| 4 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

গল্প: জোছনা ওড়ে চাঁদের আশেপাশেই । মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট
– একটু রাতে, না বেশী রাতে?
উত্তর না দিয়েই ফোনটা নামিয়ে নেন হাসান সাহেব। বিপরীত পাশের কথায় তিনি অভ্যস্ত। চিরাচরিত হালচাল মুখস্ত করতে হয় না, হয়ে যায়। অল্প ধাক্কায় ঝাঁকুনি লাগে না। শুধু একটা গরম বাতাসের ধূলিঝড় বয়ে যায় বুকের ভিতর। হঠাৎ করে কাঁচা বাঁশ ভাঙ্গার মতো কিছু একটা ভাঙে, শব্দ হয় না। কষ্টের বাতাসে তরঙ্গ থাকে না, আয়তন থাকে। 
মফস্বলের বাজার। কয়েকটা সচ্ছল দোকানের পাশে একটি প্রতিবন্ধী কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার। সরকার অনুমোদিত। ফাঁকা রুম। আসবাব বলতে একটা পরিত্যক্ত টেবিল ঘিরে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার। চেয়ার গুলো এলোমেলো। মাঝবয়েসী চারটা কম্পিউটার সেট। তিনটা বন্ধ। একটা চালু। ডিজেল ইঞ্জিনের মতো কুলিং ফ্যানের শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর হ্যাং হচ্ছে, রিস্টার্ট চলছে। 
গোটা দশ প্রশিক্ষণার্থী নিয়েই মুড়িরট্যাং বাসের মতো লক্কড়ঝক্কড় করে চলছে প্রশিক্ষণের কার্যক্রম। অবহেলিত ও বঞ্চিত এলাকার মানুষ ডিজিটাল যুগে এসেও কম্পিউটারের পরিধি ও গুরুত্ব বুঝতে না পারায় শিক্ষার্থীর এই আকাল। প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী জুটলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই বেশীর ভাগ উধাও! এটা ঘটে মাস শেষে ফি প্রদানের সময়। ছেলে প্রশিক্ষণার্থীদের তুলনায় মেয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে বেনিফিট বেশী। ওরা লেগে থাকে, সময়ের গুরুত্ব বুঝে। জীবনের বাঁকও চিনে। টাকা-পয়সাও কম-বেশী দিয়ে যায় রেগুলার। ছেলেদের বেলায় তেমনটা নয়। বহু গার্ডিয়ান বরাতে জানা যায়, ছেলেরা বাড়ি থেকে টাকা আনে, দেয় না। 
টুকিটাকি টিউশনিও আছে। টিউশন ভালো লাগে না হাসান সাহেবের। এটা কাজের জাতে নিকৃষ্ট। অনেকটা উন্নত জাতের ভিক্ষাবৃত্তির মতো। স্টুডেন্ট বা বেকারের প্রসঙ্গে আলাদা ব্যাপার। ওরা টাইমপাসের জন্য বা নিজে শেখার জন্য টিউশন করে থাকে। হাসান সাহেব জীবিকার জন্য টিউশনের কাছে বাধ্য ও অনুগত। পেশাদার শিক্ষক হয়ে যারা এমন চিটিংবাজী করেন, তারা আদৌ শিক্ষক নন। ক্লাশের চেয়ে একজন শিক্ষক বাইরে কখনোই বেশী পড়াতে পারেন না। এটা তাদের ভেলকিবাজি। ডাক্তারদের মতো শিক্ষকরাও এখন প্রাইভেট সার্ভিসে ঝুকে গেছে। ক্লাশে আর্টিক্যালসটা ভালোভাবে দিতে পারলে, বাইরে আলাদা প্র্যাকটিস একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। অবশ্য এক ধরণের গার্ডিয়ান্সের মনগড়া ধারণা থেকেই ছাত্রছাত্রীরা গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের দ্বারস্থ হয়। সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থায় গৃহশিক্ষক বা গাইডের প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, বৈজ্ঞানিক নয়। লাগলে লাগানো যায়, না লাগালেও চলে। 
প্রশিক্ষণের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে টিউশন নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় সারা বিকাল ও সন্ধ্যারাত। টিউশন করেও হাসান সাহেবের তেমন সুফল নেই। লাজুক লাজুক স্বভাবের জন্য তিনি সম্মানিটা চেয়ে নিতে পারেন না। কেমন জানি একটা বিবেক বিবর্জিত এবং লজ্জাস্কর লজ্জাস্কর কাজ বলে মনে হয় তাঁর কাছে। সুবিধা পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা ষাট-নব্বই দিনেও মাস গোনে। নির্দিষ্ট কোনো ফি ধার্য না থাকায় যার যত, যখন খুশি দেয়। 
কম্পোজ-প্রিন্ট ও অনলাইন আবেদনঘটিত কাজও চলে মাঝেমধ্যে। এগুলো বৈদ্যুতিক বিষয়ক কাজ। বিদ্যুতের মর্জির উপর নির্ভর করতে হয় হাসান সাহেবকে। আইপিএস হলে বিদ্যুৎপ্যারা থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেতো। কিন্তু সমস্যা টাকা! অল্প সময়ের বিদ্যুতের বিকল্প হিসাবে ল-ভোল্টজের আইপিএসের জন্যও বিশ/পঁচিশ হাজারের ব্যাপার। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় ঘটে না। বাধ্য হয়েই হাসান সাহেবকে বিদ্যুৎতাফিসের মর্জির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হয়। বিদ্যুতের বিচ্ছিন্নতার গ্যারান্টি থাকলেও সংযোগের গ্যারেন্টি গ্রাম বা মফস্বলে নেই। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলে, ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে দেয়ার অঙ্গিকার করছে সরকার; স্থায়ীত্বের অঙ্গিকার করেনি’। 
রাতেই সময়টা বেশী দিতে হয়। অনলাইনের কাজটা রাত যত গভীর হয় তত দ্রুত করা যায়। দিনের বেলায় নেট লোডিং থাকে। একটা চাকুরীর আবেদন করতে ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়। কম্পোজ ও প্রিন্টের কদর কম। প্রতি পৃষ্ঠার জন্য দশ টাকা হারে। কিন্তু একটা নেটভিত্তিক আবেদনের বিপরীতে মিলে ত্রিশ টাকা। কম সময় ও কম খরচে লাভের মুখটা উজ্জ্বল।
নেটের চাপ প্রতিদিন সমান যায় না। কোনোদিন বেশী, কোনোদিন কম। আবার কোনোদিন একেবারেই থাকে না। এইচএসসি ভর্তি পারপাসে আবেদনের কাজটা রাত জেগেই করতে হয় হাসান সাহেবকে।  প্রতিযোগিতাও আছে। কলেজ অফিসের বাইরে ছাত্রছাত্রী কমই আসে। যারা আসে, তাদেরকে নিয়েও টানাটানির শেষ নেই। ছোট একটি বাজারেও দুই/তিনটি দোকান রয়েছে। এগুলোর মূল টার্গেট মেমোরি লোড। কাজ হাতে পেলে কারো কাছেই ছাড় নেই। বানরের রুটি ভাগের মতো টানাটানি।  হাসান সাহেব শিক্ষিত ও মার্জিত হওয়ায় সুশীল সমাজের একটু বেশীই আনাগোনা তাঁর কাছে।
শেষ আবেদনটা সাবমিট হচ্ছে না। ট্রাই করতে রাত কখন যে গভীরের পথে হাসান সাহেব ঠাহর করতে পারেন না। বুক পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করেন। রাত একটা বেজে কুড়ি মিনিট! 
আশেপাশের কেউ নেই। স্তব্ধ। বাজারের মাঝ বরাবর রাস্তাটা পশ্চিম দিক থেকে পূর্বদিকে চলে গেছে। পশ্চিমে ঈশ্বরগঞ্জ আর পূর্বদিকে কেন্দুয়া। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা গন্ডা। একটি আর্দশ মডেল গ্রামও বলা চলে এটাকে। বাজারের পাহারাদার দুইজন রাস্তার দুইদিকের টং দোকান ধরে টুলছেন। কে বা কারা এলো-গেলো তেমন নজর নেই। দুইটা টর্চলাইট জ্বলে ওঠে একসাথে। নিভে যায়। একটা কালো রঙের বিড়াল মিউমিউ করে পালিয়ে যায়।
জোনাক রাত। আকাশে তারার মেলা। ছোট-বড় হরেক তারা। দিনের আলোর মতো ধূসর সাদা প্রকৃতি।  সূর্যের আলোর মতো ত্যাজ নেই জোছনায়। চাঁদের আলোতে একটা মায়া মায়া সোহাগ আছে। মায়ের সোহাগের মত। রাস্তার দু’ধারে গাছের ছায়াগুলো সামনে থেকে পিছনে হাঁটে। ওদের পায়ে চলার শক্তি আছে, গতি নেই। জোছনায় ছায়াগুলো খাটো হয়, বিকালের আলোর মতো লম্বা হয় না। পাতার ফাঁকে ফাঁকে গুটিগুটি জোছনার ফোঁটা মাটিতে লুটিয়ে থাকে। ফুলের গালিচার মতো। 
আঁধার রাতে জোনাকপোকার আলো গাঢ় হলেও চাঁদনি রাতে পানসে। অপরিপক্ক তরমুজের মতো। ফর্সা রাতে ঝিঁঝিপোকার গলার আওয়াজ মধুর হয়, কাশফুলের মতো মধুর। হেলে-দুলে কানে বাজে। একটা শিয়াল ভাঙ্গা গলায় গান গায়। প্রিয়হারা কান্নাস্বরে।
কুপি বাতিটা জ্বলছে না। উঠোনে শ্যামবর্ণের মতো অন্ধকার। হাসান সাহেবের উপস্থিতি ঠের পেয়ে কুকুরটা শান্ত পায়ে এগিয়ে আসে। ম্যাচ লাইটের ছোট আলোর মতো ওটার চোখযুগল মিটিমিটি করে। আলো দূরে যায় না, চোখের পাশেই থাকে; চোখের গভীরে। অন্য দিনের মতো স্বভাবসুলভ লেজ নাড়ে না। পায়ের কাছে আড়াই প্যাঁচ দিয়ে শুয়ে পড়ে। খাওয়া হয়নি বুঝি? মালিক ঘুমিয়ে পড়েছে? বোবা প্রাণী হলেও কুকুরটি বড় প্রভুর কথা বুঝতে পারে, উত্তর দিতে পারে না। অপেক্ষা গাঢ় হলে প্রথম মুখদর্শনে কথা ভাষা পায়, প্রাণ পায় না। প্যাঁচপ্যাঁচ লাগে। থুতনিটা মাটিতে নামিয়ে লেজটা নাড়িয়ে দাঁড়িয়ে যায়। চোখে-মুখে একটা তৃপ্তির ছোঁয়া আছে ওর।
কুপিটা জ্বালানো যাচ্ছিল না। হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে কুপিটা উপুর করে রেখে আবারো চেষ্টা। লাভ হয়নি। কেরোসিন ছাড়া বাতি জ্বলে না, সলতা জ্বলে। দুই টুকরো পাটশলা এগিয়ে আসে।
– আলুভর্তা? শুকনো মরিচ ও পেঁয়াজটা হালকা ভেঁজে নিলে মজা হতো। সরিষার তেলে যা দাম, নাগাল পাওয়া যায় না। ঠান্ডা ভাতে ভর্তা মাখিয়ে মুখে পুরার আগে হাসান সাহেব ক্ষীণস্বরে বলেন, ডাল করেছো, মসুর? আলুভর্তার সাথে পাতলা মসুরের সখ্যতা বাড়ে। গলায় গিঁট আঁটে না। হাসান সাহেবের স্ত্রী হাসিনা বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। চোখের নিচে কালো দাগ। দাগের ভাঁজে ভাঁজে স্যাঁতস্যাঁতে। কাদা নেই। কাদার খরা আছে। বয়সের সাথে শরীরের মিল নেই। নবীন ধানের পাতার মতো কুঁকড়ে গেছে মুখাবয়ব। চৈত্রের অনলে পোড়া ঘাসের মতো চুলগুলো কপালের উপর অনাদরে বেড়ে ওঠে। তেল বা চিরুনির আর্শীবাদ নেই। চাপা ঢোক গিলেন হাসান সাহেব। বলেন, তনু খেয়েছে? কিছু? 
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে হাসান সাহেব ভাতের থালাটা সরিয়ে পাতিলের ঢাকনাটা তুলেন। পোয়াখানেক পানির উপর ক’ফোঁটা জল পড়ে। নোনাজল সাধারণ পানিতে মিশে না। আলগা আলগা আগলা হয়ে থাকে বীচিকলার আঁঠার মতো। স্ত্রীয়ের দিকে তাকিয়ে মাথাটা নিচু করে বলেন, চাল ছিলো না বুঝি?
– এখন আর কর্জ মানুষে দেয় না। আনলে যে দিতে পারি না। প্রতিদিনের অভাবে, কত আর দিবে? তিন গ্লাস পানি খেয়ে সরে বসে হাসিনা বেগম। মাথা নিচু করে আবার বলে, তনুর অসুখটা বেড়েছে! থেমে থেমে প্রলাপ বকছে!
– সে-কি আর নতুন? কপালদোষেই। ভাতের নলাটা মুখে না পুরে স্ত্রীয়ের দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন, খেয়েছো তুমি?
– একমাত্র ছেলে আমাদের সামনে…আঁচলে মুখ মুছে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে হাসিনা বেগম বলে, ছেলেটাকে একবার ডাক্তার দেখানো গেলে-! তোমার অপেক্ষায় থেকে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছে। বাপ-পাগল ছেলে, চোখের আড়ালে যেতে দেয় না। বড্ড কষ্ট হয়, জানো? আমি পঙ্গু! ছেলেটা মরে মরে…কি আজব কপাল আমার! তোমার কপালে জোড়া লেগে দুঃখের আগুনে কষ্টের ঘি ঢালছি। আঁচলের ভেজা বুকে মুখ ডাকে হাসিনা বেগম। 
– ধৈর্য ধরো। সামনের মাসে নতুন দুইটা প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হতে পারে। টাকাটা পেয়েই তনুর সাথে তোমার শরীরেরও একটা চেক-আপ…চোখ দুটি মুছে মুখ উপরে তুলে ঘরের চালের সাথে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যান হাসান সাহেব।
-পরের পকেটে টাকা রেখে নিজেদের পরিকল্পনায় বাজেটের হিসাব খুব আজব লাগে না! এটাই হয়তো নিয়তি। মালিক কার রিজিক কোথায়, কখন, কিভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন…পানি খান। পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয় স্বামীর দিকে।
-ঠিক তাই। আমরা পাখির মতো সেই রিজিক টুকরিয়ে টুকরিয়ে খাই। আমাদের তো নির্দিষ্ট গন্তব্য আছে, পাখিদের তো তা-ও নেই। সন্ধ্যায় খাবার নিয়ে বাসায় ফিরতে পারে, না-ও পারে। পেট ঘটিত ঝুঁকি। 
বাড়ির পিছনে, ঘন জঙ্গল। কুহক পাখিটা কেঁদে ওঠে। ডানা ঝাপটায়। কুহকের কাঁদার মাঝে আজ মমতা নেই, বিভৎসতা আছে। হাসিনা বেগমের বুকটা চেৎ করে ওঠে। গরম তেলে পানি দিলে যেমন করে পুড়ে তেমন করে পুড়ে তার বুক। গন্ধ বেরোয় না। জ্বালা করে। এসিডে পোড়ানোর মতো জ্বালা। কাঁচা হলুদ পুড়ে। হলুদ পুড়লে, পোড়ার গন্ধ কুহক সইতে পারে না। বিপদের আগামবার্তা নিয়ে দূরে চলে যায়। ছেলের কাছে ছুটে যায় হাসিনা বেগ। কোলে নেয়। আদর করে। আদরে মন ভরে না। দুশ্চিন্তা হয়। রাত-নিশীথে কুহকের ডাক অশুভ! 
পুবাকাশে বড় তারাটার দিকে হাসান সাহেব চেয়ে থাকেন। তার চাহনিতে আক্ষেপ নেই, প্রহসন আছে। জীবিকার সাথে জীবনের, দুখের সাথে সুখের প্রহসন। সোনালি চাঁদটা রক্তিম হয়ে পশ্চিমাকাশে নুয়ে পড়ে। চাঁদের মনে দুঃখ নেই। নিজের সর্বস্ব দিয়েই যতক্ষণ পেরেছে প্রকৃতিকে সেবা দিয়ে গেছে। ওর সেবাদানে প্রতিদান চাওয়া নেই। 
দূরবনে হুতোম প্যাঁচার ডাক শুনে হাসিনা বেগম  থালাবাটি গুছিয়ে বিছানার এক পাশে বসে। 
তনু নিথর। ঘুমের ঘোরে মাঝেমধ্যে বাবাকে ডাকে। স্বপ্নের মতো একা-একা কথা কয়। ঘোড়ার পিঠে চড়ার মতো শব্দ করে। চাবুক ঘুরায়। হাত নড়ে। এপাশ-ওপাশ করে চিৎ হয়। বুকের হাড়গুলো গোনা যায়। হাসান সাহেব তনুকে এক নজর দেখে ঘাড় ফিরিয়ে নেন। চোখ থেকে ভেজা কিছু গড়িয়ে যায়। পানির মতো পাতলা নয়, লবণের মতো ঘন, ক্ষার। ছেলের পাশে শরীরটা বিছিয়ে দেন তিনি। স্বামী-স্ত্রী দু’জন দু’পাশে। মাঝখানে একমাত্র সন্তানের রুগ্ন দেহ।
দুই চোখে স্বপ্ন নেমে আসে হাসান সাহেবের। পূর্বের অফিসে তিনি স্বপদে বহাল হয়েছেন! নতুন মালিক দয়াবান ও মানবিক মানুষ। এক্সিডেন্টে হারানো পা ফিরে পেয়েছেন। পায়ে হেঁটে অফিসে যান। অফিসের সামনে বাগান। বাহারী ফুল। ফুলে ফুলে মৌমাছি ওড়ে। মৌমাছি ধরা যায়, পোষ মানানো যায়। ছুটির দিনে স্ত্রী-সন্তানকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসেন। ডাক্তার বলেছেন, সেরে যাবে। ছোট্ট একটা বাসাও হয়ে গেছে। দুইটা রুম। একটা থাকার। একটা গেস্ট। পরিপাটি।
ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসে। স্বপ্নটা ভেঙে যায়। হাসিনা বেগম কেঁদে ওঠে। তনুকে জড়িয়ে ধরে। স্বপ্নের কথা স্বামীকে বলে। কুমির দেখার ভাবার্থ কি? হাসান সাহেব নিজের দেখা স্বপ্নের কথা বলেন না। শুধু অপলক স্ত্রীয়ের দিকে চেয়ে রইলেন।
গায়ে প্রচন্ড তাপ। খইফোটা আগুন। মাথায় জলপট্টি বদল হয় ঘনঘন। হাত-পায়ে তেল ঢলছেন হাসান সাহেব। চোখ খোলার চেষ্টা করেও তনু চোখ খুলতে পারছে না। বাবাকে জড়িয়ে ধরে। বুকে বুক, মুখে মুখ মিলিয়ে বলে, বাবা! তুমি এসেছো? আমায় ছাড়া তোমার ভালো লাগে? একটু থেমে গিয়ে আবার বলে, ভোর আর কতদূর? দিনের আলো  কি দেখা হবে না? তুমি কেমন বাবা, আমায় দিনের আলোর কাছে নিয়ে যেতে পারো না! আমার খেলার জন্য একটা বাগান করে দিতে পারো না? বাগানে ফুল, মৌমাছির সাথে খেলবো; একা একা ভালো লাগে না। হাসান সাহেব তার স্ত্রীয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলেন না। চোখ বন্ধ করলেন। তনুকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। উঠোনে একজোড়া কাক সমস্বরে কা-কা করে।
ভোর হয়। পাড়া-পড়শী আসে। মসজিদ থেকে দুটি খাটিয়া আনা হয়। জোড়াকবরের মাঝেখানে গড়াগড়ি করে হাসিনা বেগম। বড়ই গাছের ডালজোড়া নড়ে। কুকুরটি চেয়ে রয়-।

2 thoughts on “গল্প: জোছনা ওড়ে চাঁদের আশেপাশেই । মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত