| 26 মে 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

যব উই মেট এন্ড…

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

প্রথমার্ধটা সবার জানা। ছটফট করা স্বভাব, খলবল করে কাজ করা উদ্যম, কলকল করে কথাবলা ঠোঁট, ঝলমল করা চুড়িতে-ঝুমকোয় সাজানো রূপ, টলমল করা আদুরে দাপট! গীতকে দেখে আদিত্যর বড্ড অবাক লাগে। অফুরন্ত শক্তি, মুক্ত মন আর আবেগের অধিকারিনী গীতেরা তাদের লক্ষ ওয়াটের আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীতে। বাবা-মায়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্কে জেরবার, প্রেমিকার যোগ্যতর পুরুষনির্বাচনে হীনমন্যতায় ভোগা আদিত্যদের দেখে গীতেরা দশভুজা হয়ে ওঠে। তারা নিজের পজিটিভিটি, আবেগ, আলো, মুক্তমন জীবনবোধের শক্তিতে হ্যাঁচকাটানে তুলে এনে আদিত্যদের হাতে গীটার ধরিয়ে টিউন করিয়ে গান গাওয়ায়, ‘তুমসে হী দিন হোতা হ্যায়, সুরময়ী সাম আতি হ্যায় তুমসে হী।’

দিনরাত এক করে আদিত্যরা কাজ করে, গীতকে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। গীতের মুখে অংশুমানের নাম ইমনে কোমল রে-র মতন বেসুরো হয়ে বাজে! গীতকে অংশুমানের কাছে পোঁছে দিয়ে আদিত্য ভাবে, ভাগ্য অংশুমানের! গীতের জন্য সেদিন আদিত্যর শেষ অবধি সুইসাইডটা করা হয় না। আবার ট্রেন ধরতে বাধ্য হয় সে।

তারপর গীতেরা অংশুমানদের চিনতে পারে, তাদের নিষ্পাপ রঙ-গন্ধ-স্পর্শ যেন ব্লিচ করে ধুয়ে যায়। তারা নিজেকে লুকিয়ে রাখে, যন্ত্রণায় ছবি আঁকে, আত্মহারা স্বপ্নে ভাবে – ‘আওগে যব তুম, ও সাজনা, আঙ্গনা ফুল খিলেঙ্গে’!গীতেরা কিন্তু অপেক্ষা করে না কোন ত্রাতার, আশাও করে না আদিত্য উদ্ধার করতে আসবে বা অংশুমানেরা ক্ষমা চাইবে। গীত তার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়ে লেখে “পহেলি হোলিতে কৃষ্ণ এনে দিলো রং পেন্সিল। চাইলো, রাধিকা দুনিয়া ভরিয়ে দিক তার মনের রঙে রাধিকার ঝুমকো দুল চাই কৃষ্ণ ফিরিয়ে দিলো রং পেন্সিল, এনে দিলো ঝুমকো, পরিয়ে দিলো নিজের হাতে তারপর রাধিকার সেই ঝুমকোপরা কান ছুঁয়ে কৃষ্ণ নিজের হাতে লাল রং মাখিয়ে দিলো রাধিকার গালে নারকেল ছোবড়া দিয়ে ঘষে ঘষে গাল থেকে অনেক যত্ন করে সব রং তুলেছে সে। দেওয়াল থেকে ছবি খুলে নিয়ে ফ্রেম ভেঙে কাগজ ছিঁড়েছে। সে ফোন থেকে সব ছবি ধরে ধরে মুছেছে ঝুমকো দুলের।

একটা তো কৃষ্ণের আদরে ভেঙেই গেছিলো অন্যটা! সে নিজে আদর করে জমিয়েছিল তা কবেই ফেলে দিয়েছে জঞ্জালের ঝুড়িতে।

আজ হোলি। কাগজ-পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতে বসলো সে। ঝুমকো আর সে পরেই না। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া রং মাখে, লাল নয়, অন্য রং…। সব ছবিই কেমন করে জানি কৃষ্ণরূপ ধরছে আজ অনেক দোকান ঘুরে সেই রাবার খুঁজে ফিরেছে যা দিয়ে মন থেকে কৃষ্ণনাম জন্মের মতো মোছা যায়। রাবারটা কোনও দোকানে আজও খুঁজে পায়নি রাধিকা।

গীতের সময় লাগে, বর্ণহীন জীবনে অভ্যস্ত হতে, টুকরো টুকরো রং দিয়ে জীবনের কোণে কোণে ছোট্ট ছোট্ট আল্পনা দিতে! কিন্তু তার পরেও গীতের সুইসাইডটা করা হয় না।মনের গভীরের নিষ্পাপ সত্যের আলোতে বেঁচে থাকে তার প্রাণ। একদিন আদিত্য আসে নিজের উজাড়করা প্রেম নিয়ে, অংশুমানকে বাস্তব চেনায়। অংশুমান গীতকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে ক্ষমা চায়, হন্যে হয়ে মানালী থেকে ভাতিন্ডা যায়। কাহানী মে এক্সপেকটেড টুইস্ট। গীতের পরিবার ও গীত সবাইমিলে সফল, অভিজাত, ভদ্র আদিত্যদের বরণ করে। অংশুমান অপমানিত হয়, পরাজিত হয়, সুইসাইডটা করে না অবশ্য। পিকচার আভী বাকী হ্যায় মেরে দোস্ত! পরের অংশটুকু সিনেমায় দেখায় না…। পরেরটুকু বাস্তব।

পার্ট টু- তে গীত অবশেষে একদিন শান্তিতে আদিত্যের বুকে মাথা রাখে। এত যত্ন, এত প্রতিশ্রুতি, পারিবারিক মূল্যবোধে ভরপুর মানুষটার প্রতি বিশ্বাসে-প্রেমে-কৃতজ্ঞতায় টইটম্বুর গীত নিজের সমস্ত বর্ম খসিয়ে নিজের দুর্বলতাকে মেলে ধরে। নিজের রূপগুণের রূপকথা অতিক্রম করা বাস্তবটুকু, অতীতের কান্নাটুকু, যন্ত্রণাটুকু সঁপে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিরাম খোঁজে, বিশ্রাম নিতে চায়। আদিত্যের দুধসাদা শার্টের বুকে গীতের চোখের কাজলে-জলে মাখামাখি হয়। আদরে-সোহাগে ভরপুর গীত প্রাণখুলে কেঁদে অবশেষে আদিত্যের বুক থেকে মুখ তুলে আধবোজা চোখে নিজের থরথর ঠোঁটদুটো প্রেমচুম্বনের আকাঙ্খায় মেলে ধরে। অপেক্ষার কিছু মুহূর্ত কেটে যেতে প্রত্যাশাপূরণ না হওয়ায় এবার গীত চোখ মেলে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে ভয়ে শিউরে ওঠে।

সামনে আদিত্যের শরীরে বসে গেছে ক্রুর-নিষ্ঠুর অংশুমানের মাথা! চিৎকার করে কেঁদে ওঠে গীত। চুরমার হয়ে যায় স্বপ্ন। শুরু থেকে সবটুকুই যে মুখোশ আর খোলসে ঢাকা ছিল আদিত্য, তা বুদ্ধিমতী গীতের বুঝতে সময় লাগে না। ম্যানিপুলেশনটা বুঝতে পারে, দেখতে থাকে, কি করে পাল্টে গেল সব। আদিত্যরা তাদের হাত ধরে তাদের শক্তিটুকু নিয়ে তাদের হীনমন্যতাভরা জীবন থেকে উঠে এসে গীটার হাতে গাইবার জন্যই যে আসে বারবার! গীটারটা যেই পাওয়া হয়ে যায়, গীতের কান্নাটুকুর সুযোগটা আদিত্যরা ইন্টারভ্যাল হিসেবে কাজে লাগায়। সঙ্গে সঙ্গে খোঁজা শুরু করে ‘গীত’ ছেড়ে ভিন্ন স্বাদের কোনো আরব্যরজনীর সুর। গীতের গীটারটা আদিত্য নিয়ে চলে যায় বেদুঈন মেয়েটির সাথে। গীত জানে, বেদুঈন মেয়েটি সাপুড়ের বাঁশী বাজায়, সুদৃশ্য পানপাত্রে মদের নেশায় হিলহিলে শরীরে মোহময়ী ছন্দ তোলে! সে যাক, গীত এখনো জানে “বরসে গা সাওয়ান ঝুমঝুমকে।” সেই সাওয়ান আনার জন্য গীত ধুলো ঝেড়ে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়ায়! গীটার গেছে, তো কি? গীত পুরোনো সন্তুর টেনে বের করে তিলককামোদে বাঁধে। কান্নাভেজা গলাতেও নিখুঁত সুরে গেয়ে ওঠে “পা নি সা রে গা সা রে পা মা গা রে গা সা নি, নি রে গা রে নি মা ধা নি ধা’ নাঃ, শেষ পর্যন্ত গীতের সুইসাইডটা করা হয় না।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত