| 16 এপ্রিল 2024
Categories
কবিতা সাহিত্য

সিরিজ কবিতা: ভগবান ও গবলেট । নন্দিনী সেনগুপ্ত  

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
 

 

১  

 

অনেকগুলো থিওরি গিলতে গিলতে

আরও ফুলে উঠল

ওয়াইনের গবলেটের পেটের কাছটা।

এতটাই ফুলে গেলো যে

ঐ সরু একটা পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা

মুস্কিল হয়ে যেতে লাগলো তার পক্ষে। 

কে বোঝে তার দুঃখ?

হুঁশওয়ালারাই কেউ বোঝেনা 

মাতালরা তো আরোই…

যাক গে, যার খুশি থিওরি ঠুসে দিক গে 

গবলেট বেশিক্ষণ দাঁড়াতে না পারলে

না পারলে…

আর কী বা হবে? তাকে তো আর পরদিন

ভগবানের মত

জনসভায় বক্তৃতা দিতে হবেনা!

গবলেট নাহয় ক্লান্ত গবেট হয়ে ঘুমোতে যাক। 

তাকে দেখে অন্য কারো

নেশার কথা মনে পড়তে পারে, 

তার নিজের কিচ্ছু মনে পড়ে না     

কিন্তু সাবধান, বেশি ঠুসতে যেওনা।

ফেটে গেলে তোমারি হাতে কাচ ফুটে,

রক্তারক্তি কাণ্ড হতে পারে।

 

 

ভগবানের বাড়ির পার্টিতে

একটা খেলা শুরু হয়েছে অনেকদিন ধরে

চাকরটা অজস্র গবলেট দিয়ে পিরামিড সাজিয়ে রেখেছে  

একদম ওপরের গবলেটটা ভগবানের নিজের জন্য,

সেটা বলাই বাহুল্য। সেটাই সবার আগে ভর্তি হয়  

 

নিচের দুটো সারিতে যে গবলেটগুলো   

ভগবানের একদম কাছের চেলা যারা, তারা পায়  

 

তারও নিচেরগুলো পায়

ভগবানের চাকরবাকর যারা, তারা  

ব্যস, তার নিচেও অনেক, অনেক গবলেট আছে।

 

আসলে এত মানুষ যে ভগবান বানিয়েছিলেন কবে,

সেটা একেবারে ভুলে মেরে  দিয়েছেন

যাই হোক, সব্বার নামে নামে গবলেট আছে

সেটা থাকাই যথেষ্ট নয় কি?  

এবার পানীয় গড়িয়ে গড়িয়ে ওপর থেকে এসে

গবলেট ভর্তি হবে সব মানুষের জন্য…   

আরে দূর দূর, ভুলেও এসব স্বপ্ন দেখো না।    

 

আসলে সমস্যাটা মানুষগুলোর নয়।

ওরা তো জানেই না যে ওদের সবার নামে গবলেট আছে

সমস্যাটা গবলেটগুলোর। একদম নিচের গবলেটগুলোর।

কারণ, ওরা বহুযুগ পানীয় দিয়ে ভরে ওঠেনি,

বহুযুগ কেউ ঠোঁট রাখেনি ওদের কিনারায়।

ওদের গায়ের কাচ শক্ত, শুকনো হয়ে আছে

ওরা ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে আসছে

ফাঁকিবাজ চাকরটা খেয়াল করেনি

একদম নিচের গবলেটগুলো ভেঙে পড়লে

 

পিরামিডটা ধসে যাবে যে কোনও দিন।

 

ভগবান আসলে খুব দুঃখী  

সেটা শুধুমাত্র গবলেটটা জানে।

গবলেটের কিনারা বেয়ে

প্রতি রাতে

যখন এক দু ফোঁটা লবণাক্ত তরল

মিশে যায় পানীয়ের মধ্যে,

তখন গবলেটটা

সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য

ভগবানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে 

 

কিন্তু গবলেটের কোনও হাত থাকেনা।

পা থাকে, সেও একটামাত্র।

আর একটা বেশ বড় পেট থাকে। 

 

কিন্তু সে ভগবানের গবলেট

তাই পেটের ভাবনা একেবারে নেই তার;

 

যাদের আছে, তাদের কোনওদিন দ্যাখেনি

গবলেটটা।

হয়তো ভগবান তাদের চেনেন না একেবারেই।

যাদের চেনেন

তারাই ভগবানকে দুঃখ দিয়েছে।

 

পার্টিতে ভগবানের সঙ্গে

অনেকেই সেলফি তুলতে আসে 

তবে গবলেটটা কোনওদিন আসেনি।

একদিনও না।

গবলেটের এই সেলফি তুলবার অনীহা

ভগবানকে একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেয়।

অবশ্য সেলফি তুললেও

ভগবান সেটা পোস্ট করতেন না।

কারণ, গবলেটসহ ভগবানের ছবি

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট হলে

ভগবান ট্রোলড হতে পারেন।

সে ভারি বিশ্রী বিরক্তিকর ব্যাপার।

গবলেটের কোনও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেই  

কারণ তার হাত নেই। 

 

সেরকম অবশ্য আরও অনেকেই আছে

যাদের হাত নেই 

তবুও তারা ভগবানের সঙ্গে সেলফি তোলে 

সেটা গচ্ছিত ধনের মত রেখে দেয় সাবধানে।

গবলেট সেলফি তোলেনা ভগবানের সঙ্গে।       

গবলেটের এই এত অনীহা

ভগবানকে একটা অনিশ্চয়তার দোলাচলে

টেনে নিয়ে যায়।

ভগবান ভাবতে বসেন  

তবে কি… তবে কি

এই নির্লিপ্তি নিয়ে

গবলেটটাই একদিন

ভগবান হয়ে উঠতে পারে!

 

 

ভগবানের মৃত্যু নেই

কিন্তু গবলেট ভঙ্গুর।

ইচ্ছে হলেই ভগবান 

ভেঙে চুরচুর করে  

প্রতি রাতে নির্মাণ করে নিতে পারেন

নতুন গবলেট।

কিন্তু সেটা হয়না।

কারণ, ভগবানের বয়স বাড়ছে।

মৃত্যু নেই, এটা ঠিক।

তবে চোখের জ্যোতি কমে গেছে অনেক,

বেড়ে গেছে গবলেটটার প্রতি মায়া।

যদি আর এরকম সুন্দর গবলেট তিনি

নির্মাণ করতে না পারেন…

এই ভয়েই ভেঙে ফেলছেন না।

 

 

হে ভগবান, আমি তোমার বাড়ি যাবো না

আমার বড় ভয় করে ভগবান

তোমার শরীর থেকে, চোখ থেকে

দ্যুতি ঠিকরোয় ভগবান  

আমি চেয়ে থাকতে পারিনা

তুমি বসতে বললে বসতে পারিনা  

চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকি হে;

এগোই না আর

পাছে আমার পায়ের কাদা লাগে

তোমার পশম পাপোশে।

 

আমার লজ্জা করে ভগবান

তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে,

পাছে আমার ঘেমো গা আর 

ধুলোমাখা চুলের গন্ধ তোমার নাকে যায়

আমি বরং দুরেই থাকি

দূর থেকে ভেসে আসে

তোমার হেঁসেলের ভালো খাবারের গন্ধ

টুংটাং কাঁটাচামচ, বাসনের আওয়াজ  

না, আমি খাবারের ভাগ চাইবো না  

আমার খিদে পেলে

তোমার বাড়ির উল্টোদিকে

চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে, একটা রুটি খাবো

এককাপ চায়ে ডুবিয়ে

তোমার সময় হলে ডেকো

আমার সদ্যপ্রকাশিত কবিতার বইটা শুধু  

তোমার হাতে দেব

 

আঙুলের ছোঁয়া বাঁচিয়ে যদি রাখো….  

 

ভগবান সাইড টেবিলে

গবলেটটা রেখেছেন   

আমার সদ্যপ্রকাশিত  

কবিতার বইটার উপরে।  

 

গবলেটের পায়ের গোল দাগছোপ  

স্পষ্টতর হচ্ছে বইটার মলাটে

আমার নামের উপরে।            

বইটা এখন

গবলেটের কোষ্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কবিতা কোনও কোনও মানুষকে

ধর্মের মতই

ধারণ করে রাখে     

আর আমার কবিতার বইটা গবলেটটাকে

রোজ সন্ধ্যায় ধারণ করে।

 

আসলে গবলেটেরও তো একটা

সম্মানজনক

দাঁড়াবার ঠাঁই প্রয়োজন। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত