী করছেন কী! তাছাড়া ওকে তো ওই বাচ্চাটা ঠেলে ফেলে দিয়েছিল আগে, কপালটা কেমন ফুলে উঠেছে দেখুন”! তারপর ওরাই ওর কপালে জলটল দিয়ে সুস্থ করল। মা কাঠের মতো দাঁড়িয়ে ছিল! ফেরার পথে কারুর সঙ্গে একটিও কথা বলল না মা, রূপা পিসী কি একটা বলতে গেছিল, মায়ের চোখ দেখে চুপ করে গেল। মা শুধু ওকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।

কলকাতা ফিরেই মা ঋত্বিককে নিয়ে একটা আলাদা ফ্ল্যাটে শিফট করল। সেখানেও ওর বাবা গিয়ে ওদের নামে খারাপ খারাপ কথা বলে রাস্তা থেকেই চেঁচাতে শুরু করেছিল, মা একদিন থানায় খবর দিতে পুলিশ এসে বাবাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। তার বেশ কয়েক মাস পরে মা এসে একদিন বলল, “বুবাই, আর ভয় নেই। এবার থেকে শুধু আমি আর তুই” । বলে কেমন একটা বিষণ্ণ উদাস হাসি হাসল মা। ঋত্বিক বুঝল, বাবার প্রতি মুহূর্তের টেনশন থেকে বেরোতে পারলেও মায়ের কোথাও একটা কষ্টও রয়ে গেলো ভেতরে, ছোট হলেও মায়ের ভেতরটা অনুভব করতে পারল সে!

ঋত্বিকের জীবন ছোট্ট থেকেই নারী-কেন্দ্রিক। সবার আগে মা। মায়ের পরেই দিয়া। মা তো বেশির ভাগ সময়ই সারা দিন থাকত না, কিন্তু বাড়ি ফিরে শুধু ঋত্বিককে নিয়েই থাকত। মা না থাকার সময়টা দিয়া গল্প বলে, ওয়ার্ড গেম খেলে, টিভিতে একসঙ্গে কার্টুন দেখে কাটিয়ে দিতো। আর স্কুলেও ঋত্বিকের বেস্ট ফ্রেণ্ড ছিল শর্মিলী । আর তুয়া, আরাত্রিকা, বহ্নিশিখা, সৃজনী, আর ওরা দুজন, মানে ঋত্বিক আর শর্মিলী মিলে একটা দল ছিল। একসঙ্গে খেলত ওরা। কিন্তু একটু উঁচু ক্লাসে উঠে এই দলটাই কেমন পাল্টে গেল। আরাত্রিকা আর তুয়া ছেলেঘেঁষা হয়ে গেল কেমন যেন! বিশেষ করে ক্লাস নাইন থেকে। সৃজনী আর বহ্নিশিখাও মাঝে মাঝেই ছেলেগুলোর সঙ্গে গুজুরগুজুর করত। শর্মিলী অবশ্য ওর সঙ্গেই থাকত সারাক্ষণ! ওকে যে শর্মিলী খুব পছন্দ করে, তা ও বুঝতেই পারত। কিন্তু এই বার, এক্সারশনে গিয়ে সমস্ত গোলমাল হয়ে গেল!

ওরা গেছিল বোট্যানিকাল গার্ডেন এ। এত বড় জায়গায় আন্টিরা আর হাঁটতে পারছিলেন না । তাই ওদের বলে দেওয়া হল ঠিক দুটোর সময় ওরা যেন মেন গেটের কাছে চলে আসে, লাঞ্চ দেওয়া হবে। তপতী আন্টি যথারীতি কড়া গলায় বললেন, “এক মিনিট দেরি হলে এক মাস ক্লাস সাসপেন্ড”! মুহূর্তের মধ্যে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ল। ও আর শর্মিলী চলল নিজেদের মতো। বেশ কিছুটা এগিয়ে শর্মিলী ফিসফিসিয়ে বলল, “ওই দ্যাখ, গাধার মত ড্যাবড্যাব করে দেখিস না যেন! আরাত্রিকা আর সুমন্ত! দ্যাখ, গাছটার পেছনে রে গাধা! নির্ঘাত চুমু খাচ্ছে”! বলতে বলতেই গলাটা যেন কেমন খসখসে হয়ে গেল শর্মিলীর। ওর হাত ধরে কিছু বোঝার আগেই টান মেরে ছুটতে ছুটতে নিয়ে গেল খানিক দূরে, একটা ঝোপড়া মতো গাছের আড়ালে আর নিজের ঠোঁটে শর্মিলীর সামান্য ঘামে ভেজা গালটা টের পেল ও। আর তারপরেই শর্মিলীর ঠোঁটটা নেমে এসে ওর ঠোঁট ছুঁলো।

কয়েক সেকেণ্ড কিছু বুঝতেই পারল না ঋত্বিক, শুধু বুঝল ওকে আরো কাছে টেনে আগ্রাসীর মতো শুষে চলেছে শর্মিলী। আর ও!!! ওর কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। বরং কেমন একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ছে শরীর জুড়ে ।
কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে হাঁপাতে ওকে ছেড়ে দিলো শর্মিলী। আর ওর দিকে সরুচোখে তাকিয়ে অদ্ভুত গলায় বলল,” তুই গে নাকি রে!!! তোর তো কিছু হলোই না”!!

ফেরার পথে সবাই হইহই করে গান ধরল। শর্মিলী ওর পাশে বসলোই না একবারও । এমনকী নেমেও তাকালো না ওর দিকে। বাকি সবার দিকে তাকিয়ে “বাইইইইইই” বলতে বলতে বিরাট হাইরাইসের পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। তখন ঠিক ওইভাবেই নিজেই নিজের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছিল ঋত্বিক!

অলকানন্দা দরজা খুলে ঋত্বিককে দেখলেন, একটা বিধ্বস্ত কালচে চেহারার ঋত্বিক । “কি হয়েছে বুবাই”, উৎকন্ঠা ভরা মায়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই ও নিজেকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।

জীবনে এই প্রথম নিজের ফোন খুলে উলঙ্গ মেয়েদের ছবি সার্চ করে দেখতে আরম্ভ করলো ঋত্বিক। আর বুঝল ওর কিছুই হচ্ছে না! সব ছেলেদের মেয়েদের দেখলে, মেয়েদের নিয়ে কথা বলতে গেলেও যা হয়, তার কিছুই ওর হচ্ছে না! তাই ওকে দেখে মাঝে মাঝে ওর ক্লাসের ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যে হাসত আর বলত “মামা’স বয়”, ওরা বোধহয় খানিক আন্দাজ করত! আর মেয়েদের নিয়ে ওদের আদেখলাপনা দেখলে ওর আবার রাগ হত! মেয়েদের নিয়ে এমন মাতামাতি করার কি আছে ও ভেবেই পেত না । বরং সিনেমাতে যখন বলিষ্ঠ কোনো নায়ককে দেখত, ওর গা কেমন শিরশিরিয়ে উঠত। কহো না প্যায়ার হ্যায় তো এখনও চালিয়ে দেখে ও। ঋত্বিক রোশনের জন্য । এক তো দুজনের নামের উৎসই এক, তারপর ওই পেশিবহুল চেহারা! আর হলিউডের ব্র্যাড পিট !! উফফফ্!! কিন্তু তখনও কিছু অন্যরকম ভাবনাই আসে নি ওর মনে।

সারা রাত ছটফট করতে করতে ভোরের একটু আগে ঘুমিয়ে পড়ল ও। স্বপ্ন দেখল, একটা অপূর্ব ফুলের বাগানে ঢুকেছে, দূর থেকে দেখছে অপার্থিব রঙ আর সৌন্দর্য্য নিয়ে ফুলগুলো নিজেদের মেলে ধরেছে। কিন্তু যেই ও কাছে যাচ্ছে, একটা আর্ত আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাপড়িগুলো। বাগানের শেষ ফুলটার কাছে গিয়ে দেখল শর্মিলীর মুখ বসানো, আর মুখটায় তীব্র ব্যঙ্গ । ও “শর্মিলীইইইই” বলে হাত বাড়াতেই “ছিঃ ঋত্বিক! তুই গে, তুই গে, গেএএএএ, গেএএএএ” বলতে বলতে পাপড়িটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল আর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ওর।

ক্লান্ত শরীরটাকে বাইরে এনে দেখল মা ব্যাকুল মুখে বসে। ওর বেরোনোর আওয়াজ পেতেই ঘুরে বসলেন।
“কি হয়েছে, বুবাই! আমাকে বল্। আমি ক’দিন ব্যস্ত ছিলাম, তোকে সময় দিতে পারি নি একদম। তাই রাগ করেছিস সোনা? আমি কি করি বল্! সময় মতো ডাবিংয়ের কাজ না সারলে কত অসুবিধা, জানিস তো মা! এখন সব শেষ, আমি এখন এক মাস কোনো কাজে হাত দেব না বলে দিয়েছি ওদের। তুই আমার কাছে আয়। একটু হাত বুলিয়ে দি। আর কি হয়েছে খুলে বল প্লিজ । শর্মিলীর সঙ্গে ঝগড়া করেছিস বুঝি”!

মায়ের কথাগুলো যেন কানে ঢুকেও ঢুকছিল না ওর। কিন্তু শর্মিলীর নাম শুনে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না ঋত্বিক । মায়ের কাছে এসে মাকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলল আর হেঁচকি তুলে তুলে বলতে লাগল, “মা, আমি অ্যাবনরমাল মা। মা, তোমার ছেলে গে! কোনো মেয়েকে ছুঁলে আমার কোনো অনুভূতি হয় না মা। মা, সবাই ঠাট্টা করবে আমাকে। তোমাকেও। মা, কী করব আমি!! কী হবে আমার”!!!!

ছেলের কথা শুনে প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন অলকানন্দা! কী বলছে ঋত্বিক!! এত সুন্দর ছেলে তাঁর! কী সুন্দর গঠন শরীরের। একেবারে পুরুষালী। ইলেভেনে ওঠার পর থেকেই কালো কালো দাড়ি গোঁফও দিব্যি গজাতে শুরু করেছে!! হ্যাঁ, ছেলে বন্ধু বিশেষ ছিল না ওর, সব মেয়ে বন্ধুই এতদিন। কিন্তু এই নিয়ে তো মাথাই ঘামান নি তিনি! এই জন্য মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে ও বেশি কমফর্ট ফিল করত! কী করবেন তিনি এখন! ডাক্তার দেখাবেন! হ্যাঁ, ডাক্তার তো দেখাতেই হবে! কিন্তু যদি সেখানেও জানা যায়, এই রকমই থাকবে ও!! গে!! পুরুষসমকামী! সবাই তো জেনে যাবে!! কী হবে!!! তাহলে কি দূরে কোথাও চলে যাবেন??!! যেখানে ওঁদের কেউ চিনবে না! জানাজানি হওয়ার আগেই এটা করতে হবে! হ্যাঁ, এটাই একমাত্র উপায়! দুজনে মিলে কোথাও চলে যাওয়া!!

ভাবতে ভাবতে প্রবীরের কথা মনে এল একবার, আর আপাদমস্তক ভয়ে শিউরে উঠলেন তিনি। এখন যদি প্রবীর ওঁদের সঙ্গে থাকত, ছেলেকে বোধহয় মেরেই ফেলত। হয়ত মা ছেলে, দুজনকেই। একটা বাচ্চা ছেলের ভুলও যে কখনো ক্ষমা করে নি, সে এতবড় ত্রুটি কখনোই মেনে নিতে পারত না!!!
ত্রুটি, শব্দটা মাথায় আসতেই যেন হাজার ভোল্টের শক্ খেলেন তিনি। “ত্রুটি” ! তাঁর করা প্রথম সিনেমার নাম, যেখানে সমকামী একটি ছেলে জানতে পারছে নিজের এই বৈশিষ্ট্যের কথা, যা ওর পরিবার, সমাজ কেউ মেনে নিল না, শেষ পর্যন্ত একা থাকতে শুরু করল, নিজের মত সঙ্গী খুঁজতে শুরু করল, কিন্তু কাউকে পেলো না পুরোপুরি করে। কেউ এল শুধু টাকার জন্য; কেউ বা উভকামী, ওর সঙ্গে কিছুদিন থেকে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলল, আর ঠিক ওর মতো যারা, অনেকেই নিজেদের অক্ষমতা লুকিয়ে বিয়ে করে নিল, আর বাকিদের মধ্যেও এমন কাউকে ও পেল না যে ওর সেনসিটিভ মনটাকে বুঝবে! তাই একদিন ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষাকে মনের মধ্যে চেপে রাখতে রাখতে ছেলেটি উন্মাদ হয়ে গেল!! এই সিনেমাটাই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়েছিল। অলকানন্দার নাম জানতে পেরেছিল সবাই। ওই একটা সিনেমার পর পেছন ফিরতে হয় নি তাঁকে। “ত্রুটি”!
কে জানত, একদিন এই সিনেমার গল্প তাঁর আর তাঁর ছেলের গল্প হয়ে ফিরে আসবে জীবনে! কিন্তু না, তিনি তো দেখাতে চেয়েছিলেন, এ ত্রুটি নয়। এই যৌনবোধ হয়ত সংখ্যায় কম, কিন্তু এও স্বাভাবিক। আমাদের মানসিকতা হল আমাদের চারপাশে যা বেশি দেখি, তাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নি। কম মানেই অস্বাভাবিক । কিন্তু কোনোভাবেই তো তা সত্যি নয়। বরং যা কম, তাকে তো আরো বিশেষ ভাবে দেখা উচিত, যেমন মা সবসময় তাঁর দুর্বল সন্তানকে বেশি ভালোবাসেন, বেশি যত্ন করেন। এমনকী, মহাভারতের কুন্তী, বনবাসে যাওয়ার আগে দ্রৌপদীকে বলেছিলেন সহদেবের বিশেষ খেয়াল রাখতে; ছোট বলে, আদুরে বলে সহদেব একটু দুর্বল, তাই। কিন্তু তাই বলে কি সহদেব অস্বাভাবিক!!! তাই বলে কি ঋত্বিক অস্বাভাবিক! কখনোই নয়! বরং এ কোনো দুর্বলতাও নয়। এ অন্য আরেক রকম বোধ মাত্র। তিনি, অলকানন্দা, যদি একথা না বোঝেন, ঋত্বিকের পাশে তিনি যদি না দাঁড়ান, তাহলে আর কেউ ওকে বুঝবে, এ আশাই বা করেন কি করে!

তাঁর কোলে মুখ গোঁজা ছেলেকে জোর করে তুলে ধরেন তিনি। দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেন, “ঋত্বিক, আজ থেকে তোমার লড়াই শুরু হবে। সঙ্গে আমি তো থাকবোই । দেখবে, আরো কতজনকে পাশে পাবে তুমি । তোমার মত এমন কত ছেলে মেয়ে আছে, যাদের যৌন চেতনা তোমার মতোন। কিন্তু তারা সত্যি একা। তারা সবাই তোমাকে দেখে সাহস পাবে। নিজেকে একটুও অস্বাভাবিক ভেব না । আর দেখো, সময়ও তো পাল্টে যাচ্ছে। পনেরো বছর আগে “ত্রুটি” কিন্তু বহু মানুষকে ভাবিয়েছিল। এখন তুমি মানুষকে আবার ভাবতে শেখাও। নিজেকে না পাল্টিয়ে”!
মায়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে ঋত্বিকের ভেতরের তলিয়ে যাওয়া ভাবটা, শূন্যতার অনুভবটা কেমন যেন কমতে শুরু করেছিল। ও বুঝল, একটা অন্যরকম লড়াই শুরু করতে হবেই, সমাজের সঙ্গে, নিজের সঙ্গেও। কিন্তু সঙ্গে মা থাকবে। পুরোটাই । তাহলে তো ও একা নয়! নিজের মনে হঠাৎ কেমন একটা জোর টের পেলো ও। একটা বিদ্যুতের মতো। ও জানে ঋত্বিক মানে যজ্ঞের পুরোহিত । আর পুরোহিত মানে যিনি পুরোভাগে থেকে সবার হিত করেন। তাই করবে সে আজ থেকে। সত্যি সত্যি নিজের মতো করে ও ঋত্বিক হয়ে উঠবে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত