বই না পড়ে অর্থোদ্ধার, আলো নয় তা অন্ধকার (পর্ব-২)

লেখক আড্ডায় ‘বাংলা কবিতা: অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’ গ্রন্থ নিয়ে আলোচকদের বক্তব্যের জবাব 

গৌরচন্দ্রিকা 

শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ‘লেখক আড্ডা’ নামে কবি ও লেখকদের একটি সংগঠন আমার প্রবন্ধের বই ‘বাংলা কবিতা: অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’ নিয়ে ঢাকাস্থ কার্যালয়ে একটা আলোচনা/আড্ডার আয়োজন করে যেখানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক, কবি, সম্পাদক ও সমালোচক যথাক্রমে শোয়েব শাহরিয়ার, মঈনুদ্দিন খালেদ, এজাজ ইউসুফী, আলমগীর খান, আফরোজা সোমা এবং ফরিদুল আলম। আলোচনাটি ফেসবুকে লাইভ প্রচারিত হয়, ফলে দেশে এবং দেশের বাইরে অনেকেই সেটা দেখার ও শোনার সুযোগ পান। আমি টরোন্টো থেকে ফেসবুকের এই লাইভ আড্ডায় যুক্ত হয়ে আলোচকদের আলোচনা শুনি। বইটিতে দীর্ঘ কলেবরের ৫ টি প্রবন্ধ এবং একটি সাক্ষাৎকার আছে যার ভেতর মাত্র দু’টি প্রবন্ধ নিয়ে আলোচকরা কথা বলেন ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ করার অবকাশ পান। এদের মধ্যে তিনজন আলোচক মূলত বইটির নাম প্রবন্ধ ‘বাংলা কবিতা: অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’ নিয়েই তাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেন। তাদের কথা শুনে আমি বুঝতে পারি যে তাদের কেউই প্রবন্ধটি ঠিকভাবে পড়ে আসেন নি এবং না পড়েই মনগড়া, বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য করেছেন যা শ্রোতাদের কাছে আমার লেখা সম্পর্কে ভুল বার্তা দেয়। স্বভাবতই তাদের কথার জবাব দেয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আড্ডার শেষে আলোচকদের কথার জবাব দিতে সঞ্চালক আমাকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারায়, আমি বলেছিলাম লিখিতভাবে এর জবাব দেব। ভিডিও থেকে আলোচকদের কথা শুনে, প্রতিটি প্রসঙ্গ নিয়ে লিখিত জবাব দেয়া ছিল সময়-সাপেক্ষ কাজ যা অনুমিত সময়কে ছাপিয়ে যায় এবং এর মধ্যে মহামারী করোনা এসে আমাদের বন্দি করে, মনোযোগ ছিনিয়ে নেয়। লেখাটি এক পর্যায়ে এসে শেষ হয়ে গেলেও, সবার মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে এটি প্রকাশ করার জন্য আমি অপেক্ষা করি। পুরো আলোচনাটি মোট ৩ টি অংশে ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল। আমি আলোচকদের পুরো বক্তব্য বিষয় অনুযায়ী (পয়েন্ট টু পয়েন্ট) সাজিয়ে জবাব দেবার চেষ্টা করেছি এবং সেই সাথে ভিডিও ক্রম অনুযায়ী যে-পয়েন্টে তারা কথা বলেছেন তার সময়কালও উল্লেখ করেছি। পাঠকদের কথা ভেবে প্রতিটি পর্বের শেষে আলোচনার ভিডিওগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। লেখাটির আয়তন ও পাঠকদের ধৈর্য্যের কথা বিবেচনা করে সাহিত্যের অনলাইন কাগজ ‘ইরাবতী’ এটি তিন পর্বে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ তার ২য় পর্ব প্রকাশিত হ’ল।


লেখকের জবাব: ২য় পর্ব 

জানি না কী ভেবে এরপর মঈনুদ্দিন খালেদ খাপছাড়া ভাবে বললেন, “এই জিনিসটা আমার মনে হয় একদম আলাদা করা উচিত যে ঠাকুরবাড়ি একটা কেন্দ্র, কিন্তু ঠাকুরবাড়িই একমাত্র কেন্দ্র নয়। ঠাকুরবাড়িতে অবনীন্দ্রনাথ যে আধুনিকতার চর্চা করছেন, সেখানে তিনি নতুন আইকন তৈরী করছেন, তিনি মোঘল সভ্যতা হোক, হিন্দু ভারত বা বৌদ্ধ ভারতের মূর্তি ভাস্কর্যের প্রতি যে আকর্ষণ বোধ করছেন সেটা কিন্তু নবশিল্প পর্যন্ত আসতে, যামিনী রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে; পরে নন্দলালও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ক্লাসিকের মধ্যে আমরা ছিলাম না, আমাদের যে জিনিসটা ছিল ক্লাসিক চর্চার লোকায়নে, ঐ জায়গাটা না বুঝতে পারলে পোস্টমডার্ন বোঝা কিন্তু কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের দেশের মতো দেশের জন্য, ত্রিপুরা, আসামের মতো দেশের জন্য।”

[ভিডিও # ৪, সময়কাল ০৬:২৪ -০৭:২৪ ] 

আমার লেখায় কোথাও কী এমন ধারণা দিয়েছি যে ঠাকুরবাড়ি একমাত্র কেন্দ্র যে তিনি এমন মন্তব্য করলেন? আমি প্রাচীন চর্যাপদ থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বাংলাকাব্যের বিবর্তনের প্রতিটি ধাপকে গুরুত্ব সহকারে ব্যাখ্যা করার ধারাবাহিকতায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা রেনেসাঁসের প্রধান পুরুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কথা উল্লেখ করেছি যিনি এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে সবচেয়ে প্রভাবসঞ্চারী ব্যক্তি, এটা তো বাস্তবতা ! মঈনুদ্দিন খালেদের কথা অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ শুধু ক্লাসিকের চর্চা করেছেন যার মধ্যে আজকের বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ)-কে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ বাংলাদেশ, ত্রিপুরা বা আসামে ক্লাসিকের চর্চা ছিল না, যা ছিল বা আছে তা লোকায়ত সংস্কৃতির চর্চা। প্রশ্ন হচ্ছে, লোকায়ত সংস্কৃতির চর্চা কী পশ্চিমবঙ্গে ছিল না বা এখন নেই? অথবা রবীন্দ্রনাথ কী শুধু পশ্চিমবঙ্গেই তাঁর কাব্য, সাহিত্য সাধনা করেছেন এবং ক্লাসিক নিয়েই বুঁদ হয়েছিলেন? ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে কাটিয়েছেন এবং সেখানকার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকসংস্কৃতির ঐশ্বর্যকে নিজের সৃষ্টির মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন, তা কী তিনি জানেন না? এটা আমার কাছে পরিস্কার নয় যে কেন মঈনুদ্দিন খালেদ লোকায়ত সংস্কৃতি চর্চার পথে রবীন্দ্রনাথকে বাধা হিসেবে দেখেন? বরং তিনিই তো আমাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী ও শিক্ষক। লোকায়ত সংস্কৃতির সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্বন্ধ বোঝার জন্য কয়েকটি তথ্য এখানে দিলাম : ১৩০১ বঙ্গাব্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ পল্লীসাহিত্য সংগ্রহে উদ্যোগী হন এবং এর ফলশ্রুতিতে ১৩০১ সালে ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘মেয়েলি ছড়া’, ১৩০২ সালে সাহিত্য পরিষদের পত্রিকায় ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’, ১৩০৫ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘গ্রাম্যসাহিত্য’, ১৩১২ সালে প্রকাশিত হয় স্বদেশী সংগীতের সংকলন ‘বাউল’। রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থ ‘খেয়া’ প্রকাশিত হয় ১৩১৩ সালে যার বিভিন্ন কবিতায় বাউল গানের সুর, ভঙ্গি ও ভাষার প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৩০২ সাল থেকে ১৩২২ সাল পর্যন্ত লোকসাহিত্য সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথের সমন্বিত উদ্যোগ দেখতে পাওয়া যায়, যার মধ্যে লোকসঙ্গীত এবং বিশেষভাবে লালনের গান সংগ্রহ ছিল উল্লেখযোগ্য। স্মর্তব্য, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের সুর গগন হরকরা নামের একজন বাউলের গান থেকেই নিয়েছিলেন এবং সেই গান গেয়েই বাংলাদেশের কৃষক মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাহলে? একটা কথা ভুলে যাবেন না যে রাজনৈতিক কারণে দেশভাগের ফলে আজ সব কিছু যত দূর-দূর মনে হয়, অবিভক্ত বাংলার কালে কিন্তু তেমন ছিল না। অঞ্চলগত পার্থক্য যেমন ছিল, আবার বাংলার একটা অখণ্ড সাংস্কৃতিক বোধও কার্যকর ছিল যা আজো এতো বিভেদের ভিতরেও ফিকে হয়ে যায় নি। এই সূত্র ধরেই বলি, আমার সম্পর্কে আপনার যে পর্যবেক্ষণ, “তুষারের গায়েনের মধ্যে ধ্রুপদী ডাইসটা দেখতে পেয়েছি”, সেটা যদি হয়ই আমি তো কোনো সমস্যা দেখি না। লোকায়ত সংস্কৃতিকে অনুধাবন ও আত্মীকরণের জন্য ধ্রুপদী মনন বাঁধা নয়, বরং সহযোগিতামূলক। রবীন্দ্রনাথ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। 

মঈনুদ্দিন খালেদের খণ্ডিত পাঠ-প্রতিক্রিয়ার একটা উদাহরণ দেব, অর্থাৎ তিনি কোনো প্রসঙ্গে লেখকের বক্তব্য আংশিক পড়ে কীভাবে মন্তব্য করেন তার নমুনা! মঈনুদ্দিন খালেদ তার আলোচনার এক পর্যায়ে বলছেন: “এখানে আমি তার (তুষার গায়েনের) যে স্পেস এবং টাইম দেখার বিষয়টা সেটা আমি নিজের ভাবে, নিজের মতো করে বলতে চেষ্টা করছি। ঊনিশ পৃষ্ঠায় তিনি (তুষার) লিখছেন, “পশ্চিমবঙ্গেই বৈষ্ণবকাব্য অধিকতর সমৃদ্ধ”, সত্যি কথা, কারণ হিসেবে তিনি (তুষার) বলছেন, “সেখানে নিসর্গের স্থির বিস্তৃতি ও দিগন্তে লীন প্রান্তরের মধ্যে ব্যক্তি তার সীমা অতিক্রম করে অসীমের মধ্যে সমাহিত হবার অন্তরঙ্গ আহবান খুঁজে পান।” এর পরেই মঈনুদ্দিন খালেদের সংহারী প্রশ্ন, “পূর্ববঙ্গের নদীমাতৃক বাংলাদেশে অনন্ততা অনুভব করার ক্ষেত্রে এটার সাথে পার্থক্যটা কি? ঐখানে পান, এইখানে পান না, তাই তো আমি বুঝব ! অনন্ততার কত গান আপনি চিন্তা করেন, ‘রুপালি নদীর রূপ দেইখ্যা আমি হইয়াছি পাগল,’ বিচিত্র গান আছে, অনন্ততাকে জীবনের অনিত্য জায়গাটাকে স্পর্শ করতে চায়, এবং কঠিন কাজ করতেছে, দাঁড় টানছে, হাল বাইছে, কৃষিকাজ করছে, বিশেষত গ্রীষ্মে, মানুষ কিন্তু মারেফতি গান গাইছে, এই জিনিসটা বোঝা উচিত, আধ্যাত্মিকতার জায়গাটা, লোক-মনীষা কীভাবে আধ্যাত্মিকতাকে অনুভব করেছে।” [ভিডিও # ৪, সময়কাল ১২:৪১ -১৩:৫৩ ]

আমার জবাব, আপনি যদি স্বচ্ছ মন নিয়ে কোনো কিছু না পড়েন এবং অর্ধেক পড়েন, তাহলে এরকমই বুঝবেন! আমি পরের লাইনগুলোতে কী লিখেছি সেটা পড়ে দেখার ধৈর্য্য অথবা উপলব্ধি আপনার হয়নি। আমি পরের লাইনগুলোতে লিখেছি, “একদা পূর্ববাংলা, এখনকার বাংলাদেশ, নদীমাতৃক; ভাঙাগড়ার অস্থির দ্বন্দ্বে চিরজাগরূক নিসর্গের মধ্যে এখানে শাক্ত-কাব্যের জন্ম ও বিকাশ। এখানকার নদীর পাড়ে জন্ম নেয় বাণিজ্য বায়ুর গল্প : মানুষের দৈনন্দিন ঘর-সংসার ও বাণিজ্যবেসাতি; বণিক পুরুষদের প্রতাপ ও তেজোদৃপ্ত জীবনাচরণ; নারী-পুরুষের প্রেম-বিরহ ও হিংসা-কলহ, দুর্গম পরিবেশ ও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার তীব্র জীবনস্পৃহা নিয়ে রচিত হয়েছে কালজয়ী চাঁদ সদাগর অথবা বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী: মনসামঙ্গল (বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস প্রমুখ)।” যেকোনো পাঠক খণ্ডিতভাবে না পড়ে, প্রথম থেকে শেষ লাইনগুলো পড়লে সহজেই বুঝতে পারবেন যে ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর প্রভাব কোনো অঞ্চলের (পশ্চিমবঙ্গ/ পূর্বববঙ্গ) কাব্যকে কোন ধারায় (বৈষ্ণবকাব্য/ শাক্ত কাব্য) বেশি প্রভাবিত করেছে তার একটা তুলনামূলক রূপরেখা দেয়া হয়েছে। এর মানে কী এই দাঁড়ায় যে আমি নদীমাতৃক বাংলাদেশে অনন্ততা অনুভব করার কথা আমি অস্বীকার করছি? আপনি যেমন নদীমাতৃক বাংলাদেশের সন্তান, আমিও সেই নদীমাতৃক বাংলাদেশেরই সন্তান এটা ভুলে যাবেন না ! আপনি যেভাবে খণ্ডিত পাঠ-প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন, সেভাবে তো পশ্চিমবঙ্গের একজন পাঠকও বলতে পারে, “আপনি পূর্ববঙ্গে নদীর ভাঙাগড়া দেখলেন, শাক্ত কাব্য খুঁজে পেলেন, পশ্চিমবঙ্গে কী নদীর পাড় ভাঙে না, শাক্ত কাব্য লেখা হয় নাই?  বৈষ্ণবকাব্য ও শাক্ত কাব্য পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্বববঙ্গ, উভয় অঞ্চলেই লেখা হয়েছে, পার্থক্য তার গুণ ও পরিমানে। উভয় অঞ্চলেই নদী এবং প্রান্তর রয়েছে, উভয় অঞ্চলের মানুষই কঠিন কাজ করে, দাঁড় টানে, হাল বায়, কৃষিকাজ করে, বাউল এবং মারেফতি গায়, উভয় অঞ্চলের লোক-মনীষা আধ্যাত্মিকতাকে অনুভব করে। আমার আলোচনায় কোনো অঞ্চলের প্রতি বেশি প্রীতি বা পক্ষপাত দেখানো হয় নাই, প্রকৃতির প্রভাব কাব্যের কোন ধারাকে কোন অঞ্চলে বেশি বিকশিত করেছে, সেটাই নৈর্ব্যক্তিকভাবে বলেছি। বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন কবিরের ‘বাংলার কাব্য’ বইতেও আমার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যাবে। শোয়েব শাহরিয়ার আপনাকে সেকথা বলবার চেষ্টাও করেছেন, আপনি আমলে নেন নি। 

তিনি প্রবন্ধের ঘাটতি নির্দেশ করতে গিয়ে আমাকে প্রশ্ন করছেন, “প্লেটোর আইডিয়া, স্পিনোজার ঈশ্বর, হেগেলের এবস্যলুট, দেকার্তের কোজিতো I think so I am, লাইবনিজের মোনাড, রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতা ইত্যাদি বলছেন, কিন্তু এরিস্টটল নয় কেন? এগুলো আমার মনে হয় যদি তিনি করেও থাকেন, এগুলোর ব্যাখ্যা থাকা দরকার। হতেই পারে তিনি তার মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন, আমি যেমন আমার মতো করে বলছি এবং ওই লাইনটা পরিষ্কার করে দেয়া উচিত যে কার্টেসিয়ান ফিলসফির মধ্যে কী করে I think so I am এটা অনেক বেশি reasoning তৈরী হয়েছিল, অথবা রোমান্টিসিজমের মধ্যে I feel so I am হ’ল এবং কী করে  এক্সপ্রেশনিজমের মধ্যে এসে I don’t believe, so I am এইসব জিনিসগুলা না আমার কাছে মনে হয়েছে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া উচিত, আমি কোনো বাংলা বইতে এগুলা দেখি না যে পরিষ্কার করে সহজ বাংলায় লেখা।
[
ভিডিও # ৪, সময়কাল ১৯:২৪ – ২০:৪৩ ] 

এই যে তিনি সমালোচনা করলেন, তিনি কী পড়ে দেখেছেন কোন প্রেক্ষিতে আমি এসব মনীষীদের নাম বলেছি? আমি একটা চিন্তাকে প্রকাশ করতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে কিছু মনীষীর নাম নিয়েছি, সেখানে আরো অনেক নাম আসতে পারে; কিন্তু এখানে নাম তো বিষয় নয়, বিষয় হচ্ছে চিন্তা। কী সেই চিন্তা? আমার প্রবন্ধ থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি, “সাধারণভাবে স্বীকৃত যে মানুষের জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম ভাষা যার মাধ্যমে জীবন ও তার বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। কিন্তু ফরাসী কাঠামোবাদী ভাষা-তাত্ত্বিক রোঁলা বার্থ তাঁর ভাষাচিন্তার এক পর্যায়ে এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে ভাষা বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করতে অক্ষম, বরং ভাষা নিজেই বাস্তবতাকে গড়ে তোলে অর্থাৎ ভাষা জ্ঞানের বিকৃতি সাধন করে। ফলে একটা ‘টেকস্ট’ একইসাথে বিবিধ ও পরস্পরবিরোধী অর্থ বহন করে থাকে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে দেরিদা বিনির্মাণতত্ত্ব (Deconstruction theory) নির্মাণ করেন যা দিয়ে ভাষার ভেতর লুক্কায়িত অধিবিদ্যাকে (Meta physics) তিনি নস্যাৎ করে দিতে চান। এই অধিবিদ্যা আসলে কী? এই অধিবিদ্যা হচ্ছে এমন কোনো ভাব, ধারণা বা প্রত্যয় যার কোনো বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখা হয় না; কিন্তু মানুষকে তা গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে এই বিশ্বাসে যেন বা তার উত্তরণ, মুক্তি বা মোক্ষ ওর ভেতর নিহিত আছে। বড় বড় কবি, সাহিত্যিক, মনীষী ও চিন্তাবিদদের মধ্যে দেখা যায় তারা কোনো একটা আদর্শ বস্তুর ধারণাকে প্রকাশ করতে চান তাদের কল্পনায় ও রচনা-কর্মে যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই; কিন্তু আপাতদৃষ্টে মনে হয় তার ভেতর মর-জর্জর পৃথিবীর সব প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি ও বেদনার নির্বাণ আছে, যেমন — প্লেটোর আইডিয়া, স্পিনোজার ঈশ্বর, হেগেলের এবসল্যুট, দেকার্তের কজিতো, লাইব্‌নিজের মোনাড, রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতা ইত্যাদি। ভাষা হচ্ছে সেই মাধ্যম যা এই অধিবিদ্যার জগত গড়ে তোলে। তাই ভাষাকে আক্রমণ করে এবং অধিবিদ্যার ছাল ছাড়িয়ে তার ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও বিরোধগুলোকে উন্মোচন করে দেরিদা প্রমাণ করতে চান যে ভাষার একটি মাত্র অর্থ হয় না ; লেখক যা বলেন বলে মনে হয় তার বাইরেও অনুক্ত থেকে যেতে পারে অনেক কিছু যা বিরোধাভাসে পরিপূর্ণ।” পাঠক দেখুন যে-প্রেক্ষিতে আমি এই মনীষীদের নাম ও তাঁদের ভাব/ ধারণাকে উল্লেখ করেছি, মঈনুদ্দিন খালেদ তার মর্মে না গিয়ে প্রবন্ধের উপর ভাসা ভাসা চোখ বুলাতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে মন্তব্য করেছেন কেন এরিস্টটলের নাম নেই অথবা কার্টেসিয়ান ফিলসফি, রোমান্টিসিজম, এক্সপ্রেশনিজমের সংজ্ঞা জুড়ে দেইনি। আমি তো ফিলসফি এবং শিল্পান্দোলনের উপর কোনো এনসাইক্লোপেডিয়া অথবা কলেজের নোটবই লিখতে বসি নি!


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
‘লেখক আড্ডা’র অনুষ্ঠানে বই নিয়ে আলোচনা করছেন ‘লিরিক’ পত্রিকার সম্পাদক কবি এজাজ ইউসুফী

এরপর এজাজ ইউসুফী যেভাবে আলোচনা শুরু করলেন তাতে মনে হ’ল তিনি ‘বাংলা কবিতা : অধুনান্তিকতার অভেদ সন্ধান’ বইটি নিয়ে আলোচনা করতে আসেন নি, তিনি এসেছেন এমন একটি সেমিনারের বক্তা হয়ে যার শিরোনাম হতে পারত ‘বাংলাদেশে উত্তর আধুনিকতার প্রতিষ্ঠাকল্পে ছোট কাগজ লিরিক-এর ভূমিকা’। আলোচনার প্রথমভাগে তিনি বই নিয়ে কোনো কথাই বলেন নি, তিনি ব্যস্ত ছিলেন উত্তর আধুনিকতা নিয়ে তার জ্ঞানের প্রচার ও নিজের কবিতা পাঠ করে উত্তর আধুনিকতার তত্ত্ব জাহির করার পাশাপাশি ‘লিরিক’-এর জন্ম ও কর্মবৃত্তান্ত তুলে ধরার কাজে। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যেসব কথাবার্তা তিনি বলেছেন, তার সাথে সমিল অনেক কিছু আমার প্রবন্ধে রয়েছে। যেসব স্থানে বিরোধ এবং তার স্ববিরোধিতা লক্ষ করেছি, সেসব নিয়ে আমি কথা বলব। তিনি প্রথম আধা ঘন্টায়

[ভিডিও # ৪, সময়কাল ২৯:৩৭ – ৫৭:৩৩ ]

যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আগে তার জবাব দিচ্ছি। এজাজ ইউসুফী বলেন যে ১৯৮৬-৮৭ সাল থেকে, পশ্চিমবঙ্গের কবি ও তাত্ত্বিক অঞ্জন সেনের সাথে বই ও চিঠিপত্রের যোগাযোগের সূত্র ধরে তিনি ও তার সহযাত্রী ‘লিরিক’ কবিগোষ্ঠী বাংলাদেশে ‘উত্তর আধুনিক’ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন এবং তারই ফলাফল হিসেবে ১৯৯৩ সালে লিরিক উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা-১ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে ‘উত্তর আধুনিক’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দাবি করতে গিয়ে তিনি আপত্তিজনকভাবে শিকার হয়েছেন আঞ্চলিকতাবাদের, ঢাকাকে তিনি দাঁড় করিয়েছেন চট্টগ্রামের প্রতিপক্ষ হিসেবে। তার অভিযোগ ‘কেন্দ্র’ ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহল ‘প্রান্ত’ চট্টগ্রামকে উত্তর আধুনিকতার মতো নতুন চিন্তাদর্শনের প্রবক্তা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি এবং তাদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন যে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত লিরিকের ৪টি উত্তর আধুনিক সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা (আনু মুহাম্মদ থেকে যতীন সরকার পর্যন্ত) উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন এমন ৫০টি প্রবন্ধ চতুর্থ সংখ্যায় সঙ্কলিত করে তিনি তার বিশাল, বিস্তৃত উত্তর দেন। তার বক্তব্য: “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে যখন কথা হয়, ঢাকায় যেটিকে আমি কিষ্কিন্ধ্যাপুরী বলি, যেখানে আসলে খুব ভালো মানুষের বসবাস নয়, তারা সেটিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। এটিকে প্রথমত প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মীয় উত্থান এগুলো বলা হ’ল এবং একটি গ্ৰুপ তৈরী করল শাহবাগ কেন্দ্রিক, ইশারফ হোসেন নামক এক অর্বাচীনকে দিয়ে, সেটি ব্যর্থ হয়ে গেল। সেটিতে অবাক করা বিষয়, এই ছেলেটি একটি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর ছেলে, সেখানে সে সেমিনার করল ৩/৪ দিন ব্যাপী, বাংলাদেশের সব বামপন্থী বুদ্ধিজীবী সেখানে গিয়ে বক্তব্য রাখলেন। অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে উত্তর আধুনিকতা নামে, দীর্ঘকালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, নিজস্ব কৃষ্টি, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উপর — সেই ভিত্তিভূমির উপর, কলোনির মানুষ না হয়ে আমরা মানবিক মানুষ, প্রযুক্তির মানুষ, জ্ঞানের মানুষ হিসেবে তাদের (পশ্চিম) কাউন্টার ডিসকোর্স তৈরি করে, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার কথা যখন বলছি, তখন এরা প্রথমে আমাদের এইভাবে চরিত্র হননের চেষ্টা করল। […] আজকে আপনি ধরেন যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন ভাই (তারই অনুসারী ছিলেন আমাদের তুষার গায়েন ‘একবিংশ’ পত্রিকার মধ্য দিয়ে) তিনিই বলেছিলেন যে এরা যে কাজগুলো করছে, কলকাতার অঞ্জন এবং চট্টগ্রামের ‘লিরিক’ বের হলে আমরা বুঝতে পারি যে ‘উত্তর আধুনিকতা’ নামে একটা জিনিস আছে!” 

মারাত্মক অভিযোগ বটে! যে সময় থেকে ‘লিরিক’ উত্তর আধুনিকতা নিয়ে কাজকর্ম শুরু করেছে, সেই একই সময়ে ঢাকা থেকে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’, কবি মঈন চৌধুরীর ‘প্রান্ত’, তপন বড়ুয়ার গাণ্ডীব; বগুড়া থেকে সরকার আশরাফের ‘নিসর্গ’ পত্রিকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেসব লিটল ম্যাগাজিন বের হয়েছে সেখানে উত্তর আধুনিকতা নিয়ে অঞ্জন সেন, তপোধীর ভট্টাচার্য, কলিম খান সহ উল্লেখযোগ্য বাঙালি তাত্ত্বিকদের বহু প্রবন্ধ, নিবন্ধ সহ পশ্চিমা পোস্টমডার্ন তাত্ত্বিকদের প্রবন্ধের অনুবাদ, দর্শন ও ভাষা বিজ্ঞান নিয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাকর্ম প্রকাশিত হয়েছে। লিরিকের মতো সিলমোহর গায়ে না মেরেও, এসব পত্রিকায় যেসব কবিরা লিখেছেন তাদের কবিতা, গদ্য ও বিভিন্ন রচনায় উত্তর আধুনিক চিন্তাদর্শনের চর্চা ও অৰ্জনের গভীরতা সনাক্ত করা যায়। গোড়ার দিকে উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যে সন্দেহ ও সমালোচনা তা অসঙ্গত ছিল না, কারণ আধুনিকতার সীমানা ভেঙে যে উত্তর আধুনিকতা জায়গা করতে চাইছিল সেখানে তো শুধু নতুন জীবন বিধানই নয়, প্রতিক্রিয়াশীলরাও এর ভিতর দিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করছিল। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের প্রতিনিধি যে ইশারফ হোসেনের কথা তিনি বললেন, তার সাথে খোন্দকার আশরাফ হোসেন এবং আমাদের (যারা ‘একবিংশ’-এ নিয়মিত লিখেছি) মুখোমুখি তর্ক হয়েছে। এজাজ ইউসুফী যে বললেন ইশারফ হোসেনকে দিয়ে গ্রুপ করিয়ে তার আয়োজিত সেমিনারে সব বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা উত্তর আধুনিকতার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন, তো তিনি কী বলবেন সেই বামপন্থী বুদ্ধিজীবী কারা? আমি বা সমমনা বন্ধুদের কেউ তো ঐ রকম সেমিনারে যাই না, তাই জানিও না। এই যে ঢালাওভাবে সব বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের দোষারোপ করা, এটা কী ঠিক? বামপন্থীদের মধ্যেও যে অনেক তরিকা ও বিভক্তি আছে সেটা তো এজাজের জানবার কথা। ইশারফ হোসেন তো চুনোপুঁটি, বাম নামধারী প্রতিক্রিয়াশীল রাঘব বোয়াল ফরহাদ মজহার গংদের সাথে ‘একবিংশ’ গ্ৰুপের লিখিত এবং মুখোমুখি তর্ক-বিতর্ক হয়েছে যারা ডিসকোর্সের ছুরিতে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ধর্মীয় মৌলবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এজাজ ইউসুফী এবং ‘লিরিক’-কে আমরা সেই সন্দেহের তালিকায় দেখিনি, তার প্রমান ‘একবিংশ’ আয়োজিত একাধিক অনুষ্ঠানে তাকে বক্তা হিসেবে ঢাকায় আমন্ত্রণ করা হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৯৫ সালে ‘একবিংশ’র ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান যেখানে আমি ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতা’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করি ও সার্বিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করেছিলাম : “পোস্টমডার্নিজমের (আমাদের এখানে উত্তর আধুনিক/আধুনিকোত্তর) বহুমুখী প্রবণতার ভেতর একটি হচ্ছে ঐতিহ্যমুখীনতা যা পাশ্চাত্যের যন্ত্রসভ্যতার অতিপরিণত জাগতিক সমৃদ্ধি ও যৌক্তিক পরিণতির বিরুদ্ধে বিসৃজনের ধারণায় ব্যাপ্ত। আধুনিককে প্রতি মূহুর্তেই আধুনিক হয়ে ওঠার তাড়নায় ক্রমাগতই অতীতের সাথে বিচ্ছিন্নতা তৈরী করে যেতে হয়। এই বিচ্ছিন্নতা অতিক্ৰম করতে উত্তর আধুনিকরা সমস্ত দেশ, কাল ও ইতিহাসের ভেতর নিজেদের স্থাপন করতে চান। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি একটি নিকট ভাবনা হিসেবে এপার-ওপার বাংলায় ঐতিহ্য ও তার নবসূত্রায়নের প্রশ্নে প্রযুক্ত হচ্ছে। এপর্যন্ত এটিকে সদর্থে গ্রহণ করলেও এর শঙ্কার দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। ইতোমধ্যে তার আলামত আমরা লক্ষ করছি। ঐতিহ্য চর্চার কথা বলে এবং যুক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে অনেকেই আধ্যাত্মিকতার নামে স্থির ধর্মবিশ্বাস ও মধ্যযুগীয় মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন যার যোগসূত্র সহজেই অনুমেয়। অথচ আধ্যাত্মিকতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, দর্শন, বিশ্বাস, উদ্দেশ্য ও প্ররোচনার উর্ধ্বেই একটি বিস্তৃত অনুষঙ্গ হিসেবে জীবনাবলোকনের প্রশ্নে স্থিত হতে পারে যার প্রমান রয়েছে এসময়ে রচিত শক্তিশালী কবিতায়। উত্তর আধুনিক শিরোনামের সাফল্য নির্ভর করছে অতঃপর উদ্যোক্তাদের দর্শন ও চিন্তার স্বচ্ছতার উপর যেখানে প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে তাদের মেরুদূরত্ব নিশ্চিত হবে।” এইসব কথা ইশারফ হোসেন, ফরহাদ মজহারদের তৎপরতার বিরুদ্ধেই উচ্চারিত হয়েছিল।   

অঞ্জন সেনের নাম জড়িয়ে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এজাজ করলেন, তার কোনো সূত্র কী তিনি দিতে পারবেন? বরং এর উল্টোটাই সত্য! প্রমান হিসেবে আমি খোন্দকার আশরাফের হোসেনের প্রবন্ধ ‘উত্তর আধুনিক চাতালে’ থেকে অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করব যেখানে আশরাফ লিখেছেন, “আমি তখন ‘একবিংশ’ নামক কবিতার কাগজের ৯ নম্বর সংখ্যাটি প্ৰকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময়ে ডাকযোগে একটি পত্র পেলাম: লেখক অঞ্জন সেন, সম্পাদক, গাঙ্গেয়পত্র, কলকাতা। পত্রটি একবিংশের মার্চ ১৯৯২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় পত্রপ্রবন্ধ হিসেবে, শিরোনাম দিই : আশির কবিতা, ‘গৃহে ফেরে ভ্রামণিক চোখ’। আমরা বাংলাদেশে একটি নতুন কবিতা আন্দোলনের জন্ম দিতে চাচ্ছিলাম। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে সেই প্ৰচেষ্টার সহযোগী হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছিল তরুণ প্রজন্মের মুখপত্র ‘একবিংশ’। […] আশির দশকে আমরা চেয়েছিলাম কবিতায় স্বচ্ছতা ও অভিনিবেশ ফিরিয়ে আনতে, চেয়েছিলাম দেশ-কাল-ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে কবিতায় সেইসব নান্দনিক লক্ষণগুলো যুক্ত করতে যা হারিয়ে যাচ্ছিল রাজনৈতিক অপস্মারের মধ্যে। […] আমরা তখনো উত্তরাধুনিকতা নামক চিন্তাপ্রপঞ্চ নিয়ে নিষ্ঠাবতী ভাবনা করিনি, যদিও চেতনাচক্রবালে ঝিলিক দিচ্ছিল বটে সেইসব।’একবিংশ,’গাণ্ডীব’, ‘সংবেদ’, ‘প্রান্ত’ প্রভৃতি ছোটকাগজ আমাদের অক্ষরগুলো ধারণ করছিল।  […] এমন সময়ে অঞ্জন সেনের ঐ চিঠি আমাদের জাগিয়ে তুললো, আমরা কিছুটা আত্মসচেতনও যেন হয়ে উঠলাম। অঞ্জন সেন তাঁর নিজস্ব পাঠসূত্রে আমাদের কবিতার মধ্যে ‘আবিষ্কার’ করলেন ‘সদর্থক’ কিছু গুণ, যা পশ্চিমবঙ্গের কিছু কবিতাকর্মীর রচনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। ঐ চিঠিতে (একবিংশতে) অঞ্জন সেন লিখলেন : “নতুন প্রজন্মের কবিতার নতুন একটা সদর্থক চেহারা স্পষ্টভাবেই দেখা দিয়েছে। কবিদের প্ৰত্যেকেরই ব্যক্তিভাষা যেমন বোঝা যাচ্ছে তেমনি সমষ্টিগত প্রাণের চেতনার উপাদানটিও প্রবল। ঐতিহ্য এবং পরম্পরার পটভূমিতে এই অনিরুদ্ধ আশি’র সময়ের কবিতাকে বিচার করা যেতে পারে। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি একাত্মতার জন্যই এসব কবিরা বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজস্বভাবে সমকালে অবস্থান করে সংশ্লিষ্ট হতে পেরেছেন। এখানে কোনো সংকীর্ণতা-অন্ধতা নেই। ইউরোপকেন্দ্রিক আধুনিকতার চলনে আমরা দেশজ ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করতে শিখেছি … ঐতিহ্য মানেই সংকীর্ণ প্রাচীনপন্থা নয় বা সামন্ততান্ত্রিক বোধ নয়। ঐতিহ্যের মধ্যে যে মানবিক বোধের জীবন্ত ধারা যে প্রাণ চেতনার প্রবাহন নুতন কবির কাছে তা গ্ৰহনযোগ্য।” […] দীর্ঘ ঐ পত্র-প্রবন্ধে অঞ্জন সেন যে চমৎকৃত হওয়ার মতো কাজটি করলেন তা হলো — তিনি একটি আয়না তুলে ধরলেন আমাদের চোখের সামনে, আমরা সানন্দবিস্ময়ে দেখলাম যে, আমরা অনেকটা অসচেতনভাবেই স্পর্শ করেছি কিছু ওয়েভ-লেন্থ, কিছু চিন্তা-তরঙ্গ যা সমান্তরালভাবে সীমান্তের ওপারেও প্রবহমান। […] এই ঘটনার পর অঞ্জন সেন বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে হয়ে ওঠেন একটি পরিচিত নাম। ‘একবিংশ’ ‘প্রান্ত’ এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘লিরিক’ কাগজে অনেকগুলো প্রবন্ধ লেখেন তিনি : প্রতিটি লেখার কেন্দ্রে তার ‘উত্তর আধুনিক’ কাব্যভাবনা। আমাদের এখানে ততোদিনে পোস্টমডার্নিজমের ভাবনাগুলো অনূদিত হতে শুরু করেছে। সাহিত্য থেকে এতোদিনকার মহামহিম মানব-বিষয়কে নির্বাসিত করে এক ধরণের শূন্যবাদী নির্বিন্ন-হতাশ চক্ষুহীনতার ব্যান্ডওয়াগনের সরব পদচারণা। লিওতার-ইহাব হাসানদের রচনাগুলো অনূদিত হচ্ছিল; কেউ কেউ দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা না করেই পোস্টমডার্ন কাব্যচর্চার নানা বিভঙ্গ সবিস্তারে তুলে ধরছিলেন। বলাই বাহুল্য, সেগুলো পশ্চিমে জাত বিশেষ ধরণের চিন্তাপ্রপঞ্চ; সাহিত্য থেকে এতোদিনকার মহামহিম মানব-বিষয়কে নির্বাসিত করে এক ধরণের শূন্যবাদী নির্বিন্ন-হতাশ চক্ষুহীনতার ব্যান্ডওয়াগনের সরব পদচারণা। লিওতার-ইহাব হাসানদের রচনাগুলো অনূদিত হচ্ছিল; কেউ কেউ দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা না করেই পোস্টমডার্ন কাব্যচর্চার নানা বিভঙ্গ সবিস্তারে তুলে ধরছিলেন। আমাদের তরুণদের একাংশ এই উদ্বায়ী মনোভঙ্গীর প্রতারক জেল্লায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন সেসময়। শেকড়হীন, ঐতিহ্যচ্যুত, নানারকম শব্দব্যায়ামে পরিকীর্ণ হচ্ছিল কবিতা” […] বৈনাশিকী পোস্টমডার্নিজমের ঝড় শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে চাচ্ছে আমাদের সমূহ পরিচয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মরক্ষার যুদ্ধে মাতৃভাষা ও আমাদের ভূমিজ কবিতা আমাদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী অস্ত্র ও ঢাল। অঞ্জন সেন সেই যুদ্ধের অগ্রসৈনিক। তাঁকে সেলাম।” অঞ্জন সেন সম্পর্কে খোন্দকার আশরাফের দৃষ্টিভঙ্গী উপরের বক্তব্যে সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট এবং সেই ভাবনায় ‘লিরিক’ও যে উপস্থিত, সেটাও তো এখানে দলিল হয়ে আছে। শুধু তাই নয়, উত্তর আধুনিকতার সমান্তরালে পোস্টমডার্নিজমের নামে যা চর্চা হচ্ছে, তার পার্থক্যও তিনি অভ্রান্তভাবে চিহ্নিত করেছেন। তাহলে এজাজের কথার ভিত্তি এবং বিরোধিতার হেতু কী? 

এতক্ষণ যা লিখলাম তার সাথে আমার বইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু এজাজ ইউসুফীর কথার জবাব দিতে প্রসঙ্গক্রমে বলতে হ’ল। তার বক্তব্য এমন কিছু প্রশ্ন উদ্রেক করছে যা আগে কখনো তার সম্পর্কে আমার চিন্তায় আসেনি। এজাজ বাংলা কবিতায় আধুনিকতা এবং উত্তর আধুনিকতার প্রেক্ষাপট বৰ্ণনা করতে গিয়ে যেসব কথা বলেছেন তার মধ্যে পারম্পর্যের অভাব, স্ববিরোধিতা এবং চিন্তার সংকট লক্ষণীয়। এজাজ বলছেন: “(তুষার) এইখানে বলবার চেষ্টা করেছেন যে মাইকেলে এসে আমাদের প্রথম আধুনিকতার সূত্রপাত বাংলাকাব্যে এবং সেটিও পশ্চিমের ধার করা। যে এন্টি হিরোকে হিরো করা, রাবণকে হিরো হিসেবে দেখা, এটির মধ্য দিয়ে তিনি বলতে চাচ্ছেন যে আধুনিকতার সূত্রপাত এবং রবীন্দ্রনাথের পরিবার, ঠাকুর পরিবার সেটি যেটি করেছেন পুরো রেনেসাঁসের নির্যাসগুলো বাংলা সাহিত্য, শিল্পে, সংস্কৃতিতে চারিয়ে দিতে পেরেছে। এর পরে আমরা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এসে, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বলয় ভেঙে ফেললেন বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলাম” […]

মাইকেল মধুসূদনের হাত ধরে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার সূত্রপাত তাকে এজাজ ‘পশ্চিমা থেকে ধার করা’ বলে খারিজ করছেন, ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে এন্টি নায়ককে (রাবন) নায়ক করা নিয়ে মধুসূদনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাহলে তো কাব্য/সাহিত্যে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের বাইরে এসে নতুনভাবে জীবনকে দেখার ও সৃষ্টি করার কোনো স্পেস থাকে না, প্রাচীন ও মধ্যযুগে রচিত ধর্মীয় কাব্যগুলোর বাঁধা ছকেই আমাদের পড়ে থাকতে হতো যেখানে দেব-দেবীর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য ও অচলা ভক্তি নির্ধারণ করে মানুষের নিয়তি। ভারতে ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সামন্ত অর্থনীতির স্থানে আধুনিক বণিক পুঁজির আবির্ভাবে বাংলায় নতুন মধ্যবিত্ত সমাজের সৃষ্টি, ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে যুক্তিবাদ, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রেনেসাঁসের সাথে পরিচয়ের ফলে সমাজ জীবনে এর শক্তি ও গতিশীলতা যে অনিবার্য পরিবর্তন সূচিত করে তা বাঙালির চিন্তা, মনন ও সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করবে এটাই তো স্বাভাবিক। “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাটিয়া চলিল।/কিছু দূর গিয়া পুন রওয়ানা হইল।।” মধ্যযুগের এই সমিল অক্ষরবৃত্ত বা পয়ারে লেখা মন্থরগতির কাব্য যা ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত চালু ছিল, সেটা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন বাঙালি মনীষা ও তার গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে একজন মাইকেল মধুসূদন দত্তের আবির্ভাব ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক যিনি প্রাচীন চিন্তারীতিকে আঘাত করার পাশাপাশি পরিবর্তনশীল সমাজের গতিকে ধারণ করেন কাব্যছন্দে যার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটে ১৪ মাত্রার প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্তের গতিময়তায়: “সম্মুখ সমরে পড়ি বীর চুড়ামনি/বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে/অকালে, কহ, হে দেবী, অমৃতভাষিণী/কোন বীরবরে বরি সেনাপতি পদে/পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষোকূলনিধি/রাঘবারি।” প্রখ্যাত লেখক, সমালোচক ও চিন্তাবিদ হুমায়ুন কবিরও তাঁর ‘বাংলার কাব্য’ গ্রন্থে এই মত প্রকাশ করেছেন। 

এটা ঠিক যে মাইকেল প্রবর্তিত আধুনিকতা বহু শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী সমাজে গড়ে ওঠা বাংলা কাব্যের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছেদ ঘটায়। সেকথা অধুনান্তিক চিন্তার প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে আমার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি এবং যথাস্থানে তা পুনরুল্লেখ করব। রবীন্দ্রনাথের অনন্যতা এখানেই যে তিনি মধুসূদনকৃত বাংলাকাব্যের এই বিচ্ছেদকে তার সৃষ্টিগুণ ও প্রতিভার মাধ্যমে অতিক্রম করেছিলেন এবং চিরন্তন বাংলা গীতিকাব্যের ধারাকে আধুনিক গীতিকাব্যের রূপদান করে বিশ্বসভায় পৌঁছে দিয়েছেন। আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম এজাজ ইউসুফী, রেনেসাঁসের নির্যাস বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে চারিয়ে দেবার অভিযোগ এনে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করতে চাইলেন। বোঝাই যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এজাজের ধারণা শুধুমাত্র খণ্ডিতই নয়, আরোপিতও বটে।  হুমায়ুন কবির তাঁর ‘বাঙলার কাব্য’ বইতে (অধ্যায়-৫, পৃষ্ঠা ৪১-৪৫) রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যা লিখেছেন তার কিয়দংশ আমি এখানে তুলে দিচ্ছি, “বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব বিস্ময়কর। তাঁর কাব্যসাধনার ঐশ্বর্য এবং বৈচিত্র্য বাঙালি মানসকে যেভাবে অভিভূত করেছে, পৃথিবীর অন্য কোন দেশে কোন কালে বোধ হয় তার তুলনা মেলে না। একটামাত্র কবির সাধনায় প্রাদেশিক ভাষা বিশ্ব-সাহিত্যের পর্যায়ে পৌঁছে গেল, ইয়োরোপে দান্তের জীবনে আমরা তার দৃষ্টান্ত পাই। কিন্তু দান্তের চেয়েও বোধ হয় রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধি দূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী। […] প্রাক-বঙ্কিম যুগের মধ্যবিত্ত মানস বাঙলাদেশে ইয়োরোপের সংস্কৃতির সংস্থাপনার স্বপ্ন দেখেছিল। মাইকেলের কাব্যসাধনা সে প্রয়াসের ব্যর্থতার পরিমাপক। সে ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় কেউ কেউ ইয়োরোপকে একান্তভাবে বর্জন করবার স্বপ্নও দেখেছেন। বঙ্কিমী যুগের হিন্দু মানসের স্বপ্ন ছিল প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন। সে স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথকে টানে নি। তার পরিবর্তে তিনি দেখেছেন ভারতবর্ষে নতুন জাতীয়তার স্বপ্ন, যে স্বপ্ন একদিন আকবরের মনেও জেগেছিল। […] পারিবারিক অথবা সামাজিক কোন বিপর্যয়ের ফলে ঠাকুর গোষ্ঠী হিন্দু সমাজের অন্তৰ্ভূক্ত হয়েও সমাজের সঙ্গে শিথিল-সম্বন্ধ তা জানবার উপায় নাই, কিন্তু কারণ যাই হোক না কেন, এই শ্লথ সম্বন্ধের ফলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে রবীন্দ্রনাথের লাভ বই লোকসান হয়নি। তাই রবীন্দ্রনাথ কেবলমাত্র প্রাচীন ভারতীয় হিন্দুসংস্কৃতির উত্তরাধিকারী নন, মোগল আমলে ভারতবর্ষে ভারতীয় ও সারাসেনিক সভ্যতার সংঘর্ষ ও সমন্বয়ে যে অপরূপ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাকেও তিনি অন্তরে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। সংস্কৃতির এ যুগ্ম ধারায় ইংরেজ আমলের গোড়ায় মিলল, ইউরোপীয় সভ্যতার আবেদন। রবীন্দ্রনাথের জীবনে এ তিন ধারার ত্রিবেণী সঙ্গমের ফলে যে তাঁর বিশ্বজয়ী প্রতিভার বিকাশে সাহায্য করেছে, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নাই। […] তাঁর যৌবনের দিন কেটেছে পূর্ব বাঙলার গ্রামে ও পদ্মার চরে। সেখানে তিনি যে জীবনধারার স্বাদ পেয়েছেন তা বাঙলার আদিম ও শ্বাশত প্রাণধারা। দেশের জীবনস্রোতের সঙ্গে তাঁর যোগ তাই কোনদিন ছিন্ন হয় নি। […] তাই তাঁর মানসে সংস্কৃতি ত্রিধারা কেবলমাত্র আকস্মিকভাবে মেলে নি, জাতির অন্ত:শীলা জীবনের বিচিত্র প্রকাশে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে।” রবীন্দ্রনাথ রেনেসাঁসের থেকে যেটুকু গ্রহণ করেছেন তা এই তরঙ্গের সদর্থক অংশ যা সূচনা-লগ্নে শুধু ইউরোপ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে আলোকিত করেছিল। এজাজ তাঁর পূর্ববর্তী আলোচক মঈনুদ্দিনের মতো বাংলার বাউল, সুফি ও অধ্যাত্মবাদী ঐতিহ্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। প্রশ্ন করি রবীন্দ্রনাথ তাঁর যে-কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন সেই ‘গীতাঞ্জলী’-র মর্মবস্তু কী? সেটা যে বাংলা ও প্রাচীন ভারতীয় অধ্যাত্মবাদী ধারার উচ্চতর প্রকাশ, সেটা কী আপনার অজানা? জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে লালনের সংযোগ, লালনের গান সংগ্রহ করে দেশীয় পত্রিকা ও ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা বিশ্ব পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের গানে বাউল, কীর্তন ও লোকায়ত ঐতিহ্যের বিভিন্ন ধারাকে গ্রহণ করে সঙ্গীতে নবমাত্রা দেয়ার কাজ তো রবীন্দ্রনাথই করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলার বিপুল বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির মাধ্যমে প্রেম, প্রকৃতি, সত্তা ও স্বদেশের রূপসন্ধান, ব্যক্তির আত্মিক মুক্তির সমান্তরালে ধর্ম-সমাজ-রাষ্টের অচলায়তন ভেঙে সামষ্টিক মানুষের মুক্তি, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বীজমন্ত্র উচ্চারণের পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, সমবায়ী অর্থনীতি ও পরিবেশ ভাবনার বাস্তব প্রয়োগে অগ্রণী রবীন্দ্রনাথ আজো বাঙালির জীবনে সর্বোচ্চ প্রভাব সঞ্চারী। বাংলাদেশ রাষ্টের জন্মের সাথে তাঁর অস্তিত্ব মিশে আছে। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষার আন্দোলন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দমন করার ক্ষেত্রে যাকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে, তিনি রবীন্দ্রনাথ। ৬০-এর দশকে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, ৬৭ এর ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্সের ময়দানের জমায়েতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেকসপিয়ার, অ্যারিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য, আর সরকার আমাদের পাঠে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলা কবিতা লিখে বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা এ ব্যবস্থা মানি না, আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এ দেশে গীত হবেই।” বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এই গান গৃহীত হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে। আর বেশি কিছু নাই বলি, আজকের দিনেও বাঙালির এমন কোন উৎসব, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আয়োজন রয়েছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত? সঙ্গত কারণে উত্তর আধুনিক/অধুনান্তিক তাত্ত্বিক, কবি ও লেখকরা রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচনা করেন, তিনি আমাদের চিরকালীন সম্পদ। তাই এজাজ যখন রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে উত্তর আধুনিক সন্দর্ভ রচনার কথা বলেন, তখন তা দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তিনি যে বললেন ‘রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এসে, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বলয় ভেঙে ফেলে নজরুলের আগমন’, এ কথার কী অর্থ? রবীন্দ্র ভাববিশ্বের সাথে নজরুলের কী কোনো বিরোধ আছে? রবীন্দ্রনাথ যেখানে তাঁর স্বভাবধর্মে স্পর্শ করেছিলেন বাঙালি (মানুষের) অস্তিত্বের সামগ্রিক রূপ, সব বন্ধ্যাত্ব ও অবরোধ থেকে মুক্ত হবার জন্য শক্তি জুগিয়েছেন মানুষকে; সেখানে নজরুল নির্দিষ্টভাবে মানবসৃষ্ট সামাজিক বিভেদ, শ্রেণীদ্বন্দ্ব, ধর্মীয় কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট নজরুল যখন ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন, রবীন্দ্রনাথ আশীর্বাদ করে নজরুলকে লিখেছিলেন, ‘‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’’ ইংরেজ সরকার যখন নজরুলকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক লিখে নজরুলকে উৎসর্গ করেন এবং টেলিগ্রাম পাঠান। আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও গভীর সম্পর্ক ছিল। এই মহান কবিদ্বয়ের চিন্তা-চেতনার মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না বলেই, এখনও বাঙালি একই সাথে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন করে। অথচ সেই পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে এক কৃত্রিম বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে বিশেষ একটা গোষ্ঠি। এর কারণ কী? 

পশ্চিম থেকে ধার করেছেন অথবা রেনেসাঁসের নির্যাস নিয়ে কাজ করেছেন এমন সব অভিযোগ তুলে এজাজ ইউসুফী যেখানে মধুসূদন এবং রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করছেন, সেখানে তিনিই বলছেন, “পঞ্চকবি যখন এক একজন পশ্চিমা কবির ধার করা কাব্যচেতনাকে বা তাদের কাব্যদর্শনকে অকাতরে, একেবারে তারা কোনো ভণিতা করেন নি, তারা স্পষ্টভাষায় বলেছেন, আমি অমুকের অনুসারী, আমি ওর মতো লিখি। এইভাবে করে যে আধুনিকতার সূত্রপাত করেছিল এবং পশ্চিমা যে আধুনিকতা, সেটির সূত্রপাত তাদের মধ্য দিয়ে। এটিও একটি, আমাদের কাছে এখন নঞর্থক একটা বিষয় মনে হলেও, সে সময় সেটি কিন্তু একটি বিপ্লবী চেতনা ছিল, রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বের সাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্তির একটি দ্বার খুলে দিয়েছিল, একটি দ্বার উন্মোচন করেছিলেন তারা। আজকে আমরা উত্তর আধুনিকতার সময়ে এসে বলতে চাই যে তারই ধারাবাহিকতায় আশির দশকের যে কবিতা, আশির দশক পর্যন্ত যে কবিতা সেটি তারই ধারাবাহিকতা।”     

এটা কী চূড়ান্ত স্ববিরোধিতা হয়ে গেল না? এই কথার ভিতর কতগুলো ত্রুটি ও স্ববিরোধিতা রয়েছে সেটা দেখুন। প্রথমত যে কারণ দেখিয়ে এজাজ মধুসূদন ও রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করছেন, সেই কারণকে বিপ্লবী চেতনা বলে তিনি তিরিশের কবিদের মহিমান্বিত করছেন এবং দাবি করছেন যে এর মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যের সাথে সংযুক্তি ঘটেছিল। বিশ্ব সাহিত্যের সাথে সংযুক্তি কার মাধ্যমে প্রথমে ঘটেছিল? সেটা যে রবীন্দ্রনাথ, উত্তর সবারই জানা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসাহিত্যকে আত্মস্থ করেছেন, কিন্তু অনুকরণ করেন নি- প্রয়োজনীয় আলোটুকু গ্রহণ করে তিনি বাংলা ও ভারতীয় ভাবসম্পদ নিয়েই বিশ্বসাহিত্যের দরবারে পৌঁছেছিলেন। রবীন্দ্র প্রভাব বলয়কে অতিক্রম করতে তিরিশের কবিরা সফল হয়েছিলেন সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটাকে ‘বিপ্লবী চেতনা’ বলে এজাজ কী স্ববিরোধিতায় জড়িয়ে গেলেন না? বাংলাভাষী উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সকলেই অভিন্ন মতপ্রকাশ করেছেন যে বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ কালের ঐতিহ্য পরম্পরার সাথে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ ঘটেছে তিরিশের কবিদের মাধ্যমে যা আমিও ব্যাখ্যাসহ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি। ব্যতিক্রম জীবনানন্দ দাশ। এমনকি এজাজ নিজেও তার একটি প্রবন্ধে তিরিশের দশকের কবিদের সম্পর্কে একই মতামত ব্যক্ত করেছেন, “আমরা নিজেরাই কিন্তু মাইকেলের মধ্য দিয়ে সচেতনভাবে ভাবেই পাশ্চাত্য প্রভাবকে মেনে নিয়েছিলাম। এক্ষেত্রে ভারতীয় চিন্তা ও দর্শনের সাহায্যে তাকে সফল আত্মীকরণ সম্ভব হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এই লেনদেন প্রতিসাম্য মেনেই এগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী এই সাহিত্যিক প্রেরণা সার্থকভাবে আত্মীকরণ হতে পারেনি তিরিশি আধুনিকতার কালে। হয়েছে পাশ্চাত্য ছায়া মানসের অনুকরণ মাত্র। তাই দেখা যায় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশের এই কালে প্রাচ্যের দার্শনিক চিন্তার প্রভাব সাহিত্য থেকে সরে যেতে থাকে। অথচ ভারতীয় মন দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে কখনই বিশেষণ করা সম্ভব হয়নি। […] ফলে নিজস্ব পটভূমি ছেড়ে এবং দেশজ লৌকিক সত্তাকে বাদ দিয়ে পাশ্চাত্যের দৈন্য-জীবনের গ্লানি, হতমান বিবর্ণতা ও পঙ্কিলতাকে শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ভেবে তাকে ঐশ্বর্যরূপে গ্রহণ করেছে। এখনও বিদেশী মোহাচ্ছন্নতা কাটেনি।” (ঔপনিবেশিকতার স্বরূপ: উত্তর আধুনিকতা, লিরিক, উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা-২, মাঘ ১৪০১) এই ছিল একদা তিরিশের দশক সম্পর্কে যার অভিমত, হঠাৎ কী হল যে এখন তিনি দাবি করছেন তিরিশের ধারাবাহিকতায় আশির দশকের কবিতার উন্মেষ? স্ববিরোধিতা শুধু এখানেই নয়, তিনি যখন তিরিশের দশক থেকে এক লাফ দিয়ে সরাসরি আশির দশকে এসে পৌঁছাতে চান, তখন তিনি অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে অস্বীকার করেন তিরিশ থেকে আশি পর্যন্ত বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায় যা এড়িয়ে গিয়ে উত্তর আধুনিক/অধুনান্তিক কবিতার আলোচনা সম্ভব নয়। যেমন, চল্লিশের দশকে ‘সোশ্যাল রিয়েলিজম’ নামে মার্ক্সবাদী দর্শন ও নন্দতত্ত্বের একটি শক্তিশালী ধারা (কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কবিদের মাধ্যমে) যা তিরিশের অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদের বিপরীতে সক্রিয় ছিল, ৪৭-এ দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভবে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন বিন্যাস সূচিত হয় যা ৭১-এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই আধুনিকতাবাদী কবিতার ধারাটি বহু ব্যবহারে জীর্ণ হলে (কারণ আমার প্রবন্ধে বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে) উত্তর আধুনিক/ অধুনান্তিক কবিতার জন্ম প্রক্রিয়া শুরু হয়। আমি আমার প্রবন্ধে প্রাচীন চর্যাপদ থেকে উত্তর আধুনিক/অধুনান্তিক কবিতা পর্যন্ত সমস্ত যাত্রাপথটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করে প্রথম পর্বের শেষ অধ্যায়ে এর উপসংহার টেনেছি এভাবে, “এই অধুনান্তিক কালপর্বে দাঁড়িয়ে, কবিরা তাদের দৃষ্টি প্রসারিত করেছেন বাংলা কবিতার হাজার বছরের দিকে যাতে বাঙালির ঐতিহ্য ও চৈতন্যপ্রবাহকে যথাযথভাবে শনাক্ত করা যায় এবং বিভিন্ন কালপর্বে ঔপনিবেশিক শাসন ও শিক্ষার ফলে তা যেভাবে খণ্ডিত ও বিকৃত হয়েছে তাকে পুনরুদ্ধার ও পরিশুদ্ধ করে একটি অভিন্ন সূত্র নির্মাণ করা যায়। এবার এই অভিন্ন সূত্রটির সাথে দেশ-কালের বাস্তবতা এবং সমকালীন বিশ্ব-বীক্ষাকে যুক্ত করে বহুত্বময় সমগ্রতার পথে যাত্রা করার সংকল্পই ব্যক্ত করেছেন কবিরা। অবশেষে যাত্রা হয়েছে শুরু! উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঐতিহ্য অনুসন্ধান এবং নিজস্বতা নির্মাণের বোধ এখানকার পোস্টমডার্ন (উত্তর আধুনিক/অধুনান্তিক)-কে ইউরোপ-আমেরিকার পোস্টমডার্ন থেকে পৃথক করে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলা কবিতার হাজার বছরের বিবর্তনের দিকে দৃষ্টি ফেলে আমাদের উপলব্ধি হয় যে ঐতিহ্য ও চৈতন্যপ্রবাহের ধারাবাহিকতা খণ্ডিত হয়েছে, বিশেষ করে, আধুনিকতার বিভিন্ন পর্বে। মধুসূদন যে-আধুনিকতার সূত্রপাত করেছিলেন, তাতে বাংলা কাব্যের নতুন জন্ম সম্ভব হ’ল বটে, কিন্তু তা ইউরোপীয় কাব্যের মডেলকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করায়, হাজার বছর ধরে প্রবহমান আঞ্চলিক বাংলাকাব্যের স্থানিক বৈশিষ্ট্যের সাথে বিচ্ছিন্নতা ঘটে গেল। তার অধিকাংশ কাব্যের বিষয়বস্তু যদিও বাঙালি এবং বৃহদার্থে উপমহাদেশীয় ঐতিহ্যের অংশ, কিন্তু এর কাব্যপ্রাণ ও কাব্যরীতি একান্তভাবেই ইউরোপীয়। মধুসূদনের সাধনার মধ্য দিয়ে আলাদা কাব্যভাষা ও কাব্যবোধ নিয়ে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা কাব্যধারা অর্থাৎ আধুনিক কবিতার সূচনা হয়ে গেল। ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত ব্যক্তিবাদী মননবিশ্বের এই ধারা উত্তরকালে আরো বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে রবীন্দ্রোত্তর কবিদের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসামান্য প্রতিভা এবং ত্রিকালদর্শী প্রজ্ঞার মাধ্যমে এই বিচ্ছিন্নতাকে যথাসম্ভব অতিক্রম করে গেছেন। তাই উত্তর আধুনিক পর্বের কবিকুল তাকে অন্তহীন প্রেরণা ও সৃজনশীলতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নি ও কৌমচেতনাকে তারা সবিশেষ শ্রদ্ধা করেন। রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিকুল নতুন কবিতার সন্ধানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর, পাশ্চাত্য-প্রভাবিত হাইমডার্নিস্ট আধুনিকতাকে এদেশ, মাটি ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা না করে যেভাবে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তাকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে। যদিও এই আধুনিকতা পর্বের শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশকে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়জ্ঞান করা হয় তাঁর অসামান্য ঐতিহ্যচেতনা ও ইতিহাসজ্ঞানের জন্য যার ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর অন্তর্লীন নৈরাশ্য ও বেদনাবোধকে ধারণ করেও মানবমুক্তির জন্য পথ অনুসন্ধান করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে) হাই-মডার্নিস্ট আধুনিকতার আদর্শে গড়ে-ওঠা নগরাশ্রয়ী কাব্যকৃতির তুলনায় মাটিঘনিষ্ঠ, ঐতিহ্য-সংলগ্ন কাব্যধারাটিকে সঙ্গত কারণেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। অবশ্য কবিতার ক্ষেত্র বিবেচনায়, শহর ও গ্রাম এভাবে স্থূল বিভাজন করে দেখার অবকাশ নেই। কবিতার অভেদ অন্বেষণে সর্বগ্রাসী প্রশ্ন হচ্ছে নগর অথবা গ্রাম যা-ই হোক, তাকে কেন্দ্র করে জীবনানুভবের বৈভিন্ন্যকে স্বদেশের বাস্তবতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোয় দেখা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচিত হচ্ছে আজকের অধুনান্তিক কবিকুলের কাছে। এ-কারণেই ভাষা আন্দোলন অথবা স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে ঝলসে-ওঠা প্রতিবাদী শিল্পিত নগরাবয়বকে ঐতিহ্যের স্থানিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ; অন্তঃসারশূন্য একমাত্রিক শ্লোগান অথবা কল্পিত ক্লেদের শহরকে নয়। বাংলা কবিতা যেন বাংলার আত্মা থেকেই উৎসারিত হয় এই বোধ থেকেই অধুনান্তিক কবিতা আদি চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বৈষ্ণব ও শাক্তের অমৃতধারায় অবগাহন করে, লৌকিক কাহিনীকাব্যের রৌদ্রজল গায়ে মেখে পল্লীসাহিত্য ও কবিতার বিপুল ছায়ার নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণভরে সতেজ নিঃশ্বাস নেবার আশায়।” আমার চিন্তা পদ্ধতি আশা করি পাঠকদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেইসাথে আলোচকদের দৃষ্টিভঙ্গী ও বই না-পড়ে সমালোচনা করার সূত্রটিও ধরতে পারছেন। 

 

[চলবে]

 

 

লেখক আড্ডার ভিডিও #২ দেখতে ক্লিক করুন

 

লেখক আড্ডার ভিডিও #৩ দেখতে ক্লিক করুন

 

লেখক আড্ডার ভিডিও #৪  দেখতে ক্লিক করুন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত